চামড়ার মুখোশ

পল্লবী সেনগুপ্ত

লাইব্রেরিতে একলা বসে বসে নোটস তৈরি করছিল রুনু৷ বাইরে জোরে বৃষ্টি পড়ছে আজ৷ ঘুটঘুটে কালো অন্ধকার যেন আচ্ছন্ন করে রেখেছে পৃথিবীটাকে৷ আর মাঝে মাঝেই কান ফাটান শব্দে বাজ পড়ে খানখান করে দিচ্ছে ফালি লাইব্রেরি ঘরখানার স্তব্ধতা৷

আজ সকাল থেকে আকাশের মুখ ভার৷ তাই কলেজে আজ উপস্থিতির হারও ছিল কম৷ কিন্তু তবুও রুনু কামাই করেনি৷ কারণ ওর কামাই করতে ভালো লাগে না৷ কী হবে কামাই করে? কামাই করা মানেই তো সারাদিন লেডিজ পিজির ঘরে পড়ে থাকা আর সুহানা, মলি, রিক্তা ওদের হাসির খোরাক হওয়া৷

হ্যাঁ রুনু ওদের কাছে হাসি ঠাট্টার পাত্রী৷ একটা অজ গ্রাম থেকে কলকাতা শহরে পড়তে এসেছে ও৷ গরিব ঘরের মেয়ে৷ ওদের মতো দামি জামা কাপড় যেমন ওর নেই, তেমনই ও জানে না শহুরে আদপ কায়দা আর চলন বলনও৷ ওরা সবাই যখন ওদের অবস্থাপন্ন পরিবারের গল্পে পিজি মাতিয়ে রাখে, তখন রুনু শুধুই নীরব শ্রোতা৷ সত্যি তো কী আর বলবে ও? ওর তো বলার মতো তেমন কিছুই নেই৷ তাই এমন একটা মেয়ে হাসি ঠাট্টার খোরাক হবে বই কী৷

সুহানা এর মধ্যে সব থেকে বেশি উগ্র৷ আর রুনুকে নিয়ে মজা করতে ওই সব থেকে বেশি ভালোবাসে৷ রুনু আগে কষ্ট পেত৷ কিন্তু এখন অনেকটা অভ্যাস হয়ে গেছে ধীরে ধীরে৷ ও বুঝে গেছে এই শহরে এগুলো মানিয়ে নিয়েই চলতে হবে ওকে৷

তবে হ্যাঁ এই শহরটা যে রুনুকে কিছু দেয়নি এমন বলতে পারবে না রুণু৷ বিকাশ যে ওর এক পরম পাওয়া৷ রুণু জানে না বিকাশ কেন এমন পাগলের মতো ভালোবাসে ওকে৷ মাত্র সাড়ে পাঁচ মাসেই বিকাশ বড্ড আপন হয়ে গেছে ওর৷

—‘আর কত দেরি? বাড়ি যাবে না?’ একটা খোনা গলার স্বরে চমকে উঠল রুনু৷

লাইব্রেরিয়ান অজিত পাণ্ডে মুখে একটা অদ্ভুত হাসি ঝুলিয়ে দাঁড়িয়ে রুনুর একদম সামনে৷ অদ্ভুত একটা নোংরা লোলুপ চাহনি যেন ঝরে পড়ছে লোকটার দু-চোখ বেয়ে যেটা ছুঁয়ে যাচ্ছে রুনুর শরীর৷

—‘হ্যাঁ এই তো আর মিনিট দশেক৷’ শুকনো গলায় বলল রুনু৷

হে হে হে... অদ্ভুতভাবে হাসল লোকটা৷

রুনুর সারার শরীর ভয়ে গুলিয়ে উঠল৷ কলেজ বোধ হয় প্রায় ফাঁকা৷ বাইরে অবিশ্রান্ত বর্ষণ আর এই অদ্ভুতে টিমটিমে আলো জ্বলা তিনতলার কোণার একদিকের এই লাইব্রেরী ঘরটা৷ হাত চালিয়ে নোটটা শেষ করতে লাগল রুনু৷ কিন্তু হঠাৎ চমকে উঠল রুনু দড়াম একটা শব্দে৷ পাণ্ডে বন্ধ করছে লাইব্রেরির দরজা৷

—‘একী দরজা বন্ধ করছেন কেন?’ কেঁপে গলা রুনুর গলা৷

কোনো উত্তর না দিয়ে এক পা এক পা করে এগিয়ে আসছে পাণ্ডে রুনুর দিকে৷ শরীর কাঁপছে রুনুর৷ হঠাৎ ঝপ করে নিভে গেল ঘরের আলোটাও৷

আতঙ্কে ভয়ে টেবিল খামচে ধরল রুনু৷ ও বুঝতে পারছে পাণ্ডে এবার ওর একদম সামনে৷

—‘না৷ না বলছি৷ আর এক পাও এগোবেন না বলছি৷’ যদি এগোন আমি কিন্তু...

না৷ শেষ হল না রুনুর কথা৷ তার আগেই একটা বীভৎস চিৎকার ছিটকে এল—

—‘আআআ...৷’ মরণ চিৎকার করছে পাণ্ডে৷

দপ করে আবার জ্বলে উঠল আলো৷

—‘উফফ! মাগো!’ ভয় আতঙ্কে এবার নীল হয়ে গেছে রুনুর শরীর৷ রুনুর সামনেই পড়ে রয়েছে পাণ্ডের অচেতন দেহ৷ গলার কাছে খুবলানো মাংস৷ গর্ত হওয়া জায়গা থেকে ফিনকি দিয়ে বের হচ্ছে রক্ত৷

কী হয়ে গেল হঠাৎ? কে মারল পাণ্ডেকে? কোথায়ই বা গেল আততায়ী? সব গোলমাল হয়ে যাচ্ছে রুনুর মাথার মধ্যে৷ সবাই কি তাহলে এবার রুনুকে ধরবে? কিচ্ছু বুঝতে পারছে না রুনু৷

না পালাতে হবে৷ এক্ষুনি৷ শুধু এইটুকুই এখন বুঝতে পারছে ও৷ হ্যাঁ এখন পালাতে হবে এই জায়গা থেকে৷

পাগলের মতো ছুটতে ছুটতে কলেজ থেকে বেরিয়ে এল মেয়েটা৷ বৃষ্টিতেই ছুটছে৷ খেয়াল নেই যেন আর কোনো দিকে৷

বিছানার ওপর জড়সড় হয়ে বসেছিল রুনু৷ কলকাতায় এই সবে কিছুদিন হলই তো ও এসেছে৷ কিন্তু তার মধ্যে যে এভাবে বিপদ ধাওয়া করবে ওকে সেটা ও ভাবতেই পারেনি৷ কয়েক মাস আগেই ঘটে গেল লাইব্রেরির সেই বীভৎস ঘটনা৷ একটা জল ঝড়ের রাতে ওরই চোখের সামনে খুন হয়ে গেল ওদের লাইব্রেরিয়ান৷ কিন্তু সত্যি চোখের সামনে কি? রুনু তো সত্যিই জানত না কে আততায়ী? ও তো দেখেইনি কিছু৷ খুনের ঠিক আগের মুহূর্তটাতেই তো ঘুটঘুটে অন্ধকার হয়ে গেছিল সব কিছু৷ কিন্তু কাউকে সে কথা বিশ্বাসই করাতে পারেনি ও৷ থানা পুলিশ কোর্ট কাছারির গেড়োতে এখনও আটকে আছে ও৷ সে সব মিটতে না মিটতেই আবার এই বীভৎস ঘটনা!

আজ শরীরটা ভালো নেই রুনুর৷ তাই আজ ও কলেজ যায়নি৷ আর আজই আবার কী একটা কারণে ছুটি নিয়েছিল সুহানাও৷ গোটা দিনটা এই ফাঁকা পিজিতে সুহানার সাথে সারাদিন থাকতে হবে ভেবেই মনটা বিরক্তিতে ভরে যাচ্ছিল ওর৷ তাই কতকটা বিরক্ত মুডেই স্নান ঘরে ঢুকেছিল ও৷

স্নান করতে করতে হঠাৎই রুনুর কানে আছড়ে পড়েছিল ভয়ার্ত একটা চিল চিৎকার৷ মরণ আর্তনাদ করছে সুহানা৷ ভিজে গায়েই তড়িঘড়ি বাথরুম থেকে বেরিয়ে এসে আঁতকে উঠেছিল রুনু৷ বিশ্বাস করতে পারছিল না নিজের চোখকে৷

মেঝের ওপর পড়ে রয়েছে সুহানার রক্তাক্ত দেহ৷ চোখ দুটো ঠিকরে আসছে৷ গলার কাছে একটা মাংস খুবলান গর্ত৷ রক্তে ভেসে যাচ্ছে মেঝে৷

বীভৎস দৃশ্যটা দেখে টলে পড়েই যাচ্ছিল রুনু৷ কোনোরকমে নিজেকে সামলে নিয়ে শুধু বিকাশকে ফোন করেছে একটা৷

—‘বিকাশ, বিকাশ প্লিজ একবার এসো আমার পিজিতে৷ আমি একাই আছি এখন৷ প্লিজ বিকাশ৷ কেন ডাকছি সেটা তুমি এলেই বলব৷’ হ্যাঁ শুধু এইটুকুই ও বলেছে বিকাশকে আপাতত৷

টিং টং! কলিং বেলের শব্দে চমকে উঠল রুনু৷ উঠে গিয়ে খুলে দিল দরজাটা৷ বিকাশ এসে গেছে৷

—‘কী হয়েছে রুনু? হঠাৎ এমন জরুরি তলব? কোনো প্রবলেম নাকি তুমি... একীইই!! বীভৎস মৃতদেহটা দেখে আঁতকে উঠেছে বিকাশ৷ ভয়ে সাদা হয়ে গেছে ওর মুখ৷

—‘এটা কি রুনু? কীভাবে?’

বাচচা মেয়ের মতো বিকাশের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ল এবার রুনু৷ শক্ত হাতে আঁকড়ে ধরল ওকে৷

—‘বিশ্বাস কর বিকাশ আমি জানি না৷ আমি কিচ্ছু জানি না৷ আমি সত্যি জানি না৷ আমি জানি না কে এভাবে খুন করল সুহানাকে৷ কে এই অদৃশ্য হত্যাকারী আমি জানি না৷ আমি বুঝতে পারছি না কে আমায় ফাঁসানোর চেষ্টা করছে?’ পাগলের মতো মাথা ঝাঁকাচ্ছে রুনু৷

—‘রুনু, আমায় ছাড় বলছি৷’ রুনুর বাহুপাশে আবদ্ধ হয়ে আজ যেন দম বন্ধ হয়ে আসছে বিকাশের৷

—‘না বিকাশ আমি তো তোমায় ছাড়ব বলে ধরিনি৷’

—‘আমার লাগছে৷ আমার লাগছে রুনু৷ আআ৷’ বীভৎস চিৎকার ছিটকে এল বিকাশের গলা চিরে৷

এবার হালকা হয়ে এল রুনুর বাহুপাশের বন্ধন৷ আস্তে আস্তে এলিয়ে পড়ছে মেঝেতে বিকাশের প্রাণহীন দেহটা৷ গলার কাছে খোবলানো গর্ত৷ রক্ত বেরোচ্ছে ভক ভক করে৷

রুনু একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল দেহটার দিকে খানিকক্ষণ৷ সিনেমার ফ্ল্যাশব্যাকের মতো অনেক টুকরো দৃশ্য ভেসে উঠছে ওর চোখের সামনে৷ অনেকগুলো মিষ্টি দুপুর আর বিকাল৷ অনেকগুলো হাতে হাত আর চোখে চোখ রাখার মুহূর্ত৷

বিকাশের বুক পকেট থেকে মোবাইলটা টেনে বের করল রুনু৷ আবার খুলল হোয়াটসঅ্যাপের সেই ম্যাসেজটা, যেটা দু-দিন আগে প্রথম বিকাশের চোখ এড়িয়ে নজরে আসে রুনুর৷

বিকাশ লিখেছে ওর বন্ধু দীপককে—

—‘আরে ভাই রুনুর মতো গেঁয়ো মেয়েকে বিয়ে করা যায় নাকি? ওর সাথে শুধু টাইমপাস করছি৷ এরপর সুযোগ বুঝে ওর শরীরটাকে ভোগ করে নেব৷ তারপর আর খুঁজেই পাবে না আমাকে ও৷ আর ওর মতো মেয়ের অত ক্ষমতা নেই আমাকে খুঁজে বের করার৷’

হাঁটু গেড়ে এবার টাটকা মৃতদেহের সামনে বসে পড়ল রুনু৷ দু-হাতের আঁজলা ভরে তুলে নিল অনেকখানি তাজা রক্ত৷ তৃপ্তি করে পান করল সেই রক্ত সুধা৷

এবার ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল দেওয়ালের লম্বা আয়নাটার সামনে৷ একটানে ছিঁড়ে ফেলল মুখে সাঁটা চামড়ার মুখোশটা৷ ধীরে ধীরে সারা শরীর থেকে খসে পড়ছে ওর মানুষ নামক প্রজাতির খোলস৷

এবার বেরিয়ে এল ইরুককুকিরিস৷ হ্যাঁ৷ ইরুককুরিরিস এই গ্রহের বাসিন্দা নয়৷ অনেকগুলো ছায়াপথ, গ্রহ, উপগ্রহ পেরিয়ে এসেছিলও এখানে৷ এখানে এসেই ও প্রথম পেয়েছে ‘মানুষ’ নামক প্রাণীটার রক্তের স্বাদ৷ উফফ! কী ব্যাপক স্বাদ!

তখন থেকে ঠিক করে নিয়েছে ও৷ নিজের ক্ষমতার জোরে চামড়ার মুখোশ পরে আর সারা শরীরকে মানুষের চামড়ায় ঢেকে ঘুরে বেড়াবে ও গোটা পৃথিবীটা৷ মানুষের ছদ্মবেশে থাকতে থাকতে সামনে পাওয়া শয়তান মানুষ খুঁজে বের করে নিজের রক্ত পিপাসা মিটাবে ও৷ তবে এক মুখোশে বেশিদিন থাকবে না৷ এক একটা রূপের মেয়াদ হবে সাত মাস করে৷ আর প্রতিটা রূপে মারবে তিনটে করে শয়তান৷ তাদের গলার নলি চিরে রক্ত পান করবে ও৷

রুনু অবতারে ও মেরেছে পাণ্ডেকে, যে কিনা সুযোগের সদ্ব্যবহার করে যে কোনো নিষ্পাপ মেয়েকে নষ্ট করতে পারে৷ আর মেরেছে সুহানাকে, যার কাছে কিনা গরিব হওয়াটা মস্ত বড়ো অপরাধ৷ আর শেষ পর্যন্ত কিনা বিকাশও! এত বড়ো প্রতারক সেই ছেলেটাও! সত্যি এই পৃথিবীটা বড্ড বাজে জায়গা৷ আর মানুষ জাতিটাও মোটেই ভালো না৷

ইরুককুরিরিস এবার নিজের শরীরটাকে অদৃশ্য করে ভাসিয়ে দিল হাওয়ায়৷ অদৃশ্য ইরুকুকু উড়ছে এবার৷ কেউ আর দেখতে পাচ্ছে না ওকে৷ এবার ও খুঁজে নেবে অন্য কোনো একটা চামড়ার মুখোশ, তখন আবার সবাই দেখতে পাবে ওকে৷ এবার ও যাবে অন্য কোনো নতুন একটা শহরে৷ আবার নতুন রূপ, আবার নতুন জায়গা, নতুন মানুষ আবার রক্ত পান করার নতুন খেলা! নতুন শিকার, নতুন শাস্তি আর নতুন কয়েকটা মৃত্যু৷

___

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%