অবিন সেন
প্রতাপ কোনও ভাবেই সেই অর্থে চিন্তাশীল নয়। অধিকাংশ সিদ্ধান্ত সে তাৎক্ষণিক ভাবে নিয়ে থাকে। এর পিছনে কখনও কাজ করে ক্রোধ, কখনও অভিমান কিংবা প্রতিহিংসা। সর্বদাই সে তার আবেগের কাছে পরাধীন হয়ে থাকে। সেই কারণে, সব সিদ্ধান্ত যে তার ঠিক হয় তাও নয়। তা ছাড়া তার সিদ্ধান্তের উপরে কথা বলবে এই ক্ষমতা কার আছে? শঙ্কর তাকে শুধু একটু বুঝতে পারে। বোঝাতেও পারে অনেক সময়ে। ফলে, বেশ কিছু বিপদের হাত থেকে প্রতাপকে সে রক্ষা করতে পেরেছে।
আবার অনেক সিদ্ধান্ত যা শঙ্করের অগোচরে হয়েছে, তা বিপদ ডেকে এনেছে। যেমন হুরে শুঁড়ি ও তার সমস্ত পরিবারকে হত্যা করাটা শঙ্কর ঠিক মেনে নিতে পারেনি। এই হত্যা সাধারণ মানুষের মনে রাজার বিরুদ্ধে একটা বিরূপ ধারণার জন্ম দিয়েছে। এই বিষয়ে সে আরও তদন্ত করে সত্য ঘটনা ভালো করে জেনে বুঝে তারপরে সিদ্ধান্ত নেবার পক্ষপাতী ছিল। কিন্তু প্রতাপ এই বিষয়ে কোনও পরামর্শ দেবার অবকাশই রাখেনি। তবে শঙ্করও বুঝতে পেরেছে এই ঘটনার আড়ালে রাজ্যের আরও কোনও প্রভাবশালী মানুষের যোগ আছে। তাই সে তামিম নামের এক গুপ্তচরকে নিয়োগ করল। প্রতাপ যা করতে চাইছে করুক। মুখোশের আড়ালের মানুষটাকে খুঁজে বার করতে হবে।
ওড়িশা গমনের বিষয়ে শঙ্কর তাই প্রতাপকে আগে থেকে একটু সাবধান করে দিল।
- দেখো রাজা, ওড়িশায় আমাদের কোনও রকম হঠকারী সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত হবে না।
প্রতাপ হাসল। সন্ধ্যার পরে সে আকণ্ঠ মদ্যপানে ডুবে যায় আজকাল। সঙ্গে জুটেছে তান্ত্রিক কৃষ্ণহরি ভট্টাচার্য। লোকে বলে কানা কেষ্ট। প্রতাপকে সে বুঝিয়েছে, তন্ত্রসাধনায় শত্রুকে বশ করা যাবে। ফলস্বরূপ তার জন্য প্রতি সন্ধ্যায় উত্তম সুরার ব্যবস্থা। প্রতাপের দুর্গের নিকটেই একটি সুন্দর পুজোর গৃহ নির্মাণ হয়েছে। সন্ধ্যার পরেই সেখানে কানা ভট্টাচার্য কাঁসর ঘণ্টা বাজিয়ে পুজো অর্চনা করে। প্রতাপ রক্তিম পট্টবস্ত্র পরে সেখানে বসে থাকে। পুজো শেষে, রাত্রি পর্যন্ত সুরাপান চলে তাদের।
শঙ্কর এই কানা কেষ্টকে একেবারেই সহ্য করতে পারে না। তন্ত্র সাধনা বড়ো সর্বনাশের জিনিস। এই পথ ধরলে তলিয়ে যাবার বড়োই সম্ভাবনা। শঙ্করের তাই প্রতাপকে নিয়ে ভাবনা হয়। মাঝে মাঝে তাকে সে মনে করিয়ে দেয় তার আশৈশব লালিত স্বপ্নের কথা। সমগ্র বঙ্গে একচ্ছত্র অধিকার স্থাপনের কথা। তার কথা শুনে প্রতাপ উত্তেজিত হয়ে ওঠে। তখন তার মাথায় প্রভূত পরিকল্পনা খেলে যায়। সারা দিন সেই সব পরিকল্পনা সে তার মনের মধ্যে লালিত করে। কিন্তু সন্ধ্যা হলেই সে অন্য মানুষ। শঙ্কর ভাবে, প্রতাপকে এই অন্ধ কানাগলি থেকে কী ভাবে বার করে নিয়ে আসবে। শরৎকুমারীকেও সে এই কথা বলেছে। শরৎকুমারী একান্তে একদিন প্রতাপকে বলল,
