নির্বেদ রায়

আপাতত যে খুনিটির কথা নিয়ে আমরা আলোচনা করতে চলেছি তার বয়স হল তিন বছর। ওই তিনবছর বয়সে সে মোটমাট স্ত্রী-পুরুষ মিলিয়ে তেষট্টি জন মানুষকে খুন করেছিল আর মালয়দেশের বিস্তীর্ণ রবারক্ষেত জুড়ে সৃষ্টি করেছিল ত্রাসের রাজত্ব। গোটা অঞ্চলে ওই তিনবছরের শিশু হয়ে উঠেছিল একক বিভীষিকা।
কিন্তু বৃত্তান্ত শোনার আগে প্রথমেই যে প্রশ্নটা মনে জাগে তা হল, 'আর পাঁচজন শিশুর মতো ছোটখাটো দুষ্টুমি করার বদলে মাত্র তিন বছর বয়সেই সে কেন হয়ে উঠল একেবারে পাকা খুনি?'
সুতরাং গোড়াতে সেই উত্তরটা একবার খোঁজার চেষ্টা করা যাক—
ভদ্রলোকের বিস্তর পয়সা ছিল ঠিকই, কিন্তু বুদ্ধি ছিল কি? থাকলেও নিশ্চয়ই দুর্বুদ্ধি। নইলে কেউ কখনো ছেলের আবদার মেটাতে বাঘ কেনে? আর যদি বা কেনে তাহলে এমন অসতর্ক কি হয়, যার মাশুল গুনতে নয় নয় করে বলি হতে হয় তেষট্টিটা তাজা মানুষকে? ঘটনাটা ঘটেছিল এইরকম—
''এই অঞ্চলেরই এক 'সুলতান' তাঁর ছেলের বায়নাক্কা সামলাতে আর কিছুটা নিজেকে জাহির করার জন্যও বটে, একটি বাঘের বাচ্চা কিনে ফেলেন। তাঁর হয়তো স্থির ধারণা ছিল যে বাঘটি তাঁর মতো একজন পুরুষসিংহের আশেপাশে ক'দিন ঘুরলেই ক্রমে ক্রমে নেহাতই একটা পুষি বেড়ালে পরিণত হবে, কিন্তু কার্যক্ষেত্রে দেখা যায় বাঘের বাচ্চাটার সেরকম কোনো নিরীহ ধারণা ছিল না। ফলে শান্তশিষ্ট হয়ে দুধ-ভাত খাবার বদলে সে একদিন সুযোগ-সুবিধা বুঝে তার প্রভুপুত্রকেই খানিক আদর-আপ্যায়ন করে শেষে চম্পট দেয়।
বাঘের আদর বলে কথা। সে আদরের ধাক্কা সামলানো সহজ নয়। ছেলেটি অবশ্য তার বাপের পয়সা আর নিজের রক্তের জোরে শেষপর্যন্ত সামলে উঠল, কিন্তু শখের জন্তুটার এমন বেয়াদবিতে সুলতান গেলেন ভীষণরকম চটে। কয়েকজন স্থানীয় শিকারিকে তিনি নিযুক্ত করলেন বাঘটাকে মারার জন্য। কিন্তু বাঘ-শিকারি সবাই হয় না। ওই শিকারিদেরই একজন তাই বাঘটার নাগাল পেয়ে যে গুলি ছোঁড়ে সেটা জন্তুটার কাঁধ ছুঁয়ে চলে যায়। বাঘ আহত অবস্থায় পালায়।
আহত বাঘের মতো সাংঘাতিক প্রাণী আর নেই। এই ঘটনার পরেই মালয়ের রবারক্ষেতে মূর্তিমান শয়তানের মতো হানা দিতে শুরু করে আহত জন্তুটা। তখন তার বয়স মাত্র তিন বছর!
মানুষের সংস্পর্শে বেশ কিছু সময় কাটাবার জন্যই হোক কি নিজের বন্য অনুভূতির জোরেই হোক, বাঘটা কিন্তু মানুষের গতিবিধি সম্বন্ধে প্রায় সবকিছুই জানে। মোটামুটি এই ভাবেই সে এখনো এই অঞ্চলে একটানা হত্যাকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে।''—এক নাগাড়ে কথাগুলো বলে থামল জ্যাক ক্রডেন।
টেবিলের অপর প্রান্তে বসে যে মানুষটি এতক্ষণ একমনে কথাগুলো শুনে যাচ্ছিল, তাঁর নাম উইলসন মেনার্ড। শিকারই তাঁর পেশা, নেশাও বটে। ক্রডেনের কথা শেষ হতে মেনার্ড তার পাশে রাখা রাইফেলটায় একবার হাত বুলিয়ে নিল। তারপর খানিকক্ষণ চুপ থেকে প্রশ্ন করল—'বাঘটা পুরুষ না স্ত্রী, সে বিষয়ে কিছু জানেন?'
—'পুরুষ।'
হয়তো আরো কিছু প্রশ্ন ছিল মেনার্ডের, কিন্তু করা হয়ে উঠল না। তাঁবুর পরদা সরিয়ে ক্রডেনের কাফ্রী অনুচরটি ঢুকে খবর দিল—'আয়োজন সম্পূর্ণ; এখন হুজুররা মর্জি করলেই বেরোতে পারেন।' দুই শিকারি নিজেদের মধ্যে একবার দৃষ্টি বিনিময় করে নিজের নিজের বন্দুক হাতে উঠে দাঁড়াল। গন্তব্যস্থল 'কামপঙ' গ্রাম।
পরের ঘটনা বরং মেনার্ডের মুখেই শোনা যাক—
'কেলান গ্রাম থেকে রওনা হবার ঘণ্টাখানেকের মধ্যে আমরা কামপঙে এসে পৌঁছুই। এই গ্রামটিতেই বাঘ তার শেষ শিকার মেরেছে। গ্রামটা মালয়ের আর পাঁচটা প্রতিবেশী গ্রামগুলোর মতো। সরু একটা নদী গ্রামের এক পাশ দিয়ে বয়ে গেছে, অন্য দিকে গ্রামের সীমানা পার হলেই ঘাসঝোপে ভরা রবারবনের শুরু।
গ্রামে ঢোকার আগে থেকেই কান্নার আওয়াজ ভেসে আসছিল। আমরা আসার মাত্র ঘণ্টা কয়েক আগেই বাঘটা এখানে একজন স্ত্রীলোককে মেরেছে। সমস্ত গ্রাম জুড়ে শোকের ছায়া, সেই সঙ্গে গ্রামবাসীদের চোখেমুখে চাপা আতঙ্কের ছাপও স্পষ্ট। আমরা গিয়ে পৌঁছতে সবাই এসে ঘিরে ধরল। মোড়লের মুখে শুনলাম স্ত্রীলোকটি যখন কাপড় কাচতে নদীর ঘাটে এসেছিল, বাঘ তখনই তাকে মারে।
সময় নষ্ট না করে আমি আর ক্রডেন দুজনেই একমত হয়ে ঠিক করলাম যে এখনি হত্যাকাণ্ডের জায়গাটা একবার দেখে আসা দরকার।
গ্রামের কয়েকজন যুবক আর ওই অঞ্চলের এক অভিজ্ঞ পথপ্রদর্শককে সঙ্গে নিয়ে নদীর দিকে এগোলাম। গ্রামের লোকজনের কথামতো পাড় ধরে ফার্লং-টাক এগিয়ে চোখে পড়ল স্ত্রীলোকটির দেহাবশেষ। কাছাকাছি মাটির উপর চারিদিকে ছড়িয়ে রয়েছে বাঘের পায়ের ছাপ। 'মড়ি' আর পায়ের ছাপ পরীক্ষা করে কয়েকটা খবর জোগাড় করা গেল—
প্রথমত, মাঘের সামনের ডান পায়ের থাবার ছাপটা যেরকম অস্পষ্ট, তাতে বুঝতে অসুবিধা হয় না যে সেটা অন্য পায়ের তুলনায় কমজোরি, সম্ভবত কোনোরকম আঘাত পাওয়ার জন্যই। 'মড়ি' পরীক্ষা করে বুঝলাম বাঘটার একটা কষের দাঁত ভাঙা। কিন্তু সবচেয়ে বড় কথা হল তার আকার—সামনের পায়ের সঙ্গে পিছনের পায়ের ছাপের ব্যবধানটুকু মেপে যা বুঝলাম, তাতে বাঘটা অন্তত সাড়ে আট থেকে ন'ফুটের মাপের তো হবেই। প্রকাণ্ড বাঘ। পছন্দ বটে সুলতানের!
জায়গাটার চারপাশে অনেকগুলো ছোট-বড় রবার গাছ ঘিরে রয়েছে। তার মধ্যে মজবুত দেখে গাছ বেছে নিয়ে মাচা বাঁধবার ব্যবস্থা করতে বললাম। গ্রামে ফিরে 'টোপ'-এর জন্য একটা ছাগলও জোগাড় হয়ে গেল।
দুপুরের মধ্যে বাকি আয়োজনটুকু সেরে ফেলে সামান্য বিশ্রাম নিয়ে যখন আবার নদীর পাড়ে গিয়ে দুজনে উপস্থিত হলাম, সন্ধ্যা হতে তখনও কিছু দেরি আছে। আমি সঙ্গে নিয়েছি পয়েন্ট ফোর জিরো ফোরের রাইফেল, ক্রডেনেরটা সম্ভবত পয়েন্ট ফাইভ জিরো জিরো। দুটোই ভারী বন্দুক। আলাদা করে আলো নেবার দরকার হয়নি, দুটো বন্দুকেই আঁটা আছে একটা করে জোরালো টর্চ। ছাগলটাকে গাছে বেঁধে দুজনে মাচায় গিয়ে উঠলাম।
অন্ধকার নামছে ঘন হয়ে। আরও ঘন বলে মনে হচ্ছে কারণ আকাশে চাঁদ ওঠেনি। আস্তে আস্তে অস্পষ্ট হয়ে আসছে নদীর পাড়, দূরের গাছগুলো, নীচের ঘাসঝোপ। আর সেইসঙ্গে ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে রাতের অরণ্যের ভাষা। নাম-না-জানা রাত-জাগা পাখিরা অদ্ভুত স্বরে ডেকে উঠছে মাঝে মাঝে; শুকনো পাতা খসে পড়ার শব্দে চমকে উঠি—ওই বুঝি বাঘ এল! চোখ যেখানে বিকল, কান সেখানে বড় বেশি খোলা রাখতে হয়, সমস্ত মন যেন গিয়ে জড়ো হয়েছে কানে। সময় আর কাটে না।
বেশিক্ষণ চুপচাপ এইভাবে বসে থাকলে একটা ঘোরের মতো এসে যায়। কতক্ষণ সেভাবে কেটেছিল খেয়াল নেই। হঠাৎ একটা কর্কশ চিৎকারে চমকে উঠলাম। ছাগলটা ডাকছে!
পলকে তন্দ্রা উধাও, সমস্ত শরীর টানটান। ক্রডেনের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, সেও উঠে বসেছে; রাইফেলের 'সেফটি ক্যাচ'-এ চেপে বসেছে বুড়ো আঙুল। আশ্চর্যের কিছু নেই, জঙ্গলের যাদের অন্তত কিছুদিনের চেনা পরিচয় তারা এই ইঙ্গিতগুলো জানে, বোঝে।
জঙ্গল কখনো মানুষকে ফাঁকি দেয় না, তার ভাষায় সে একবার হলেও সাবধান করে দেয়। তাই জঙ্গলে চলাফেলা করতে হলে এই ভাষা শেখা বড় প্রয়োজন।
তারস্বরে ডেকে চলেছে ছাগলটা, দড়ি ছেঁড়বার চেষ্টা করছে প্রাণপণে, আর আমরা দুজনে প্রায় নিশ্বাস চেপে সেই অন্ধকারের মধ্যে যতদূর সাধ্য চোখদুটোকে মেলে ধরবার চেষ্টা করছি ঘাসঝোপ আর রবার গাছগুলোর আশেপাশে। সময় কাটছে, যেন প্রতি পল এক-একটা যুগ।
তবু সেইভাবেই সময় কেটে গেল। ঘাসঝোপগুলো চোখের সামনে ঝাপসা থেকে একটু ফিকে-স্পষ্ট হয়ে আসতে মাথা তুলে আকাশের দিকে তাকালাম। আকাশে তখন ধূসর-শ্লেটের রং ধরেছে। একটু পরেই পুব আকাশে রং-এর ছোঁয়া লাগল।

মাচা থেকে নেমে এসে ছাগলটাকে খুলে নিলাম। তারপর আশেপাশে একটু চোখ বুলিয়ে নিতে গিয়েই অবাক হলাম বেশি। কাল রাতে বাঘ এসেছিল। আর শুধু এসেছিল বললে ভুল হবে, আমাদের গাছটাকে বেড় দিয়ে, ছাগলটাকে বেশ ভালো করে দেখেশুনে সে চলে গেছে, অথচ ছোঁয়ার চেষ্টাও করেনি। তখনই বুঝলাম, এ বাঘ ভোগাবে।
ভোগালোও বটে—একদিন নয়, দুদিন নয়, পরপর পাঁচ দিন গাছের নীচে 'টোপ' বেঁধে মাচায় বসে আমরা বন্দুক হাতে সারারাত দু-চোখের পাতা টানটান করে অপেক্ষা করেছি, আর রাত শেষ হলে যথারীতি গাছ থেকে নেমে ছাগলটাকে খুলে নিয়ে ক্লান্ত শরীর কোনোরকমে টানতে টানতে গ্রামের কুটীরে ফিরেছি। বাঘ ভুলেও আর আসেনি, অথচ যেন আশেপাশে থেকেই মজা দেখেছে। সেইরকমই অন্তত মনে হয়েছে আমাদের।
শেষে ছ'দিনের দিন মরিয়া হয়েই মতলব ভেঁজেছি আমি আর ক্রডেন মিলে। সাঙ্ঘাতিক মতলব! শিকারের নিয়ম না মেনে, প্রায় আত্মহত্যার ঝুঁকিই একরকম নিতে হয়েছে আমাদের। মনে শুধু এইটুকু ভেবে সাহস এনেছি যে, যে বাঘ নিজে নিয়মকানুন মেনে চলে না, তাকে মারতে গেলে অত ব্যাকরণের ধার ধারলে চলবে না। একটু বেপরোয়া হতেই হবে। তাই ছাগলের টোপে যখন বাঘ আসছে না, তখন ঠিক করেছি আমরাই টোপ হ'ব পালা করে।
এইখানে একটা কথা বলা দরকার—মনে রাখতে হবে যে শিকারের যত ক'টা চালু নিয়ম আছে তার মধ্যে বোধহয় সবচেয়ে বিপজ্জনক হল মাটিতে দাঁড়িয়ে শিকার করা। কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে বিপদ তার চেয়ে ঢের বেশি, কারণ জমিতে দাঁড়িয়ে বা জানোয়ারের পিছনে ধাওয়া করে শিকারি সাধারণত শিকার করে দিনের বেলায়, আমাদের বেলায় সেটা অন্ধকার রাত। দু-নম্বর কারণ, বাঘটা একটা অসাধারণ ধূর্ত মানুষখেকো, আর সবচেয়ে বড় কথা, যে লোকটা মাটিতে ঘুরে বেড়াবে তাঁর কাছে কোনো অস্ত্র থাকবে না, থাকবে মাচার উপর বসে যে তাঁকে পাহারা দেবে তাঁর কাছে; কারণ বন্দুক হাতে থাকলে বাঘটা যে আর ত্রিসীমানায় ঘেঁষবে না, এ ব্যাপারে আমরা তখন নিশ্চিত।
'টস'-এ হেরে আমি প্রথম মানুষ-টোপ হিসাবে নির্বাচিত হলাম। বন্দুক আর টর্চ সম্বন্ধে বন্ধু ক্রডেনকে পরীক্ষা করে নিঃসন্দেহ হতে বলে গাছ বেয়ে নীচে নেমে গেলাম। পেশাদার শিকারির জীবন বেছে নেওয়ার পর অনেকবার বিপদের মুখোমুখি হয়েছি আমি, মৃত্যুকে খুব কাছ থেকে দেখেছি বহুবার, কিন্তু জীবনে এত ভয় কোনোদিন পাইনি। এ ভয়, অসহায় মানুষের ভয়। জানি, মাচার উপর থেকে পলকহীন সতর্ক চোখে চেয়ে আমায় পাহারা দিচ্ছে ক্রডেন; এও জানি যে তার চোখের পাহারা আর বন্দুকের নিশানা এড়িয়ে আমার কাছে এগোতে পারবে না কোনো জন্তুই, কিন্তু তবু মাটিতে পা দেওয়ার সাথে সাথে বড্ড অসহায় বোধ করছি নিজেকে—কারণ, আমি জানি বাঘ বলতে কি বোঝায়।
ঝাপসা অন্ধকারের মধ্যে নদীর ধার দিয়ে পায়চারি করতে করতে এই কথাগুলোই মনে আসছিল বারবার। মিনিটে-মিনিটে ঘড়ি দেখছি, একঘণ্টা সময় যেন আর কাটতেই চায় না।
একসময় অবশ্য কাটল—পালা শেষ করে উঠে এলাম মাচার উপরে। স্বীকার করতে আপত্তি নেই, কি স্বস্তি যে পেলাম তা বলে বোঝানো যাবে না। ক্রডেন ভাবলেশহীন মুখে গাছ বেয়ে ততক্ষণে নীচে নেমে গেছে—এবার ওর পালা। টর্চ আর বন্দুক পরীক্ষা করে নিয়ে আমিও পাহারায় বসলাম সতর্ক হয়ে। ক্রমে পরের ঘণ্টাটাও কেটে গেল একসময়—ক্রডেন উঠে এল গাছে, কিন্তু কোথায় বাঘ? একটা বন-বেড়ালের লেজও চোখে পড়ল না।
একে ওই দু-আড়াই ঘণ্টা ধরে প্রচণ্ড মানসিক চাপ, তার উপর হতাশা। ভোরের অপেক্ষা করতে-করতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি বুঝতেও পারিনি। বুঝলাম পাঁজরে ক্রডেনের কনুই-এর গুঁতো খেয়ে—'দেখ, দেখ, ওই দেখ!'
ঘুম উধাও। রাইফেল হাতে নিয়ে ক্রডেনের আঙুল বরাবর তাকিয়ে কিন্তু প্রথমে কিছুই নজরে এল না। বোধহয় ঘুম-চোখ বলেই। একটু সয়ে যেতে অবশ্য চোখে পড়ল—না, বাঘ নয়; একটি মেয়ে, একটি মালয়ী তরুণী।
এই দৃশ্য দেখব ভাবিনি। মানুষখেকোর ভয়ে যেখানে দিনমানে লোকে একলা পথ চলে না, সন্ধের আগে দরজা-কপাট পড়ে যায়, গ্রাম খাঁ-খাঁ করে, সেখানে শেষরাতে একা একটি মেয়ে চলেছে বনের পথ দিয়ে? বুঝলাম, নিতান্ত কোনো প্রয়োজনের তাগিদেই পথে বেরোতে হয়েছে তাঁকে।
মেয়েটি আসছে আমাদের গাছের দিকেই—তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরার তাড়ায় কোনোদিকে নজর নেই তাঁর। বোধহয় 'কামপঙ' গ্রামেরই বাসিন্দা।
প্রায় গজ পঁচিশের মধ্যে সে এসে পড়েছে আমাদের গাছটার, এমন সময়ে তাঁর পিছনে খানিকটা দূরের ঘাসঝোপ হঠাৎ নড়ে উঠল। তারপর ঝোপের উপরে জেগে উঠল প্রকাণ্ড একটা গোল মাথা—বাঘ! মালয়ের নরখাদক শিকারের পিছু নিয়েছে।
নিজের অজান্তেই মুখ দিয়ে আওয়াজ বেরিয়ে আসছিল মেয়েটাকে সতর্ক করে দেওয়ার জন্য, ক্রডেনের হাতের চাপে কোনোরকমে সেটা সামলানো গেল। শিকারি জীবনের একটা মস্তবড় ভুল করে বসতে যাচ্ছিলাম, হয়তো যার জন্য সারাজীবন প্রায়শ্চিত্ত করে কাটাতে হত।
মেয়েটি ততক্ষণে আমাদের গাছের প্রায় দশ-পনেরো গজের মধ্যে এসে গেছে; হঠাৎ তাঁর অনুভূতি যেন বিপদ সম্পর্কে তাঁকে সতর্ক করে দিল। মেয়েটি পিছনে ঘুরে তাকাল। তারপরই আতঙ্কে দিশাহারা হয়ে সে চিৎকার করে ছুটল প্রাণপণে।
বাঘ শিকার হাতছাড়া করতে রাজি নয়। ঘাসঝোপের আড়াল ছেড়ে চাপা গর্জন করে সে তাড়া করল। কয়েকটা মাত্র লাফের ব্যাপার। কিন্তু তার আগেই গর্জন করে উঠল আমার আর ক্রডেনের বন্দুক। পরপর দুটো গুলি বিদ্ধ করল মানুষখেকোটাকে। মাটির উপর ছিটকে পড়ল তার ডোরাকাটা বিরাট দেহ।
কিন্তু সে কয়েকমুহূর্তের জন্য। অসাধারণ জীবনীশক্তির জোরে আবার উঠে দাঁড়াল বাঘ, তারপর মরণ-কামড় বসাতে ঝাঁপ দিল মেয়েটার দিকে। আরও চারটে গুলি! গড়াতে গড়াতে বাঘের দেহ গিয়ে থামল মালয়ী মেয়েটার প্রায় পায়ের কাছে। এবার স্পন্দনহীন নিশ্চল। মেয়েটি অবশ্য তার আগেই জ্ঞান হারিয়েছে।
বন্দুকের শব্দ শুনে গ্রামবাসীরা ততক্ষণে এসে পড়েছে। গাছ থেকে নেমে এলাম। তেষট্টিটা খুনের নায়ক কুখ্যাত নরখাদক শেষ অবধি মারা পড়েছে। গ্রামবাসী আনন্দে আত্মহারা। আমরা অবশ্য সেই আনন্দে পুরোপুরি যোগ দিতে পারলাম না, শরীর তখন আর বইছে না।
পরে বাঘটার মাপ নেওয়া হয়েছিল—পাক্কা আট ফুট ন'ইঞ্চি। আমার জীবনে এত বড় বাঘ আমি আর দেখিনি।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন