আজ বৈশাখী আসুক...

পল্লবী সেনগুপ্ত

—‘হ্যাঁ এই তো, সাবধানে... সাবধানে... আমার হাতটা ধরুন... হ্যাঁ এই তো... একদম পারফেক্ট’...৷

হুইল চেয়ার থেকে খুব সাবধানে ৩০২ নম্বর কেবিনের রোগীকে বিছানায় শুইয়ে দিল শম্পা৷

‘থ্যাঙ্কস’... খুব ছোটো করে বলল লোকটা৷ বিছানায় নিজেকে ঠিক মতো সেট করে নিয়েই আবার শম্পার দিকে ছুঁড়ে দিল সেই দৃষ্টিটা৷

চকিতে সতর্ক হয়ে গেল শম্পা৷ নিজেকে বাঁচিয়ে একটু কোণার দিকে সরে গেল৷ সন্তর্পণে নিজেকে ব্যস্ত করে দিল ফলের রস ঢালার কাজে৷ নয় নয় করে শহরের এই নামজাদা বেসরকারি নার্সিং হোমে নার্সের কাজের তো কম দিন হল না, তাই পরিস্থিতি আঁচ করতে এখন শিখে গেছে ও৷ এই ধরনের সেলিব্রিটি রোগীও কম দেখা হল না, কিন্তু কোনো কেসেই এত অস্বস্তিতে পড়তে হয়নি শম্পাকে৷ এখন মনে হচ্ছে কেন যে ও নাচতে গেল মেয়েটার কথায়! তার আর কি? যত হ্যাপা তো শম্পার৷

এই লোকটা অবশ্য ঠিক সেই অর্থে সেলিব্রিটি নয়৷ সিনেমা বা সিরিয়ালের নায়ক, গায়ক বা মন্ত্রী নয়৷ এ হচ্ছে নামজাদা সাংবাদিক৷ ‘এগিয়ে খবর’ চ্যানেলের স্টার সাংবাদিক৷ বাংলার এক নম্বর নিউজ চ্যানেলের এই পপুলার মুখটাকে এখন কে না চেনে! ফলের রস ঢালা যখন প্রায় শেষের দিকে, ঠিক তখনই প্রশ্নটা এল আবার— ‘সিস্টার, আমি কিন্তু এখনও আমার জবাবটা পেলাম না৷ আর আপনি জানেন জবাবটা না নিয়ে আমি ছাড়ব না৷’ সামান্য কেঁপে উঠল শম্পা৷ এই লোকটার অনেক ক্ষমতা৷ যদি একবার কোনো স্টেপ নেয়, বা কোনো কমপ্লেন করে নার্সিং হোম-এর কমিটিতে কেউ আর বাঁচাতে পারবে না শম্পাকে৷

—‘আমি তো আপনাকে যা বলার বলেছি স্যার৷’ কাঁপা গলায় উত্তর দিল শম্পা৷

—‘হ্যাঁ কিন্তু সেটা আমি বিশ্বাস করছি না৷ আমি সেদিন আপনাকে নিজের কানে একজনকে অন্য কথা বলতে শুনেছি৷ আপনি কাউকে বলছিলেন যে আপনি সেদিন বাড়ি থেকে খাবারই আনেননি৷’

প্রমাদ গুনল শম্পা৷ কি বলবে বুঝতে পারল না৷ ভীষণ গম্ভীর আর ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন লোকটা৷ সত্যি খুব আলাদা৷ তবে শম্পার কাছে ও তো শুধু নামি সাংবাদিক বা রোগী নয়, ওর আরও একটা পরিচয় আছে৷ যেটা লোকটা নিজেও জানে না৷

—‘স্যার৷ আপনার কিন্তু খুব কুইক ইমপ্রুভ হচ্ছে৷ কাল থেকে আপনি নিজেই হুইল চেয়ার নিয়ে ঘুরবেন৷ আমি আর হেল্প করব না৷ আমি আপনার সাথে থাকব, কিন্তু আপনি নিজেরটা নিজেই করবেন৷’ প্রসঙ্গ পাল্টে অন্য কথায় যেতে চাইল শম্পা৷

—‘আপনার হেল্প আজও লাগত না৷ কিন্তু প্রশ্নের উত্তরটা’... কথাটা শেষ হল না৷ কেবিনের দরজায় মৃদু টোকার শব্দ৷ কেউ বাইরে থেকে ডাকছে শম্পাকে৷

—‘এক্সকিউজ মি স্যার, আমি দু-মিনিটে আসছি৷ এই দরজার জাস্ট বাইরেই আছি আমি৷’ কেবিনের দরজা ঠেলে বাইরে বেরোল নার্স৷ আর ঠিক সেই মুহূর্তেই খোলা দরজাটা দিয়ে একমুঠো জুঁই ফুলের গন্ধ মাখা বাতাস এসে আছড়ে পড়ল ৩০২ নম্বর কেবিনে৷ চমকে উঠল বিছানায় থাকা লোকটা৷ আবার... আবার সেই গন্ধ... তার মানে সে এখানেই আছে৷ খুব কাছাকাছি কোথাও৷ হয়তো একদম এই ঘরটার পাশেই রয়েছে সে৷

—‘না, একদম না৷ কোনোভাবেই এই ভাবনাকে প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না৷’ নিজের মনকেই কষে ধমক লাগাল ‘এগিয়ে খবর’ চ্যানেলের দুঁদে সাংবাদিক৷

হিং টিং ছট, অং বং চং মন্ত্র এক নাগাড়ে পড়েই চলেছে পুরোহিতটা, যার বিন্দু বিসর্গও বুঝছে না শ্রুতি৷ শুধু শ্রুতি কেন, এখানে উপস্থিত বেশির ভাগ লোকই যে বুঝছে না, সে বিষয়ে সুমনা ১০০ ভাগ নিশ্চিত৷ তবুও হয়েই চলেছে একের পর এক মন্ত্র আচার অনুষ্ঠান৷ কারণ এগুলোই সমাজের নিয়ম৷ উফফ! আর কতদিন নিয়মের দোহাই দিয়ে সমাজ চালাবে এই স্বেচ্ছাচারিতা? আর কতদিনই বা শ্রুতির মতো মেয়েদের নিজের সব ইচ্ছা আর অনুভূতিকে জলাঞ্জলি দিয়ে মেনে যেতে হবে এসব? একদম ভালো লাগছে না ওর৷ ইচ্ছে করছে এক্ষনি ছুটে কোথাও পালিয়ে যেতে৷ ভারী বেনারসি শাড়ি আর গয়নার ওজন যেন প্রতি মুহূর্তে ওকে জানান দিচ্ছে আজ থেকে শুরু হল ওর আপোষের জীবন৷ স্থির দৃষ্টিতে ও তাকিয়েছিল যজ্ঞের আগুনের দিকে৷ কেমন যেন জ্বলন্ত ক্যানভাসের মতো মনে হচ্ছে আগুনটাকে৷ টুকরো টুকরো ছবির কোলাজ যেন ভেসে উঠছে ওই আগুনটার ওপর দিয়ে শ্রুতির চোখের সামনে একের পর এক৷ হারিয়ে যাওয়া দিনের টুকরো কিছু স্মৃতি৷ নাঃ, কিছুতেই মনটাকে নিজের বশে করতে পারছে না মেয়েটা৷ চোখ সরিয়ে নিল ও আগুনের দিক থেকে৷ চোখটা কেমন জ্বালা করছে৷ এবার ও দৃষ্টি ঘোরাল পাশে৷ ছেলেটা বাধ্য মূর্তির মতো বসে রয়েছে বর আসনে৷ কিন্তু ওর চোখ দুটোও বলছে যে ওরও মন বড়ো চঞ্চল হয়ে রয়েছে৷ শ্রুতি জানে এই মুহূর্তে ওরও চোখের সামনে হাজার ফেলে আসা মুহূর্তের কোলাজ৷

হঠাৎ ঘাড়ে একটা খুব চেনা হাতের ছোঁয়া, ঈষৎ কেঁপে উঠল শ্রুতি৷ ঘাড় ফেরাল এবার৷ হ্যাঁ ঠিক৷ মৌলীই ছিল৷

—‘আমি আজ চলি রে৷ সব ভালো ভালো মিটে যাক৷ পরশু দেখা হচ্ছে আবার৷’

—‘থেকে যা না রে প্লিজ আজকের রাতটা৷’ কেমন আর্তির মতো শোনালো শ্রুতির স্বরটা৷

—‘না রে তুই তো জানিস মা-কে একা রাখা যাবে না৷ আমি গেলে তবে আয়া মাসি বাড়ি যাবে৷’

—‘তাহলে বিয়েটা শেষ হলে যা৷’

—‘আমারও তো তাই ইচ্ছে করছে৷ কিন্তু এতটা পথ একা ফিরব তো...৷’ এবার একটু নীচু হল মৌলী৷ শ্রুতির কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল— ‘কিছু ভাবিস না৷ সব ঠিক হয়ে যাবে দেখিস৷’

চমকে উঠল শ্রুতি৷ মৌলীর গলার স্বরটা অবিকল সেই এক রকম লাগল, হুবহু সেই দিনের মতো৷

আবার শ্রুতির চোখের সামনে ভেসে উঠল একটা দৃশ্য৷ শহরের নামজাদা কলেজটার আকাশে উড়ছে হলুদ আবীরের ফোয়ারা৷ ইলেকশনে হলুদ দল জিতেছে৷ হই চই এর তাই আর শেষ নেই৷ আবার ক্ষমতায় হলুদ দল৷ অনেকগুলো ছেলে-মেয়ে বেষ্টিত হয়ে এগিয়ে আসছে লম্বা, হিরো মতো একটা ছেলে৷ সেই জি এস হচ্ছে এবার৷ এত দিন কাগজে কলমে জি এস না থাকলেও বেশ হোমরা চোমড়া তো ও ছিলই৷ ওর হাত জড়িয়ে রয়েছে একটা মেয়ে৷ ছেলেটাও শক্ত করে চেপে রেখেছে সেই মেয়েটার হাত৷ আর দূর থেকে দাঁড়িয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে এই দৃশ্যটা দেখছে আর একটা মেয়ে৷ খুব মলিন চেহারা মেয়েটার৷ এই ঠাট বাঁট-এর কলেজের আকাশে কেমন একটা বেমানান ঘুড়ির মতো৷ পরনে সস্তা সালোয়ার কামিজ, গায়ের রং যথেষ্ট চাপা, খুব সাধারণ মুখশ্রী আর চোখে কেমন যেন ভীতু ভীতু ভাব৷ ও বি সি কোটার রিজারভেশনের জোরে এই বড়ো কলেজটায় চান্স পেয়েছে খুব মধ্যবিত্ত পরিবারের সাধারণ মেয়েটা৷ উল্লাস করতে করতে মেয়েটাকে পাশ কাটিয়েই চলে এল আসন্ন জি এস আর তার দল বল৷ ভীতু চোখ দুটো হঠাৎই জলে ভরে উঠল৷ ঠিক তখনই মৌলী এসে হাত রাখল মেয়েটার কাঁধে৷ এই স্পর্শ টুকুরই যেন অপেক্ষায় ছিল সে৷ ঝর ঝর করে কেঁদে ফেলল এবার৷

—‘পাগলি কাঁদছিস কেন? যাকে ভালোবাসিস তার সফলতায় কেউ কাঁদে?’

—‘আমি খুব খারাপ রে মৌলী৷’ মৌলীকে জড়িয়ে ধরে আরও জোরে জোরে কেঁদে উঠল মেয়েটা৷

—‘আমি জানি ওর সফলতায় আমার খুশি হওয়া উচিত৷ কিন্তু আমি যে পারছি না৷ এত দিন ও শুধু ক্লাস রিপ্রেজেনটেটিভ আর কালচারাল সেক্রেটারি ছিল তাতেই তো ওকে কলেজ চত্বরে প্রায় পাওয়াই যেত না৷ ক্লাসেও আসত কম৷ আর এবার তো... এবার তো...৷ ওকে শুধু চোখের দেখাটুকু দেখা নিয়েই তো খুশি ছিলাম আমি৷ সেটাও বোধ হয় এবার হারাল রে মৌলী৷’ বাচচাদের মতো ডুকরে কেঁদে উঠল সরল মেয়েটা৷

—‘কিচ্ছু ভাবিস না৷ সব ঠিক হয়ে যাবে দেখিস৷’ মেয়েটার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে বলল মৌলী৷ সূর্য অস্তে যাচ্ছে৷ আকাশ যেন লাল আবীরে মাখামাখি৷ সেই লাল আবীরের কুচি কুচি অংশ ছুঁয়ে যাচ্ছে দুই বন্ধুর পবিত্র ভালোবাসাকে৷ মৌলী মনে মনে বলল— ‘হে ভগবান এই লাল আভার একটু অংশ এই মেয়েটাকেও দাও তুমি৷ মেয়েটা যে বড্ড ভালো৷ বড্ড সরল৷

ঝ্যাং ঝ্যাং করে গিটার বাজিয়ে গান গাইছে ছেলেটা কলেজ ক্যান্টিন চত্বরে৷ আর তাকে ঘিরে পাঁচ-ছটা ছেলে-মেয়ে বসে মন্ত্র মুগ্ধের মতো শুনছে সেই গান৷ গান শেষ হতেই হাততালিতে ফেটে পড়ল তারা যথারীতি৷ আর আবীর-এর ঠোঁটেও ফুটে উঠল রোজকার মতোই একটা বিজয়ী নায়কের হাসি৷ আবীর সুদর্শন, স্মার্ট, ভালো লেখে, ভালো গান করে, খুব সুন্দর কথা বলে, পড়াশুনাতেও খারাপ না৷ আর সবচেয়ে বড়ো কথা ওর মধ্যে একটা অদ্ভুত যাদু আছে, যে কারণে স্কুল লাইফ থেকেই লোকজনের ভীষণ নজর কাড়ে ও৷ যে কোনো জায়গাতেই খুব কম দিনেই ও ভীষণ পপুলার হয়ে যায় আর যে কোনো ক্ষেত্রেই সফলতাও ও পেয়ে যায় তাড়াতাড়ি৷ অবশ্য এই কলেজেও যে এত তাড়াতাড়ি এত বেশি লোকের মন ও জয় করে ফেলবে সেটা ভাবেনি আবীর৷ এটা দেশের অন্যতম বিখ্যাত কলেজ, এখানে কেউই তেমন হেলা ফেলা নয় তাই আবীর ভেবেছিল এখানে হয়তো নিজের জাদু জমানো ওত সহজ নাও হতে পারে৷ কিন্তু না, যথারীতি বরাবরের মতোই এখানেও অনেকেই আবীর জাদুতে কুপোকাত৷ আজকাল তো আবীরের ফ্যানের সংখ্যা আরও বেড়ে গেছে৷ আর হবে নাই বা কেন আগামী ইলেকশনের পর আবীরই যে জি এস হচ্ছে সেটা তো প্রায় নিশ্চিত৷ গান শেষে অনেক হাততালি আর প্রশংসার মাঝে আবীর খুঁজছিল বিশেষ দুটো চোখ৷ হ্যাঁ সেই চোখ দুটোও ভীষণ আবেগ মাখা একটা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আবীরের দিকে৷ আবীর জানে ওই দৃষ্টির মানে৷ এত ভিড়ের মাঝে এক টুকরো আড়াল খুঁজে নিয়ে আবীরকে পাগলের মতো আদর করতে চাইছে তমিস্রার মন এখন৷ এই কলেজে সুন্দরীর সংখ্যা নেহাত কম নয়৷ তাই খুব স্বাভাবিক ভাবেই প্রথম দিন থেকেই একাধিক মেয়ের প্রতি একটা হালকা ক্রাশ তৈরি হচ্ছিল আবীরের৷ হ্যাঁ, আবীর এমনটাই৷ সুন্দর, স্মার্ট মেয়েদের প্রতি ওর একটা ভালো লাগা তৈরি হয়ে যায় হুট হাট৷ এখানেও তার ব্যাতিক্রম হয়নি৷ তবে আবীরের প্রতিও এখানে ফিদা প্রচুর মেয়ে সেটা জানা আছে ওর৷ তবে তমিস্রার ব্যাপারটা একদম আলাদা৷ ওর মধ্যে আলাদা একটা ব্যাপার আছে৷ যেই কারণে ওকে একটু বেশিই ভালো লেগেছিল আবীরের৷ যাই হোক ফাইনালি ওদের সম্পর্কটা ভালো ভাবে দানা বেঁধেছে তাও মাস দুয়েক হল৷ সময়ের মেয়াদটা কম হলেও সম্পর্কের গভীরতাটা মোটেও কম না৷ তবে এটা ঠিক যে খুব ঘনিষ্ঠ দু-একজন বন্ধু ছাড়া এখনও কেউ জানে না ওদের সম্পর্কের কথা৷ তবে আবীরের মন বলছে তমিস্রার সাথে ওর সম্পর্কটা হয়তো টিকে যাবে বেশ কিছু দিন৷

—‘আবীর, আবীর... এই আবীর...’ চারপাশের ভিড়টা ছাড়িয়ে হঠাৎ একটা ডাক পৌঁছাল ওর কানে৷ ডাকের উৎসটা খুঁজতে এদিক ওদিক তাকাল আবীর৷ আর ওমনি ঝাং করে মাথাটা গরম হয়ে গেল ওর৷ তপন এদিকেই আসছে বিচ্ছিরি চিৎকার করতে করতে৷ এই তপন ছেলেটাকে একদম সহ্য হয় না ওর৷ আনস্মার্ট, গাঁইয়া, ব্যক্তিত্বহীন ছেলে একটা৷ নেহাতই নিজের ডিপার্টমেন্টের ছেলে তাই... নইলে কে কথা বলত এরকম একটা ছেলের সাথে৷ আবীরদের ডিপার্টমেন্টে মেয়ে একটু বেশি, আর এই ছেলেটাও মেয়েদের সাথেই বেশি মিশে থাকে ওই জন্যই৷ মেয়েদের ফাই ফরমাশও খাটে বোধ হয় মাঝে মাঝে৷ ইশস! কী অদ্ভুত মানসিকতা৷ তপন দৌড়াতে দৌড়াতে চলে এল প্রায় আবীরের সামনাসামনি৷ হাঁপাচ্ছে অল্প অল্প৷

—‘আবীর, একটা কথা ছিল৷ একবার একটু ওদিকে যাবি রে ভাই?’

বিরক্তিতে কুঁচকে গেল আবীরের মুখ৷ ও ভালোই জানে কী কথা বলতে চাইছে তপন৷ তাই বেশ গম্ভীর ভাবেই বলল— ‘যা বলার এখানেই বল৷’

—‘এখানে বলা গেলে কি আর ডাকতাম রে তোকে ভাই? প্লিজ চল না৷’ উফফ ছেলেটা বড্ড নাছোড় তো৷ অগত্যা উঠল আবীর৷ নইলে বোধ হয় এখানে দাঁড়িয়ে ঘ্যান ঘ্যান করেই যাবে৷ একটু ফাঁকা একটা কোণা খুঁজে নিয়ে এগোল আবীর সেদিকে৷ আর পিছু পিছু তপনও৷

—‘কিছু কি ভাবলি রে ভাই?’

—‘কী ভাবব বলতো? কী ব্যাপারে?’ একটু খিঁচিয়েই জবাব দিল আবীর৷

—‘শ্রুতির ব্যাপারটা৷ বিশ্বাস কর মেয়েটা সত্যি খুব ভালো৷ খুব আবেগি আর সরল৷ আজকালকার মেয়েদের মতো একদম নয়৷ আর তোকে সত্যি বড্ড...’

—‘ব্যস তপন৷’ ধমকে উঠল আবীর৷ ‘বড্ড নির্লজ্জ যে মেয়েটা সেটা তো বুঝতেই পারছি৷ নইলে বার বার তোকে এভাবে পাঠায় নাকি উমেদারি করতে?’

—‘না আবীর না৷ ও তো জানেই না এভাবে আমি তোকে বলছি৷ ও আমাকে পাঠায়নি৷ ও একতরফা একটা প্রেমের জ্বালায় বড্ড কষ্ট পাচ্ছে৷ আর বন্ধু হয়ে আমরা কি করে সেটা দেখি বল৷ শুধু তোকে একটি বার চোখের দেখা দেখার আশায় নিদারুন শরীর খারাপ নিয়েও কলেজ আসছে৷ ওর মতো মেয়ে হয় না রে৷’

আবীরের বলতে ইচ্ছে করল তাহলে তুই ই ওকে ভালোবেসে বুকে জড়িয়ে নে না৷ ওর সাথে তো তোকেই মানায়৷ দুজনেই কোটার জোরে ঢুকে গেছিস এখানে৷ কিন্তু মুখে তো আর ঠিক বলা যায় না৷ হাজার হোক দুজনেই নিজের ডিপার্টমেন্টের ছেলে-মেয়ে বলে কথা৷

—‘দেখ, তুই বোধ হয় পাগল হয়ে গেছিস৷’ সুর একটু নরম করল আবীর৷ —‘আর সেই জন্যই বুঝতে পারছিস না যে কতটা উদ্ভট একটা কথা বলছিস তুই৷’

—‘না শোন তুই...’

—‘তুই শোন আমার কথা৷ ওকে বল আবীর মৈত্র কে নিয়ে ভেবে নিজের সময় আর এনার্জি নষ্ট না করে নিজের লেখা পড়া, ড্রেসিং সেন্স আর লুকটা নিয়ে ভাবতে৷ ওগুলো একটু ভালো করার চেষ্টা করুক ও, তাহলে হয়তো ওর প্রেম করার সাধটা মিটলেও মিটতে পারে৷ আর হ্যাঁ, বড়ো কলেজে পড়ছিস তোরা, তাই কমন সেন্সটা বাড়া৷ বামন হয়ে চাঁদ ধরা যায় না সেটা বুঝতে গেলে কমন সেন্সই যথেষ্ট৷’ কথাগুলো খুব রুক্ষ স্বরে বলে গটগট করে এগিয়ে গেল আবীর, আর তপন ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইল বোকার মতো৷

আর পুরো ঘটনাটাই থামের আড়াল থেকে দেখতে পেল সেই ‘বামন’টা, যে কিনা চাঁদ ধরার স্বপ্ন দেখেছিল৷ দু-চোখ জলে ভরে উঠল তার৷ মেঘলা দুপুরের বিষণ্ণ বাতাসটা যেন নখ বের করে আঁচড়াচ্ছে তাকে৷ সত্যি তো! আবীর তো ঠিক বলেছে পুরোপুরি৷ কোথায় সে আর কোথায় আবীর৷ আকাশ আর পাতাল পার্থক্য৷ কিন্তু সব জেনে বুঝেও এই বেইমান হূদয়টা কেন যে ওই আবীরের জন্যই...৷

গুড়গুড় করে মেঘ ডাকছে৷ মেঘের ভ্রুকুটিটাও বেড়েছে আরও অনেকখানি৷ মনে হয় আজ খুব ঢালবে৷ কালবৈশাখীর দামাল বাতাস আর বৃষ্টির ফোঁটা এলোমেলো করে দেবে সবটুকু৷ কলেজের বাইরে বেরিয়ে এল মেয়েটা৷ ঝাপসা দুটো চোখ নিয়ে বৃষ্টির বড়ো বড়ো ফোঁটা গায়ে মাখতে মাখতে এগিয়ে চলেছে সে৷ বৃষ্টির জলে মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে মেয়েটার চোখ থেকে গড়িয়ে পড়া মুক্তোর দানাগুলো৷

কলেজ স্ট্রিট প্যারামাউনটের সামনে দাঁড়িয়ে উশখুশ করছিল শ্রুতি৷ কব্জি উল্টে ঘড়ি দেখল একবার৷ প্রায় পাঁচটা বাজতে চলল তবু রোদের ভ্রুকুটি যেন কমে না৷ আসলে জ্যৈষ্ঠ মাসের রোদ তো, তাই যেন গিয়েও যেতে চায় না৷ ঠিক শ্রুতির খারাপ ভাগ্যের মতো৷ উফফ! এখনও এল না ছেলেটা৷ একবার কি ফোন করে দেখবে? না থাক বেশি বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে এটা৷ কেন যে ও রাজি হল দেখা করতে আসার জন্য৷ অবশ্য না হয়ে আর কি বা উপায় ছিল৷ যে কোনো উপায়েই হোক ভাঙতে তো হবে বিয়েটা৷ হ্যাঁ, শ্রুতির বাবা মা যেমন পণ করেছে যে মেয়ের বিয়ে দিয়েই ছাড়বে, তেমনি ও পণ করেছে যে সব কটা বিয়ে ও ভেঙেই ছাড়বে৷ শ্রুতি বিয়ে করবে না নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে৷ ও একটা স্বনির্ভর মেয়ে৷ তাহলে কি প্রয়োজন আছে শুধু শুধু জীবনে জটিলতা বাড়ানোর৷ গ্র্যাজুয়েশনে এমন কিছু মার কাটারি রেজাল্ট হয়নি শ্রুতির৷ তাই প্রথাগত শিক্ষাকে বিদায় জানিয়ে শ্রুতি ভর্তি হয়েছিল নার্সিং ট্রেনিং-এর জন্য৷ ট্রেনিং শেষে শম্পাদি-র রেফারেন্সে জয়েনও করেছে জুনিয়র হিসেবে শম্পাদি-র নার্সিং হোমেই৷ শম্পাদি ওর মাসতুতো দিদি৷ কিন্তু দারুণ ভালোবাসে ওকে৷ অনেকদিন ধরেই শম্পাদি বেশ সুনামের সাথে চাকরি করছে শহরের নামি ওই বেসরকারি নার্সিং হোমটায়৷ তাই শ্রুতির চাকরিটা মোটামুটি সহজেই হয়ে গেছিল৷ পৃথিবীতে শম্পাদি একমাত্র মানুষ যে শ্রুতির অনুভূতিটাকে সম্মান করে৷ পাগলামি মনে করে না৷ হ্যাঁ আবীরের প্রতি শ্রুতির গভীর এক তরফা প্রেমটা আজও একই আছে, কিন্তু কেউ বোঝে না সেটা৷ সবাই ওকে পাগল ভাবে এসব বলতে গেলে৷ উল্টে ওকেই বুঝিয়ে দিতে চেষ্টা করে৷ আর শ্রুতির মতো মধ্যবিত্ত ঘরের সাধারণ মেয়েদের নিজের অনুভূতি নিয়ে বিলাসিতা করার অনুমোদন যে আজ ও নেই৷ সে যতই সমাজ এগিয়ে যাক না কেন৷ আত্মীয় স্বজন পাড়া পড়শি পাগল করে দিচ্ছে বাবা মা কে ওর বিয়ের জন্য৷ বাবা মা-ও কোমর বেঁধে লেগে পড়েছে মেয়ের বিয়ের জন্য৷ অসুস্থ বয়স্ক মানুষ দুটোর শুধু একই কথা— ‘পাগলামি করিস নে সুমি৷ কি ভাবিস তুই ওই ছেলে আসবে তোর জন্য! এ সব ভুলে সংসার কর, দেখবি সব ভুলে যাবি তুই৷ আমরা না থাকলে কি হবে তোর?’ না কিছুতেই বোঝানো যায় না ওদের৷ তবে এটাও ঠিক শ্রুতি পাগল নয়৷ ও জানে চাঁদ বামনের ঘরে আসে না৷ কিন্তু তা বলে মনে একজনকে বসিয়ে রেখে অন্য কারোর ঘর করা, তার বাচচার মা হওয়া এ যে হয় না৷ সে শ্রুতিকে ভালো না বাসলেও তো শ্রুতির ভালোবাসাটা মিথ্যা হয়ে যায় না৷ সব প্রেম কে কি এক রকম হতেই হবে? সব প্রেমেই কি ভালোবাসাটা দু-তরফ হতেই হবে? সব প্রেমেই কি সারাজীবন দুটো মানুষকে পাশাপাশি থেকে সংসার করে নুন তেলের হিসাব করতেই হবে? প্রতিটা মানুষ যেমন আলাদা তেমনি সবার অনুভূতিও আলাদা৷ সবার ভালোবাসাকে ছুঁয়ে দেখার মনটাও আলাদা৷ হ্যাঁ কেউ বলতেই পারে শ্রুতির পাগলামি এসব৷ এমন প্রেম বাস্তব সমাজ আর জীবনে কোনো দাম নেই৷ না তাতে কিছু যায় আসে না শ্রুতির৷ ও না হয় একটু পাগলই হল৷ সবাই কি এক রকম হবে নাকি! দু-দুটো সম্বন্ধ এর আগে এসেছিল শ্রুতির জন্য৷ একজন ওকে পছন্দ করেনি, আর একজন ছেলেকে ব্যক্তিগত ভাবে কথা বলে ও স্পষ্ট জানিয়েছিল যে সে অন্য কাউকে ভালোবাসে৷ কিন্তু আপাতত সেই ভালোবাসার মানুষের সাথে বিয়েটা ওর সম্ভব নয় তাই নিজে থেকে বাড়িতে সম্বন্ধ নাকচ করতে পারবে না ও৷ তাই ছেলেটা নিজেই যেন ভেঙে দেয় বিয়েটা৷ কাজও হয়েছিল তাতে৷ কিন্তু এই দেবরূপ ছেলেটা বড়ো অদ্ভুত৷ শ্রুতি এর ক্ষেত্রেও একই ভাবে বলেছিল, কিন্তু সে শুনে বলেছিল— ‘আপনার কথা আমি মানতে পারি তাহলে আপনাকেও আমার একটা কথা রাখতে হবে৷ পরশু বিকালে প্যারামাউন্টের সামনে দাঁড়াবেন৷ একবার কথা বলব৷ তারপর সব ডিসিশন হবে৷’ কিন্তু কোথায় সে? আসবে না নাকি? আসুক একবার৷ আজ আরও কড়া ডোজ দিতে হবে৷

—‘এক্সকিউজ মি. ম্যাডাম... একটু দেরি হয়ে গেল না?’ অপরিচিত কণ্ঠস্বরে চমকে পিছনে তাকাল শ্রুতি৷ এসে গেছে ছেলেটা৷

শ্রুতি অল্প হেসে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল৷ তার আগেই ছেলেটা বলল— ‘চলুন ভিতরে গিয়ে বসা যাক৷’

সরবতের গ্লাস নিয়ে মুখোমুখি বসে আছে দুজনে৷ শ্রুতিই প্রথম কথা শুরু করল৷

‘দেখুন সেদিনই আপনাকে বলেছিলাম আমি একজনকে ভালোবাসি৷ আর হ্যাঁ এটা ঠিক যে এই মুহূর্তে তার সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই, আর হবেও না৷ কিন্তু আমার ভালোবাসাটা বা অনুভূতিটা তো আর তাতে মিথ্যা হয়ে যায় না৷ আমার বাড়ির লোকরা এসব বোঝে না৷ তাই আমি বিয়ে করব না বললে তারা হাজারটা প্রশ্ন করবে৷ কিন্তু একজন আধুনিক ছেলে হিসাবে আপনি নিশ্চয় বোঝেন ইচ্ছার বিরুদ্ধে একজন মেয়েকে বউ বানানো উচিত না৷ তাই বিয়ে না করার কথাটা আপনাকেই বলতে হবে৷’ এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে গেল শ্রুতি৷ একটু থামল তারপর৷ দেখল অদ্ভুত ভাবে হাসছে ছেলেটা৷ মাথাটা গরম হয়ে গেল এবার শ্রুতির৷ স্বর একটু রুক্ষ করে বলল— ‘আপনি হাসতেই পারেন৷ আমাকে পাগল, স্কিতজফ্রেনিক যা খুশি ভাবতে পারেন৷ কিন্তু আমার অনুভূতি আমার কাছে ১০০ ভাগ সত্যি৷ তাই...’

—‘কে বলল আমি পাগল ভাবছি আপনাকে?’ এতক্ষণে মুখ খুলল ছেলেটা৷

—‘প্রতি মানুষের অনুভূতি তার কাছে তার মতো করে সত্যি৷ এমনকি যাদের আমরা পাগল বলি তারাও আমার আপনার কাছে অস্বাভাবিক৷ কিন্তু তার নিজের কাছে সে একদম সত্যি৷ আর এই যে কথাগুলো আপনি বললেন, আপনাকে দেখতে আসার আগের মুহূর্তেও আমি ভেবেছিলাম এগুলো বোধ হয় আমাকেই বলতে হবে আপনাকে৷ যেমন এর আগেও বলেছি দু-এক জায়গায়৷ আমি তো আর জেনেশুনে কোনো মেয়ের জীবন নষ্ট করতে পারি না৷ তাই আমার অনুভূতির জন্য তারাও আমায় পাগল ভেবেছিল বোধ হয়৷ আরও অনেকেই ভাবে বোধ হয়৷ কিন্তু তাতে আমার কিচ্ছু যায় আসে না৷ কারণ ওই যে, আমার কাছে আমি সত্যি৷’

ভীষণ অবাক লাগল শ্রুতির৷ এসব কি বলে লোকটা? ওর মনের কথা বোধ হয় বুঝতে পারল দেবরূপ৷ বলল— ‘কী হল? পাগল ভাবছেন তো আমায়? জানেন আমি ক্লাস নাইন থেকেই রিক্তাকে ভালোবাসি৷ ও আমাদের পাড়ায় থাকত, দীর্ঘ দশ বছরের প্রেম আমাদের৷ রিক্তা ছাড়া কোনোদিন নিজেকে ভাবতে পারিনি আমি আর ও জানত না আমায় ছাড়া কিছু৷ কাগজে কলমে বা আচার মেনে বিয়ে না হলেও মনে মনে আমরা স্বামী স্ত্রীই ছিলাম৷ কিন্তু সেই রিক্তাই চলে গেল আমায় ছেড়ে৷ মাসির বাড়ি যাচ্ছিল ও সাতদিনের জন্য শিলিগুড়িতে৷ মারাত্মক এক রেল দুর্ঘটনা কেড়ে নিল ওকে আমার থেকে৷’ এবার একটু থামল দেবরূপ৷ আবার বলে চলল— ‘ওর মৃত্যুটা মেনে নিতে পারিনি আমি৷ সব সময় মনে হয় ও আশে পাশেই আছে আমার৷ যে কোনো সময় সামনে চলে আসবে৷ আমি যখন একা থাকি, যখন ঘুমাই ওর স্পর্শ অনুভব করি আমি৷ তাই যে যাই বলুক আমার পক্ষে রিক্তার জায়গা অন্য কাউকে দেওয়া সম্ভব ছিল না৷ বিয়ে নিয়ে কোনোদিন ভাবিইনি আমি৷ কিন্তু বিধি বাম৷ মা হঠাৎ আক্রান্ত হলেন ক্যান্সারে৷ মৃত্যু শয্যায় কথা আদায় করলেন যে আমি বিয়ে করব৷ মা কোনোদিন কিছু চাননি আমার থেকে৷ তাই মায়ের শেষ সময়ে কথাটা না দিয়ে পারলাম না৷ তারপর থেকে দাদা বউদি আর বাড়ির বাকিরা উঠে পড়ে লাগল আমার বিয়ে নিয়ে৷ কিন্তু রিক্তার জল ভরা চোখ আমি দেখতে পাই আমার বিয়ের আলোচনার সময়৷ তাই একটার পর একটা বিয়ে ভাঙতে থাকলাম আমি৷ কোনো মেয়ের জীবন নষ্ট হোক আমি চাই না, আমার যে আর কিছু দেবার নেই কাউকে৷ কিন্তু সেদিন আপনার কথা শুনে প্রথমবার অন্য কিছু মনে এল আমার৷’ একটু থেমে সরবতে চুমুক দিল দেবরূপ৷ শ্রুতি তাকিয়ে আছে উদগ্রীব চোখে৷ আবার বলতে শুরু করল দেবরূপ—

—‘যখন আপনি সেদিন আমার কোনো কথা শোনার আগেই বললেন কাউকে ভালোবাসেন, বিয়ে করতে চান না আমায়৷ অথচ সেই ভালোবাসার মানুষ এখন আপনার থেকে দূরে চলে গেছে তাই আপনাদের বিয়েটাও এক্ষুনি সম্ভব নয় তাই বিয়ে ভাঙতে হবে আমায়, তখন আমার মনে হল হয়তো আপনি সেই যাকে আমি খুঁজছি৷’

—‘মানে?’ বিস্মিত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করল শ্রুতি৷

—‘মানে আমি ভাবছিলাম যদি এমন একজনকে পাওয়া যায়, যে সাহায্য করবে আমায়৷ দেখুন শ্রুতি বিয়ে নিয়ে এই লুকোচুরি খেলাটা আপনি বেশিদিন চালাতে পারবেন না৷ একসময় আপনার বাবা মা কোথাও না কোথাও বিয়ে আপনাকে দেবেই৷ আর আমিও এভাবে কত দিন পাত্রী দেখা দেখা খেলব? মা-কে দেওয়া কথাটা যে রাখতে হবে আমায়৷ তাই বলছিলাম যদি আপনার আর আমার বিয়ে মানে বিয়ে বিয়ে নাটকটা সেরে ফেলা যায় তাহলে সমাজ তথা পরিবারে এই নিত্য দিনের বিয়ের চাপ থেকে আমরা মুক্তি পেয়ে যাব৷ আর যেহেতু আমরা একই পথের পথিক তাই একে অপরের অনুভূতিকে সম্মান করব আর খুব ভালো বন্ধু হয়ে উঠব৷ কিন্তু কারোরই কিছু প্রত্যাশা আর থাকবে না এই সম্পর্ক থেকে৷ কি ভুল বলছি?’

—‘না, মানে কিন্তু এমন আবার হয় নাকি? দেখুন আমি...’

—‘আমি কিছু সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিচ্ছি না আপনার ওপর৷ আপনি ভাবুন৷ তারপর জানান আমায়৷ যদি আপনার আমার কথাগুলো ঠিক না লাগে তাহলে আমি না হয় আপনার কথা মতোই জানাবো আপনার বাড়িতে৷ চলি আজ৷’

চলে গেল দেবরূপ৷ শ্রুতি বসে রইল ঝুম মেরে৷ সূর্য অস্ত যাবার পর অন্ধকারে ডুবছে শহর৷ হাল্কা হাওয়া ছুঁয়ে যাচ্ছে সবাইকে৷ শ্রুতির কানে বাজছে লোকটার কথাগুলো৷ সত্যি না পাওয়ার ব্যথা নিয়ে কত মানুষই না ঘুরছে চারপাশে৷ কজনেরই বা খবর রাখি আমরা৷ শ্রুতি ধীর পায়ে উঠে নামল রাস্তায়৷ বুক ভরে বড়ো করে শ্বাস নিল একটা৷ বুকে জমে থাকা জগদ্দল পাথরের বোঝাটা হঠাৎই যেন একটু হালকা ঠেকল মেয়েটার৷ গুড়গুড় মেঘ ডাকল আকাশে৷ ক্লান্ত দগ্ধ দিনের শেষে কালবৈশাখী আসছে বোধ হয় ঘর্মাক্ত পৃথিবীর ক্লেদটুকু শুষে নিতে৷

বিছানায় শুয়ে ছটফট করছিল শ্রুতি৷ কিছুতেই ঘুম আসছে না৷ কেন... কেন এত অভিশপ্ত শুধু ওরই ভাগ্যটা? যাদের ও ভালোবাসে, যাদের ও ভালো চায় তারা সবাই কেন জ্বলে পুড়ে মরে এভাবে? একদিনের জন্যও কি শান্তি পাবে না ও? দেবরূপের সাথে বিয়ের পর থেকে যা হোক তাও কাটছিল দিনগুলো৷ ছেলেটা ভীষণ ভালো৷ রিক্তার জন্য ওর সাংঘাতিক ভালোবাসা দেখে মাঝে মাঝে শ্রুতির মনে হত সত্যি কত দুর্ভাগা এই রিক্তা৷ এত অপার প্রেম ছিল ওর জন্য, কিন্তু তবুও চলে যেতে হল ওকে৷ না, শ্রুতির মনে দেবরূপের জন্য কক্ষনো প্রেম জাগেনি, কিন্তু একটা অপার শ্রদ্ধা লোকটা আদায় করে নিয়েছিল নিজ গুনেই৷ আস্তে আস্তে ভীষণ ভালো বন্ধু হচ্ছিল ওরা৷ ভীষণ ভরসা করত শ্রুতি দেবরূপকে, আর সেও শ্রুতিকে আর ওর অনুভূতিকে খুব সম্মান করত৷ স্বামী স্ত্রী সুলভ সম্পর্ক ওদের ছিল না, তবে এও ঠিক যে সময় বড্ড বড়ো ওষুধ৷ কে বলতে পারে কোনোদিন হয়তো ঠিক হয়ে যেত ওদের মধ্যেও সব৷ কিন্তু যে সুযোগ আর এল কই৷ হঠাৎ শহরে ধেয়ে এল এক মারণ জ্বর৷ চার দিনের জ্বরে প্রাণ হারাচ্ছে বহু লোক৷

দেবরূপও সেই জ্বরের কবলে পড়ল৷ ওদের বিয়ের বয়স তখন সবে ছ-মাস৷ নিজের নার্সিং হোমেই দেবরূপকে ভর্তি করিয়েছিল শ্রুতি৷ সেবার কোনো ত্রুটি রাখেনি৷ কিন্তু তবুও শেষ রক্ষা আর হল কই?

দেবরূপ যখন চরম অসুস্থ হয়ে নার্সিং হোমে ভর্তি তখনই একদিন আবার সে সামনে চলে এসেছিল খুব অপ্রত্যাশিত ভাবে আর শ্রুতির বুকে আবার আছড়ে পড়েছিল একই সাথে লক্ষ কোটি ঢেউ৷ দেবরূপকে আলাদা কেবিনে রাখতে পারেনি শ্রুতি৷ যে বেডে দেবরূপ ছিল, তার পাশের বেডে ভর্তি থাকা লোকটা বোধ হয় কোনো ভাবে পরিচিত ছিল তার৷ তাকে দেখতে হঠাৎই একদিন চলে এসেছিল সে৷ কোনো বাঁধা ধরা ভিজিটিং আওয়ারে নয়, দুপুরের দিকে এমনি একটা সময়৷ এত বছর পর আবার সে একদম সামনে৷ ‘এগিয়ে খবর’ চ্যানেলে তো তাকে সব সময়তেই দেখা যায়, কিন্তু আজ আবার সে একদম সামনে৷ শ্রুতি খুব কষ্ট করে শক্ত করছিল নিজের মন, একবারও তাকায়নি তার দিকে৷ কিন্তু... কিন্তু মনে হল সে যেন কয়েক মুহূর্তের নির্নিমেষ দৃষ্টি দিয়ে দেখছে ওকে৷ বিশ্বাস হয়নি শ্রুতির৷ কী করে বিশ্বাস হবে? সে এখন বিখ্যাত মানুষ৷ শ্রুতি শুনেছে যে কলেজের পুরোনো কোনো লোকের সাথে যোগাযোগ রাখে না সে৷ ফেসবুকে পর্যন্ত অ্যাড করে না৷ সেখানে সে কি করে শ্রুতির দিকে... না এটা হতেই পারে না৷ কারণ তার সেই কথাটা যে আজও ভোলেনি শ্রুতি৷ ‘বামন হয়ে যে চাঁদ ধরা যায় না৷’ এই ঘটনার দু-দিন পরেই চলে যায় দেবরূপ তার রিক্তার কাছে৷ আবার শ্রুতি একা৷ দেবরূপের মৃত্যুটা ওকে আরও একবার বুঝিয়েছিল যে ভগবান ওর প্রার্থনা শোনেন না৷ যেমন আজও আবার সেটা হাড়ে হাড়ে বুঝছে ও৷ আবীরকে ও নিঃস্বার্থ ভাবেই ভালোবেসে গেছে চিরকাল৷ হোক না একতরফা প্রেম, তবুও তার মঙ্গল কামনা করতে একদিনও ভোলেনি ও৷ তবুও আবীরের এই পরিণতি আজ? গাড়ি অ্যাক্সিডেন্ট করে একটা পা বাদ চলে গেল মানুষটার? তাও আবার শ্রুতির চোখের সামনেই৷ শ্রুতিরই নার্সিং হোমে৷ এটা তো শ্রুতিই মানতে পারছে না৷ তাহলে সে কীভাবে মানবে? না, শ্রুতি যাদের ভালো চায় তাদের কারোর ভালো হয় না৷ না আবীর, না দেবরূপ, না শম্পাদি৷ আজ শম্পাদি বোধ হয় ওর জন্যই বিপদে পড়তে চলেছে৷ শ্রুতির মনটা বরাবরই বেয়াড়া আর অবুঝ৷ বিশেষ করে আবীরের ব্যাপারে৷ তাই যেদিন ও প্রথম শুনল আবীর এখানকার পানসে আর কষটে মারা খাবার খেতে পারছে না, সেদিন কিছুটা ঝুঁকি নিয়েই আবীর-এর প্রিয় আলুপোস্ত নিয়ে এসেছিল নিজের হাতে রান্না করে৷ কলেজে পড়তে এটা শুনেছিল শ্রুতি যে, আলুপোস্ত তার বড্ড প্রিয়৷ শম্পাদির ডিউটি ছিল সেদিন ওর ঘরে৷ তাই কিছুটা জোর করেই খাবারটা গুঁজে দিয়েছিল ও৷ ভেবেছিল শম্পাদি ঠিক ম্যানেজ করে খাইয়ে দেবে তাকে৷ কিন্তু না, শম্পাদি পারেনি৷ খাবারটা সে খেলেও ধরা পড়ে গেছে শম্পাদি৷ এবার এটার জল কতদূর গড়াবে কে জানে!

আকাশে আস্তে আস্তে আলো ফুটছে, পাখির কিচিমিচি জানান দিচ্ছে যে রাত এবার শেষ৷ শ্রুতি ধীরে ধীরে বিছানায় উঠে বসল৷ জল ভরা চোখে তাকাল দেওয়ালে টাঙানো শ্রী কৃষ্ণের বড়ো বাঁধানো ছবিটার দিকে৷ অস্ফুটে বলল— ‘হে ভগবান সব কষ্ট শুধু আমায় দাও, কিন্তু আমার কাছের লোকগুলোকে আর কষ্ট দিও না, প্লিজ দিও না৷’

—‘মাম, ওরা তখন বলছিল তুমি নাকি মারা যাবে? তুমি নাকি আমায় ছেড়ে চলে যাবে?’ এটা কি সত্যি মাম? কেন তুমি চলে যাবে? মারা যাওয়া মানে কি মাম? স্টার হয়ে যাওয়া তাই না?’

বছর সাতেকের বাচচা ছেলেটার মাথায় অপার স্নেহে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল তার মা৷ এবার থামল পলকের জন্য৷

—‘কে তোকে বলেছে এসব?’

—‘ওই তো ওরা বলছিল৷ আমি শুনতে পেয়ে গেছি৷ তুমি স্টার হয়ে যাবে না তো মাম?’

—‘আমি স্টার হয়ে গেলে তোর খুব কষ্ট হবে না রে?’

—‘হ্যাঁ, হবেই তো৷ তুমি না থাকলে কে আমায় এভাবে ভালোবাসবে বল? কে আমার কান্না পেলে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দেবে বল? কে ঘুমানোর সময় আমায় ছুঁয়ে থাকবে বল?’

মায়ের শুকনো মুখটা কালো কষ্টের ছায়ায় ঢেকে গেল৷ বাচচা ছেলেটার চুল ঘেঁটে দিয়ে কান্না চেপে বলল— ‘আছে একজন৷ যে তোকে আমার মতো করেই ভালোবাসবে৷ আমার মতো করেই ছুঁয়ে থাকবে সারা জীবন৷ তোর সব কান্না সে মুছিয়ে দেবে৷’

—‘সে কে মাম?’

—সে একটা পরী৷ সে একদিন আসবে তোর কাছে৷ লাল বেনারসি শাড়ি পরে, ফুলের মুকুট পরে সে আসবে৷ সারাজীবন সে তোর কাছে থাকবে তোকে ভালো বাসার জন্য৷’

—‘সে কবে আসবে মাম? সে কোথায় আছে?’

—‘এই তো সোনা, সে তুমি আর একটু বিগ বয় হলেই চলে আসবে৷ সে তো এখানেই আছে৷ খুব আশে পাশে কোথাও৷ তুমি যেদিন তাকে খুঁজে পেয়ে যাবে সেদিনই সে চলে আসবে...৷’

না, আজ পর্যন্তও তাকে খুঁজে পায়নি আবীর৷ মা হারা ছেলেটার অবচেতন মনে ভালোবাসা খুঁজে পাবার যে সুপ্ত ইচ্ছাটা ছিল, সময় আর পরিস্থিতির প্রভাবে তার বিকাশ হয়তো ঘটেছিল সম্পূর্ণ অন্য ভাবে কিন্তু তাতে কিছু হয়নি৷ আবীর যেমন একা ছিল তেমনই একা রয়ে গেছে৷ এই এত বছরের জীবনে সম্পর্ক তো কম হয়নি৷ কিন্তু মা যেমনটা বলেছিল তেমন ভালোবাসার ছোঁয়া কখনো খুঁজে পায়নি আবীর৷ কোনো সম্পর্ক তো দু-বছরের বেশি টেকেইনি ওর৷ কখনো আবীর নিজেই বেরিয়ে এসেছে সম্পর্ক থেকে নানা ইগো, আর খারাপ লাগার কারণে৷ আর কখনো বা অপর দিকের মানুষটা চলে গেছে কিছু না কিছু দোহাই দিয়ে৷ আসল ব্যাপার হচ্ছে সত্যিকারের ভালোবাসাটা কোনোদিন আসেনি ওর কাছে৷ আজ প্রায় দু-বছর হল আবীর সিঙ্গেল৷ আসলে সম্পর্ক, প্রেম এই শব্দগুলো এখন খুব ভিত্তিহীন লাগে ওর কাছে৷ আবীর জানে এখনও বহু মহিলা আকৃষ্ট ওর প্রতি৷ কিন্তু আবীর-এর আর ভালো লাগে না কাউকে৷ কারণ সবাই তো এক৷ সম্পর্ক মানে দু-দিন একসাথে পাব-এ যাওয়া, পার্টিতে নাচা, পাঁচতারা হোটেলে ডিনার করা৷ তার পর সব শেষ৷ অবশ্য এখন ওর খ্যাতি, টাকা পয়সাকে ভালোবেসে কেউ হয়তো থেকে যেতেও পারে সারাজীবন, কিন্তু সেই ভালোবাসার ছোঁয়াটা কি দিতে পারবে সে?

মা মারা যাবার মাস খানেক আগে সেই যে পরীটার কথা বলে গেছিল, সেটা তরুণ বয়সের গরম রক্তে চাপা পড়ে গেলেও মুছে যায়নি কোনোদিনই৷ সেই জন্যই তো বোধ হয় সেই এক ফোঁটা নিঃস্বার্থ স্নেহের ছোঁয়ার জন্য এত কাঙাল পানা করে মনটা আজকাল৷

মায়ের সেই কথাগুলো নতুন করে মনে পরার সূত্রপাত ঠিক এই জায়গাটা থেকেই, মানে এই নার্সিং হোম থেকেই৷

গত বছর হঠাৎ যখন শহরে ধেয়ে এল কালাজ্বর, তখন তিমিরদাও ভর্তি হয়েছিল এখানে৷ তিমিরদা আবীরের জ্যাঠতুতো দাদা, কিন্তু বড্ড ভালোবাসে ওকে৷ তাই ওকে দেখতে প্রথমবার এখানে পা রেখেছিল আবীর৷ সেই সময়েই চোখ চলে গেছিল পাশের বেডে৷ আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে আছে একটা ছেলে আর ভীষণ স্নেহে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে নার্স৷ অপার মমতা যেন ঝরে পড়ছে তার দু-চোখের তারা থেকে৷ নার্সের মুখটা চেনা৷ কলেজের সেই ভীতু ভীতু মেয়ে শ্রুতি৷ তবে এখন আর তেমন ভীতু ভাবটা নেই চোখে৷ অনেক পরিণত সে এখন৷ কেমন মিষ্টি যুঁই ফুলের গন্ধ যেন ভেসে আসছে তার শরীর থেকে৷ দৃশ্যটায় কী যেন একটা ছিল৷ কয়েক মুহূর্তের জন্য চোখ সরাতে পারল না আবীর৷ ওই গন্ধটায় কেমন যেন একটা মাদকতা রয়েছে৷

—‘তিমির দা, পাশের বেডে ছেলেটাকে নার্স তো খুব টেক কেয়ার করছে৷ তোকেও দেখছে তো এভাবে?’ প্রশ্নটা করেই ফেলেছিল আবীর৷

—‘হ্যাঁ রে ভাই৷ এটা নামি নার্সিং হোম৷ যত্ন আত্তির কোনো ত্রুটি নেই৷ তবে এখানে যাকে দেখেছিস, উনি তো ওই নার্সের বর৷ তাই ওনার সাথে কি আর তুলনা...’

তিমিরদা’র কথাগুলো হঠাৎ অপ্রত্যাশিত ভাবে কেমন যেন ধাক্কা মারল আবীরকে৷ বাড়ি ফিরে এসেও বার বার চোখের সামনে ভেসে উঠেছিল একটা মমতা মাখানো হাতের স্পর্শ, ঠিক যেমনটা মা বলেছিল অনেক বছর আগে৷

পলকের জন্য হঠাৎ মনে হয়েছিল ওই স্পর্শ, ওই মমতা আসলে তো আবীরেরই হতে চেয়েছিল৷ মন কে সঙ্গে সঙ্গে কষে শাসন করেছিল সেদিন আবীর৷ ছি! এগুলো কি ভাবনা৷ শ্রুতি একজন পর স্ত্রী৷ কিন্তু মন যে বড়ো বেয়ারা৷ শত শাসন সত্ত্বেও মাঝে মাঝেই সেই দৃশ্য ভেসে ওঠা চোখের সামনে কিন্তু থামেনি৷

নিয়তি বড়ো বিষম বস্তু৷ তাই আজ আবার আবীর এই নার্সিং হোমেই৷ আজ ও পঙ্গু৷ পা হারানোর পর প্রথম যখন চেতনা এল আবীরের, উফফ সে কী অসহ্য যন্ত্রণা৷ আবীরের আর্ত চিৎকারে ছুটে এল অনেক ডাক্তার, নার্স৷ কিন্তু ওর চোখ খুঁজছিল এক জোড়া হাত৷ এখন যে বড়ো দরকার সেই স্পর্শ৷ ঘুমের ইঞ্জেকশান দেওয়া হল আবীরকে৷ চোখ বুজতে বুজতে মনে হল সেও এসে দাঁড়িয়েছে যেন৷ সেই যুঁই ফুলের গন্ধটা ছুঁয়ে যাচ্ছিল আবীরকে৷

তারপর সেদিন ঘটল সেই অদ্ভুত ঘটনা৷ লাঞ্চের থালায় হঠাৎ আলু পোস্ত৷ না কোনো ভাবেই মিল নেই এখানকার বিস্বাদ খাবারগুলোর সাথে৷ মনে হচ্ছে কেউ যেন খুব যত্ন নিয়ে বানিয়েছে খাবারটা শুধু আবীরের জন্যই৷ মনে মনে সন্দেহটা দানা বেঁধেছিল তখনই৷ ডিউটিরতা নার্স শম্পাকে চেপে ধরেছিল ও৷ প্রথমে ভুল ভাল যুক্তি দিয়ে রেহাই পেতে চাইলেও গতকাল আবীরের জেরার মুখে পড়ে স্বীকার করেছে সব৷ সে শম্পারই বোন৷ আর খাবারটা তারই বানানো ছিল৷ আসলে শুধু আজ নয় বিগত আট বছর ধরে সে নিঃশব্দে ভালোবেসে গেছে আবীরকে, কিছু পাবার আশা ছাড়াই৷ নিজের বিবাহিত জীবনও কাটায়ইনি স্বাভাবিক ভাবে৷ আজ একাকী বিধবা মেয়েটা দাঁতে দাঁত চেপে নিজের জীবন সংগ্রাম চালাচ্ছে, তবুও আবীরের মঙ্গল কামনা করতে সে ভোলে না একদিনের জন্যও৷

না, এগুলো শোনার আর জানার পর থেকে আর নিজেকে সামলে রাখতে পারছে না আবীর৷ খুব অচেনা একটা অনুভূতি ছেয়ে রয়েছে ওর বুকের মধ্যে৷ কেবিনের এসিটা বন্ধ করল ও৷ ভালো লাগছে না আর মেকি শৈত্য৷ খুলে দিল জানালা৷ আসুক খোলা হাওয়া, আজ যে প্রাণ খুলে নিঃশ্বাস নেবার দিন৷

টিক টিক... দরজায় মৃদু টোকার শব্দ৷

—‘কাম ইন’... নিজের একপেশে সাহেবি কায়দায় বলল আবীর৷ ভিতরে এল সে৷

—‘আপনি আমায় ডেকেছেন স্যার?’

—‘হুম৷ সিস্টার শম্পার হেল্প নিয়ে আমার লাঞ্চে তুমি নিজের রান্না পাঠিয়ে দিয়েছিলে? কি ভাবলে? ধরা পরবে না? তুমি জান না এটা বে আইনি৷ তুমি জান আমি কি করতে পারি এর জন্য?’

—‘স্যার আপনি আমাকে যা ইচ্ছা শাস্তি দিন৷ দয়া করে শম্পাদি-কে ছেড়ে দিন৷ ওর কোনো দোষ নেই৷’ গলা কাঁপছে মেয়েটার৷

খুব কষ্ট করে হাসি চাপল আবীর৷ আবার গম্ভীর গলা করে বলল— ‘ছেড়ে দিতে হবে তোমাদের? বাঃ! কী সুন্দর৷’ কয়েক মুহূর্ত থামল ও৷ তারপর আবার বলল—

—‘ঠিক আছে ছেড়ে দিতে পারি৷ কিন্তু একটা শর্ত আছে৷’

—‘বলুন স্যার৷’

—‘একদিনের ওই একমুঠো আলু পোস্ততে আমার হবে না৷ সারা জীবন আলু পোস্ত সাপ্লাই করে যেতে হবে আমাকে৷’

—‘মানে?’ ভেঙে পড়ছে আস্তে আস্তে মেয়েটা৷

—‘আমার মা ছোটোবেলায় আলু পোস্ত করে দিতেন আমায়৷ আমার খুব ভালো লাগত৷ তার পর মা চলে গেলেন৷ আর আমিও খুঁজতে লাগলাম এমন একটা মেয়ে যে আলু পোস্ত রান্নায় পারদর্শী৷ কিন্তু তেমন কাউকে আজ অবধিও খুঁজে পেলাম না৷ কিন্তু এবার যখন এমন একজনকে পেয়েছি তাই আর ছাড়তে পারব না, নিজের বউ করে বাড়িতেই রেখে দেব৷’

—‘এসব আপনি কি বলছেন স্যার? কেন এভাবে অপদস্থ করছেন আমায়?’ ঝরঝর করে কাঁদছে মেয়েটা৷

আবীরও এবার সিরিয়াস হল৷ গলা নামিয়ে বলল— ‘কেন রে? যাকে দূর থেকে ভালোবাসতে পারিস, তাকে কাছে টেনে ভালোবাসতে পারবি না? নাকি আমি এখন পঙ্গু বলে আপত্তি তোর আমায় বিয়ে করতে?’

বাচচা মেয়ের মতো ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে এখন কাঁদছে শ্রুতি৷ আবীর তবু বলে চলেছে— ‘আজকাল পা বাদ গেলে কেউ অথর্ব হয় না সেটা তুইও জানিস৷ নকল পা মানুষের স্বাভাবিক জীবনকে অব্যাহত রাখে৷ কিন্তু দিনের শেষে? দিনের শেষে আমার যে একটা হাত দরকার রে যাকে ভর করে আমি চলব৷ যে হাতের ছোঁয়াটা শুধু আমার হবে৷ কিরে ধরবি না আমার হাত?’ হাত বাড়িয়ে দিয়েছে আবীর৷ শ্রুতি কাঁপছে তির তির৷

—‘কিন্তু... কিন্তু... বামন হয়ে যে চাঁদ ধরা যায় না৷’

—‘পুরোনো কথায় অভিমান করে এখনও দূরে সরে থাকবি? ক্ষমা করবি না পঙ্গু লোকটাকে?’

আস্তে আস্তে হাত বাড়াল শ্রুতি৷ আলতো করে ছুঁল আবীরের হাত৷ দু-চোখের জলে থই থই মেয়েটার৷

জানলা দিয়ে ছুটে আসছে ঠাণ্ডা ভেজা হাওয়া৷ জুঁই ফুলের গন্ধ মিশে যাচ্ছে আবীরের নিশ্বাসে৷ কী সুন্দর লাগছে সব কিছু এই বিকালটায়৷ গুড়গুড় করে ডেকে উঠল মেঘ আকাশ কাঁপিয়ে৷ খোলা জানলা দিয়ে ছুটে আসা বৃষ্টির ফোঁটা ভিজিয়ে দিচ্ছে ওদের৷

—‘কালবৈশাখী!’ অস্ফুটে বলল শ্রুতি৷

—‘না কাল নয়, আমার আজ বৈশাখী চাই... জীবনের অনেকটা সময় নষ্ট হয়ে গেছে৷ আর নয়, একটুও নয়৷ বসন্তকে যে এবার বেঁধে রাখার পালা!’ অন্তরের অন্তঃস্থল চিরে শব্দ হয়ে বেড়িয়ে এল আবীরের সবটুকু ভালোবাসা৷

___

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%