পল্লবী সেনগুপ্ত
—‘এই ভ্যালেনটাইন্স ডে তে সারাদিন ধরে মুভি প্লাস চ্যানেলে দেখুন পর পর ব্লকবাসটার হিট ছবি৷ দেব, জিৎ আর প্রসেনজিৎ...’
উফফ! এই এক জিনিস দেখিয়ে দেখিয়ে ক-দিন ধরে চোখ পচিয়ে দিল একেবারে৷ একরাশ বিরক্তি নিয়ে রিমোটের বোতাম টিপে চ্যানেলটা ঘুরিয়ে দিল নীলিমা৷
—‘এই ভ্যালেন্টাইন ডে তে নিজের মনের মানুষকে মনের মতো উপহার দিতে চলে আসুন মায়াবী জুয়েল হাউসে...’
এবার টিভিটা বন্ধই করে দিল নীলিমা৷ এই এক শুরু হয়েছে এখন৷ এই সব ভ্যালেন্টাইন ডে নাকি সব গুষ্টির পিণ্ডি এসব আগে ছিল না এত৷ এখনই যত্ত বাড়াবাড়ি৷
টিভি বন্ধ করে হালকা পাখা চালিয়ে চাদর ভালো করে মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ল নীলিমা৷ প্রতিদিন এই সময় মানে এই দুপুরের দিকটায় টিভি নিয়েই থাকে ও৷ কিন্তু আজ ইচ্ছে করছে না৷ কিচ্ছু ভালো লাগছে না৷
আর চারিদিকে এই ভ্যালেন্টাইনের ভ্যানভ্যানানি দেখতে আরও বেশি যেন অসহ্য লাগছে আজ৷ আসলে নীলিমার মতো মেয়েদের কাছে ভ্যালেন্টাইন ডে আর বাকি আর পাঁচটা দিনের তো কোনো পার্থক্য হয় না, তাই এসব আদিখেত্যাও জাস্ট পোষায় না৷
প্রেম দিবস! হুহ! প্রেম বলে কি আদৌ কিছু হয় নাকি যে তার আবার আলাদা করে কোনো দিন হবে! হ্যাঁ প্রেম নামক ওই শব্দটা সিনেমা, সিরিয়াল বা গল্পের বইয়ের পাতার বাইরে থাকে না, এটা মনে প্রাণে বিশ্বাস করে নীলিমা৷ কারণ এই চল্লিশ বছর বয়স পর্যন্ত নীলিমা জীবনে প্রেম বলে কোনো বস্তুর দেখা পায়নি৷
হ্যাঁ সেই বয়স যখন ওর চোদ্দ ছিল তখন পাড়ার বিনোদদা’কে ওর খুব ভালো লাগত৷ কী সুন্দর দেখতে৷ কী সুন্দর গান গাইত লোকটা৷ তখন নীলিমা রোজ স্কুল যাবার পথে দু-চোখ ভরে দেখত বিনোদদাকে৷ রোজ সকালে ওই সময়টাতেই জানলার পাশে বসে রেওয়াজ করত বিনোদ দা৷ ওকে দেখে তখন নীলিমার মনে হত ইশশ! যদি এই লোকটার পাশে বসে ওর চোখে চোখ রেখে সারাজীবন ধরে বসে ওর গান শোনা যেত, তাহলে কি ভালোই না হত৷
এরকম ভাবতে ভাবতে যখন নীলিমার দিন কাটছিল তখনই দুম করে একদিন বাড়িতে চলে এল বিনোদদা’র বিয়ের কার্ড৷ কার্ডটা দেখে বুকের কাছটা কেমন যেন মুচড়ে উঠেছিল নীলিমার৷ কয়েকদিন পর পর রাতে আর ঘুম হয়নি৷ শুধু এটা ভেবে মনের মধ্যে হুহু করেছিল যে এবার থেকে আর বিনোদদাকে দু-চোখ ভরে দেখার আর তাকে নিয়ে স্বপ্নের জাল বোনার অধিকারটা থাকবে না ওর৷ বিনোদদা পুরোপুরি অন্য কারোর হয়ে যাবে৷
যাই হোক সেই প্রথম আর সেই শেষ৷ এই ঘটনার পর আর কোনদিন প্রেম প্রেম ভাব জাগেনি নীলিমার মধ্যে৷ আর বিনোদদার বিয়ে হবার পর, ওই বউকে দেখার পর আস্তে আস্তে নীলিমার মন থেকে মুছে যেতে শুরু করছিল বিনোদ প্রীতি৷
তারপর তো আর বছর কয়েকের মধ্যে বিয়েই হয়ে গেল ওর কলকাতা শহরের দায়িত্ববান সরকারি কেরানি রতন হালদারের সাথে৷ হ্যাঁ দেখতে দেখতে এই রতন হালদারের সংসারে আঠারোটা বছর পার হয়ে গেল নীলিমার৷
এই আঠারো বছরে নীলিমা কোনোদিনই প্রেম খুঁজে পায়নি সম্পর্কের মাঝে৷ রতন বরাবরই খুব ছাপোষা মানসিকতার মানুষ৷ সে খুব দায়িত্ববান গৃহকর্তা নিঃসন্দেহে৷ তা ছাড়া বলাই বাহুল্য যে রতন খুব কর্তব্যপরায়ণ বাবা, খুবই নিয়ম মেনে চলা দায়িত্বশীল স্বামী৷ তবে কোনোভাবেই এক কণাও প্রেমিক নয়৷ রতন খুব সৎ মানুষ৷ সে খুব নিষ্ঠা করে পুজো জ্ঞানে নিজের চাকরি করে, নেশা করে না, মেয়েদের দিকে বদ নজরেও তাকায় না৷ বলা ভালো রতন মধ্যবিত্ত জীবনের গতানুগতিক নিয়মের এক চুলও এদিক ওদিক করে না৷ আর সেই জন্যই মাঝে মাঝে নীলিমার মনে হয় রতন বুঝি অনুভূতি শূন্য একটা রোবট৷ যে যন্ত্রের মতো সংসার করে যে ভাবে, বিছানায় নিজের শরীরের জৈবিক নিয়মের খাতিরে রমণও করে সেভাবে আবার বাজারে গিয়ে আলু পটলও কিনে আনে সেভাবে৷
ঘটাং ঘটাং করে বাইরের গেট খোলার শব্দে নীলিমা বুঝল বুবান ফিরল স্কুল থেকে৷ ফিরুক গে৷ আজ আর উঠতে ইচ্ছা করছে না নীলিমার৷ পুঁটি আছে৷ ওই দরজা খুলে খেতে দিয়ে দেবে ওকে একটা দিন৷
বুবান মানে নীলিমার একমাত্র ছেলে৷ এখন ক্লাস নাইন৷ দেখতে দেখতে ওই একরত্তি ছেলেটাও চোখের সামনে কত বড়ো হয়ে গেল৷ এখন নিজের জগতেই সে ডুবে থাকে বেশি৷ তাই নীলিমা যেন আরও বেশি একা হয়ে গেছে আজকাল৷ তবুও ছেলেটা যখন মা-এর আঁচল ধরা ছিল তখন ওকে নিয়ে সময়টা কেটে যেত নীলিমার৷ কিন্তু এখন তো আর ছেলেরও মা-কে সেভাবে প্রয়োজন নেই৷ আর রতন হালদার? সে, আর কবেই বা নীলিমাকে নিয়ে ভেবেছে৷ ভাবতে জানে নাকি আদৌ লোকটা? কোনো অনুভূতি থাকলে তো! আজকাল সত্যি চোখ ফেটে জল আসে নীলিমার৷ এই ভাবে ভালোবাসাবিহীন একটা আসবারের মতোই তাহলে কাটবে ওর বাকি জীবনটাও? কেউ তো বোঝে না নীলিমা কতখানি একা আর নিঃস্ব৷ এই চার দেওয়াল, বাংলা মেগা সিরিয়াল আর দেব জিতের সিনেমা দিয়ে নিজেকে যে আর ভুলিয়ে রাখতে পারছে না ও৷
—‘কি হল মা শুয়ে আছ এভাবে ঘর অন্ধকার করে? শরীর খারাপ নাকি তোমার?’ বুবান মায়ের ঘরে ঢুকেই ছুঁড়ে দিল প্রশ্নটা৷
—‘না শরীর খারাপ নয়৷ এমনি৷ ভালো লাগছে না৷ তুই খেয়ে নে৷ পুঁটিদিকে বল ও দিয়ে দেবে৷’ ধরা গলায় জবাব দিল নীলিমা৷
—‘শরীর খারাপ নয় তো কি হয়েছে? ও বুঝেছি৷ সকালে বাবার সাথে যে ঝগড়া হল সেই নিয়ে মুড অফ তোমার৷ তাই তো? উফফ! মা এই হয়েছে তোমাদের প্রবলেম৷ প্রথমে নিজেরাই ঝামেলা করবে আর তারপর নিজেরাই মুড অফ করবে৷ কোনো মানে হয়? তার চেয়ে ভালো কথা বলছি শোন৷ এই সব অশান্তি মিটিয়ে নাও৷ কাল বাদে পরশুই ভ্যালেন্টাইন ডে৷ বাবাকে একটা গোলাপ আর সিগারেটের প্যাকেট দিয়ে পটিয়ে ফেল৷ তারপর দেখবে বাবা ঠিক তোমার দাবি মেনে নেবে৷’ হে হে করে হেসে নিজের বিধান শুনিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল বুবান৷
আবার চোখ ফেটে জল আসছে নীলিমার নিজের পেটের ছেলেটাও ওকে বোঝে না৷ কি লাভ আর ওর বেঁচে থেকে৷ আজ সকালে... আজ সকালে যা কিছু হয়েছে সবটাই তো চোখের সামনে দেখল বুবান৷ তারপরেও মায়ের হয়ে একটি কথাও বলল না বাপের বিরুদ্ধে৷ অবশ্য কেনই বা বলবে৷ বাপের পয়সায় খায় পরে ছেলে৷ কিন্তু নীলিমার শ্রম! তার কি কোনো দাম নেই৷ কি না করেছে নীলিমা এই সংসারের জন্য? যেদিন থেকে বিয়ে হয়ে এসেছে সেইদিন থেকে ভেবে গেছে সকলের কথা৷ মুখ বুজে শ্বশুর শাশুড়ির সেবা করে গেছে তাদের জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত৷ প্রতিটা মুহূর্তে ভেবে গেছে কীভাবে সংসারের মানুষগুলোকে শুধু আর একটু বেশি ভালো রাখা যায়৷ প্রতিদিন সবার মন মত খাবার বানান, ঘর গোছান, সকলের মঙ্গল কামনায় ব্রত করা, পুজো দেওয়া এসবেরল কি কোনো দাম নেই?
কোনোদিন নীলিমা মুখ ফুটে কিচ্ছু চায়নি স্বামীর থেকে৷ না শাড়ি, না কোন দামি হোটেলে ডিনার৷ এমনকী নিজের একফালি ছাদের স্বপ্নটাকেও মেরে ফেলেছে গলা টিপে৷ এই ভাড়ার বাড়িটাকেই বানিয়ে নিয়েছে নিজের স্বর্গ৷ আর বাইরের খাওয়া বলতেও নীলিমার কাছে বড়োজোর পাড়ার মোড়ের বিমলের দোকানের বিরিয়ানি আর মাঝে মাঝে রতনের বিকালে কিনে আনা ডিমের চপ৷ কিন্তু তারপরেও সংসারের আজ ওর এই দাম!
পরের মাসে বড়দার মেয়ে মানসীর বিয়ে৷ তাই নীলিমার বড়ো ইচ্ছে ওকে একটা গলার চিক উপহার দেবার৷ সেই কথা ও বলেও ফেলেছে মানসীকে৷ নিজের জন্য তো কোনোদিন কিছু চায়নি ও বরের কাছে, তাই প্রথমবার কিছু একটা বললে রতন না করবে না বলেই ওর বিশ্বাস ছিল৷
—‘সামনের মাসেই তো মানুর বিয়ে৷ তাই ওর জন্য তো ভালো কিছু উপহার নিতে হবে৷ মানে সোনার কিছু৷’ কথাটা আজ সকালেই রতনকে বলেছিল নীলিমা৷
অফিস যাবার জন্য তখন তৈরি হচ্ছিল রতন৷ ভাবলেশহীন গলায় জবাব দিয়েছিল—
—‘হ্যাঁ জানি৷ টাকা আমার সরানো আছে আলাদা৷ কানের ফুল দেবে তো? হয়ে যাবে৷ কবে কিনতে যাবে বল৷’
—‘না কানের ফুল না৷ আমি ওকে গলার চিক দেব৷ ওকে আমি বলেছি৷’
—‘গলার চিক মানে?’ আকাশ থেকে যেন পড়েছিল রতন৷ আর ওর ওই ভঙ্গিমাটা দেখে ধাঁ করে মাথাটা গরম হয়ে গেছিল নীলিমার৷
—‘গলার চিক মানে গলার চিক৷ শোননি নাকি আগে কখনো৷’
—‘না নীলিমা৷ ওসব হবে না৷ আমার অত বাড়তি টাকা নেই৷ কানের ফুলই ঠিক আছে৷’
আর সহ্য করতে পারেনি নীলিমা৷ বেশ চেঁচিয়ে বলে উঠেছিল—
—‘না ঠিক নেই কানের ফুল৷ আমি চিকই দেব৷ জীবনে কোনোদিন কিছু চাই না বলে খুব পেয়ে বসেছ না? কোথা থেকে টাকা জোগাড় হবে জানি না আমি৷ চিক দেব ব্যস৷’
—‘আর আমিও বলে দিচ্ছি আমি একটা বাড়তি টাকাও দিতে পারব না৷ কত খেটে রোজগার করতে হয় জান?’
শেষ কথার শ্লেষটা চরম ভাবে বিদ্ধ করেছিল নীলিমাকে৷ ও রোজগার করে না বলে আজ এত বছর পর রতন খোঁটা দিচ্ছে ওকে? অনেক কষ্টে কান্না চেপে বলেছিল—
—‘অনেক হয়েছে আর না৷ অনেক মানিয়ে চলেছি আমি, কিন্তু এবার আমি সত্যি ক্লান্ত৷ পারছি না আর তোমার সাথে চলতে৷ ছেলেও বড়ো হয়ে গেছে৷ এবার দয়া করে মুক্তি দাও আমায়৷ আমি সত্যি আর থাকতে চাই না তোমার মতো লোকের সাথে৷’ বলেই ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল দুম করে৷
সত্যি নীলিমা চলে যাবে৷ যেদিকে দু-চোখ যায় সেখানেই চলে যাবে ও৷ এই সংসারে আর ও থাকবে না৷ এখানে তো ওর কোনো দামই নেই৷

—‘বউদি একটা কথা ছিল৷’ দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে পুঁটি৷
—‘বল কী হয়েছে?’
—‘আমায় দু-শো টাকা আগাম দেবে গো?’
—‘মানে? কী জন্য আগাম দেব? এই তো ক-দিন আগে মাইনে পেলি৷’ বিরক্ত গলা এবার নীলিমার৷
—‘না মানে আসলে পরশু তো ইয়ে মানে... মান ভেলেটিন ডে না ওই কি যেন... তাই আমার ব ফেরেনড (বয়ফ্রেন্ড) কে একটা কিছু দেব৷’
উফফ! আবার ঘুরে ফিরে সেই ভ্যালেন্টাইন ডে৷ না অসহ্য লাগছে নীলিমার এই বিষয়টা৷ ওর তো না আছে জীবনে ভালোবাসা আর না আছে ভালোবাসার দিন... তবুও ওর সামনেই বারবার কেন আসছে এই কথা!
—‘কোনো আগাম হবে না৷ যা এখন৷’ খিঁচিয়ে উঠল নীলিমা৷
মনটা খুব ভারাক্রান্ত লাগছে৷ না, সত্যি সবার জীবনে সব কিছু থাকে না৷ তাই নীলিমার জীবনেও নেই৷ প্রেম ভালোবাসা এই সব শব্দগুলো এই নীলিমার আর এই জীবনে খুঁজে পাওয়া হল না৷
সিটটা খালি হতেই তাতে ধপ করে নিজের শরীরটা ছেড়ে দিল রতন৷ উফফ! বাসে সিট খালি পাওয়া তো নয় যেন ভগবানের দেখা পাওয়া৷ দিন দিন এই অফিস টাইমে বাসে করে বাড়ি ফেরার পর্বটা যেন কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে উঠছে৷ অন্যদিন সিট পাওয়া নিয়ে এত চাপ নেয় না রতন৷ কিন্তু আজ শরীরটা সত্যি বিশেষ ভালো লাগছে না৷ সকাল থেকে মাথার মধ্যে কেমন যেন চাপ ধরে আছে৷ আর এখন তো নিঃশ্বাসটা কেমন যেন বন্ধ হয়ে আসছে এই ভিড় বাসটায়৷
ধুর! আর ভালো লাগে না৷ বাঁচতেই আর ইচ্ছে করে না রতনের৷ কি লাভ আর এই থোর বড়ি খাড়া জীবনটাকে বয়ে বেড়িয়ে নিয়ে৷ অনেক তো হল৷
ছোটোবেলা থেকেই বড্ড সাদা মাঠা ছেলে রতন৷ পড়াশুনায় সাধারণ, কথাবার্তা হাঁটা চলা চেহারা সবই সাধারণ৷ সেটা জানত রতন বরাবরই৷ তাই গ্র্যাজুয়েশন শেষ করার পর যখন একটা সরকারি চাকরি জুটেছিল তাতে বেশ খুশিই হয়েছিল ও৷ হোক না কেন কেরানির চাকরি, তবুও সরকারি তো৷
বিশেষ কোনো মেয়ের প্রতি প্রেম ট্রেম কোনোদিনই তেমন আসেনি রতনের মনে৷ তাই বাবা মা যখন বললেন সেজ মাসিমার ননদের মেয়ের সাথে সম্বন্ধ এসেছে রতনের আর তাকে দেখতে যেতে হবে, তখন বাবা মা-র বাধ্য ছেলে হয়ে চলেই গেছিল রতন৷
মেয়েটাকে দেখে প্রথমবারেই কি যেন একটা হয়েছিল রতনের৷ কি যে ঠিক হয়েছিল সেটা ও নিজেও বুঝতে পারেনি সেদিন৷
ফর্সা মুখ, টোল পরা গাল আর জোড়া ভুরুর মাঝে কালো ছোট্ট টিপ আর তার মাঝেই নিজের মনটা হারিয়ে ফেলেছিল রতন৷ বাড়ি ফিরে বাবা মা-কে জানিয়েছিল বিয়ে করলে শুধু মাত্র এই মেয়েকেই বিয়ে করবে ও৷
তারপর শুভ দিনে বর বেশে রতন পৌঁছে গেছিল তাকে একদম নিজের করে নিয়ে আসার জন্য৷ বিয়ে ঠিক হবার পর থেকে প্রতিদিন রাতে তাকে নববধূর সাজে কল্পনা করে রতন যে কি ভীষণ রোমাঞ্চিত হত তা শুধু ও নিজেই জানে৷
শুভদৃষ্টির সময় চোখে একরাশ স্বপ্ন আর ভালোবাসা নিয়ে রতন তাকিয়েছিল তার দিকে৷ কিন্তু ওই চোখ দুটো কেমন যেন ভাবলেশহীন৷ সম্প্রদানের সময় ঘটের উপরে রাখা গামছার আড়ালে রতন নিজের সবটুকু ভালোবাসা উজাড় করে চেপে ধরেছিল তার হাতে৷ ভেবেছিল বোধ হয় তার মুখেও ফুটে উঠবে চিরাচরিত কনে সুলভ গোলাপি আভা৷ কিন্তু না৷ সে মুখ তখনও নির্বিকার৷ ফুল শয্যার রাতেও তাই৷ রতন ঢেলে দিতে চেয়েছিল তার সবটুকু উষ্ণতা, কিন্তু সে? না তাকে সেদিনও পড়তে পারেনি রতন৷
প্রথম প্রথম রতন ভাবত সবে নতুন বিয়ে হয়েছে, নিজের পরিবার পরিজনদের সকলকে ছেড়ে নতুন পরিবেশ তাকে মানিয়ে চলতে হচ্ছে তাকে আর সেই জন্যই হয়তো এত উদাস থাকে সে৷ কিন্তু না৷ আসল কারণটার তল রতন পেয়েছিল বিয়ের প্রায় মাস ছয়েক পর৷ রতনেরই ছোটো শালি পরমা ইয়ার্কিচ্ছলে বলে ফেলেছিল একদিন৷ বিয়ের আগে নাকি তার মনে ধরেছিল তাদেরই পাড়ার এক গানের মাস্টারকে৷ দারুন নাকি গানের গলা তার, আর সাথে চেহারা খানাও খাসা৷ পুরো বাংলা সিনেমার চিরঞ্জিত টাইপ৷
সবটা শুনেই কেমন যেন কুঁকড়ে গেছিল রতন৷ মুহূর্তের মাঝেই নিজেকে একটা জোকার বলে মনে হয়েছিল৷ সত্যি তো৷ নীলিমার মতো মেয়ের পাশে তো অমন ছেলেকেই মানায়৷ রতনের মতো কালচে গায়ের রং, তোবড়ানো গাল আর হাফ টেকো টাইপ একটা মানুষকে কি আর নীলিমার পছন্দ হতে পারে৷ সেদিনের পর থেকেই একটু একটু করে নিজের আবেগ আর তার প্রকাশকে গুটিয়ে নিয়েছিল রতন৷
নীলিমা খুব কতর্ব্যপরায়ণ মেয়ে৷ রতন বা তার বাড়ির লোকদের প্রতি দায়িত্ব বা কর্তব্য নিয়ে সে একদম একশো ভাগ সৎ৷ কিন্তু রতন তো এই দায়িত্বের ভার বয়ে চলা এই মানুষটাকে চায়নি৷ ও তো শুধু চেয়েছিল নিজের জন্য এক সমুদ্র ভালোবাসা খুঁজে পেতে যেমনটা ওর নিজের মনে আছে নীলিমার জন্য৷
কিন্তু না৷ এই আঠারো বছরে একদিনও নীলিমার চোখে দেখতে পায়নি নিজের জন্য সেই বাঁধন ভাঙা প্রেম৷ উল্টে ওর ভালোবাসাকেও নীলিমা বুঝতে পারেনি কোনোদিন৷ বুঝতে চায়ইনি৷ বিয়ের পরে নীলিমা পুজোর সময় জামা কাপড় কিনতে যেত রতনের মায়ের সাথে৷ সাধারণত নিজের পছন্দ মতোই শাড়িটারি কিনত ও৷ কিন্তু তবুও একবার নিজের পছন্দে বেগুনি রঙের জমকালো একটা শাড়ি কিনে নিয়ে গেছিল ওর জন্য৷ বেগুনি রঙটা যে রতনের বড্ড প্রিয়৷ প্রথবার নিজে হাতে নীলিমাকে উপহার দেওয়াটা নিয়ে সেদিন বেশ উত্তেজিত ছিল রতন৷ কিন্তু মুহূর্তের মাঝেই নীলিমা নিভিয়ে দিয়েছিল সবটা৷
—‘ইশশ! কী শাড়ি এটা? কী বাজে রং৷ আর এত জংলা কাজ আমি পড়ি নাকি? তুমি রাখ এটা৷ সামনের মাসে সুভাষ কাকুর মেয়ের বিয়ে আছে, তখন ওকেই দিয়ে দেব এটা৷ আর পয়সা খরচ করে কিনতে হবে না তখন৷’
শুধু বোকার মতো একটু ঘাড় নেড়েছিল রতন৷
আর একবার নিজের পছন্দ মতো এক নাকছাপি নিয়ে গেছিল ও নীলিমার জন্য৷ নীলিমার জন্মদিনে৷ ওর মনে হয়েছিল দারুন মানাবে এটা ওকে৷ কিন্তু সেদিনও নীলিমা গুরুত্ব দেয়নি ওর ভাবনাকে৷
—‘এ বাবা! কি বিচ্ছিরি জিজাইন৷ তুমি আমায় না দেখিয়ে কেন কিনতে যাও বলতো৷ শুধু শুধু পয়সা খরচ৷ যাকগে এটার ক্যাশ মেমো আছে তো? কাল গিয়ে পাল্টে আনব আমি৷’
এরপর থেকেই আস্তে আস্তে নিজের সব আবেগকে গলা টিপে শেষ করতে মরিয়া হয়ে উঠেছিল রতন৷ কিছুটা পেরেও ছিল৷ কিন্তু অনেকটাই পারেনি৷ সেইজন্যই তো ওর ভালো লাগা, মন্দ লাগা, খুশি অখুশি নিয়ে আজও এত বেশি ভাবে রতন৷
রতন জানে মুখ ফুটে না বললেও নিজের একটুকরো বাসার বড়ো সাধ মানুষটার৷ আর তাইতো অফিসের অজিতদার সাথে কথা বলেছে রতন৷ অজিতদা ব্যবস্থা করে দেবেন বলেছেন৷ সেকেন্ড হ্যান্ড ফ্ল্যাট৷ অজিতদার চেনাও আছে৷ বেশ সস্তায় হয়ে যাবে৷ নিজের সব শখ আহ্লাদ বিসর্জন দিয়ে শুধু নীলিমার এই সাধটা মেটানোর জন্যই যে তিল তিল করে পয়সা জমাচ্ছে রতন৷ নীলিমাকে জানতে দেয়নি৷ ভেবেছিল হঠাৎ একদিন বলে চমকে দেবে ওকে৷ ওর মুখে সেই আচমকা অনাবিল খুশি দেখতে পাওয়ার সাধটা রতনের আজও মেটেনি যে৷
না এখন হিসেব বহির্ভুত খরচ করাটা রতনের পক্ষে সত্যি সম্ভব নয়৷ সেইজন্যই তো আজ না চাইতেও নীলিমার দাদার মেয়েকে চিক দেবার প্রস্তাবটা খারিজ করতে হল রতনকে৷ হ্যাঁ হয়তো এতে নীলিমার রাগ করাটা স্বাভাবিক ছিল, কিন্তু তা বলে এত বড়ো কথা! আঠারো বছর সংসার করার পরও কি নীলিমার এতটুকু মায়া জন্মায়নি এই ছাপোষা কুদর্শন মানুষটার ওপর? না নিশ্চয় জন্মায়নি৷ তা না হলে কি আর বলতে পারত যে মুক্তি চায় ও৷ হ্যাঁ ও তো বলেই দিল রতনের মতো মানুষকে নিয়ে আর চলতে পারছে না ও৷
না সত্যি বড্ড বেশি কষ্ট হচ্ছে আজ রতনের৷ বুকের কাছটায় একটা অসহ্য চাপ লাগছে৷ মনে হচ্ছে হূৎপিণ্ডটা যেন ছিঁড়ে যাবে এবার৷ দমটা বন্ধ হয়ে আসছে ধীরে ধীরে৷ আস্তে আস্তে চোখের সামনে ঝাপসা হয়ে আসছে এই পৃথিবী, চারপশাটা, এই বাসটা৷
—‘দাদা... দাদা কী হয়েছে আপনার? আপনি এমন করছেন কেন? দাদা... এই জল দে ওনাকে... এক্ষুনি নিয়ে আয়...’
কতগুলো অচেনা মুখ ঝুঁকে পড়েছে রতনের ওপর৷ একরাশ অচেনা কণ্ঠস্বর ওকে নিয়েই যে কথা বলছে বুঝতে পারছে রতন৷ বাসটা কি থেমে গেল এবার? আস্তে আস্তে সব শব্দ ফিকে হয়ে আসছে৷ সব দৃশ্য ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে৷ রতন কি মারা যাচ্ছে তাহলে? হ্যাঁ তাই বোধ হয়৷ এই বেশ৷ নীলিমা তো মুক্তিই চেয়েছিল ওর থেকে৷ নীলিমাকে মুক্তি দিয়ে চলে যাচ্ছে ও৷ ও ভালো থাক... সুখে থাক... আর রতন থাকবে না ওর জীবনে৷ আর রতন ভাববে না ওর কথা৷ অনেক দূরে... অনেক দূরে এবার চলে যাচ্ছে রতন৷
—‘রতন হালদারের বাড়ির লোক কে আছেন?’ নার্সের আচমকা কর্কশ স্বরে ঈষৎ কেঁপে উঠল নীলিমা৷ গত দেড় দিন ধরে এই নার্সিং হোমেই পড়ে রয়েছে ও৷ এক মুহূর্তের জন্যও যেতে পারেনি মানুষটাকে ফেলে৷ সবার হাজার অনুরোধ সত্ত্বেও মুখে বিশেষ কিছু তুলতেও পারেনি৷ কী করেই বা পারবে৷ ওখানে যে লোকটার যমে মানুষে লড়াই চলছে৷
সব হয়েছে নীলিমার জন্য৷ না নিজেকে কোনোদিন ক্ষমা করতে পারবে না ও৷ সেদিন ঠিক বেরোবার আগের মুহূর্তেই চিক দেবার ব্যাপারটা নিয়ে ওই তো অশান্তি বাধিয়েছিল৷ ভালো করে খেয়েও যেতে পারেনি মানুষটা৷ নিশ্চয় সারাদিন ধরে খুব টেনশন করেছে আর তার ফলেই...
আসলে নীলিমা যে সত্যি একেবারেই বুঝতে পারেনি এমন কিছু ঘটতে পারে৷ ঝগড়া অশান্তি তো ওদের এর আগেও কতবার হয়েছে৷ কিন্তু তা বলে এত মারাত্মক তার ফল! ডাক্তাররা বলছেন রতনের হার্ট অ্যাটাকটা বেশ ভালোই সিরিয়াস৷ বহুদিন ধরেই নাকি একটু একটু করে হূৎপিণ্ডের ব্যাধি বাসা গেড়েছে ওর শরীরে৷
যেদিন ওদের ঝগড়া হয়েছিল সেদিনই সন্ধ্যাবেলা অফিস থেকে ফেরার পথে বাসে অ্যাটাকটা হয় রতনের৷ ভাগ্যিস বাসে পাড়ার দু-একজন চেনা লোক ছিলেন৷ তারাই ওকে নার্সিং হোমে ভর্তি করান আর বাড়িতে খবর দেন৷
না, রতনকে সুস্থ করে নিয়ে তবেই একেবারে বাড়ি ফিরবে নীলিমা৷ নইলে কি বা আছে ওর বাড়ি ফেরার৷ সারাদিন রান্না বান্না সে তো রতনের কথা ভেবেই, পুজো আচচা সেও ওরই মঙ্গল কামনায়, বাড়ি গুছিয়ে রাখা সেও তারই জন্য৷ আগোছালো ঘর যে মোটে পছন্দ না মানুষটার৷ নীলিমার জীবনের প্রতি পরতেই তো রতন৷ রাগ করলেও রতন, অভিমান করলেও রতন, ঝগড়া করলেও রতন, কিছু প্রত্যাশা করলেও রতন৷ নীলিমার অস্তিত্বের মধ্যেই তো মিশে আছে মানুষটা৷ না এই উপলব্ধিটা আগে কোনোদিন এভাবে হয়নি নীলিমার৷ আসলে ও সব সময়ই জানত যে, রতন তো আছেই৷ রতনকে হারিয়ে ফেলার ভয় তো কোনোদিন এর আগে পেতে হয়নি নীলিমাকে৷ আজ প্রথমবার ওকে হারিয়ে ফেলার কথা ভাবতে গিয়েই আঁতকে উঠছে ও৷ আরও বেশি করে বুঝতে পারছে রতন ওর জীবনের কতখানি বা বলা ভালো ওর জীবনের সবটুকু জুড়েই তো রতন৷ আজ শুধু একটাই প্রার্থনা প্রতি নিয়ত করে চলেছে নীলিমা ভগবানের কাছে—
—‘হে ঈশ্বর, শুধু মানুষটাকে ভালো করে ফিরিয়ে দাও আমার কাছে৷ বাড়ি, টাকা পয়সা কোনোদিন আর কিচ্ছু চাইব না আমি৷ শুধু মানুষটাকে পাশে নিয়ে আজীবন চলতে চাই৷’
—‘রতন হালদারের বাড়ি থেকে কে আছেন?’ নার্স ডাকল গম্ভীর গলায়৷
—‘আমি... আমি ওর মেজ শালা৷ আমায় বলুন...৷’ মেজদা এগিয়ে গেল নার্সের ডাকে৷ পাশেই ভিতু ভিতু চোখে দাঁড়িয়ে আছে বুবান৷
—‘উই আর ভেরি সরি৷ মিস্টার হালদার ইজ নো মোর৷’
নীলিমার সারা শরীরটা কেঁপে উঠল এবার৷ মানে হল কানের ভিতর কেউ ঢেলে দিল যেন এক টিন গরম গলন্ত সীসা৷ মুহূর্তের মধ্যেই যেন বুকের ভিতরটা খালি৷
না কান্না পাচ্ছে না নীলিমার৷ সব চোখের জল যেন শুষে নিয়েছে কোনো অদৃশ্য দানব৷
রতন আর নেই! রতন ওকে ছেড়ে চলে গেছে! না এটা তো হতেই পারে না৷ এবার আর তাহলে নীলিমা বেঁচে থাকবে কী জন্য? আর তো কোনো কাজ নেই ওর৷ কার মঙ্গল কামনায় পুজো করবে? কার পছন্দ ভেবে সব্জি কিনবে বাজার থেকে? কার জন্য রান্না করবে? যে কোনো অসুবিধাতেই কাকে মুখ ঝামটা দেবে? কেই বা সন্ধ্যাবেলা নীলিমাকে ডিমের চপ এনে দেবে? কে নীলিমার সব অভিযোগ শুনবে? কার সাথে আর ঝগড়া করবে নীলিমা৷
রতন ছাড়া যে নীলিমার পুরো অস্তিত্বটাই নড়বড়ে৷ বুকের কাছে অসহ্য একটা যন্ত্রণা হচ্ছে নীলিমার৷ ও কিছুতেই সহ্য করতে পারছে না৷
—‘নাআআ’... গগনভেদী একটা তীব্র চিৎকার বেরিয়ে এল নীলিমার গলা চিরে৷
—‘মা... মা... কী হয়েছে তোমার...’ বুবান ঝুঁকে পড়েছে নীলিমার ওপর৷
ধড়মড় করে চোখ খুলল নীলিমা৷ নার্সিং হোমে টানা দেড় দিন ধরে বসে থাকতে থাকতে এমনটাই হচ্ছে থেকে থেকে৷ মাঝেই মাঝেই চোখে বুজে আসছে হালকা তন্দ্রায়৷ আর অমনি চোখের পাতায় এসে ভিড় করছে একরাশ দুঃস্বপ্ন৷
—‘রতন হালদারের বাড়ি থেকে কে আছেন?’ চমকে উঠল নীলিমা৷ নার্স এসে খুঁজছে রতনের বাড়ির কাউকে৷ ঠিক একটু আগেই দেখা দুঃস্বপ্নটার মতো৷ তবে কি এবার... তবে কি এবার স্বপ্নের বাকিটাও...
আতঙ্কে ঠোঁট কামড়ে ধরল নীলিমা৷
—‘আমি আছি৷ আমি মেজ শালা ওর৷’ মেজদা এগিয়ে গেল৷ সাথে বুবান ও৷ হুবহু সব মিলে যাচ্ছে স্বপ্নটার সাথে৷
—‘ওকে৷ আচ্ছা মি. হালদারের জ্ঞান এসেছে৷ আগের থেকে বেটার হয়েছে কন্ডিশন৷ আপনারা একে একে যান৷ তবে বেশি কথা বলাবেন না পেশেন্টকে৷’ নিজের পেশাদারী চালে বলল নার্সটা৷
উফফ! বুক ঠেলে স্বস্তির নিঃশ্বাস বেরিয়ে এল নীলিমার৷
—‘বাই দা ওয়ে, নীলিমা কে আছেন? ওয়াইফ কি?’ নার্সের দৃষ্টি নীলিমার দিকেই৷
—‘হ্যাঁ আমি৷ কেন?’ ভীতু কণ্ঠে বলল নীলিমা৷
—‘উনি নীলিমাকেই খুঁজছেন৷ মাঝেও ঘোরের মধ্যে ওই নামই নিচ্ছিলেন৷ তাহলে আপনিই প্রথমে যান ম্যাডাম৷’
একছুটে প্রায় কাঁচের দরজা ঘেরা ঘরটার দিকে এগিয়ে গেল নীলিমা৷ রতন শুয়ে আছে৷ শরীরে হাজারটা নল আর ছুঁচ আর মেশিনের সমারোহ৷
—‘এবার থেকে আমার সব কথা শুনে চলবে বুঝলে৷ তেলে ভাজা, পাঁঠার মাংস সব বন্ধ তোমার৷ আমি যেমন যেমন বলব তেমনটাই খাবে শুধু৷’ কথা বলতে বলতে হাউহাউ করে বাচচা মেয়ের মতো কাঁদছে নীলিমা৷
রতন একদৃষ্টে তাকিয়ে রয়েছে নীলিমার দিকে দুর্বল দুটো চোখ নিয়ে৷ ঠিক যেমনটা করে তাকিয়েছিল শুভদৃষ্টির সময়৷ নীলিমার দু-চোখ উপচানো ভালোবাসা৷ শুধু রতনের জন্য৷ কোথায় লুকিয়ে রেখেছিল এতদিন এই ভালোবাসার সমুদ্রকে মেয়েটা? নিজের বুকের মধ্যে নাকি সংসার আর তার প্রতিটা কোণাতেই লুকিয়ে রেখেছিল শুধু রতনই বুঝতে পারেনি৷ কারণ রতন ভাবত ভালোবাসা মানে শুধু সেই একই গতানুগতিক কনসেপ্ট৷ ভালোবাসা তো স্থবির নয়৷ ভালোবাসা তো সজীব৷ তাই তার রূপ রং সব আলাদা আলাদা প্রতিটা ক্ষেত্রে৷
—‘খুব চালাকি করে আমায় ছেড়ে চলে যাবে ভেবেছিলে না সব দায়িত্ব আমার ঘাড়ে চাপিয়ে? একবারও ভাবলে না তোমাকে ছাড়া কতটা অসহায় আমি৷ অবশ্য সে তুমি কবেই বা ভেবেছ আমার কথা৷’ কেঁদেই যাচ্ছে নীলিমা৷
শরীরের হাজার কষ্ট সত্ত্বেও এক পরম তৃপ্তি টের পাচ্ছে রতন, যেটা বলে বোঝাতে পারবে না ও৷
—‘নীলু...’ অস্ফুটে ডাকল রতন৷ ছোট্ট করে৷ বিয়ের পর থেকে কতবার ভেবেছে রতন এই নামে ডাকবে ওকে৷ কিন্তু ডাকা আর হয়নি৷ ডাকতে গিয়েও কেন যেন বিদ্রোহ করেছে স্বর বার বার৷ মনে হয়েছে হয়তো রতনের মুখে এসব আদিখ্যেতায় বিরক্ত হবে ও৷
—‘কোনো কথা নয়৷ একদম চুপ করে থাকবে৷ ডাক্তার বলেছেন একদম চুপ থাকতে তোমায়৷ আবার একটা বিপদ বাধিয়ে আমায় মেরে ফেলবে তাই তো?’
—‘না নিলু না৷ আর যে যমের আমায় ছোঁয়ার সাধ্য নেই৷ তোমার ভালোবাসার শেকল ছিঁড়ে আর যে কেউ নিয়ে যেতে পারবে না আমায়৷ আর আমিও যে এবার বাঁচতে চাই৷ অনেকদিন৷ তোমার চোখের ওই ভালোবাসাটা দেখার জন্যই বাঁচতে চাই৷’
না রতন বলতে পারল না কথাগুলো৷ সব কথা যে বলতে নেই৷ কিছু কথা চোখের ভাষাকে আশ্রয় করেই খুঁজে নেয় নিজের গন্তব্য৷
শুধু একদৃষ্টে রতন তাকিয়ে রয়েছে নীলিমার দিকে৷ চোখে টলটল করছে জল৷ আর নীলিমার দু-চোখে বাঁধ ভাঙা শ্রাবণ৷
—‘কি হল শুধু চোখে চোখে প্রেম করে তুমি একাই দখল করে রাখবে বাবাকে? আমায় একটু কথা বলতে দেবে না?’ বুবান এসে দাঁড়িয়েছে কখন যেন৷ চোখে জল ছেলেটার৷ তবুও লঘু ইয়ার্কি করে সহজ করতে চাইছে বিধ্বস্ত মা-কে৷ দেড় দিনেই যেন দশ বছর বয়স বেড়ে গেছে ছেলেটার৷
—‘হ্যাঁ রে বাবা৷ তুই থাক৷ আমি চলি৷’ কথাটা বুবানকে বললেও দৃষ্টি রতনের দিকেই নীলিমার৷
রতনের চোখ পরতে পারছে নীলিমা৷ ওই চোখে সম্মতি নেই৷ রতনের চোখ চাইছে নীলিমা এখন থাকুক ওর সামনে৷
—‘আমি আছি তো ঠিক বাইরেটাতেই৷ একটু পরেই আসছি আবার৷’ চোখে একরাশ আশ্বাস নিয়ে বলল নীলিমা রতনকে৷
কাঁচের দরজা ঠেলে ক্লান্ত পায়ে বেরিয়ে এল নীলিমা৷ নার্সিং হোমের লবি ছেড়ে এসে দাঁড়াল বাইরের চত্বরটায়৷ বসন্তের ফুরফুরে বাতাস বইছে চারদিকে৷ হ্যাঁ বসন্ত তো এসেই গেল আবার৷
হঠাৎ চোখে পড়ল হাতে রাংতা জড়ানো একটা গিফটের প্যাকেট নিয়ে রাস্তা পার হচ্ছে একটা মেয়ে৷ সুন্দর সাজগোজ করা৷
হ্যাঁ তাই তো৷ আজই তো সেই দিন৷ ভ্যালেন্টাইন ডে৷ কোনোদিন এই দিনটার তাৎপর্য নিয়ে ভাবেনি নীলিমা৷ কিন্তু আজ যেন নতুন করে বুঝতে পারছে, হ্যাঁ আজ সত্যি ভালোবাসার দিনই বটে৷ আজই তো যেন নতুন করে খুঁজে পেল ও নিজের ভালোবাসাকে, নতুন করে চিনল আবার৷
সব ভালোবাসার প্রকাশ সত্যি এক রকম হয় না৷ এক একটা ভালোবাসা যে এক এক রকম৷ কিছু ভালোবাসা থাকে যেগুলোকে আলাদা করে দেখা যায় না৷ কারণ সেগুলো নিজের মধ্যেই মিশে থাকে৷ মিশে থাকে নিজের অস্তিত্বের মাঝে, জীবনের প্রতিটি কোণায় আর গৃহকোণের প্রতিটি পরতে পরতে৷ খুব কাছে থাকা জিনিস যেমন অনেক সময় চোখ এড়িয়ে যায়, তেমনই একদম পাশে থাকা ভালোবাসাকেও হয়তো অনেক সময় আলাদা করে নজরে পড়ে না৷ কিন্তু নীলিমা এবার দেখতে পেয়েছে৷ আর কোনো সংশয় নেই ওর৷ ভালোভাবে চিনতে পেরেছে নিজের মনকে আর নিজের ঘরের মানুষটাকেও৷ ওর মতো সুখী আর কে আছে! নিজের ঘরের মানুষটাই যে ওর সত্যিকারের মনের মানুষ, প্রাণের মানুষ৷
___
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন