বন্ধ দরজার ওপারে

পল্লবী সেনগুপ্ত

অনেকদিনের আগে

বৃষ্টি ঝরানো একটা রাত৷ চারদিকে ব্যাঙ-এর ডাকে কান পাতাই দায়৷ আর তার মধ্যে গোটা গ্রাম জুড়ে চলছে লোডশেডিং৷ সময়টা প্রায় চল্লিশ বছর আগে৷ তাই সে সময়কার শহরতলি আজকের মতো এত উন্নতও ছিল না৷ সব মিলিয়ে একটা মারাত্মক দুর্যোগের রাত৷ এরকমই এক শহরতলির মেয়ে মৌ৷ সেই দুর্যোগের রাতে কেমন জ্বলন্ত চোখে সে বসে রয়েছে নিজের ঘরে৷ একটা মোমবাতির শিখার ক্ষীণ আলো সারা ঘরময় দোল খেয়ে বেড়াচ্ছে৷ মৌ একমনে নিবিড় ভাবে কী যেন ভেবেই চলেছে৷ আর আগুন ঠিকরে বেড়াচ্ছে তার দু-চোখের তারা থেকে৷ হঠাৎ কী যেন একটা হল৷ মেয়েটার দু-চোখের সেই আগুন নিভে একরাশ মেঘ এসে ভিড় করল সেখানে৷ আর শুরু হল দু-চোখের বৃষ্টি৷ ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে একলা শূন্য ঘরে কাঁদছে মৌ৷ ঢং ঢং করে বারোটা বাজল বড়োলোক বাড়ির গ্র্যান্ড ফাদার ক্লকটায়৷

হঠাৎ ঘরের দরজা খুলে ঢুকে এল ভিতরে আর একজন৷ একটু সংকুচিত তার ভাব৷ পরনের কাপড়ও তুলনামূলক মলিন৷ তবে বেশ সুন্দরী সে৷

—‘আমায় এভাবে হঠাৎ কেন ডাকলি? আমি জানি আমি তোর অপরাধী৷ কিন্তু বিশ্বাস কর আমি কিছু জেনে বুঝে করিনি৷ যা হয়েছে তার সবটাই...’

—‘চুপ কর রে মিনু৷ আর আমায় দোষী করিস না৷’ এবার ওই মেয়েটাকে থামিয়ে কেঁদে ফেলল মৌ৷

—‘যা যা অন্যায় আমি করে গেছি এতদিন ধরে তোর ওপর তা মহাপাপ আমি বুঝে গেছি৷ আমি আমার সবটুকু ভুল বুঝতে পেরেছি৷ আমায় তুই ক্ষমা কর৷ তুই ভাগ্যবতী তাই তুই...৷ আমি কে বলতো এসবের মাঝে আসার! কাল তুই কোথাও যাবি না এ বাড়ি ছেড়ে৷ কথা দে আমায়৷’ মলিন বসনা মেয়েটার হাত ধরে শিশুর মতো কাঁদছে এবার মৌ৷

একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেছে মেয়েটা৷ নিজেকে অল্প সামলে নিয়ে বলল— ‘না রে আর আমায় আটকাস না৷ যেতে দে রে আমায়৷’

—‘না না না৷ তুই যেতে পারবি না মিনু৷ যেতে দেবো না৷ আর যদি তুই সত্যি আমায় ক্ষমা না করে চলে যাস তাহলে আত্মহত্যা করব আমি৷ শেষ করে দেব নিজেকে৷’

—‘মৌ! এসব কি বলছিস তুই! ঠিক আছে৷ ঠিক আছে৷ তুই শান্ত হ৷ আমি যাব না৷ কোথাও যাব না৷’

—‘তুই বল তবে আমায় ক্ষমা করেছিস!’ ভাঙা গলায় বলল মৌ৷

—‘হ্যাঁরে করেছি৷ অনেক আগেই করেছি৷’

—‘তাহলে আমার হাতে বানানো এই পায়েস খা৷ কালই তো তোর জন্মদিন৷ নিজে হাতে বানিয়েছি আমি৷ তুই যদি মন থেকে আমায় ক্ষমা করে থাকিস তবেই খাবি৷ নইলে নয়৷’ কান্নাভেজা গলা তখনও মৌয়ের৷

পায়েসের বাটিতে চুমুক দিল মেয়েটা৷ মৌয়ের মুখে ফুটে উঠল একটা তৃপ্তির হাসি৷ ও জড়িয়ে ধরল মেয়েটাকে৷

—‘তোকে আমি খুব ভালোবাসি রে৷ সবার থেকে বেশি৷ তুই ছাড়া কে আর আমায় আপন করেছে বল তো! তোর সব ভালোবাসার প্রতিদান আমি দিতে পারব কিনা জানি না, কিন্তু তোকে কোনোদিন ছেড়ে যাব না৷ বারবার তোর কাছেই ফিরে ফিরে আসব রে৷’ মেয়েটা মৌয়ের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলল৷

পরম শান্তিতে মৌ দু-চোখ বন্ধ করল এবার৷

ইদানীং শরীরটা একদম ভালো যাচ্ছে না মৃত্তিকা চৌধুরীর৷ তবুও আসব না আসব না করে শেষ পর্যন্ত চলেই এলেন এখানে৷ না সাধু সন্ন্যাসী বা এই সব ‘বাবা’দের প্রতি কোনোদিনই তেমন আস্থা নেই মৃত্তিকার৷ সারাজীবন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞানের অধ্যাপনা করার পর এসব তো নিশ্চয় উনি মানতে পারেন না, কিন্তু আজ কতকটা শিখা মানে নিজের ছোটো ননদের মন রাখতেই এখানে এসেছেন৷ শিখার গুরুদেব এসেছেন৷ উনি এবার শিখার বাড়িতেই উঠছেন৷ তার নাকি অসীম ক্ষমতা৷ মানুষের চোখ আর হাতের রেখা দেখেই বলে দিতে পারেন সব অতীত আর ভবিষ্যৎ৷ না সেই ক্ষমতাবান পুরুষের দর্শন পাবার ইচ্ছা ছিল না মৃত্তিকার৷ কিন্তু শিখা যখন ফোন করে বারবার জোর করতে লাগল এখানে আসার জন্য গুরুদেবের সাথে দেখা করতে, তখন আর না টা বেশিক্ষণ ধরে রাখতে পারলেন না মৃত্তিকা৷ আসলে সেই বহুদিন আগেই যখন বিয়ে হয়ে প্রথম নতুন পরিবারে এসেছিলেন মৃত্তিকা, তখন থেকেই শিখা কখন যেন বড্ড নিজের হয়ে গেছিল৷ তা ছাড়া এই বছর দুয়েক আগে যখন মারা গেলেন মিস্টার চৌধুরী তবে থেকে যেন একটু একটু করে মানসিক ভাবেও দুর্বল হয়ে পড়ছেন মৃত্তিকা চৌধুরী৷ আর গত দু-মাস ধরে যেটা তার সাথে হচ্ছে সেটা কাকেই বা বোঝাবেন তিনি! দিন নেই, রাত নেই যখনি দু-চোখের পাতা এক হচ্ছে, ব্যস সেই একই স্বপ্ন৷ গলা কেটে কে যেন খুন করছে দুঁদে অধ্যাপিকা মৃত্তিকা চৌধুরীকে৷ না মুখ দেখা যাচ্ছে না তার, শুধু দেখা যাচ্ছে পরনে তার ফুল ছাপা ফ্রক৷ এই স্বপ্নটা যখন আসে তখন দমটা কেমন যেন বন্ধ হয়ে আসে মৃত্তিকার, স্বপ্নের মধ্যেই যখন অজ্ঞাত পরিচয় আততায়ী গলায় ছুরি বসায় তার, কেমন ধারালো যন্ত্রণায় যেন বিদ্ধ হয়ে ওঠে ওর শরীর৷ ফাঁকা বাড়িটায় সারাক্ষণ কে যেন একটা অদৃশ্য চোখ দিয়ে জরিপ করে মৃত্তিকাকে৷ হাওয়া যেন ফিসফিসিয়ে বলে কানে কানে— ‘মৃত্তিকা এবার যে সময় হয়ে এল রে তোর৷ এবার যে দরজাটা খুলে যাবে৷’

—‘বউদি চল একবার গুরুদেবকে প্রণাম করে আসবে৷’ শিখার ডাকে বিছানা ছেড়ে উঠে গেলে ওর গুরুদেবের ঘরে৷ খুব সাধারণ চেহারার একজন ভদ্রলোক৷ সাদা পোশাক পরা৷ বেশ শান্ত আর সৌম্য চেহারা৷ তবে মৃত্তিকার দিকে চোখ পড়তেই কেমন যেন হঠাৎ চঞ্চল হয়ে গেল ওনার দৃষ্টি৷

—‘শিখা বেটি... ইনকো কউন লায়া রে?’ বজ্র কঠিন স্বরে এবার প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন ভদ্রলোক৷

—‘বাবা, ইনি আমার বউদি৷ খুব ভালো মানুষ৷ আপনাকে প্রনাম করতে...’

—‘কউন ভালা হ্যায়, কউন বুরা হ্যায় ইসকা বিচার ভগওয়ান করতে হ্যায়৷ ইনসান নেহি৷ তু ইনকো ইসহি ওয়াক্ত লে যা মেরা সামনে সে৷’

—‘কিন্তু বাবা...’

‘বোল দিয়া না ম্যায়নে’... শিখাকে থামিয়ে এবার হুংকার করে উঠলেন ওর গুরুদেব৷ আর সাথে মৃত্তিকার দিকে ছুঁড়ে দিলেন একদলা ঘৃণাভরা দৃষ্টি৷

এবার নিদারুন অপমান লাগল মৃত্তিকার৷ দীর্ঘদিন সম্মানের সাথে অধ্যাপনা করে এসেছেন উনি৷ কেউ কোনোদিন সামনে অসম্মান করতে সাহস পায়নি৷ আর সেখানে কিনা কোথাকার একটা বুড়ো...

—‘আপনি আমার সম্বন্ধে এভাবে কথা বলছেন কেন? আমাকে আপনার অপছন্দ হতেই পারে, তার মানে এই নয় যে আপনি আমায় অসম্মান করবেন৷ শুনুন, আপনাদের মতো লোকদের প্রতি আমারও কোনো ভরসা নেই৷ নেহাতই শিখার কথায়... শুনুন আমি কে, আর কি আমার সামাজিক পরিচয় সেটা সম্বন্ধে কি আদৌ কোনো ধারণা করার ক্ষমতা আছে আপনার? না নেই৷ আর সেই জন্যই এভাবে আমার সম্বন্ধে কথা বলার সাহস পাচ্ছেন আপনি৷’ এক নিঃশ্বাসে ইস্পাতের মতো দৃঢ় স্বরে কথাগুলো বলে গেলেন মৃত্তিকা৷ এদিকে শিখার মুখে ততক্ষণে ফুটে উঠেছে তীব্র কাঁচু মাচু ভাব৷ মৃত্তিকার ধারালো কথাগুলোর তক্ষুনি কোনো উত্তর দিলেন না গুরুদেব৷ কয়েক মুহূর্ত ঠান্ডা দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন মৃত্তিকার দিকে৷ তারপর খুব আস্তে আস্তে কেটে কেটে বললেন— ‘বহত গুরুর হ্যায় না তুঝে আপনে আপ পে...৷ করলে... থোরি দিন আউর করলে তেরা ইয়ে ঝুটা ঘমন্ড...৷ লেকিন আউর জাদা দিন নেহি চলেগা ইয়ে... কিউকি উয়ও আ গেয়ি৷ আ গেয়ি উয়ও৷ আব সারি বন্ধ দরওয়াজা খুল জায়েগা, খুল জায়েগা...৷