‘ওগো, তুমি এই সব তন্ত্র মন্ত্র ছেড়ে দাও। এতে কারও ভালো হয় না।’
প্রতাপ নেশার ঘোরে হাসে। হেসেই উড়িয়ে দেয়। জড়ানো গলায় বলে, ‘সব তো তোমাদের ভালোর জন্যই করা। মা যশোরেশ্বরী আমাকে স্বপ্নে বলেছেন, আমি সারা বঙ্গের অধিপতি হব একদিন।’
তার কথা ভালো বোঝা যায় না। জড়িয়ে আসে।
কিছুক্ষণ পরে তার নাসিকাগর্জন শুরু হয়। এই মানুষের সঙ্গে কি কথা চলে! শরৎকুমারীর চোখ জলে ভরে আসে। কন্যাকে বুকে চেপে ধরে সে শুয়ে থাকে। চোখের জলে মধ্যরাত্রি কেটে যায়। দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে ভাবে এক সময়ে তার গর্বের সীমা ছিল না! স্বামীকে সে নিজের মতো করে, একেবারে নিজের মতো করে পেয়েছিল। ভালোবাসায় বেঁধে রাখতে পেরেছিল। শরৎকুমারী বুঝতে পারে, ভালোবাসার বাঁধন ক্রমশ আলগা হয়ে আসছে। বড়ো মানুষদের নারীসংসর্গ নিয়ে সে অনেক কথা শুনেছিল। তার পিতারও তো চারটি স্ত্রী। কিন্তু তার এমন সৌভাগ্যে কার যে নজর লাগল! শরৎকুমারীও চোখের জলে মা যশোরেশ্বরীকে ডাকে। রোদনের আবেগে তার শরীর কেঁপে কেঁপে ওঠে। কন্যা বিমলা বড়ো হচ্ছে। সে এখন সব বুঝতে পারে। তার ঘুম ভেঙে যায়। মায়ের বুকের কাছে পাখির নরম বুকের মতো তার শরীরটা কাঁপতে থাকে। তবু তো সে রাজ্যের মহারানি। নিজেকে সান্ত্বনা দিতে দিতে ঘুমিয়ে পড়ে শরৎকুমারী।
শঙ্কর তাই ওড়িশা যাত্রায় সহজেই সায় দেয়। কিছু দিন অন্তত প্রতাপকে তন্ত্র-মন্ত্র থেকে সরিয়ে রাখা যাবে।
ওড়িশার পাঠান সর্দার কতলু খাঁ তখন মোগলদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে। বাংলার সুবাদার আজিম খাঁ ওড়িশার এই বিদ্রোহ দমন করবার নিরন্তর চেষ্টা করছে। কিন্তু উৎকলবাসীর প্রবল প্রতিরোধের কাছে মোগলদের সেই চেষ্টা বার বার ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে।
প্রতাপকে কাছে পেয়ে কতলু খাঁ খুব খুশি হলেন। আন্তরিকতায় বুকে টেনে নিয়ে বললেন, ‘তোমার পিতা আমাকে খুব স্নেহ করতেন।’
কতলু খাঁর বয়স হয়েছে। পঞ্চাশের অধিক। কিন্তু বুকে এখনও তারুণ্যের তাকত। দুইজনের মধ্যে মোগলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বিষয়ে অনেক কথা হল।
শঙ্কর এক মনে তাদের কথা শুনছিল। কিন্তু প্রতাপ তার আসল উদ্দেশ্যের কথা খুলে বলল না কতলু খাঁর সামনে।
প্রতাপ মনস্থির করে এসেছিল উৎকল থেকে সে গোবিন্দ বিগ্রহ ও উৎকলেশ্বর শিবলিঙ্গ নিজের দেশে নিয়ে যাবে। এই কথা প্রথমে শঙ্কর জানত না। উৎকলে আসার পরে প্রতাপ তার কাছে এই মনোভাব ব্যক্ত করে। খুল্লতাত বসন্ত রায়ও প্রতাপকে বার বার বলে দিয়েছে, এই দুই বিগ্রহ যদি উৎকল থেকে যশোরে নিয়ে এসে প্রতিষ্ঠা করা যায়, তবে পার্শ্ববর্তী রাজাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠায় কয়েক কদম এগিয়ে যাওয়া যাবে। এই প্রস্তাবটা প্রতাপের খুব মনে ধরেছিল।
এখন, কতলু খাঁ কি এই দুই ঐতিহ্যবাহী বিগ্রহ প্রতাপকে দিতে চাইবে? সে সম্ভাবনা ক্ষীণ। দীর্ঘক্ষণ কতলু খাঁর সঙ্গে কথা বলে প্রতাপ তা জানতে পেরেছে। তাই সে শঙ্করের শরণাপন্ন হল।
‘বন্ধু, এর তো একটা উপায় বার করতে হবে। তা না হলে চুরি করে নিয়ে যেতে হবে।’
প্রস্তাবটা প্রথমে শঙ্করের ঠিক মনঃপূত হল না।
‘চৌর্যবৃত্তি করবে শেষে? কিন্তু যদি জানাজানি হয়ে যায় তা হলে উৎকলের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক খারাপ হয়ে যাবে। এই সময়ে মোগলদের যারা শত্রু তাদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক ভালো রাখাই উচিত।’
প্রতাপ অনেকটা যেন অধৈর্য হয়ে বলল, ‘সে আমি জানি। কিন্তু গোবিন্দ বিগ্রহ আর উৎকলেশ্বর শিবলিঙ্গ আমার চাই।’
তার গলায় সেই প্রবল জেদ ফিরে এসেছে।
শঙ্কর কিছুক্ষণ ভাবল। জেদ ভালো কিন্তু যুক্তিহীন জেদ ভালো নয়। তারপরে বলল, ‘সূর্যকান্তর যে ‘বালাম’ নৌকায় সৈন্য নিয়ে চিল্কার উপকূলে পৌঁছাবার কথা তাদের কতদিন সময় লাগবে বলে তোমার মনে হয়?’
প্রতাপ আর শঙ্কর উৎকলে এসেছিল জলপথে। সঙ্গে ছিল দুর্ধর্ষ কিছু বন্দুকচি সৈন্য আর তিরন্দাজ। সেই সঙ্গে রণতরিতে আছে পর্যাপ্ত গোলাবারুদ আর কামান। ঠিক ছিল পিছনে সূর্যকান্ত তেমনি দুটি-তিনটি নৌকা ও অধিক পরিমাণে সৈন্য নিয়ে উৎকলের উদ্দেশ্যে যাত্রা করবে। তারপরে এখানে এসে সমুদ্রে নোঙর ফেলে অপেক্ষা করবে। সেই সঙ্গে উপঢৌকন হিসাবে বেশ কয়েকটি কামান ও গোলাবারুদ উপহার দেবে উৎকল অধিপতিকে। হয়তো এর পিছনে যে কারণ আছে তা হল নিজের কিছুটা শক্তি প্রদর্শন করা।
প্রতাপ ভ্রূ কুঞ্চিত করে বলল, ‘কত দিন আর! আমার অনুমান এক পক্ষকাল! তার বেশি সময় লাগার কথা নয়।’
শঙ্কর বলল, ‘আগামীকাল ভোরবেলা একটা ‘ছিপ’ নৌকাকে একটি সাংকেতিক বার্তা লিখে পাঠিয়ে দাও। বলে দাও, কার্লোস যেন আরও তিন চারটি দ্রুতগতির নৌকা ও সৈন্য নিয়ে সুবর্ণরেখা নদীতে চলে যায়। অবশ্যই খুব দ্রুত। আমি আমার পরিকল্পনা ভেবে নিয়েছি।’
তার পরে একান্তে সে তার পরিকল্পনার কথা প্রতাপকে বলল।
আগামী কয়েকদিন তাদের উভয়েরই কোনও কাজ নেই। পরদিন তারা সমুদ্রে স্নান সেরে জগন্নাথ দর্শন করে নগর পরিভ্রমণে বেরিয়ে পড়ল। উৎকল অধিপতি তাদের জন্য অশ্ব শকট দিয়েছেন। সেই সঙ্গে তাদের নিজস্ব রক্ষী আছে কয়েকজন। পুরী নগরী পরিভ্রমণ করতে করতে প্রতাপ ভাবল কত ঝড়-ঝাপটা গিয়েছে এই পুরী নগরীর উপর দিয়ে। শেষে হিন্দু রাজাদের নিজেদের মধ্যে বৈরিতায় নীলাচল এখন পাঠান রাজাদের অধীনে। এখন আবার মোগলরা এই নগরীর দখল নিতে চাইছে।
প্রতাপ যেন দ্বিধাবিভক্ত হয়ে যায়! তার কোন পক্ষ অবলম্বন করা শ্রেয়? ভাবল, পাঠানরা তবু বহুদিন ধরে বাংলায় শাসন করেছে, তাদের সঙ্গে বাংলা, বিহার, ওড়িশার একটা আত্মীয়তা হয়তো তৈরি হয়ে গিয়েছে। সেই কারণেই হয়তো তার পিতা আর কতলু খাঁ বন্ধু হতে পেরেছিলেন। সেই দিক দিয়ে মোগলরা তো বহিরাগত। এক সময়ে কোন সুদূর বিদেশ থেকে তারা এসেছিল। এখন তারা ভারতবর্ষে শাসন কায়েম করে বসেছে। আর ভারতের শাসকরা নিজদের মধ্যে লড়াই করে তাদের সেই দখলদারিকে শক্ত ভিতের উপরে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে। প্রতাপের বুকের ভিতরে আবার রক্ত চঞ্চল হয়ে উঠল।
নগরে ভ্রমণ করতে করতে বেলা বেশ বেড়ে গিয়েছে। গ্রীষ্মের রোদ যেন ফেটে পড়ছে চারপাশে। প্রতাপ বলল, ‘শঙ্কর চল এবার। আহার করে বিশ্রাম করে নেওয়া যাক।’
শঙ্কর যেন পথ চলতে চলতে কিছু ভাবছিল। তাই প্রথমে প্রতাপের কথা তার কানে প্রবেশ করেনি। দ্বিতীয় বার একই কথা বলায়, সে প্রতাপের দিকে ফিরে বলল, ‘রাজা, তুমি বরং এখন বিশ্রামাগারে ফিরে যাও। আমি আর একটু নগরে পরিভ্রমণ করি। আমার কিছু দ্রব্য ক্রয় করার আছে।’
প্রতাপ আর কথা বাড়ায় না। সে বুঝতে পেরেছে শঙ্করের মাথায় অন্য কিছু পরিকল্পনা আছে। সে আর দ্বিরুক্তি না করে ফিরে যায়।
শঙ্কর তখন নগরের মধ্যস্থলে একটি মান্ডির মধ্যে প্রবেশ করল। ঘুরে ঘুরে ছদ্মবেশ ধারণের উপযোগী কিছু সামগ্রী ক্রয় করে ভাবল একবার গোবিন্দ বিগ্রহ দর্শন করে এলে কেমন হয়! রাজপথের পাশে একটি মনোহারী বিপণির সামনে দাঁড়িয়ে সে সেই কথাই ভাবল। সহসা চারদিকে যেন একটি শোরগোল পড়ে গেল। চারদিকের জনতা যেন তটস্থ হয়ে রাস্তা ছেড়ে পাশে সরে দাঁড়াচ্ছে। কী ব্যাপার ভাবতে ভাবতে শঙ্কর সেই দোকানের আঙিনার ভিতরে সরে দাঁড়াল। বিপণির অধিপতি ফিস ফিস করে বলল, ‘মহারানি আসছেন। ওই দেখো তাঁর শিবিকা।’
সে একটি আঙুল উঁচিয়ে দেখাল।
বেশ কয়েকজন বরকন্দাজ ও অস্ত্রধারী সৈনিক পরিবৃত হয়ে দুটি শিবিকা এগিয়ে আসছে। কী সুন্দর সাজ সেই শিবিকার। শঙ্কর মুগ্ধ হয়ে দেখছিল। না, তাদের দেশে এমন শিবিকা পাওয়া যায় না। তখন সেই বিপণির অধিপতি ফিস ফিস করে বলল, ‘মহারানি শিকারে বেরিয়েছেন। আজ আবার কার পালা কে জানে!’
দোকানদারের নাম অরণি। বয়স হয়েছে ঢের। নাদুস নুদুস স্থূলকায় চেহারা। চোখ দুটি ছোটো ছোটো। মুখে হাসি লেগেই থাকে। হাসলে সেই ক্ষুদ্র চোখ আরও মুদিত হয়ে আসে। মাথায় বিরল কেশ। কথা শুনে শঙ্কর রাস্তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে অরণির দিকে তাকাল।
সে কিছু বলতে গেল। কিন্তু অরণির চোখের দিকে তাকিয়ে সে আবার ঘাড় ফিরিয়ে রাস্তার দিকে তাকাল। দেখল সেই শিবিকা দুটি একটু এগিয়ে গিয়ে থেমে গেছে।
তখনই আবার অরণির ফিস ফিস গলা শুনল।
এখানে আবার কার উপরে নজর পড়ল!
শঙ্কর লক্ষ করল এক বরকন্দাজ তার দিকেই যেন এগিয়ে আসছে। তার দিকেই কি? শঙ্করের অনুমান সত্যি। সেই বরকন্দাজ এগিয়ে এসে খুব রূঢ় ভঙ্গিতে বলল, ‘এই তোমাকে ডাকছেন। এস আমার সঙ্গে।’
শঙ্করের খুব খারাপ লাগল তার কথার ভঙ্গি। কিন্তু কী করবে! রাজার পেয়াদা। মেজাজ তো তার গরম হবেই। সে সেই পেয়াদার সঙ্গে গিয়ে একটি শিবিকার সামনে দাঁড়াল।
শিবিকার কপাট জমকালো পর্দায় আচ্ছাদিত। ভিতরে কী আছে সে কিছুই দেখতে পাচ্ছিল না। সহসা ভিতর থেকে খিল খিল এক হাসির শব্দ শুনল শঙ্কর। এক সুমিষ্ট নারী কণ্ঠ আদেশের ভঙ্গিতে বলল,
‘সন্ধ্যার সময়ে তুমি এই স্থানেই অপেক্ষা করবে। আমার পেয়াদা তোমার গৃহ চিনে আসবে। অন্যথা হলেই কিন্তু তোমার মৃত্যুদণ্ড। যাও।’
শেষ কথাটা যেন ধমকের মতো।
শান্ত স্বভাব শঙ্করের ভিতরে যেন অনল জ্বলে উঠতে চাইছে। কিন্তু বহু কষ্টে সে নিজেকে সংবরণ করেছে।
তাকে এবং সেই পেয়াদাকে সেই স্থানে রেখে শিবিকা দুটি আবার চলতে আরম্ভ করল। তখনই দ্বিতীয় শিবিকার দ্বার থেকে পর্দা ঈষৎ বাতাসে সরে গেল। শঙ্কর সেই ফাঁক দিয়ে আশ্চর্য কৃষ্ণবর্ণ দুটি চোখ দেখে হতবাক হয়ে গেল। এমন ডাগর চোখ সে কখনও দেখেনি। কিছুক্ষণ সে যেন সংবিৎ হারিয়ে ফেলেছিল। ততক্ষণে শিবিকা দুটি চোখের আড়ালে চলে গিয়েছে।
শঙ্কর সেই পেয়াদাকে বলল, ‘তুমি একটু তফাতে দাঁড়াও। আমি এই মনোহারী দোকান থেকে কিছু দ্রব্য ক্রয় করব।’
সে বুঝতে পেরেছে এই বিপণির অধিপতি নিশ্চয়ই এই বিষয়ে কিছু জানে। সে সেই বিপণির সামনে ফিরে আসতেই অরণি হাসি মুখে বলল,
‘কি আজ তা হলে তুমি চোখে পড়ে গেলে!’
শঙ্কর কিছু বুঝতে না পেরে বলল, ‘আমি তো কিছুই বুঝতে পারলাম না।’
অরণি তার কথার সরাসরি উত্তর দিল না। বলল, ‘অবশ্য তোমার চেহারা চোখে পড়ার মতোই।’
একটু থেমে চারপাশে একবার চোখ ঘোরাবার ভঙ্গি করে বলল, ‘এমন আর একটা চেহারা তো চারপাশে নজরে আসছে না। তার উপরে কচি নাগর।’
সে আবার ফিক ফিক করে হেসে উঠল।
শঙ্করের জিজ্ঞাসু দৃষ্টি দেখে সে বলল, ‘আমাদের মহারানি তাখমীনা বেগম, এমনি করে মাঝে মাঝে নগর ভ্রমণে বের হন, ভ্রমর অন্বেষণে। তিনি মহারাজের কত নম্বর পক্ষ তা জানি না। শুনেছি, অন্দরমহলে উনিই এখন সর্বময়ী কর্ত্রী। কিন্তু মহারাজা বুড়ো হয়েছেন। বুড়ো হাড়ে কি আর সেই জোর আছে! তা ছাড়া তার আরও ভোগের বস্তু আছে। কবুতর আছে।’
অরণি মুখের মধ্যে একটা অশ্লীল ভঙ্গি করে। আবার বলে, ‘কিন্তু রানির যৌবনের আগুন শুনেছি লেলিহান। তাই তিনি মাঝে মাঝে নগরে বের হন। যাকে চোখে পড়ে তার ডাক পড়ে মহলে।’
সে চোখে মুখে আর আবার একটা অশ্লীল ভঙ্গি করল।
শঙ্কর সব বুঝে গিয়েছে। কিন্তু তার চোখের সামনে ওই দুটো কালো চোখের দৃষ্টি ভাসছে। কে ও? তার সঙ্গে কি আবার দেখা হবে?
সেই দিন সন্ধ্যা থেকেই শঙ্করের অভিসার শুরু হল। কিন্তু প্রতাপকে সে এই বিষয়ে কিছু বলেনি। সে শুধু বলেছে, ‘রাজা, আমি গোবিন্দ বিগ্রহ আর শিবলিঙ্গ প্রাপ্তির এক উপায় ভেবে ফেলেছি। সেই বিষয়েই আমাকে কয়েকদিন সন্ধ্যার পরে বের হতে হবে। তবে কত দিন তা ঠিক বুঝতে পারছি না। তবে আশা করি ততদিনে সূর্যকান্ত নৌকা নিয়ে উপস্থিত হয়ে যাবে।’
শঙ্কর দেখল মহারানি তাখমীনা বেগম উগ্র বাঘিনীর মতো। লেলিহান অগ্নিশিখা। যেন বন্য আগুন। জীবন তাঁর কাছে শুধুমাত্র ভোগের বস্তু। তাঁর কাছে সঙ্গী বা সঙ্গিনীর ইচ্ছা অনিচ্ছা গুরুত্বহীন। তবু শঙ্কর তার অদ্ভুত বাকচাতুর্যে আস্তে আস্তে মহারানির সঙ্গে সম্মানজনক এক বন্ধুত্ব করে ফেলেছে। শুধু মহারানিকে নয়, রাজ অন্তঃপুরের হালচাল দেখে শঙ্করের মনে হয়, যখন এক বংশের পতনের সূচনা হয় তখন বুঝি তার চারদিকে এমনি করে পচন ধরে দুর্গন্ধ ছড়ায়। নীতি, মূল্যবোধ সব কিছুই গলিত মাংসের মতো খসে খসে পড়তে থাকে। সে ভাবল এই বংশের পতন আর বেশি দূরে নেই। মহারাজা ভোগী, সুরাসক্ত। তার পুত্ররা ইন্দ্রিয়াসক্ত। নারীরা বিপথগামী, বহুভোগ্যা। শঙ্করের মতো ব্রাহ্মণ যুবকের সারা গা রি রি করে ওঠে। কিন্তু ওই যে আকর্ষণ! ওই যে দুটো ভ্রমরকৃষ্ণ চোখের নিবিড় চাহনি! তা সে কোনও ভাবেই এড়িয়ে যেতে পারছে না। সেই চোখের দৃষ্টির দিকে তাকালেই শঙ্করের বুকের ভিতরটা দুলে ওঠে। কী যে কঠিন মায়া!
প্রতিদিন ফরিদা নামের মেয়েটি তাকে একটি গোপন দ্বার দিয়ে প্রাসাদের বাইরে পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে যায়। পতিতা মেয়েটি স্বভাবে প্রগলভ। কিন্তু কোনও এক অজানা কারণে সে শঙ্করের সঙ্গে প্রগলভতা করে না। মৃদুভাষিণী ফরিদার কাছ থেকে আস্তে আস্তে তার দুঃসহ জীবনের কাহিনি জেনে নিয়েছে শঙ্কর। তার বাপ-মা কে সে জানে না। এক চাচার কাছে মানুষ। ভবঘুরে উপজাতির মতো তারা দেশে দেশে ঘুরে বেড়াত। তারপরে যখন তার দেহে অতুল ঐশ্বর্যের মতো যৌবনের ঢল নামল তখন একদিন তাকে বিক্রি করে দিল তার চাচা। সেখান থেকে হাত বদল হয়ে তার ঠাঁই হল সুলতানের হারেমে। অতঃপর মহারানির নজরে পড়ে যাওয়ায় তাখমীনা বেগম তাকে নিজের দাসী করে নিয়েছে। শুধু কি দাসী, সে তার ব্যভিচার-সঙ্গিনীও।
ফরিদার এই আশ্চর্য আকর্ষণই যেন শঙ্করকে বার বার টেনে নিয়ে আসে। তা ছাড়া তার মনে আর একটা মতলব আছে। মহারানিকে খুশি করেই সে ওই দুই বিগ্রহ হস্তগত করবে। কারণ, কতলু খাঁ এখনও কোনও এক অজানা কারণে তাঁর তাখমীনা বেগমের কাছে বশীভূত।
এমন সময়ে অতর্কিতে মোগল আক্রমণ নেমে এল উৎকল রাজ্যের উপরে। শঙ্কর যেন এই সুযোগের অপেক্ষাতেই ছিল। চর মারফত সে এমনি একটি সম্ভাবনার কথা শুনেছিল। ঠিক জগন্নাথদেবের স্নানযাত্রার কয়েকদিন আগেই ভরা বর্ষায় মোগলদের আক্রমণ অতর্কিতে বজ্রপাতের মতো আছড়ে পড়ল।
শঙ্কর বলল, ‘রাজা, আমাদের কি এই সুযোগ গ্রহণ করা উচিত?’
- তুই বলছিস, আমরা কতলু খাঁকে সাহায্য করব?’
‘আমি সেটাই বলতে চাইছি রাজা! উৎকল আমাদের মিত্র রাজ্য। তা ছাড়া আমাদের একবার শক্তি পরীক্ষা হয়ে যাবে। দেখো না আমরা কেমন জলপথে যুদ্ধ করি।’
প্রতাপের বুকের ভিতরে রক্ত যেন ঢেউ খেলে উঠল।
‘ঠিক বলেছিস। বাদরিয়া মরশুমের ভরা নদীতে আমাদের নৌকা নিশ্চয়ই পৌঁছে গিয়েছে। এই দিক থেকে উৎকল আক্রমণ করবে। আর আমরা সুবর্ণরেখা নদী দিয়ে ঢুকে পিছন থেকে মোগলদের অতর্কিতে আক্রমণ করব।’
‘তা হলে রাজা, চলো সুলতানের সঙ্গে এই বিষয়ে আলোচনা করে আসি।’
উৎকলাধিপতি কতলু খাঁ-র তখন দিশাহারা অবস্থা। জীর্ণ ভিত্তির উপরে দাঁড়িয়ে আছে তাঁর সমরসম্ভার, পরিচালনা ব্যবস্থা। শুধু মাত্র ওড়িশাবাসীর মরণপণ জেদের কাছে মোগলরা পেরে উঠছে না।
প্রতাপের প্রস্তাব পেয়ে ডুবন্ত মানুষ যেন খড়কুটো হাতে পেল।
মহারাজের সম্মতি পেয়ে, সেই দিন রাত্রেই শঙ্কর দূত পাঠিয়ে দিল সূর্যকান্ত আর কামালের কাছে। মোগল সেনাপতি কিছু বুঝে ওঠার আগেই সুবর্ণরেখা নদী থেকে পাঁচটি বৃহৎ রণতরী উন্নত কামানে সজ্জিত হয়ে মোগলদের উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে। সেই সময়ে পশ্চিমা বায়ুর প্রভাবে প্রবল বৃষ্টি শুরু হয়েছে। বাংলার জলেকাদায় অভ্যস্ত প্রতাপের সৈন্যরা সেই বর্ষণের মাঝেই তাদের বিক্রম দেখাতে লাগল। মোগল সৈন্যরা এই ধরনের প্রবল বর্ষণে যুদ্ধ করতে অভ্যস্ত নয়। তারা আস্তে আস্তে নিস্তেজ হয়ে পিছু হঠতে লাগল। বেগতিক দেখে মোগল সেনাপতি আবরাম খাঁ পিছু হঠতে বাধ্য হল। যুদ্ধ বেশিদিন স্থায়ী হল না। এই প্রথম মোগল সম্রাটের মনে প্রতাপ নামক একটি ক্ষতের সৃষ্টি হয়ে গেল।
পাঠান অধিপতি কতলু খাঁ যারপরনাই খুশি হয়ে প্রতাপ ও তার বন্ধুদের প্রকাশ্য সভায় সংবর্ধনা দিলেন।
বিদায় নেবার আগে প্রতাপ হাসতে হাসতে বলল, ‘মহারাজা, আমাদের পুরস্কার?’
কতলু খাঁও হেসে উঠে বললেন, ‘কী চাও বলো, প্রতাপ?’
প্রতাপ একবার শঙ্করের দিকে তাকাল। চোখে চোখে তাদের কথা হয়ে যায়। প্রতাপ স্মিত মুখে বলল, ‘মহারানি আমাদের দুজনকে দুটি অমূল্য পুরস্কার দিতে চেয়েছেন, সেই আমাদের পুরস্কার। আমরা আর কিছু চাই না।’
মহারাজা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালে প্রতাপ বলল, ‘গোবিন্দ বিগ্রহ আর উৎকলেশ্বর শিবলিঙ্গ উপহার হিসাবে দিতে চেয়েছেন মহারানি। সে দুটি আমরা আমাদের উভয় রাজ্যের মিত্রতার নিদর্শন হিসাবে যশোরে নিয়ে গিয়ে যথাযথ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠা করতে চাই।’
কতলু খাঁর মনে কালো একটা মেঘের ছায়া যেন খেলে যায়! কিন্তু সেটি এক মুহূর্তের জন্যই। তবু মুখে তিনি হাসিটা ধরে রাখতে পারলেন না। তাঁর যেন মনে হল মিত্রতার জন্য বেশি মূল্য দিতে হচ্ছে। রাজ্যের ঐতিহ্য যে বেহাত হয়ে যাচ্ছে! হয়তো আগামী দিনে মোগলদের হাতে এই বিগ্রহের কী পরিণতি হবে কে জানে! তার থেকে এই বরং ভালো! প্রতাপই তাদের রক্ষা করুক। একটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তিনি বললেন, ‘মহারানির উপহার আমারও উপহার।’
প্রতাপ তৎক্ষণাৎ বলল, ‘তবে যদি অনুমতি করেন আজ রাত্রেই আমরা যশোরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করব। আজ যাত্রার পক্ষে শুভ লগ্ন।’
কারণ সে বুঝতে পারছিল, বিলম্ব করা ঠিক হবে না। মহারানির মত বদল হতে কতক্ষণ! তা ছাড়া দিনের বেলা এই কার্য করলে ভক্তরা বাধা দিতে পারে। তার বদলে রাত্রেই তারা সেবায়েতদের যথেষ্ট অর্থ উৎকোচ দিয়ে দুই বিগ্রহ হস্তগত করে। শঙ্করই পুজো করে দুই দেবতাকে গৃহে নিয়ে এসে প্রতাপকে বলল,
‘রাজা, তোমরা যাত্রার আয়োজন করো। আমার আর একটি কাজ আছে। সেটা সমাধান করেই আমি নৌকা ছাড়ার আগে ঠিক পৌঁছে যাব। সূর্য আছে। ও এই দিকের সমস্ত ব্যবস্থা দেখে নেবে।’
কিন্তু, প্রতাপ নৌকায় অপেক্ষা করছে অথচ শঙ্করের তখনও দেখা নেই। শুভ লগ্ন যে পার হয়ে যাবে। নৌকার গলুইয়ে দাঁড়িয়ে সে অধীর হয়ে অপেক্ষা করছে।
আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষার পরে সে অধৈর্য হয়ে পড়ে।
- সূর্য, তুই জানিস ও কোথায় গেছে?
সূর্যকান্ত উত্তর না দিয়ে অন্ধকারের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে বলল,
‘ওই দেখো, দূরে একটি ঘোড়া আসছে যেন।’
ঠিক তাই। নিমেষে হাওয়ার বেগে এক।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন