নিভৃত যতনে

পল্লবী সেনগুপ্ত

স্যানডির কথা

ওদের পাঠানো দামি শপিং মল এর কেতা দুরস্ত জামা কাপড় পরে আর দামি সুগন্ধি গায়ে ছিটিয়ে আয়নার সামনে গুটি গুটি পায়ে গিয়ে দাঁড়াল স্যানডি৷ নিজেকে দেখে নিজেই চমকে উঠল যেন৷ এ কে? একে কি আদৌ চেনে ও? এ তো পুরো অচেনা একটা মানুষ যেন৷ ওকে তো ঠিক বাংলা সিরিয়ালের হিরোদের মতো লাগছে৷ আসলে দেখতে শুনতে তো ও বরাবরই বেশ ভালো, তার ওপরে গত কয়েক মাসের ঘষা মাজা, আর আদপ কায়দা শেখার চক্করে পরে ও যেন বদলে গিয়েছে পুরোপুরি৷ আর আজ দামি পোশাকের সংযুক্তিতে ব্যাপারটা যেন পুরো অন্য একটা মাত্রা পেয়েছে৷ অবশ্য ওর রূপ, আদপ কায়দা আর কেতাই যে ওকে এই নতুন চাকরিতে টিকে থাকতে আর সাফল্য পেতে সাহায্য করবে সেটা তো হাড়ে হাড়ে জানে স্যানডি, কিন্তু তবুও...৷ কিন্তু এই ভাবটা আজ ঝেড়ে ফেলতেই হবে ওকে সেটা ভেবেই আবার মন শক্ত করল স্যানডি৷ ডিউক দা বলেছে যে ওর এই সব কিন্তু কিন্তু ভাব ওর পেশাদার চালকে ক্ষুণ্ণ করতে পারে আর যেটা ওদের পেশায় কোনোভাবেই চলবে না, তাইতে এটা আবার ওর প্রথম কাজ৷ তাই নিজের মন শক্ত করে কাজের দিকে মনে দিতে চেষ্টা করল ছেলেটা৷ সাফল্য যে ওকে পেতেই হবে৷ ওর কাজ, ওর রোজগার এ সবের ওপর যে আজ নির্ভর করছে অনেক কিছুই৷ ওর আগামী দিনের চাবিকাঠি যে আজ শুধু ওরই হাতে৷

নিজের নতুন ফোনটা টেনে নিল স্যানডি৷ নতুন শেখা কৌশল খাটিয়ে বুক করে নিল শহরে ছুটে বেড়ান নামজাদা ভাড়ার ক্যাব গুলোর একটা৷ ক্লায়েন্টের সব ডিটেলস তো আছেই ওর কাছে৷ এর পর শুধু গিয়ে পৌঁছানো দরকার ঠিক সময়ের মধ্যে৷ আর তো বেশি বাকি নেই ওর পরীক্ষার৷ ক্যাব বুক হয়ে গেল৷ নির্দিষ্ট যান্ত্রিক বার্তা জানিয়ে দিল আসছে ওর বাহন৷ বুকের মধ্যে ঢিপ ঢিপ টা ক্রমেই বেড়ে চলেছে ওর৷ চোখের কোণটা কেমন যেন ভিজে ভিজে ঠেকছে৷ আজকের কাজে সফল হওয়াটা খুব দরকার সেটা জানে স্যানডি, তবুও কেন যেন মনের একটা চোরা কোণা থেকে যেন কেউ অনবরত বলে চলেছে— ‘না না৷ তুই আজ সফল হোস না৷ তুই আজ সফল হলে হয়তো সব কিছু অনেক বদলে যাবে৷ তুই বদলে যাবি আর সবটা জানলে সেও কি আর...’ উফফ! কী হচ্ছে এটা? নিজেকেই নিজে আবার শাসন করল স্যানডি৷ না, আজ ওকে সফল হতেই হবে, আর সেটা না হতে পারলে ও যে হারিয়ে ফেলবে সব কিছু৷ না, এই সফলতা ওর দরকার৷ সব দ্বিধা কাটাতেই হবে এবার৷ নিজের জন্য, তার জন্য, সবকিছুর জন্য৷

ঘর ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে এল স্যানডি৷ মনের ভেতরটা দুমরে মুচরে যাচ্ছে৷ কিন্তু না তবুও ওকে এগোতেই হবে ওর লক্ষ্যের দিকে, এগোতেই হবে ক্লায়েন্টের ঠিকানার দিকে৷

—‘তুই তাহলে সত্যি নিকে করছিস শাহিন?’

—‘হ্যাঁ৷ করবই তো৷ আমার পথ ছাড়... পথ ছাড় বলছি...’

—‘তুই তোর আল্লার নামে কসম খেয়ে বলতো দিকি তুই কোনোদিন ভালোবাসার নজরে দেখিসনি আমায়...’

—‘না না না৷ না দেকিনি৷ দেকলে কি সেটা আগে তোমায় বলতুমনি নাকি? আমি তোমায় ভালো কথা বলছি রুপেশ দাদা, তুমি এসব পাগলামো ছাড় দেকিনি বাপু৷ তুমি হলে গিয়ে হিঁদুর ঘরের পোলা আর আমি মোছলমানি৷ এসব হয় নে কো৷’

—‘এত আমি বুঝিনে রে৷ আমি তোকে বড়ো ভালোবাসি৷ আর আমি জানি তোর মনেও আমার জন্য অনেক মায়া আছে, সে তুই যতই আমার দিয়ে দূরে দূরে পালাস নে কেন আমি তোর মন পড়তে পারি৷ মায়া যদি তোর নাই থাকত তাহলে সেবার আমার কলেরা হল বলে তুই পিরের থানে মাথা ঠুকলি কেন? তুই কি ভাবিস আমি খবর রাখি নে? আর কেনই বা আমি অন্য মেয়েছেলের সাথে দুটো বেশি কথা কইলে তোর দু-চোখে মেঘ ঘনায় বল তো দেখি? কি ভাবিস তুই? আমি কিছু জানিনে? সব আমার নজরে আছে বুঝলি?’

—‘এত কথা জানি নে৷ তুমি আমার কেউ নও আমিও কেউ নই তোমার৷ এই হল হক কথা৷ এখন আমায় যেতে দাও তো দিকি৷ কে কোথা দিয়ে দেখি ফেলবে যে তুমি আমার পথ আটকে এত কতা কইচ, আর ওমনি একখানা সববনাশ হোক আর কি৷ তুমি জাননে আমার বাপ খুড়ো কেমন ধারার?’

—‘ঠিক আচে যা তুই৷ তবে একখানা কথা মাথায় রাকিস, যেদিন তুই নিকে করবি সেদিনই আমি আমার পরান দেব৷ গলায় দড়ি দেব নইলে বিষ খাব৷ খাবই খাব এই আমি বলে দিলুম৷ আমি বেঁচে থাকতি তোকে অন্য কারো কাছে যেতি দিতি পারব নে... কিছুতে পারব নে৷’

উফফ! এবার কী করবে শাহিন৷ এই রুপেশ দাদা ছেলেটা যে বড্ড গোঁয়ার৷ আজ দুপুরে বলা ওর কথাগুলো যে কিছুতেই ভুলতে পারছে না শাহিন৷ একটা ছোটো গাঁয়ের খুব সাধারণ মুসলমান পরিবারের মেয়ে শাহিন৷ ওদের বাড়িতে বাপ আর খুড়োর কথাই শেষ কথা৷ আর সেই জন্যই শুধু ওর আববু চাইল নে বলেই তো ক্লাস সেভেনের পর আর পড়া হল না শাহিন এর৷ এই ছোটো গ্রামটায় মুসলমানদেরই বাস মূলত৷ তবে হিন্দুও আছে দু-এক ঘর৷ এই রুপেশ দাদা তেমনই এক হিন্দুর ঘরের ছেলে৷ এই গাঁয়েরই স্কুলের বারো কেলাসে পড়ে৷ সবাই বলে এই এলাকায় রুপেশ এর মতো ছেলে আর হয় নে কো৷ কি সুন্দর দেখতি, পড়াশুনায় মাথাও আছে৷ এই তো এবার বারো কেলাস পাশ দিয়ে কলেজেও যাবে বোধ হয়৷ কিন্তু রুপেশ এর কপালটা বড়ো খারাপ৷ সেই কোন ছেলেবেলায় বাপ মা-কে হারিয়েছে, আর এখন মানুষ হচ্ছে মামা মামির সংসারে৷ ওর মামিটা বড্ড পাজি৷ বড়ো খাটায় ছেলেটাকে, আর মামাটাও হয়েছে তেমনই বউ ভেদা আর মেনিমুখো৷ এই দুখী ছেলেটার কেন কে জানে সেই কোন কাল থেকেই মনে ধরে গেছে শাহিন কে৷ বারবার, বারবার শাহিন এর কাছে ছুটে ছুটে আসে ও৷ শাহিন যত দূরে পালাতে চায় ওর থেকে তত যেন ওকে বাঁধতে চায় ছেলেটা৷ কি পাগল ছেলে রে! একবারও বোঝে না কেন শাহিন পালাতে চায় ওর থেকে? আরে শাহিনের যে বড্ড মায়া পড়ে গেছে ওর জন্য৷ অমন রাজপুত্তুর পানা যার রূপ, যার অমন মিষ্টি ব্যবহার তার মায়ায় না পড়ে কি আর উপায় আছে৷ কিন্তু শাহিন কে যে সে সব মনের কথা মনেই চেপে রাখতে হবে৷ এসব কথা যদি ভুল করেও আববু জানতে পারে তাহলে যে সববনাশ৷ ওই জেদি, খুনে আর একরোখা লোকটা যে কি করতে পারে আর কি না পারে তা যে হাড়ে হাড়ে জানে শাহিন৷ আর ও কি পারে কোনোভাবেই ওই প্রাণের মানুষটার একটুও ক্ষেতি হতে দিতে৷ সেই জন্যই তো বারবার ওর থেকে দূরে থেকেছে শাহিন৷ কিন্তু এবার? এবার কি হবে? পাগল ছেলেটা যদি সত্যি কিছু করে বসে? ও যে সব পারে করতে শাহিনের জন্য সেটা তো জানে ও৷ সেই যে সেবারে হাত কেটে শাহিনের নাম লিখেছিল! উফফ! কি করবে এবার শাহিন? আর তা ছাড়া শাহিন নিজেও যে এক দণ্ড শান্তি পাচ্ছে নে৷ ও নিজেই বা কি করে রুপেশ ছাড়া আর কাউকে মেনে নেবে নিজের জীবনে? ও যে নিজের মন প্রাণ সব কিছু রুপেশকে দিয়ে বসে আছে৷ না, কিছু একটা এসপার ওসপার করতেই হবে এবার৷ নইলে যে কেউ বাঁচবে না৷ না শাহিন, না রুপেশ না আববুর পছন্দ করা ওই ছেলেটা৷ না, আর ভয় পেলে চলবে না৷ এবার সব ভয়কে হারিয়ে দিয়ে জিততে হবে, জিততেই হবে৷ শাহিনরা হেরে গিয়ে আববুরা বারবার জিততে পারে নে, ভালোবাসা বারবার হারতে পারে নে৷ এবার শুধু মেয়েছেলে বলে শাহিন আর কলের পুতুল বনবে নে কিছুতেই৷

ডাক্তারখানা থেকে বেরিয়ে রুপেশ বুঝতে পারল ওর মাথাটা টলছে, পা দুটো কাঁপছে থর থর, চোখের সামনে যেন চাপ চাপ অন্ধকার নেমে আসছে ওর৷ দু-এক পা এগিয়ে সামনের একটা পাকা বাড়ির বাঁধানো রোয়াকে ধপ করে বসে পড়ল ও৷ এটা কী শুনল ও? ডাক্তারবাবু কী বললেন এটা? শাহিন এর শরীরে বাসা বেঁধেছে এমন এক মারণ রোগ? কবে? কীভাবে? ক্যান্সারের মতো একটা সাংঘাতিক অসুখ কীভাবে ধরল শাহিনকে? ডাক্তারবাবু যা বললেন তা যে ভয়ানক৷ সব পরীক্ষা নিরীক্ষা করে নাকি দেখা গেছে যে শাহিনকে ধরেছে ক্যান্সার৷ ডাক্তারবাবু বললেন, এখন নাকি শাহিনকে ভালো করতে গেলে অনেক দামি চিকিৎসার প্রয়োজন৷ অনেক দামি দামি ওষুধ, অপারেশন, কেমোথেরাপি না কি যেন সব বলে সেগুলো নাকি লাগবে৷ অনেক অনেক টাকা নাকি লাগবে তাতে৷ কিন্তু রুপেশ কোথায় পাবে অত টাকা? কী করবে এবার ও? তাহলে কি শাহিন তিল তিল করে শেষ হয়ে যাবে ওরই চোখের সামনে? ও শুধু দেখবে বোবা দর্শকের মতো৷ কিন্তু শাহিনকে ছাড়া ও বাঁচবে কী করে? ওই যে ওর জীবনের সবটুকু৷ না, শাহিনকে কোনোভাবেই মরতে দেবে না রুপেশ৷ যে ভাবেই হোক মেয়েটাকে বাঁচাবে ও৷ ও তো বরাবরই শাহিন এর জন্য সব করতে পারে৷ আজ ও কি তাহলে পারবে না নাকি? কিন্তু ঠিক কি করতে হবে এবার ওকে সেটাই বুঝতে পারছে না রুপেশ৷ নিজেদের ভালোবাসাকে বাঁচানোর জন্য ওদের এত কষ্ট আর চেষ্টা কি তাহলে সব মিথ্যা হয়ে যাবে এবার? যেদিন সত্যি ওদের ভালোবাসা শেষ হতে বসেছিল, যেদিন সত্যি শাহিন এর বাড়ি থেকে ওর নিকা পাকা হয়ে গেছিল সেদিন ও তো ভগবান বাঁচিয়েই দিয়েছিলেন ওদের৷ আজও রুপেশের মনে পড়ে সেই দিনটা৷ খুব মন খারাপ করে, ভাঙা প্রাণ নিয়ে পুকুরের ধারে নির্জন দুপুরবেলায় বসেছিল সেদিন রুপেশ৷

—‘রুপেশ দাদা তোমার সাথে দুটো কথা ছিল গো৷’ আচমকা শাহিনের গলার স্বরে চমকে উঠেছিল ও৷ একি! শাহিন নিজে থেকে ওকে ডাকছে! যে মেয়ে সব সময় ভয়ে ভয়ে থাকে, যে সব সময় পালাতে চায় ওর থেকে সে আজ নিজে থেকে এসেছে ওর কাছে!

—‘কী ব্যাপার তুই?’

শাহিন ভয়ে ভয়ে একবার দেখে নিয়েছিল চারপাশটা৷ তারপর পাতলা স্বরে বলেছিল

—‘রুপেশ দাদা আমায় নিয়ে পালায়ে যাবে গো? আমার আববু যে জোর করে নিকে দিয়ে দিচেচ আমার৷ আমার থেকে অনেক বড়ো এই মরদ৷ আরও দুটি বিবি আছে তার৷ আমি এখানে নিকে করবনি গো৷ আমি যে তোমারে মন দিয়ে বসে আছি৷ আগে তোমায় কোনোদিন বলি নাই ভয়ে৷ যদি আববু জানতি পেরে তোমার কোনো ক্ষেতি করে সেই ভয়ে৷

শাহিনের সেই ছলছলে চোখ আর কান্নাভেজা কথাগুলো যেন সেদিন হাতুড়ি ঠুকেছিল রুপেশের বুকে৷ শাহিন তারপর হঠাৎ সেদিন জড়িয়ে ধরেছিল রুপেশের হাত দুটো৷

—‘রুপেশ দাদা দু-একদিনের মদ্দি না পালালি যে সববনেশ আর আটকানো যাবেনি৷ তুমি কিছু একটা কর৷’ রুপেশ সেই মুহূর্তেই বুঝতে পেরে গেছিল সেদিন, খুব চটজলদি ওকে কিছু একটা করতেই হবে নিজের ভালোবাসাকে বাঁচাতে হলে৷ ভগবানের দয়ায় কীভাবে যেন ওর মাথায় খেলে গেছিল বাবলাদা’র কথাটা৷ বাবলাদা রুপেশের পিসির ছেলে৷ যখন রুপেশের বাপ মা বেঁচে ছিল তখন মাঝে মাঝেই বাবলাদা আসত ওদের বাড়ি৷ খুব ভালোবাসত রুপেশকে৷ ছেলেটা চালচুলোহীন হলেও মনটা বড্ড ভালো৷ এমনকী মামার বাসায় এসে থাকার পরও মাঝে মাঝে খোঁজ খবর নিত সে রুপেশের৷ ওর কাছে ফোন নম্বরও ছিল বাবলাদা’র৷ তারপর সেই বাবলাদা’র সাহায্য নিয়েই রুপেশ পালিয়ে এসেছিল শাহিনকে নিয়ে ওদের সেই গ্রাম ছেড়ে বহু দূরের এই হিন্দু গ্রামে৷ মন্দিরে বিয়ে করে নতুন সংসার করেছে ওরা৷ যদিও ও কাউকে বলেনি যে শাহিন অন্য জাতের৷ কিন্তু কি বা আসে যায় এই সব জাতে পাতে ভালোবাসার কি জাত হয় নাকি? সবাব রক্তই তো একইরকম লাল৷ কিন্তু তবুও শাহিনের নাম ও বদলে করেছে সোনা৷ হ্যাঁ ওর সোনা বউই তো৷ রুপেশ এখন এখানকার একটা ছোটো কারখানায় কাজ করে৷ আর শাহিন বাড়ি বসে মেয়েদের ব্লাউজ সেলাইয়ের কাজ করে৷ খুব সুন্দর করে সাজিয়েছে শাহিন ওদের ছোট্ট বাসাটা৷ ওদের সংসারে অভাব আছে ঠিকই, কিন্তু ভালোবাসা আর শান্তির কোনো কমতি নাই৷ এভাবেই ওরা পার করেছে দু-দুটো বছর৷ পুরোনো কেউ জানতেই পারেনি আর ওদের নতুন ঠিকানা৷ শাহিনটা একদম পাগলি৷ কোনো কিছুই যেন লাগে না ওর৷ রুপেশ মাঝে মাঝে রাতের বেলায় আদর করতে করতে বলে— ‘হ্যাঁরে বউ, তোকে তো আমি কোনো যত্নই করতে পারি না৷ দুধটা ফলটা খাওয়াতে পারি না, সুন্দর শাড়ি স্নো পাউডারও কিনে দিতে পারি না৷ তোর দুঃখু হয় না?’

পাগলিটা তখন রুপেশের বুকে মাথা রেখে বলে— ‘দূর! তুমি তো নিজেরেই দিয়েচ আমায়৷ আর কি চাইব আমি? তুমি শুধু বল তুমি আমারেই এভাবে ভালোবাসবা সারা জীবন৷ আমারে কথা দাও আমি ছাড়া আর কোনো মেয়েছেলের দিকে দেখবা না, আমারে ছুঁয়ে বল আমি ছাড়া আর কোনো মেয়েমানুষকে ছুঁয়ে দেখবা না৷’

রুপেশ ওকে বারবার বোঝায়— ‘দূর পাগলি৷ তুই ছাড়া আর কে আছে আমার বল দিকি? তোকে ছাড়া আর কারে দেখব আমি? তুই যে আমার সব, তুই যে আমার জগত৷’ কিন্তু তবুও যেন বুঝতে চায় না অবুঝ মেয়েটা৷ বারবার বলে ‘আমার মাথার দিব্যি বল তুমি শুধু আমার৷’ কিন্তু রুপেশ তো সত্যি শাহিন ছাড়া আর কোনো দিকে কোনোদিন তাকানোর কথা ভাবতেই পারে না৷ মিথ্যা দিব্যি তো করেনি ও৷ তবে কেন আজ মরতে বসল মেয়েটা? কি করবে এবার রুপেশ? কিচ্ছু বুঝতে পারছে না৷ কিন্তু কিছু যে একটা করতেই হবে৷ হঠাৎ রুপেশের মাথায় একটা ঝিলিক দিল৷ বটুকদা৷ হ্যাঁ বটুকদা-কে একবার ফোন করলে কেমন হয়৷ নম্বরটা তো আছেই৷ বটুকটা ওদের কারখানায় অল্প কদিন কাজ করেছিল৷ তারপর কাজ ছেড়ে শহরে চলে যায় কি না কি একটা বড়ো চাকরি পেয়েছে৷ সেই বটুকদাই দিন কয়েক আগে ফোন করেছিল রুপেশকে৷ চাকরি করতে যেতে বলছিল শহরে৷ বটুকদা-র কোম্পানিতেই লোক নেবে বোধ হয়৷ মায়না নাকি বেশ ভালো৷ রুপেশের মতো ফর্সা সুন্দর দেখতে ছেলে নাকি ওখানে গেলেই পেয়ে যাবে কাজ৷ কয়েক মুহূর্ত ভেবে বটুকদা-কে ফোনটা করেই ফেলল রুপেশ৷

—‘হ্যালো’ কয়েকবার ফোন বাজার পর শোনা গেল বটুকদা-র গলা৷

—‘বটুকদা, রূপেশ বলছি৷ চিনতে পারছ?’ কাঁপা কাঁপা গলায় বলল রূপেশ৷

—‘কে?... অ রুপেশ৷ মানে কারখানার সেই হিরো কাটিং রুপেশ? তা এখানে কি মনে করে?’

—‘বটুকদা আমার খুব বিপদ গো৷ অনেক টাকার দরকার৷ আমার বউটার ক্যান্সার হয়েছে যে৷ আমায় বাঁচাও বটুকদা৷ বাঁচাও৷’

—‘আরে দাঁড়া৷ অত হাউ মাউ করলে চলে নাকি?’ শোন কাজ তোর হতে পারে৷ কিন্তু তাতে অনেক শর্ত আছে বুঝলি৷ প্রথম শর্ত হল তোকে শহরে আসতে হবে৷ আর আপাতত কিছুদিন তোকে শহরেই থাকতে হবে, অন্তত যতদিন না তোর ট্রেনিং শেষ হয়৷ তারপর আসল কাজ শুরু হলে যদি ভালো কাজ করে বসদের খুশি করতে পারিস তবে বাড়ি যাবার অনুমতি মিলতে পারে দু-একদিনের জন্য৷ কিন্তু আপাতত বাড়ি, বউ সব ভুলে যেতে হবে গুরু৷ আর হ্যাঁ ভুলেও বউকে নিজের সাথে নিয়ে আসার কথা ভেবো না কিন্তু৷ তাহলে জানবে নিজেরও বিপদ আর বউয়েরও৷’

—‘কিন্তু টাকা? আমার বউয়ের চিকিৎসা?’

—‘ওগুলো সবই হবে৷ টাকা দেওয়া হবে তোমায়৷ চিকিৎসাও শুরু করতে পারবে ঠিকই৷ শুধু আপাতত তোমার বউয়ের সামনে যাবার অনুমতি মিলবে না৷ বুঝলে গুরু?’

না, একদমই ভালো বুঝতে পারছে না রুপেশ৷ কিন্তু শুধু এটুকু বুঝতে পারছে শাহিনকে ভালো করার একটা আবছা আলোর রেখা দেখতে পাচ্ছে ও৷ দেখতে পাচ্ছে টাকা জোগাড়ের একটা উপায়৷ তাই সবটা না বুঝলেও কথাগুলো মেনে নিল রুপেশ৷

—‘তাই হবে৷ যা তুমি বলছ তাই হবে বটুকদা৷’

—‘বেশ৷ তাহলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চলে আয় শহরে ট্রেন ধরে৷ ঠিকানা পত্র সব তোকে এস এম এস করে দিচ্ছি৷

কট করে কেটে গেল লাইন৷ দু-এক মুহূর্ত হতভম্বের মতো বসে থেকে আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াল রুপেশ৷ এবার সবটা গুছিয়ে নিতে হবে৷ হাতে আর সময় যে বেশি নেই৷ সব থেকে আগে শাহিনকে বোঝাতে হবে৷ ওকে বোঝাতেই হবে যে রুপেশকে যেতে হবে দূরে৷ হ্যাঁ শাহিন এর জন্য, শাহিনকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যই আজ ওকে যেতেই হবে শাহিনকে ছেড়ে৷ আর যে কোনো উপায় নেই৷

হুহু করে শহরের সীমানা ছাড়িয়ে ছুটে চলেছে ক্যাবটা৷ আর স্যানডির মনের হুহু ভাবটাও বেড়েই চলেছে ক্রমশ৷ আজ তাহলে সত্যি সত্যি ও রুপেশ থেকে স্যানডি হয়ে যাবে৷ বারবার ওর আজ মনে পড়ছে শাহিনের কথা৷ কী করছে পাগলিটা? এখানে আসার পর কয়েকবার ফোনে কথা হয়েছে মেয়েটার সাথে৷ কথা হলেই বারবার কান্নাকাটি করে৷ আর তখনই আরও বেশি দূর্বল হয়ে পড়ে রুপেশ৷ কিন্তু দুর্বল হলে যে ওর চলবে না৷ এখানে আসার আগেও কী ভীষণ কান্নাকাটি করেছিল শাহিন৷ রুপেশেরও যে বুকটা ফেটে যাচ্ছিল সে কথা যদি বুঝত মেয়েটা! তবে ও চিকিৎসা শুরু হয়ে গেছে রুপেশের পাঠানো টাকায়৷ জগা জ্যাঠা আর জ্যেঠির থেকে সব খবর তো পাচ্ছে রুপেশ৷ সত্যি এই মানুষ দুটো না থাকলে কী যে হত! ওরা রুপেশদের বস্তিতেই থাকে৷ সন্তান নেই, তাই শুরু থেকেই শাহিনকে বড্ড ভালোবাসত ওরা৷ ওদের হাতে শাহিন এর ভার ছেড়েই তো এখানে এসেছে রুপেশ৷

প্রথম যেদিন এখানে বটুকদা-র কাছে এল রুপেশ সেদিনটা খুব মনে পড়ছে আজ৷ শুরুতেই বটুকদা বলেছিল বটুক নাকি বটুক নেই এখন৷ ও নাকি এখন ডিউক৷ আর তেমনি রুপেশও নাকি কাজে ঢুকলে আর রুপেশ থাকবে না৷ হয়ে যাবে স্যানডি বা সানি বা রনি এমন কিছু৷ আরও বলেছিল বটুকদা—

—‘শোন এ কাজে ঢোকা সোজা৷ কিন্তু বেরোন সোজা না৷ এ কাজের ব্যাপারে কোথাও কোনো কথা বলবি না, বা পালাবার চেষ্টা করবি না৷ কোনো চালাকি কিন্তু বসরা বরদাস্ত করবে না এই আমি বলে দিলাম৷ যদি কোনো চালাকি করিস তাহলে কিন্তু মারা পড়ে যাবি বললাম৷ তুই চিনিস না আমাদের এই বসদের৷ এদের অনেক জোরদার ক্ষমতা৷ এদের সাথে লেগে তোর আমার মতো চুনো পুঁটি পুরো থেঁৎলে যাবে৷ তবে হ্যাঁ মন দিয়ে কাজ কর পয়সার মুখ দেখতে পাবি তোকে গ্যারান্টি দিচ্ছি৷ কিরে বুঝলি?’

না৷ রুপেশ কিছুই বুঝতে পারছিল না৷ একটা অজানা আতঙ্ক শুধু গ্রাস করছিল ওকে৷ ঠিক কি কাজ করতে হবে ওকে? এ কোথায় এসে পড়ল ও? রুপেশের ফাঁকা চাহনি দেখে বোধ হয় কিছু আন্দাজ করেছিল বটুক৷ তাই বলে উঠেছিল— ‘এই তো সবে এসেছিস জার্নি করে৷ এখন একটু আরাম কর৷ তোকে সন্ধ্যায় নিয়ে যাব এক জায়গায়৷ তখন সব বুঝে যাবি৷’

বটুকদা নিজের কথা মতো সেদিন ওকে সন্ধ্যার দিকে নিয়ে গিয়েছিল সেই নির্দিষ্ট জায়গাটায়৷ একটা ফ্ল্যাট৷ সেখানে বসে রয়েছে কয়েকজন লোক৷ ওদের মধ্যে বেঢপ মোটা আর টাকমাথা একটা লোক রুপেশকে দেখেই বটুকদা-কে বলে উঠেছিল—

—‘আরে ডিউক, তেরা ইয়ে দোস্ত তো কাফি চিকনা হ্যায় রে৷’ তারপর চোখ টিপে আবার বলেছিল ‘ইসকা টেরনিং আগার ঠিক ত্যারা সে হাম দে পায়ে তো ফের ইয়ে তো কামাল দিখায়গা রে৷’ লোকটার কথা শেষ হতেই বটুকদা সহ ঘরের সবাই ফেটে পড়েছিল এক অদ্ভুত অট্টহাসিতে৷

রুপেশের মুখখানা ভয়ে শুকিয়ে আমসি হয়ে গেছিল তখন৷ কিন্তু ওর সেই রং উড়ে যাওয়া চেহারাকে পাত্তা না দিয়েই ওরা বুঝিয়েছিল কাজের ব্যাপারটা৷ কাজটা শুনে আঁতকে উঠেছিল রুপেশ৷ ওকে করতে হবে পুরুষ দেহব্যবসায়ীর কাজ৷

—‘মানে এসব কি বলছ তোমরা?’ কাতর গলায় বটুকের দিকে তাকিয়ে বলেছিল রুপেশ৷ পুরুষ দেহব্যবসায়ী? এমন আবার হয় নাকি? রুপেশ মহিলা দেহব্যবসায়ী বা বেশ্যার কথা শুনেছে৷ পয়সার জন্য নিজেদের সম্মান আর শরীর বিক্রি করে এরা৷ কিন্তু পুরুষ দেহব্যবসা? এসব কোন গ্রহের কথা!

বটুকই তখন বুঝিয়েছিল রুপেশকে৷ বলেছিল বড়ো বড়ো শহরের আনাচে কানাচে মহিলা দেহব্যবসায়ীর মতো পুরুষ দেহ ব্যবসায়ীদের অস্তিত্বও নাকি গজিয়ে উঠছে দিনে দিনে৷ পয়সাওয়ালা অথচ নিঃসঙ্গ একাকী অনেক মহিলাই নাকি পয়সার বিনিময়ে কিনে নেয় পুরুষদের যৌন সঙ্গ৷ আর শুধু তাই নয় অনেক সমকামি পুরুষও নাকি অর্থের বিনিময়ে ভাড়া নেয় অন্য পুরুষের শরীর৷ বটুকদের কোম্পানি বড়ো বড়ো পয়সাওয়ালা ক্লায়েন্টদের ভাড়া দেয় তেমনই পুরুষ দেহব্যবসায়ী৷ গোপন এ ব্যবসা চলছে ভালোই৷ কিংবা কে জানে ওপর মহলে আঁতাতও থাকতেই পারে এদের৷

—‘না না৷ আমি পারব না এসব৷ আমি যে শাহিন এর মাথা ছুঁয়ে কথা দিয়েছি’... বলতে গিয়ে গলা কেঁপে গেছিল রুপেশের৷ বলতে পারেনি ও৷ বটুকদা যে শুরুতেই বলেছিল এ পথে আসা সহজ, কিন্তু বেরনো ততটাই কঠিন৷ তা ছাড়া বেরিয়ে ও যাবেটাই বা কোথায়? শাহিন এর চিকিৎসার খরচ যোগাবার আর যে অন্য কোনো পথ নেই ওর৷ আজ ও বুঝতে পারছে যে ভালোবেসে যে শুধু মেয়েরাই অগ্নিপরীক্ষা দিতে পারে এমন নয়, ভালোবাসায় সবাই সমান৷ সত্যিকারের ভালোবাসা পুরুষদেরও সম্মুখীন করে কঠিন থেকে কঠিনতম অগ্নিপরীক্ষার৷ রুপেশ জানে না ও জিতবে কিনা, জানে না ভবিষ্যৎ আর কি কি অন্ধকার দেখাবে ওকে, ও শুধু জানে ওকে যেভাবেই হোক বাঁচাতে হবে নিজের ভালোবাসার মানুষটাকে৷

—‘স্যারজি আ গেয়া আপ কা লোকেশান৷’ ক্যাব চালকের স্বরে হুঁশ ফিরল রুপেশের৷ ভাড়া মিটিয়ে নামল রুপেশ৷ একটা গেস্ট হাউস৷ হ্যাঁ এখানেই তো আসার কথা ছিল ওর৷ শহরের সীমানার বাইরের এই গেস্ট হাউসেই তো থাকার কথা ওর ক্লায়েন্টের৷ ভাড়া মিটিয়ে নামল রুপেশ৷ এগিয়ে গেল ধীর পায়ে ৩১৩ নম্বর ঘরের দিকে৷

বেল টিপতেই দরজা খুলল বেঢপ মোটা, প্রায় টেকো এক মহিলা৷ বয়স রুপেশের মামির মতোই হবে৷ তবে বেশ ধনী দেখেই বোঝা যাচ্ছে৷ রুপেশের সারা শরীরটা যেন চোখ দিয়ে জরিপ করে নিল সে৷ তারপর দু-দিকে গাল ছড়িয়ে হাসল বিশ্রী ভাবে৷ ভাঙা ভাঙা কালচে ছাপ পরা দাঁত বেরোতেই আরও কুশ্রী দেখাল তাকে৷

—‘হ্যালো ম্যাম৷ আই আম স্যানডি, নাউ অ্যাট ইয়োর সার্ভিস৷’ সদ্য শেখা পেশাদারী চালে কথাগুলো বলল রুপেশ৷ বুকের ভিতর অসম্ভব তোলপাড় চলছে ওর৷

মহিলা অল্প একটু মাথা দোলাল৷ তারপর ক্ষিপ্র শকুনের গতিতে এগিয়ে এসে নিজের মোটা আর খসখসে ঠোঁট দুটো ঘষে দিতে লাগল রুপেশের ঠোঁটে৷ উগ্র পান মশলা আর মদের গন্ধে গা গুলিয়ে উঠল রুপেশের৷ ইচ্ছে করল এক ধাক্কায় ওই মহিলাকে ধরাশায়ী করে ছিটকে সরে যেতে৷ কিন্তু না, অদৃশ্য শেকলে যে বাঁধা রয়েছে ও৷ ওর যে অগ্নিপরীক্ষা৷ ভালোবাসার পরীক্ষা৷ রুপেশ নিজেকে মেলে ধরতে চেষ্টা করল আস্তে আস্তে৷ ও বুঝতে পারল ও মহিলা ক্রমে টানতে টানতে নিয়ে যাচ্ছে বিছানার দিকে৷ রুপেশ দু-চোখ বন্ধ করল৷ ও বুঝতে পারল ও আস্তে আস্তে পরিণত হচ্ছে একটা রক্ত মাংসের পুরুষ শরীর রূপী যন্ত্রে৷ হঠাৎ যেন ও দেখতে পেল এই মুহূর্তে ওর থেকে বহুদূরে থাকা ওর শাহিনকে, ওর ছোট্ট সংসারটাকে৷ শাহিন যেন হাত মেলে ডাকছে ওকে আর রুপেশ যেন চিৎকার করে বলছে— ‘তুই ভালো হয়ে যাবি রে বউ৷ একদম ভালো হয়ে যাবি৷ আবার তারপর সব আগের মতো হয়ে যাবে৷’ হ্যাঁ রুপেশ আবার একদিন ঠিক ফিরবে ওর শাহিনের কাছে৷ কারণ রুপেশ যে শুধু শাহিনের৷ আবার সেদিন রাতের বেলায় শাহিনের মাথা নিজের বুকে চেপে বলবে রুপেশ— ‘তুই যে আমার সব রে পাগলি৷ তুই যে আমার জগত৷’ শুধু সেই দিনটার জন্যই যে এত কিছু আজ৷ না রুপেশ হারবে না, ওর ভালোবাসাকে ঠিক জিতিয়ে দেবে ও৷ সব আবার আগের মতো ঠিক করে দেবে ও৷ আবার শুধু বাঁচবে রুপেশ শাহিন আর ওদের ছোট্ট পৃথিবী ভর্তি এক সমুদ্র ভালোবাসা৷

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%