পল্লবী সেনগুপ্ত
—‘শেষ প্রশ্ন স্যার... আপনি কি কখনো স্বচক্ষে ভূত দেখেছেন বা এমন কোনো অভিজ্ঞতা প্রত্যক্ষ করেছেন যেটা ঠিক লৌকিক নয়৷’
শেষ প্রশ্নটাতেই মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল এ সময়ের প্রখ্যাত সাহিত্যিক অভিযান গুহ’র৷ অভিযান ভৌতিক অলৌকিক পর্যায়ের সাহিত্য রচনা করেই এই নিদারুন খ্যাতি, টাকা পয়সা সব পেয়েছেন খুব অল্প সময়ের মধ্যেই৷ অল্প জল খেয়ে বললেন—
—‘প্লিজ আজ আর কোনো প্রশ্ন নয়৷ আমায় এক্ষুনি বেরিয়ে যেতে হবে একটা অন্য ভীষণ জরুরি কাজে৷’ প্রায় হন হন করে বেরিয়ে গেলেন অভিযান গুহ ইন্টারভিউ রুম ছেড়ে৷
—‘খোকা যে কেন এমন করছে তার কিছুই তো আমি বুঝতে পারছি না৷ এত নাম ডাক করেছে এখন, কিন্তু সংসার ধর্ম তো করতে হবে এবার৷ কিন্তু ছেলে তো বিয়ের নাম শুনলেই কেমন যেন আঁতকে ওঠে৷ কেন যে এমন করছে...’ মুখে চিন্তার ভাঁজ ফেলে কথাগুলো স্বামীকে বললেন সুমিত্রা দেবী৷
—‘আরে ঘটক পরশুদিন যে মেয়েটার ছবি দিয়ে গেছে সে মেয়েটার ছবি খোকাকে দেখাও যখন খোকা আসবে পরের বার৷ আমি বলছি অমন ডানা কাটা পরীর সমন্ধ খোকা না বলতে পারবে না৷’
স্বামীর কথা শুনে খানিক আশ্বস্ত হলেন সুমিত্রা দেবী৷ কিছুটা স্বগতোক্তির ভঙ্গীতেই বললেন—
—‘তাই যেন হয় ঈশ্বর, তাই যেন হয়৷’
টিফিন বাক্স খুলে টিফিন খেতে খেতে একদৃষ্টে মেয়েটার দিকে লক্ষ্য করছিল লখা মানে লখিন্দর৷ লখা নিজের নামটা নিয়ে বড্ড অস্বস্তিতে ভোগে৷ কেন যে ঠাকুমা এমন একটা বিদঘুটে নাম রেখেছিলেন ওর! ওর নাকি বাইশ বছর বয়সে ফারা আছে৷ তাই ঠাকুমার ইচ্ছে হল ওর নাম লখিন্দর দিতে... ইশশ! কোনো মানে হয়৷
লখা কলেজ পাশ করেছে গত বছর৷ ও একদমই গ্রামের ছেলে৷ চালাক চতুরও বিশেষ নয়৷ শুধু একটু আধটু কবিতা টবিতা লিখতে পারে এই আর কি!
কলেজ পাশ দিয়ে যখন নিপাট শিক্ষিত যুবক হয়ে ঘরে বসেছিল লখা, তখনই বেশ খানিকটা অপ্রত্যাশিত ভাবেই জুটে যায় ওর এই চাকরিটা৷ ওদের গ্রামেরই লেখা কাকিমার জামাইয়ের সুপারিশে এই চাকরিটা পেয়ে গেছে লখা৷ খুব সাধারণ একটা বেসরকারি অফিসে কেরানির কাজ৷
অফিসে জয়েন করার পর প্রথম প্রথম সব কিছু ঠিকই ছিল৷ মন দিয়েই কাজ করছিল লখা৷ কিন্তু গোলমাল শুরু করল বেয়াড়া এই মনটা৷ অজন্তা বলে ওই মেয়েটাকে দেখলেই কেন যে বুকের মধ্যে এভাবে ধুকপুকানিটা বেড়ে যায়...
আসলে অজন্তা মেয়েটা সত্যি খুব ভালো৷ লখা নতুন বলে সবাই যেমন শুরুর দিকে ওকে শুধু নাস্তানাবুদ করার চেষ্টা করত অজন্তা কোনোদিনই তা করেনি৷ বরঞ্চ লখা কোনো কাজ বুঝতে অসুবিধা হলে ও সব সময় সাহায্য করার চেষ্টা করত লখাকে৷ আর অজন্তার এই আলাদা রকম মিষ্টি ব্যবহারটাই আস্তে আস্তে লখাকে বড্ড দুর্বল করে দিয়েছে ওর প্রতি৷
আগে লখা ভাবত যে লখার ওই মেয়েটার প্রতি এই অনুভূতিটা শুধুই একতরফা৷ কিন্তু ওকে ভীষণ চমকে দিয়ে ইদানীং অজন্তার ব্যবহারটাও কেমন যেন বদলেছে একটু একটু করে৷ লখা লক্ষ্য করেছে ইদানীং অজন্তার দৃষ্টিও ছুঁয়ে যায় ওকে একটা অন্যরকম ভালো লাগা নিয়ে৷ আগে লখা লুকিয়ে লুকিয়ে অজন্তাকে দেখত, কিন্তু আজকাল অজন্তার প্রশ্রয়েই ও মাঝে মাঝেই সরাসরি দৃষ্টি বিনিময় করে অজন্তার সাথে৷ দু-একবার কাজের অছিলায় ছুঁয়ে গেছে অজন্তার হাত৷ না, অজন্তা রাগ করেনি৷ বরং কেমন ভয় পাওয়া ত্রস্ত হরিণীর মতো কেঁপে উঠেছে কখনো, আবার কখনো বা লজ্জার গোলাপি আভা ছড়িয়ে পড়েছে ওর মুখে৷
অজন্তার দিকে দেখতে দেখতেই আজও লাঞ্চের রুটি তরকারি খাচ্ছিল লখা৷ কখন যে তরকারি ফুরিয়ে গেছে, আর শুধু শুকনো রুটিই চিবিয়ে চলেছে ও সেটা লক্ষ্যই করেনি লখা৷ ও তো আজকাল বেশির ভাগ সময়ই কেমন যেন স্বপ্নের জালে বিভোর থাকে৷
—‘কী ব্যাপার? শুকনো রুটি খাচ্ছ কেন? তরকারি শেষ? এই নাও৷ আমার এত তরকারি লাগবে না৷’
অজন্তার গলার স্বরেই চমক ভাঙল লখার৷ অজন্তা নিজের লাঞ্চ বক্স থেকে তরকারি ঢেলে দিচ্ছে লখাকে৷
—‘এই না না৷ আমি আর খাব না’.... বাধা দিতে গেল লখা৷ আর ঠিক তখনই আবার অজন্তার আঙুল ছুঁয়ে গেল লখার হাত৷
আবার কেঁপে উঠল অজন্তা৷ আবার একটা হালকা রক্তিম আভা ছুঁয়ে দিল ওর চিবুক৷
লখার বুকের মধ্যেও যেন বয়ে গেল কুলকুল ঝর্না৷ না অনেক হয়েছে৷ আর না৷ নিজের আবেগ নিয়ে আর এভাবে লুকোচুরি খেলতে পারছে না লখা৷ এবার একটা কিছু করতেই হবে৷
—‘অজন্তা, আমার তোমার সাথে খুব দরকারি কিছু কথা আছে৷ যেটা আমি অফিসে বলতে পারব না৷ আমার তোমার কিছুটা সময় চাই৷ আজ অফিসের পর একটা কফিশপে একটু যেতে পারবে আমার সাথে?’ কথাটা প্রায় একনিঃশ্বাসে বলে দিল লখা৷
পলকে ফ্যাকাসে হয়ে গেল অজন্তার মুখ৷ নিমেষে যেন সবটুকু রক্ত কেউ শুষে নিয়েছে ওর মুখ থেকে৷ সাদাটে পাংশু বর্ণ মুখে পাক খাচ্ছে একরাশ ভয়৷
না, লখা দেখতে পেল না সেটা৷ বা হয়তো বুঝতেও পারল না৷ লখার বুক জুড়ে তখন পাক খাচ্ছে শুধুই নবীন প্রেমের উন্মাদনা৷
বাস স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে পাগল পারা বৃষ্টিতে ভিজছিল লখা৷ পাগলের মতো বৃষ্টি হচ্ছে কলকাতা শহর জুড়ে৷ লখা আজ ছাতা নিয়ে বের হয়নি সকালে৷ তাই এখন তো ওকে ভিজতেই হবে৷ অবশ্য তাতে কোন দুঃখ নেই লখার৷ ভিজতে কোনো আপত্তি নেই৷ আসলে আর বাঁচতেই ইচ্ছা করছে না ওর৷ কী হবে আর বেঁচে থেকে! গত পরশু দিনের ঘটনাটা এখনো পুরোপুরি হজম করতে পারছে না ও৷ কফিশপে সেদিন অজন্তাকে প্রপোজ করেছিল৷ কিন্তু অজন্তা প্রত্যাখান করেছে ওকে৷ কিন্তু কেন? না সত্যি বুঝতে পারছে না লখা এই প্রত্যাখানের কারণ কি? লখা নিশ্চিত যে অজন্তা ওকে পছন্দ করে, কিন্তু তাহলে কেন?
অজন্তার জীবনটা অনেকটা অন্ধকার মেঘে ঢাকা এটা ঠিক, কিন্তু তার জন্য ও লখাকে কেন সরিয়ে দিতে চাইছে দূরে? লখা জানে অজন্তার স্বামী মারা গেছেন একটা বিচ্ছিরি দুর্ঘটনায় বছর দুই আগে৷ আর বর্তমানে অজন্তার তিন কুলে কেউ নেই৷ সেইজন্যই তো লখা আজ চায় অজন্তাকে নিজের করে নিয়ে ওকে সব ভুলিয়ে দিতে৷ তাহলে ওর কীসের এত ভয় আজ? কেন সেদিন ওভাবে তড়িঘড়ি কফিশপ ছেড়ে চলে গেল অজন্তা? তারপর গতকাল অফিস পর্যন্ত এল না৷ আজ সারাদিনে একটি বার তাকাল না পর্যন্ত লখার দিকে৷
অবিশ্রান্ত বারিধারা ভিজিয়ে দিচ্ছে লখাকে, তবুও দেখা নেই বাসের৷ হঠাৎ যেন মাথার ওপর একটুকরো ছাদ অনুভব করল লখা৷ চমকে পাশ ফিরে তাকাতেই ও দেখল কখন যেন ওর পাশে এসে দাঁড়িয়েছে অজন্তা৷ ছাতা দিয়ে বাঁচাতে চাইছে ওর মাথা৷ ওকে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল লখা তার আগেই খুব চাপা স্বরে কথা বলে উঠল অজন্তা—
—‘লখিন্দর আমার তোমার সাথে খুব দরকারি কয়েকটা কথা আছে৷ খুউব দরকারি৷’ কেমন হিসহিসে লাগল যেন অজন্তার গলাটা৷ লখা আবার কিছু একটা বলতে গেল, কিন্তু বলা হল না৷ তার আগেই সামনে অবতীর্ণ হল রুটের বাস৷
পড়িমরি করে বাসটায় উঠে পড়ল লখা৷ আর উঠেই চমকে গেল৷ একী! অজন্তাও উঠে এসেছে৷
—‘কী ব্যাপার তুমি এই বাসে?’ প্রশ্নটা করেই ফেলল লখা৷
—‘আমি রোজ এই রুটের বাসেই ফিরি৷ আমি তোমার থেকে কিছুটা আগে অফিস থেকে বের হই বলে তুমি হয়তো আগে কোনোদিন দেখনি৷’ একই রকম চাপা হিসহিসে স্বরে বলল অজন্তা৷
মিনিট দশেকের মধ্যেই একটু খালি হল বাসটা৷ ধপ করে নিজের শরীর ছেড়ে দিল লখা একটা খালি সিটে৷ ওমনি পাশের খালি সিটে এসে বসে পড়ল অজন্তাও৷
—‘লখিন্দর, আমি আজ তোমায় এমন একটা কথা বলব যেটা হয়তো তোমার বিশ্বাস হবে না৷’ মুখে একরাশ ভয় নিয়ে কথাটা বলল অজন্তা৷
—‘নিলয়, মানে আমার স্বামী খুব সাংঘাতিক লোক৷ ও যদি একবারও জানতে পারে যে তোমার নজর পড়েছে আমার ওপর, বা আমিও তোমার প্রতি... বিশ্বাস কর নিলয় তাহলে আর আমাদের কাউকে ছাড়বে না৷ শেষ করে ফেলবে ও আমাদের৷ কোথাও পালিয়ে বাঁচতে পারব না আমরা৷’ লখা দেখল ভয় আর আতঙ্কে কেমন অদ্ভুত কালো দেখাচ্ছে অজন্তার মুখ৷
—‘মানে? এসব কি বলছ তুমি? নিলয় বাবু মানে তোমার স্বামী তো মারা গেছেন৷’
—‘নিলয় মানসিক ভাবে অসুস্থ ছিল৷ ওর সবচেয়ে বড়ো অসুখের জায়গা ছিলাম আমি৷ ওর সব সময় মনে হত আমি ওকে ঠকাব৷ আমার ভালোবাসা ওর প্রতি পুরোপুরি সৎ নয়৷ নিলয় মারা যায় অ্যাক্সিডেন্টে৷ কিন্তু মৃত্যুর পরেও শেষ হয়নি নিলয়ের আমার প্রতি অধিকার বোধ৷ প্রতি মুহূর্তে ও এখনো কড়া নজরে রেখেছে আমাকে৷ আমার বিন্দুমাত্র বেচাল দেখলেই ও শেষ করে ফেলবে আমায়৷ আর সাথে তোমাকেও৷ তাই প্লিজ তুমি আমার থেকে দূরে দূরে থেকো লখা৷ এতে তোমার আর আমার উভয়েরই মঙ্গল৷’
—‘এসব কি পাগলের মতো বলছ তুমি অজন্তা?’ বাসের লোকজন উপেক্ষা করেই খানিকটা স্বর চড়িয়ে ফেলল লখা৷ নিজেকে সংযত করে নিল পরক্ষনেই৷
—‘আমি ঠিক বলছি লখা৷ নিলয় আজও আমার সাথেই থাকে৷ অন্যরূপে, অন্যভাবে৷ কিন্তু ও ভীষণ ভাবে সত্যি আজও আমার জীবনে৷’
হঠাৎ ভীষণ ক্যাচম্যাচ শব্দ করে ব্রেক কষল বাসটা৷
—‘আমি আসি’ বলে দ্রুত পায়ে নেমে গেল বাস থেকে অজন্তা৷ স্থানুবত হয়ে কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইল লখা৷ তারপর বাসটা ছাড়ার মুহূর্তটাতেই নেমে পড়ল লখাও৷
বৃষ্টিভেজা সেই সন্ধ্যায় অজন্তার বলে যাওয়া কথাগুলোর বিন্দু বিসর্গ গত সাত দিনেও বুঝে উঠতে পারেনি লখা৷ কী ওসব কথার মানে? অজন্তা কি কোনো রকম মানসিক ব্যাধির শিকার হয়েছে নাকি জেনে বুঝে ইচ্ছে করেই লখাকে দূরে সরিয়ে দেবার জন্য এমন আষাঢ়ে ভূতের আজগুবি গল্প ফেঁদেছে ও৷ এই সব ভাবতে ভাবতেই গত সাতটি দিন কেটে গেছে লখার৷ কিন্তু কোনো উত্তর পায়নি ও৷ গত সাতদিন ধরে টানা অফিসে আসেনি অজন্তা৷ আজ সকালে এসেছিল৷ তবে অজন্তা নয়৷ অজন্তার রেজিংগনেশান লেটার৷ ও খবর পাঠিয়েছে যে ও চলে যাচ্ছে এই শহর ছেড়ে দু-দিন পরেই৷ অজন্তার ইস্তফার খবরটা পাবার পরই আজ নিজের শেষ সিদ্ধান্তটা নিয়ে ফেলেছে লখা৷ আজ ও সরাসরি পৌঁছে যাবে অজন্তার বাড়ি৷ ভাগ্যিস! সেদিন সন্ধ্যাতেই অজন্তার পিছু নিয়ে গিয়ে ওর বাড়িটা দেখে নিয়েছিল লখা৷ কিন্তু সেদিন সাহস হয়নি ওর ওই বাড়িতে ঢোকার৷ কিন্তু আজ ও ওখানে গিয়েই সরাসরি মুখোমুখি হবে অজন্তার৷
সেই মতোই বেরিয়ে পড়েছে আজ লখা অফিস শেষে৷ এগিয়ে চলেছে ও অজন্তার বাড়ির দিকে৷ যদিও ঘড়ি বলছে সময় রাত ন-টা সবে, কিন্তু চারপাশটা দেখে যেন মনে হচ্ছে গভীর রাত৷ অজন্তার পাড়ায় ইতিমধ্যে এসে পড়েছে লখা৷ এখন বোধ হয় পাওয়ার কাট হয়েছে এখানে৷ বর্ষার সন্ধ্যা, তাইতে ঘুটঘুটে অন্ধকার, ঝিঁঝিঁ আর ব্যাঙের অবিরাম কলরব চলছে, সব মিলিয়ে হঠাৎ কেমন যেন গা-টা ছম ছম করে উঠল লখার৷
হাঁটতে হাঁটতে এবার লখা চলে এসেছে অজন্তার বাড়ির একদম কাছে৷ ঘুটঘুটে একলা সন্ধ্যায় কেমন যেন অতৃপ্ত দৈত্যর মতো দাঁড়িয়ে আছে পুরোনো দিনের একতলা বাড়িটা৷ বাড়িটার দরজার সামনে দাঁড়াল লখা৷ বুকের ভেতর হঠাৎ যেন কেউ লক্ষ দামামা বাজাতে শুরু করেছে৷ ভীষণ ভয় করছে হঠাৎ কেন কে জানে!
নাঃ৷ ভয় কীসের? নিজেই যেন নিজেকে প্রবোধ দিল লখা৷ কাঁপা হাতে হাতে কড়া নাড়ল অজন্তার দরজায়৷
ঠক ঠক... একবার, দু-বার, তিনবার৷ পর পর তিনবার কড়া নাড়ল লখা৷
—‘কে? কে?’ এবার ভেতর থেকে শোনা গেল অজন্তার গলা৷
এতদিন পর ওর গলাটা শুনতে পেয়ে লখার হূদয়ের ভেতর যেন একসাথে লক্ষ প্রজাপতি উড়ে গেল৷ সব ভয় নিমেষে উবে গেল৷
—‘আমি...৷ আমি লখিন্দর অজন্তা৷’ বলতে গিয়ে যেন আবেগে গলা বুজে এল লখার৷
খুট করে খুলে গেল দরজাটা৷ সামনে দাঁড়িয়ে অজন্তা৷ হাতে তার মোমবাতি, যার শিখাটা দুলছে আর লাফাচ্ছে ক্রমাগত৷
—‘তুমি? তুমি এখানে? তুমি কীভাবে চিনলে এই জায়গা? ভয়ে শুকিয়ে গেছে অজন্তার মুখ৷ কাঁপছে গলার স্বর৷
—‘সব কথা বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখেই বলবে? ভিতরে আসতে বলবে না?’ কথাটা বলেই আর অজন্তার উত্তরের অপেক্ষা করল না ও৷ খানিকটা ওকে জোর করে ঠেলেই ভিতরে ঢুকে গেল৷
—‘আমি জানি না লখিন্দর, তুমি কীভাবে চিনলে এই জায়গা৷ কিন্তু শুধু এই কথাই বলব যে এখানে এসে তুমি আজ তোমার জীবনের সব চেয়ে বড়ো ভুলটা করেছ৷ আর রক্ষা নেই৷ আর আমরা কেউ বাঁচব না৷’ ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে এবার অজন্তা৷
—‘না অজন্তা না৷ তোমাকে এভাবে আমি ভয় আর আতঙ্ক নিয়ে বেঁচে থাকতে দেব না৷ আর তোমাকে আমি চলে যেতেও দেব না৷ তোমার এসব আজগুবি ভাবনা এবার শেষ করতে হবে৷ নিলয় বাবু আর নেই৷ মারা গেলে আর কেউ আসতে পারে না৷’ অজন্তার একদম কাছ ঘেঁষে বসে বলল লখা৷
—‘না, লখা তুমি বুঝতে পারছ না’... কথাটা শেষ করতে পারল না ও৷ তার আগেই লখার গলা চিরে বেরিয়ে এলো একটা তীব্র চিৎকার৷
—‘অজন্তা... ওটা আ আ কী?’ আঁতকে উঠেছে লখা৷ কারণ আলো আঁধার মাখা ঘরটার কোণে রাখা কাঁচের বাক্সটায় ততক্ষণে চোখ পড়ে গেছে ওর৷ ও দেখে নিয়েছে যে কাঁচের ওই বাক্সটায় কিলবিল করছে একটা হিংস্র চোখের নধর কালো কেউটে৷
—‘ওটা নিলয়৷’ খুব ঠাণ্ডা গলায় উত্তর এল অজন্তার কাছ থেকে৷
—‘আমি তো তোমাকে বলেইছিলাম যে নিলয় এখনও এখানেই থাকে৷ আমার সাথে থাকে আমার উপর নজরদারি করবে বলে৷ নিলয়ের মৃত্যুর দু-দিন পরেই ও আবার ফিরে এসেছিল৷ সাপের শরীর নিয়ে৷ প্রথমে আমি বুঝতে পারিনি৷ কিন্তু তারপর ও নিজেই ধরা দিল৷ ও বলছে আমাকেও ও সাপ বানিয়ে দিতে পারে যেকোনোদিন৷ তাই আমি ওর সব কথা শুনে চলি লখা৷ আর আগামী দিনেও শুনে চলতে হবে আমায়৷ তাই বলছি তুমি প্লিজ চলে যাও৷’ কেটে কেটে কথাগুলো বলল অজন্তা৷
মাথা গুলিয়ে যাচ্ছে লখার৷ এসব কী বলছে মেয়েটা? এই একবিংশ শতকে এমন কথা কেউ বলতে পারে নাকি?
—‘অজন্তা আমার মনে হয় তোমার মানসিক চিকিৎসা দরকার৷ কোনোভাবে একটা ভয়ের মধ্যে আটকে পড়েছ তুমি আর যার থেকে হয়ে যেতে পারে তোমার বড়ো কোনো ক্ষতি৷ এভাবে একটা সাপ পুষছ ঘরের মধ্যে, আর বলছ ওটা নিলয় বাবু৷ না, অজন্তা এভাবে চলতে পারে না৷ আমি তোমায় সাইকিয়াট্রিস্ট এর কাছে নিয়ে যাব৷’ এবার একটু শক্ত হল লখা৷
—‘না লখা, আমি সব হারিয়ে ফেলেছি৷ আমার জীবন স্বপ্ন, সব কিছু৷’ এবার ডুকরে কেঁদে উঠল অজন্তা৷
লখা এগিয়ে গেল অজন্তার দিকে৷ ওর চোখ মুছিয়ে দিয়ে শক্ত করে চেপে ধরল ওকে নিজের আলিঙ্গনে—
—‘আমি এভাবেই শক্ত করে সারাজীবন বেঁধে রাখব তোমায় নিজের কাছে৷ দেখি কে আলাদা করে আমাদের৷ প্রেম যখন জীবনে একবার এসেছে তাকে আমি আটকে রাখবই অজন্তা৷’ ওর মাথায় একটা গভীর চুমু খেয়ে বলল লখা৷
—‘সত্যি বলছ? আমায় ভুলে আর অন্য কোনো মেয়ের দিকে তাকাবে না বল? আমায় কোনোদিন ভুলে যাবে না বল? আমি কিন্তু তাহলে খুব কাঁদব৷ আঁচরে কামড়ে একাকার করব তোমায়? প্লিজ আমার নিলয়ের থেকে বাঁচাও লখা৷’ লখার বুকে মাথা রেখে হাপুস নয়নে কাঁদছে অজন্তা৷
—‘নিলয় কিচ্ছু করতে পারবেন না৷ আমি বলছি শোন৷’ আশ্বাস ভরা স্বরে বলল লখা৷
—‘কিন্তু ও...’ আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল অজন্তা, কিন্তু বলতে পারল না৷ লখা তার আগেই ওর ঠোঁটে ডুবিয়ে দিল নিজের ঠোঁট৷
ঝন ঝন ঝন ঝন... মুহূর্তের মাঝে একটা তীব্র হাড় কাঁপান শব্দে কেঁপে উঠল ঘরের মেঝে৷ শব্দের অভিঘাতে ছিটকে গেল লখা আর অজন্তা৷
হঠাৎ কীভাবে যেন ভেঙে গেছে সাপের কাঁচের বাক্সটা৷
—‘লখা, লখা নিলয় জেগে উঠেছে৷’ ভয়ে কাঁপছে অজন্তার স্বর৷
বাকরুদ্ধ হয়ে গেছে লখাও৷ কাঁচের বাক্স থেকে বেরিয়ে এসেছে সাপটা৷ আর নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না লখা৷ সাপটা এবার ফণা মেলে দাঁড়িয়ে আছে লম্বা সোজা সরলরেখার মতো, ঠিক যেন দু-পায়ে ভর দিয়ে আছে ও৷
—‘তুমি পালাও লখা৷’ কোনোমতে বলল অজন্তা৷ কিন্তু লখা পালাতে পারছে না৷ কোন অদৃশ্য মায়াবলে যেন স্থবির হয়ে গেছে ওর পা দুটো৷
লখা দেখতে পাচ্ছে৷ ওর চোখের সামনে আস্তে আস্তে সাপটা পরিণত হচ্ছে মানুষে, এমন মানুষ যার সারা শরীরটা ঠিক সাপের খোলসের মতো৷
সর্পিল ভঙ্গিতে এগিয়ে আসছে লখার দিকে এগিয়ে আসছে ওই সর্প মানব লখাকে শেষ করতে৷ লখার মনে পড়ল সবে দু-মাস আগে একুশ পুরে বাইশে পড়েছে ও৷ আর ঠাকুমা বলেন সর্বদা, বাইশ বছরে ওর মস্ত ফাঁড়া আছে৷ এই কি তবে সেই ফাঁড়া?
হঠাৎ তড়িৎ গতিতে লাফ মেরে দৌড়ল লখা দরজার দিকে৷ এক হ্যাঁচকায় দরজা খুলে কোনোমতে বেরিয়ে রাস্তায়৷ আর ঠিক সেই মুহূর্তে শুনতে পেল ও একটা কান ফাটান আর্তনাদ অজন্তার গলায়৷
—‘না না নিলয় না৷ প্লিজ ক্ষমা করে দাও আমায়৷ না আ আ৷’
না লখার আর কিচ্ছু শোনার বা বোঝার অবকাশ নেই৷ ও এখন ছুটছে পাগলের মতো৷ ওকে পালাতে হবে যে৷ পালাতেই হবে যেভাবেই হোক৷
না আর ছুটতে পারছে না লখা৷ পা দুটো অবশ হয়ে আসছে, বুকটা মুচড়ে উঠছে৷
আঁক করে একটা মুখ দিয়ে শব্দ বের হল লখার৷ জ্ঞান হারিয়ে রাস্তায় লুটিয়ে পড়ল ও৷
বিকালের পড়ন্ত আলো ছুঁয়ে যাচ্ছিল প্রখ্যাত ভৌতিক সাহিত্যিক অভিযান গুহকে৷ অনেকদিন পর গ্রামের বাড়িতে ফিরেছেন৷ আনমনা হয়েই বসেছিলেন বাড়ির দাওয়ায়৷ এরকম কত বিকাল আগে কেটেছে এমনই বাড়ির দাওয়ায় বসে৷ তখন তো আর অস্তিত্ব ছিল না এই বিখ্যাত সাহিত্যিকের, তখন ছিল নেহাতই এক গ্রাম্য যুবক লখা৷
মা বারবার বলছেন বিয়ের জন্য৷ জোর করে হাতে গুঁজে দিয়ে গেছেন একটা ছবি৷ কিন্তু না৷ অভিযান ওরফে লখা তো আজও কেমন যেন কেঁপে উঠে কোনো নারী সঙ্গের কথা ভাবলেই৷ ঝপ করে মনে পড়ে যায় পাঁচ বছর আগের সেই বীভৎস রাতটা৷ মনে পড়ে যায় লখার সেই সময়ে জীবনে আছড়ে পড়া একটা মোহ৷ হ্যাঁ মোহই৷ যদি ভালোবাসা হত তাহলে কি আর লখা পারত সেদিন নিজের প্রাণ বাঁচাতে অমন ভাবে ওকে ফেলে পালাতে?
সেদিন রাতে প্রাণ নিয়ে কোনোমতে পালিয়ে, রাস্তায় অজ্ঞান হয়ে পড়েছিল লখা৷ হ্যাঁ সেরকমই তো মনে পড়ে ওর৷ কিন্তু জ্ঞান হবার পর ও নিজেকে খুঁজে পেয়েছিল নিজেরই মেস ঘরের বিছানায়৷ গায়ে ধুম জ্বর৷ রুমমেটদের মুখে ও শুনেছিল লখা নাকি মেস বাড়ি থেকে অল্প দূরে পড়ে ছিল সেদিন৷ ওদের মেসের রান্নার দিদি ভোর বেলা কাজে আসার সময় ওকে দেখতে পেয়ে তুলে আনে ওকে৷
না, লখা সেদিন বুঝতে পারেনি কীভাবে মেস অবধি এসেছিল ও৷ কিছুতেই মনে পড়েনি ওর৷ তবে মনে করার চেষ্টাও করেনি আর৷ সেই বীভৎস স্মৃতি ওর বুদ্ধি, যুক্তি, মানবিকতা সব স্থবির করে দিয়েছিল সেদিন৷ কোনো দিকে না তাকিয়ে, কোনো কথা না ভেবে চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে সোজা ফিরে এসেছিল গ্রামের বাড়ি৷
অনেকদিন কেমন যেন আতঙ্কের ঘোরে ছিল৷ তারপর হাতে তুলে নিয়েছিল পেন৷ কিন্তু আর কবিতা নয়, হাত থেকে বের হতে শুরু করেছিল ভূতের গল্প৷ আস্তে আস্তে দু-একটা পত্রিকায় জায়গা পেল লেখা৷ তারপর বই৷ আর সেই বইয়ের চরম সাফল্য এক ধাক্কায় অনেকটা এগিয়ে দিয়েছিল ওকে৷ আর আজ তো ও নামজাদা সাহিত্যিক৷
আজ এত গুলো বছর পার হয়ে যাবার পর মাঝে মাঝে মনে হয় লখার সত্যি কি ওই বীভৎস রাতটা এসেছিল লখার জীবনে? নাকি সবটাই ছিল জ্বরের ঘোরের দুঃস্বপ্ন? আচ্ছা এমনও তো হতে পারে অসুস্থ অবস্থায় ও রাস্তায় জ্ঞান হারিয়ে পড়েছিল আর তখনই চোখে নেমে এসেছিল সেই ভয়ানক স্বপ্ন?
