অর্ধাঙ্গিনী

পল্লবী সেনগুপ্ত

ইরার কথা

দু-চোখ ভর্তি আগুন নিয়ে ইরাবতী তাকিয়ে রইল সংগ্রাম চৌধুরীর চলে যাওয়াটার দিকে৷ কী সাঙ্ঘাতিক অপমান! দীর্ঘ চার বছর বিবাহিত জীবন পার করার পর লোকটা এভাবে প্রত্যাখ্যান করল আজ ইরাকে! শুধু ইরা সন্তানের জন্ম দিতে অক্ষম বলে! না, কষ্ট হচ্ছে না ইরার৷ বরঞ্চ একটা কালো অপমানের জ্বালায় ছেয়ে যাচ্ছে বুকের ভিতরটা৷ এখনও কানে বাজছে কথাগুলো৷

—‘না ইরা না৷ এভাবে নিষ্ফল এই জীবনে আমি আর বাঁচতে চাই না৷ বাবা ডাক আমি শুনবোই৷ তাই আমি যমুনাকে বিয়ে করব৷ তোমায় চলে যেতে আমি বলছি না৷ তুমি যেমন আছ থাক৷ আমি নতুন ঠিকানা খুঁজে নেব আমার আর যমুনার জন্য৷’

হ্যাঁ কেন চলে যাবে ইরা? না ও যাবে না৷ এই সংসার ওর নিজের হাতে সাজানো৷ তাই চলে যাবার কোনো প্রশ্নই নেই৷ আর সংগ্রাম চৌধুরীকেও এত সহজে ওকে ঠকাতে দেবে না ইরা৷ যে অপমান আজ ওকে পেতে হল সেই অপমানের জ্বালায় জ্বলবে ওই লোকটাও৷ হ্যাঁ প্রতিশোধ নেবে ইরা৷ প্রতিশোধ৷ এমন প্রতিশোধ নেবে যাতে জীবনেও আর কোনোদিন কোনো স্বামী তার স্ত্রীকে এভাবে ছেড়ে চলে যেতে না পারে৷ হ্যাঁ, ইরা এমন শাস্তি দেবে সংগ্রামকে যাতে সেটা যুগযুগ ধরে নজির হয়ে থাকে সংগ্রামের মতো আরও অনেক ভালোবাসাবিহীন, নির্দয়, লম্পট স্বামীর জন্য৷

সুলেখার কথা

বিছানা খামচে বালিশে মুখ গুঁজে হাপুস নয়নে কাঁদছে সুলেখা৷ ওর যে সব শেষ হয়ে গেল৷ দীপ এভাবে পারল ওকে ছেড়ে চলে যেত? হ্যাঁ, এটা ঠিক যে এক বছরের এই বিবাহিত জীবনে দীপ যে ওকে কখনোই সেভাবে নিবিড় করে ভালোবাসেনি সেটা বুঝতে পারত সুলেখা৷ কিন্তু তবুও মুখে কিছু বলত না৷ বরঞ্চ সব সময় চেষ্টা করত দীপের মন বুঝে চলার, ওকে খুশি করার৷ কিন্তু, তবুও কোনো মেয়ে কি পারে নিজের স্বামী অন্য মহিলার প্রতি আসক্ত এটা জেনেও মুখ বুজে থাকতে৷

সন্দেহটা সুলেখার মাস খানেক আগে থেকেই শুরু হয়েছিল৷ আর আজ সিলমোহর পড়ল তাতে৷ আর নিজের কদর্য চেহারাটা এভাবে সামনে চলে আসাতেই বোধ হয় এত হিংস্র হয়ে উঠল আজ দীপ৷

রোজকার মতোই স্কুল থেকে ফিরে এসে আজ বাথরুমে গেছিল দীপ ফ্রেশ হতে৷ আর ওর মোবাইলটা পড়ে ছিল খাটের ওপর৷ হঠাৎ পরপর অনেক বার ম্যাসেজ টোন বেজে উঠল৷ আলো জ্বলে উঠল ফোনের৷ কি যে একটা সন্দেহ হল আজ সুলেখার৷ ফোনটা তাই হাতে টেনে নিয়েছিল৷ ফোনটার স্ক্রিন লক নেই দেখে ম্যাসেজগুলো দেখার কৌতূহলটা আজ আর সামলাতে পারেনি সুলেখা৷

অনেক ম্যাসেজ এসেছে হোয়াটসঅ্যাপে৷ যে ম্যাসেজ করেছে তার নাম অনুরিমা৷ নামটা চেনা সুলেখার৷ মেয়েটা নাকি দীপের সাথেই কলেজে পড়ত৷ মেয়েটা অনেকগুলো নগ্ন নারীর দেহের ছবি পাঠিয়েছে দীপকে৷ তার সাথে খুব কুরুচিকর কিছু জোকস৷ চোখ ফেটে জল এসে গেছিল সুলেখার সবটা দেখে৷ এত নোংরা ওর ঘরের মানুষটা! ব্যস্ত হাতে স্ক্রল করে দেখছিল কিছু আগের ম্যাসেজও৷ হ্যাঁ সবটা দেখে বুঝতে পারছিল সুলেখা যে দীপ আর ওই মহিলার নির্ঘাত কোনো অবৈধ খারাপ সম্পর্ক চলছে৷ দুঃখে অপমানে ফোনটা হাতে নিয়ে পাথরের মতো দাঁড়িয়েছিল সুলেখা৷

—‘কী ব্যাপার? আমার ফোন হাতে নিয়ে কী করছ তুমি?’ দীপের তীব্র চিৎকারে চমকে উঠে বুঝেছিল সুলেখা কখন যেন বাথরুম থেকে বেরিয়ে এসেছে সে৷

—‘এত নোংরা তুমি? ছি! এভাবে দিনের পর দিন প্রতারণা করে চলেছ আমার সাথে? লজ্জা করে না তোমার নিজের স্ত্রী-এর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে?’ নিজের মেজাজ আর ধরে রাখতে পারেনি সুলেখা৷

দু-এক মুহূর্ত চুপ ছিল দীপ৷ তাই পরই ফেটে পড়েছিল তীব্র আস্ফালনে৷

—‘তোমার স্পর্ধা হয় কী করে আমার মোবাইল চেক করার? আমার দিকে আঙুল তোলার আগে দেখেছ তুমি নিজে কি? কুৎসিত মহিলা একটা৷ স্বামীকে সুখী করার কোনো ক্ষমতাই নেই তোমার৷ না আছে রূপ৷ না আছে কোনো গুন৷’

—‘কি বললে তুমি? আমি কুৎসিত? লজ্জা করে না তোমার এই কুৎসিত মহিলার বাবার বাড়িতে থাকতে, তার বাবার পয়সায় খেতে?’

সুলেখার শেষ কথাগুলোর পর আর দাঁড়ায়নি দীপ এক মিনিটও৷ দড়াম করে দরজা বন্ধ করে বেরিয়ে গেছে বাড়ি ছেড়ে৷ আর যাবার সময় বলে গেছে—

—‘আর কোনো সম্পর্ক থাকবে না তোমার আমার এর পরে৷ ডিভোর্স এর নোটিশ পাঠিয়ে দেব আমি৷’

আজ চলে গেল দীপ৷ সুলেখা জানে আর ও ফিরবে না৷ প্রচণ্ড জেদি ও৷ হ্যাঁ সুলেখা এবার মামলা, কেস, কোর্ট অনেক কিছুই করতে পারে৷ কিন্তু লাভ কি তাতে? মানুষটা তো আর ফিরবে না৷

সুলেখা যে থাকতে পারবে না দীপকে ছাড়া৷ ও যে ওকে বড্ড ভালোবেসে ফেলেছে৷ বাড়িতে কী বলবে বাকিদের? সবাই যে দীপকে বড্ড ভালো বলে জানে৷

এবার কি তাহলে সুখেলাকে সারাজীবন ডিভোর্সি মেয়ে হয়ে বাঁচতে হবে আর সবাই বাঁকা চোখে দেখবে ওকে? ফিসফাস করবে ওর আড়ালে? না না না৷ এগুলো সহ্য করতে পারবে না ও৷

সুলেখা আর একবার ডায়াল করল দীপের মোবাইল নম্বর৷ না এখনও সুইচ অফ বলছে৷ না, আর বাঁচতে ইচ্ছে করছে না সুলেখার৷ হ্যাঁ শেষ করে ফেলবে ও নিজেকে৷ এই একটাই পথ জীবনের আসন্ন যন্ত্রণাগুলো থেকে মুক্তি পাবার৷ সুলেখা মরবে৷ মরে ভূত হয়ে ও ঠিক টাইট করবে ওই অনুরিমাকে, আর সাথে দীপকেও৷

ঘুটঘুটে অন্ধকার ঘরটায় ভূতের মতো বসে আছে দীপ৷ সারাদিনের ক্লান্তি আর ঘুমে দু-চোখের পাতা ভারী হয়ে এসেছে, কিন্তু তবুও আজ ও ঘুমাবে না কিছুতেই৷ আজ ওকে সব রহস্য ভেদ করতেই হবে৷

সব, সব হয়েছে ওই মেয়েটার জন্য৷ সুলেখাই দায়ী সব কিছুর জন্য৷

দীপ খুব নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে৷ কলকাতায় বাড়িও নয় ওদের৷ বাড়ি মেদিনীপুর জেলার একটা অখ্যাত গ্রামে৷ বাবা মার যান খুব ছোটোবেলায়৷ তারপর থেকে মা খুব কষ্ট করে মানুষ করেছেন ওদের৷ তবে বাকি সব ভাই বোনদের মধ্যে ওর আদর যত্নটাই সবচেয়ে বেশি ছিল মায়ের কাছে৷ কারণ দীপেরই পড়াশুনার মাথা সবচেয়ে ভালো সবার মধ্যে৷

মা ওকে ভালো রাখার সবটা চেষ্টা সর্বদা করতেন ঠিকই কিন্তু তাতে মন ভরত না দীপের৷ ওর সব সময় ইচ্ছে করত অনেকটা বেশি কিছু পেতে৷ ওদেরই গ্রামের ছেলে সমর, প্রায়ই কলকাতায় আসত মামা বাড়িতে৷ আর ফিরে যেত যখন তখন ওর হাতে থাকত কলকাতার দামি জামা প্যান্ট, ঘড়ি, পারফিউম আরও কত কিছু৷ দীপেরও ইচ্ছে করত ওগুলো পেতে৷ কিন্তু কে দেবে ওকে? তাই মনের ইচ্ছে মনেই গুমরে মরে যেত৷

এভাবেই আস্তে আস্তে বড়ো হচ্ছিল দীপ৷ শৈশব শেষ হয়ে গেল৷ এল কৈশোর৷ আর বদলাটা শুরু হল তখন থেকেই৷ দীপের অনেক বন্ধুই প্রেম করতে শুরু করল৷ অনেকে প্রেমে পড়তে শুরু করল৷ কিন্তু দীপের ব্যাপারটা ছিল সম্পূর্ণ আলাদা৷ না বিশেষ কোনো মেয়েকে দেখে মানসিক পরিবর্তন, ভালো লাগা এসব হত না দীপের৷ দীপকে শুধু টানত মেয়েদের শরীরটা৷ যে কোনো মেয়ের শরীর নয়, সুন্দরী আর যৌন আবেদন পূর্ণ নারী শরীর৷ সুডৌল স্তন, ভরা নিতম্ব সম্পন্ন মেয়েদেরকে একদম কাছ থেকে পেতে ভীষণ ইচ্ছে করত দীপের৷ ইচ্ছে করত যৌনতা মাখানো শরীরগুলো ছিঁড়ে খুঁড়ে ভোগ করতে৷

কিন্তু দীপ খুব সাধারণ একটা গ্রামের একটা নিম্ন মধ্যবিত্ত ছেলে৷ তাই এই ধরনের নিষিদ্ধ ইচ্ছে যে ওর পূরণ হাতে পারে না তা বলাই বাহুল্য৷

শেষ হয়ে গেল দীপের স্কুল জীবন৷ পা রাখল ও কলেজের দোরগোড়ায়৷ কলেজে পড়তে শহরে চলে এল৷ শহরের মেয়েগুলো অনেক আলাদা৷ এরা সবাই অনেক মডার্ন, স্মার্ট, ঝকঝকে৷ দীপের মনে হত যেন মনি মুক্ত খচিত খোলা সিন্দুক ওর সামনে পড়ে, শুধু দু-হাত ভরে সবটুকু নিজের করে নেবার অপেক্ষা৷

কিন্তু মনে হওয়া আর বাস্তবের মধ্যে অনেক তফাৎ থাকে৷ দীপের যাই মনে হোক না কেন, আসলে দীপ একটা গ্রামের সাধারণ ছেলে, বেশ গরিব৷ আর দেখতেও নেহাতই সাদা মাঠা৷ তাই দীপের প্রতি আকৃষ্ট হবেই বা কেন কেউ৷ না কোনো মেয়েই পাত্তা দিত না তেমন দীপকে৷ মাথার মধ্যে তখন কেমন যেন আগুন জ্বলত দীপের৷ ইচ্ছে হত ঝাঁপিয়ে পড়ে সব মেয়েগুলোকে ছিঁড়ে খুঁড়ে নিতে৷

কিন্তু সবার দিন তো আর সব সময় খারাপ একই ভাবে চলে না৷ তাই দীপের জীবনেও এল অনুরিমা৷ দীপের কলেজেরই মেয়ে৷ পড়াশুনায় বেশ খারাপ, কিন্তু যৌন আবেদন বেশ ভালোই৷ না দীপের ঠিক মনের মতো না হলেও, খুব মন্দ নয়৷ দীপের খরার জীবনে একমাত্র মরূদ্যান৷ অনুরিমার সাথে সম্পর্ক হয়েছিল দীপের৷ শরীরী বিভঙ্গে মাতাতে, আর শরীরী রহস্য জালে খেলাতে মেয়েটা নেহাত কম জানে না৷ অনুরিমাতে বেশ ভালোই বুঁদ ছিল দীপ৷ শরীর এর পরিবর্তে মেয়েটাকেও খুশি রাখতে হত দীপকে৷ মেয়েটা গরিব ঘরের৷ কিন্তু স্বপ্ন তার আকাশ ছোঁয়া৷ দামি জমা কাপড়, মেক আপ, জুতো সর্বদা চায় সে৷ তার সে সব চাহিদা মিটিয়ে তাকে খুশি রাখত দীপ৷ আর অনুরিমাকে খুশি করতে করতে যে আসলে নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছিল দীপ, যেটা ও বুঝতেই পারেনি৷ মায়ের পাঠান টাকা, নিজের টিউশনির টাকা সব কিছু খুইয়েও অনুরিমাকে খুশি রাখতে দীপ তখন মত্ত৷ এদিকে পড়াশুনায় ঢিলে, রেজাল্টও খারাপ হতে শুরু করল দীপের৷

গ্র্যাজুয়েশন এ চরম খারাপ রেজাল্ট হল৷ আর তার সাথেই খবর এল মায়ের মৃত্যুর৷ মাথায় তখন আকাশ ভেঙে পড়ল ওর৷ এদিকে অনুরিমাও আস্তে আস্তে তখন পাত্তারি গোটাচ্ছে দীপের থেকে৷ কারণ বিরাট সাইজের একটা রাঘব বোয়াল তখন ধরা পড়েছে তার জালে৷

দীপের পকেটের হাল এতই খারাপ যে সামনের মাসে মেসের ভাড়া ঠিক ভাবে দেবার সংগতি নেই, আর ঝুলিতে সংগ্রহ বলতে একটা চরম খারাপ রেজাল্ট৷ এই সব কিছুর কামড়ে যখন দীপের প্রায় আধ পাগল অবস্থা, তখন কীভাবে যেন একদিন দেখা হয়ে গেছিল রাস্তায় তপন কাকুর সাথে৷ তপন কাকু, যে কিনা এককালে ওর বাবার বেস্ট ফ্রেন্ড ছিল৷ ছোটোবেলার বন্ধু৷

—‘আরে দীপ, তুই কলকাতায়? কবে এসেছিস? কি করছিস এখন? আমাকে একবার জানাসনি বাবা?’

দীপ বুঝে গেছিল এই তপন কাকুকে যদি কোনোভাবে এখন একবার পটিয়ে ফেলা যায় আর এই মালদার বড়োলোকটার বাড়িতে কোনোভাবে ঢুকে পড়া যায় তাহলে কলকাতায় ফ্রিতে থাকা খাবার একটা ডেরা জুটে যাবে৷

হ্যাঁ তপন কাকুর সহানুভূতি সেদিন বেশ কৌশলে কুড়িয়ে নিয়েছিল দীপ৷ বাপ মা মরা ছেলে, কলকাতায় কীভাবে ঠগদের পাল্লায় পড়ে অনেক টাকা খুইয়েছে এই নিয়ে গল্পটা এত ভালো সেদিন শুনিয়েছিল দীপ, যে ইচ্ছে করছিল নিজেরই পিঠ চাপরে দিতে৷

—‘তুই এবার থেকে আমার বাড়িতেই থাকবি৷ ওখানে থেকে পড়াশুনা করবি৷ আমার এত বড়ো বাড়ি থাকতে বিজয়ের ছেলে মেসে থাকবে এ হয় নাকি?’

উফফ! সেদিন যেন হাতে স্বর্গ পেয়েছিল দীপ৷ ওই বাড়িতে ব্যবস্থাটা পাকা হয়ে গেছিল৷ সবই ঠিকঠাক চলছিল৷ শুধু দীপের মাথাটা জ্বলে যেত তপন কাকুর ডিগডিগে রোগা কালো ন্যাকড়ার মতো মেয়েটাকে দেখলে৷ দীপকে দেখলেই দাঁত কেলিয়ে হাসত মেয়েটা৷ উফফ! বাবা! ঠিক যেন ভাল্লুক শাঁকালু খাচ্ছে৷ যত সম্ভব দীপ এড়িয়ে চলার চেষ্টা করত ওকে৷ এরকম মেয়ে ওর জাস্ট সহ্য হয় না৷

আবার আস্তে আস্তে ভালো দিন ফিরতে শুরু করল দীপের৷ রেজাল্ট খারাপ হলেও বছর দুয়েকের মাথায় একটা চাকরি পেয়ে গেল দীপ৷ প্রাইমারি টিচারের চাকরি৷ মায়নে খুব মার কাটারি না হলেও সরকারি চাকরি তো বটে৷ আর সেই বীভৎস ঘটনাটা দীপের জীবনে ঘটল তখনি৷ চাকরি জয়েন করার দু-একদিন পর তপন কাকু ওকে ডাকলেন৷

—‘দীপু, আমি জানি তুই ভালো ছেলে৷ দু-বছর ধরে তো দেখছি তোকে৷ আর সব থেকে বড়ো কথা হল তুই হলি গিয়ে বিজয়ের ছেলে৷ আজ ভগবানের আশীর্বাদে তুই সরকারি চাকরিও পেয়েছিস৷ আমি জানি তুই আরও উন্নতি করবি৷ তা বাবা, এবার তো সংসারীও হতে হবে৷ শোন বাবা, আমার মেয়ে সুলেখা তোকে খুব পছন্দ করে আমি জানি৷ আমি এও বুঝি যে তুইও পছন্দ করিস ওকে৷ তাই আমি চাই তাড়াতাড়ি তোদের চার হাত এক করে দিতে৷’

তপন কাকুর কথাগুলো শুনে সেদিন শরীরের সব কটা হাড় একসাথে রাগে জ্বলে গেছিল দীপের৷ ওই দোমড়ানো জিভে গজার মতো মেয়েটাকে বিয়ে করবে দীপ? ভাবে কি লোকটা? কারোর ঘাড়ে ওকে গছাতে পারছে না বলে শেষমেষ বলির পাঁঠা দীপ হবে? ইচ্ছে করছিল তপন কাকুর টাক মাথাটা সজোরে দেওয়ালে ঠুকে দিতে৷ কিন্তু ইচ্ছে থাকলেও তো আর সব হয় না৷ তাই সেদিনও তেমন কিছু করেনি দীপ৷

—‘আমি একটু ভেবে জানাব কাকু৷’ বলে সময় চেয়ে নিয়েছিল৷ সত্যি ভেবেওছিল অনেক৷ দীপের যা মাইনে, তাতে বাড়িতে ভাই বোনদের টাকা পাঠিয়ে নিজের মেসে থাকার আর খাওয়ার খরচ চালিয়ে হাতে যা বাঁচবে তাতে কোনোদিনই ওর খুব বিলাসপূর্ণ জীবন পাবে না৷ আর পকেটে রেস্ত না থাকলে কেউ যে পোঁছে না তা তো জানেই দীপ৷ কিন্তু সুলেখাকে বিয়ে করে নিলে এ বাড়িতে ফ্রিতে থাকা খাওয়া আর ফুটানি তো চলবেই আর বাড়িতে পাঠানোর পর হাতে ভালোই বাঁচবে টাকা৷

তাই বুদ্ধিমানের মতো সুলেখাকে নিজের জীবনে মেনেই নিয়েছিল দীপ৷ ওর ওই ন্যাতানো কালো শরীরটা রোজ রাতে দেখেই গা গুলিয়ে উঠত দীপের, কিন্তু তবুও ওকে সহ্য করত দীপ৷ মাঝে মাঝে অন্ধকার ঘরে অনুরিমাকে কল্পনা করে ওর শরীরটা খুঁড়ে দেখার চেষ্টা করত দীপ, কিন্তু না৷ ন্যাকড়া মোচড়ানোর অনুভূতি ছাড়া আর কিছু অনুভূতি আসত না৷

তবুও যা হোক চলছিল জীবন৷ কিন্তু হঠাৎই এমন সময়ে আবার দীপের জীবনে ফিরে এল অনুরিমা৷ তার জাল ছিঁড়ে সেই রাঘব বোয়াল পালিয়েছে৷ তাই আবার তার মনে পড়েছে দীপের কথা৷ আর দীপের পকেটে তো এখন পয়সাও আছে৷ আবার অনুরিমার সাথে শরীরী খেলায় মেতে উঠেছিল দীপ, তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করছিল নিজের যৌবন৷ কিন্তু হুট করে সব নষ্ট করে দিল ওই শয়তান মেয়েছেলেটা৷ এত সাহস কিনা দীপের ফোন চেক করে! ওর কাছে কৈফিয়ত চায়! না, আর দেরি করেনি দীপ৷ এক কাপড়ে ছেড়ে চলে এসেছে ওই বাড়ি৷ হয়তো হঠকারি সিদ্ধান্ত এটা, কিন্তু তবুও... আর সহ্য হচ্ছিল না ওই মেয়েটাকে?

এই বাড়িটায় দীপ থাকছে তা প্রায় দিন পনেরো হল৷ আর তার পর থেকেই আস্তে আস্তে নানা বদল শুরু হয়েছে ওর জীবনে৷ আর এর মধ্যে সবচেয়ে বড়ো বদল হল তনয়া৷ হ্যাঁ এখন দীপের মনে সব সময়ই ঘোরা ফেরা করে চলেছে তনয়া৷ অনুরিমা, ওর শরীর, পর্ণ সিনেমা আর কিচ্ছু এখন ভালো লাগছে না দীপের৷ দীপ নিজেই বুঝতে পারছে না কি হল ওর? তনয়াকে তো ও চেনেই না৷ তবুও কেন ওর জন্যই এত পাগল পাগল লাগছে ওর৷

এ বাড়িতে উঠে আসার পর দিনই ফ্রেন্ড রিকোয়েস্টটা পেয়েছিল দীপ ফেসবুকে৷ তনয়া সরকার৷ ভীষণ সেক্সি কতগুলো ছবি প্রোফাইলে৷ দীপ এক ঝটকায় এড করে নিয়েছিল৷ এরকম সেক্সি মেয়ে দেখলেই এড করে নেয় ও৷ সেদিন রাত থেকেই শুরু হল চ্যাট৷ মেয়েটা খুব স্মার্ট৷ বুঝতেই পারছিল দীপ৷ আর প্রথম দিনেই দীপের ফোন নম্বর নিয়ে ফোন করেছিল ও৷ দীপ বদলে ফেলেছে পুরোনো ফোন নম্বর৷ সুলেখা বা ওর পরিবারের ধরা ছোঁয়ার মধ্যে আপাতত পড়তেই চায় না ও৷ যাক কটা দিন, তারপর না হয় পাঠান যাবে ডিভোর্সের নোটিশ৷

যাই হোক, তনয়া মেয়েটার সাথে প্রথম কথা বলতে গিয়ে থমকে গেছিল দীপ৷ মেয়েটা যাকে বলে আর কি দারুণ বোল্ড৷ দু-একটা কথা বলার পরেই বলেছিল—

—‘জান তোমায় কেন এড করলাম? কারণ তোমায় দেখেই বুঝেছিলাম তোমার মধ্যে সেক্সের একটা urge আছে, যেটা সবার থাকে না৷ আমি ঠিক এমন ছেলেই পছন্দ করি৷ জান, আমি ডিভোর্সি, আমার হাজব্যান্ডের থেকে সেক্সুয়ালি স্যাটিসফাই ছিলাম না তাই ডিভোর্স করেছি৷ দেখবে আমার ছবি?’

নিজের একটা স্বচ্ছ রাত পোশাক পড়া ছবি শেয়ার করেছিল তনয়া৷ তনয়া এভাবেই কথা বলে৷ বেশির ভাগই শরীর আর যৌনতার কথা, তবে মেয়েটা বড্ড রহস্যময়ী৷ আর রহস্যটাই পাগল করে দিয়েছে দীপকে৷ তনয়া রোজ রাত নটা থেকে এগারোটা কথা বলে ওর সাথে৷ ব্যস শুধু ওই দু-ঘণ্টাই৷ বাকি সময় কোনোভাবেই দীপ ধরতে পারবে না ওকে৷ ওর ফোন কিছুতেই কানেক্ট হয় না৷ ফেসবুকেও ওকে অনলাইন দেখা যায় না৷

—‘তনয়া আর কোনো নাম্বার নেই তোমার? কেন তোমায় আমি ধরতে পারি না ফোনে? আমার যে খুব পেতে ইচ্ছে করছে তোমায়?’ দীপ এরকম কিচ্ছু বললেই অদ্ভুত রহস্য করে হাসে তনয়া, যেন দীপ খুব বোকাবোকা একটা কথা বলে ফেলেছে৷ তনয়া বলেছে খুব শিগগির ও দেখা করবে দীপের সাথে৷ আর প্রথম দিন এই বাড়িতে এসেই দেখা করবে৷ ফাঁকা বাড়িই সবচেয়ে ভালো৷ সেইদিনই ও চিনতে চায় দীপের শরীর, দীপকে চেনাতে চায় নিজের সবটুকু৷

দীপ তো সেই অপেক্ষাতেই দিন গুনছিল৷ বুঁদ হয়েছিল তনয়া নেশায়৷ তনয়া মাঝে মাঝেই নিজের শরীরী বিভঙ্গের ছবি শেয়ার করে৷ একবার পাঠিয়েছিল উন্মুক্ত স্তনের ছবিও৷ কোথায় এখন নিজের মনের মতো একজনকে পাবার উল্লাস মানাবে দীপ, তা না এসব কি জালে ও পড়ল কে জানে!

অন্ধকার রাতে একলা এই ঘরটায় জেগে বসে থাকতে থাকতে এখন বেশ গা ছমছম করছে দীপের৷ কেন যেন মনে হচ্ছে খুব খারাপ কিছু ঘটতে চলেছে ওর সাথে৷ তনয়ার সাথে দেখা বুঝি আর হল না৷

এই বাড়িটা মোটেই খাস কলকাতার বুকে নয়৷ শহর ছাড়িয়ে বেশ দূরে৷ শহরতলির দিকে৷ আসলে দীপের স্কুলও এইদিকেই কিনা৷ বাড়িটা ওকে ঠিক করে দিয়েছেন ওরই কলিগ সুজিতদা৷ বাড়ির মালিক সুজিতদা’র খুব চেনা জানা৷ তাই বেশ অনেকটা সস্তাতেই হয়েছে ব্যাপারটা৷

বাড়িটা বেশ পুরোনো৷ তা প্রায় বছর পঞ্চাশেকের পুরোনো তো বটেই৷ বেশ অবস্থাপন্ন লোকের বাড়ি ছিল এটা৷ বাড়ির মালিকের নাম ছিল সঞ্জীব চৌধুরী৷ সঞ্জীব চৌধুরীর বংশে আর কেউ বেঁচে নেই এখন৷ একটা দুর্ঘটনায় মারা যায় ওর ছেলে আর বউমা একসাথেই৷ তারপর বিপত্নীক সঞ্জীব চৌধুরীও আর বেশিদিন বাঁচেনি৷ তাই সঞ্জীবের দুঃসম্পর্কের ভাগ্নেই এখন বাড়ির মালিক৷ সে খাস কলকাতার লোক৷ তাই এই বাড়িটায় সে থাকে না৷ লিজে দেয় বাড়ি বা ভাড়া দেয়৷

—‘বাড়িটা বেচে না দিয়েই ফেলে রেখেছেন কেন?’ জিজ্ঞাসা করেছিল দীপ৷ কিন্তু কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি বাড়ির মালিক৷ বরঞ্চ মুখটা কেমন যেন ফ্যাকাশে হয়ে গেছিল তার প্রশ্নটা শুনে৷ সেই ফ্যাকাশে মুখ নিয়ে তখন কিছু মাথা না ঘামালেও আজ যেন হূৎপিণ্ডের রক্ত চলকে চলকে উঠছে দীপের৷

এই বাড়িটা দোতলা৷ তবে দোতলার ফ্লোরটা পুরো বন্ধ থাকে৷ দীপের আধিপত্য একতলাতেই৷ এই বাড়িতে আসার পর পরই একটা জিনিস লক্ষ্য করেছিল দীপ৷ রোজ রাত বারোটার পর পাওয়ার কাট হয় এখানে৷ পুরো ঘুটঘুটে অন্ধকারে ডুবে একলা জেগে থাকে দীপ৷ প্রথমদিকে ব্যাপারটা তেমন আমল দেয়নি৷ জায়গাটা তো ঠিক খাস কলকাতা নয়, শহরতলি৷ তাই হয়তো হচ্ছে এমন৷ এখন সময়টাও ডিসেম্বর; তাই ফ্যানের দরকার নেই বলে তেমন একটা মাথা ঘামায়নি দীপ বিষয়টা নিয়ে৷

কিন্তু দিন দুয়েকের পর ব্যাপারটা সত্যি ভাবিয়ে তুলল ওকে৷ কারেন্ট চলে গেলে তো আর ভূতুড়ে অন্ধকারে বেশিক্ষণ জেগে থাকা যায় না, তাই শুয়ে পড়ত দীপ৷

কিন্তু সেই ঘুম প্রতিদিনই ভেঙে যেত ঠিক রাত দুটোয়৷ একদম কাঁটায় কাঁটায় রাত দুটো৷ আর ঘুম ভাঙত এক অদ্ভুত কষ্টের অনুভব নিয়ে৷ যেন বন্ধ হয়ে আসছে দীপের নিশ্বাস৷ ঠিক যেন কেউ দীপের বুকের ওপর চেপে বসে আছে৷ ঠিক যেন কেউ অদৃশ্য সাঁড়াশি দিয়ে চেপে ধরেছে দীপের গলা৷

দমবন্ধ করা এই বিদঘুটে অনুভব নিয়ে পরপর তিনদিন পার হল দীপের, তারপর সত্যি নিদারুন ভয় পেয়েছিল ও৷ কিন্তু তবু কাউকে বলতে পারেনি নিজের এই ভয়ের কথা৷ এসব কি কাউকে বলা যায় নাকি! সবাই তো পাগল ভাববে ওকে৷ তবে তিনদিন পর দীপ আবিষ্কার করল আর এক ভয়াবহ ব্যাপার৷ রাতের ওই নিয়মিত পাওয়ার কাট শুধু এই বাড়িতেই হচ্ছে, এলাকার আর কোথাও কিন্তু নয়৷

এই ব্যাপারটা বোঝার পর থেকেই আতঙ্কের একটা কালো দলা যেন গিলতে আসে দীপকে প্রতিরাতে৷ প্রতিরাতেই সেই এক ঘটনা, ভয়ানক ভাবে রাত দুটোয় ঘুম ভেঙে যাওয়া অন্ধকার ঘুটঘুটে ঘরে৷ আর প্রতিমুহূর্তেই এক অদ্ভুত অনুভূতি৷ যেন কোনো অদৃশ্য চোখ ক্রমাগত জরিপ করে চলেছে দীপকে, যেন কালো এই শূন্য ঘরে দীপ একা নয় আরও কেউ রয়েছে ওর সাথে৷ তার অদৃশ্য চাপা নিশ্বাস আর অশরীরী পদধ্বনি প্রতি মুহূর্তে জানান দিচ্ছে তার অপার্থিব অস্তিত্ব৷

না আর পারছে না দীপ৷ উৎকণ্ঠায়, আতঙ্কে, অনিদ্রায় আস্তে আস্তে ভেঙে পড়ছে ওর শরীর৷ কিন্তু তবুও কাউকে ও জানাতে পারছে না ওর জমাট বাঁধা আতঙ্কের কথা৷ কে বিশ্বাস করবে আজকের দিনে ওর এই সব প্রলাপ! তাই দীপ ঠিক করেছে, ও ঠিক করেছে যে আজ সব রহস্য নিজেই ভেদ করার চেষ্টা করবে ও৷ না, ও ঘুমাবে না৷ ও জেগে থাকবে৷ ও দেখতে চায়, ঠিক কি হয় রাত দুটোর সময়৷ কে আসে এখানে প্রতিদিন রাত দুটোর পর৷

ক্লান্ত চোখে জেগে আছে দীপ, পাশে কাঁপা কাঁপা শরীরে জ্বলছে মোমের শিখা৷ নিজের হূৎপিণ্ডের শব্দও যেন শুনতে পাচ্ছে ও, এতটা নৈঃশব্দ চতুর্দিকে৷

ঢংঞং করে দূরে কোনো বাড়ির গ্র্যান্ডফাদার ঘড়িতে দুটোর ঘণ্টা পড়ল বোধ হয়৷ আর অমনি ভবলীলা সাঙ্গ হল মোমের৷

দীপ উঠে হাতড়াল দেরাজ, নতুন মোমের খোঁজে৷ কিন্তু কি অদ্ভুত! মোম নেই! কিন্তু এ কি করে সম্ভব! দীপ যে নিজের হাতে মোম রেখেছিল ওখানেই৷ হ্যাঁ একটুও ভুল হচ্ছে না ওর৷ ডিসেম্বর এর শীতেও এবার দীপের কপালে জমে উঠল বিন্দু বিন্দু ঘাম৷

ঘরের জানলার পাল্লাটা এবার অল্প ফাঁক করল দীপ৷ যদিও বাইরে ঠাণ্ডা, তবুও... বাইরের আবছা চাঁদের আলো অল্প হলেও ভিতরের জমাট বাঁধা অন্ধকারকে ভেদ করছে৷

ঠুক ঠুক ঠুক... দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হল এবার৷ আর সাথে সাথেই দীপের হূৎপিণ্ডটা যেন একলাফে গলার কাছে চলে এল৷ কারণ কড়া নাড়া হচ্ছে দীপের দরজাতেই৷ এত রাতে! কে আসবে দীপের এই অচেনা নতুন ঠিকানায়৷

ঠুক ঠুক ঠুক... আবার সেই একই শব্দ৷

‘কেএএ?’ দীপের গলা শুকিয়ে কাঠ আতঙ্কের আক্রমণে৷ স্বর কাঁপছে৷

—‘দীপ, আমি... দীপ...’ পরিচিত মেয়েলি কণ্ঠস্বর৷

আতঙ্ক ছেড়ে এবার দীপের অবাক হবার পালা৷ এ তো তনয়ার স্বর! ফোনে তো বহুবার শুনেছে এ গলা দীপ৷

—‘দীপ প্লিজ দরজাটা খোল৷ আমি তনয়া...’ ওপারের কণ্ঠস্বর আকুল৷

একরাশ কৌতূহল আর বিস্ময় নিয়ে এবার দরজাটা খুলল দীপ৷ আর অমনি হুড়মুড় করে ভিতরে ঢুকে পড়ল তনয়া৷ মুখে ওর একরাশ উদ্বেগ৷

—‘তুমি? এত রাতে? এখানে? তুমি কীভাবে জানলে এ ঠিকানা?’ দীপের বিস্ময় কাটেনি এখনও৷

তনয়া হাঁপাচ্ছে৷ হাঁপাতে হাঁপাতেই বলল—

—‘সব বলছি দীপ৷ এই ঠিকানা তো তুমি আমায় দিয়েছিলে দীপ৷ আর আজ এভাবে আসা ছাড়া আর আমার উপায় ছিল না৷ আমার বর, মানে সেই অত্যাচারী শয়তান আজ হঠাৎ চড়াও হয়েছে আমার বাড়িতে৷ আমায় খুব মারধোর করেছে৷ বলেছে সে আবার আমায় বাধ্য করবে তার সাথে থাকতে৷ জোর করে সে আমার শরীর... আমি তাই পালিয়ে এসেছি৷ গভীর রাতে যখন যে ঘুমে মগ্ন, তখন আমি পালিয়ে এসেছি৷’ এবার কাঁদছে তনয়া৷ কান্নার দমকে ফুলে ফুলে উঠছে ওর ভরা যৌবন আবিষ্ট শরীর৷

দীপ একদৃষ্টে তাকিয়ে রয়েছে তনয়ার দিকে৷ আতঙ্ক কেটে এবার একটা ভালো লাগার ঘোর ঘিরে ধরেছে ওকে৷ এই সেই তনয়া৷ যাকে পাবার স্বপ্ন রাত দিন তাড়া করছে ওকে৷ তনয়ার পরনে পাতলা রাত পোশাক, সেই রাত পোশাকের আড়াল থেকে যেন হাতছানি দিয়ে দীপকে ডাকছে মেয়েটার যৌবন৷

না, আর নিজেকে সামলাতে পারল না দীপ৷ তনয়ার শরীরটা চুম্বকের মতো টানছে ওকে৷

দীপ গিয়ে বসল তনয়ার পাশে৷ আস্তে আস্তে নিজের ঠোঁট ঘষতে শুরু করল তনয়ার ঘাড়ে আর পিঠে৷ তনয়ার কান্নাও এবার কমছে৷ আস্তে আস্তে জেগে উঠছে ওর শরীরও৷ দীপকে জড়িয়ে ধরেছে তনয়া৷ দীপও ব্যস্ত হাতে খুলছে তনয়ার পোশাক৷ সম্পূর্ণ অনাবৃত তনয়াকে চাই আজ ওর৷ যেন হঠাৎ ঘুম থেকে জেগে উঠেছে কোনো ক্ষুধার্ত চিতা৷

এক ঝটকায় এবার দীপকে বিছানায় শুয়ে দিয়েছে তনয়া৷ নিজের ঠোঁট ঘষছে দীপের গলায়, বুকে, পেটে৷

—‘আআআআ’... দীপের একটা বীভৎস আর্ত চিৎকার মুহূর্তে বিষিয়ে তুলল চারদিকের বাতাস৷

কণ্ঠনালীর কাছে একটা তীব্র যন্ত্রণা ছিন্নভিন্ন করছে দীপকে৷

—‘কী করলে তুমি তনয়া...’ দীপের হাত অজান্তেই চলে গেছে এবার ওর হাত নিজের গলার কাছে৷ রক্তে মাখামাখি হাত৷ যেন একরাশ আক্রোশে কেউ ছিঁড়ে নিয়েছে এক খাবলা মাংস ওর গলার কাছ থেকে৷

—‘হি হি হি হি...’ একটা হাড় হিম করা নারী কণ্ঠের হাসি শোনা গেল এবার দীপের আর্তনাদ ছাপিয়ে৷

শনশন করে একটা খ্যাপাটে বাতাস হঠাৎ বইতে শুরু করেছে বাইরে৷ সেই বাতাসের দাপটে হঠাৎ দুম করে খুলে গেল গোটা জানলার পাল্লাটাই৷ হুশ করে ঘরে ঢুকে এল এক পশলা আবছা সাদাটে চাঁদের আলো৷ আর তাতেই আরও স্পষ্ট দেখল দীপ যে তনয়া হাসছে পাগলের মতো৷ আর দৃশ্যটা দেখা মাত্র যন্ত্রণা ছাপিয়ে আতঙ্ক গ্রাস করল দীপকে৷ এ কী দেখছে ও?

তনয়ার সারা মুখ রক্তে মাখামাখি৷ চুলগুলো এলোমেলো পাগলের মতো৷ আর চোখ? না চোখ নেই৷ সেই জায়গায় জেগে আছে শুধু বীভৎস অন্ধকার দুটো কোটর৷

—‘কে... কে তুমি?’ শেষ অবস্থায় পৌঁছে গেছে দীপ৷

—‘চিনতে পারছিস না আমায়?’ হ্যাঁ তনয়া বা সেই তনয়া রূপী সেই বীভৎস মূর্তি আস্তে আস্তে বদলে যাচ্ছে যেন৷ এখন ওই জায়গায় এক অন্য নারী মূর্তি৷

আরে! এ তো... এ তো... এর ছবি তো দেখেছে দীপ৷ এই বাড়ির দেওয়ালেই দেখেছে৷ এরই তো নাম নাকি ইরাবতী চৌধুরী৷ এর বিরাট বড়ো তৈলচিত্র এ বাড়ির দেওয়ালেই আছে৷ এই তো এ বাড়ির আসল মালিক মানে চৌধুরী বাড়ির দাপুটে পুত্রবধূ, যে কিনা পঞ্চাশ বছর আগে নিজের স্বামীর গলার নলি কেটে তাকে খুন করে, নিজে আত্মহত্যা করেছিল৷ এভাবেই নাকি সে শাস্তি দিয়েছিল তার চরিত্রহীন স্বামীকে৷ বদলা নিয়েছিল নিজের অকারণ অপমান আর প্রত্যাখানের৷ কিন্তু সে? সে এখানে কীভাবে? কোন সময়ে ফিরে গেছে দীপ?

—‘কী ভেবেছিস? লাম্পট্য করে পার পেয়ে যাবি? নিজের নির্দোষ বউকে ঠকিয়ে, নিজের শরীরের খিদে মেটাবি অন্য মেয়ের শরীর খুঁজে? না আমি থাকবে হবে না সেটা? আমি হতে দেব না৷ আগেও দিইনি৷ আজও দেব না৷’

কিচ্ছু বুঝতে পারছে না দীপ৷ ইরাবতী চৌধুরীর অতৃপ্ত আত্মাই কি তার মানে তনয়া সেজে এতদিন... কিন্তু কেন? কী দোষ করেছে দীপ ওনার দরবারে? না আর কিচ্ছু ভাবতে পারছে না দীপ৷ ওর চোখের সামনে আস্তে আস্তে নেমে আসছে অন্ধকার৷ শেষ হয়ে আসছে ওর প্রাণশক্তি, শেষ হয়ে যাচ্ছে দীপ৷ সাজা পাচ্ছে নিজের সকল জঘন্য কাজের৷ আস্তে আস্তে ফিকে হয়ে আসছে বিদেহী আত্মার ফিসফাস, চিৎকার আর পদধ্বনি৷

* * *

অনেকগুলো চিৎকার, কথাবার্তা আর উদ্বিগ্ন গলার স্বর শুনতে পাচ্ছে দীপ৷ সঠিক বুঝতেও পারছে না ও মরে গেছে না বেঁচে আছে, কোথায় আছে এই মুহূর্তে সেটাও বুঝতে পারছে না একদমই৷ সারা গায়ে অসহ্য যন্ত্রণা৷ চোখ মেলার ক্ষমতা প্রায় নেই বললেই চলে, তবুও ভীষণ কষ্ট করে এবার তাকাল দীপ৷

চোখ খুলতেই একরাশ সূর্যের আলো ঝাপটা মারল ওর চোখে মুখে৷ কয়েকটা মুহূর্ত লাগল ওর সবটা মনে করতে৷

—‘স্যার, স্যার কি হয়েছে আপনার? আপনি এখানে কীভাবে...?’

—‘দীপ, তুমি এখানে... এভাবে? কী হয়েছে দীপ?’

একরাশ চেনা অচেনা মুখের সারি ওকে ঘিরে৷ হ্যাঁ দীপ বুঝে গেছে এতক্ষণে, ও এই মুহূর্তে পড়ে রয়েছে ওরই স্কুল চত্বরের বাইরের বড়ো মাঠটায়, প্রায় অর্ধ নগ্ন অবস্থায়৷ ওরই সব ছাত্ররা, সহকর্মীরা ওকে এভাবে দেখে এখানে স্তম্ভিত৷ তাই এত প্রশ্ন একনাগাড়ে করেই চলেছে৷ কিন্তু কী বা কি উত্তর দেবে? ওর তো কিছুই জানা নেই৷ ঠিক কতক্ষন এভাবে এখানে ও পড়েছিল, আর এখানে এলই বা কীভাবে কিছুই তো বুঝতে পারছে না দীপ৷ তাই ওর যে কিচ্ছু বলার নেই৷

—‘দীপ, কী হয়েছে? তুমি এখানে এভাবে? এই ওকে তোল তো৷ দীপ আর এখানে এভাবে এক মূহূর্তও নয়৷ তুমি এক্ষনি আমার সাথে আমার বাড়ি চল৷ ওখানে গিয়েই বাকি সব কথা হবে৷ আগে একটু গরম দুধ আর শুশ্রূষা দরকার তোমার৷’ সুজিতদা এগিয়ে এসেছেন এবার ভিড় ঠেলে সামনে৷ মাথার ওপর এই স্নেহের পরশটুকুই যেন এখন দরকার ছিল দীপের৷

—‘সুজিতদা... সুজিতদা...’ ছোট্ট শিশুর মতো এবার কান্নায় ভেঙে পড়ল দীপ৷

বাসটা হুহু করে ছুটে চলেছে৷ আর দীপও চলেছে ওর নিজের গন্তব্যের দিকে৷ না, এখনও কোনো কিছুই বুঝতে পারছে না দীপ৷ তবে উত্তর না মেলা ওই প্রশ্নগুলো নিয়ে আর ও ভাবতেও চায় না৷ আর কেনই বা চাইবে৷ এই দীপ যে অন্য মানুষ৷

সেদিন সুজিতদা’র বাড়িতে গিয়ে খানিক সেবা শুশ্রূষার পর আগাগোড়া সবটুকু খুলে বলেছিল দীপ৷ কিচ্ছু লুকায়নি৷ এমনকী নিজের চরিত্রের অন্ধকার দিকটাও না৷ প্রথমবারের মতো সেদিন নিজের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কারো সামনে মুখ খুলেছিল দীপ৷

সব শুনে ভুরুতে একরাশ অবিশ্বাস আর চিন্তার ভাঁজ নিয়ে সুজিতদা বলেছিলেন—

—‘সবই তো শুনলাম৷ কিন্তু এসব কথা আর কেউ তোমার মুখে শুনলে তোমায় নির্ঘাত চরিত্রহীন, বিকার মস্তিষ্কের এক যুবক ভাববে৷ আমি নেহাত তোমায় স্নেহ করি তাই, তেমনটা না হয় ভাবতে চাইছি না৷ কিন্তু তা বলে এই একবিংশ শতকের একজন শিক্ষিত মানুষ হয়ে তো বলিউড কায়দার এই ভূতের গপ্পো বিশ্বাস করতে পারি না৷ তাহলে যে আমারই মস্তিষ্কের সুস্থতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে৷ তুমি নিজেই ভাব না, এমন সুন্দর দিনের আলোয় কেউ যে হুট করে এসে তোমায় এমন এক আজগুবি কাহিনি শোনাত, তুমি কি মেনে নিতে পারতে?

মাথা নীচু করে নিয়েছিল দীপ৷ কারণ সত্যিই দীপ নিজেও এটা বিশ্বাস করত না যদি অন্য কেউ এমন বলত৷

—‘শোন দীপ, এই এলাকায় আমি অনেক বছর আছি৷ সেই বাপ ঠাকুরদার আমল থেকে৷ তোমার আগেও ও বাড়িতে লোকজন থেকে গেছেন৷ কিন্তু কেউ কোনদিন ভূতের কথা বলেননি৷ আর ধুর! ভূত বলে কি কিছু হয় নাকি?

শোন এটা ঠিক যে, ইরাবতীদেবীর করা সেই খুন, আর তার মৃত্যু দুটোই ভয়াবহ৷ কিন্তু তা বলে তুমি ওনাকে ভূতই বানিয়ে দিলে ভায়া? শোন আমি বাপ কাকার কাছে শুনেছি, ইরাবতীদেবী এমনিতে খুব ভালো মহিলা ছিলেন৷ উনি গরিবদের খুব ভালোবাসতেন৷ অনেক দান ধ্যান করতেন৷ খুনটা হয়তো উনি ঝোঁকের মাথাতেই করেছিলেন৷ ওনার স্বামী সত্যি খুব খারাপ লোক ছিল৷ খুবই লম্পট৷ এই বাড়িতেই স্ত্রীর পাশাপাশি বাজারের মেয়ে এনে তুলেছিলেন৷ ইরাবতীদেবীর মতো দাপুটে মহিলার পক্ষে কি সেটা মেনে নেওয়া সম্ভব ছিল বল৷ আর তা ছাড়া শুধু ইরাদেবী কেন, এমন অবিচার কেই বা মানবে৷ কিন্তু তা বলে উনি মরে ভূত হয়েছেন এমন কথা কেউ কোনোদিন বলেননি৷ যদি সত্যি এমন হত তাহলে কি এতদিনে আর কেউ সে ভূতের দেখা পেত না?’

—‘আমার মনে হয় ইরাদেবী সবাইকে দেখা দেন না, যেহেতু আমি খারাপ চরিত্রের ছেলে, যেহেতু আমিও ওনার স্বামীর মতোই যে নিজের স্ত্রীর বিশ্বাস ভঙ্গ করেছি, তাই হয়তো আমাকেই এভাবে শিক্ষা দিলেন উনি৷’ কথাটা বোকার মতো সেদিন বলেই ফেলেছিল দীপ৷

—‘কী সব যা তা বলছ বল তো? ইরাদেবী কিনা ভূত সেজে এসে তোমায় শিক্ষা দেবেন! দেখ, এসব কথা বোলো না৷ লোকে তোমায় বদ্ধ পাগল ভাববে৷ তবে আসল ব্যাপারটা কী ঘটেছে আমি সেটা বুঝে গেছি৷’ সুজিতদার শেষ কথাটায় চমকে গেছিল দীপ?

—‘আসল ব্যাপার মানে৷ আসল ব্যাপার কী সুজিতদা?’

—‘শোন দীপ, তোমার কম বয়স৷ তাই ঝোঁকের মাথায় একটা ভুল করে ফেলে সুলেখাকে কষ্ট দিয়েছ ঠিকই, কিন্তু এমনিতে যে তুমি খারাপ ছেলে না সে তো আমরা সকলেই জানি৷ আর সেই জন্যই স্ত্রীকে কষ্ট দিয়ে, তাকে ছেড়ে এসে আসলে তুমি একদম ভালো নেই৷ তোমার মনের মধ্যে সবসময় উথাল পাথাল চলছে এই ক-দিন, আর তার থেকেই তোমার মনের মধ্যে তৈরি হয়েছে অদ্ভুত অদ্ভুত কিছু ধারণা৷ আর একা থাকতে থাকতে, সব সময় নেগেটিভ ব্যাপার ভাবতে ভাবতে তুমি নিজেই নানা রকম জিনিস হ্যালুসিনেট করেছ৷ আমার মনে হয় তোমার মানসিক অবস্থা ঠিক নেই দীপ৷ তোমার অবশ্যই একজন সাইক্রিয়াটিস্টের সাথে কথা বলা উচিত৷ তুমি নিশ্চয় কোনো মারাত্মক স্বপ্ন দেখেছিলে কাল রাতে আর তারপর ভয় পেয়ে ঘুমের ঘোরেই ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেছিলে৷ তারপর সেই ঘোরের মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে কোনোভাবে পৌঁছেছিলে ওই স্কুল চত্বরে৷ তুমি ভাবতে পারছ ওই চত্বরে না পৌঁছে অন্য কোথাও গেলে তোমার কি ভীষণ বিপদ হতে পারত!’

—‘এসব আপনি কি বলছেন দাদা? আমি সাইক্রিয়াটিস্ট দেখাব? আমি কি পাগল নাকি?’

—‘আরে পাগল হলেই লোকে সাইক্রিয়াটিস্ট দেখায় এসব ধারণা আজকাল ক্লিশে হয়ে গেছে ভাই৷ মনের যে কোনো সমস্যাতেই আজকাল লোকে ওনাদের সাথে কথা বলে৷ ওনারা কাউন্সেলিং করে অনেক মনের সমস্যা দূর করে দেন৷ আমার এক পরিচিতেরও হয়েছিল ঠিক তোমার মতোই৷ সাংসারিক গণ্ডগোল থেকে মনের চাপ আর তার থেকেই অনিদ্রা, ভুল ভাল হ্যালুসিনেশন৷ তারপর এখন সাইক্রিয়াটিস্ট-এর পরামর্শে দিব্য ভালো আছে৷’

—‘না দাদা আমি কিছু হ্যালুসিনেট করছি না বা কোনো মিথ্যাও বলছি না৷ আর তার প্রমাণ আমি এক্ষুনি দেখাচ্ছি৷ আমার মোবাইলেই আছে তনয়া সরকারের পাঠান ছবি আর ওর প্রোফাইলও ফেসবুকে দেখাচ্ছি আপনাকে৷’ সুজিতদাকে কথাগুলো খুব কনফিডেন্স নিয়ে বললেও শেষ পর্যন্ত আর সেই প্রত্যয় ধরে রাখতে পারেনি দীপ সেদিন৷ উল্টে নিজেই আবার মুখোমুখি হয়েছিল আর এক নাম না জানা আতঙ্কের৷

প্যান্টের পকেট হাতড়ে ধকল সওয়া ফোনটাকে পেয়ে গেলেও পায় নি সেদিন আর কিছুই৷ মোবাইলে তনয়ার পাঠান কোনো ছবি আর নেই৷ দীপ পাগলের মতো খুঁজেছিল৷ কিন্তু না আর ও পায়নি মেয়েটার সেন্ড করা একটা ছবিও৷

এমনকী তনয়ার ফেসবুক উধাও, দেখাচ্ছে না ওর হোয়াটসঅ্যাপও৷ কী এক যাদুবলে যেন উধাও হয়ে গেছে সব৷ ওর পাঠান সব ছবি, টেক্সট৷ এমনকী ফোন বুক বা কল লগে দেখাচ্ছে না ওর ফোন নম্বরটাও৷ যেন তনয়া সরকার নামের মানুষটার অস্তিত্ব ছিলই না পৃথিবীতে কোনোদিন৷

—‘সুজিতদা... সুজিতদা, বিশ্বাস করুন... আমি কিচ্ছু বুঝতে পারছি না৷ তনয়ার সব চিহ্ন এভাবে উধাও হয়ে গেল আমি একেবারেই বুঝতে পারছি না...’ সব কথা হারিয়ে ফেলে দীপ যে এবার খাবি খাচ্ছে সেদিন বুঝেছিলেন সুজিতদা৷ তাই বলেছিলেন—

—‘ছাড় ভাই৷ এসব নিয়ে আর ভেবো না৷ তুমি বলবে ভূত আর আমি বলব সবটাই তোমার মনের ভুল আর কল্পনা৷ তাই এসব তর্কের কোন শেষ নেই৷ তার চেয়ে বরঞ্চ কাজের কথা শোন৷ কাল অনেক রাতে সুলেখার ফোন এসেছিল৷ তোমায় ফোনে না পেয়ে বড়ো উতলা হয়ে গেছে বেচারি৷ এই পনেরো দিন পাগলের মতো টেনশন করেছে৷ তারপর অতি কষ্টে আমার এই নম্বর জোগাড় করে ফোন করেছিল কাল৷ তুমি একবার ওর সাথে কথা বলবে তো?’ কথাটা বলে উত্তরের অপেক্ষা আর না করেই সুজিতদা কী একটা ফোন নম্বর ডায়াল করতে লেগে পড়েছিলেন মন দিয়ে৷ দু-এক মুহূর্তের মধ্যেই দীপ শুনেছিল কথা বলছেন সুজিতদা৷

—‘হ্যাঁ সুলেখা মা, দীপ এখানেই আছে৷ এই নাও কথা বল৷’ হাতে সেদিন ফোনটা ঠুসে দিয়েছিলেন সুজিতদা৷

—‘হ্যালো’ ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলেছিল দীপ৷

—‘তুমি কোথায়? কীভাবে আছো? প্লিজ ফিরে এসো৷ আমি যে অপেক্ষা করছি তোমার জন্য৷’ ব্যাকুল স্বর সুলেখার৷ কোনো রাগ নেই স্বরে৷ কোনো অভিযোগও নেই৷ আছে শুধু উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা দীপের জন্য৷ অবাক হয়ে গেছিল দীপ৷ এত কিছুর পরেও আজও সুলেখা ওর জন্য অপেক্ষা করছে!

তাই মৃদু স্বরে বলেছিল—

—‘কেন অপেক্ষা করছ সুলেখা? আমি তো খারাপ তুমি জানোই৷ তাই আমি বাঁচি কী মরি তাতে কার কী যায় আসে?’

—‘তুমি ভালো কি খারাপ অত আমি জানি না৷ আমি শুধু জানি আমি তোমায় ভালোবাসি৷ তাই তোমায় নিয়েই আমি মরব, বাঁচব৷ সুখে দুখে সংসার করব৷ তুমি আজই ফিরে এসো প্লিজ৷’

সুলেখা ফোনের লাইন কেটে দিলেও কেমন ভেবলে বসে ছিল দীপ সেদিন৷ বুকের মধ্যে কেমন একটা মিষ্টি ভালো লাগার স্রোত টের পাচ্ছিল, যেটা আগে কোনোদিনও পায়নি৷

—‘ভাই, স্ত্রী রত্ন বড়ো রত্ন৷ তাই তাকে কষ্ট দিয়ো না৷ সেই যে তোমার সংসারের লক্ষ্মী৷ তাই সেই লক্ষ্মীকে কষ্ট দিলে নিজেকেও জ্বলতে হয় আর সংসারও জ্বলে যায়৷ সুলেখা যে তোমার অর্ধাঙ্গিনী৷’

দীপের কাঁধে আলতো হাত রেখে কথাগুলো বলছিলেন সুজিতদা, আর ও যেন মর্মে মর্মে উপলব্ধি করতে পারছিল সব কটা শব্দ৷ আর এই উপলব্ধিটা খুঁজে দিতেই ফিরে এসেছিলেন ইরাদেবী, তার নিজের পরিণতি হয়তো আর কারও হতে দিতে উনি চান না৷ হয়তো ওই বাড়িতে থাকতে না গেলে এত ভালো করে এটা বুঝতেই পারত না দীপ৷ যে যাই বলুক, ও জানে ইরাদেবীই এসেছিলেন৷ কখনো তনয়ার রূপ ধরে, তো কখনোও বীভৎস আকার ধরে৷

না আর ভয় করছে না দীপের আজ সেই রাতের কথা ভেবে৷ ও যে ভীষণ ভাবে কৃতজ্ঞ ওই বাড়িটার কাছে৷ যদি সঠিক সময়ে ওর চোখ না খুলত তাহলে হয়তো ওর জীবনটাও শেষ হয়ে যেত ধীরে ধীরে অনুরিমার মতো কালনাগিনীদের বিষে৷ সংসার, দাম্পত্য, ভালোবাসা এগুলোর সুখ হয়তো বুঝতেই পারত না ও কোনোদিন৷ হ্যাঁ সুজিতদা ঠিকই বলেছিলেন, সব পুরুষই একটা আশ্রয় খোঁজ৷ ভরসার জায়গা খোঁজে, ভালোবাসার ঠিকানা খোঁজে৷ আর সেই ঠিকানাটাই হল স্ত্রী, অর্ধাঙ্গিনী৷

হ্যাঁ সেই ঠিকানাটা আর হারাতে দেবে না দীপ৷ আর ও যাযাবরের মতো ঘুরে মরবে না৷ ও যে আজ চিরদিনের জন্য ফিরে যাচ্ছে ওর নিজের ঠিকানার কাছে, নিজের চূড়ান্ত গন্তব্যের কাছে, নিজের সত্যিকারের ভালোবাসার কাছে৷

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%