মায়ার বাঁধন

পল্লবী সেনগুপ্ত

বিছানার ওপর আধশোয়া হয়ে বাংলা উপন্যাসের পাতা উল্টাছিল অনু৷ বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে ঝিরঝির৷ আর অনুর মনেও আজ যেন একরাশ মেঘের আনাগোনা৷ আজ ছুটি৷ তাই দুপুরে বাড়িতেই রয়েছে ও৷ মনটা মোটে ভালো নেই আজ অনুর৷ আসলে দিনদিন সুখেনের সাথে কেমন যেন দূরত্ব তৈরি হয়ে যাচ্ছে৷ আর এটাই প্রতি মুহূর্তে যন্ত্রণা দিচ্ছে ওকে৷ ভালোবেসেই তো বিয়েটা হয়েছিল ওদের, কিন্তু তবুও আজ কেন যেন শিথিল থেকে শিথিলতর হয়ে যাচ্ছে ওদের সম্পর্কটা৷

অনু জানে, সুখেনও ভালো নেই আজ ওদের সম্পর্কের এই অবনতিতে৷ যাই হোক না কেন অনুর প্রতি ভালোবাসায় যে সুখেনের কোনো ভেজাল নেই সেটা খুব ভালো জানে অনু৷ আজ পরিস্থিতির কারণে হয়তো সুখেন নানাভাবে ভুল বুঝছে ওকে৷ অশান্তি পাচ্ছে ওরা দুজনেই৷ সুখেনও ভালো নেই অনুর মতো৷

আসলে রমাদেবী মানে সুখেনের মা-ই দায়ী আজ ওদের এই সম্পর্কের অবনতির জন্য৷ মানুষটা ছেলেকে নিয়ে অমানুষিক পজেসিভ৷ আর এই ব্যাপারটাই আজ মারাত্মক হয়ে দাঁড়াচ্ছে ওদের জন্য৷ সুখেনও মা-কে ভীষণ রকম ভালোবাসে৷ কিন্তু বিয়ের পর মায়ের সাথে সাথে বউকেও যে ছেলে অনেকখানি ভালোবাসবে সেটা তো স্বাভাবিক৷ কিন্তু এই ব্যাপারটাই মেনে নিতে পারছেন না রমাদেবী৷ উনি বোধ হয় চান বউকে কেবল একটা বাড়তি আসবাব হিসেবেই দেখুক ছেলে৷

ছেলে বউয়ের মধ্যে অশান্তি লাগাবার জন্য সব সময় ছুতো খুঁজতে থাকেন রমাদেবী৷ আর আজকাল যেন উনি বড়ো বেশি সাফল্য পাচ্ছেন এই ব্যাপারে৷ ওনার বুদ্ধিতেই বোধ হয় ছোটো খাটো নানা ব্যাপারেই সুখেন ভুল বুঝছে অনুকে৷ ঝগড়া ঝাটি হচ্ছে নিয়মিত৷ অশান্তির কালো বাদল পিছু ছাড়ছেই না ওদের৷ আর সুখেন এমনিতে শান্ত ছেলে হলেও রাগলে ও চণ্ডাল৷ আর এই এত রাগ তো ওর শরীরের জন্যেও ভালো না৷ রমাদেবী কি বুঝতে পারছেন না যে অশান্তির বীজ বপনের ফলে সুখেনও একটুও ভালো নেই? উনি কি চান যে ছেলেটা একটু শান্তি পাক? নাকি নিজের ভাবনাই ওনার কাছে এত গুরুত্বপূর্ণ যে ছেলের দিকটা বোঝার চেষ্টাই করেন না উনি?

—‘বউমা...’ রমাদেবীর আচমকা হুংকারে চমকে উঠল অনু৷ কখন যেন দরজায় এসে দাঁড়িয়েছেন ভদ্রমহিলা৷

—‘হ্যাঁ বলুন...’ যথাসম্ভব স্বর শান্ত রাখার চেষ্টা করল অনু৷

—‘তুমি আজ যখন ল্যান্ডফোনে কথা বলছিলে তখন আমি শুনেছি তোমার কথা৷ তুমি নাকি সামনের মাসের পনেরো তারিখ মুর্শিদাবাদ যাবে?’

—‘হ্যাঁ যেতে হবে৷ সে তো আমি আপনাকে তিন মাস আগেই বলেছিলাম৷’

—‘তিন মাস আগে কি বলেছিলে না বলেছিলে আমার অত মনে নেই৷ কিন্তু এখন আমি তোমায় সাফ জানিয়ে দিচ্ছি ওই সময় যাওয়া তোমার হবে না৷ ওই সময়ে কাশী থেকে আমার গুরুদেব আসছেন, তাই আমি চাই তুমি ওই সময় বাড়িতেই থাক৷ তোমাকে গুরুদেবের সেবায় নিয়োজিত থাকতে হবে ওই সময়৷’ আদেশের চালে নিজের বিধান শুনিয়ে দিলেন রমাদেবী৷

—‘সেটা সম্ভব নয় মা৷ আমাকে যেতেই হবে৷ সব ফাইনাল হয়ে গেছে৷ এখন আমি দায়িত্ব এড়াতে পারব না৷ মাত্র ১৭ দিন বাকি আছে আর৷ এই শেষ মুহূর্তে আমি কিছু বদলাতে পারব না৷ আর তা ছাড়া আপনি তো আগেই জানতেন তাহলে আগে কেন বলেননি আমায়? তাহলে না হয় কিছু চেষ্টা করা যেতে পারত৷’

—‘কী বললে? আমায় তুমি শিখাবে যে কোনটা আগে বলতে হবে আর কোনটা পরে? আর গুরুদেবের থেকে তোমার কাছে কিনা ওই স্ফূর্তি আর বেলেল্লাপনা আজ বেশি বড়ো হয়ে গেল? লজ্জা করে না তোমার বেহায়ার মতো আমার সামনে দাঁড়িয়ে এগুলো বলতে?’

—‘ভদ্র ভাবে কথা বলুন মা৷ আমি কোনো বেলেল্লাপনা করতে যাচ্ছি না সেটা আপনিও জানেন৷ আমি একজন শিক্ষিকা৷ তাই নিজের ছাত্রীদের প্রতি আর নিজের কাজের প্রতি আমার একটা দায়বদ্ধতা আছে, সেটা আমি উপেক্ষা করতে পারি না৷ আমি ইতিহাস পড়াই তাই ছাত্রীদের নিয়ে এই এসকারশানের দায়িত্বটা আমি এড়াতে পারব না৷ আগে থেকে হলে না হয় তাও চেষ্টা করা যেত, কিন্তু এই শেষ মুহূর্তে সেটা সম্ভব নয়৷’ দৃঢ় স্বরে বলল অনু৷

—‘একদম মুখে মুখে কথা বলবে না৷ কে বলেছে তোমায় ওই চাকরি করতে? আমার ছেলে তোমার খাওয়া পরার কোন অভাবটা রেখেছে যে কাজ করতে হবে তোমায়? তুমি কি ভাব আমি বুঝি না? ওই চাকরিটা হল আসলে তোমার ছুতো বাইরে বেরিয়ে পর পুরুষদের সাথে গা ঘেষাঘেষি করার৷ আর এসকারশানের নাম করে যে তুমি আসলে নষ্টামি করতে যাবে তাও জানি আমি৷’

—‘ছি ছি মা৷ আপনি না একজন ভদ্রমহিলা৷ আর এই আপনার মুখের ভাষা? শুনুন মা আমি খাওয়া পরার জন্য চাকরি করি না৷ কেন করি সেটা আপনি বুঝবেন না৷ কারণ সেটা বোঝার জন্য যে বিবেক বা শিক্ষাটুকু দরকার সেটা আপনার আছে বলে মনে হয় না৷ অবশ্য আপনার সাথে আমি আর কথা বাড়াতেই চাই না আপনার এই সব নোংরা কথা শোনার পর৷ আমার সত্যি রুচিতে বাধছে আপনার সাথে বাক্যালাপ করতে৷’

রমাদেবীর মুখের সামনেই দুম করে দরজাটা বন্ধ করে দিল অনু এবার৷

—‘কী বললে তুমি? আমি অশিক্ষিত? আমার সাথে কথা বলতে রুচিতে বাধে তোমার? এত স্পর্ধা তোমার? এত বাড় বেড়েছে তোমার? তোমার সব বাড় আমি ছেঁটে দেব৷ আজ ফিরুক সুখেন৷ ফিরুক একবার৷ আজ তোমার একদিন কী আমার একদিন৷’

রমাদেবীর হুংকারে যেন ঝনঝন করে উঠল গোটা বাড়িটা৷

ঘরে বসে বেশ চাপা স্বরেই কথা বলছিল মিলি ওর বেস্ট ফ্রেন্ড রিমার সাথে৷ আজ শরীরটা সকাল থেকেই ম্যাজম্যাজ করছিল মিলির৷ তাই ও অফিস ডুব মেরেছে৷ নইলে কি আর ঘরে বসে দুপুর বেলায় বন্ধুর সাথে ফোনে আড্ডা দেবার সৌভাগ্য হয় ওর৷

—‘এই মিলি এত আস্তে আস্তে কথা বলছিস কেন রে?’ রিমা একটু বিরক্তি স্বরেই বলল৷

—‘আর বলিস না৷ আজ আমার শাশুড়িটাও বাড়ি আছ৷ কে জানে আরি পাততেও পারে৷’

—‘দুর৷ কী করে আরি পাতবে? তুই তো মোবাইলে কথা বলছিস৷ নিজের ঘরে বসে৷ তাও কী করে...?’

—‘ধুর জানি না৷ আমার একদম ভালো লাগে না মহিলাকে৷ কেমন যেন গুমরে মট মটে করছে৷ উফফ! কলেজের প্রফেসর যেন আর কেউ হয় না৷ সব সময় কেমন যেন ভারিক্কী ভাব৷’ গলায় একরাশ উষ্মা নিয়ে কথাগুলো বলল মিলি৷

—‘তুই এক কাজ কর মিলি৷ তুই শাম্বকে নিয়ে আলাদা কোনো ফ্ল্যাটে শিফট হয়ে যা৷ উনি থাকুক নিজের গুমোর আর ভারিক্কি চাল নিয়ে৷’

—‘হ্যাঁরে আমিও তো তাই চাই৷ কিন্তু আমি চাইলেও তো আর হল না৷ আমার ওই মাতৃভক্ত রামপ্রসাদ বর সেটা মানলে তো৷ উফফ! এই শাম্বটা যে এমন মাম্মাজ বয় সেটা প্রেম করার সময় আমি একদম বুঝিনি রে৷ তাহলে কিছুতেই ওর গলায় মালা দিতাম না৷ ওর মায়ের নামে তো ও কিছু শুনতেই চায় না৷ ওর খালি একটাই কথা মা তো তোমায় কোনো ব্যাপারেই কিছু বলে না, কিছুতে বাধা দেয় না তাহলে তোমার সমস্যা কোথায়? আরে ওকে আমি বোঝাতেই পারি না যে কথায় কথায় বাধা দিলে বা কোমর বেঁধে ঝগড়া করতে এলেই যে শুধু প্রবলেম হয় তা তো নয়, অ্যাটিটিউড প্রবলেমও একটা বড়ো সমস্যা৷ আর ওই মহিলার অ্যাটিটিউডটাই আমার জাস্ট পোষায় না৷ জানিস রিমা, আজকাল আমার আর শাম্বর রিলেশনটাও খুব স্ট্রেসড চলছে শুধু ওই মহিলার জন্য৷ সব সময় শাম্বর ওর মা-কে অন্ধের মতো সাপোর্ট করাটা আর ওই মহিলার অতিরিক্ত ছাড়া ছাড়া ব্যবহার আমার প্রতিই তার জন্য দায়ী৷ যাই হোক আমি জানি না এভাবে চললে কতদিন আমি থাকত পারব শাম্বর সাথে৷ থাকুক শাম্ব ওর মা-কে নিয়ে৷’

—‘না না এভাবে বলিস না৷ শাম্ব রিয়েলি লাভস ইউ৷ সেই কলেজ লাইফ থেকেই তো দেখছি আমরা৷ তুই ওকে বোঝা৷ আমি শিওর তোর সাথে ঝামেলা বা ঝগড়া করে শাম্বও ভালো থাকে না৷’

—‘আমি জানি আমাদের রিলেশন এর টেনশনের জন্য শাম্ব খুব আপসেট থাকে আজকাল৷ কিন্তু আমি...’ শেষ হল না মিলির কথাটা৷ ঠিক তখনই টোকা পড়ল দরজায়৷ টুক টুক টুক৷

—‘মিলি, তুমি কি ঘুমাচ্ছ?’ মিলি শুনতে পেল দরজার বাইরে লেখা চৌধুরীর মানে শাশুড়ির গলা৷

—‘এই শোন আমি তোকে একটু পরে কল করছি৷ আমার শাশুড়ি ডাকছে৷’ ফোন কেটে নিজের ঘরের দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এল মিলি৷

—‘হ্যাঁ বলুন...’ কেজো স্বর মিলির৷

—‘শোন আজ টুপু বাড়ি ফিরে এলে সন্ধ্যায় ওকে নিয়ে একবার আমার ঘরে এসো৷ তোমাদের দুজনের সাথে আমার কিছু জরুরি কথা আছে৷’

—‘কী কথা?’ ভুরুতে ভাঁজ মিলির৷

—‘সেটা তখনই বলব বললাম তো৷’ গম্ভীর চালে প্রস্থান করলেন লেখাদেবী নিজের বক্তব্যটুকু শুনিয়ে৷

মিলিও আবার ফিরে এল নিজের বিছানায়৷ আঙ্গুল মটকাচ্ছে মট মট করে৷ কী কথা থাকতে পারে ওই মহিলার যেটা উনি মিলির সামনেই শাম্বকে বলতে চাইছেন?

তাহলে কি মিলির নামে কোনো অভিযোগ করে শাম্বর কানে বিষ ঢাল চায়? কিন্তু গত দেড় বছরে তো কখনো এমন করেননি৷ তাহলে কি এটা নতুন গুন?

‘উফ!’ বুক ঠেলে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল মিলির৷ কে জানে কি ভাবছেন মহিলা৷ তবে শাম্বকে নিজেকে বদলাতে হবে এত মা মা মা মা করতে থাকলে মিলি আর থাকতে পারবে না ওর সাথে৷ হ্যাঁ অনেক হয়েছে, আর না৷ এবার শক্ত হবে মিলি৷ হবেই হবে৷

রাস্তা দিয়ে এলোপাথারি বাইক চালাচ্ছে সুখেন৷ না, কিছুতেই মাথাটাকে বাগ মানাতে পারছে না ও৷ ইশশ! এটা কি করল আজ ও? শেষ পর্যন্ত কিনা ও আজ অনুর গায়ে হাত তুলল! ছি ছি৷ কিন্তু... কিন্তু অনুও তো চরম অন্যায় করেছে আজ৷ ও কিনা মা-কে বলেছে যে মা অশিক্ষিত৷ মা-র সাথে কথা বলতে ওর রুচিতে লাগে! এত জঘন্য ভাবে মায়ের সাথে ব্যবহার করার পরও কিনা মুখের উপর বলল মায়ের কাছে ক্ষমাও কোনো মতেই চাইবে না৷

এই সব কথাগুলো শুনেই তো আর রাগটাকে নিজের বশে রাখতে পারল না সুখেন৷ অনুর জেদ সব ব্যাপারে আজকাল যেন বেড়েই চলেছে৷ আর মায়ের সাথে একফোঁটা মানিয়ে চলার ক্ষমতা নেই ওর৷ নিত্যদিনের এই অশান্তি যে সুখেনও আর নিতে পারছে না সেটা কি আদৌ বোঝে অনু? সব সময় মা অভিযোগ করে অনুর ব্যাপারে৷ হ্যাঁ মায়েরও বাড়াবাড়ি আছে সেটা আজকাল বুঝতে পারছে সুখেন৷ অনু কি এতটাও খারাপ নাকি? কিন্তু সুখেনই বা কি করবে? মা-কে কিছু বলতে গেলেই মা বলবে আমি সব ছেড়ে চলে যাব কাশীতে গুরুদেবের কাছে৷ আর অনুকে কিছু বলতে গেলেই ও অশান্তি করে৷ কোনদিকে যাবে সুখেন? ও যে দুজনকেই বড্ড ভালোবাসে৷

কিন্তু আজ ও যেটা করল সেটা কোনোভাবেই মেনে নেবে না অনু সেটা সুখেন বুঝতে পারছে৷ অনুর আত্মসম্মান প্রবল৷ তাই আজ বরের হাতে শাশুড়ির সামনে চড় খাবার পরেও যে আর সে ওই বাড়িতে থাকবে না তা ষোল আনা জানে সুখেন৷

কিন্তু সুখেন তাহলে কী করবে এবার? ও তো পারবে না অনুকে ছেড়ে থাকতে৷ উফ! না না আর ভাবতে পারছে না সুখেন৷ ক্ষমা চাইতে হবে অনুর কাছে৷ আটকাতেই হবে ওকে৷ কিন্তু মা? মা তো তাহলে ভয়ানক অসন্তুষ্ট হবে৷ তারপর মা যদি চলে যায়?

না না৷ কিচ্ছু বুঝতে পারছে না সুখেন৷ গোঁ গোঁ করে আরও স্পিড বাড়াল বাইকের৷ ঝড়ের গতিতে বাইক চালাচ্ছে, যেন চারপাশের কিছুই আর দেখতে পাচ্ছে না ও৷

না ও আর নিজের মধ্যে নেই৷ তাই আর দেখতেও পেল না যে উল্টো দিক থেকে তীব্র বেগে ছুটে আসছে একটা লরি ওরই দিকে৷ না, সুখেন পারল না৷ পারল না পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে যেতে৷ বাইক শুদ্ধ পড়ল লরির সামনে৷ ঝটিতে ধাবমান লরির ধাক্কায় ছিটকে পড়ল উল্টো দিকের রাস্তায়৷ ঠং করে সজোরে ঠুকে গেল মাথাটা শক্ত পিচের রাস্তায়৷ হ্যাঁ, রাগ করে বেরিয়ে এসেছিল তাড়াহুড়ো করে ছেলেটা৷ না, আজ হেলমেট নিয়েও বেরোয়নি ও৷

‘আআআ’ একটা তীব্র চিৎকারে অনেকগুলো লোক ছুটে এল ওর দিকে৷ অসহ্য যন্ত্রণায় তখন কাতরাচ্ছে সুখেন৷ তবে বেশিক্ষণ পেতে হল না যন্ত্রণা৷ কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই উবে গেল ওর সব কষ্ট আর চোখের সামনে নেমে এল একরাশ কালো দুর্ভেদ্য অন্ধকার৷

—‘এই বেঁচে আছে? বেঁচে আছে?’ ভিড়ের মধ্যে থেকেই বলল যেন কারা৷

—‘না না স্পট ডেড৷ হেলমেট ছাড়াই চালাচ্ছিল তো’ আবার কেউ বলল ভিড়ের থেকেই৷

অনেকগুলো লোক দৌড়াল ঘাতক লরিটার সন্ধানে, ওটাকে আটক করতে৷ কিন্তু সুখেন ততক্ষনে মুক্তি পেয়ে গেছে জীবনের সব অশান্তির আগুন থেকে৷ পৃথিবীর মায়া ততক্ষণে কাটিয়ে ফেলেছে অনুর স্বামী আর রমাদেবীর একমাত্র ছেলে৷

—‘মা তুমি আমাদের কিছু বলবে বলে ডেকেছ?’ মিলি আর শাম্ব অনেকগুলো প্রশ্ন চোখে নিয়ে মায়ের সামনে দাঁড়িয়ে৷

—‘হ্যাঁ রে৷ দেখ টুপু তোর বাবা মারা যাবার পর পরই আমি চলে আসি এই বাড়িতে৷ এই বাড়িটা আমার বাবার তৈরি করা বাড়ি৷ আমার শৈশব, কৈশোর আর যৌবন যেমন কেটেছে এই বাড়িতে, তেমনি তোর জন্ম থেকে তোর বড়ো হওয়া, তোর চাকরি বিয়ে সেগুলোও এই বাড়িতে৷ তাই এই বাড়িটা আমার কাছে বড্ড আপনার রে৷ আর সেইজন্যই বোধ হয় আমি আমার জীবদ্দশায় এই বাড়ি ছাড়ার কথা ভাবতেও পারব না৷ তা ছাড়া আমার কলেজ যাতায়াতেরও সুবিধা হয় এখান থেকে৷’ এতটা বলে একটু থামলেন লেখা দেবী৷

মিলির ভুরূতে ভাঁজ লেগে রয়েছে একই ভাবে৷

—‘এসবই তো জানি মা৷ তাহলে আজ হঠাৎ এসব নতুন করে বলছ কেন?’ বলল শাম্ব৷

—‘বলছি তার কারণ আছে৷ আসলে আমি একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি টুপু৷ দেখ টুপু তোর অফিস বানতলায়৷ আর তোর অফিসের গাড়ি তোকে অফিস পৌঁছে দেয় আবার বাড়িতেও ছেড়ে দেয়৷ কিন্তু মিলির অফিস সল্টলেকে৷ ওর অফিস থেকে ও কোনো গাড়ি পায় না৷ বাসে ট্রামে করেই যাতায়াত করতে হয় ওকে৷ আর এই এরিয়া থেকে অনেক দূরও হয় ওর অফিসটা৷ ওর বড্ড কষ্ট হয় যাতায়াতে৷ একদিন অফিসের গাড়ি মিস করলে তোরও অনেক সমস্যা হয় যাতায়াতে৷

আর এসব দেখেই আমি তোদের না জানিয়েই একটা কাজ করেছি৷ আমি তোদের জন্য একটা ফ্ল্যাট বুক করেছি ওই নিউটাউনের দিকটায়৷ ওখান থেকে অফিস যাতায়াত করতে সুবিধা হবে তোদের৷ ধরে নে তোদের আগামী বিবাহবার্ষিকীর উপহার এটা আমার তরফ থেকে৷’

—‘মানে? এসব তুমি কি বলছ মা? আমরা ওখানে থাকব আর তুমি এখানে একা থাকবে? মানেটা কি এসবের? আমরা কি তোমায় বলেছি যে আমাদের অসুবিধা হচ্ছে? এটা হতেই পারে না মা৷’ হাউমাউ করে উঠল শাম্ব৷

‘প্লিজ শাম্ব, মা যখন ভেবেছেন তখন উনি ঠিকই ভেবেছেন নিশ্চয়৷ আর মা তো ঠিক কথাই বলছেন৷’ এতক্ষণে মুখ খুলেছে মিলি৷ ওর দু-চোখে ঝিকমিক করছে একটা অপার খুশি৷

—‘হ্যাঁ টুপু আমি সত্যি তোদের ভালোর জন্যই বলছি রে৷ আর বিশ্বাস কর আমার কোনো অসুবিধা হবে না৷ আমি তো মাঝে মাঝেই যাব ওখানে৷ আর তোরাও আসবি প্রায়ই৷ মিলি তুমি একটু বুঝাও তো ছেলেটাকে৷’

—‘কিন্তু মা... না এমন হয় না৷ প্লিজ মা একটু বোঝো...’ পাগলের মতো ছটফট করেই যাচ্ছে ছেলেটা৷ মিলি ওকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে নিয়ে গেল ঘরে৷

লেখাদেবীও ঘরের আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়লেন এবার৷ বুক চিরে বেরিয়ে এল একটা বড়ো নিঃশ্বাস৷

স্টাফ রুমে বেশ আনমনা হয়েই বসেছিলেন আজ অধ্যাপিকা অনুলেখা চৌধুরী৷ গত সপ্তাহেই মিলি আর শাম্ব শিফট হয়ে গেছে নতুন ফ্ল্যাটে৷

হঠাৎ যেন সম্বিৎ ফিরে পেলেন পিঠে পরিচিত হাতের ছোঁয়ায়৷ কখন যেন এসে পিছনে দাঁড়িয়েছে দীর্ঘ দিনের সহকর্মী বনাম বন্ধু মিত্রা৷

—‘কিরে এত উদাস কেন? মন ভালো নেই নিশ্চয়?’ চেয়ার টেনে বসতে বসতেই বললেন মিত্রা৷

—‘না না মন ভালো থাকবে না কেন? ধুত কি যে বলিস!’ নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন অনুলেখা চৌধুরী৷

—‘কেন এমন করলি অনু? যে ছেলেকে নিজের সবটুকু দিয়ে বড়ো করলি আজ তাকে নিজের হাতে এভাবে দূরে করে দিলি! সুখেনদা মারা যাবার সময়ও তো জানতিসই না নিজের শরীরে বাসা বেঁধেছে আর একটা প্রাণ৷ প্রথম টের পেলি সুখেনদার কাজ টাজ মেটার পর...’

—‘হ্যাঁরে সত্যি প্রথমে কিছু বুঝিনি৷ সুখেনের মৃত্যুর পর ওদের বাড়ির সবাই যাতা ব্যবহার করছিল আমার সাথে৷ বলেছিল আমার জন্যই নাকি চলে গেছে সুখেন৷ একে স্বামীর শোক, তাইতে সবার এমন নারকীয় ব্যবহার৷ কীভাবে যে আমি কাটিয়েছি তখন৷ তাই যখন টের পেলাম সে আসছে, আর দু-বার ভাবিনি৷ ও বাড়ি ছেড়ে চলে এসেছিলাম বাবার বাড়ি৷’ শুকনো গলায় বলল অনু মানে অনুলেখা চৌধুরী৷

—‘হ্যাঁ জানি তো৷ আর এও জানি কীভাবে শাম্বকে বুকের এক এক ফোঁটা রক্ত দিয়ে মানুষ করেছিস তুই৷ ওই ছেলেই তো তোর জীবনের সব কিছু৷ তাহলে কেন করলি এমন অনু?’

—‘মিত্রা তুই তো জানিস আমি সব সময় চেয়েছি আমার ছেলেটার যাতে কোনোরকম কষ্ট না হয়৷ যেন ও খুব ভালো থাকে৷ তাই জন্যই’...

—‘মানে? এটা কি বলছিস তুই?

—‘ঠিক বলছি৷ মিলি মানে শাম্বর বউয়ের কোনোদিনই আমায় বিশেষ পছন্দ হয়নি রে৷ সেটা না হতেই পারে৷ ও মডার্ন মেয়ে৷ হয়তো মেলে না আমার সাথে মত৷ তবে আমি বুঝতে পারছিলাম ইদানীং আমায় নিয়ে শাম্ব আর মিলির মধ্যে বেশ অশান্তি লাগছিল৷ আর সেই অশান্তির জেরেই বড্ড কষ্ট পাচ্ছিল ছেলেটা৷ আসলে ও যে আমাদের দুজনকেই বড়ো ভালোবাসে৷ তাই রোজকার মা বউয়ের এই দ্বন্দ্বে ভালো ছিল না ও৷ আর তাই জন্যই বোধ হয় ইদানীং আমি খুব বেশি করে দেখতে পাচ্ছিলাম তিরিশ বছর আগে হারিয়ে যাওয়া আমার সুখেনকে টুপুর মধ্যে৷

আমার শাশুড়ি নিজের ছেলেকে নিজের সম্পত্তি ভাবতেন৷ উনি বলতেন প্রায়ই ছেলের সাথে আমার নাড়ির বন্ধন৷ আর এই বন্ধনের জন্যই ছেলে শুধু আমার৷ আমারই মত মেনে চলবে ও৷

আসলে উনি বুঝতে পারেননি একটা সময় এলে বন্ধনকেও শিথিল করতে হয়, নইলে বন্ধন বেড়ি হয়ে যায়৷ ছেলে-মেয়ে বড়ো হবার পর তার পৃথিবীটা তাকে তার মতো করে সাজাতে দিতে হয়৷ নিজের স্বার্থ আর ইগো নিয়ে লড়াই করে সেখানে জোর করে ঢুকতে নেই৷ নাড়ির বন্ধনকে জোর করে আঁকড়ে তাকে ফাঁস বানাতে নেই৷ আর উনি সেদিন এটা বোঝেননি বলেই একসাথে তছনছ হয়ে গেছিল অনেকগুলো জীবন৷

কিন্তু আমি সেটা চাইনি রে৷ আমি চাইনি আমার জন্য কোনোভাবে আমার ছেলে কষ্ট পাক৷ আমার জন্য ওদের জীবনে সমস্যা আমি চাইনি৷ আমার নাড়ির বন্ধন কে ওর শেকল কি করে বানিয়ে তুলি বল? আর সেইজন্যই ওকে জোর করে হলেও পাঠিয়ে দিলাম ওদের নিজেদের পৃথিবীতে৷ নিজেদের মতো করে এবার বাঁচুক ওরা৷ নিজেরা ভালো থাকুক৷’

—‘জানি না বাবা তুই কি সব বলিস...’ বিরক্তি নিয়েই এবার উঠে পড়লেন অধ্যাপিকা মিত্রা জানা৷

কয়েক মূহূর্ত স্থির হয়ে বসে থাকলেন অনুলেখা৷ তারপর উঠে ধীর পায়ে এগিয়ে গেলেন স্টাফরুম ছেড়ে ক্লাসের দিকে৷ আজ কলেজের শেষে একবার যেতে হবে শাম্বর ফ্ল্যাটে৷ বারবার ডাকছে ছেলেটা৷ আর অনুও যে ওকে না দেখে বেশিদিন থাকতেই পারে না৷ তাই তো ছেলেটা চলে যাবার পর থেকেই বুকের কোণে ক্রমাগত চিনচিন করেই যাচ্ছে৷ কিন্তু না সেটা বুঝতে দেওয়া যাবে না ছেলেটাকে৷ অনু জানে এখন মিলি আর টুপুর মধ্যে গণ্ডগোল সব মিটে গেছে৷ বেশ শান্তিতে আছে এখন ওরা৷ ব্যস! আর কী চাই৷ এইটুকুই তো চেয়েছিল অনু৷

বুকের মাঝে কষ্টের হুলটা খুঁচাতে থাকলেও আজ বেশ নির্ভার লাগছে অনুর, শাম্ব আর মিলির সম্পর্কটা সামলে গেছে এটা সত্যি বড্ড বড়ো পাওয়া৷ মা-রা তো শুধু এটাই চায়, সন্তানের হাসিমুখটা দেখতে৷ সন্তানের সমস্যাবিহীন, মসৃণ জীবনের সামনে যে নিজের সব কষ্টই ফিকে হয়ে যায় মায়ের৷ আর সেইজন্যই তো বুকের কষ্ট বুকে চেপেও আজ হাসছে অনু৷ নিখুঁত ভাবে করে চলেছে ভালো থাকার অভিনয়টা৷

___

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%