না মনে যেমন খেয়ালই আসুক না কেন, লখা পারেনি একবারও আর অজন্তার খোঁজ নিতে৷ কলকাতা শহরে ফেরার পরেও পারেনি৷ যখনই ভেবেছে অজন্তার কথা, তখনই ভয়ে অসাড় হয়ে এসেছে ওর শরীর৷
কিন্তু বয়সও বাড়ছে৷ সবাই বিয়ের জন্য চাপ দিচ্ছে৷ কী একটা ভেবে যেন হাতের ছবিটা দেখল এবার লখা৷ মেয়েটার সম্বন্ধ এনেছে ঘটক৷ হ্যাঁ সবাই বলছে ঠিকই৷ মেয়েটার রূপ সত্যি মন ভোলান৷ ছবিটার দিকে দেখতে দেখতে মনটা কেমন দুলে উঠল যেন বিখ্যাত সাহিত্যিকেরও৷ না এই মেয়েকে নিয়ে ঘর বাঁধলে বেশ হবে৷
মা-কে গিয়ে এবার বলবে বিয়েতে মত আছে৷ উঠতে গেল ও৷ কিন্তু একী? পা সরছে না কেন লখার? মনে হচ্ছে পা দুটো যেন কেউ গেঁথে দিয়েছে মাটির সাথে৷ আর হাতটা কেন এমন ভারী ঠেকছে? বুকের ভেতর কেন এমন আতঙ্ক ঢেউ খেলে যাচ্ছে?
একী? একী? কী হচ্ছে এটা? শিরদাঁড়া দিয়ে হিমেল স্রোত বইছে লখার৷ একী! ছবির মেয়ের মুখটা এমন বদলে যাচ্ছে কী করে? একী? ছবির মেয়েটা একটু একটু করে যে পরিণত হচ্ছে লখার সেই পুরোনো প্রেমের মানবীতে... অজন্তা! সাপের মতো সুড়ুত করে জিভ বের করল অজন্তা৷ হিসহিস করে বলল—
‘—বলেছিলাম না, আমায় ভুলে অন্য কাউকে মনে জায়গা দিলেই আঁচড়ে কামড়ে শেষ করে দেব৷ তোমার মিথ্যা ভালোবাসায় ভুলে সেদিন শেষ হয়ে গেছিলাম আমি৷ তবুও এতদিন ক্ষমা করে দিয়েছি তোমায়৷ কিন্তু তুমি এবার সুখে সংসার করব ভেবেছ!’
—‘না না না আ আ! প্লিজ মেরো না আমায়...’ একটা গোঙানি মেশান চিৎকার বেরিয়ে এলো লখার গলা থেকে৷
* * *
সাহিত্য জগতে আজ শোকের ছায়া৷ মারা গেছেন বিখ্যাত সাহিত্যিক অভিযান গুহ, সর্প দংশনে৷ গ্রামের বাড়িতে গিয়েছিলেন লেখক৷ একলা বলেছিলেন খোলা দাওয়ায়৷ আর তখনই ঘটে ঘটনাটা৷ আসলে বর্ষাকাল, ঝোপ ঝাড় ভরা এলাকা৷ হয়তো লেখক খেয়ালই করেন নি কখন সে এসে ফণা তুলেছে ওনার দিকে৷
_______
বি. দ্র: লেখকের মৃতদেহের পাশে পড়েছিল একটা মেয়ের ফোটোগ্রাফ৷ পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে ওই মেয়েটির সাথেই বিয়ের কথাবার্তা চলছিল অভিযান গুহ’র৷
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন