পল্লবী সেনগুপ্ত
অনুভার কথা
—‘বলো দুগগা মাইকি জয়... বলো দুগগা মাইকি জয়... আসছে বছর আবার হবে... আসছে বছর আবার হবে’... চিৎকারটা আবছা হতে হতে এবার মিলিয়ে গেল দূরে৷ বুঝলাম এই বছরের মতো বিদায় নিলেন মা দুর্গা৷ আমি মানে আমি অনুভা দাস যথারীতি পূজার বাকি দিনগুলোর মতোই পুজোর শেষ দিনেও বিছানায় শুয়ে৷ অবশ্য অন্য বছরগুলোতেও যে আমি বাকি পৃথিবীটার মতো আনন্দের সমুদ্রে ঢেউ তুলে ভেসে যাই তা মোটেই নয়, কিন্তু হ্যাঁ পাড়ার মণ্ডপে টুকটাক কাজে কাকিমাদের সাহায্য করা, একটা মাত্র যে নতুন সালোয়ার পাই সেটা পরে অষ্টমীর সকালে অঞ্জলি দেওয়া বা আমার বয়সি আমার পাড়ার অন্য দু-একটা মেয়ের সাথে একটু আধটু গল্প করা এসব করে থাকি৷ অন্তত গত বারো বছর তাই করছি৷ বারো বছর বলছি কারণ আমার বয়স এখন ষোল আর প্রথম চার বছরের স্মৃতি আমার মোটা মগজে খুব একটা চকচকে শান নিয়ে বেঁচে নেই৷
না, এবছর সে সব কিছুই করতে পারিনি৷ কারণ পুরো পুজোটাতেই আমি ছিলাম বিছানায় বন্দি৷ আর আমি জানি এটাই এই পৃথিবীতে আমার শেষ পুজো৷ কারণ আমি আর বাঁচব না সেটা আমি জেনে গেছি৷ অবশ্য আমার মতো একটা নিষ্প্রয়োজন প্রাণ এই পৃথিবীতে আর বেঁচেই বা কি করবে? কবেই বা কার কোন উপকারে লেগেছি আমি? আমি দেখতেও সুন্দর নই৷ বয়সের ধর্ম অনুযায়ী যখন কোনো যৌবন পেরনো ছেলে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করে, যখন আমার চোখ ছুঁয়ে যায় কোনো পুরুষের চিবুক; লক্ষ্য করেছি কেমন একটা অব্যক্ত ঘৃণায় যেন শিউরে ওঠে সে৷ লজ্জায় তখন কেমন সিঁটিয়ে যাই আমি, বুঝতে পারি আমি এবং আমার দৃষ্টি বা সান্নিধ্য খুব আপাংক্তেয় সবার কাছে৷ হ্যাঁ পড়াশুনায় বোধ হয় আমি মন্দ না৷ তবে তাতেই বা কি? আমার মতো হত দরিদ্র পরিবারের মেয়েরা গল্পেই পড়া লেখা শিখে জজ ব্যারিস্টার হয়৷ বাস্তবে নয়৷ তবে আমি জানি আমি মরে যাবার পর একটা মানুষ একদম নিঃস্ব হয়ে পড়বে৷ আমার চলে যাবার পর আর সে বেশিদিন বাঁচবেই না হয়তো৷ সেই মানুষটা হল আমার দাদু৷ আমিই যে দাদুর সবটুকু পৃথিবী আর দাদু আমার৷ আমায় জন্ম দিতে গিয়ে চলে যান আমার মা৷ তাই স্বাভাবিকভাবেই তার সাথে পরিচয়ের সৌভাগ্য থেকে আমি বঞ্চিত সেই জন্মলগ্ন থেকেই৷ তার বাবা? তিনি তো ইহলোকের মায়া কাটিয়েছিলেন আমার জন্মেরও মাস চারেক আগেই৷ তাই আমার ছোটোবেলা থেকে ওই একটা লোকই আমার বাবা, মা, ভাই বোন, বন্ধু সব কিছু৷ আমার দাদু৷ আমার দাদু একটা খুব ছোটো কারখানায় কাজ করতেন৷ সেই ছোট্টবেলার দিনগুলোতে দেখতাম দাদু সকালবেলা আমার দুধ বানিয়ে দিদার কাছে রেখে ভোঁ বাজলেই দৌড় লাগাত৷ দিদাও তখন বড্ড আগলে রাখত আমায়৷ মনে পড়ে দাদু মাঝে মাঝে কারখানা থেকে ফিরে বেত, শোলা, রঙিন কাগজ, চকচকে সোনালী জরি, চুমকি এসব দিয়ে কি যেন বানাত৷ তখন আমি একটু বড়ো৷ আধো আধো স্বরে জিজ্ঞাসা করতাম— ‘এগুলো কী দাদু?’
—‘এগুলো খেলনা গো দিদিভাই৷ আমি তোমায় খেলনা বানিয়ে দেব গো৷’ হেসে হেসে বলত দাদু৷ সত্যি হতও তাই৷ কী সুন্দর সুন্দর হাতের কাজের পুতুল বানাত দাদু৷ কিন্তু দিদা রেগে যেত৷ বলতো— ‘আবার ওসব পাগলামো নিয়ে পড়লে তুমি? আবার এসবের জন্য গাদা পয়সা খরচা করেছ তো?’ তখন আমি বুঝতাম না ব্যাপারখানা ঠিক কি? দাদু যেদিনই আমার জন্য খেলনা বানায় কেন দিদা অমন রাগ করে? আরও খানিক বড়ো হবার পর খানিকটা দিদার থেকে শুনে আর নিজের মগজ খাটিয়ে ধরেছিলাম ব্যাপারটা৷ দাদুর মধ্যে নাকি বহুকাল থেকেই বাসা বেঁধে আছে এক পাগলামি বা ছেলেমানুষি৷ শিল্পী হবার পাগলামি৷ দাদু নাকি বরাবরই নিজে নিজে এসব সরঞ্জাম কিনে এনে পুতুল টুতুল বানায়৷ একে তো অভাবের সংসার৷ তাইতে কি দিদার আর এসব পাগলামো ধাতে সয়৷ ইশশ! সেদিন কি আর দিদা জানত যে একদিন এই হাতের কাজই বাঁচিয়ে রাখবে দাদুকে৷
দাদুর ভাগ্যটাও আমার মতোই পোড়া৷ তাই কারখানার চাকরি থেকে দাদুর অবসরের পরপরই ধরা পড়ল দিদার ক্যান্সার৷ খারাপ সময় আসলে কাকে বলে তখনই বুঝেছিলাম আমি৷ প্রায় ছ-মাস নিজের সাধ্যমতো দাদু আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল দিদাকে বাঁচানোর৷ কিন্তু তবুও শেষ রক্ষা আর হল না৷ চলে গেল দিদা৷ এদিকে ততদিনে আমাদের অভাবের সংসার ফুটিফাটা হয়ে গেছে আরও শতগুণ৷ জমানো শেষ কপর্দকটাও আর নেই৷ এটা এই বছর তিন চারেক আগের কথা বলছি৷ তখন থেকে আমাদের রোজগারের উপায় শুধুমাত্র এই বাড়িটার সামনের ফালি অংশটুকুর ভাড়া আর দাদুর হাতের কাজের বানানো পুতুল আর খেলনা৷ পাগলের মতো পরিশ্রম করে বুড়ো মানুষটা৷ সারা বিকাল আর সন্ধ্যা বানায় এসব, তারপর রোদ জল সব উপেক্ষা করে স্কুল গুলোর দোরে দারে ঘোরে, যদি বাচচারা কেনে এসব৷ যে কোনো মেলায় দৌড়ে যায়৷ না স্টল দেবার ক্ষমতা তো আমার দাদুর নেই, কিন্তু যদি ওই মেলার বাইরে একচিলতে জায়গায় দাঁড়িয়ে বেচা যায়! প্রতি বছর পুজোর সময় বড়ো বড়ো প্যান্ডেলের বাইরে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে সারাদিন, যদি বিক্রি বাটা করে লাভ করা যায়! কিন্তু হায় রে! বোকা ওই বুড়ো মানুষটা বোঝেই না যে আজকালকার সেলফি, মোবাইল, ভিডিয়ো গেমস আর ঝাঁ চকচকে ডিজিটাল দুনিয়ার যুগে দাদুর প্রাণ ঢেলে বানানো ওই হাতের কাজের পুতুল আর খেলনা যে পিছিয়ে পরার নিশানা৷ কেতাদুরস্ত কর্পোরেট বাবা মায়েরা কি কখনো চাইতে পারে যে তাদের স্মার্ট আর চকচকে বাচচারা হাতে ট্যাব-এর বদলে দাদুর বানানো ওই পুতুল নিক! ওগুলো যে তাদের কাছে বাড়তি আবর্জনার মতো৷ দাদুর মুখটা দেখে কষ্টে আমার বুকটা জ্বলে যায়৷ আমি জানি আমার দাদু অসাধারণ একজন শিল্পী৷ শুধু আমি কেন আমাদের পাড়ার সবাই বলে দাদুর হাতের বানানো পুতুল যেন বিশ্বকর্মার তৈরি৷ কিন্তু এই পোড়া দেশে এমন হাজার হাজার শিল্পী যে শুধুই ব্যর্থ ফেরিওয়ালা হয়ে বেঁচে থাকে৷ যাদের থেকে কিছু সামগ্রী কেনা তো দূর, যাদের কে বোধ হয় অনেক তথাকথিত উচচবিত্ত মানুষ ভিখারির চোখে দেখে৷ যেখানে তেরো চোদ্দো কোটি টাকা দিয়ে থিম পুজোর প্যান্ডেল তৈরি হয়, সেই প্যান্ডেল এর বাইরে সারাদিন দাঁড়িয়ে থাকে আমার দাদুর তিরিশ টাকার পুতুলও বিক্রি হয় না৷ যে শহরে উৎসবের আনন্দের নামে এক একদিনে হাজার হাজার টাকা রেস্তোরার বিল মেটায় মানুষ, সেই শহরেই আমার দাদু সারাদিন না খেয়ে থেকে চেষ্টা করে যায় দু-একটা ‘মাল’ বেশি বিক্রি করার৷ হ্যাঁ ‘মাল’ই বললাম৷ কারণ আমার দাদুর মতো শিল্পীদের প্রতিভা ‘মাল’ হয়েই ফেরি হয় বাজারে প্রতিদিন নিতান্ত জলের দরে৷ দাদুর এই সংগ্রাম দেখে আমি দাঁতে দাঁত ঘষে প্রতিজ্ঞা করেছি বহুবার যে দাদুর সব কষ্ট মিটিয়ে দেব আমি৷ শত অভাবেও দাদু আমার লেখাপড়া কোনোদিন বন্ধ হতে দেয়নি৷ তাই ভেবেছিলাম পড়াশুনা শিখে বড়ো মানুষ হয়ে একদিন দাদুর জন্য যোগ্য সম্মান ঠিক ছিনিয়ে আনব আমি৷ কিন্তু ওই যে তখন বললাম৷ ওসব গল্প বা সিনেমায় শুধু হয়, বাস্তবে নয়৷ বাস্তবে আমার মতো অনুভারা মুখ থুবড়ে পড়ে, মরে যায়৷ এই যেমন আমি মরতে চলেছি৷ আসলে আমি জন্মের সময়তেই আমার হূৎপিণ্ডে একটা ফুটো নিয়ে জন্মেছিলাম৷ তাই নিয়ে নানা সময়ে নানা ভাবে টুকটাক ভুগেছি৷ কিন্তু না, ব্যাপারটা এবার অনেক জটিল হয়ে গেছে৷ গত কয়েক মাস পুরো বিছানায় বন্দি আমি৷ ডাক্তাররা বলেছেন অনেক খরচ সাপেক্ষ কি সব অপারেশন না করালে আমি নাকি বাঁচব না৷ আর এটা শোনার পর থেকেই একদম পাগলা হয়ে গেছে দাদু৷ জানি না কোথায় কোথায় ঘুরে বেড়াচ্ছে টাকা জোগাড়ের জন্য, কি সব করছে কিছু বুঝতে পারছি না৷ শুধু এটুকু জানি ও খরচ জোগাবার সাধ্য ওই বুড়ো মানুষটার নেই৷ হঠাৎ কি হয়েছে দু-দিন হল জানি না৷ এই দেবীপক্ষ পরার পর থেকেই দেখছি দাদু যেন কেমন বদলে গেছে৷ চোখে মুখে চিক চিক করছে খুশি৷ শুধু বলছে— ‘বুঝলি দিদি, তোকে এ যাত্রায় বাঁচিয়ে দেবই আমি৷ সব ব্যবস্থা করে ফেলেছি৷ মা দুগগা যে আমায় শুধু হাতে ফেরাবেন না৷’
জানি না দাদু কি ভাবছে৷ কোনো ভাবেই মুখ খোলাতে পারছি না লোকটাকে৷ দাদু কি তবে এই বসত বাড়িটার এক ফালি ছাদটুকু বেচে দিয়ে চিকিৎসা করাতে চাইছে আমার? হে ভগবান! এমনটা হওয়ার আগে যেন নিঃশ্বাসটা থেমে যায় আমার৷ শেষ বয়সে কি তবে পথে বসবে মানুষটা? হে ঈশ্বর আমারও তবে বিসর্জন হয়ে যাক, হয়ে যাক এই দশমীতেই৷
সুপ্রিয়ার কথা
পুজোর জন্য ছুটি ছিল আমাদের স্টুডিয়ো পাড়ায় লাস্ট কয়েকটা দিন৷ গতকাল দশমীর পর আবার ছন্দে ফিরেছে সব৷ আমি মানে সুপ্রিয়া লাহিড়ী রোজকার মতোই গাড়ি থেকে নেমে গটমট করে হেঁটে এগিয়ে গেলাম নিজের ফ্লোরের দিকে৷ আমি যে এই টলি পাড়ার বেশ নামকরা শিল্পী সবাই তা এক কথায় স্বীকার করে নেবে সে নিয়ে কোনো দ্বিধা নেই আমার৷ যদিও আমার উত্থানটা ঘটেছিল মেগা সিরিয়ালের হাত ধরেই, কিন্তু এখন আমি বাংলা আর্ট ফিল্মের জগতেও নিজের বেশ একটা আলাদা জায়গা করে নিয়েছি৷ এমনকী বলিউড থেকেও টুকটাক কাজের অফার পাচ্ছি৷ তবে বাংলা ছবিতে আমার ব্যস্ততা এখন বাড়লেও মেগা সিরিয়ালের কাজ আমি এখনও ছাড়িনি৷ ‘রূপকুমারী’ সিরিয়ালটায় বিশেষ একটা ডাকসাইটে রোলে আছি৷ আরে! আমরা হচ্ছি শিল্পী মানুষ৷ দর্শকদের কাছাকাছি থাকা নিয়েই কাজ৷ মাধ্যম সে ছবি হোক বা ছোটো পর্দা৷ এ বছর তো ‘অন্য আকাশ’ ছবিটার জন্য ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড এর নমিনেশনেও আছি আমি৷ পেয়েও যাব জানি৷ কারণ ভালো কেরিয়ার বানাতে গেলে মন দিয়ে কাজ করার পাশাপাশি যেটা দরকার তার সবটাই আমি করি৷ ওপর মহলে যাতায়াত, তেল টেল বেশ ভালোই মারা এই আর কি৷ সব কিছু মিলিয়ে আমার কেরিয়ার গ্রাফটা যে বেশ ভালো তা আমি জানি৷ অনেকেই সে জন্য বেশ ঈর্ষার চোখে দেখে আমায়৷ কিন্তু এর সবটাই মাটি হতে বসেছিল শুভেন্দুর জ্বালায়৷ শুভেন্দু মানে আমার তথাকথিত বর৷ উফফ! কী কুক্ষণেই যে বিয়ে করেছিলাম ওই অপদার্থটাকে৷ আসলে তখন কম বয়স ছিল লোকটার, সবে আর্ট কলেজ থেকে পাশ দিয়েছে৷ স্টুডিয়ো পাড়ায় ভালোই যাতায়াত আর্ট ডিরেক্টরের সহকারী হিসাবে৷ আর আমিও তো আর সেদিন আজকের মতো হনু ছিলাম না৷ ছিলাম মাটি কামড়ে পড়ে থাকা একজন উঠতি অভিনেত্রী৷ যাই হোক সেই সময়ই আমাদের প্রেম, তারপর বিয়ে৷ আর এই বিয়ের কয়েক বছরের মধ্যেই আমি টের পেলাম এই লোকটা অপদার্থ৷ অসহ্য রকমের মাতাল আর কুঁড়ে৷ তখন থেকেই সম্পর্ক শিথিল হতে শুরু করে আমাদের৷ কি মায়ায় যে আটকে আছি এখনও ওর সাথে কে জানে! নিজেই বুঝি না মাঝে মাঝে৷ নইলে গত বছরই তো ছেড়ে দেওয়া উচিত ছিল আমার ওকে৷ ওর জন্যই তো আমার নিন্দুক আর শত্রুগুলো এত কথা বলার সুযোগ পেল আমার বিরুদ্ধে৷ কথা নেই, বার্তা নেই ড্রাগ কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়ে নিজের নাক কাটল আর সাথে আমারও৷
—‘দিদি, শুভদা তো ফাটিয়ে দিয়েছে গো৷ এই পার্টিটা কবে দিচ্ছ গো?’ শেলি মানে ‘রূপকুমারী’র লিড অ্যাকট্রেসের ডাকে চমকে তাকালাম৷ দেঁতো হাসি হেসে বললাম— ‘এনি ডে রে৷ যবে একটু ফাঁকা পাব আমরা সবাই৷’ কথা শেষ হতে না হতেই ঢুকে এল প্রমা মানে আমাদের ডিরেক্টর৷
—‘হাই প্রিয়া, কনগ্র্যাচুলেশনস৷ শুভর সাকসেস এর পার্টিটা কবে পাচ্ছি?’ আবার যথারীতি মেকি হেসে একই জবাব দিলাম আমি৷ বুঝতেই পারছি যে আজ মানে আপাতত কিছুদিন চলবে এই আদিখ্যেতাটা৷ আসলে শুভঙ্করের ডিজাইন করা থিমের পুজো এবার আঠারোটা শারদ সম্মান পেয়েছে৷ সব পুজো উদ্যোক্তারা শুধুই ওকে চাইছে নেক্সট ইয়ারে৷ এমনকী ও দিল্লি যাচ্ছে একটা বিশেষ কনফারেন্সে এই সূত্রেই৷ বিদেশেও ডাক পেয়েছে৷ এতদিনে চাপা পড়ল ওর ড্রাগ কেচ্ছাটা৷ হ্যাঁ, এটা ঠিক যা কিছু আজ পাচ্ছে শুভ তা আমার প্রভাব প্রতিপত্তি ছাড়া হত না৷ যা হচ্ছে তার সবটাই তো... কিন্তু আমিই বা কি করব৷ নিজের সম্মান বাঁচাতে এটুকু যে বড়ো দরকার ছিল৷ আর হাজার হোক আমার বর তো৷ না, আগামী দিনেও সব রকম পরিস্থিতি সামাল দিতে আমারও যা যা করণীয় তা করে আমাকে ওর পাশে থাকতেই হবে৷ শুভর সম্মান বাড়া মানে তো আসলে সুপ্রিয়া লাহিড়ীর বরেরই স্ট্যাটাস বাড়া৷ লাভটা যে আমারই৷
নাম তার নিকুঞ্জ দাস
বুড়ো লোকটা একটু ঘাবড়েই গেছে বোধ হয় এত বড়ো ঝাঁ চকচকে বাড়িটা দেখে৷ তবু ধীর পায়ে এগিয়ে গেল৷ পকেট থেকে একবার বের করে দেখে নিল ঠিকানা লেখা ভাঁজ করা কাগজটা৷ হ্যাঁ এটাই তো৷ কলিং বেল এর ওপর আঙুল ছোঁয়াতেই দরজা খুলে দিল বাড়ির চাকর৷
—‘আজ্ঞে আমার নাম নিকুঞ্জ দাস৷ মিত্তির বাবু আমায় আসতে বলেছিলেন৷’ খুব সংকুচিত ভাবে বলল বুড়ো মানুষটা৷
—‘অ আপনি সেই...৷ ঠিক আছে বসুন৷’ চাকর চলে গেল ভিতরে৷ কিছুই বুঝতে পারছে না নিকুঞ্জ দাস৷ কেন তার ডাক পড়ল এখানে৷ এখনও তো সবটাই ধোঁয়াশায় ঢাকা৷ এখন তো এমনিতেই নিকুঞ্জ দাসের মাথার ঘায়ে কুকুর পাগল অবস্থা৷ অনেক অনেক টাকার দরকার৷ দিদিভাই এর অপারেশন করে ওকে বাঁচাতেই হবে৷ হাতে সময়ও কম৷ এদিকে এখনও তেমন কিছুই হল না৷ বাড়িটা বেচা ছাড়া আর তো কিছু উপায় নেই৷ যেভাবেই হোক বেচতে হবে৷ তার পরে কী হবে সে পরে দেখা যাবে৷ কিন্তু গতকাল হঠাৎ সব যেন এলোমেলো হয়ে গেল৷ উত্তর কলকাতার লেকটাউন চত্বরে বড়ো ফুট ব্রিজটায় সকালের দিকে বসে পুতুল ফেরি করে নিকুঞ্জ৷ সল্টলেকে গুচ্ছের বাচচাদের স্কুল হয়েছে এখন৷ ওদের সিংহভাগ যাতায়াত করে ওই সময়টায়৷ ওরাই ওই সময়টার টার্গেট খরিদ্দার৷
—‘দাদু তুমি এখানে রোজ বিক্রি কর তো৷ তাই না? তোমার সাথে একটু দরকার ছিল কথা বলতে পারবে?’ একটা অপরিচিত গম্ভীর স্বরে কাল হঠাৎ চমকে তাকিয়েছিল নিকুঞ্জ৷ একটা ঢ্যাঙা মতো কোট প্যান্ট পরা ভদ্দরবাবু৷
—‘আমার সাথে দরকার কি বাবু? পুতুল নেবে নাকি ছেলের জন্য?’ থতমত খেয়ে কাল বলেছিল বুড়োটা৷
—‘হ্যাঁ পুতুল নেব৷ অনেক পুতুল৷ অত পুতুল হয়তো তুমি এ জীবনেও বিক্রি করনি৷ অনেক টাকার ব্যাপার৷ এই নাও ঠিকানা কাল সকালে চলে যেও৷’
সেই মতোই তো এসেছে আজ নিকুঞ্জ দাস৷ কিন্তু এখনও তো মাথায় ঢুকছে না কিছুই৷
—‘ও তুমি এসে গেছ!’ একটু ব্যস্ত ভাবে এবার সিনে এল সেই ঢ্যাঙা বাবুটা৷ নিকুঞ্জের উল্টো দিকের চেয়ারটায় বসে বলল— ‘শোনো তোমায় আমাদের জন্য কাজ করতে হবে৷ তাই ডেকেছি তোমায়৷ কিছু কঠিন কাজ না৷ পুতুল বানানো আর খেলনা বানানোর কাজ৷ তোমার বানানো পুতুল দিয়ে সেজে উঠবে দক্ষিণ কলকাতার নাম করা পুজো মণ্ডপ৷’ ফ্যালফ্যাল করে তাকাল নিকুঞ্জ দাস৷
—‘মানে বাবু? এসব কি বলছেন আপনি? আমার মতো একটা অনামি শিল্পী যে কিনা আসলে একটা রাস্তার হকার তার কাজ গিয়ে কিনা...’
—‘আঃ তুমি এত কেন ভাবছ? তুমি এসে কাজ করবে আমাদের ওয়ার্কশপে মানে আমাদের অফিসে বসে বানাবে তুমি৷ সব মাল আমরা দেব তোমায়৷ তুমি শুধু বানাবে৷ আর টাকা পাবে তুমি যথেষ্ট৷ মন খুশি হয়ে যাবে তোমার৷ নাম ধাম নিয়ে এত ভেবো না তুমি৷ তুমি কাজ করবে অন্য একজনের হয়ে৷ একজন নাম করা শিল্পীর হয়ে৷ তিনি নিজেই সব করতে পারেন, নেহাতই তিনি ব্যস্ত মানুষ তাই...’
—‘বুঝতে পেরেছি বাবু৷’ ধরা গলায় বলল বুড়োটা৷
—‘বাঃ এই তো৷ তাহলে কাল থেকেই লেগে পড়৷ সময় তো আর বেশি নেই৷ পুজো তো এসেই গেল প্রায়৷ এই রাখ ওয়ার্কশপের ঠিকানা৷ চলে এসো কাল৷ তখন না হয় কিছু অগ্রিমও দেওয়া যাবে তোমায়৷’
চলে গেল বুড়োটা আর হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম আমি মানে আমি অরূপ মিত্তির৷ এই দিদি কাম বস এই সুপ্রিয়া লাহিড়ীও হয়েছে তেমন৷ ওর পি এ কাম ভাই হয়েই তো এখন আমার সব ফুটানি৷ তাই ওর মন রেখে তো চলতেই হবে৷ জামাইবাবু মানে শুভদা দা গত বছর সেই কেচ্ছাটায় জড়িয়ে পড়ার পর থেকেই দিদি শুধু সুযোগ খুঁজছিল কীভাবে জামাইবাবুর ইমেজ ক্লিন করা যায়৷ আর সেই সুযোগ ওকে পেতে হল আমার ডেরা মানে বাসা থেকেই৷ তাতাই মানে আমার ছেলেটাকে দিদি খুব ভালোবাসে৷ হাজার ব্যস্ততা সত্ত্বেও সপ্তাহে একদিন চেষ্টা করে এখানে আসতে৷ সেদিন এসে হঠাৎ দেখল তাতাইয়ের কাছে কয়েকটা সস্তার হাতে বানানো খেলনা৷ কি পাগলামো ওকে ভর করল জানি না৷ ও বুঝেই গেল নাকি এই সব কাজ নিয়ে যদি কোনো পুজোর থিম সাজানো যায় তাহলে নাকি দারুণ হবে৷ আমার গিন্নি আনতে যায় ছেলেকে স্কুল থেকে৷ মেঘা বলল কোনো রাস্তার হকার নাকি এগুলো নিজে হাতে বানিয়ে রাস্তায় বসে বেচে৷ ব্যস! আর পায় কে দিদিকে৷ আমার প্রতি হুকুম হল যেভাবেই হোক ওই লোকটাকে খুঁজে আমায় ব্যবস্থা করতে হবে যাতে তার কাজ চালানো যায় শুভদা-র আর্ট এর নামে৷
আরে! দিদি ফোন করেছে যে৷
—‘হ্যাঁরে দিদি বল৷ হ্যাঁ সব ব্যবস্থা হয়ে গেছে৷ ও বুড়ো কাল থেকেই কাজে লেগে পড়বে৷ আমি এদিকটা সামলাচ্ছি তুই ওদিক দ্যাখ৷’
—‘কি বললি? হ্যাঁ হ্যাঁ সব হয়ে যাবে৷ তুই সামলে নে ওদিকটা৷ ব্যস৷’ দিদি ফোন কেটে দিল আর স্বস্তির নিঃশ্বাস নিলাম আমি৷ সব ভালোয় ভালোয় উতরালে আমার জন্য বড়ো পুরস্কার নাচছে নির্ঘাত৷
শিল্পীর কথা
আমার বয়স চৌষট্টি৷ নাম নিকুঞ্জ দাস৷ বয়স চৌষট্টি হলেও আমার আজ চার বছরের খোকার মতো নাচতে ইচ্ছে করছে আনন্দে৷ আনন্দ তো হবেই৷ আমার আদরের দিদিভাই এর অপারেশন যে ভালো ভাবে হয়ে গেছে৷ ডাক্তার বলেছে সব বিপদ কেটে গেছে৷ আর আমি সেই সুসংবাদটা নিয়ে এই সবে ঢুকছি আমার চিলতে ঘরে৷ গিন্নির জন্য জিলিপি কিনেছি আজ৷ বড়ো ভালোবাসে বুড়িটা৷ সেটা ওর ছবির সামনে সাজিয়ে দিতে গিয়েই দেখলাম মিটিমিটি হাসছে বুড়ি৷
—‘কি বুড়ি হাসছ কেন? খুব তো বলতে আমার হাতের কাজ ফালতু৷ ও সব আমার পাগলামো৷ আর আজ? কী বলবে? ধন্য ধন্য করছে সবাই সেই কাজের নামে৷ নাই বা বসল তাতে আমার নাম৷ কিন্তু কাজ যে আমারই গিন্নি৷ আমিই যে আসল শিল্পী৷ আজ আমার শিল্প সার্থক গিন্নি৷ সার্থক৷ আমার হাতের কাজের এত কদর যে মরণের মুখ থেকে কেড়ে এনেছে আমার দিদিভাইকে৷ একটা শিল্পীর এর থেকে বড়ো পাওনা আর কি হতে পারে বলতো?’
ইশশ! আমার গিন্নিটাকে দেখো৷ এখনও ভেংচি কাটছে ছবি থেকেই৷ কি বললে? কি বললে? আসলে আমি রাস্তার হকারই থেকে যাব৷ কেউ জানবে না আমার নাম৷
—‘ঠিক আছে৷ জানার দরকার নেই৷ আমার দিদিভাই তো আবার হেসে খেলে বেড়াবে আমার চোখের সামনে৷ শোনো আর রাস্তায় হকারি করব না আমি৷ আমার চাকরি ওই শুভেন্দু হালদারের কাছে পাকা হয়ে গেছে বুঝলে৷
কিন্তু জান গিন্নি বুকের কাছটায় কেমন যেন একটা কষ্ট পাকিয়ে উঠছে৷ কেন বলতো গিন্নি? চোখে এত জল ঝরছে কেন বুঝতে পারছি না গো৷ আজ তো আমার খুশির দিন৷ তবুও কি যে কাঁটা ফুটছে বুঝতে পারছি নে৷’
না গিন্নিকে বলছি না কিন্তু আমি জানি কি কাঁটা বিঁধছে আমার৷ আমি যে শিল্পী হতে চেয়েছিলাম৷ কিন্তু... কিন্তু...৷ না না না৷ মন শক্ত করতে হবে আমায়৷ দিদিভাইকে অনেক বড়ো মানুষ করতে হবে যে৷ শিল্পী নিকুঞ্জ হেরে গেলেও, দাদু যে হারবে না৷ আর কে বলতে পারে হয়তো আমার দিদিভাইই একদিন মস্ত মানুষ হয়ে ঠিক কেড়ে আনবে ওই বড়ো মানুষগুলোর থেকে ওর দাদুর জন্য তার আসল সম্মানটা দিদিভাই যে আমায় কথা দিয়েছিল একবার৷ না, শিল্পী নিকুঞ্জ দাসের বিসর্জন হয়েছে কে বলেছে? বিসর্জনেই যে লুকিয়ে থাকে বোধন৷ আমার বুক ভাসা এই চোখের জল মুছে আমায় আবার বাঁচার স্বপ্ন দেখতেই হবে৷ সেই দিনটার জন্য যেদিন আমার দিদিভাইয়ের হাত ধরে আমিও প্রাইজ নেব শিল্পী নিকুঞ্জ দাস হয়ে৷ ফোকলা দাঁতে হেসে হেসে বলব বাবুরা আমি ফেরিওয়ালা নই গো৷ আমি যে শিল্পী৷
___
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন