পল্লবী সেনগুপ্ত
—‘ওই যে দ্যাখ গুরু আসছে... এসে গেছে তোমার ক্যাটরিনা কাইফ... হলুদ টপ আর জিন্স এ তো পুরো...’
মুকুলের কথায় চমকে চায়ের দোকানের বাইরেটায় তাকাল অঞ্জন৷ হ্যাঁ সে তো আসছে৷ রোজকার মতোই বেলা দশটার সূর্যের সোনালী আলোটাকে আরও একটু বেশি উজ্জ্বল করে দিয়ে সে এবার সোজা এগিয়ে যাবে বাসস্ট্যান্ডের পথে৷ তারপর বাসে উঠে হুশ করে চলে যাবে কলেজে আর অনেকগুলো ছেলের হাঁ করা মুখ চেয়ে থাকবে তখনও সেই আবছা হতে হতে প্রায় মিলিয়ে আসা বাসটার দিকে৷
সে আজও হনহন করে পার হয়ে চলে গেল চায়ের দোকানটাকে পাশ কাটিয়ে প্রতিদিনের মতোই৷ আর অঞ্জনও নিয়মমাফিক একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে চেয়ে রইল তার স্বপ্নসুন্দরীর দিকে৷ তারপর একসময় সেই মনহরনী মিলিয়ে গেল অঞ্জনের দৃষ্টিসীমার ওপারে৷
—‘এই আজ উঠিরে৷ আবার একটা ক্লায়েন্ট মিটিং আছে আজ৷ অলরেডি বেশ দেরি হয়েছে৷ এরপরও যদি না উঠি তাহলে তো আজকেই বিদায় করে দেবে কোম্পানি৷’ ভাঁড়ে চায়ের শেষটুকু এক চুমুকে শেষ করে উঠে পড়ল অঞ্জন৷
—‘বিদায় তো তোকে এমনিতেও করবে তোর কোম্পানি৷ সেলসের চাকরিতে টিকে থাকা এত সস্তা নাকি? ইশশ! টার্গেট যে মিট করতে পারিস না, সে তো নিজেই বললি৷ আর তা ছাড়া যাকে পটানোর জন্য এত ঝক্কি নিচ্ছিস সে তো এমনিতেই অন্য বন্দরে নৌকা ভিড়িয়ে দিয়ে বসে আছে৷’ বলেই খ্যাক খ্যাক করে বিচ্ছিরি ভাবে হাসল সোমেন৷
—‘তুই সব জেনে বসে আছিস নাকি রে? তোর বোনের সাথে দুটো কথা বলে বলেই সব জেনে গেলি তুই?’ এবার খেঁকিয়ে উঠল অঞ্জন৷
আবার খ্যাক খ্যাক করে হাসল সোমেন৷ কোনো উত্তর দিল না৷
মনে একরাশ তিক্ততা নিয়ে অফিসের পথে পা বাড়াল অঞ্জন৷ উফফ! কেন যে মাঝে মাঝে এমন করে সোমেন কে জানে! সকাল বিকাল দু-বেলা যাদের সাথে পাড়ায় বসে আড্ডা হচ্ছে, সেই বন্ধুগুলোই সব জেনে শুনে যদি এমন করে তাহলে মনটা কি দুমড়ে মুচড়ে যায় না! সোমেন, মুকুল, বাবলা এদের কাছে কি কিছুই অজানা!
মেয়েটাকে যে ঠিক কবে থেকে ভালো লাগতে শুরু করেছিল সেটা মনে পড়ে না অঞ্জনের৷ তবে এটা মনে আছে যে ওকে ভালো লাগতে শুরু করার পর থেকে আর কোনোদিন অন্য কোনো মেয়ের দিকে তাকাতেও ইচ্ছে করেনি৷ অমন কালো গভীর দুটো চোখ তো আর এই পৃথিবীর কোনো মেয়ের থাকতেই পারে না৷ আর ওই লাখ টাকার হাসিটা? নাঃ৷ ওটা আর কারো হবে না৷ শুধু ওই চোখের দিকে তাকিয়ে বা ওই হাসির কথা ভেবেই তো কাটিয়ে দিতে পারে অঞ্জন প্রতিটা দিন৷ কিন্তু ও? না ও বোধ হয় ঘেন্না করে অঞ্জনকে কিংবা করুণা করে বা হয়তো কোনোদিন ভুল করেও ভাবেই না অঞ্জনের কথা৷ অবশ্য ওর মতো অমন ঝকঝকে সুন্দরী, স্মার্ট আর পড়াশুনা করা একটা মেয়ের অঞ্জনকে নিয়েই ভাবনা তো থাকারই কথা নয়৷
কী আছে অঞ্জনের? সাধারণ কলেজ থেকে বি. কম. পাশ করা, পাড়ার মোড়ে চায়ের দোকানে বন্ধুদের সাথে বসে আড্ডা মারা, খুবই সাধারণ ছাপোষা বাবা মায়ের অতি মামুলি চাকরি করা সাদা মাঠা একটা ছেলে৷
আর সে? না সে খুব বড়োলোকের দুলালী নয় ঠিকই, তবুও যে সে নিজের রূপে গুনেই আজ অসাধারণ৷ একটা মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়েও যে কীভাবে পাড়ার বেশির ভাগ ছেলের স্বপ্নচারিণী হয়ে উঠতে পারে সেটা এই মেয়েকে না দেখলে কেউ বিশ্বাসই করতে পারবে না৷
অঞ্জন জানে সোমেনেরও বেশ দুর্বলতা আছে ওর ওপরে৷ সোমেনের বোন মঞ্জুরী ওর বেস্ট ফ্রেন্ড৷ বছর দুয়েক আগেও দুই বান্ধবী এক সাথেই কলেজ যেত৷ এখনও দু-জনের ভালোই বন্ধুত্ব আছে৷ সে প্রায়ই যায় মঞ্জরীর বাড়ি৷ সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করে সোমেন নিজের জমিতে ইট পেতে দেবে ভেবেছিল৷ সুবিধা হয়নি বিশেষ তাই এসব হাবিজাবি বলে এখন৷ অঞ্জন দেখতেই তো পায় কীভাবে হাঁ করা মুখ নিয়ে সোমেন তাকিয়ে থাকে ওর দিকে৷ কিন্তু ও কোনোদিন দৃকপাতও করে না এই সব পাড়ার ছোকরাদের প্রতি৷ কিন্তু অঞ্জন আশা ছাড়েনি আজও৷ কেন যেন মনে হয় একদিন ওর রাজকন্যা ঠিক ওর কাছে আসবে৷ এই সাধারণ সেলসের নতুন জোটা চাকরিটা তাই তো এত মন দিয়ে করছে ও৷ কোনো রোজগার ছাড়া কি আর স্বপ্ন দেখা যায়! তা সে হোক না কম রোজগার!
অঞ্জনের মা জানেন সবটা৷ মা বলেন—
—‘পাগল ছেলে৷ রাজকন্যাদের জন্য তো রাজপুত্রই আসে৷ আর তুই যে রাজপুত্র নোস রে সোনা৷ তাই আর ওকে ভেবে কষ্ট পাস নে৷ ওকে ভুলে যা৷ নইলে দেখবি যেদিন এক ঘোড়ায় চড়া রাজপুত্র এসে ওকে তোর চোখের সামনে থেকে নিয়ে চলে যাবে নিজের রানি করে, সেদিন তুই যে আর সহ্য করতে পারবি নে রে বাবা৷’
উফফ! সেই দিনটার কথা ভাবলেই যে অঞ্জন শিউরে ওঠে৷ সত্যি এমন কোনোদিন হলে তো ও মরেই যাবে৷ ধুর! কেন যে ও একটা রাজপুত্তর হল না!
‘ঠাম্মা তারপর কী হল রাজকুমারীর? সেই বদমাশ রাক্ষসটা কি তাকে ধরে নিয়ে যেতে পারল?’
—‘হ্যাঁ পারল তো৷ আসলে রাক্ষসটা তো ছদ্মবেশে এসেছিল৷ তাই রাজকুমারী বুঝতেও পারল না৷ তখন হল কি, সেই ছদ্মবেশী রাক্ষসটা রাজকন্যাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে নিজের ডেরায় ধরে নিয়ে গেল৷ তারপর যেই না, খসে পড়ল তার ছদ্মবেশ ওমনি তো রাজকন্যা তাকে দেখে খুব ভয় পেয়ে গেল৷ আর রাক্ষস বলল আজ তোকে আমি জল দিয়ে গিলে খাব৷ তখন রাজকন্যার সে কি কান্না! আর তো সে পালাবার কোনো পথও খুঁজে পায় না৷’
—‘তাহলে কি হল? রাজকন্যা কি মরে গেল? রাক্ষসের পেটে চলে গেল?’
—‘না গো দিদিভাই, রাজকন্যাদের কি মারা এত সহজ নাকি? রাজপুত্তর আছে না? তারপর তো রাজপুত্তর টগবগিয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে এল৷ তারপর তার রাক্ষসের সাথে লড়াই হল খুব৷ অবশেষে সে রাক্ষসকে মেরে ফেলে রাজকন্যাকে উদ্ধার করে নিয়ে গেল৷’
—‘ইশশ কী মজা! রাজকন্যা বেঁচে গেল? আচ্ছা ঠাম্মা সব রাজকন্যাদের জন্যই কি রাজপুত্তর থাকে?’
—‘থাকে তো দিদিভাই৷ এই তো যেমন তুমি একটা রাজকন্যা তাই তোমার জন্যও একদিন একটা ফুটফুটে রাজপুত্তর আসবে৷’
—‘সত্যি? সত্যি আমায় কোনো রাক্ষস ধরে নিয়ে গেলে রাজপুত্তর এসে লড়াই করবে? সত্যি?’
—‘হ্যাঁ গো দিদিভাই৷ সত্যি সত্যি সত্যি৷’
ভলভো বাসের ঠাণ্ডা আমেজে হেডফোন কানে গুঁজে সিটে গা এলিয়ে বাড়ি ফিরছিল শাওন৷ গান বাজছে ‘শুন মেরি হামসফর...’৷ গানটা শুনতে শুনতেই ওর মনটা হঠাৎ পৌঁছে গেছিল ছোটোবেলায় ঠাম্মার কাছে শোনা গল্পটার মাঝে৷
ঠাম্মা সেই রূপকথা শুনিয়ে প্রতিবারই বলত ওর জন্যও নাকি ভগবান ঠিক করে রেখেছেন এক রাজকুমার, যে একদিন এসে সব রাক্ষস খোক্কসদের হাত থেকে ছাড়িয়ে আনবে ওকে৷
আর আজ সত্যি তাই হয়েছে৷ না বাস্তবে সৌভাগ্যক্রমে কোনো রাক্ষসের দেখা মেলেনি ঠিকই কিন্তু রাজপুত্র সত্যি এসে ধরা দিয়েছে শাওনের আঁচলে৷
দিব্যই যে আসলে ওর স্বপ্ন আর কল্পনায় মিশে থাকা সেই রাজকুমার সেটা তো প্রথমে বোঝেইনি শাওন৷ খুব সাধারণ ভাবেই সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইট থেকে পরিচয় হয়েছিল ওদের৷ প্রথমে পরিচয়, তারপর আস্তে আস্তে বন্ধুত্ব৷ তখনই শাওন জেনেছিল দিব্য খুব বড়ো ব্যবসায়ী পরিবারের ছেলে৷ তবে নিজে ডাক্তারি পাশ করেছে সবে নামজাদা মেডিক্যাল কলেজ থেকে৷ ইচ্ছা আছে অল্পদিনের মধ্যেই আরও হায়ার স্টাডি করতে বিদেশ যাবার৷ দিব্যর ছবি দেখেই শাওন বুঝেছিল দিব্য বেশ হ্যান্ডসাম৷ তবে সেটা যে এতটা বেশি মাত্রায় সেটা দিব্যকে সামনে দেখার পর প্রথম বুঝেছিল শাওন৷ প্রায় ছ-ফুট লম্বা, ছিপছিপে চেহারা আর ফর্সা গালে নীলচে আভার দাড়ি আর সাথে চোখে রিমলেশ চশমা৷ পুরো সেই কহো না প্যায়ার হ্যায় এর ঋত্বিক রোশন টাইপ৷ ওকে দেখেই ওর প্রেমে ঠাস করে আছাড় খেয়ে পড়েছিল শাওন৷ ওর গা থেকে ভুরভুর করে বেরচ্ছিল দামি পারফিউমের গন্ধ৷ একটা শপিং মলে দেখা করেছিল ওরা৷ প্রথমদিনেই জোর করে দিব্য খুব দামি একটা কুর্তি কিনে দিয়েছিল ওকে আর তারপর ওকে ডিনার করিয়েছিল খুব নামজাদা দামি রেস্টুরেন্টে৷ বারবার তখন মনে হচ্ছিল শাওনের, ইশশ! যদি এই মানুষটাকে একদম নিজের করে পাওয়া যেত! কিন্তু না৷ নিজের মনের ভাব ঘুণাক্ষরেও ও বুঝতে দেয়নি দিব্যকে৷ শাওন সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে৷ দিব্যর মতো ছেলের পাশে দাঁড়ানোর ওর কী বা যোগ্যতা আছে!
সেই প্রথম সাক্ষাতের পরেও আরও দু-বার দেখা করেছিল ওরা৷ আর তখনই শাওন নিজের মনের সবটুকু হারিয়ে ফেলেছিল৷ তবুও চুপ ছিল ও৷ কথা বার্তা চলত নিজের স্বাভাবিক ছন্দেই৷ দিব্য সব রকম কথা শেয়ার করত ওর সাথে৷ নিজের স্বপ্নের কথা, ক্যারিয়ার প্ল্যানের কথা৷ পছন্দ অপছন্দ সব কিছু৷ ও বলত বিলেত থেকে পড়ে এসে ও শহরে না থেকে গ্রামে থাকতে চায়৷ সেখানকার সাধারণ গরিব মানুষদের জন্য কিছু করতে চায়৷ যাতে কেউ আর বিনা চিকিৎসায় না মরে৷ শাওন অবাক হয়ে শুনত আর ভাবত সত্যি কত আলাদা এই ছেলেটা৷
তারপর এল সেইদিনটা৷ ২৬ মে৷ দু-দিন ধরে পুরো বেপাত্তা ছিল দিব্য৷ কোনো ফোন নেই৷ চ্যাট নেই৷ রিসিভও করছে না ফোন৷ শাওন কষ্টে যখন প্রায় আধমরা তখনই সেই ২৬ মে রাত দুটোয় হঠাৎ হুড়মুড় করে হোয়াটসঅ্যাপ জ্বলে উঠল দিব্যর অনেকগুলো মেসেজ নিয়ে৷
—‘শাওন... আমি জানি না আমি কীভাবে বলব৷ জানি না আজকের পর আর আদৌ তুমি আমার বন্ধু থাকবে নাকি আমায় ভুল বুঝে চলে যাবে৷ আসলে আমি ভেবেইছিলাম যে আর কোনোদিন তোমার সামনে আসব না৷ কারন আর আমি নিজেকে লুকিয়ে রাখতে পারছি না৷ শাওন, আমি বুঝতে পারছি আস্তে আস্তে আমি বড্ড দুর্বল হয়ে পড়েছি তোমার প্রতি৷ আজকাল সব সময় তোমার কথাই মনে হয় আমার৷ তোমার সাথেই সর্বক্ষণ কথা বলতে ইচ্ছে করে৷ আমার মনে হচ্ছে তুমি ছাড়া আমি আর চলতে পারব না৷ শাওন প্লিজ আমায় ভুল বুঝ না৷ আমি তোমায় ভালোবেসে ফেলেছি৷’
নিজের চোখকে সেদিন বিশ্বাস করতে পারছিল না শাওন৷ এও কি সম্ভব! এভাবে হঠাৎ স্বপ্ন সত্যি হয়ে যায় নাকি!
সেই শুরু৷ এখন তো দিব্য ছাড়া শাওন নিজেকে জাস্ট ভাবতে পারে না৷ দিব্যর মতো ছেলের পাশে পাশে চলার আনন্দটাই আলাদা৷ দিব্য যেদিন ওকে প্রথমবার কিস করেছিল সেদিন শাওনের মনে হয়েছিল নির্ঘাত প্রজাপতির বৃষ্টি হচ্ছে ওর সারা শরীর জুড়ে৷ দিব্যর প্রতিটা স্পর্শ আর আদরই যেন বারবার সম্পূর্ণ করে তোলে ওকে৷ তবে ওর বড্ড ভয় হয় মাঝে মাঝে৷ সত্যি কি ওর কোনো যোগ্যতা আছে দিব্যর মতো ছেলের পাশে চলার? কোন খেয়ালে কে জানে এখন ফোনে ও নিজের রিং টোন সেট করেছে ‘ম্যায় তেরি কাবিল হু ইয়া কাবিল নেহি৷’
শাওন জানে এখন ওর বেশির ভাগ বান্ধবীই ওকে হিংসা করে৷ সে তো করবেই৷ অমন হিরের টুকরো বয়ফ্রেন্ড থাকলে সে ঈর্ষার পাত্রী হবে বই কী! বাবা মা-ও বারবার ওকে নিয়ে আসতে বলছেন৷ দিব্য তো বলেইছে আসবে ও পরের মাসে৷ তারপর তো আসলে ও বিদেশ চলে যাচ্ছে তিন বছরের জন্য৷ উফফ! তিন বছর দিব্য থাকবে না৷ ভাবতেই বুকটা মুচরে ওঠে শাওনের৷ অবশ্য দিব্য ফিরে এলেই বিয়েটা সেরে ফেলতে হবে বলেছে ছেলেটা৷ ততদিনে শাওনের এম. এ. টাও শেষ হয়ে যাবে৷ উফফ! বিয়ে, হানিমুন আর আদর এই নিয়ে কথা বলতে শুরু করলে আর তো কিছু লাগে না ছেলেটার৷ দিব্য বলেছে মালদিভ এ যাবে ওরা৷ অখণ্ড নির্জনতা, সমুদ্র আর শুধু ওরা দুজন ভাবতেই গায়ে কাঁটা দেয় শাওনের৷
তবে হ্যাঁ নিজেদের প্রেমের সাক্ষী সমুদ্রকে বানাতে তো পরের মাসেই একবার মন্দারমনি যাচ্ছে ওরা৷ কিছু একটা ঢপ মেরে বাবা মা-কে রাজি করাতে হবে৷ যদিও ভীষণ ভয় করছে ওর৷ তবে এটাও ঠিক যে দিব্য সাথে থাকতে কোনো ভয়ই ছুঁতে পারে না ওকে৷ ওখান থেকে ফিরে আসার পরই তো দিব্য আসবে ওদের বিয়ের ব্যাপারে কথা বলতে শাওনের বাবা মা-র সাথে৷ আর মাত্র তিন বছর৷ তারপর সত্যি রাজপুত্তরকে পেয়ে যাবে শাওন৷
ঘ্যাঁচম্যাচ করে ব্রেক কষল বাসটা৷ আর শাওনেরও সম্বিৎ ফিরল যে বাড়ি এসে গেছে৷ বাস থেকে নামতে হবে এবার৷
বাস থেকে নেমে রাস্তায় পা দিতেই কানে এল কয়েকটা পরিচিত কথা ওই চায়ের দোকানের দিকটা থেকে—
—‘গুরু ওই যে আসছে... উফফ! সত্যি গুরু তোমার চয়েসের জবাব নেই...’ ওদিকে না তাকিয়েও শাওন বুঝতে পারল ওই অঞ্জন বলে ভ্যাবলাকান্ত ছেলেটা হাঁ করে তাকিয়ে আছে ওর দিকে৷ উফফ! কী যে অসহ্য লাগে শাওনের৷ এই চায়ের দোকানে বসে থাকা ওই আলু ভাতে মার্কা ফিজিক নিয়ে কিনা শাওনের সাথে প্রেম করার স্বপ্ন দেখে ছেলেটা৷ কি অদম্য আশা! ভাবলে হাসিও পায় আবার রাগও হয় শাওনের৷ বছরের পর বছর এই একই ভাবে শাওনকে ক্যাবলার মতো ঝাড়ি মেরে যাচ্ছে ছেলেটা৷ এতেই ওর শান্তি৷ উফফ! কেন যে এরা বোঝে না যে শাওনের মতো সুন্দরীদের জন্য রাজপুত্ররা অপেক্ষা করে থাকে, তাদের জন্যই জন্ম হয় শাওনদের৷ এই সব উলু খাগড়ার কোনো জায়গা শাওনদের জীবনে থাকে না৷ থাকতে পারে না৷
অন্ধকার ঘরটায় টেবিলে মাথা রেখে ঝুম মেরে বসেছিল অঞ্জন৷ বাইরের আওয়াজ, শব্দ, আলো, গন্ধ সব জাস্ট অসহ্য লাগছে ওর৷ কী যে করবে এবার ও কিছুতেই বুঝতে পারছে না৷ মাথার ভেতরটা কেমন যেন ভোঁ ভোঁ করছে, বুদ্ধি আর কাজ করছে না৷ মঞ্জরী ঠিক কি বলতে চাইছিল? যা শুনল অঞ্জন সব ঠিকঠাক শুনল তো? নাঃ৷ কিচ্ছু বুঝতে পারছে না অঞ্জন৷ তাহলে কি সব শেষ হয়ে যাবে এবার এভাবে? অঞ্জন কি কিচ্ছু করতে পারবে না? কিন্তু কিছু তো একটা ওকে করতেই হবে? কিন্তু কি সেটা? এই পরিস্থিতিতে এখন কিই বা করতে পারে অঞ্জন৷
খট করে একটা শব্দ টের পেল অঞ্জন নিস্তব্ধ ঘরটায় আর অমনি ঘর ভরে উঠল ফ্যাটফ্যাটে সাদা টিউব লাইটের আলোয়৷
—‘অঞ্জনদা...’ মঞ্জরী এসেছে বুঝতে পারল অঞ্জন৷
আস্তে আস্তে মাথা তুলল ও৷ ভেজা চোখ দুটো রক্তের মতো লাল প্রায়৷
মঞ্জরী খেয়াল করল না বোধ হয়৷
—‘অঞ্জনদা তোমাকে আমার অনেক কিছু বলার আছে৷ বিশ্বাস কর হাতে আর সময় সত্যি বেশি নেই৷ তুমি প্লিজ আমায় ফিরিয়ে দিও না অঞ্জনদা৷ তুমি ছাড়া এখন আমার এই কথা আর কে শুনবে বল?’
অঞ্জন দেখল মঞ্জরীর গলা কাঁপছে৷ এবার আস্তে আস্তে দরজার দিকে এগোল ও৷ নিঃশব্দে আলতো করে ভেজিয়ে দিল ঘরের দরজাটা৷
হাতে ফুটে থাকা মেহেন্দির নক্সাগুলোর দিকে ঝাপসা দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল শাওন৷ এই মুহূর্তে এই ঘরে ও সম্পূর্ণ একা৷
বর এসে গেছে বর এসে গেছে রব শুনেই যথারীতি সবাই দৌড়ছে বর দেখতে৷ সেই গতানুগতিক প্রথা মেনে বর দেখার উন্মাদনায় কনেকে একা বসিয়ে চলে যাওয়া৷
—‘ম্যায় তেরি কাবিল হু ইয়া... কাবিল নেহি...’
—‘হ্যালো’ মোবাইল কানে চাপল শাওন৷
—‘শাওন প্লিজ আমার ওপর রাগ করিস না রে৷ আজ আমার দিল্লিতে এই পরীক্ষাটা পড়ে না গেলে আমি সত্যি থাকতাম তোর বিয়েতে৷ প্লিজ আমায় ভুল বুঝিস না৷ কিরে শুনতে পাচ্ছিস? দেখিস সব ঠিক হয়ে যাবে৷’
শাওন অনেক কিছু বলতে চাইল ওর বেস্ট ফ্রেন্ডকে৷ কিন্তু বলতে পারল না৷ কেমন যেন সব তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে৷ বুকের মাঝে একরাশ কষ্ট আর গলার কাছে আটকে থাকা এক দলা কান্না কিচ্ছু বলতে দিচ্ছে না শাওনকে৷ বুকের ভেতর কেমন ঢিপ ঢিপ করে উঠল শাওনের৷ সেই এক সুর যেন খেলছে মঞ্জরীর গলায় ঠিক দেখিস সব ঠিক হয়ে যাবে৷’ ঠিক এই কথাটার পরেই তো শাওন সেদিন সপাটে চড় বসিয়ে ছিল নিজের সবচেয়ে প্রিয় বান্ধবীর গালে৷
আবার... আবার... না চাইতেও হুশ করে শাওনের মনটা পিছিয়ে গেল সেই কালো সময় আর মুহূর্তগুলোর মাঝে৷
স্বপ্নের মানুষটার সাথে সমুদ্রের কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়াটা যে কি স্বপ্নিল ব্যাপার সেটা শাওন বুঝতে পেরেছিল দিব্যর সাথে একান্তে মন্দারমনি পৌঁছে যাবার পর৷ সবটাই কেমন যেন স্বপ্নের মতো লাগছিল৷ সমুদ্র, আকাশ, বালি, ঝিনুক আর পাশে দিব্য, আর ক্ষণে ক্ষণেই দিব্যর পাগল করা আদর৷ পুরোপুরি ভেসে গেছিল শাওন৷ নিজেকে সামলাতে পারেনি আর৷ নিজের সবটুকু দিয়ে দিয়েছিল দিব্যকে৷ সেদিন ওর মনে হয়নি ব্যাপারটা একটুও খারাপ৷ যেটা দিব্যরই সেটা ওকে দিতে বাধাটাই বা কোথায়? এতে ভুল তো নেই৷
কিন্তু ঠিক ভুলের হিসাবটা যে এতটা সহজে মিলান যায় না সেটা শাওন প্রথম বুঝতে শুরু করেছিল মন্দারমনি থেকে ফেরার পর৷ হঠাৎই কেমন যেন একটু একটু করে বদলে যেতে শুরু করল দিব্য৷ দেখা করতে চায় না, বেশি কথা বলতে চায় না, চ্যাট করতে চায় না এমনকী শাওন ফোন করলেও কাজের অজুহাতে দু-একটা কথা বলেই এড়িয়ে যেতে চায় ওকে৷
কষ্টে পাগল হয়ে যেদিন শাওন একরাশ কান্না বুকে নিয়ে ওকে বলেছিল—
—‘দিব্য, কেন এমন করছ তুমি? আমি কি কিছু ভুল করেছি? যদি আমি কিছু অন্যায় করে থাকি না বুঝে তাহলে প্লিজ আমাকে বক, মার বা যা ইচ্ছে শাস্তি দাও৷ কিন্তু প্লিজ এভাবে আমায় দূরে ঠেলে দিও না৷’ কথাগুলো বলার সময় সেদিন ঝর ঝর করে কেঁদে ফেলেছিল শাওন৷ তবুও দিব্য সেই একইভাবে ভাবলেশহীন গলায় বলেছিল—
—‘প্লিজ শাওন বারবার ফোন করে বিরক্ত কোরো না তো আমায়৷ তুমি তো জানই জাস্ট একমাসের মধ্যেই মানে ২৭ নভেম্বর লন্ডন যাচ্ছি আমি, তাই এই সময়ে যে আমি চরম ব্যস্ত থাকব আর তোমার এসব ইমোশনাল ড্রামার জন্য যে আমার হাতে সময় থাকবে না সেটা কি বোঝার মতো বুদ্ধিটুকুও নেই নাকি তোমার?’
—‘আমি জানি তুমি বিদেশ যাচ্ছ৷ কিন্তু আমার বাড়িতে যে তার আগে তোমার আসার কথা আমাদের বিয়ের ব্যাপারে কথা শুরু করার জন্য৷ বাবা মা যে বারবার জিজ্ঞাসা করছেন৷ কবে আসবে তুমি?’
—‘ওনাদের বল বড়োলোক বাড়িতে মেয়েকে ভিড়িয়ে দেবার প্ল্যান করে সেটা নিয়ে এত বেশি উত্তেজিত না হতে৷ ধৈর্য ধরুক৷ সময় হলে ঠিকই পাবে আমার দেখা৷’ দিব্যর ইস্পাত কঠিন নিষ্ঠুর কথাগুলো শুনে সেদিন কেঁপে গেছিল শাওন৷ এসব কি বলছে ও? একি আদৌ ওর সেই চেনা দিব্য? কেমন যেন সিটিয়ে গেছিল সেদিনের পর থেকে শাওন৷ আর কোনো যোগাযোগ করতে পারেনি নিজের থেকে দিব্যর সাথে এর পর৷ শুধু রাতের পর রাত ওই আকাশের বুকে জেগে থাকা তারাগুলোকে সাক্ষী রেখে নিজের চোখের জলে বালিশ ভিজিয়ে গেছে৷ আর অপেক্ষা করে গেছে পাগলের মতো শুধু দিব্যর একটা ফোনের৷ কিন্তু না৷ আর কোনো ফোন আসেনি৷ সেই ২৭ নভেম্বর তারিখটা পেরিয়ে যাবার পর শাওন শুধু বুঝতে পেরেছিল যে ও নিঃস্ব হয়ে গেছে৷ দিব্য এখন ওর জন্য অনেক দূরের একটা নাম৷ সে তো আসলে ওর কোনোদিনই ছিল না৷ দিব্যর ফেসবুক, স্কাইপ সব প্রোফাইল হাওয়া, ফোন নম্বর ইনঅ্যাকটিভ৷ মনে হয় যেন দিব্য বলে কেউ কোনোদিন ছিলই না শাওনের জীবনে৷ সবটাই যেন ছিল ক্ষণিকের কল্পনা৷
না, কল্পনা নয়৷ দিব্য ভীষণভাবে একটা কালো বাস্তব ছিল শাওনের জীবনে৷ তাই তো ঠিক ২৭ ডিসেম্বর হঠাৎ মাথা ঘুরে বাথরুমে পড়ে গেল শাওন৷ বমিও হল অনেকটা৷ ডাক্তার এসে বললেন যে শাওনের কালো বাস্তব তার চরম অভিশাপের সাক্ষ্য চিহ্ন পুঁতে দিয়েছে শাওনের শরীরে৷
—‘বল বল কবে করলি এসব সর্বনাশ তুই? পারলি এত নীচে নামতে? তুই কি মানুষ? বল কে? কে করেছে এই সর্বনাশ? কে দিব্য? কোথায় সে? কবে আসবে? বল কীভাবে মুখ দেখাব এবার আমরা সমাজে? এই অবৈধ বাচচার কী পরিচয় হবে? উফফ! ভগবান! এবার যে গলায় দড়ি দিতে হবে আমায়?’ মায়ের একলক্ষ প্রশ্ন আর বাবার নিথর অবস্থা সেদিন আরও বেশি বিবশ করে দিয়েছিল শাওনকে৷ কিন্তু তবুও মায়ের প্রশ্নের কোনো উত্তরই দিতে পারেনি ও৷ কি বা বলার ছিল ওর? দিব্য এই সন্তানের বাবা সেটা বলতে পারেনি সেদিন শাওন কিছুতেই৷ যে মানুষটা একটা ছেঁড়া জুতোর মতো ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে শাওনকে তার কথা বলবে শাওন! আর বলবেই বা কি? সে কোথায় তাও কি জানে নাকি ও৷
মায়ের আর্তনাদ আর বাবার থমথমে মুখ এর মধ্যে থেকেই একটুকরো আড়াল খুঁজে সেদিনই বিকেলে ও চলে গেছিল নিজের বেস্ট ফ্রেন্ড মঞ্জরীর বাড়ি৷ নিজের সন্তানকে আশ্রয় দেবার আর তাকে বাঁচিয়ে রাখার শেষ চেষ্টা যে করতেই হবে ওকে৷ ও যে মা৷ মা তো সন্তানকে উপেক্ষা করতে পারে না৷ নিজের লজ্জা ঘেন্না ভুলে সবটুকু জানিয়েছিল মঞ্জরীকে৷
—‘মঞ্জু তুই প্লিজ বাঁচা আমায়৷ আমি জানি তুই পারবি৷ কাকু মানে তোর বাবার পলিটিক্সে তো অনেক বড়ো হাত আছে৷ তাই কাকু চাইলেই পারবেন আমায় একটা চাকরি জোগাড় করে দিতে৷ যে কোনো কাজ করব আমি৷ আমি সব পারব৷ প্লিজ তুই আমায় ফিরিয়ে দিস না৷ আমি আর তাহলে কোথায় যাব বল৷ আমি যে বাবা মা-কে এই অসম্মানের অন্ধকারে ঠেলে দিতে পারব না৷ তাই একটা ব্যবস্থা যে আমার বড্ড দরকার৷’
—‘এসব কি বলছিস তুই শাওন? তোর শরীরের এই অবস্থায় তুই চাকরি করবি? তুই কি পাগল হয়ে গেছিস? আর তা ছাড়া অভিজ্ঞতাবিহীন শুধু গ্র্যাজুয়েট একটা মেয়ের চাকরি পাওয়া অত সোজা নাকি আজকের বাজারে? আর পেলেও বা কটা টাকা মাইনে পাবি সেখানে? তাতে কি হবে তোর? শোন শাওন তার চেয়ে এই ভালো যে বাড়িতে সব কথা খুলে বল৷ বাচচাটাকে এবোরট কর৷’
—‘না মঞ্জু৷ প্লিজ ওকথা বলিস না৷ এটা আমি পারব না৷ আমি বাড়িতেও আমার এই লজ্জার কথা বলতে পারব না রে৷’ দু-হাতে মুখ ঢেকে কান্নায় ভেঙে পড়েছিল শাওন সেদিন৷
কয়েক মিনিট চুপ থেকে মঞ্জরী বলেছিল—
—‘তাহলে আর একটাই উপায় আছে শাওন৷ অঞ্জনদা৷ তুই অঞ্জনদা-র কাছে যা৷ সব কথা ওকে খুলে বল৷ ও তোর পাশে দাঁড়াবেই রে শাওন৷ ও যে তোকে পাগলের মতো ভালোবাসে৷ ও তোকে ফেরাবে না৷ তোর কোনো ক্ষতি হতে দেবে না ও৷ তুই যদি না বলতে পারিস তাহলে আমি যাব ওর বাড়ি৷ আমি গিয়ে সবটা বলব ওকে৷’
এই কথাটায় মাথাটা দাউদাউ করে জ্বলে গেছিল শাওনের৷ বিপদে পড়েছে বলে মঞ্জরী কি ভাবছে ওকে? নরকের কীট? ঠাস করে মঞ্জরীর গালে একটা চড় মেরে সেদিন শাওন বলেছিল—
—‘আজ তুই চিনিয়ে দিলি যে তুই কেমন বন্ধু? বিপদে পড়ে তোর কাছে সাহায্য চেয়েছি বলে তামাশা করছিস আমায় নিয়ে? ছিঃ এই তুই আমার বেস্ট ফ্রেন্ড৷’
ওদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে হনহন করে পা চালিয়ে বাড়ি আসতে আসতেই ঠিক করে নিয়েছিল শাওন কী করবে ও এবার৷ হ্যাঁ অনেক হয়েছে৷ আর নয়৷ এই নোংরা পৃথিবীতে আর বাঁচতে চায় না ও৷ সত্যি মৃত্যুর পরের পৃথিবীটার খোঁজেই বেরোবে এবার ও৷
—‘কিরে দিদিভাই কনে সেজে একা একা বসে কী ভাবছিস? আর বাকি সব কোথায়? বর দেখতে ছুটেছে বুঝি?’
ঠাকুমার গলার স্বরে এক নিমেষে যেন সেই অতীতের অন্ধকার সময় ছিঁড়ে আবার আজকের বাস্তবে এসে পড়ল শাওন৷ ঠাকুমা! একমাত্র এই মানুষটাকেই সবটুকু সত্যি বলতে পেরেছিল শাওন৷ শুধু ঠাকুমাই ওকে বলত সেই সময়েও—
—‘দেখিস দিদি, খারাপ সময় ঠিক কেটে যাবে৷ তুই ভুল করেছিস ঠিকই, কিন্তু পাপ করিসনি৷ কাউকে ভালোবাসা আর বিশ্বাস করা যদি পাপ হত তাহলে যে চন্দ্র সূর্য মিথ্যা হয়ে যেত৷ তবে হ্যাঁ ভুল মানুষকে বিশ্বাস করা ভুল৷ তাই আজ তোর এত কষ্ট৷’
—‘ওরে কনে বউ রে, তোর রাজপুত্তুর এর যে আজ আর তর সইছে নে রে তার বউটাকে দেখার জন্য এই লাল টুকটুকে শাড়িতে৷’ বলেই আবার ফোকলা দাঁতে খিক খিক হাসল বুড়ি৷
—‘রাজপুত্তুর মানে? কে রাজপুত্তুর?’ ঘড়ঘড়ে গলায় বলল শাওন৷
—‘ওরে পাগলি রে তোর রাজপুত্তুর৷ যার কথা তোকে বলেছি সেই ছোট্ট থেকে৷ আজ যে তার তোর আঁচলে বাঁধা পড়ার দিন৷
—‘আমার রাজপুত্তুর!’ চোখের সামনে এবার শাওনের ভেসে উঠছে একটা ফোলা ফোলা ফর্সা মুখ, চোখে তার গোল গোল চশমা আর মুখে লেগে রয়েছে একটা সরল হাসি যে সবসময়, না জানি সেই কোন কাল থেকে শুধু শাওনকে একটু চোখের দেখা দেখতেই ব্যাকুল৷
সেই দিনটায়... সেই দিনটায় যেদিন মঞ্জরীর সাথে রাগারাগি করে, ওকে থাপ্পড় মেরে বুকে একরাশ যন্ত্রণা নিয়ে আবার ঘরে ফিরে এসেছিল শাওন; সেদিন ফিরে ঘরের দরজা বন্ধ করে নিজেকে শেষ করে ফেলার ভাবনা চিন্তাই করছিল ও৷ নানা ভাবনা চিন্তা তোলপাড় করে দিচ্ছিল ওর বুকের ভিতর৷ কিন্তু হঠাৎ ভাবনার ঝড়টা থমকে গেছিল বাইরের ঘর থেকে ভেসে আসা অনেক চেঁচামেচির শব্দে৷
খুট করে সন্তর্পণে দরজা খুলে বাইরে বেরোতেই শুনতে পেয়েছিল বাবার গলা—
—‘জানোয়ার ছেলে৷ পাড়ার ছেলে হয়ে তুমি সর্বনাশ করলে আমাদের৷ তোমায় পুলিশে দেব আমি৷ দেখি কোন বাপ বাঁচায় তোমায়৷’
—‘কাকু আমি জানি আমরা খুব বড়ো অন্যায় করে ফেলেছি৷ আপনি যা খুশি শাস্তি দিতে পারেন আমায়৷ কিন্তু প্লিজ বোঝার চেষ্টা করুন একবার৷ আমায় পুলিশে দিলে আমি তো শাস্তি পাবই, কিন্তু আরও বেশি বড়ো শাস্তি পাবে শাওন৷ অনেক বদনাম হবে ওর৷ হয়তো দুঃখে অভিমানে মেয়েটি নিজের বড়ো কোনো ক্ষতি করে ফেলবে৷’
—‘শয়তান নোংরা ছেলে৷ আমি ছাড়ব না তোমায়৷’ মা’ও ঠাস ঠাস করে চড় মারছিল ওকে৷ আর নীরবে দাঁড়িয়ে সব অপমান সহ্য করছিল সেই ছেলেটা, বিনা দোষে৷
শাওন স্থবির হয়ে গেছিল পুরো দৃশ্যটায়৷ ওরা গলা আটকে গেছিল, মুখ থেকে কথা সরছিল না৷ ও চিৎকার করে বলতে চাইছিল—
—‘এসব মিথ্যা, সব ভুল৷’ কিন্তু কেন কে জানে সব শব্দ সেদিন বেইমানি করেছিল ওর সাথে৷
পরেরদিন সন্ধ্যায় ও সোজা হানা দিয়েছিল ছেলেটার বাড়ি৷ ওর ঘরে ঢুকে ওর ওপর আছড়ে পড়েছিল ঝড়ের মতো৷
—‘আমি জানি মঞ্জরী তোমায় বলেছে আমার ব্যাপারে৷ কিন্তু তুমি এসব করে কি প্রমাণ করতে চাইছ অঞ্জন? এত সাহস হল কী করে তোমার? আমার জীবনের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবার তুমি কে? কোনো জায়গা নেই তোমার আমার জীবনে৷ কোনোদিনও থাকবে না৷ বুঝতে পেরেছ?’
—‘আমি তো কোনোদিন তোমার জীবনে জায়গা চাইনি৷ ভাবিওনি আর ভাববও না৷ কিন্তু তা বলে তোমায় চোখের সামনে একটু একটু করে জ্বলে পুড়ে মরতেও দেখতে পারব না৷ কারণ... কারণ...৷ সে যাই হোক, আমি জানি আমি তোমার যোগ্য নই আর হতেও পারব না৷ যা করেছি তা শুধুই এই কঠিন পরিস্থিতিটাকে সামাল দেবার জন্য৷ আজ তোমার একজন স্বামীর পরিচয় দরকার, না তোমার জন্য নয়৷ যে আসছে তার বেঁচে থাকার জন্য এই সমাজে৷ সে চলে আসার পর, পরিস্থিতি সামলে ওঠার পর তুমি যা চাইবে তাই হবে৷ তুমি চাইলে ডিভোর্স দিয়ে দেব আমি৷ তারপর তুমি নতুন ভাবে বাঁচতেই পার নিজের ইচ্ছামতো৷ কথা দিচ্ছি আমি কোনো বাধা হব না তোমার৷ এখন শুধু আমাদের সন্তানের কথা ভেবে সবটা মেনে নাও তুমি৷’
খুব কেটে কেটে কথাগুলো উচচারণ করেছিল সেদিন শাওনের দেখা সেই আপাত ক্যাবলা ছেলেটা৷ অবাক হয়ে গেছিল শাওন৷ কে এ? কী বলছে এ সব? বিনা দোষে অন্য কারোর কলঙ্ক মাথায় নিয়ে এভাবে কেউ নিজেকে দুনিয়ার সামনে ছোটো করতে পারে নাকি? এ কেমন মানুষ? এত শক্তি কোথায় পাচ্ছে এই ছেলেটা? মনে পড়েছিল সেদিন শাওনের ছোটোবেলায় শোনা ঠাকুমার সেই গল্প, রাক্ষসের হাত থেকে রাজপুত্র এসে রক্ষা করত রাজকন্যাকে৷ আবার রাজকন্যা ফিরে পেত নতুন জীবন?
—‘অঞ্জন... অঞ্জন... আমি তোমার মতো মানুষের যোগ্য নই৷ আমি যে নষ্ট হয়ে গেছি৷ আমায় ভালোবাসতে পারবে তুমি সত্যি করে? নাকি তোমার ঘেন্না আর দয়া নিয়েই বাঁচতে হবে আমায় বাকি জীবন? আসলে আমি যে ঘেন্নারই যোগ্য৷’ কান্নায় ভেঙে পড়া শাওন সেদিন বলেই ফেলেছিল কথাগুলো শেষমেষ৷ আছড়ে পড়েছিল ও সেদিন অঞ্জনের বুকে একটুকরো বিশ্বাসে ভরা নিরাপদ ভালোবাসার খোঁজে৷ অঞ্জনের দু-হাত ছুঁয়ে যাচ্ছিল ওর মাথায় পরম আশ্বাসের স্পর্শ হয়ে, আর শাওনের দু-চোখ ছাপিয়ে বন্যা এসে ভাসিয়ে দিচ্ছিল ওর সব গ্লানি৷
—‘কিরে দিদি চোখে জল কেন তোর? আজ যে খুশির দিন৷ লগ্ন যে প্রায় এসেই গেল৷’ আবার বলল ঠাকুমা আদরের নাতনির চোখ মুছিয়ে দিতে দিতে৷
—‘আমি সুখী হতে পারব তো? অঞ্জনকে সুখী করতে পারব তো বল৷’ আকুল হয়ে জিজ্ঞাসা করল শাওন৷
—‘রাজপুত্তর এসে গেছে যে, আর চিন্তা কীসের৷’ আবার বলল বুড়ি৷
—‘রাজপুত্তররা শুধু গল্পে নয়, আমাদের জীবনেই থাকে তাই না ঠাকুমা? শুধু অনেক সময় আমরা চিনে নিতে পারি না কেন কে জানে?’ ঠাকুমার গলা জড়িয়ে সেই ছোট্টবেলার মতো খিলখিল করে আবার হাসল শাওন অনেকদিন পর৷ আজ যে ওর সত্যিকারের নিজের মানুষটাকে পাবার দিন, ঠিক সেই রূপকথার গল্পগুলোর রাজকন্যাদের মতোই৷
___
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন