বৃষ্টির রূপকথা

পল্লবী সেনগুপ্ত

মেঘলা দুপুরের গন্ধ সারা গায়ে মাখতে মাখতে কোল বালিশ জাপটে ধরে বেশ করে বিছানায় গড়াগড়ি খাচ্ছিল বিজন৷ রবিবার দুপুর গুলোতে যেন দুনিয়ার আলসেমি এসে পেয়ে বসে ওকে৷ আর সে তো হবেই৷ সারা সপ্তাহ যা খাটুনি যায়! আই টি ইঞ্জিনিয়াররা তো এখন মোটা মাপের মাইনে পাওয়া আধুনিক শ্রমিক ছাড়া আর কিছুই নয়৷ এই সবে মাস দুয়েক হল ব্যাঙ্গালোরের পাত্তারি গুটিয়ে কলকাতায় নিজের বাড়িতে ফিরেছে বিজন৷ এখন কলকাতাতেই চাকরি করছে ও৷ কিন্তু তবুও বাড়িতে আর থাকাই বা কতটুকু সময়!

গুরুগুরু করে মেঘ ডাকা শুরু হয়েছে৷ বৃষ্টিটা ঝেঁপে এবার নামল বলে৷ পরম আবেশে চোখটা বুজতেই যাচ্ছিল বিজন, ঠিক তখনই আছড়ে পড়ল কানে তীক্ষ্ণ ডাকটা...

—‘কাকি, ও কাকি একবার দরজাটা খুলবে গো তাড়াতাড়ি? বড্ড বাদলা আসছে যে...’

ধাঁই করে যেন একটা হাই ভোল্টেজ শক খেল বিজন৷ রেখা! হ্যাঁ এটা তো রেখারই গলা৷ তার মানে... তার মানে রেখা এখনও আসে এই বাড়িতে! কিন্তু... কিন্তু মা যে বলেছিল রেখার কোনো খবর আজ জানে না কেউ৷ ওরা নাকি এ তল্লাট ছেড়ে চলে গেছে৷ তবে কি সেদিন মিথ্যা বলেছিল মা? কিন্তু কেন? মা তো কিছু কোনোদিন জেনেছিল বলে মনে হয় না৷ নাকি কিছু আন্দাজ করেছিল বলেই...? কিন্তু কি করেই বা আন্দাজ করবে? বিজন তো কোনোদিন কিছু ভুল করেও বুঝতে দেয়নি৷ তবে কি রেখা নিজেই...?

তড়াক করে বিছানায় উঠে বসল বিজন৷ খামচে ধরল বিছানার চাদর৷ কান খাড়া করে শোনার চেষ্টা করল বাইরের ঘরে ঠিক কী কথা বার্তা চলছে৷

—‘কিরে এনেছিস ওই নতুন ডিজাইনের ব্লাউজটা? সুমি কিন্তু বেশ কয়খানা নেবে?

—‘হ্যাঁ গো কাকি এনেছি৷’

এবার ঠোঁট কামড়ে ধরল বিজন৷ এখনও সেই একই কাজ করে চলেছে রেখা, লোকের বাড়ি বাড়ি ঘুরে ব্লাউজ আর সায়া ফেরি৷ লেখা মাসি কি এখনও আছে? নাকি রেখা একাই করে এখন এই কাজ?

অনেক সাহস করে শেষবারের মতো যখন বিজন রেখার কথাটা মা-কে জিজ্ঞাসা করেছিল সেটা প্রায় বছর তিন আগে তো হবেই৷ ইঞ্জিনিয়ারিং-এর ফাইনাল সেমিস্টার তখন সব চুকেছে৷ ব্যাঙ্গালোরে চাকরি জয়েন করার আর অল্প দিনই বাকি৷

—‘কেন রে বিজু রেখার খবর জিজ্ঞাস করছিস কেন হঠাৎ?’ মায়ের প্রশ্নটায় বেশ থতমত খেয়েই গেছিল সেদিন বিজন৷

—‘না মানে এমনি, এই যে তুমি বললে বিকালে সায়া ব্লাউজ কিনতে বেরোবে তাই আর কি...৷ আগে তো ওরা বাড়ি এসেই দিয়ে যেত৷’

—‘না না, ওরা তো এ তল্লাট ছেড়ে অনেকদিনই হল চলে গেছে৷ কে জানে কোথায় গেছে৷’

ব্যস! এর পর আর কোনোদিন রেখার নামটাও উচচারণ করেনি ও, আর কারোর মুখেও শোনেনি ও নাম৷ কিন্তু মনের ভাঁজে যে আজও একটা চিনচিনে ব্যাথা হয় ওর সেই মুখটা মনে পড়লে৷ ওই বৃষ্টি ভেজা বিকালটা যে আজও মাঝে মাঝে ঝাপসা ছবির মতো ফুটে ওঠে ওর অবচেতন মনের ক্যানভাসে৷

তবে কি তখন রেখা চলে গেলেও আজকাল আবার এই পুরোনো তল্লাটে ফিরে এসেছে ও? লক্ষ প্রশ্ন এসে ঘিরে ধরছে বিজনকে৷ অল্প অল্প কাঁপছে বিজন বিছানায় বসে বসেই৷ ঝম ঝম করে বৃষ্টি হচ্ছে বাইরে আর সাথে গুমগুমে মেঘের ডাক৷ প্রকৃতি যেন তুলি দিয়ে আঁকতে চাইছে একটা বৃষ্টি ভেজা রূপকথা আবার, ঠিক সেই দিনের মতো... সেই বিকেলটার মতো৷

—‘বিজু বাবা,’ ...ডাকটায় থমকে দাঁড়াল বিজন৷ ও বেরচ্ছিল বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে৷ আর তো কটা দিনই হবে এই আড্ডা৷ এর পর তো ও চলেই যাবে দিল্লিতে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে নামজাদা কলেজে৷

বিজন কে ডেকেছে লেখা মাসি৷ এই ভদ্রমহিলা ওদের বাড়িতে আসে মাঝে মাঝেই৷ মা-কে সায়া ব্লাউজ এসব এসে দিয়ে যায় মায়ের অর্ডার মতো৷

—‘হ্যাঁ মাসি বলুন’ একটু ভারিক্কি চালেই বলল বিজন৷ হ্যাঁ বিজন ওর বয়সি অন্য ছেলেদের তুলনায় একটু গম্ভীর প্রকৃতির৷ সে তো হবেই৷ ছোটো থেকেই বিজন ক্লাসের টপার৷ সব স্যারদের চোখের মণি ও৷ তা ছাড়া বিজন নামকরা হার্ট স্পেশালিস্ট সৃজন রায়ের ছেলে৷ ওর মা’ও কলেজের অধ্যাপিকা৷ এ হেন ছেলে যে অন্য পাঁচটা ছেলের থেকে বেশ কিছুটা আলাদা হবে সে তো বলাই বাহুল্য৷

যদিও বিজন কিন্তু ছোটো থেকে এমন আলাদা হতে চায়নি৷ কিন্তু সেই শৈশব থেকেই বাবা মা মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছেন ওর মাথায় ভালোভাবে যে বাকি পাঁচটা ছেলের মতো চলতি স্রোতে গা ভাসাতে ও আসেনি৷ ওকে সবার থেকে আলাদা হয়ে নিজের পরিচয় বানাতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি... এসব শুনতে শুনতে আর বাবা মা’র কথা মেনে চলতে চলতে কখন যেন ওর বয়সি ছেলেদের থেকে সত্যি বেশ খানিকটা আলাদা হয়ে পড়েছে ও৷

—‘বিজু বাবা আমি খুব আনন্দ পেয়েছি বউদিদের মুখে কথা শুনে৷ তুমি কত্ত ভালো রেজাল্ট করেছ৷ কত্ত বড়ো কলেজে পড়তে যাচ্ছ৷ তুমি অনেক বড়ো হও বাবা৷’ লেখা মাসি বড্ড সরল ভাবে বলল কথাগুলো৷ অল্প হাসল বিজন৷

—‘দ্যাখ দ্যাখ এই বিজু দাদাকে দেখ, জানিস কত্ত ভালো পড়াশুনায়৷ পায়ের ধূলা নে গে যা৷’ এবার কথাগুলো মাসি বলল নিজের মেয়েকে৷ হ্যাঁ লেখা মাসির মেয়েটাও এ বাড়িতে মাঝে মাঝেই চলে আসে মায়ের সাথে৷ এমনিতে নাকি মেয়েটা পড়াশুনা করছে৷ ক্লাস এইটে পড়ছে৷ আবার তার পাশাপাশি মা-কে কাজে সাহায্যও করে৷ বড্ড গরিব ওরা৷ তবুও বিধবা লেখা মাসি পড়াচ্ছে ওকে৷

বিজন তাকাল মেয়েটার দিকে৷ আর অমনি কেমন যেন শিরশির করে উঠল ওর শরীরটা৷ মেয়েটা মিটিমিটি হাসছে বিজনের দিকে তাকিয়ে৷ বিজন তাকাতেই চোখ নামিয়ে নিল ও৷ সেই হাসি, সেই দৃষ্টি, শ্রদ্ধা, বিস্ময়, ভালো লাগা সব কিছু মেশানো ওই দৃষ্টি৷

বিজন চিরকাল পড়াশুনা নিয়েই থেকেছে৷ মেয়েদের দিকে তেমন লক্ষ্য করেনি সেভাবে৷ তবুও যে অনেক মেয়ের ভালো লাগার পাত্রই নানা সময়ে হয়েছে ও তা বিজন ভালোই জানে৷ কিন্তু তাদের কারোর চোখেই বিজন নিজের জন্য অমন বিস্ময় মিশ্রিত ভালো লাগা দেখেনি৷ মুগ্ধতা দেখেনি নিজের জন্য৷ তাদের চোখে বিজন পেয়েছে কখনো শুধুই চটুল আবেদন আর নয়তো অতি সাধারণ তাৎক্ষণিক আকর্ষণের ভাষা৷

আর প্রতিবার যখনই বিজন এই দৃষ্টিটা মেয়েটার চোখে দেখে তখনই শরীরে কেমন যেন একটা ঝিমঝিম ভাব লাগে ওর৷ ও আর বেশিক্ষণ যেন ধরে রাখতে পারে না নিজের আবেগকে৷ পালিয়ে যেতে ইচ্ছে করে মেয়েটার সামনে থেকে৷

আজও তার অন্যথা হল না৷ ঘিয়ে সালোয়ার আর রেখার এলোমেলো উড়ন্ত চুলগুলো যে আস্তে আস্তে বিজনকে অবশ করে দিচ্ছে সেটা বেশ বুঝতে পারল ও৷

—‘মা, আমি আসছি...’ জোরে একটা হাঁক দিয়ে বেরিয়ে গেল বিজন৷ না, না, না৷ বিজন কোনোদিন এসব নিয়ে ভাবেনি আর আজও ভাববে না৷ সামনে চূড়ান্ত অধ্যাবসায়ের দিন আসছে ওর৷ ওকে বড়ো হতে হবে৷ অনেক উপরে উঠতে হবে৷ এসব বিজনের জন্য নয়, আর রেখার মতো মেয়ে তো নয়ই৷

সেই বহু বছর আগে রেখার গলা পেলে বা ওকে চোখের সামনে দেখলে যে ঝিমঝিমে ভাবটা জাগত বিজনের শরীরে আজও সেটাই যেন জাগছে৷

আজ তবে এত্ত গুলো বছর পরে যদি রেখা ওকে চোখের সামনে দেখে তাহলে কি করবে? ঘৃণা ভরা কোনো দৃষ্টি ছুঁড়ে দেবে কি? নাকি আজও ওর চোখের ভাষায় খেলা করবে কোনো বিস্ময়?

আচ্ছা কেমন দেখতে হয়েছে এখন রেখাকে? সেই ভাসা ভাসা গভীর চোখ আর সেই ঠোঁট... আর ঠোঁটের পাশের তিলটা? সেটাও নিশ্চয় একই আছে এখনও? রেখার কি আদৌ মনে আছে বিজনকে?

হ্যাঁ নিশ্চয় আছে৷ সেই সন্ধ্যাটা যখন বিজন ভুলতে পারেনি তেমন রেখাও কি ভুলতে পেরেছে? আচ্ছা রেখা কি বিয়ে করেছে? এখন কি সংসারী ও?

ধুপ করে বিছানায় শুয়ে পড়ল আবার বিজন৷ বুকের ভিতর উথাল পাথাল করছে৷ জোর করে কানে গুঁজে দিল হেডফোন৷

চারপাশের সবটুকু থেকে এই মুহূর্তে নিজেকে সরিয়ে নিতে চায় ও৷ কিন্তু হচ্ছে না৷ কিছুতেই হচ্ছে না৷ মনটাকে নিজের বশে বন্দি কিছুতেই করতে পারছে না বিজন৷

—‘এই তুমি কি ঘুমাচ্ছ?’ বিজনের মনের মতোই আঁধার ছড়ানো ঘরটায় ঢুকেই সাদা ফ্যাটফ্যাটে টিউব লাইট জ্বালাল সুমি, মানে সম্বন্ধ করে বিয়ে করা বিজনের ছয় মাসের পুরোনো স্ত্রী৷

—‘না মানে হ্যাঁ ওই’... খাপছাড়া জবাব দিল বিজন৷

—‘এই চল না একবার৷ একজন মহিলা এসেছেন৷ কী সুন্দর সুন্দর ব্লাউজ এনেছেন আর সাথে কুর্তিও৷ আমি তো বুঝতেই পারছি না কোনটা ছেড়ে কোনটা নেব৷ প্লিজ চল না একবার৷ মা শুধু মানা করছিল তোমায় ডাকতে... কিন্তু আমিই বললাম যে বিজুই বেছে দেবে আমায়৷ চল না চল না প্লিজ৷’ নিজের স্বভাব সিদ্ধ আহ্লাদী চালে আব্দার জুড়েছে সুমি৷

সুমি মেয়েটা বড্ড সরল৷ বিয়ের প্রথম রাতেই বিজনকে বলেছিল নিজের এক বছর টিকে থাকা প্রেম আর সেই প্রেমিকের সাথে ও প্রথম আর শেষ চুম্বনের গল্পটা৷

এই সুমিই এখন বিজনের বুক জুড়ে৷ কিন্তু তবুও কেন যে অবাধ্য ফ্ল্যাশব্যাকের মতো মাঝে মাঝেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেই মুখটা...

না, সুমি নিজের প্রথম প্রেমের কথা বললে বিজন ওকে বলতে পারেনি রেখার ব্যাপারে৷ কিই বা বলত! রেখা তো আর বিজনের প্রেমিকা ছিল না৷ বন্ধুও ছিল না৷ তাহলে কে ছিল রেখা ওর? কেউ ছিল না তো৷ নামহীন সম্পর্ক? না তাই বা কোথায়? সম্পর্ক তো অনেক গভীর শব্দ৷ ওদের মধ্যে অত ব্যাপ্তি কোনোদিন ছিল কি?

—‘এই কি হল? চল না... চল না’... এবার বিজনের হাত ধরে টানছে সুমি৷

—‘না সুমি প্লিজ, প্লিজ আমায় ছাড়’... গলাটা শুকিয়ে আসছে বিজনের৷ রেখার সামনে বউয়ের হাত ধরে যাবে ও? কী ভাববে রেখা? মাথা উঁচু করে চলা প্রথম সারির ইঞ্জিনিয়ার বিজন রায় কি আরও এক ধাপ নীচু হয়ে যাবে না তাতে ওই সাধারণ মহিলার কাছে? অবশ্য এমনিতেই কি রেখার চোখে উঁচু আছে ও? কিন্তু... কিন্তু রেখা কি জানে, ও কি মানবে যে সত্যি আজও একটু হলেও ও বেঁচে আছে বিজনের স্মৃতিতে?

আস্তে আস্তে সুমির হাত ধরে এগোচ্ছে বিজন৷ এগোচ্ছে অতীতের দিকে, এগোচ্ছে অনেক বছর আগের বৃষ্টি ভেজা একটা বিকেলের দিকে৷

দুমদুম করে জানলার পাল্লাগুলো এলোমেলো লাফালাফি করছে শুনেই বিজন বুঝতে পারল ঝড় উঠেছে নির্ঘাত৷

দ্রুত পায়ে জানালাগুলো বন্ধ করার জন্য এগোল ও৷

—‘আঃ.... উফ!’ ককিয়ে উঠল ছেলেটা৷ জানালা বন্ধ করতে যেই যাবে অমনি ঝড়ের দাপটে অবাধ্য একটা পাল্লা এসে আছড়ে পড়ল বিজনের কপালের উপর৷

কেটে গেছে কপালের বেশ কিছুটা৷ কোনোমতে খোলা জানালা দুটো বন্ধ করে বাথরুমে ছুটল বিজন, ডেটল লাগাতে হবে কপালে৷

ধুর! কোথায় যে গেল ডেটলের শিশিটা! অন্ধকারে হাতড়াচ্ছে বিজন৷ ঝড়ের প্রকোপে আলো নিভে গেছে যে৷ ডেটল খুঁজে না পেয়ে বাথরুম ছেড়ে বেরিয়ে এল ও৷

বাইরে বসার ঘরে একলা বসে রয়েছে ও ভূতের মতো৷ একটা মোমবাতির ফিকে হলুদ শিখা আলো ছড়াচ্ছে ঘরে৷

আসলে বাড়িতে আজ কেউ নেই৷ বাবা মা গেছেন খড়গপুরে দিদার বাড়ি৷ দিদার শরীরটা হঠাৎ বেশ খারাপ করেছে কিনা৷ ওরা গেছে আজ সকালে আর ফিরবে কাল৷ বিজনের জন্য সব রান্না সেরে রেখে গেছে রান্না দিদি৷ এমনিতে তো আজ রাতে ওদের বাবার বন্ধুর মেয়ে শিলা দিদির বিয়েতে নেমন্তন্ন খেতে যাবার কথা ছিল৷ কিন্তু দিদার শরীর খারাপ হওয়াতেই ভেস্তে গেল সব৷ আজ রাতে বাড়িতে একাই থাকতে হবে বিজনকে৷

আর তো মাত্র কটাই দিন এই বাড়িতে৷ পাঁচ দিন পরেই তো বিজন চলে যাচ্ছে দিল্লি৷ নতুন জীবনের আহরণে৷

ঠুক ঠুক ঠুক... দরজায় কড়া নাড়ছে কেউ৷ শুনতে পেল বিজন৷ কে এল এই বৃষ্টির মধ্যে?

—‘কে? কে?’ দু-বার হাঁক ছাড়ল বিজন৷

—‘আমি৷ আমি রেখা৷’ পলকে রিনরিনে স্বরটা ঝংকার তুলল বিজনের বুকে৷

—‘না মা বাড়িতে নেই৷ দিদার বাড়ি গেছে৷ খড়গপুরে গেছে৷ কাল ফিরবে৷’ দরজা খুলে বলল বিজন৷

—‘ও৷ আসলে মা এই ব্লাউজ দিয়ে যেতে বলল৷ মায়ের শরীরটা ভালো নেই তো৷ আর কাকি অর্ডার দিয়েছিল আজ বিয়ে বাড়ি যাবার জন্য৷’ কেমন মায়াবী স্বরে যেন বলল মেয়েটা কথাগুলো৷

ভিজে গেছে রেখা৷ ওর সারা চোখে মুখে এলোমেলো বৃষ্টির ফোঁটা৷ আকাশি সালোয়ার ভিজে গেছে৷ চুল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে জল৷ আর চোখে সেই দৃষ্টি৷ মুগ্ধ নয়নে আজও মেয়েটা যথারীতি জরিপ করছে বিজনকে৷

আবার... আবার যেন নিজের স্নায়ুর ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে বিজন৷

—‘এমা একি! আপনার কপালে যে রক্ত? কী করে হল?’ কাঁপা স্বরে বলে উঠল রেখা৷

—‘না ও কিছু না৷’ বলে আবার পালাতে চাইল বিজন৷

—‘কিছু না বললেই হল?’ বিজনকে ঠেলেই এবার ভিতরে ঢুকে এল রেখা৷

ফ্যাচ করে নিজের ওড়না ছিঁড়ে অপটু হাতে বেঁধে দিচ্ছে বিজনের ক্ষতস্থান৷ উফফ! কী সাংঘাতিক মায়াবী স্পর্শ৷ বিজন বুঝতে পারল ওর শরীরের ঝিমঝিমানিটা বেড়ে চলেছে আরও শতগুণ৷

—‘এমন হল কী করে? ইশশ! অনেকটা কেটে গেছে যে৷’ অনেক কথা বলে চলেছে রেখা৷ সব ঠিক মতো কানে ঢুকছে না বিজনের৷ ও আস্তে আস্তে কাবু হয়ে যাচ্ছে রেখার গা থেকে ভেসে আসা অদ্ভুত গন্ধটায়৷ জীবনে প্রথমবার... প্রথমবার কোনো মেয়ে ওর এত্তটা কাছে৷

হঠাৎ কী যেন হয়ে গেল বিজনের মাথার মধ্যে৷ খপ করে চেপে ধরল ও রেখার একটা হাত৷ চমকে উঠল রেখা৷

—‘রেখা, রেখা ভালোবাসবে আমায়? প্লিজ৷ আমি... আমি...’ ঘোর লাগা স্বরে বলে উঠল বিজন৷

—‘এসব কী বলছেন? কোথায় আপনি আর কোথায় আমি? আমার যে কোনো যোগ্যতাই নেই আপনার পাশে দাঁড়ানোর৷ আমি যে খুব সাধারণ৷’

—‘না না আমি জানি না৷ এসব আমি মানি না...’ বলতে বলতেই ঝপ করে নিজের ঠোঁটটা ডুবিয়ে দিল বিজন রেখার ঠোঁটে৷ বুঝতে পারল রেখা কাঁপছে এক অদ্ভুত ভালো লাগায়৷ বৃষ্টি ভেজা একটা সন্ধ্যা আর মোমের দুলন্ত শিখাকে সাক্ষী করে বিজনের ঠোঁট আস্তে আস্তে নামছে রেখার শরীর ছুঁয়ে৷ গলায়, কাঁধে আর তারপর বুকে৷ ভীষণ বেপরোয়া আজ বিজন৷ আর রেখাও যেন সমর্পিত হরিণী৷

বিজনের হাত আস্তে আস্তে প্রবেশ করছে রেখার ভিজে যাওয়া কুর্তির একদম গভীরে৷ প্রথমবার ও অনুভব করছে নারী শরীর, পাগল করে দিচ্ছে ওকে রেখার প্রস্ফুটিত যৌবনের স্পর্শ৷

—‘আমি আসি আজ...’ হঠাৎ ঝপ করে নিজেকে ছাড়িয়ে নিল রেখা৷ বিজন কিছু বলার আগেই দৌড়ে বেরিয়ে গেল বৃষ্টি ভেজা অন্ধকারের মধ্যেই৷

কয়েক মুহূর্ত স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল বিজন৷ কেমন যেন একটা ঘোর লাগা ভাব৷ কিন্তু ঘোরটা কাটতেই ওকে পেয়ে বসল একটা মারাত্মক ভয়৷

ছি ছি ছি! এটা কি করতে যাচ্ছিল ও? আর কি করেই বা ফেলল? রেখা যদি কাউকে কিছু বলে দেয়? ভালো ছেলে হিসাবে যে সুনামটা অর্জন করেছে ও সেটা তো নিমেষে ধূলিসাৎ হয়ে যাবে৷ আর বাবা মা?

মা তো বোধ হয় আত্মহত্যাই করে নেবে৷ আর বাবা? বাবা তো নির্ঘাত তাড়িয়ে দেবে ওকে৷ শেষে কিনা ডক্টর সৃজন রায়ের ছেলের সাথে একটা ফেরিওয়ালার মেয়ের... ছি ছি! ঘেন্না ঘেন্না৷ কাউকে যে আর মুখ দেখাবার যো থাকবে না ওর৷

পা কাঁপছে এবার বিজনের৷ নাঃ বেমালুম চেপে যেতে হবে সবটা৷ কিন্তু রেখা যদি ব্ল্যাক মেল করে? কিন্তু কি প্রমাণ আছে এসবের? কোনো প্রমাণ নেই৷ কাজেই রেখা যদি কাউকে কিছু বলেও দেয়ে ওকে মিথ্যাবাদী প্রমাণ করা এমন কিছু কঠিন হবেই না বিজনের জন্য৷ হ্যাঁ ভুলে যেতে হবে বেমালুম এই সন্ধেটা৷ আর তো মাত্র পাঁচ দিন পরেই ও চলে যাচ্ছে দিল্লি৷ তারপর আর রেখা ওকে চাইলেই বা পাচ্ছে কোথায় ব্ল্যাকমেল করার জন্য!

—‘এই আমায় বেছে দেবে কিন্তু কুর্তি৷’ হিড়হিড় করে বিজনকে টানছে সুমি৷

ঢিপঢিপ করছে বিজনের বুকের ভিতর৷ না সেই সন্ধ্যার পর আর কোনোদিন রেখার সাথে সেভাবে দেখা হয়নি ওর৷ দিল্লি যাবার পর প্রায় গোটা দু-বছর নানা ছলে এড়িয়ে গেছে ও কলকাতায় আসা, শুধু রেখার সাথে মুখোমুখি হবার ভয়ে৷ তবে রেখাও যে ওসব কথা কাউকে বলেনি সেটা দিল্লিতে বসেও বুঝেছিল বিজন৷

দু-বছর পরে দিল্লি থেকে সাতদিনের জন্য কলকাতায় ফিরে মায়ের কাছে শুনেছিল লেখা মাসি এখন খুব কম আসে মায়ের কাছে৷ আর রেখা তো একদমই আসে না৷

তবুও সেই বারেই রাস্তায় কীভাবে যেন একদিন দেখা হয়েই গেছিল রেখার সাথে৷ না ওর মুখের দিকে ভালো করে তাকাতেও সাহস হয়নি সেদিন বিজনের৷ কোনো মতে পালিয়ে বাঁচতে চেয়েছিল ও৷ রেখাও ওর দিকে তাকিয়েছিল কিনা সেদিন লক্ষ্য করা হয়নি৷ তবে রেখা ওর একদম পাশ ঘেঁষে চলে গেছিল৷

সেদিন ফিরে নিজের পকেট থেকেই একটা চিরকুট খুঁজে পেয়েছিল বিজন৷ সাদা কাগজে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা—

‘বৃষ্টির ফোঁটা দিয়ে রূপকথা লেখা হলেও সেটা মুছে যায়

আমি জানি৷ বৃষ্টির রূপকথা যে বড়োই মায়াবী, বড়োই ক্ষণিক৷’

ভাল থাকবেন৷

চিরকুটটা পরে সেদিন বুকের ভেতর মুচড়ে উঠেছিল বিজনের৷ কিন্তু পরমুহূর্তেই আবার ফিরে এসেছিল সেই ভয়টা৷ সামাজিক স্টেটাস হারানোর ভয়, খারাপ ছেলের বদনাম কুড়ানোর ভয়৷ সেই শেষ৷ আর কোনোদিন দেখা হয়নি তার সাথে৷ তারা তো নাকি চলেই গেছিল এই তল্লাট ছেড়ে৷

হ্যাঁ রেখা ঠিক বলেছিল বৃষ্টির রূপকথা বোধ হয় সত্যি মুছে যায়, কিন্তু তার দাগটুকু যে মুছে গিয়েও মোছে না৷ তাই তো আজও মাঝে মাঝে ঘুমের মধ্যে বিজন দেখতে পায় অনেক পুরোনো সেই বৃষ্টি বিকেলটাকে আবছা ভাবে৷

—‘দিদি এই যে আমার বর৷ ওর পছন্দ খুব ভালো৷ ওই বেছে দেবে কুর্তি৷’ পিছন করে বসে আছে রেখা বিজনের দিকে৷ আর বিজনের বুকে একসাথে লক্ষ দামামা বাজছে৷ এত বছর পর আবার রেখার মুখোমুখি ও৷ আবার রেখার চোখে চোখ পড়বে৷ মিলিয়ে যাওয়া রূপকথার মতো হারিয়ে যাওয়া কয়েকটা মুহূর্ত আবার ভাসবে ওদের দুজনের মাঝে৷

—‘এই এসো না এদিকে৷’ ...বিজনের হাত ধরে টেনে নিয়ে এল মহিলার সামনে সুমি৷

চমকে উঠল বিজন৷ না৷ এ তো রেখা নয়৷ এ তো অন্য একজন মহিলা৷

—‘বিজু, এটাই তপু দিদি৷ ইনিই ব্লাউজ দিয়ে যান মা-কে৷ তপু দিদি ইনি আমার পতিদেব৷’ হি হি হাসছে সুমি৷

চোয়াল ফাঁক করল বিজনও৷ হঠাৎ যেন কেমন বেবাক ফাঁকা লাগছে বুকের ভিতরটা৷ না এটা রেখা নয়৷ হবেই বা কী করে? রেখা তো অজানা কোনো এক ঠিকানায় হারিয়ে গেছে৷ নাঃ, রেখার সাথে আর কোনোদিন দেখা হয়তো এ জীবনে হবে না৷ ও নিজেই হয়তো আর হতে দেবে না৷ কারণ মায়াবী চোখের মেয়েটা যে জানত বৃষ্টির রূপকথা হারিয়ে যায়, ধুয়ে যায় তার গল্প৷

সুমি হাসছে আর কুর্তি দেখছে৷ ওর দিকে অপলক তাকিয়ে রইল বিজন কয়েকটা মুহূর্ত৷ না, আজ সুমিকে রেখার ব্যাপারে বলবে বিজন৷ যেমন সুমি জানিয়েছিল নিজের প্রথম প্রেমের কথা, তেমন বিজনও জানাবে আজ সুমিকে৷ হ্যাঁ রেখাই বিজনের প্রথম প্রেম৷ সেই স্বীকৃতি আজ দেবে ও সেই সন্ধ্যার মুহূর্তটাকে৷ নিজের জীবনের বৃষ্টির রূপকথার জলপরীর এই সম্মানটুকু সযত্নে ও বাঁচিয়ে রাখবে এবার থেকে সারা জীবন৷

___

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%