পলকে মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে গেল মৃত্তিকা চৌধুরীর৷ কে এই গুরুদেব? কি বলছেন উনি এসব? ঠিক সেই মুহূর্তেই ঝপ করে নিভে গেল ঘরের আলোটা৷

—‘এই রে! আবার লোডশেডিং৷ আমি এখুনি নিয়ে আসছি একটা বাতি৷’ শিখার গলা শুনতে পেলেন মৃত্তিকা৷ শিখা বেরিয়ে যেতেই উনি নিজেও ওই ঘরটা ছেড়ে বেরোবার জন্য পা বাড়ালেন৷ কিন্তু ঠিক তখনি অন্ধকার জমাট বাঁধা সন্ধ্যাটা কাঁপিয়ে কর্কশ স্বরে বাজ পড়ল কোথাও আর হুড়মুড় করে খোলা জানালার কপাট দিয়ে ঢুকে এল একটা পাগলাটে ক্ষ্যাপা বাতাস৷ সেই বাতাসটাই যেন কানে কানে বলল মৃত্তিকাকে৷

—‘আমি এসে গেছি রে৷ ফিরে এসেছি আমি আবার তোর কাছে৷ বন্ধ দরজার ওপারে থাকা সব অন্ধকার যে এবার আমার মতো তোরও হবে৷’

‘না না না’... চিৎকার করতে চাইলেন মৃত্তিকা৷ কিন্তু গলাটা আটকে এল তার৷ বুঝতে পারলেন তিনি যে অন্ধকারটা আরও গাঢ় হচ্ছে৷ ক্রমশ আরও গাঢ় হচ্ছে৷

না, অন্ধকারটা সত্যি আরও যেন বড়ো বেশি নিকষ কালো লাগছে৷ এত বেশি গাঢ় লাগছে যে মনে হচ্ছে যেন হিংস্র নখ বের করে আঁচড়ে দেবে এক্ষনি এই অন্ধকারটা৷ উফফ! আবার আজও লোডশেডিং৷ না, মৃত্তিকার আজ রাতেও ঘুম আসছে না৷ এই নিয়ে দিন সাতেক হল মেয়ের বাড়িতে এসে রয়েছেন উনি, কিন্তু না৷ নিজের মানসিক অস্থিরতা কমার বদলে দিনে দিনে শুধু বেড়েই চলেছে৷ মাঝে মাঝে মনে হচ্ছে এখানে থাকতে এসে কি তাহলে মস্ত বড়ো ভুল হয়ে গেল! কিন্তু না৷ তাই বা বলা চলে কি করে৷ মা হিসাবেও তো মৃত্তিকার একটা দায়িত্ব আছে৷ আজ প্রায় সাত বছর পর বিদেশ থেকে দেশে ফিরেছে রত্না আর জামাই৷ আর তারা যখন বারবার করে এত অনুরোধ উপরোধ করছে এখানে এসে কটা দিন থেকে যাবার জন্য তখন মৃত্তিকার পক্ষে কি আর বারবার না বলা সম্ভব৷ তা ছাড়া মৃত্তিকার একা একা ও বাড়িতে থাকতে বেশ কিছুদিন যাবত কি ভীষণ অসুবিধা যে হচ্ছিল সেটা তো আর ভোলার নয়৷ সবচেয়ে বড়ো কথা হল জেরি মানে রত্নার মেয়ের শরীর এখনও একদম ঠিক নেই৷ তাই এ অবস্থায় কীভাবেই বা মৃত্তিকা ওদের এড়িয়ে যেতে পারতেন! ওদের আর কেই বা আছে এই দুনিয়ায়৷ জামাইয়ের তো আর বাবা মা নেই৷ তাই এখন মৃত্তিকার দায়িত্ব তো অনেকটাই বেশি৷ কিন্তু সমস্যাটা তো অন্য জায়গায়৷ প্রথম যখন রত্না জানাল যে ওরা যে নতুন ফ্ল্যাটটা কিনে আসছে সেটা বারাসাতের দিকে তখনই বুকের ভিতরটা অল্প কেঁপে উঠেছিল মৃত্তিকার৷ সেই এলাকা! আর কেন যেন মনে পড়ে গেছিল প্রায় সাত বছর আগে লাস্ট এয়ারপোর্টে দেখা জেরির মুখটা৷ ওর সেই জ্বলন্ত দৃষ্টিটা৷ জেরি জন্মেছিল ১০ আগস্ট৷ ঠিক সেই তারিখ৷ অথচ রত্নার ডেলিভারি ডেট কিন্তু ছিল সেপ্টেম্বরে৷ তবুও যখন জেরি বেছে বেছে ১০ আগস্টই জন্ম নিল তখন বিজ্ঞানের অধ্যাপিকা হওয়ার পরেও কি সব আজগুবি ভাবনা যেন সেদিন ভর করেছিল মৃত্তিকাকে৷ কড়া শাসনে তাদের দমন করেছিলেন সেদিন৷ কিন্তু কিছু ঘটনা তার শাসনের শৃঙ্খলকে দুর্বল করে দিত বারবার৷ জেরি অন্য বাচচাদের মতো নয়৷ সে বেশি কাঁদে না৷ বেশি খায়ও না৷ আর সবচেয়ে বড়ো কথা হল মৃত্তিকা যখনই কোলে নিতেন নিজের একমাত্র নাতনিকে তখনই কি সাংঘাতিক চিৎকার করে কাঁদত জেরি৷ যেন কি এক অজানা আতঙ্ক গ্রাস করছে ওকে৷ জেরি যত বড়ো হতে থাকল তত নিজের দিদিমার প্রতি তার বিরাগ প্রদর্শন যেন বাড়তে লাগল৷ আর যখন ঘরে কেউ থাকত না, যখন মৃত্তিকা একলা কোনো সময়ে আদর করতে যেতেন জেরিকে ও যেন কি ভীষণ জ্বলন্ত চোখে দেখত মৃত্তিকার দিকে৷ অত ছোটো শিশুর পক্ষে ওভাবে তাকানো যে অসম্ভব তা তো জানাই মৃত্তিকার৷ তবে ও কি চোখের ভুল? তাই হবে নিশ্চয় এই বলেই নিজের মনকে বোঝাতেন উনি৷ কারণ জেরির ওই খর দৃষ্টি ঘরে অন্য কেউ ঢুকলেই তো গায়েব হয়ে যেত৷ তবে দিন যাবার সাথে সাথে রত্নারাও বুঝতে পারছিল যে জেরি ঠিক স্বাভাবিক নয়৷ ও অসংলগ্ন কথা বলে, ব্যবহার করে৷ তবে ওর এক অদ্ভুত প্রতিভা ছিল৷ ওই বয়সেই নিদারুণ ছবি আঁকত মেয়েটা৷ রত্নারা বলত এটাও অস্বাভাবিক৷ কী সব মাথা মুণ্ডুহীন ঘর বাড়ি আর মানুষ আঁকে জেরি৷ কিন্তু মৃত্তিকার কেন যেন খুব চেনা চেনা লাগত জেরির সব ছবিগুলোকে৷ খুব চেনা চেনা৷ জেরির স্বাভাবিক হবার লক্ষণ খুব একটা দেখা যাচ্ছিল না৷ সেই সময়েই রত্না আর মানস বিদেশ পাড়ি দেয় ওকে নিয়ে৷ মাঝে আর বিশেষ আসেওনি ওরা৷ কিন্তু আজ যখন সাত বছর পর ফিরল ওরা জেরি তো কিচ্ছু বদলায়নি৷ উল্টে মৃত্তিকার প্রতি ওর সেই জ্বলন্ত দৃষ্টির ধার যেন আরও বেড়েছে৷

বিছানায় শুয়ে শুয়ে এসব ভাবতে ভাবতে চোখটা অল্প ঘুমে জড়িয়ে এসেছিল মৃত্তিকার৷ ঠিক তখনই খুট করে একটা শব্দ হল৷ খুব কাছেই যেন৷ চোখ মেললেন মৃত্তিকা৷ ওর ঘরে কেউ ঢুকেছে৷ কিন্তু সেটা কী করেই বা সম্ভব৷ দরজা তো নিজের হাতে বন্ধ করে শুয়েছেন মৃত্তিকা৷ ঘরে ঢোকা ব্যক্তি এবার আস্তে আস্তে এগিয়ে আসছে মৃত্তিকার দিকে৷ ঘরের ঘোলাটে অন্ধকারে তার মুখ দেখতে পাচ্ছেন না মৃত্তিকা৷ সে চকিতে এগিয়ে এল মৃত্তিকার খাটের কাছে আর মুহূর্তের মাঝে তার দুই হাতে সাঁড়াশির মতো চেপে ধরল মৃত্তিকার গলা৷ আর ঠিক সেই মুহূর্তেই জ্বলে উঠল ঘরের আবছা রাত বাতি৷ আততায়ির মুখ ঝলসে উঠল তাতে৷ উফফ! এ কি করে সম্ভব! —‘না, মিনু না...’ কীভাবে যেন মৃত্তিকার গলা ঠিকরে বেরিয়ে এল চিৎকারটা৷

—‘কী হয়েছে মা?’ এটা রত্নার গলা৷ মায়ের চিৎকার শুনে এ ঘরে এসেছে ও৷

—‘একী জেরি? এ ঘরে কি করছ তুমি এত রাতে? আর মা তুমি দরজা লাগিয়ে কেন শুতে যাওনি?’ নিজেকে একটু সামলে কোনো মতে এবার তাকালেন মৃত্তিকা৷ না, মিনু নেই ঘরে দাঁড়িয়ে আছে মানস আর রত্না৷ আর রত্নার ঠিক পাশেই জেরি৷ তবে জেরির চোখে সেই ভয়ানক দৃষ্টি আর নেই এবার৷ বদলে ঠোঁটের কোণায় অদ্ভুত একটা হাসি৷ এই হাসিটা খুব চেনা মৃত্তিকার৷ বহু বছর আগের একটা মুখ যেন ফুটে উঠেছে জেরির মুখে৷ না, আর পারলেন না মৃত্তিকা৷ বুজে নিলেন আবার নিজের দু-চোখ৷

বন্ধ দরজার ওপারে

কাল রাতে... কাল রাতে আমার সব প্রশ্ন আর সন্দেহ শেষ হয়ে গেছে৷ সব কিছু একদম স্পষ্ট হয়ে গেছে কাল রাতে৷ হ্যাঁ সে ফিরে এসেছে৷ সে তো বলেইছিল সে আসবে ফিরে বারবার আমার কাছে৷ তাই আবার ফিরে এসেছে সে৷ কাল রাতে আমি তাকে দেখেছি একদম আমার চোখের সামনে৷ না, জেরি নয় ও আসলে মিনু৷ কিংবা মিনুই হয়তো জন্ম নিয়েছে জেরি রূপে, কিংবা মিনুর অতৃপ্ত আত্মা হয়তো জন্মক্ষণ থেকেই ভর করেছে মিনুকে৷

জানি না সবটাই হয়তো আমার মনের ভুল এমন হতে পারে৷ কারণ এসব ঘটনার কোনো সঠিক ব্যাখ্যা তো সত্যি হয় না৷ আর আমার মতো একজন কট্টর যুক্তিবাদী আর বিজ্ঞানপন্থী মানুষ কি করেই বা বিশ্বাস করতে পারে এসব৷ কিন্তু এটাও তো ঠিক যে যা আমি দেখেছি, যা অনুভব করেছি সেটা মিথ্যা হতে পারে না৷ অনেক সময় যুক্তি আর বিজ্ঞানের বাইরেও তো কিছু কিছু থাকে৷ তাই না? আচ্ছা আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি না তো?

কী চায় সে? আমার মৃত্যু আর তার প্রতিশোধ নাকি আমার জীবনের মাঝে লুকিয়ে থাকা রহস্যটা ফাঁস করতে চায়? না আমি সেটা হতে দেব না৷ আমি অপরাধী হয়ে, সবার চেখে ছোটো হয়ে বাঁচতে পারব না৷ জানি না আমার সিদ্ধান্ত ঠিক কিনা৷ জানি না এতে সে শান্তি পাবে কি না৷ জানি না এতে জেরি সুস্থ হবে কিনা৷ তবে এটা ঠিক এই মানসিক যাতনা আর আতঙ্ক ঘেরা জীবনে হাঁপিয়ে উঠেছি আমি৷ তাই এবার মুক্তি দরকার৷

আমি আজ সব সত্যি লিখে রেখে যেতে চাই৷ কারণ হয়তো আমি আর বেশিদিন বাঁচতে পারব না৷ হয়তো আমি আত্মহত্যা করতে বাধ্য হব বা সেই হয়তো নিয়ে নেবে আমার জীবন৷ সে মানে মিনু৷ যে আজ থেকে বহু বছর আগে প্রথম থাকতে এসেছিল আমার বাবা মায়ের কাছে নিজের সব হারিয়ে৷ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ আর সেই রাজনৈতিক অশান্তির সময়ে নিজের ভিটে মাটি আর পরিজনদের হারিয়ে ওপার বাংলা থেকে সে এসেছিল এপার বাংলায় এক চিলতে আশ্রয়ের খোঁজে৷ সে ছিল আমাদের দুঃসম্পর্কের আত্মীয়৷ সে সময় এখানে আমাদের বেশ বর্ধিষ্ণু অবস্থা৷ বারাসাত সংলগ্ন অঞ্চলে আমাদের তখন বড়ো বাড়ি, জমিজমা, লোকজন সব মিলিয়ে বেশ বড়োলোকই ছিলাম আমরা৷ বাবার তখন ওই এলাকায় বেশ নামডাক, লোকজন মানে গোনে ভালোই৷ সেই সময় মিনুর ঠিকানা হল আমাদের বাড়ি৷ তার অবস্থানটা সেদিন আমাদের বাড়িতে আশ্রিতার হলেও আমি তাকে কোনোদিনই সে নজরে দেখতাম না৷ আমারই বয়সি একটা সর্বহারা মেয়ে৷ আমি তাকে বন্ধুর মতোই ভালোবাসতাম৷ সে বেশ আপনার হয়ে উঠেছিল আমার৷ আমার বাবা মাও তাকে স্নেহের চোখেই দেখতেন৷

একসাথেই দুজনে বড়ো হচ্ছিলাম আমরা৷ বড়ো হবার সাথে সাথে প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে ভালোলাগা আর ভালোবাসা সেদিন আছড়ে পড়েছিল আমার জীবনেও৷ হীরকদা৷ আমার ভালোলাগার সেই মানুষ ছিল হীরক চৌধুরী৷ আমার বাবার প্রিয় বন্ধুর বড়ো ছেলে৷ হীরকদা খাস কলকাতার ছেলে৷ যেমন স্মার্ট, তেমনই সুন্দর৷ ডাক্তারি পড়ছে৷ আমাদের বাড়িতে বেশ যাতায়াতও ছিল ওদের৷ কখন যে নিজের মন হারিয়ে ফেলেছিলাম নিজেও বোধ হয় বুঝতে পারিনি৷ তাই আর কাউকে বলাও হয়নি সে কথা৷

কিন্তু হঠাৎ একদিন পড়ল বিনা মেঘে বাজ৷ একদিন হঠাৎই আমি আবিষ্কার করলাম হীরকদা-কে আমাদেরই বাড়ি সংলগ্ন বাগানটায় খুব নিবিড় অবস্থায় মিনুর সাথে৷ আমার চোখের সামনে পুরো পৃথিবীটা দুলে উঠেছিল৷ দিগ্বিদিক জ্ঞান শূন্য হয়ে সেই মুহূর্তেই ওদের মাঝে ঢুকে ঠাস করে একটা চড় কসিয়ে দিয়েছিলাম মিনুর গালে৷

—‘আমাদের আশ্রিতা হয়ে আমার বাবার বন্ধুর ছেলের সাথে তুই... এত স্পর্ধা তোর? দেখ আমি বাবাকে বলে তোর কী হাল করি৷’

—‘মৌ বিশ্বাস কর...’ খুব ভয় পেয়ে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল মিনু, তার আগেই হীরকদা বলল—

‘তুমি কাউকে কিছু বলেই কিছু করতে পারবে না৷ আমি ওকে ভালোবাসি৷ আর তাই ওর কেউ কোনো ক্ষতি করতে পারবে না৷ আমি সব সময় ওকে আগলে রাখব৷’ বলেই হীরকদা চলে গেল, তারপর আবার ফিরে এসে মিনুকে বলল— ‘সামনের মাসে ডাক্তারি পাশ করে যাব আমি৷ আর তারপরই বিয়ে করব আমরা৷ সেই কটা দিন একটু কষ্ট কর তুমি মিনু৷’ আবার চলে গেল হীরকদা আর কান্নায় ভেঙে পড়লাম আমি৷ মিনু আস্তিনের সাপ হয়ে আমাকেই ছোবল মারল৷ কি আছে ওর৷ রূপ ছাড়া কিছুই নেই৷ তবুই হীরকদা ওকেই... না সহ্য করতে পারছিলাম না আমি৷ মিনুর প্রতি আক্রোশে আমি অন্ধ হয়ে গেছিলাম৷ আমার গয়না ওর ঘরে লুকিয়ে রেখে ওকে সবার সামনে চোর সাজালাম৷ তারপর বিধান এল যে মিনুকে ছেড়ে চলে যেতে হবে আমাদের বাড়ি৷ মিনু মেনেও নিল সেই বিধান৷ ও কলকাতায় চলে যাবে৷ অন্য এক আত্মীয়ের বাড়ি৷ তবুও শান্তি পাচ্ছিলাম না আমি৷ সামনের মাসে যদি সত্যি বিয়ে করে ওরা৷ তারপর আমি বানিয়ে ফেললাম সেই সর্বনাশা প্ল্যান৷ দিনটা ছিল ১০ আগস্ট৷ বাড়ির সকলে বেশ দূরে এক আত্মীয়ের বিয়েতে গেছিলেন৷ আমি গেলাম না৷ অজুহাতটা ছিল অসুস্থতার৷ এদিকে তার পরের দিনই মিনুর বাড়ি ছেড়ে চলে যাবার কথা৷ ১১ আগস্ট আবার মিনুর জন্মদিনও৷ সেই ১০ আগস্ট বাড়িতে আমি, মিনু আর কয়েকজন ঝি চাকর ছাড়া বাড়িতে কেউ ছিল না৷ ভয়ানক দুর্যোগের রাত ছিল সেটা৷ মিনুকে আমি ডেকে পাঠালাম নিজের ঘরে৷ ক্ষমা চাইলাম নিজের বিগত ক-দিনের কৃতকর্মের জন্য৷ খুব কাঁদলাম৷ তারপর নিজের হাতে বানান পায়েসের বাটি তুলে দিলাম ওর হাতে৷ না, মিনু বুঝতেও পারেনি ওই পায়েসে বিষ মিশিয়েছি আমি৷ পায়েস খাবার কিছুক্ষণের মধ্যেই আমারই চোখের সামনে মরণের কোলে ঢলে পড়ল ও৷ তবে বুঝতে পেরেছিল ও মড়ার ঠিক আগের মুহূর্তে নিজের মরণের কারণ৷ একটা জ্বলন্ত দৃষ্টি আর এক অদ্ভুত হাসি মেশানো সেই মুখ মিনুর আমি কোনোদিন ভুলিনি৷ সেই হাসি মুখ আমি যে আজও দেখি জেরির মধ্যে৷ মিনুর সেই হাসি যেন বলতে চেয়েছিল তুই জিততে পারবি না৷ আমি ফিরে আসবই৷ হ্যাঁ৷ ও ফিরে এসেছে৷ জেরি হয়ে ফিরে এসেছে মিনু৷ জানি না আমার কি কি ক্ষতি করে প্রতিশোধ নেবে ও৷ সেদিন আমি আইনের হাত থেকে রেহাই পেয়ে গেছিলাম৷ আমার বাবা অনেক ক্ষমতাশালী মানুষ ছিলেন৷ নিজের অর্থনৈতিক আর রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে পুরো ব্যাপারটা ধামা চাপা দিয়েছিলেন৷ মিনুর মৃত্যুর কোনো সুবিচার সেদিন তাই আর হয়নি৷ আমরা ওই ঘটনার পর ছেড়ে দিই ওই এলাকা৷ চলে আসি কলকাতায়৷ আমিও পড়াশুনায় মন দি৷ তারও বেশ কিছু বছর পর পাকে চক্রে আমি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হই সেই হীরক চৌধুরীর সাথেই৷

আমার জেতার কথা ছিল না৷ তবুও জিতেছি আমি, মিনুকে রাস্তা থেকে সরিয়ে দিয়ে৷ তাই হয়তো ও আজ জেরি হয়ে ফিরে এসেছে৷ হীরকের মৃত্যুর পর থেকে প্রতিদিন, প্রতি ক্ষণে আমার মনে হয়েছে মিনু যেন আমার পাশে পাশেই রয়েছে, শুধু ঠিক মুহূর্তের অপেক্ষা করছে প্রতিশোধের জন্য৷ কিন্তু জেরিই মিনু... সেটা আমি জানতাম না৷ দু একটা খটকা থাকলেও আমি সেগুলো কোনোদিন আমল দিইনি৷ কিন্তু জানি না আর কেন উড়িয়ে দিতে পারছি না সেদিন রাতের নিজের দেখা আর বোঝা টুকু৷ না আমি চলে যাব৷ তবেই হয়তো বাঁচবে আমার মেয়ের জীবন, সুস্থ হবে আমার একমাত্র নাতনিটা৷

নাঃ, এর পর আর কিছু লেখা নেই৷ এর পর থেকে শুধুই সাদা পাতা৷ সেই সাদা পাতা গুলোর দিকেই বেবাক ফাঁকা দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল রত্না৷ আজ জেরির জন্মদিন, মায়ের মৃত্যুদিন, আরও অনেক কিছুর দিন৷ আজ ১০ আগস্ট৷ দু-বছর আগে ঠিক এই দিনে আত্মহত্যা করেছিলেন মৃত্তিকা চৌধুরী আর ঠিক দু-বছর আগেই এই দিন হারিয়ে গেছিল জেরি৷ নিজের দশ বছরের জন্মদিনের দিনই৷ একই সাথে এত বড়ো দুটো বিপর্যয়ের অভিঘাত সহ্য করতে পারেনি রত্না৷ অনেকটাই মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছিল ও৷ তবে আজ ও কিছুটা সুস্থ৷ মানসের ভালোবাসা আর চিকিৎসায়৷ কিন্তু এক মুহূর্ত ও শান্তি পায় না৷ কোথায় হারিয়ে গেল ওর জেরি? কেন আর ও ফিরে এল না? কীভাবে হারিয়ে গেল ও? কেনই বা ও বলত ওসব অদ্ভুত কথা? জন্মের পর থেকেই খুব অন্যরকম ছিল মেয়েটা৷ বেশি খেত না, ঘুমাত না এমনকী কাঁদতও না৷ শুধু স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকত৷ সবাই বলত— ‘রত্না, তুই কি লাকি রে! কি শান্ত বেবি তোর৷’ কিন্তু রত্না খুশি হত না৷ জেরির দিকে তাকালেই কেমন যেন গা ছমছম করত ওর৷ না ও কাউকে বলেনি সে কথা৷ কিন্তু সেই জেরি রত্নার মায়ের কোলে গেলে পরিত্রাহি কাঁদত৷ বুঝত না রত্না৷ কেন হচ্ছে এমন৷ একটু বড়ো হবার সাথে সাথেই জেরি ছবি আঁকতে শুরু করল৷ একটা ১৭/ ১৮ বছরের মেয়ের ছবি আঁকত বারবার, যাকে কোনোদিনই কেউ দেখেনি ওরা৷ আর আঁকত একটা বড়ো বাড়ির ছবি৷ বারবার বলত— ‘বন্ধ দরজাটা খুলতে হবে৷ ওখানে যে একটু একটু করে জমা হয়েছে অনেক অন্ধকার৷’ জেরির আধো আধো বুলিতে এসব আবোল তাবোল কথা শুনে প্রথমে মজা পেলেও পরে ভয় করত রত্নার৷ কেন বারবার একই প্রলাপ বকে ও৷ জেরির অবস্থার উন্নতি হচ্ছিল না দেখে ওকে নিয়ে তো বিদেশই চলে গেছিল ওরা৷ কিন্তু তবুও খুব একটা বদলায়নি পরিস্থিতি৷ উল্টে এখানে আসার আগের বছর থেকে তো জেরি পাগলের মতো জেদ ধরেছিল দেশে ফেরার৷ কিছুটা জেরির জেদের জন্যই তো ওরা... কেন এমন ছিল ওর একমাত্র সন্তান? কেন কোনো সায়াকায়াট্রিক ভালো করতে পারেনি জেরিকে? এই সব রহস্যই কি আজ খুঁজে পেল রত্না মা এর লেখায়? সত্যি জেরিই কি সেই মিনু যাকে কিনা দুঁদে অধ্যাপিকা মৃত্তিকা চৌধুরী নিজের হাতে খুন করেছিলেন? চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়ছে রত্নার৷ জেরি কি তবে আর ফিরে আসবে না? মৃত্তিকা চৌধুরী আত্মহত্যা করলেও তার মৃতদেহ দেখে মনে হয়েছিল শেষ সময়ে নিদারুন ভয় পেয়েছিলেন তিনি কিছু দেখে৷ কিন্তু কী দেখে? জেরি বরাবরই আলাদা ঘরে শুত৷ সেদিনও তাই শুয়েছিল৷ সেই রাত ভোর হতেই যেমন পাওয়া গেছিল মৃত্তিকা চৌধুরীকে মৃত অবস্থায়, তেমনি আর পাওয়া যায়নি জেরিকেও৷ কোথায় যেন মিলিয়ে গেল মেয়েটা৷ মাঝ রাতে কোথায় উবে গেল ও? অনেক তদন্ত হয়েছে, অনেক খোঁজাখুঁজি হয়েছে৷ কিন্তু না৷ জেরি ফিরে আসেনি৷ এই দু-বছরে হাহাকার আর একরাশ প্রশ্ন নিয়ে উন্মাদিনির মতো প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্ত কাটিয়ে গেছে রত্না৷ বারবার চোখে ওর নেমে এসেছে অদ্ভুত সব স্বপ্ন৷ কিন্তু গতরাতের স্বপ্নটা? জেরিকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিল রত্না৷ স্বপ্ন নয়৷ ঠিক যেন সত্যি৷

—‘মা তুমি আর কেঁদো না৷ আমার আর ফেরা হবে না গো৷ আমার যে ওখানকার সব কাজ শেষ৷’ জেরির কথা শুনে স্বপ্নেই আর্তনাদ করে উঠেছিল রত্না৷

—‘এসব কি বলছিস মা৷ ফিরে আয় আমার কাছে৷ তুই জানিস না, আমি সব সময় অপেক্ষা করি তোর জন্য৷ কেন এভাবে আমায় ছেড়ে চলে গেলি তুই? কি আমার দোষ? তুই সব আমায় বল৷ আমি যে শান্তি পাচ্ছি না৷’

হঠাৎ কাঁদতে শুরু করল জেরি৷ কাঁদতে কাঁদতে যেন একটু একটু করে বড়ো হয়ে যাচ্ছিল ও৷ রত্না দেখল জেরির মতো জামা পরে দাঁড়িয়ে আছে একটা বছর আঠারোর মেয়ে৷ তাকে দেখে স্বপ্নেও চমকে উঠল রত্না৷ আরে, এর ছবিই তো আঁকত জেরি ছোটোবেলায়৷ মেয়েটা বলল—

—‘মা তোমার সব প্রশ্নের উত্তর তোমার ঘরেই আছে মা৷ মৃত্তিকা চৌধুরী যে ঘরে মরেছিল সেই ঘরের বাম দিকের বড়ো কাঠের আলমারির নীচের ড্রয়ারে সব উত্তর আছে৷’ ঠিক তখনই ভেঙে গেল স্বপ্নটা৷ রত্না আজ সেই মতোই এসে খুঁজছিল এই ঘরে৷ নির্ধারিত জায়গাতেই পেয়ে গেল এই নোটপ্যাড৷ হাত পা কেমন কাঁপছে রত্নার৷ মাথা ঝিমঝিম করছে৷ কিছুই যেন বিশ্বাস হচ্ছে না৷

—‘ম্যাডাম আপনার ওষুধের সময় হয়ে গেছে৷ টেবিলে জলখাবার আর ওষুধ একসাথে রেখেছি৷ স্যার ওয়েট করছেন৷’ আয়ার ডাকে সম্বিৎ ফিরল রত্নার৷

—‘আসছি’ বলেই নোটপ্যাডটা লুকিয়ে দিল বিছানার গদির তলায়৷ কোনোমতে জলখাবার শেষ করে, মানসকে অফিসে রওনা করিয়ে দিয়েই দৌড়ে ফিরে এসে আবার হাতড়াল বিছানার গদির তলা৷ হাতে ঠেকল নোটপ্যাড৷ কিন্তু কই? এখানে তো সাদা পাতা শুধু৷ মায়ের লেখাটা কোথায় গেল? রত্না পাগলের মতো হাতরাচ্ছে এই ড্রয়ার ওই ড্রয়ার, গদির তলা৷ কিন্তু না সেই নোটপ্যাডটা৷

—‘কী হয়েছে ম্যাডাম?’ আবার এল আয়া রত্নাকে অস্থির দেখে৷

—‘একটা নোটপ্যাড... তুমি যখন ডাকলে আমায়, আমার হাতে ছিল৷ পাচ্ছি না সেটা৷’

—‘সেটা তো আপনি তখন বিছানার গদির তলায় রাখলেন৷ আমি তো দেখলাম৷’

—‘হ্যাঁ কিন্তু এটায় কিছু লেখা নেই৷ ওটায় লেখা ছিল৷ আমার মায়ের লেখা৷ তুমি বিশ্বাস কর’...

এবার ঠোঁট উল্টাল আয়া৷ উফফ! আবার পাগলি বউটা হ্যালুসিনেট করেছে নির্ঘাত৷ এর এই ভুল দেখার ব্যামোটা এত ডাক্তার ওষুধেও কেন যে কমছে না৷

—‘আসুন ম্যাডাম৷ মনে হয় আপনার শরীরটা আবার খারাপ লাগছে৷ আসুন তো আমার সাথে৷ শোবেন একটু৷’

—‘না না৷ ওটা খুঁজে পেতে হবে আমায়৷ প্লিজ৷ আমায় ছাড়৷’ নিজেকে জোর করে ছাড়াতে চাইল রত্না৷ কিন্তু পারল না৷ ওর শরীরটা যে সত্যি আজকাল জোরবিহীন হয়ে পড়েছে৷ আয়া এনে শুইয়ে দিল রত্নাকে৷ চোখ জলে ভরে গেল রত্নার৷ ও বুঝতে পারছে আয়া ভাবছে আবার ও পাগলামি করছে৷ কিন্তু ও কী করে বোঝাবে ও সত্যি খুঁজে পেয়েছে ওর জেরির রহস্য৷ কিন্তু কোথায় গেল লেখাটা? লেখাটাও কি তবে হারিয়ে গেল কোনো অজানা দরজার ওপারে? না না না৷ আর কিছু হারাতে দেবে না রত্না৷ ও সুস্থ হবেই৷ সেদিন ও ঠিক খুঁজে আনবে ওর হারিয়ে যাওয়া জেরিকে, সেদিন ও ঠিক খুঁজে আনবে মায়ের লেখাটাও৷ সেদিন সবাই বুঝবে রত্না পাগল নয়৷ ও জেরির মা, শুধু জেরির মা৷

___

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%