তুমি আসবে বলে...

পল্লবী সেনগুপ্ত

রবির কথা

রবির ইচ্ছে করছে এই মুহূর্তে পুরো পৃথিবীটাকে দুমরে মুচরে খান খান করে দিতে৷ না, মানে ঠিক পুরো পৃথিবীটা নয় ‘নারী’ নামক প্রজাতিটাকে শেষ করে দিতে ইচ্ছে করছে ওর এই পৃথিবীর বুক থেকে৷

ছোট্ট রবি, না কোনোদিন ভালোবাসার স্বাদ পায়নি সেই ছেলেটা শৈশবেও৷ বাবা চাকরির সুবাদে বাইরে, আর মা সবসময় কেমন যেন ছাড়া ছাড়া আর উড়ু উড়ু৷ —‘মা, আমায় একটু আদর কর’ বলে কাছে গিয়ে জড়িয়ে ধরলেই কেমন যেন ছিটকে সরে যেতেন ভদ্রমহিলা৷

—‘বিনয় দেখতে পারছ না ছেলেটাকে’ করে মা হাঁক দিতেই যেন বেশি স্বচ্ছন্দ৷ আর ওমনি রবি আবার বিনয় দাদার হেফাজতে বন্দি নিয়মমাফিক৷ ভদ্রমহিলা যেন বড়ো বেশি গম্ভীর রবির সাথে, অথচ ফোনে হেসে হেসে কথা বলতে কিন্তু তার জুড়ি মেলা ভার৷

—‘প্লিজ, ছাড় আমায়৷ না, না না৷ বিনয় নেই আজ, আর রবি যে কোনো টাইমে জেগে যাবে৷ পুরো বাপের মতো ওই ছেলে৷ একদম অবিনাশের ছায়া ওর মধ্যে৷ তাই তো ওকে সহ্য করতে পারি না আমি৷’

—‘না রেবা আজ ছাড়ব না তোমায়৷ আজ তোমার শরীরের প্রতিটা কোনা ছুঁয়ে আমি আদর করব৷ অনেকদিন... অনেকদিন কাছে পাইনি তোমায়৷ আর যে পারছি না আমি৷ আজ আমার সবটুকু জ্বালা মিটিয়ে দিতে হবে তোমায়৷ নইলে কোথাও যেতে পারবে না, কিছুতেই ছাড়ব না৷’

বারো বছরের রবি সেদিন সবটা দেখতে পাচ্ছিল৷ না আসলে মোটেই ঘুমায়নি ও৷ অসীম আঙ্কেলের যাতায়াতটা মোটেই কোনোদিনই বেশি ভালো লাগত না রবির৷ কেমন যেন ঘোলাটে চোখে লোকটা দেখে রবিকে৷ একদমই রবিকে পছন্দ করে না৷ সেই লোকটাই বাড়িতে এসে যখন আজ রেবা মাইতির গায়ে সাংঘাতিক ঢলে পড়ছিল প্রায়, আর রেবা মাইতিও যখন নিয়মের ছন্দ ভেঙে আজ রবিকে আদর করে ঘরে শুয়ে দিয়ে গেল তখনই মনে সন্দেহ দানা বেঁধেছিল রবির৷ তাই কিছুটা পরে পা টিপে টিপে উঠে মায়ের বেড রুমের আইবলটায় চোখ রেখেছিল ও৷

রেবা মাইতি সম্পূর্ণ নগ্ন আর অসীম মিত্তিরও৷ ঘোলাটে চোখের লোকটা রেবা মাইতির ঠোঁট, কপাল, গলা ছুঁয়ে চুম্বন করছে৷ আঙুল দিয়ে ছুঁয়ে দিচ্ছে রেবার উন্মুক্ত স্তনেও৷

—‘অসীম, আই উইল কিল ইউ...’ বারো বছরের ছেলেটার আকাশ কাঁপান উন্মাদ নিনাদ আর গোটা একটা কাঁচের টেবিল উল্টে ভেঙে ফেলার সেই তীব্র অভিঘাত সেদিন উন্মুক্ত করেছিল অসীম মিত্তির আর রেবা মাইতির সত্যিটাকে পুরো পৃথিবীর সামনে৷ রেবা মাইতি এ বাড়ি ছেড়ে চলে গেছিল চিরতরে আর মিস্টার মাইতিও বাইরে চাকরির পার্টটা চুকিয়ে ফেলেছিলেন পুরোপুরি৷

কিন্তু না৷ রবিকে কেউ বোঝেনি৷ অবিনাশ মাইতি আর রেবা মাইতির ডিভোর্স এর পর হই হই করে রেবা বিয়ে করে অসীমকে৷ আর কোনোদিন ভুলেও সে খোঁজ নেয়নি তার ছেলের৷ আর অবিনাশ মাইতি? সেও ঘরে নিয়ে আসে টুকটুকে কচি বউ৷ আর দু-দিনের মধ্যেই তাদের মাঝে আসে নতুন এক কন্যা সন্তান৷ আর রবি হয়ে যায় সংসারের একটা অবান্তর বোঝা৷ বাড়ির এক কোণে ফেলে দেওয়া একটা বাতিল আসবাব৷ তখন প্রতিদিন রবির মনে হত যে মানুষগুলো নষ্ট করে দিল রবির শৈশব, কৈশোর তাদের প্রতি বদলা না নিতে পারলে ও শান্তি পাবে না৷ প্রতি মুহূর্তে ওর মনের মধ্যে যে দাবানলের আগুন জ্বলত সেটা কারোর পক্ষে বোঝা সম্ভব ছিল না৷ আর বাইরে থেকে সবাই বলত রবি নাকি ঠিক আর পাঁচ জনের মতো স্বাভাবিক নয়৷ অপ্রকৃতিস্থ৷ রবির ইচ্ছা হত সবাইকে খুন করে দিতে৷ স্কুলের ওই ছেলেগুলোর গলা কুচি কুচি করে কেটে দিতে ইচ্ছে করত রবির যারা ওকে নিয়ে হাসত৷ স্কুলের ওই স্যার গুলোর বুকটা চিরে দিতে ইচ্ছে করত রবির যারা বলত ও ফালতু৷ ওর নাকি জীবনে কিছু হবে না৷ সবার প্রতি ঘৃণা হত রবির৷ কিন্তু ও কিচ্ছু করতে পারত না৷ ধীরে ধীরে আরও বেশি করে যেন সবার উপহাস আর ঠাট্টার পাত্র হচ্ছিল ও৷ আর ওর মনের মধ্যে প্রতিশোধের আগুনের লেলিহান শিখাও ততই প্রগাঢ় হচ্ছিল৷ এভাবেই দেখতে দেখতে মাধ্যমিক পাশ করল রবি৷ খুব খারাপ রেজাল্ট৷ থার্ড ডিভিশন৷ বাড়িতে সকলে আরও ছি ছিকারে মুখরিত হল৷ আর রবিও ঠিক করেছিল যে আর নয়৷ এবার এ বাড়ির সবাইকে খুন করে, ওর প্রতিটা শত্রুকে খুন করে আত্মহত্যা করবে ও৷

কিন্তু না৷ সেটা আর করা হল না৷ তার আগেই ওর জীবনে চলে এল রুমেলা৷ রুমেলা মানে ওর বাংলা কোচিনে ভর্তি হওয়া সেই গোলাপি সালোয়ারের মেয়েটা৷ কী সুন্দর দেখতে৷ মুখটা ঠিক গল্পের বইয়ের সিন্ডারেলার মতো৷ ওকে দেখলেই মনের মধ্যে জমতে থাকা রাগ আর ঘৃণাগুলো ফুস করে উবে যেত রবির৷ ওরা গা দিয়ে কি সুন্দর একটা গন্ধ বেরতো সবসময়৷ আর রুমেলাই এমন একজন মানুষ যে রবিকে ঘৃণার চোখে দেখত না৷ খুব মিষ্টি করে কথা বলত ওর সাথে৷ রবির খুব ইচ্ছে হত রুমেলার বুকে মুখ গুঁজে ওর শরীর থেকে ছিটকে আসা সুঘ্রাণটা প্রাণ ভরে নিতে৷ রবির খুব ইচ্ছে হত রুমেলার ওই ফুলের পাপড়ির মতো ঠোঁটে নিজের ঠোঁটটা খুব করে ঘষতে৷ আর এই ইচ্ছেগুলোর সাথে সাথেই নিজের শরীরে এক অদ্ভুত পরিবর্তন টের পেত রবি৷ এক অদ্ভুত দেহ সুখ৷ রুমেলা সত্যি খুব ভালো৷ রবিকে পড়াও বুঝিয়ে দিত মাঝে মাঝে ও৷ কিন্তু সেই রুমেলাও আর ভালো রইল না যেদিন রবি নিজে থেকে গিয়ে জানাল ওকে নিজের মনের কথা৷

—‘না রবি৷ তুই আমার বন্ধু৷ কিন্তু এসব কি? আমার এখন এসবের মধ্যে জড়াবার ইচ্ছে নেই৷’

—‘কেন? আমি কি খারাপ? নাকি আমি থার্ড ডিভিশনে পাশ করা বলে তুই পিছিয়ে যাচ্ছিস?’ মাথায় নতুন করে জ্বলে ওঠা দাবানলের আগুনকে লুকিয়ে রেখেই বলেছিল রবি৷

—‘না ওসব নয়৷ আমি সত্যি এসব চাই না এখন৷ আর যদি চাইতাম তাহলে তনেন-এর প্রস্তাবেই রাজি হতাম৷ কারণ ওকে আমারও যথেষ্ট ভালো লাগে...’

না রুমেলার কথাটা আর শেষ করার সুযোগ দেয়নি রবি৷ কারণ ওর শেষ কথাটায় ততক্ষনে রবির মাথায় খুন চেপে গেছে৷ এমনিতেই একটু নির্জন একটা কোণার দিকে দাঁড়িয়ে কথা বলছিল ওরা৷ সেই নির্জনতাকে ক্ষুণ্ণ না করেই নিঃশব্দে রুমেলার ঠোঁটের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল রবি৷ নিজের ঠোঁট আর দাঁত দিয়ে রক্তাক্ত করে দিয়েছিল ওর পাতলা দুই ঠোঁট৷ রুমেলার সমস্ত প্রতিরোধ অগ্রাহ্য করে নিজের সাঁড়াশির মতো হাত দিয়ে চেপে ধরেছিল রুমেলার দুই স্তন৷

কিন্তু না বেশিক্ষণ পারেনি রবি৷ রুমেলা প্রাণপণ চেষ্টায় কোনোরকমে নিজেকে ছাড়িয়ে দৌড়ে পালিয়ে গেছিল৷ আর রবিও ঠিক করে নিয়েছিল বাড়ি থেকে এক খাবলা অ্যাসিড নিয়ে এসে রুমেলার ওই সুন্দর মুখটা পুড়িয়ে দেবে ও পরের দিনই৷

কিন্তু না৷ সেই সুযোগটাও আর ও পায়নি৷ রুমেলা আর কোনোদিন ওই কোচিনের চত্বরই মাড়ায়নি৷ আর কোনোদিন রুমেলার মুখ দেখতে পায়নি ও৷

হায়ার সেকেন্ডারিতে ফেল করেছিল রবি৷ না, তার পর আর কেউ ওকে পড়াশুনা করতে বলেনি৷ নিজের নতুন দোকানটায় বসে কাজ শেখাচ্ছিল ওকে অবিনাশ মাইতি৷

আসলে সবটা চালাকি৷ রবিকে বিনা পয়সার চাকর বানানোর ধান্দা৷ সব বোঝে রবি৷ কিন্তু রবির মাথায় যে আগুন নেভে না কিছুতে৷ সব কটা বদলা যে বাকি৷ রেবা মাইতি, রুমেলা, স্কুলের সেই ছেলেগুলো, স্যারগুলো...৷

রবি যখন নিয়মিতভাবে বদলার ভাবনায় ব্যস্ত ঠিক তখনই আবার নতুন অধ্যায় শুরু হয়ে গেল৷ রবির তথাকথিত আপনজনরা ওর বিয়ে ঠিক করে ফেলল৷ মেয়েটা গ্রামের৷ নাম রিমা৷ দেখতে খুব একটা সুন্দর না হলেও খুব মন্দ না৷ রবির খুব ইচ্ছে না থাকলেও ও রাজি হয়ে গেছিল৷ তবু যা হোক একটা নিজের লোক তো হবে৷ আর সেখানেই রবি সবচেয়ে ভুল করে ফেলেছিল৷ আসলে মেয়েরা কোনোদিন কারোর নিজের হয় না৷ ওরা শুধু চেনে নিজের স্বার্থ আর ধান্দা৷ রিমাও তার থেকে আলাদা ছিল না৷ রবিকে আসলে ওর পছন্দই হয়নি৷ সেই আন্দাজটা বিয়ের দিনেই পেয়েছিল রবি৷ কেমন যেন ছাড়াছাড়া ভাব, ঠাণ্ডা চাহনি৷ আর ফুলশয্যার রাতে রবি যখন কাছে টানতে গেল তাকে সে তো বলেই দিল যে সে একটু সময় চায়৷ অচেনা একজনের সাথে সে হঠাৎ করে ঘনিষ্ঠ হতে পারবে না৷ ব্যস! বুঝতে আর দেরি হয়নি রবির৷ পুরো রুমেলার মতোই ব্যাপার৷ এর মনেও অন্য কেউ বাসা বেঁধে রয়েছে৷ কিন্তু না এবার আর একে যেতে দেবে না রবি৷ তাই জোর করে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল রিমার উপর৷ একদম কাবু করে ফেলেছিল মেয়েটাকে৷ কিন্তু কেন যে বেইমান শরীরটা সেদিন সাথ দিল না! পরেরদিন ভোর হতে না হতেই চলে গেল রিমা৷ দু-দিনের মধ্যে ডিভোর্স চেয়ে পাঠাল৷ রিমা আর তার পরিবারে দাবি রবি পাগল এবং পুরুষত্বহীন৷ আবার নিমেষে সকলের সামনে একটা হাস্যকর জন্তুতে পরিণত হল রবি৷ সবাই বাধ্য করল ওকে ডিভোর্স পেপারে সই করতে৷ কেউ শুনল না ওর কথা৷ কেউ বুঝল না ওকে৷

কী এমন বেশি চেয়েছিল রবি? শুধুই একটু ভালোবাসা আর একটু উষ্ণতার ছোঁয়া৷ শুধু একটু উষ্ণতার জন্যই তো বারবার কাঙালের মতো বারবার ছুটে গেছে নিঃস্ব ছেলেটা৷ আর বারবার সবাই লাথি মেরে সরিয়ে দিয়েছে ওকে৷ কিন্তু না৷ আর না৷ রবির পরাজয়ের পালা এবার শেষ৷ ওর সব কটা বদলা নিয়ে তাদের রক্ত পান করে এবার জয়ী হবে রবি৷ ভুটিয়া বাবার সাথে কপালজোরে যখন একবার পরিচয় হয়েই গেছে তখন আর পিছন ফিরে তাকাতে হবে না ওকে৷ ভুটিয়া বাবা তো বলেইছে ভগবান যার সাথ ছেড়ে দেয় শয়তান তাকে আপন করে নেয়৷ যেমন নিয়েছে ভুটিয়া বাবাকে৷ আর ভুটিয়া বাবার সব কথা মেনে চললে সেদিন আর বেশি দূর নেই যখন শয়তানের আশীর্বাদে রবির বদলা আর মনে জমে থাকা ঘৃণা শেষ হবে কড়ায় গণ্ডায়৷ পঞ্চ আহুতির মাধ্যমে সম্পন্ন হবে রবির সাধনা৷ আর তার পরই রবি হবে সত্যিকারের ক্ষমতাবান নিজের বদলা নেবার জন্য৷ পর পর পাঁচটা মাসের অমাবস্যা শুধু চাই ওর৷ আর পাঁচটা প্রথম ব্যঞ্জন বর্ণ৷ সামনের ১১ পৌষই তো অমাবস্যা৷ আর ওর আসন্ন প্রথম ব্যঞ্জন বর্ণের নাম কমলি৷

—‘ছোড়দাবাবু, ঘরে আসব...’ দরজায় টোকার শব্দের সাথেই ভেসে এল গলাটা৷

—‘কে?’ গলা ছাড়ল রবি৷

—‘আমি কমলি৷’

চকচক করে উঠল রবির চোখ৷

—‘হ্যাঁ আয়৷’ মলিন সালোয়ার পরা রোগা মেয়েটা ঢুকল রবির ঘরে৷

—‘মা, আপনার চা পাঠালেন৷ রাতে কী দেব আপনারে? রুটি না ভাত? কী খাবেন?’

উত্তর দিল না রবি৷ শুধু চকচকে লোলুপ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল রোগা, কালো অতি সাধারণ গরিব কাজের মেয়েটার দিকে৷

সমুদ্রের ধারে বসে বালি চেপে চেপে বালির ঘর বানাচ্ছিল কনক৷ আর সারা গায়ে মেখে নিচ্ছিল ফুরফুরে মিষ্টি সাগরের হাওয়া৷ অনেকেই তাকাচ্ছে যথারীতি ওর দিকে কিন্তু ওর কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই৷ ও ব্যস্ত নিজের কাজে৷ নিজের হানিমুনের একটা মুহূর্তও ও নষ্ট হতে দেবে না কোনো বাজে জিনিসে মন দিয়ে৷ হঠাৎ করে পিছন থেকে কেউ এসে জড়িয়ে ধরল ওকে৷

—‘উফফ! অরুণ৷ আবার দুষ্টুমি না?’ গদগদ গলায় বলল কনক৷ তারপর ঝট করে পিছন ঘুরে মুখ গুঁজে দিল অরুণের বুকে৷ আর ওমনি অরুণও ঠোঁট ডুবিয়ে দিল কনকের ঠোঁটে৷ সত্যি! এই মুহূর্তগুলোর জন্যই তো এতদিন সব প্রতিকূলতা সত্ত্বেও বেঁচে ছিল বোধ হয় কনক৷ আস্তে আস্তে একটা স্বর্গীয় অনুভূতি ছেয়ে যাচ্ছে কনকের সারা শরীর আর মনে৷

টিংটিংটিংটিং... অ্যালার্মের শব্দে ভেঙে গেল কনকের ঘুমটা৷ ধড়মড় করে জেগে উঠে বিছানায় বসল ও৷ উফফ! সত্যি কি জীবন্ত স্বপ্ন৷ এখনও সারা শরীর রোমাঞ্চিত হয়ে আছে ওর৷ অরুণ! ওর একদম কাছে৷ ওর নিজের মধ্যে একদম মিশে গেছিল অরুণ৷ আলগোছে একবার ঘড়ির দিকে তাকাল কনক৷ ঘড়িতে এখন দুপুর সাড়ে চারটে৷ তার মানে আর অল্প অল্প ক্ষণ পরেই এসে যাবে রাইমা দিদি৷ উফফ! এসেই তো লাটসাহেবের হুকুম ছাড়া শুরু হবে৷

—‘কনক চা দে৷ কনক এটা দে, ওটা দে, খাবার দে৷’ উফফ! অসহ্য লাগে কনকের ওই নেকা রাইমাটাকে৷ শয়তান মেয়ে একটা৷ এখন আবার চক্রান্ত করছে ওর আর অরুণের প্রেমটা ভাঙিয়ে দেবার৷ অরুণকে ওর জীবন থেকে সরিয়ে দেবার৷ সে তো ও করবেই কনক চলে গেলে ওর বিনা পয়সার কেয়ার টেকার গিরি আর করবে কে৷ কিন্তু কনক অত বোকা নয়৷ রাইমার কোনো চালকে বিশ্বাস করে ও অরুণকে হারাবে না৷ অরুণকে পাওয়াটা নেহাতই ওর চরম ভাগ্য৷ নইলে ওর মতো একটা মেয়েকে কি আর অরুণের মতো ছেলে কখনো ভালোবাসতে পারে! অরুণের প্রেম পাবার পরেই কনক বুঝেছে বেঁচে থাকার মানে কী৷ নইলে কী ছিল কনক! নিজেদের গ্রামে সকলের হাসি ঠাট্টার পাত্রী৷ ছোটোবেলাতে খুব খারাপ একটা অগ্নিকাণ্ডের কবলে পড়েছিল কনকরা৷ কনক আর ওর বোন কেয়া খুব খারাপ ভাবে পুড়ে যায় তাতে৷ প্রাণে সেবার বেঁচে গেলেও চিরজন্মের মতো নিজের রূপ খুইয়ে বসে কনক সেই মাত্র পাঁচ বছর বয়সেই৷ তারপর সেই পোড়া মুখ আর পোড়া শরীর নিয়েই ছোটো থেকে বড়ো হয়েছে কনক৷ গ্রামের সব মানুষজনই কেমন যেন হেয়ও করত কনককে৷ সবাই কেমন যেন হাসাহাসি করত ওকে নিয়ে, কানাকানি করত৷ অনেকে তো সামনেই বলত ওর মাকে—

—‘কিগো সেজ বউ, তোমার এই মুখ পোড়া কুৎসিত মেয়েগুলোকে নিয়ে কী করবে শেষমেষ? কেউ তো বরন করে ওদের ঘরে তুলবে না, আর তোমাদেরও তো গ্যাঁটের অত জোর নেই যে পার করবে ওদের৷ তাহলে ওদের কি হবে গা?’ না, মা কোন উত্তর দিতে পারত না এসব কথার৷ চুপ থাকত৷

কনক যখন স্কুলে যেত তখনও ওর সাথে মিশতে চাইত না কেউ৷ যেন ও ভিনগ্রহের এক প্রাণী৷ ভীষণ কান্না পেত কনকের৷ কী দোষ ওর যে সবাই এমন দুর ছাই করে ওকে৷ দেখতে দেখতে বড়ো হয়ে গেল কনক৷ প্রকৃতির নিয়মে ভরা যৌবনে এসে ভর করল ওর শরীর৷ আস্তে আস্তে কনকের মনও খুঁজতে শুরু করল পুরুষের সান্নিধ্যের উষ্ণতা, শরীরে খুঁজতে শুরু করল পুরুষের স্পর্শের সুখ৷ কিন্তু কনকের মতো মেয়েকে তো কথা বলারই যোগ্য মনে করে না, তাইতে কে স্থান দেবে ওকে নিজের জীবনে! মনের কষ্ট মনে চেপেই যখন দিন কাটছিল এভাবে কনকের তখন হঠাৎ একদিন ওদের বাড়িতে এল রজত মামা৷ এই রজত মামা মায়ের দুঃসম্পর্কের ভাই৷ যোগাযোগও এদের সাথে অল্পই ছিল৷ রজত মামা শিলিগুড়িতে থাকে৷ ওখানকার বড়ো ব্যবসায়ী৷ বউ নেই৷ আছে একমাত্র মেয়ে রাইমা৷ সেও ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করেছে সবে৷ রজত মামা মাকে এসে বলল—

—‘শোন বুলু, আমায় মেয়েটা কলকাতায় একটা বড়ো কোম্পানিতে চাকরি পেয়েছে৷ ওকে ওখানেই এবার থেকে থাকতে হবে৷ একা৷ ওখানে আমার চেনা লোক আছে৷ সে থাকা-টাকার সব ব্যবস্থা করে দিয়েছে৷ কিন্তু বুঝতেই তো পারছিস, ও আমার খুব আদরে মানুষ৷ একা কোনোদিন কোথাও থাকেনি৷ তাই তুই যদি কনককে ওর সঙ্গে পাঠাস তাহলে খুব ভালো হয়৷ ওরা দুজন মিলে থাকবে, কনক ওর দেখভালও করতে পারবে৷ আর তুই তো বলিসই এই গ্রামে কনকের নানা সমস্যা৷ কলকাতা তো আর তেমন না৷ ওখানে কেউ কারো ব্যাপারে মাথা ঘামায় না৷ তা ছাড়া কলকাতায় থাকতে থাকতে কনকও অনেক চালাক চতুর হবে৷ জীবনে চলার পথে ওরও তো একটু স্মার্ট হওয়া দরকার৷’

রজত মামার কথাগুলো মায়ের দারুণ মনে ধরেছিল৷ তাই এক কথায় রাজি হয়ে গেছিল মা৷ আর কনকও চাইছিল ওই গ্রামটা ছাড়তে৷ তাই ও নিজেও এই ব্যবস্থা মেনে চলে এসেছিল রাইমা দিদির সাথে৷ এখানে এসে সারাদিন বাড়ির মধ্যে বসে থেকে, কাজকম্ম করে আর রাইমার ফাই ফরমাস খেটেই চলে যেত ওর দিনগুলো যদি না হঠাৎ করে একদিন বাড়ির দোরগোড়ার কাপড় কাচার সাবান বেচতে অরুণ আসত এখানে, যদি না অরুণের হঠাৎ জল তেষ্টা পেত সেদিন৷ অরুণের সাথে ওর প্রেম হওয়াটা খুব অপ্রত্যাশিত হলেও এটাই এখন ওর জীবনে চরম ভাবে সত্যি, সে যে যাই বলুক৷

ঘ্যারঘ্যার করে আবার হঠাৎ মোবাইলটা ভাইব্রেট হল কনকের৷ খুব সন্তর্পণে নিজের লুকিয়ে রাখা মোবাইলটা টেনে বের করল কনক৷

—‘কী করছিলে কনক? সব ঠিক তো ওদিকে?’ ওপাশে অরুণের গলা৷

—‘হ্যাঁ অরুণ৷ ওরা আমায় পাগল সাজিয়ে তোমার অস্তিত্ব মিথ্যা করার চেষ্টা চালিয়েই যাচ্ছে৷ আমাদের ভালোবাসাকে মিথ্যা করার চেষ্টা আমি সফল হতে দেব না অরুণ৷ তুমি যেমন বলেছ আমি তেমনই চলছি৷’

—‘ভাবুক ভাবুক৷ ওর সবটাকে মিথ্যা ভাবুক৷ তাতেই তো আমাদের সুবিধা৷ ওরা যদি ভাবে আমি মিথ্যা, আমার ভালোবাসা মিথ্যা তাতেই তো আমি আরও বেশি সহজে লুকিয়ে তোমায় নিয়ে পালাতে পারব৷ সামনের অমাবস্যাই তো আমার স্বপ্নপূরণের দিন৷ সেদিনই তো তোমায় আমার কাছে নিয়ে আসব৷ পুরোপুরি নিজের করে নেব তোমায়৷’

—‘সত্যি বলছ অরুণ? আমাদের নিজেদের সংসার হবে? তুমি আমার হয়ে যাবে বরাবরের জন্য! উফফ! আমি যে ভাবতেই পারছি না৷’ নিজের মোবাইল ফোনটায় পরম আশ্লেষে চুমু খেতে থাকল কনক৷ ওর সারা শরীরে যে বিদ্যুতের শিহরণ খেলে যাচ্ছে৷ এবার ও যে পাবে ভালোবাসার উষ্ণ ছোঁয়া৷ কিন্তু খুশিতে পাগল মেয়েটা ফোনে চুমু খেতে খেতে টেরই পেল না যে অপর প্রান্ত কিন্তু ততক্ষণে নীরব নিথর হয়ে গেছে৷

বাড়ির একতলার ড্রয়িং রুমে চিন্তিত মুখে বসেছিল রাইমা৷ উফফ! কী সাংঘাতিক ঝামেলা হয়ে গেল এই কনকটাকে সঙ্গে নিয়ে এসে৷ একে সাথে আনার ইচ্ছা কোনোদিনই রাইমার ছিল না৷ সবটাই বাবার জোরের জন্য হল৷ আরে! রাইমা বাচচা মেয়ে নাকি যে এখানে এসে থাকতে পারবে না একা৷ কিন্তু কি আর করা যাবে, বাবার অলরেডি একটা ছোটো হার্ট অ্যাটাক হয়ে গেছে তারপর থেকে বাবার সাথে আর কোনো ব্যাপারেই তর্ক করে না রাইমা৷ কোনো ব্যাপারেই আর টেনশন দিতে চায় না বাবাকে৷ এমনিতেই তো ব্যবসার জন্য হাজার চাপ বাবার৷ আর সেইজন্যই তো আজ অবধি বাবাকে বলতে পারল না শেখরের কথাটা৷ আর আজও বলতে পারছে না কনককে নিয়ে এসে ঠিক কী মহা ঝামেলায় পড়েছে ও৷ কনকের ছোটোবেলায় সেই দুর্ঘটনার পর থেকে ও একটু গুটিয়ে গেছিল, কারো সাথে মিশত না বা হীনমন্যতায় ভুগত সেটা তো বরাবরই জানত সবাই৷ আর সেইজন্যই তো ওকে প্রথম আনতে চায়নি রাইমা৷ কিন্তু একী! এখন তো দেখা যাচ্ছে মেয়েটা সম্পূর্ণ মানসিক বিকার গ্রস্ত৷ মেয়েটা স্কিতজোফ্রেনিয়ার স্বীকার রীতিমত৷ নিজের কাল্পনিক দুনিয়া বানিয়ে নিয়ে সেখানেই বাস করে৷ কাল্পনিক এক অরুণকে আশ্রয় করে নিয়ে সারাক্ষণ প্রেম করছে তার সাথে৷ নিজের হাতটাই কাল্পনিক মোবাইল বানিয়ে সারাক্ষণ অদৃশ্য সেই মোবাইলে চলছে প্রেমালাপ৷ এ রাইমাকে কি দেখবে! রাইমারই তো সব কাজকম্ম লাটে উঠতে বসেছে এর পাগলামির গুঁতোয়৷ সাইক্রিয়াট্রিকের সাথেও কথা বলেছে রাইমা৷ উনি বলেছেন এমনটা হয়৷ কনকের মতো কিছু না পাওয়া, সমাজের কাছে বঞ্চিত আর শারীরিক কোনো ব্লকেজ থাকা মেয়েদের মনের মধ্যে নাকি অনেক সময় আস্তে আস্তে এই ধরণের বিকার গড়ে উঠতে পারে৷ নিজেদের প্রত্যাশা আর বাস্তব পরিস্থিতি এই দুয়ের মধ্যে চূড়ান্ত বৈসাদৃশ্যই এর প্রধান কারণ৷ কনককে একবার দু-বার জোর করে বা ভুলিয়ে ভালিয়ে রাইমা নিয়েও গেছিল সাইক্রিয়াট্রিকের কাছে৷ কিন্তু না৷ সে কোনো সহযোগিতা করলে তো! দিন দিন কনকের পাগলামি চরম থেকে চরমতম হয়ে উঠেছে৷ এমনকী লাস্ট কয়েকদিনে বেশ হিংস্রও হয়ে উঠেছে ও৷ প্রথমে রাইমা ভেবেছিল সবটা ও একাই সামলে নেবে৷ কিন্তু এখন বুঝতে পারছে না, একা সবটা সামলান যাবে না৷ পরিস্থিতি আস্তে আস্তে হাতের বাইরে যাচ্ছে৷ তাই শেখরকে সব জানিয়েছে ও৷

এই শেখর আসলে ওর বাবারই এক কর্মচারী৷ ব্যবসার কলকাতার দিকটা দেখে ও৷ ওর মতো সৎ ছেলে আজকের দিনে প্রায় বিলুপ্ত৷ ওর এই সততা আর নিষ্ঠাই রাইমাকে আকৃষ্ট করেছে ওর প্রতি৷ কলকাতায় রাইমার থাকার জন্য এই বাড়িটার ব্যবস্থাও ওই করে দিয়েছিল৷ কলকাতায় থাকার জন্য রাইমার যতটুকু দেখাশুনা দরকার তার জন্য শেখরই যথেষ্ট ছিল৷ কিন্তু বাবাকে আর কীভাবে বোঝায় সেটা রাইমা৷ কনকের এই সমস্যাটার কথা গত দু-চারদিন আগে প্রথম ওকে জানায় রাইমা৷ প্রথমে শুনে শেখরও রাইমার মতোই প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল৷ কিন্তু গত কাল থেকে ও যেটা বলছে সেটা জাস্ট ওর থেকে আশা করেইনি রাইমা৷ আজকের এই ২০১৮ সালে দাঁড়িয়ে শেখরের মতো একটা আধুনিক ছেলে কীভাবে এমন কথা বলতে পারে! না, এসব ভাঁওতায় বিশ্বাস করতে পারে না রাইমার মতো একটা শিক্ষিত যুক্তিবাদী মেয়ে৷

কে এই মনিকা মাইতি? সে কীভাবে উৎঘাটন করতে পারে কনকের স্কিতজোফ্রেনিয়ার রহস্য? আর শেখর যেগুলো বলছে সেগুলো কি আদৌ সত্যি হওয়া সম্ভব নাকি? এই মনিকা মাইতি নাকি আসলে শেখরের প্রতিবেশী৷ সেই নাকি এই বাড়িটার আসল মালিক৷ সেই নাকি এই বাড়িটা ঠিক করে দিয়েছিল রাইমার থাকার জন্য৷

পাশের ঘরেই কনক রয়েছে৷ রাইমা আলগোছে উঠে দরজাটার অল্প ফাঁক দিয়ে চোখ রাখল ঘরের ভিতর৷ অল্প ফ্যাকাশে আলো জ্বলছে ঘরে৷ তাতেও দেখা যাচ্ছে কনক নিজের হাতটাকে মোবাইলের ভঙ্গিতে আঁকড়ে পাগলের মতো কথা বলছে—

—‘তুমি বিশ্বাস কর অরুণ৷ আমি ওদের কারো কথা মানি না৷ আমি জানি তুমি আছ৷ ভীষণভাবে আছ৷ আর আমি তোমার কাছে যাবই আমাদের নির্ধারিত দিনে৷ আমি মরতেও ভয় পাই না, তাই এরা আমায় আর কি ভয় দেখাবে! আমার জীবনে তো কিচ্ছু নেই৷ তাই তোমায় পাবার জন্য, এই শূন্য জীবনে নেমে আসা ভালোবাসার উষ্ণ ছোঁয়া পাবার জন্য এই যদি আমায় মরতেও হয় তাও আমি রাজি৷ কোনো কিছু আমায় থামাতে পারবে না৷ কেউ আমায় আটকাতে পারবে না এই আমি বলে রাখলাম৷’

নিজের অজান্তেই কেমন যেন কেঁপে উঠল এবার রাইমা৷ এ কে? এ তো ওর চেনা সেই সহজ সরল ভীতু কনক নয়৷ এ যে কনকের বেশে যেন অন্য কেউ৷ অন্য কোনো দানোয় পাওয়া শক্তি৷ ভাবনাটা মনে আসতেই নিজেকেই নিজে কষে ধমক লাগাল রাইমা৷ না, এসব বোকা বোকা ভিত্তিহীন আর আজগুবি ভাবনার একফোঁটা ছায়াকেও প্রশ্রয় দেবে না ও৷ ও একজন যুক্তিবাদী আর বিজ্ঞান বাদী মেয়ে৷ এসব ভাবনা ওর জন্য নয়৷

রাইমা মুখ নীচু করে বসে রয়েছে মেঝেতে আর ওর দু-চোখ ভেসে যাচ্ছে জলে৷ ওর সামনেই মেঝেতে শোয়ানো রয়েছে কনকের নিথর দেহটা, যেটা এই মুহূর্ত আপাদমস্তক সাদা চাদরে ঢাকা৷ কনকের দেহটা নাকি বীভৎস আকার নিয়েছে৷ রক্তশূন্য পুরো ফ্যাকাশে এমন ডেডবডি নাকি চোখে দেখা যায় না৷ গত চার পাঁচ দিন ধরেই মিসিং ছিল কনক৷ ওকে খোঁজা নিয়ে এই ক-দিন পাগল ছিল ও আর শেখর৷ এমনকী বাবাও চলে এসেছেন শিলিগুড়ি থেকে৷ গতকাল খুঁজে পাওয়া গেছে ওকে মানে ওর মৃতদেহকে৷ এই বাড়িরই অল্পদূরের ওই পুকুরটা থেকে৷ কিন্তু না, জলে ডুবে ওর মৃত্যু হয়নি৷ পুলিশ আর পোস্টমর্টেম রিপোর্ট বলছে কনকের গলার কাছে আঘাতের চিহ্ন আছে৷ কেউ ওর গলায় ধারাল কোনো অস্ত্রের আঘাত করে যেন এক দলা মাংস ছিঁড়ে নিয়েছে৷ তারপর দেহটা ছুঁড়ে দিয়েছে ওই জলে৷ কিন্তু কে? কে বা কারা খুন করতে পারে কনকের মতো একটা নিরীহ মেয়েকে? উত্তরটা তদন্তসাপেক্ষ এটা ঠিক৷ কিন্তু রাইমার মন যে অন্য কথা বলছে৷ আজ যে আর নিজের পুরোনো বিশ্বাসে স্থির থাকতে পারছে না ও৷ এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে ওর সব যুক্তি আর বিজ্ঞান৷ তবে কি ওর জন্যেই মরে গেল কনক?

‘রাইমা’... হঠাৎ আসা ডাকটায় চমকে গেল পরমা৷ দরজার দিকে চোখ চলে গেল ওর৷ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে মনিকাদেবী৷ সেই রোগা চেহারা, সেই সাদা কালো কম্বিনেশনের শাড়ি ব্লাউজ৷ একে দেখেই রাইমার সেই অপরাধবোধটা দ্বিগুণ হয়ে ফিরে এল৷

ওর মনে পড়ে গেল দিন পনেরো আগের সেই সন্ধ্যাটা, যেদিন প্রথমে মনিকা এসেছিলেন এই বাড়িতে৷

শেখরের সাথে সেদিন এসেছিলেন প্রথম তিনি৷ শেখর বলেছিল ওর মুখে কনকের সমস্যার কথা শুনে উনি কিছু বলতে চান৷ তাই এসেছেন৷

—‘বলুন কী বলবেন...’ বেশ গম্ভীরভাবেই বলেছিল রাইমা৷ বছর বিয়াল্লিশের আধা বুড়ি চেহারার মহিলাটিকে কেন যেন সেদিন বেশ অদ্ভুত লেগেছিল ওর৷

—‘প্রথম যেদিন শেখর আমায় বলে এ বাড়িতে ভাড়া নিতে চায় একটি অল্প বয়স্ক মেয়ে সেদিনই আমি শেখরকে দুটি প্রশ্ন করেছিলাম৷ ১৷ মেয়েটির নাম কী? ২৷ মেয়েটির কোনো শারীরিক খুঁত বা অসুবিধা আছে কি না৷ কি মনে আছে তো শেখর?’ অল্প মাথা নাড়ল শেখর৷

—‘কেন এমন কথা বলেছিলাম সেটা জানানোর আগে তোমায় আমার দাদার ব্যাপারে একটু বলা দরকার৷ আমার দাদা রবি মাইতি৷ যে মারা যায় বছর পয়ত্রিশ আগে৷ সে আমার নিজের দাদা ছিল না৷ ছিল বৈমাত্রেয় ভাই৷ আমার বাবার প্রথম পক্ষের ছেলে৷ রেবা মাইতি মানে আমার বাবার প্রথম পক্ষের স্ত্রী-র স্বভাব ভালো ছিল না৷ রবি একদিন তাকে ঘনিষ্ঠ অবস্থায় ধরে ফেলে তার প্রেমিকের সাথে৷ বলাই বাহুল্য যে এই ঘটনা সাংঘাতিক নেগেটিভ প্রভাব ফেলে রবির শিশু মনে৷ তারপর থেকেই ওর মানসিক বিকার সৃষ্টি হয় নানারকম৷ ইতিমধ্যে বাবার জীবনে আসে আমার মা আর আমি৷ সেটা রবি আরও মেনে নিতে পারে না৷ ওর মনে হতে থাকে সকলেই ওর শত্রু৷ সবাই ওর জীবন নষ্ট করছে৷ তবুও আস্তে আস্তে বড়ো হতে থাকে ছেলেটা৷ নানা কারণেই বয়স বাড়ার সাথে সাথে মেয়েদের প্রতি ঘৃণাটাও আরও ওর বাড়তে থাকে৷ সবাই ভেবেছিল বিয়ে দিলে হয়তো শুধরে যাবে৷ তাই বিয়ে দেওয়া হয়৷ কিন্তু সে বিয়েও টেকে না৷ ওর বউ বউভাতের পরের রাতেই চলে যায়৷ তারা ডিভোর্স চেয়ে পাঠায় আর অভিযোগ করে রবি পাগল আর পুরুষত্বহীন৷ এই ঘটনার পরেই আর নিজেকে সামলে রাখতে পারে না দাদা৷ পুরোপুরি পাগল হয়ে যায়৷ সব সময় বিড়বিড় করতে থাকে আপন মনে৷ তখন আমাদের বাড়ির কাছে একটা মসজিদ ছিল৷ হঠাৎ দাদা শুরু করে সেই মসজিদে যাতায়াত৷ এমনকী শ্মশানে আনাগোনাও ধরেছিল ও৷ ওর মনে তখন এক আজগুবি বদলার ভাবনা৷

তারপর কোথা থেকে কি হয়ে গেছিল জানি না৷ একদিন গভীর রাতে, যখন আমরা সবাই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন তখন দাদা আমাদের বাড়ির নিরীহ কাজের মেয়েটার ঘরে ঢুকে ওকে খুন করে৷ সেই মেয়েটার ভয়াল আর্ত চিৎকারে যখন সবাই ছুটে যায় ওর ঘরের দিকে তখন সবাই বীভৎস এক দৃশ্য দেখে৷ ধারালো ছুরি দিয়ে দাদা খুবলে দিয়েছে কমলির গলার কাছটা৷ আর তারপর সেই খোবলানো মাংস আর রক্ত নিজের মুখের ভিতর ঠাসছে দাদা৷’

—‘প্লিজ চুপ করুন৷ কেন বাড়ি বয়ে এসে এসব জঘন্য গল্প শোনাচ্ছেন আমায়?’ রাইমার ধমকে দু-মুহূর্তের জন্য সেদিন চুপ হয়েছিলেন ভদ্রমহিলা৷ তারপর আবার বলতে শুরু করেছিলেন—

—‘শোনাচ্ছি কারণ, এই সব ঘটনার সাক্ষী এই বাড়িটাই যেখানে এখন তুমি থাকছ৷ প্লিজ বলতে দাও আমায়৷ সেদিনকার সেই ঘটনার পর দাদাকে পাগলা গারদে পাঠিয়ে দেওয়া হয়৷ তবে দাদা চলে গেলেও দাদার লেখা কয়েকটা ডায়েরি থেকে যায় এই বাড়িতেই৷ সেই ডায়েরি পরে আমার বাবা মা জানতে পেরেছিলেন দাদার মারাত্মক সব অভিসন্ধির কথা৷ দাদা খুব প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে উঠেছিল মানসিক বিকার আর প্রতিকূল পরিস্থিতির চাপে৷ নিজের সেই বদলার ইচ্ছা মেটাতে দাদা বোধ হয় দ্বারস্থ হয়েছিলেন ভুটিয়া বাবা নামে কোনো পীর বা সাধুর৷ অবশ্য এমনও হতে পারে যে ডায়েরিতে উল্লেখিত এই ভুটিয়া বাবা নেহাতই দাদার কল্পনাপ্রসূত৷ কিন্তু মোদ্দা কথা হল সেই সময়ে দাদা শুরু করেছিল শয়তানের উপাসনা বা নেগেটিভ শক্তির আরাধনা৷ দাদা বোধ হয় চেয়েছিল আস্তে আস্তে আমাদের এই পুরো বাড়িটাকেই কালো শক্তির আঁতুড়ঘর বানিয়ে তুলতে৷ দাদার ডাইরির কোনো এক জায়গায় লেখা ছিল ‘পঞ্চ ব্যঞ্জন আহুতির কথা৷’ এই পঞ্চ ব্যঞ্জন আহুতি বলতে দাদা বুঝিয়েছিল এমন পাঁচ জন মেয়েকে খুন করার কথা যাদের নামের শুরু প্রথম ব্যঞ্জন বর্ণ অর্থাৎ ‘ক’ দিয়ে আর সেই মেয়ের থাকতে হবে কোনো শারীরিক খুঁত৷ অমাবস্যার রাতে এমন পাঁচটা মেয়েকে খুন করে তার মাংস আর রক্ত খেলেই নাকি দাদা হয়ে উঠবে অসীম ক্ষমতার অধিকারী আর সব মেয়েই নাকি তাহলে হবে দাদার পরাভূত৷ কমলি মানে আমাদের সেই কাজের মেয়েটার বাঁ-পায়ের দুটো আঙুল ছিল না৷ আর তারা নামও ছিল ‘ক’ দিয়ে৷ তাই তাকে হতে হয়েছিল দাদার মানসিক ব্যাধির শিকার৷ পাগলা গারদে যাবার অল্প কিছুদিন পরেই স্বাভাবিক ভাবে মৃত্যু হয় দাদার৷ আর তারপরে এই বাড়িতেও নাকি ঘটতে থাকে নানা অস্বাভাবিক ঘটনা৷ তখন বাবা এ বাড়ি ছেড়ে চলে যান অন্য জায়গায়৷ এ বাড়ি লেগে যায় ভাড়া দেবার কাজে৷ বিগত পঁয়ত্রিশ বছরে এ বাড়িতে সব মিলিয়ে প্রায় দশ বারোটা পরিবার থেকে গেছেন৷ কারোরই কোনো সমস্যা হয়নি শুধু মিস্টার অনিল সাহা ছাড়া৷’

—‘কে অনিল সাহা?’ রাইমার প্রশ্নে একটু থেমে আবার বলতে শুরু করলেন মনিকা৷

—‘অনিল সাহা আর তার বউ তাদের মেয়েকে নিয়ে ভাড়া আসে এ বাড়িতে বছর কুড়ি আগে৷ ওদের মেয়ের নাম ছিল করুণা আর মেয়েটা ছিল অন্ধ৷ এই বাড়িতে আসার পর থেকেই মেয়েটির মধ্যে নানা সমস্যা শুরু হয়৷ অন্ধ নিরীহ মেয়েটা হঠাৎ স্লিপ ওয়াকিং-এর শিকার হয়৷ কোনো এক অপার্থিব দিবাকরের ভালোবাসার বাঁশির সুরের টানে অন্ধ মেয়েটা রাত বিরেতে ছুটে যায় ঘর ছেড়ে অজানা অন্ধকারের দিকে৷ কারো কোনো নিষেধ তাকে থামাতে পারে না৷ এই ঘটনা শোনার পরই আমার সেদিনেও মনে পড়ে যায় দাদার সেই পুরোনো ডায়েরির পাতাগুলো, মা বাবার মুখে শোনা দাদার সেই বীভৎস অভিসন্ধির কথাগুলো৷ একটা শারীরিক খুঁত যুক্ত মেয়ে যার নাম ‘ক’ দিয়ে৷ মুহূর্তে ভাবনার একটা নতুন দিক খুলে যায় আমার মধ্যে৷ সবটাতো মিলে যাচ্ছে দাদার সেই ডায়েরির লেখার সাথে৷ দাদার অতৃপ্ত আত্মা হয়তো আজও খুঁজে বেড়াচ্ছে তার সেই অসমাপ্ত প্রতিশোধ৷ হয়তো সেইজন্যই কমলির মতো করুণাও হতে চলেছে দাদার নিশানা৷ আজ রবি অশরীরী৷ তাই ওর ক্ষমতার পরিধিও আজ বিশাল৷ হয়তো তাই সে আজ এত বছর পর আবার যখন হুবহু সেই রকমই একজন মেয়েকে পেয়েছে এই বাড়িতে তাই ছলে বলে নিজের আয়ত্তে কাবু করতে চাইছে তাকে৷ মেয়েটাকে শেষ করে নিজের পঞ্চ ব্যঞ্জন আহুতির একটা উপকরণ বানাতে চাইছে তাকে৷ আর অদ্ভুত ব্যাপার, করুণা যে ছেলের কথা বলে ঘর ছেড়ে ছুটে যায় তার নাম দিবাকর৷ যেটা সূর্যের নাম৷ আর রবি মানেও যে সূর্য সে কে আর না জানে৷ আমি আমার এই ধারণা আর বিশ্বাসের সবটা সেদিন বলেছিলাম অনিল বাবুকে৷ না এসব কথার কোনো বাস্তব ভিত্তি বা সাক্ষ্য প্রমান হয়তো সেদিন আমি দিতে পারিনি, কিন্তু তবুও ওরা মেনেছিলেন এই কথাগুলো৷ এ বাড়ি ছেড়ে চলে যাবার ব্যবস্থা করে ফেলেছিলেন৷ কিন্তু তবুও শেষ রক্ষা হল না৷ যাবার দিনের ঠিক আগের রাতই ছিল ঘোর কালো অমাবস্যার রাত৷ সে রাতে কখন যেন একটু চোখ লেগে এসেছিল অনিল বাবু আর তার মিসেসের৷ আর ঠিক সেই সময়েই বোধ হয় ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেছিল করুণা সেই দিবাকরের বাঁশির সুরের টানে৷ তিনদিন মেয়েটার কোনো খবর পাওয়া যায়নি৷ তারপর ওর লাশ পাওয়া যায় এ বাড়িরই অল্প দূরের ওই ওয়াটার বডিটা থেকে৷ সাদা ফ্যাকাসে রক্ত শূন্য একটা দেহ৷ গলার কাছে খুবলানো মাংস৷ যেন কেউ পরম আক্রোশে ছিঁড়ে নিয়েছে মাংস পিণ্ড৷ ঠিক যেমনটা হয়েছিল বহু বছর আগে আমাদের বাড়ির কাজের মেয়ে কমলির সাথে৷’ একনাগাড়ে এতটা বলে জলের গ্লাসে মনিকাদেবীর চুমুক দিতে যাবার মুহূর্তেই গম্ভীর গলায় বলে উঠেছিল রাইমা—

—‘ম্যাডাম, আপনি যেটা শোনালেন ভূতের গল্পে প্লট হিসাবে সেটা অসাধারণ তাতে কোনা সন্দেহ নেই৷ কিন্তু কি জানেন তো ভূতের গল্প কোনো কালেই আমার একদম ভালো লাগে না৷ আসলে আমি কট্টর ভাবে যুক্তিবাদী৷ সায়েন্সের ছাত্রী৷ তাই ভূত প্রেতের আজগুবি তত্ত্বে একদম বিশ্বাস করি না৷ মনে হয় পুরো ব্যাপারটাই ধাপ্পা৷ আপনার দাদার সাথে করুণার মৃত্যুর কোনো যোগসাজশ অন্তত আমার তো মাথায় এলে না৷ অন্ধ মেয়ে৷ মানসিক সমস্যার শিকার হয়ে মাঝরাতে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছিল৷ কোনো মর্মান্তিক দুর্ঘটনার শিকার হয়ে তার মৃত্যু হওয়াটা অবশ্যই খুব দুঃখজনক, কিন্তু ভূতুড়ে নয়৷ হয়তো কাকতালীয় ভাবে তার সেই মৃত্যুর আঘাতের সাথে বহু বছর আগে আপনাদের বাড়ির মৃত কাজের মেয়ের মৃত্যুর কোনো মিল ছিল৷ কিন্তু তা বলে তারা এক সূত্রে গাঁথা হতেই পারে না৷’

—‘প্লিজ রাইমা, তুমি একটু বোঝার চেষ্টা কর৷ যুক্তি আর বিজ্ঞানের বাইরেও অনেক কিছু থাকে৷ আর তা ছাড়া বিজ্ঞানেই তো মেনে নেওয়া হয়েছে নেগেটিভ এনার্জির অস্তিত্বকে৷ তাই নয় কি? প্লিজ তুমি মরতে দিও না কনককে৷ ওর সামনে এখন যে বড়ো বিপদ৷ আগামী অমাবস্যার আগেই তুমি প্লিজ ওকে নিয়ে এ বাড়ি ছেড়ে চলে যাও৷ নাহলে হয়তো... তা ছাড়া তুমি কি লক্ষ্য করেছ কনকের কাল্পনিক প্রেমিকের নাম অরুণ৷ সেও কিন্তু সূর্য বা রবিরই নামান্তর৷ কনকের সারা গায়ে পোড়া আর ওর নামও শুরু...’

—‘ব্যস মনিকাদেবী৷ আর নয়৷ আপনার এই সব আজগুবি কাহিনি আর আমি সত্যি বরদাস্ত করতে পারছি না৷ এভাবে ভয় দেখিয়ে আমাদের নির্ধারিত সময়ের আগে বাড়ি ছাড়া করাটা আপনি যতটা সহজ মনে করছেন, তত সহজে হবে না৷ আমার বোনের অসুস্থতার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে... প্লিজ৷ আপনি এখন আসতে পারেন৷’

সেদিনকার নিজের সেই উদ্ধত ব্যবহারের জন্য আজ মাটিতে মিশে যেতে ইচ্ছে করছে রাইমার৷ কেন যে সেদিন ও একটুও মানল না কথাগুলো! হয়তো তাহলে আজও কনক... না, রাইমা আজও জানে না মনিকাদেবীর কথাগুলো কতখানি সত্যি আর কতটা সত্যি নয়৷ কিন্তু এটা তো ও জানে কনক সত্যি মিসিং হয়েছিল সেই অমাবস্যার রাত থেকেই৷ এটাও তো সত্যি যে ঠিক যেমন মৃত্যুর কথা বর্ণনা করেছিলেন মনিকাদেবী সেভাবেই মারা গেছে কনক৷

মনিকাদেবী আজ ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে বসলেন রাইমার পাশে৷ আলতো করে হাত রাখলেন ওর পিঠে৷ আবার জোরে ডুকরে কেঁদে উঠল রাইমা৷ আপনা থেকেই ওর হাত দুটো জোর হয়ে গেল মনিকা মাইতির সামনে৷

—‘রাই মামনি’... গলার স্বরে চমকে উঠল একটু রাইমা৷ সামনে এসে দাঁড়িয়েছে বুলু পিসি মানে কনকের মা৷ যার সবচেয়ে বড়ো অপরাধী আজ রাইমা৷ ক্ষমা চাওয়ার ভঙ্গীতে কিছু বলতে যাচ্ছিল রাইমা, কিন্তু তার আগেই বলল বুলু পিসি—

—‘না রে মা৷ তোর কোনো দোষ নেই আমি জানি৷ ও মেয়ের মাথায় যে দোষ গজিয়েছে তা তো মা হয়ে আমি নিজেই কোনোদিন টের পাইনি৷ নিজের মাথার দোষেই আজ হতভাগী’... ফুঁপিয়ে উঠল বুলু পিসি৷ তারপর আবার বলল— ‘আমি আজ কেয়াকে রেখে যাচ্ছি রে মা৷ এবার থেকে কনকের মতো ওই তোর...’

অপাঙ্গে একবার কেয়ার দিকে তাকাল এবার রাইমা৷ একদম কনকেরই ছায়া৷ সেই পোড়া শরীর আর মুখ, সেই বোকা বোকা ভিতু চোখ যাতে লেগে আছে হাজারো না মেটা আশার আগুন৷ সেই ‘ক’ দিয়ে নাম...

—‘না না না’... পাগলের মতো চিৎকার করে উঠল রাইমা৷ না কেয়াকে নিয়ে আর কোনো রিস্ক নেবে না ও যুক্তি বা বিজ্ঞানের দোহাই দিয়ে৷ কে জানে! সত্যি হয়তো বিজ্ঞানের বাইরেও কোনো জগত আছে৷ কে বলতে পারে৷ আমরা আর কতটুকুই বা জেনে উঠতে পেরেছি!

—‘তবে কি তুই কলকাতায় একা থাকবি নাকি এখন থেকে? পাগল হলি?’ প্রশ্নটা এল বাবার থেকে৷

নাঃ আর দেরি নয়৷ আজই আসল দিন হঠাৎ মনে হল রাইমার৷

—‘না আমি কলকাতায় আমার বরের সাথেই থাকব৷’

—‘বর মানে?’ চমকে উঠল বাবা৷

—‘বর মানে শেখর৷ আমি ওকে ভালোবাসি অনেকদিন থেকেই৷ ওকেই বিয়ে করব ঠিক করেছি৷ প্লিজ তুমি অমত কর না বাবা৷ প্লিজ মেনে নাও আমাদের৷’

দু-মুহূর্ত চুপ থাকলেন ভদ্রলোক৷ তারপর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা শেখরের হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় ধরে বললেন— ‘অমত করব কেন রে মা! এমন সৎ আর নিষ্ঠাবান ছেলেই তো তোর পাশে আমি চেয়েছিলাম৷ পয়সা কড়ি দিয়ে তোর বাবা মানুষকে বিচার করে না সেটা তুই আজও বুঝলি নারে!’

বুকের ভিতর থেকে মস্ত বড়ো একটা পাথরের বোঝা যেন নেমে গেল রাইমার৷ কিন্তু ওর যতটা খুশি হবার কথা তা যে আজ হওয়া সম্ভব নয়৷ আর চোখের সামনে যে এখনও জ্বলজ্বল করছে কনকের সেই পোড়া মুখটা, ভালোবাসার পিপাসায় কাতর ওর চোখ দুটো৷ আর সেই মুখে মিশে যাচ্ছে আর একটা অন্ধ, প্রেমহীন মেয়ের মুখ৷ অন্য একটা মুখও যেন আস্তে আস্তে ফুটে উঠছে এবার রাইমার চোখের সামনে৷ একটা সর্বহারা ছেলে, দু-চোখে যার প্রতিশোধের আগুন৷

—‘ভগবান, আজ আর আমি একার সুখ চাই না গো৷ ভালোবাসা না পাওয়া ওই মানুষগুলোর আত্মাকেও তুমি শান্ত কর ঠাকুর৷ কনক, করুণা, রবি ওরা সবাই যেখানেই থাকুকু যেন ভালো থাকে৷ একটু ভালোবাসা, একটু উষ্ণতা খুঁজে ফিরে আর যেন কোনোদিন মরতে না হয় কাউকে ওদের মতো৷’ নিজের মনেই অস্ফুটে প্রার্থনা করল রাইমা৷

___

[পঞ্চ ব্যাঞ্জন আহুতি সম্পূর্ণ কাল্পনিক তত্ত্ব৷ গল্পের প্রয়োজনে এই কল্পনার আশ্রয় নেওয়া হয়েছে৷]

___

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%