পল্লবী সেনগুপ্ত
আগামী সপ্তাহের প্রেজেন্টেশনের কনটেন্টটা রেডি করতে করতে কাজের মধ্যে একদম ডুবে গেছিল সাঁঝ৷ গত দু-দিন ধরে চলছে কাজ৷ অনেক রিসার্চ টিসার্চ করে শেষ অবধি উদ্ধার হল কাজটা৷ এবার সবটা ম্যানেজার শর্বাণীদি-কে সাবমিট করলেই এই গেড়োটা শেষ৷ কব্জি উল্টে একবার ঘড়ি দেখল সাঁঝ৷ এখন সাড়ে তিনটে৷ একটা হালকা আড়মোড়া ভেঙে একটু নড়ে চড়ে বসল আবার ও৷ একবার উঁকি দিল চারপাশের কিউবিকলগুলোতে৷ অনিক, শুভেন্দু, রমলা, বিপাশা সবাই যে যার নিজের গলতায় অলস মেজাজে রোজকার মতোই৷ কেউ কানে হেডফোন গুঁজে অলস চালে কি-বোর্ড চাপছে, কেউবা আবার আনমনা ছন্দে মাউস নাড়াচ্ছে, আবার কেউ ঢুলুঢুলু চোখে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রয়েছে৷ রোজকার প্রায় একই ছবি৷ মাথা উঁচিয়ে থাকা বড়ো বড়ো বিল্ডিং-এ ঠাসাঠাসি এই অফিস পাড়াটার বাইরে বিছিয়ে থাকা হেমন্তের অলস দুপুরটা যেন ঘষা কাচের জানালা ভেদ করে ঢুকে পড়েছে অফিসের মধ্যেও৷ শুধু কাবু করতে পারেনি সাঁঝকে৷ এই সময়টায় মানে বিশেষ করে মিঠে রোদ্দুর মাখা হেমন্তের এই দুপুরগুলোতে আরও বেশি করে যেন নিজেকে কাজে ডুবিয়ে রাখতে চায় ও৷ অফিস না থাকলেও জোর করে দু-চোখ বুজে কাঠ হয়ে পড়ে থাকে বিছানায়৷ নিজেকে ভাসিয়ে দিতে চায় গভীর ঘুমের অচিনপুরে৷ কারণ জেগে থাকলেও যে এমন অনেক হেমন্ত দুপুরের স্মৃতির গন্ধগুলো অবশ করে দেয় ওর সারা শরীর৷ কষ্ট দলা পাকিয়ে ওঠে গলার কাছে৷ গত তেরো বছর ধরে যে এমনটাই হয়ে আসছে৷
হঠাৎ ফোন ভাইব্রেট হবার ঘ্যার ঘ্যার শব্দে একটু চমকালো সাঁঝ৷
—‘হ্যালো...’ ফোন কানে চাপল ও৷
—‘সাঁঝ কাল তো শনিবার৷ তার মানে কাল তো তোর অফিস ছুটি৷ কাল তোকে তুলে নেব দুপুরের দিকটায় বুঝলি৷ প্লিজ রেডি থাকিস৷ কাল একটু নন্দন যাব আমরা৷ ঠিক আছে?’ নিজের স্বভাব সিদ্ধ খলখলে চালেই কথাগুলো বলে গেল শিমূল৷
এই নভেম্বরের মাঝামাঝি, ভরা হেমন্তের দুপুরে নন্দন! বুকটা আবার একবার মুচড়ে উঠল সাঁঝবাতির৷
—‘নারে প্লিজ আমায় ছেড়ে দে৷ আমার হবে না রে কাল৷ আমি অন্য দিন না হয়...’
—‘অন্য দিন মানে? তুই কি ভুলে গেছিস কালই ১৭ নভেম্বর৷ কালই নন্দনে দেখানো হবে শুভ্রর শর্ট ফিলমটা৷ আর তুই বলছিস যে তুই যাবি না? এটা বলতে পারলি তুই? আমি তো কবে থেকে বলে রেখেছিলাম তোকে৷ সবাইকে বলেছি আমি যে আমার বেস্ট ফ্রেন্ড আসবে কাল৷ আর তুই এখন...’ এবার গলা ভিজে এল শিমূলের৷
—‘শোন শিমূল, প্লিজ একবার বোঝার চেষ্টা কর...’ কথা শেষ হল না সাঁঝের৷ তার আগেই কেটে গেল লাইন৷ উফফ! এই শিমূলটা বড্ড ছেলেমানুষ এখনও৷ অল্পেই অভিমান আর ঠোঁট ফোলানোর স্বভাবটা সেই স্কুল লাইফ থেকে রয়েই গেল ওর৷
কিন্তু সাঁঝই বা কি করে বোঝাবে! আজ এই তেত্রিশ বছর বয়সে পৌঁছেও ও যে আটকে রয়েছে সেই কুড়িতেই৷ আজও যে এই হেমন্তের দুপুরগুলো বড্ড বেশি কষ্ট দেয় ওকে৷ আজও যে ও ভুলতে পারেনি তেরো বছর আগের ঠিক এমনই অনেক দুপুর, অনেক কথা, স্বপ্ন, ভালোলাগা আর সেই মুখটা৷ আজও যে প্রতিমুহূর্তে ওকে তাড়া করে অনেক বছর আগের এমনই নভেম্বরের হালকা শীত আর কাঁচা মিঠে রোদ মাখা একটা দুপুর৷
সেই দিনটা আজও চোখ বুজলেই একদম ছবির মতো স্পষ্ট দেখতে পায় সাঁঝ৷ নভেম্বর মাস৷ কলেজে ইলেকশন৷ প্রতি বছরের মতোই উত্তেজনা তুঙ্গে৷ হাওয়া গরম৷ ভোট গোনা চলছে৷ নীল দল আর হলুদ দল একদম নেক টু নেক ডিফারেন্সে রয়েছে৷ সাঁঝ নীল দলের চরম সাপোর্টার৷ ঠিক সক্রিয় রাজনীতি না করলেও কলেজের সবারই জানা যে সাঁঝ নীল দলের একজন৷ সেদিন সেই ভোট গোনার সময় হঠাৎ কি একটা ইস্যু নিয়ে যেন হঠাৎ বচসা লেগে গেল নীল আর হলুদ দলের৷ নিমেষে বচসা রূপ নিল হাতাহাতির আর তারপর মারামারির৷ হঠাৎই তীব্র মারমুখী হয়ে উঠেছে দুই দলেরই ছেলে-মেয়েরা৷ যে যাকে পারছে পিটাচ্ছে৷ আর সাঁঝের এমন কপাল খারাপ যে ঠিক সেই সময়টাতেই ও পড়ে গেল দুই দলের লড়াইয়ের মাঝখানে৷ হঠাৎ সাঁঝ লক্ষ্য করল হলুদ দলের কট্টর সমর্থক রিপন মানে ওই গুন্ডা টাইপের ছেলেটা রে রে করে একটা লোহার রড নিয়ে তেড়ে আসছে ওর দিকেই৷ ভয়ে পা দুটো অবশ হয়ে গেছে বলে মনে হয়েছিল সাঁঝের৷ চারদিকের মারামারির ভিড় ঠেলে পালাতে পারল না ও৷ আঘাতটা নেবার জন্য যখন তৈরি হচ্ছিল সাঁঝ তখনই হুট করে যেন কি একটা হয়ে গেল ও কিছু বুঝে ওঠার আগেই৷ হঠাৎ একটা হ্যাঁচকা টান আর নাকের ওপর এসে ঝাপটা মারা একমুঠো মাস্কের গন্ধ৷ আর চোখ মেলতেই ও বুঝল ও আছড়ে পড়েছে আকাশি পাঞ্জাবি পরা একটা ছেলের বুকের ওপর৷ ফর্সা গালের হালকা দাড়ি, আর রিমলেস চশমার আড়ালে জেগে থাকা ভাসা ভাসা নীলচে ওই চোখদুটো তো ভীষণ চেনা ওর৷ এটা তো মল্লার৷ ওদের ডিপার্টমেন্টের সেরা ছেলে৷ যাকে সব স্যার, ম্যাডামরা দারুন ভালোবাসে আর যার জন্য গোটা কলেজের প্রায় আশি ভাগ মেয়েই পাগল৷ কিন্তু ছেলেটা খুব চুপচাপ আর গম্ভীর ধরনের৷ বা বলা ভালো অহংকারী৷ কারোর সাথেই বেশি কথা বলে না৷ নিজের পড়াশোনা নিয়েই থাকে৷ মেয়ে তো দূরের কথা, ছেলে বন্ধুই নেই বেশি ওর৷ কিন্তু এই মল্লার সাঁঝকে কেন বাঁচাল রিপনের রডের আঘাত থেকে? বুঝতে পারছিল না সাঁঝ৷ মাত্র কয়েকটা মুহূর্তই বোধ হয় মল্লার এর বুকের ওপর ছিল ও৷ কিন্তু মনে হচ্ছিল যেন ওর সমস্ত পৃথিবীটা থেমে গেছে ওই কয়েকটা মুহূর্তেই৷ ভালো লাগায় কেমন যেন পাগল হয়ে যাচ্ছিল ও৷ আসলে কলেজের অনেক মেয়ের মতোই সাঁঝও যে নিজের সবটুকু সবার অজান্তেই দিয়ে বসে আছে মল্লারকে৷
—‘বাড়ি যা তাড়াতাড়ি৷ অবস্থা ভালো নয়৷’ এটাই ছিল মল্লারের প্রথম কথা সাঁঝের জন্য৷ এই প্রথম মল্লার কথা বলল ওর সাথে৷ কলেজের অনেক সাধারণ মেয়ের মতোই সাঁঝ খুব সাধারণ একটা মেয়ে৷ আর যে মল্লার কলেজে প্রায় কারোর সাথেই কথা বলে না সে কেনই বা কথা বলবে ওর মতো একটা অতি সাধারণ মেয়ের সাথে! কিন্তু তবুও সেদিন সেটাই ঘটেছিল৷ সবটাই কেমন যেন স্বপ্ন স্বপ্ন লাগছিল ওর৷ বাড়ি ফিরেও বারবার মনে পড়ছিল মল্লারের বুকে আছড়ে পড়ার মুহূর্তটা৷ আর সাঁঝ বুঝতে পারছিল মল্লার ছাড়া এ জীবনে আর অন্য কোনো পুরুষের দিকে তাকাতেই পারবে না ও৷
কমবয়সে মনটা সত্যি বড়ো বেয়াড়া থাকে৷ সাঁঝেরও সেদিন তাই ছিল৷ তাই ভালো লাগায় পাগল হয়ে যাওয়া মেয়েটা বেশ একটা বেয়াড়া স্টেপ নিয়েছিল দু-দিনের মধ্যেই৷ টিফিনের খরচ বাঁচিয়ে গিফট শপ থেকে একটা ‘থ্যাঙ্ক ইউ’ কার্ড আর চকলেট কিনে সোজা গিয়ে দাঁড়িয়েছিল মল্লারের সামনে৷
—‘জানি তুই হয়তো ভালোভাবে নিবি না, কিন্তু তবুও তোর জন্য এটা কিনেছি৷ না সেদিন আমায় বাঁচানোর জন্য থ্যাঙ্কস দিয়ে তোকে ছোটো করতে আমি চাই না এটা ঠিক, কিন্তু কৃতজ্ঞতা জানানোর অধিকার তো আমার নিশ্চয় আছে৷’ প্রায় এক নিঃশ্বাসেই কথাগুলো বলে ফেলেছিল সেদিন মেয়েটা৷ আর কথাগুলো বলার সময় নভেম্বরের হিমেল আবহাওয়াতেও ওর মাথায় ফুটে উঠেছিল কয়েক ফোঁটা ঘাম৷
মল্লার ওর কথাগুলো শুনে অল্প ভ্রূ কুঁচকে রিমলেস চশমার আড়াল থেকে নীলচে চোখ দুটো মেলে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়েছিল ওর দিকে৷ তারপর হাত বাড়িয়ে জিনিসগুলো নিয়ে বলেছিল— ‘সব সময় দলবাজি আর দিদিগিরি না করে পড়াশুনাতেও তো একটু মন দেওয়া যায়৷ পার্ট ওয়ান পরীক্ষার তো আর বেশি বাকি নেই৷’
—‘পড়া আমার অত মাথায় ঢোকে না৷ আমি সব বুঝতেও পারি না৷’ একটু আদুরী চালেই কথাগুলো বলেছিল সেদিন সাঁঝ৷ কেন কে জানে ওর মনে হচ্ছিল মল্লারও ওর সাথে কথা বলতে চাইছে৷
—‘পড়া বুঝতে অসুবিধা হলে স্যারদের তো বলাই যায়৷ আর স্যারদের বলতে না চাইলে ক্লাসের যে ছেলেপুলেগুলো মোটামুটি পড়া বোঝে তাদেরও তো বলা যায়৷’ মল্লার এর শেষ কথাটায় ঠিক কি ইঙ্গিত ছিল সেটা বুঝতে না পারার মতো বোকা সাঁঝ কখনোই ছিল না৷ কিন্তু নিজের কানকে যেন বিশ্বাস করতে পারছিল না ও৷ ঠিক শুনছে তো ও? মল্লার এসব কথা ওকে বলছে! তবুও নিজের বেড়ে যাওয়া সাহসটাকে সম্বল করে বলেই ফেলেছিল—
—‘ক্লাসের কোন ভালো ছেলে মেয়েটা আমায় সময় দেবে বল৷ তুই-ই কি দিতে পারবি?’
—‘পারব না বলে তো মনে হয় না৷’ গম্ভীর গলায় বলেছিল মল্লার৷ এর পর থেকেই বন্ধুত্ব শুরু ওদের৷ সবাই তখন ভীষণ ঈর্ষার চোখে দেখত সাঁঝকে৷ এমনকী ওর বান্ধবীরাও৷ যে মল্লার কিনা কাউকেই পাত্তা দেয় না সে কিনা হঠাৎ সাঁঝের মতো একটা অতি সাধারণ মেয়ের এত ভালো বন্ধু হয়ে গেল! বন্ধুত্ব বাড়ার সাথে সাথে ও বুঝতে পারছিল মল্লার এর ওই শক্ত আবরণটার আড়ালে একদম আলাদা একটা মানুষ আছে৷ যে ভীষণ ভালো, যে চায় নিজের সাধ্যমতো সব সময় সবার দিকে নিজের সাহায্যের হাতটা বাড়িতে দিতে৷ যে সবাইকে নিয়ে বাঁচতে চায়, যে একদম অন্যরকম একটা মানুষ৷ সাঁঝের তখন জীবনটাকে স্বপ্নের মতো লাগত৷ রোজ ক্লাস শেষে দুপুরগুলোতে মল্লার এর সাথে কফি হাউসে সময় কাটান আর নিজের কবিতা শোনানো৷ হ্যাঁ সাঁঝ তখন গল্প আর কবিতা লিখত, যার একমাত্র পাঠক শ্রোতা ছিল মল্লার৷ সাঁঝের সব টুকু চুরি করে নিয়েছিল মল্লার৷ কেন যেন ওর মনে হচ্ছিল মল্লারও পছন্দ করতে শুরু করেছে সাঁঝকে৷ এভাবেই কাটছিল দিনগুলো৷ কেটে গেছিল প্রায় গোটা একটা বছর৷
সেটাও ছিল নভেম্বর মাস৷
—‘মল্লার রোজ তো আমরা ক্লাস শেষে কফি হাউসে যাই৷ আজ নন্দনে যাবি রে?’ কি একটা খেয়ালে যেন সেদিন বলে ফেলেছিল সাঁঝ৷ মল্লারের আপত্তি ছিল না৷ তাই সেদিন ওরা পৌঁছে গেছিল নন্দন৷ পাশাপাশি হাঁটছিল ওরা৷ আর হাঁটার সময় মল্লার এর হাত ছুঁয়ে যাচ্ছিল ওর আঙুলগুলো৷ হেমন্তের হিমেল দুপুর, সোনালী রোদ আর মাস্কের গন্ধ সব মিলিয়ে ভালো লাগায় দমটা কেমন যেন বন্ধ হয়ে আসছিল সাঁঝের৷
—‘মল্লার আমি না... আমি না তেকে বড্ড ভালোবাসি রে৷ তুই বল ভালোবাসবি আমায়? ধরে থাকবি তো আমার হাত?’ মল্লারের হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে বলে ফেলেছিল সাঁঝ৷
পলকে মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেছিল মল্লারের৷ সাঁঝের থেকে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে হনহন করে বেরিয়ে গেছিল নন্দন চত্বর থেকে৷ আর বোকার মতো চোখে জল নিয়ে একলা দাঁড়িয়ে ছিল সাঁঝ৷ কিছু বুঝতে পারছিল না৷ না, এই ঘটনার পর থেকে আর কোনোদিন একটাও কথা বলেনি মল্লার সাঁঝের সাথে৷ সাঁঝও আর চেষ্টা করেনি৷— আচমকা অপমানে আর তাচ্ছিল্যে কুঁকড়ে গেছিল ও৷ যে কয়েকটা মাস বাকি ছিল কলেজ শেষ হবার, সেই কটা মাস সম্পূর্ণ আগন্তুক হয়ে হয়ে মল্লার সামনে আসত সাঁঝের জন্য, আর সাঁঝ মল্লারের জন্য৷ তারপর আর কোনোদিন দেখা হয়নি ওদের৷ বিগত তেরো বছরে কোনোদিন সাঁঝ আর কোনো খবর পায়নি মল্লারের৷ শুধু সাঁঝ কেন, ওদের ব্যাচ এর কেউই পায়নি৷ হারিয়ে গেছে মল্লার৷ শুধু হারায়নি সাঁঝের স্মৃতিগুলো৷ আজও ওরা বারবার ফিরে আসে সাঁঝকে রক্তাক্ত করতে, ক্ষতবিক্ষত করতে৷
সব ষড়যন্ত্র! বারাবর শুধু সাঁঝের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে ওই ওপরে থাকা ‘ভগবান’ নামের লোকটা৷ যেমন আজ আবার করল৷ আজ শিমূলের অনুরোধটা ফাইনালি ফেলতে পারেনি সাঁঝ৷ চলেই এসেছে নন্দনে৷ শর্ট ফিলম দেখার জন্য৷ আসলে শিমূলের বর শুভ্র পেশায় ইঞ্জিনিয়ার হলেও খুব সিনেমা পাগল৷ তাই ওরা কয়েকজন বন্ধু মিলে কিছুদিন আগে বানিয়ে ফেলেছিল একটা শর্ট ফিলম৷ এখন নন্দনে যে কলকাতা শর্ট ফিলম ফেস্টিভ্যালটা চলছে সেখানেই দেখানোর জন্য সিলেক্টেড হয়েছে শুভ্রর শর্ট ফিলমটা৷ কয়েকদিন ব্যাপি চলবে এই শর্ট ফিলম উৎসব আর আঁতেল বোদ্ধাদের ভিড় এই নন্দনে৷ প্রতিদিন দেখানো হবে ৫টা করে শর্ট ফিলম৷ আজও তাই যথারীতি৷ শুভ্রদের ছবিটা দ্বিতীয় নম্বরে দেখান হল৷ তার পরেও বাকি ছিল তিনটে৷ সাঁঝও সবার সাথে বসে দেখছিল বাকি ছবিগুলো৷ কিন্তু হঠাৎ এসব কি হয়ে গেল৷ কিছুই যে মাথায় ঢুকছে না সাঁঝের৷ শেষ ছবিটা! কী ছিল ওটা? ছবির নাম ‘ছেঁড়া মেঘ’৷ একটা অনাথ মেয়ের গল্প৷ একটা কুড়িয়ে পাওয়া মেয়ের গল্প৷ সে হঠাৎ জানতে পারে যে তাকে মানুষ করা বাবা মা তার নিজের বাবা মা নয়৷ তখন বিপর্যয় নেমে আসে তার জীবনে৷ তাকে ছেড়ে চলে যায় তার প্রেমিক, বন্ধু সবাই৷ প্রশ্ন ওঠে তার জাত নিয়েও৷ একরাশ ছাই চাপা কষ্ট বুকে নিয়ে সব ছেড়ে চলে যায় মেয়েটা৷ হারিয়ে যায় অচেনা ঠিকানায় ঠিক একটুকরো ছেঁড়া মেঘের মতোই৷ কিন্তু এই গল্পটা তো সাঁঝের ভীষণ চেনা৷ এটা তো সাঁঝেরই লেখা গল্প৷ যেটা শুধু ও শুনিয়েছিল মল্লারকে, ওদের সম্পর্কটা শেষ হয়ে যাবার ঠিক দু-তিনদিন আগে কফি হাউসে বসে৷ কিন্তু সেই গল্পটা কীভাবে এখানে...? সব চেয়ে অদ্ভুত কথা হল সিনেমার শুরুতে গল্পকার হিসাবে যে নাম দেখেছে সাঁঝ সেটাও ভারি আশ্চর্য৷ নাম সন্ধ্যাতারা৷ অনেকটাই সাঁঝের নামের সাথে মিল৷ ছবির পরিচালকের নাম সমুদ্রনীল৷ কে এই সমুদ্রনীল? সে কে সাঁঝের চেনা কেউ নাকি? ছবি দেখানো শেষ৷ এবার একে একে পাঁচ ছবির পরিচালক কিছু বক্তব্য রাখছেন৷ এই সবে চতুর্থ জনের বক্তব্য শেষ হল৷ পঞ্চম জনের পালা এবার৷ ঢিপ ঢিপ করছে সাঁঝের বুকের ভিতর৷ কাকে দেখতে চলেছে এবার ও?
—‘নমস্কার৷ আমি ‘‘ছেঁড়া মেঘ’’ এর পরিচালক সমুদ্রনীল৷’ চোখ বন্ধ করেছিল সাঁঝ৷ এবার ও চোখ মেলল আস্তে আস্তে৷ না, এ তো সে নয়৷ তাহলে?
—‘এই ছবিটা আমার প্রথম প্রয়াস৷ তবে এই ছবির গল্প আমার নয়৷ যার গল্প তাকে আমি চিনি না৷ এই গল্প আমি শুনেছি আমার দাদার কাছে৷ আমার দাদা মল্লার বসু৷ যে আমার সবচেয়ে বড়ো প্রেরনা৷ যে সব সময় আমায় উৎসাহ দিয়ে গেছে আমার সব কাজের জন্য৷ আর আমার দাদার জীবনে ভালোবাসার ঢেউ বয়ে নিয়ে আসা মানুষটার সৃষ্টি ‘ছেঁড়া মেঘ’৷ তাই আজ এই গল্পটা নিয়ে ছবি করে আমি আমার দাদাকেই সম্মান জানাতে চেয়েছি৷ আসলে দাদা আজ আর আমার সাথে নেই...’ অনেকটা দূরে চলে গেছেন৷
চমকে উঠল সাঁঝ৷ এসব কি বলছে ছেলেটা? মল্লার আর নেই? মানে? আরও অনেক কথা বলছিল সমুদ্রনীল৷ কিচ্ছু শুনতে পেল না আর সাঁঝ৷ একচাপ কালো অন্ধকার আর এক সাগর নোনা জল আঁকড়ে ধরল ওকে৷
* * *
উত্তর কলকাতার বনেদি পরিবারের মেজ বউ মৃণালিনী লাহা মা হতে পারেননি নিজের শারীরিক অক্ষমতার জন্যই৷ তাই বাড়ির সবাই বন্ধ্যা বলে ব্রাত্য করেছিল তাকে৷ কিন্তু তাতেও মরেনি মৃণালিনীর মায়ের মনটা, মাতৃসত্তাটা৷ তাই যখন তার কোলে এলো পাঁচ মাসের বাপ মা মরা অনাথ শিশুটা তাকে তখন নিজ সন্তান স্নেহেই আপন করে নিয়েছিলেন মৃণালিনী৷ কিন্তু এই ব্যাপারটা পরিবারের কেউই ভালোভাবে মানেননি৷ এমনকী মৃণালিনীর স্বামীও না৷ তাই যৌথ পরিবারে বড়ো হলেও ছেলেটা কোনোদিন ভালোবাসা পায়নি সেভাবে৷ বরং অবহেলা আর তাচ্ছিল্যই পেয়ে এসেছে৷ শুধু মা আর খুড়তুতো দুই ভাই বোন (দত্তক সূত্রে পাওয়া) ছাড়া কেউই আপন ভাবেনি কখনো ছেলেটাকে৷ আর তার উচচমাধ্যমিক পাশ করার পর যখন মারা গেল মৃণালিনী, তখন নিজেকে আরও বেশি গুটিয়ে ফেলেছিল ছেলেটা৷ শুধু পড়াশুনায় ডুবে থাকত৷ আর সব সময় সংকুচিত থাকত সবার মাঝে৷ আর সেই দুঃখী চুপচাপ ছেলেটাকেই ওর কলেজে অহংকারী ভাবত সবাই৷ কিন্তু সেই ছেলেটাও ভালোবেসেছিল একটা মেয়েকে৷ খুব ভালোবেসেছিল তাকে কোনো কারণ ছাড়াই৷ স্বপ্ন দেখত তাকে নিয়ে৷ কিন্তু একটা গল্প! সেই মেয়েটার লেখা একটা গল্পই হঠাৎ এলোমেলো করে দেয় ছেলেটার সব৷ একটা কুড়িয়ে পাওয়া মেয়ের গল্প লিখেছিল সেই ছেলেটার ভালোবাসার মেয়েটা৷ যেখানে তার প্রেমিক তাকে ছেড়ে দেয় সমাজ, সংসার আর পরিবারের ভয়ে৷ খুব অপরিণত লেখা হয়তো ছিল সেটা, তবুও ওই ছেলেটার দোমড়ানো যুবক মনে বড্ড নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল গল্পটা৷ কী বুঝেছিল সে কে জানে! নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিল মেয়েটার থেকে চিরতরে৷ আর কোনোদিন সামনে আসেনি তার৷ আজ সেই ছেলেটা চলে গেছে চেনা শহর আর চেনা বাড়ি আর চেনা গন্ডি ছেড়ে৷ সে আর থাকে না পুরোনো ঠিকানায়৷ নিজেকে অনেক দূরে সরিয়ে নিয়েছে পুরোনো চেনা মানুষগুলোর থেকে৷ উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন অধ্যাপনা করে সে৷ একাই থাকে নিজের মতো৷ বিশেষ সম্পর্ক রাখে না কারোর সাথেই পুরোনো দিনের৷ যেন স্বেচ্ছা নির্বাসন নিয়েছে সে৷
সেদিন শর্ট ফিলম উৎসব শেষে সরাসরি সমুদ্রনীলের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিল সাঁঝ৷ মল্লার এর সবটা শোনার পর চোখের জল আর বাঁধ মানছিল না ওর৷
—‘কি রে মা, চল এবার৷ তৈরি হবি না? ম্যারেজ রেজিস্টার এসে যাবে যে৷’ মায়ের ডাকে চমক ভাঙল সাঁঝের৷ একা ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে অঘ্রাণের দুপুরটার বাতাসটা গায়ে মেখে নিচ্ছিল ও৷ ফুসফুসে ভরে নিচ্ছিল হেমন্তের দুপুরের সুঘ্রাণ৷
—‘হ্যাঁ মা আসছি৷’ ঘরে এসে নিজের লাল শাড়িটা দু-হাতে মুঠো করে আলতো চুমু খেল ও৷ হ্যাঁ এই লাল রং আর মল্লার আজকের পর থেকে শুধুই যে ওর৷ সমুদ্রের থেকে সবটা শোনার পর ও নিজে গেছিল নর্থ বেঙ্গল৷ নিজের মানুষটাকে নিজেকেই যে খুঁজে নিতে হয়, নিজেকেই যে মিটিয়ে নিতে হয় সব দূরত্ব আর অভিমান৷
লাল শাড়ি আর গয়নায় সেজে বাইরের ঘরে বেরিয়ে এলো সাঁঝ৷ ম্যারেজ রেজিস্টার এসে গেছেন৷ ওই তো সেও এসে গেছে... সেই নীল চোখ, সেই রিমলেস চশমা৷ সাঁঝের চোখ পড়ল তার চোখে৷ সাঁঝ দেখতে পাচ্ছে ওর চোখে তেরো বছর আগের সেই দুপুরটা, সেই মাস্কের গন্ধটা, সেই আকাশি পাঞ্জাবিটা, সেই পুরোনো সময়টা৷
___
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন