এসেছে ফাগুন

অবিন সেন

প্রতাপ দেখল কার্লোস অদ্ভুত কুশলী তিরন্দাজ। তাদের ধনুকের গুন পরাবার ভঙ্গিটি একটু ভিন্ন ধরনের। আস্তে আস্তে সেই ভাবে ধনুক তৈরি করবার কৌশল আয়ত্ত করল তারা। এই ধনুকের ক্ষমতা অনেক বেশি। শুধু প্রতাপ নয়। শঙ্কর, সূর্যকান্ত সহ অন্যান্য সঙ্গীদের সে এই ভাবে শরনিক্ষেপ করা শেখাতে শুরু করল। শুধু কার্লোস নয়, অ্যান্তোনিও চ্যান্ডিকান থেকে সদ্য পোর্তুগাল ফেরত এক তিরন্দাজকে সঙ্গে করে নিয়ে এল। বিশালদেহী গঞ্জালেসের অত্যাশ্চর্য অস্ত্রক্ষমতা। সব অস্ত্রধারী আবার ভালো অস্ত্রগুরু হতে পারে না। সে এক বিশেষ ক্ষমতা। গঞ্জালেসের সে ক্ষমতা আছে। তিনিও প্রতাপের মতো শিষ্য পেয়ে মন প্রাণ ঢেলে শিক্ষা দিতে লাগলেন।

বৎসর দুই অতিক্রান্ত হল না, প্রতাপ আশ্চর্য ধনুর্ধর হয়ে উঠল। সে এমনই কুশলী হয়ে উঠল যে একটি শরনিক্ষেপ করার সঙ্গে সঙ্গে আর একটি শরনিক্ষেপ করতে পারে যেটি প্রথম শরের পিছনে গিয়ে আঘাত করে। আর উড়ন্ত পক্ষীকে তো সে বাম হাতেই শরনিক্ষেপ করে বিদ্ধ করে।

কিন্তু এত কিছুর আয়োজন হলেও বিক্রমাদিত্য এই সবের বিশেষ কোনও সংবাদ রাখেন না। প্রতাপের প্রতি তাঁর বিরাগ যেন বদ্ধমূল হয়ে গিয়েছে। যদিও খুল্লতাত বসন্ত রায় ও খুড়িমা চন্দ্রলেখার বাৎসল্য ও স্নেহ ভালোবাসার কোনও অভাব ঘটেনি। প্রতাপের অস্ত্রশিক্ষার আয়োজনের বিষয়ে খুল্লতাত কোনও ত্রুটি রাখলেন না।

বসন্ত রায় একদিন ডেকে বললেন। হাসতে হাসতেই বললেন, ‘পড়াশুনায় তো তোমার মন নেই। কিন্তু শুধুমাত্র অস্ত্রশিক্ষা করলেই তো আর ভালো রাজা হওয়া যায় না। রাজকার্য চালাতে গেলে উত্তমরূপে গণিত আর রাজস্বব্যবস্থা সম্পর্কে শিক্ষালাভ করতে হবে। আর মোগলদের সঙ্গে রাজত্ব চালাতে গেলে পারস্য ভাষাও শিখতে হবে। মহামান্য টোডরমল সারাদেশে মোগল শাসনকার্যে পারস্য ভাষা বাধ্যতামূলক করেছেন।’

প্রতাপের হাবভাব এখন সম্পূর্ণরূপে যুবকদের মতো। তার মধ্যে আস্তে আস্তে চিন্তা করার ধৈর্য জন্ম নিচ্ছে। সে চিন্তা করে বলল, ‘আমিও তাই ভেবেছি তাত। পারস্য ভাষা আমি শিখব। গণিত আমি জানি। তা ছাড়া এই গণিত বোঝার জন্য তো আমার শঙ্কর আছে।’

কথাটা বলে সে নিজের মনে হাসল।

- কিন্তু বাবা, অন্যের উপরে সম্পূর্ণ নির্ভর করার আগে, বিশ্বাস করার আগে নিজেরও বিষয়টা ভালো করে জানা দরকার।

- শঙ্করকে আমি নিজের থেকে বেশি বিশ্বাস করি।

বসন্ত রায় আর এই প্রসঙ্গে গেলেন না। তিনি জানেন প্রতাপের জেদ আর বাঁধনহীন ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ। এখনই মাঝে মাঝে তার উদাহরণ দেখতে পান তিনি। তিনি এত করে প্রতাপকে শিক্ষা দেবার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু নিজের চণ্ডাল ক্রোধকে নিয়ন্ত্রণ করার শিক্ষা সে পায়নি। ক্রোধে অন্ধ হয়ে সে বড়ো নিষ্ঠুর হয়ে ওঠে। এই ক্রোধই না একদিন তার শত্রু হয়ে দেখা দেয়।

বসন্ত রায়ের মাঝে মাঝে চিন্তা হয় এই নিয়ে।

কয়েক দিনের মধ্যেই তিনি প্রতাপের জন্য এক পারস্য ভাষার শিক্ষক নিয়োগ করলেন। আবদুল গনিকে তিনি গৌড় থেকে অধিক পারিশ্রমিক দিয়ে নিয়ে এলেন। তাঁকে উত্তম বাসস্থান নির্মাণ করিয়ে দিলেন। নিষ্কর ভূমি প্রদান করলেন।

আবদুল গনি নির্বিবাদী শান্ত পণ্ডিত মানুষ। পারস্য ও আরবি ভাষায় তাঁর পাণ্ডিত্য দেশজোড়া। প্রতাপের মেধা দেখে তিনি অতীব খুশি হলেন। শুধু প্রতাপ নয় তার সঙ্গীসাথিরাও পারস্য ভাষা শিক্ষা করতে লাগল। মৌলবি সাহেবের কয়েকটি পুত্রসন্তান ছিল। তার মধ্যে কনিষ্ঠটি প্রতাপের সমবয়সি। কামালও ক্রমে ক্রমে প্রতাপের দলে যুক্ত হয়ে গেল। বলা ভালো প্রতাপই তাকে নিজের দলে টেনে নিল।

কিন্তু এই প্রথাগত শিক্ষা সামান্য কয়েকদিনই মাত্র তার মনঃপূত হল। তার পরেই সে আবার মেতে ওঠে তার নৌকাবিহার, গভীর অরণ্যে মৃগয়ায়। এই সমস্ত মৃগয়াকার্যে সে এতটাই কষ্টসহিষ্ণুতার পরিচয় দেয় যে তার বন্ধুরা বিস্মিত হয়ে যায়। নিজেদের চর্মচক্ষে না দেখলে তারা হয়তো তা বিশ্বাসই করতে পারত না। অশ্বারোহণেও তার পারদর্শিতা হয়ে উঠল প্রশ্নাতীত।

একদিন বিক্রমাদিত্য উদ্যানে ভ্রমণ করছিলেন। সহসা তির-বিদ্ধ একটি ক্ষুদ্র পক্ষী তাঁর পায়ের কাছে এসে পড়ে। মৃত পাখিটিকে দেখে তাঁর বড়ো মায়া হয়! কে এই নরাধম! এই নিরীহ পক্ষীকে এইভাবে নির্মম উপায়ে হত্যা করে!

তিনি অনুসন্ধান করে দেখলেন এ তাঁর পুত্র প্রতাপের কাজ। পুত্রের নানাবিধ কাজকর্মের সংবাদ তাঁর কানে আসত। তিনি এমনিতেই বিরক্ত ছিলেন। আবারও বিরক্ত হয়ে উঠলেন। তিনি মনে মনে ভাবলেন বিষবৃক্ষের চারা আস্তে আস্তে বড়ো হচ্ছে।

প্রতাপকে তিনি ডেকে পাঠালেন।

সকলের সামনে তাকে তিরস্কার করলেন। যখনই তিনি ক্ষুব্ধ হতেন তখনই তিনি প্রতাপকে পিতৃদ্রোহী বলে তিরস্কার করতেন।

- প্রতাপ, দিনে দিনে তুমি কি এই শিক্ষা পাচ্ছ? এই নিষ্ঠুরতার শিক্ষা পাচ্ছ! এই ক্ষুদ্র নিরীহ পাখিটিকে হত্যা করতে তোমার এতটুকু হাত কাঁপল না! বীরত্ব যদি দেখাতেই হয় তবে বীরের সামনে বীরত্ব দেখাও।

প্রতাপের ভিতরে ক্রোধ যেন মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে শুরু করল। তার মুখমণ্ডল ক্রমশ রক্তবর্ণ, চোখ ক্রমশ আরক্তিম হয়ে উঠতে লাগল। সে বুঝি এখনই রাগে ফেটে পড়বে। তার হাতের চাপে হাতে ধরে থাকা শরটি মট করে ভেঙে গেল।

তাকে এই অবস্থায় দেখে শঙ্কর প্রমাদ গুনল। সে বুঝতে পারছিল এখনই বুঝি কিছু একটা ঘটে যাবে। সে সত্বর প্রতাপকে সেখান থেকে টেনে অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে গেল।

যে পিতৃদ্রোহের বীজ প্রতাপের বুকের ভিতরে এতকাল সুপ্ত ছিল তা বুঝি এবার জল-সিঞ্চন পেল।

বিক্রমাদিত্যও প্রতাপের মুখ চোখ লক্ষ্য করেছেন। তিনি যেন চমকে গিয়েছেন।

মনে মনে যেন প্রার্থনা করলেন ‘মা যশোরেশ্বরী, প্রতাপকে একদিন রক্ষা কোরো মা’।

তিনি ভ্রাতা বসন্ত রায়কে বিরলে ডেকে এই ঘটনাটি ব্যাখ্যা করলেন। বললেন, ‘প্রতাপ কি দিন দিন আরও উচ্ছৃঙ্খল হয়ে যাচ্ছে?’

বসন্ত রায় অগ্রজকে প্রবোধ দিলেন।

‘না না, তুমি যতটা ভাবছ প্রতাপ তেমন নয়। একটু দামাল। তা রাজার ছেলে একটু দামাল না হলে চলে!’

‘না, ভাই। আমি বুঝতে পারছি। এবার সে বিদ্রোহী হয়ে উঠবে।’

বসন্ত রায়, বড়ো ভাইয়ের কথা ফেলে দিলেন না।

তবু বললেন, ‘তুমি যা ভাবছ তা হয়তো সঠিক নয়।’

‘না না, আমি ভাবছি প্রতাপকে অন্যত্র কোথাও প্রেরণ করি। স্থানান্তরে গেলে হয়তো তার মনের ভাব পরিবর্তন হবে।’

বসন্ত রায় এবার অগ্রজের কথায় সায় দিলেন না।

পিতার সম্মুখ থেকে সরে গিয়ে, ক্রোধে অন্ধ প্রতাপ তিরবেগে ঘোড়া ছুটিয়ে দিল। কোথায় যাচ্ছে, কোন দিকে যাচ্ছে তার খেয়াল নেই। পিছনে ঘোড়া নিয়ে ছুটল শঙ্কর আর সূর্যকান্ত।

অনেক দূর চলে গিয়েছে প্রতাপ। সেই চন্দনা নদীর তীরে। ঠিক যেখানে চন্দনার উৎসমুখ পদ্মার সঙ্গে মিশে আছে। দুই ভগিনী যেন পরস্পরের গলা জড়িয়ে ধরে অনন্ত কাশের ভিতরে শুয়ে আছে। অনেকটা বিস্তৃত চারণ ভূমি। আম, জাম পিয়ালের বন। পর পর বহুদূর বিস্তৃত তালের সারি। অদূরেই এক সম্পন্ন গৃহস্থদের গ্রাম। প্রতাপ নদীর তীরে এসে এক বৃহৎ আম্রগাছের ছায়ায় বসল।

বসন্ত এসে গেছে। মুকুলের ভারে বৃহৎ বৃহৎ শাখাগুলি যেন ঘাড় নুইয়ে নেমে এসেছে মাটির কাছে। প্রতাপ উপরের দিকে ঘাড় তুলে তাকাল। তার চক্ষু দুটি তখনও আরক্তিম। বুকের ভিতরে যেন অশেষ জ্বালা। তাই বুঝি আম্র-মুকুলের এমন সুবাস আর দক্ষিণের বাতাস তার মনের ভিতরে কোনও রেখাপাত করল না। সে এক দৃষ্টিতে উপরের দিকে তাকিয়ে থাকল। বুকের ভিতরে লেলিহান শিখা যেন দাউ দাউ করে জ্বলে উঠছে। মাথার উপরে একদল মৌমাছি উড়ে বেড়াচ্ছে। তাদের অবিরত গুনগুন বাতাসের কানে কানে কানাকানি করছে। আরও উঁচুতে একটি পুরুষ্টু কাণ্ডে তারা চাক বেঁধেছে।

ঘোড়ার খুরের শব্দে প্রতাপ ঘাড় ফিরিয়ে দেখল, শঙ্কর আর সূর্যকান্ত এত দীর্ঘ রাস্তা একটানা এসে হাঁপিয়ে পড়েছে। ঘোড়াদুটি ক্লান্ত।

প্রতাপ দেখল সম্পূর্ণ নিরস্ত্র সে। পিতার কাছ থেকেই সরাসরি সে ঘোড়া নিয়ে বেরিয়ে এসেছে। তখন তার অস্ত্রের কথা স্মরণ ছিল না। এতদূর নিরস্ত্র হয়ে চলে আসাটা যে ঠিক হয়নি সেটা সে বুঝতে পারে। চারদিকে গুপ্তশত্রুর অভাব নেই। অস্থির মনকে একটু শান্ত করে সে উপরের দিকে তাকাল।

উপরের দিকে তাকিয়ে সে একমনে মৌমাছিদের দেখছিল। কী নিরুত্তাপ ভঙ্গিতে তারা বাসা আগলে বসে আছে। কয়েকটি মাত্র উড়ে বেড়াচ্ছে। কিন্তু তাদের ভঙ্গিতেও যেন কোনও উদ্বেগ নেই।

প্রতাপের ঠোঁটের কোণে এক হাসি খেলে গেল সহসা। তার মনের গভীরে কিছু একটা চলছে। শঙ্কর বলল, ‘কী হল হাসছ! রাগ পড়েছে?’

- পিতা কেন আমার প্রতি এমন ব্যবহার করেন? রাজত্ব কি তবে মুকুটমণি পাবে?

যশোরে ফিরে এসে বিক্রমাদিত্য আবার বিবাহ করেছেন। দ্বিতীয় পক্ষের পুত্রের নাম রেখেছেন মুকুটমণি। মুকুটমণি বেশ ফুটফুটে গৌরবর্ণ হয়েছে। বিক্রমাদিত্য এই পুত্রকে যেন চোখে হারান।

শঙ্কর বলল, ‘তা কেন করবেন! তুমি জ্যেষ্ঠ। তোমার অধিকার আগে।’

প্রতাপাদিত্য এবার বেপরোয়া ভঙ্গিতে হা হা করে হেসে উঠল। সহসা মাটি থেকে একটা বৃহৎ প্রস্তর খণ্ড তুলে নিয়ে প্রচণ্ড শক্তিতে সেটি সেই মৌমাছির চাক লক্ষ করে নিক্ষেপ করল। তার লক্ষ্য ভ্রষ্ট হবার নয়। সেই প্রস্তরের আঘাতে মৌচাকের একটি অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে মাটিতে পতিত হল।

ঝাঁকে ঝাঁকে মৌমাছি তিরের মতো নীচে নেমে এল। কী তাদের আক্রমণের ভঙ্গি! যাদের এতক্ষণ আপাত শান্ত নিরীহ মনে হচ্ছিল তারাই যেন বর্বর দস্যুর বেশে হানা দিল। শঙ্কর আর সূর্যকান্ত দৌড়ে সেখান থেকে পলায়ন করে। কিন্তু প্রতাপ সেখান থেকে এক বিন্দু বিচ্যুত হল না। উদগ্র হুলধারী পতঙ্গরা তার মুখে বুকে, সারা শরীরে, শরীরের সমস্ত নগ্ন অঙ্গে দংশন করতে লাগল। কিন্তু সে পাথরের মতো তেমনি দাঁড়িয়ে থাকল। ব্যথায় শরীরের সমস্ত পেশি সকল ফুলে ফুলে উঠতে লাগল। চোখদুটি এতটাই রক্তিম হয়ে উঠল যে দেখে মনে হবে যেন চোখ থেকে এখনই রক্ত গড়িয়ে পড়বে। কিন্তু প্রতাপের কোনও ভ্রূক্ষেপ নেই যেন। সে নিশ্চল দাঁড়িয়ে থাকল। ঘাড় তুলে একবার উপরের দিকে দৃষ্টিনিক্ষেপ করল। তার মুখের পেশিতে আবার একটা বাঁকা হাসির ভঙ্গি খেলে গেল। দেখল, উপরের চাকটি এবার অনেকটাই অরক্ষিত, সমস্ত মৌমাছি সেটি ছেড়ে দূরে ছড়িয়ে পড়েছে। প্রতাপ আস্তে আস্তে বৃহৎ গাছের কাণ্ড বেয়ে উঠতে শুরু করল। বৃক্ষ আরোহণে সে ভীষণ অনায়াস। জলে জঙ্গলের যুদ্ধে এ এক প্রয়োজনীয় কৌশল। সে সহজেই সেই মৌচাকটি হাতে করে ভেঙে নিয়ে আসে। আরও কয়েকটি মৌমাছির ভীষণ দংশন তাকে সহ্য করতে হয়। নীচে নেমে এসে ভীষণ এক উল্লাসে সে মুখের উপরে সেই চাকটি ধরে মধু নিষ্কশন করে খেতে শুরু করে। তার সারা শরীর বেয়ে সেই হলুদ বর্ণের সুমিষ্ট সুগন্ধি তরল গড়িয়ে পড়তে থাকে। সে সারা শরীরে সেই মকরন্দ আরও উত্তমরূপে মর্দন করে নেয়। আহা! দংশনের জ্বালা যেন জুড়িয়ে যায়।

শঙ্কর আর সূর্যকান্ত দূরে দাঁড়িয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকে। প্রতাপের এমন রূপ তারা কখনও দেখেনি।

হা হা হাসিতে ফেটে পড়ে প্রতাপ বলে, ‘বসে থাকলে কিছুই অধিকারে পাওয়া যায় না। প্রতিপক্ষকে বিশৃঙ্খল করে দিতে হবে।’

কথাটা বলে এক দৌড়ে সে নদীর জলে ঝাঁপিয়ে পড়ে। পেশিবহুল বাহুর বিপুল আন্দোলনে নদীর মাঝবরাবর অনেক দূর চলে যায়। তার পরে আরও দূরে নদীর অন্য পারের দিকে এগিয়ে যায়। নদীর ওই পারে সম্পন্ন গ্রাম চন্দনা।

কিশোরীদের অপরূপ কলকাকলি তার কানে আসে। সে আরও এগিয়ে যায়। সন্ধ্যার পূর্বে গ্রামের কিশোরী আর তরুণী বধূরা কলস নিয়ে জল ভরতে এসেছে। জলে নেমে তারা পরস্পরের গায়ে জল ছিটিয়ে দিয়ে জলকেলিতে মত্ত।

প্রতাপ সন্তর্পণে একটু তফাতে থেকে ওই পারে ঘাটের অদূরে একটি গুল্মের আড়ালে নিজেকে লুক্কায়িত রেখে, কটি পর্যন্ত জলের গভীরে দাঁড়িয়ে থাকল। তার ভাবভঙ্গি ঠিক ভদ্রজনোচিত নয়। কিন্তু মহিলাদের মধ্যে একটি কিশোরীকে দেখে তার মাথা ঘুরে গিয়েছে। এমন অপরূপ নারী সে বুঝি পূর্বে কখনও দেখেনি। বিকালের হেলে পড়া আরক্তিম আলো সেই কিশোরীর মুখে পড়েছে। কুঞ্চিত কেশ কুমুদের মতো মুখটিকে ঢেকে রেখেছে। রক্তিম অধর দন্তে দংশন করার আশ্চর্য ভঙ্গি। প্রতাপের ভিতরে সামান্য যাও বা লজ্জার ভাব অবশিষ্ট ছিল তাও এবার কিশোরীর হাসিতে দুই গালের টোলের বিভঙ্গে, ভেঙে খান খান হয়ে গেল।

কে এই কিশোরী!

প্রতাপ সেখানে অপেক্ষা করল। তারা যখন জল নিয়ে চলে যাচ্ছে প্রতাপ তখন জল থেকে উঠে এসে একটি বটবৃক্ষের আড়াল থেকে তাদের গমন পথের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারা যে পথে গেল, সেই পথ সে মনে মনে চিনে রাখল।

- তোমাকে আমি ঠিক খুঁজে নেব।

নিজের মনে কথাটা বলেই সে আবার জলে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%