অবিন সেন
টিপ টিপ করে বৃষ্টি পড়ছে। রাত্রি কত হয়েছে তা ঠিক বুঝতে পারছে না তামিম। একটি বিশাল অশথ গাছের নীচে সে একভাবে দাঁড়িয়ে আছে। আরও কতক্ষণ তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে সে জানে না। কোনও বিষয়েই সে বিশেষ প্রশ্ন করে না। তার কাজ শুধু শোনা। আদেশ শোনা। আলগোছে দাঁড়িয়ে অন্যের কথা শোনা। কখনও বা আড়ি পেতে আড়ালে থেকেও কে কী বলছে তা তাকে শুনতে হয়। মাঝে মাঝে তাই তাকে মনে হয় সে যেন একটা কাঠের পুতুল। রক্তমাংসের মানুষের মতো তার কোনও অনুভূতি নেই। সে নিজেও বুঝি মাঝে মাঝে তেমনটাই ভাবে। তার কোনও বোধ নেই। মানুষটা নির্বোধ নয়। কিন্তু তার চোখ মুখ বড়ো নির্বোধের মতো। রোগা শুকনো দড়ির মতো পাকানো চেহারা। উচ্চতায় খাটো। বোঁচা নাক, গাল দুটি ভিতরে বসে গিয়েছে। কপালের পাশের শিরাগুলো স্পষ্ট বোঝা যায়।
দূরের একটি আলোকবিন্দুর দিকে সে তাকিয়ে আছে। এই বাগানবাড়িটা এক সময়ে প্রতাপের ছিল। ছিল নাচঘর। অনেকদিন সেখানে মঞ্জীরের বোল বাজেনি। কিন্তু এই নাচঘর এখন আবার প্রাণ ফিরে পেয়েছে। সন্ধ্যার পরে ঘুঙুরের বোলে বাতাস মুখরিত হয়ে ওঠে। বৃষ্টির শব্দের আড়াল ছাপিয়ে এখন সেখান থেকে ঘুঙুরের শব্দ, মাতালের হুল্লোড়ের শব্দ শোনা যাচ্ছে।
এই নাচঘরের এখন দখল নিয়েছে বসন্ত রায়ের জ্যেষ্ঠ পুত্র গোবিন্দ রায়। অনেক বিষয়েই প্রতাপ দিলদরিয়া। বস্তুত, প্রয়োজনের তুলনায় বেশিই সে দান করে। কোনও দুঃস্থ মানুষ তার কাছ থেকে দান না পেয়ে ফিরে যায় না। এমনকি বন্যায় গৃহহারাকে এক বাক্যে সে গৃহ নির্মাণ করিয়ে দেয়। নদী ভাঙনে যদি কৃষিজমি নদীগর্ভে তলিয়ে যায়, সে সেই ভূমিহারা কৃষককে ভূমি প্রদান করতে পিছপা হয় না। কিন্তু সবই তার মনমেজাজের উপরে নির্ভর করে। ক্ষুব্ধ হলে কিংবা উদরে পানীয় পড়ে গেলে সে চণ্ডাল হয়ে যায়। সেই কারণে শঙ্কর গোপনে নির্দেশ দিয়ে রেখেছে, সময় বিশেষে তার সমীপে মানুষের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
গোবিন্দর সঙ্গে প্রতাপের কোনও দিনই সেই ভাবে সখ্য ছিল না। সে প্রতাপের থেকে বছর চারেকের কনিষ্ঠ মাত্র। কিন্তু দুজনের মধ্যে দূরত্ব এক যোজন। গোবিন্দ অহংকারী। রাজ গরিমায় গর্বিত। তার চারপাশে সর্বদাই একটি উচ্চ বংশীয় মোসাহেবের দল মাছির মতো উড়ে বেড়ায়। প্রতাপ যখন বনে জঙ্গলে সাধারণ মানুষ, জেলে চাষিদের মধ্যে তার শিক্ষার পাঠ নিয়ে বেড়াত, তখন গোবিন্দ গৃহে শিক্ষকের কাছে অধ্যয়ন করত। পোশাকি অস্ত্রচালনা শিক্ষা করত। আর একটু বয়স বাড়লে মোসাহেবদের সঙ্গে সঙ্গে যুক্ত হল, জমিদারসুলভ নারীলোলুপতা, সুরাপান। রাজকার্যে শিক্ষা বিষয়ে তার আগ্রহ যতটা না ছিল তার থেকে বেশি ছিল রাজসিংহাসনে বসার প্রতি লোলুপতা। তার উপযুক্ত সঙ্গী হয়েছিল সহোদর ভ্রাতা জগদানন্দ। জগদানন্দ ঈষৎ খঞ্জ। কথায় বলে কানা খোঁড়া এক কাঠি বাড়া। সে ছিল ঠিক তেমনি।
প্রতাপ সবে তখন ওড়িশা বিজয় করে ফিরেছে। বিজয়গর্বে তার মনের ভিতরে শোণিত ধারা যেন টগবগ করে ফুটে উঠছে। তার কাঙ্ক্ষিত গোবিন্দদেব বিগ্রহ ও উৎকলেশ্বর শিবলিঙ্গ সে লাভ করেছে। সেই সঙ্গে মনে অনুভব করেছে স্বাধীনতার এক স্বাদ। তাই ধূমঘাটে ফিরেই সে আদেশ দিল, শীঘ্রই যশোরেশ্বরী মন্দিরের সংস্কারের কাজ সমাধান করতে হবে।
রায়চাঁদ বলল, ‘হুজুর, আমাকে এক মাস সময় দিন। আমি আপনাকে দেখার মতো এক মন্দির উপহার দেব। সেই সঙ্গে গোবিন্দদেব ও উৎকলেশ্বর শিবলিঙ্গ প্রতিষ্ঠার উপযুক্ত ব্যবস্থা করে দেব।’
মহারাজা প্রতাপ খুশি হল।
সে তো সর্বদা এমনি অনুগত কর্মচারী চায়।
সেই সঙ্গে লক্ষ্মণ পণ্ডিতকে এক মাস পরে উপযুক্ত একটি দিন ধার্য করতে বলল।
শঙ্করকে বলেছিল, ‘বন্ধু, সমস্ত রাজ্যে ঢ্যাঁড়া দিয়ে দাও, যশোরেশ্বরীর মন্দির সংস্কারের জন্য অতিরিক্ত রাজকর দিতে হবে সাধারণ মানুষকে। আর এই কর আগামী এক মাসের মধ্যেই আদায় করতে হবে।’
শঙ্কর মৃদু আপত্তি করে বলেছিল, ‘এই সুখের সময়ে প্রজাদের উপরে অতিরিক্ত কর চাপানো কি ঠিক হবে! আমরা তো উৎকলরাজের কাছ থেকে অনেক উপঢৌকন পেয়েছি।’
সেখানে উপস্থিত খুল্লতাত বসন্ত রায় বললেন, ‘শঙ্কর ঠিকই বলেছে।’
বসন্ত রায় প্রতাপের এই বিগ্রহ প্রাপ্তিতে বিশেষ আনন্দিত হয়েছেন।
কিন্তু প্রতাপ কারোর কথায় কর্ণপাত করল না। তার ভিতরে যেন একটা বাঘের মতো অহংকার ফিরে এসেছে। সে ভাবতে শুরু করেছে, মোগলদের সে পরাজিত করেছে। এবার বাকি সবাই তার কাছে মাথা নত করবে।
মহারাজের নির্দেশ পেয়ে সূর্যকান্ত পার্শ্ববর্তী স্বাধীন রাজাদের নিমন্ত্রণপত্র পাঠাবার ব্যবস্থা করল। এ শুধু মা যশোরেশ্বরীর মন্দিরের সংস্কার নয়, বরং প্রতাপ তার সমৃদ্ধির অহংকার আর মোগলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধজয়ের প্রচার করতে চাইল।
মন্দির প্রতিষ্ঠার পরে এক সপ্তাহ ব্যাপী সারা রাজ্য জুড়ে উৎসব চলল। পার্শ্ববর্তী বাকলা, চন্দ্রদ্বীপ, সাতোর, দিনাজপুর, আরাকান থেকে রাজারা এসেছিলেন। এই উৎসব সমাপন করে প্রতাপ মনে মনে এক আত্মপ্রসাদ অনুভব করল।
শঙ্কর ভেবেছিল এই সবের ফলে প্রতাপের মন থেকে তন্ত্রমন্ত্রের ভূত নেমে যাবে। কিন্তু, এই তন্ত্র সাধনা একটা নেশার মতো। আবার সে আস্তে আস্তে এই সাধনায় নিজেকে যুক্ত করতে লাগল। ফলে দিনে দিনে তার মধ্যের নিষ্ঠুরতা যা এক সময়ে প্রচ্ছন্ন ছিল, তা আবার মাথা তুলে দাঁড়াতে লাগল।
এই সময়েই একদিন গোবিন্দ তার কাছে ধূমঘাটের পুরানো বাগানবাড়ি ও তৎসংলগ্ন নাচঘর চেয়ে বসল। অবশ্য সে দাবি করল না। প্রতাপের সামনে দাঁড়িয়ে জোর গলায় দাবি করার সাহস তার নেই।
প্রতাপ প্রথমে অস্বীকার করেছিল।
‘না না, এ নিয়ে তুমি কী করবে! তোমার গৃহে তো নাট-মন্দির আছে।’
সেই স্থানে শঙ্কর উপস্থিত ছিল। সে বলল, ‘রাজা, দিয়ে দাও না। তোমারই তো ভ্রাতা!’
কথাটা বলে সে চোখে চোখে ইশারা করল প্রতাপকে।
সন্ধ্যার পরে প্রতাপের চোখে ঢুলু ঢুলু নেশা। তবু সে শঙ্করের চোখের ভাষা পড়তে পারল। এই ইশারার ভাষা তাদের বহু পুরাতন। সেই ছেলেবেলা থেকে তারা অন্যের সম্মুখেও এই ইশারায় পরস্পরকে নিজেদের মনের ভাব প্রকাশ করতে পারে। দুজনেই দুজনের চোখের ভাষা বুঝতে পারে।
প্রতাপের অনুমতি পেয়ে গোবিন্দ খুশি হয়ে বিদায় নিলে, প্রতাপ কিছুটা মশকরার ভঙ্গিতে বলল, ‘কী রে শঙ্কর, তুই কি ব্রহ্মচারী হয়েই কাটিয়ে দিবি! বিবাহ কি করবি না?’
শঙ্কর কোনও কথা বলল না। মৃদু হাসল।
শঙ্করের কোনও উত্তর না পেয়ে, প্রতাপ আবার বলল, ‘উৎকল থেকে যাকে সঙ্গে করে নিয়ে এলি, তার প্রতি কি তোর মন মজেছে?’
প্রতাপ নিজের রসিকতায় নিজেই হা হা করে হেসে উঠল। তারপরে আবার বলল, ‘ম্লেচ্ছকেই যদি তুই নিকা করতে চাস, আমার কোনও আপত্তি নেই। আমি দাঁড়িয়ে থেকে তোদের বিয়ে দেব। তুই মুখ ফুটে শুধু একবার বল দেখি।’
আবার প্রতাপের পাহাড়ের মতো বুক ফাটানো হাসি।
শঙ্করও তার হাসির পালটা যেন মৃদু হাসল।
‘কী বলছ রাজা! ব্রাহ্মণসমাজ কি মেনে নেবে? কোনও ব্রাহ্মণই কি বিয়ে দিতে চাইবে? আমাকে সমাজচ্যুত করবে না?’
হাসি থামিয়ে প্রতাপ যেন বাঘের মতো ফুঁসে উঠল, ‘কে মেনে নেবে না? আমি মহারাজা প্রতাপাদিত্য বলছি! কার ঘাড়ে কটা মাথা আছে অস্বীকার করবে? তুই শুধু একবার হ্যাঁ বল।’
শঙ্কর এবার শব্দ করে হেসে উঠল।
‘না না, রাজা, তোমাকে কিছু করতে হবে না। করার মতো কিছু নেইও!’
শেষের দিকে তার কথায় যেন একটা বেদনা ফুটে ওঠে।
শঙ্কর নিজেও ঠিক বুঝতে পারে না, ফরিদাকে সে কী চোখে দেখে। তার প্রতি ফরিদার মনোভাবও সে সঠিক বুঝে উঠতে পারে না। আসলে নারীজাতির বিষয়ে সে একেবারেই অজ্ঞ। তবু ফরিদার প্রতি একটা সখ্য সে অনুভব করে। ফরিদাও কি করে না? উৎকলের যে পঙ্কিল আবর্তে সে নিমজ্জিত ছিল, সেখান থেকে শঙ্কর এক প্রকার তাকে চুরি করেই নিয়ে এসেছে। জানতে পারলে, উৎকলের বেগমসাহেবা কি উৎকল অধিপতির কাছে নালিশ করে ফরিদার এই পলায়নে বাধা দিত না!
কিন্তু এখানে এসেও তো তাকে সেই একই কাজ করতে হবে এখন। এক পঙ্কিলতা থেকে বেরিয়ে এসে ফরিদা কি আর এক পঙ্কিলতার পুষ্করিণীর মধ্যে নিমজ্জিত হতে যাচ্ছে! কিন্তু এই বলিষ্ঠ দৃঢ় সংকল্প মানুষটির প্রতি অবিশ্বাসী হতে তার মন চায় না। উৎকল থেকে প্রত্যাবর্তনের পরে, শঙ্কর তার দ্বিতল গৃহের ভিতরমহল ফরিদার জন্য ছেড়ে দিয়েছিল। ফরিদা তাতেই যেন কৃতার্থ হয়ে গিয়েছে। তাই তো ! এমন সমাদর কি সে পেয়েছে কখনও? তার জন্য নিজস্ব দাসী, পরিচারিকা রেখেছে শঙ্কর। কিন্তু সবই গোপনে। আসলে শঙ্করের গৃহটিও একটি দুর্গ বিশেষ। বাইরে উচ্চ প্রাকার। সর্ব সময়ে রক্ষী দ্বারা সুরক্ষিত। তার ভিতরে বৃহৎ গাছগাছালি পরিবেষ্টিত উদ্যান। সেই উদ্যানের ভিতরে গৃহ। ভিতরের কোনও বিষয়ই বাইরে বেরিয়ে আসে না। একান্ত বিশ্বস্ত রক্ষী আর পরিচারিকারা সেখানে সর্বদা নিয়োজিত থাকে। কিন্তু ফরিদার সঙ্গে শঙ্করের দিনান্তে হয়তো একবার সাক্ষাৎ হয়। কোনও কোনও দিন তাও হয় না। শঙ্কর তাকে কুশল জিজ্ঞাসা করে। তার ভালো-মন্দের সংবাদ নেয়। ফরিদা লাজুক নয়, বরং প্রভূত প্রগলভ সে। শঙ্করের কথার উত্তরে সে অনেক কিছু বলতে চায়। কিন্তু পাথরের মানুষটার মুখের দিকে তাকিয়ে তার সমস্ত কথা যেন মূক হয়ে যায়! এক সময়ে শঙ্করের কথা ফুরিয়ে যায়। মুখোমুখি তারা অনেকক্ষণ বসে থাকে। ফরিদা নির্নিমেষ নয়নে মানুষটার পাথরে কোঁদানো শরীরটার দিকে তাকিয়ে বসে থাকে। আহা! আল্লা যেন যত্নের সমস্ত মনোযোগ ঢেলে দিয়েছে মানুষটাকে গড়তে। শরীরের কোথাও কোনও খাদ নেই। ওই শরীরটার প্রতি তার বড়ো লোভ হয়। এক অনির্বচনীয় শৃঙ্গারে তার ভিতরটা ভেসে যায়। এই মানুষটাকে তার সর্বস্ব দিয়ে দিতে মন বড়ো ব্যাকুল হয়ে হঠে। কিন্তু শঙ্করের সেই দিকে কোনও খেয়াল নেই। তার শরীরের সৌন্দর্য কি এতটাই ভোঁতা হয়ে গিয়েছে যে, এই মানুষটার মনকে এতটুকু স্পর্শ করতে পারছে না? শঙ্কর উঠে চলে গেলে ফরিদা তেমনি চুপ করে বসে থাকে। অন্ধের মতো এক বেদনায় সে নিমজ্জিত হয়ে যায়। তার মাঝে মাঝে যেন মনে হয় সে কি বন্দি হয়ে আছে এখানে। অনেক রাত্রি তার নির্ঘুম কেটে যায়।
শঙ্করের বুকের ভিতরেও একটি বেদনা। এই ব্যথা সে আগে কখনও অনুভব করেনি। ফরিদার মুখটা তার মনের মধ্যে ভেসে ওঠে আজকাল। কিন্তু সে বড়ো কষ্টে জোর করে সেই মুখকে যেন বুকের মাটি থেকে উপড়ে সরিয়ে রাখে। কঠিন এক সংকল্প তাকে সম্পূর্ণ করতে হবে। সেই কার্যের ভবিষ্যৎ সে এখনই ঠিক অনুমান করতে পারছে না। কিন্তু তা সমাধান না করে আবেগে ভেসে যাবার কোনও অবসর তার নেই। সে বড়ো কঠোর ভাবে নিজের মনকে শান্ত করে রেখেছিল।
একদিন তামিম ফিরে এল অনেক রাত্রে। শঙ্করের তখনও ঘুম আসেনি। কত অলীক স্বপ্ন তার মাথাকে উত্তপ্ত করে রেখেছে। প্রতাপের মতো তারও একান্ত কামনা, বঙ্গ আবার বিদেশিদের কবলমুক্ত হবে। প্রহরী তাকে সংবাদ দিলে শঙ্কর নিজের দর্শনার্থীদের জন্য নির্দিষ্ট কক্ষে চলে যায়। ঘরে অল্প আলোর প্রদীপ জ্বলছে। দেওয়ালে তামিমের শীর্ণ ছায়া যেন সরীসৃপের মতো মনে হয়।
‘কী খবর তামিম?’
‘হুজুর, এবার আমার পাক্কা খবর। কিন্তু গোবিন্দ রায়ের পেটের ভিতর থেকে এবার কথা বার করতে হবে।’
তার পরে দুইজনে বসে পরামর্শ করে।
তামিম চলে গেলে, শঙ্কর গুম হয়ে অনেকক্ষণ বসে থাকল। তারপরে নিজের সমস্ত জড়তা ঝেড়ে ফেলে সে অন্তঃপুরের দিকে চলে যায়।
ফরিদারও তখনও ঘুম আসেনি। তার নিজস্ব দাসী তাকে সংবাদ দেয়।
- হুজুর এসেছেন!
ফরিদা ধড়মড় করে শয্যায় উঠে বসে। এত রাত্রে কেন? তবে কি....? সে যেন আর ভাবতে পারে না। একটা আশা নিরাশার দোলাচলে সে কাঁপতে থাকে যেন। দ্বার ঠেলে ভিতরে প্রবেশ করে শঙ্কর।
ফরিদা দেখে, শঙ্করের চোখ দুটি জবাকুসুমের মতো লাল।
কোনও ভণিতা না করে শঙ্কর দাসীকে বাইরে চলে যেতে বলে। দাসী চলে গেলে সে দ্বার বন্ধ করে দিয়ে এসে ফরিদার মুখোমুখি দাঁড়ায়। নিজের সমস্ত শক্তিকে সঞ্চয় করে সে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফরিদার মুখের দিকে তাকিয়ে সে কোনও ভাবেই নিজেকে দুর্বল করে দিতে পারবে না।
ভণিতাহীন, প্রেমহীন যান্ত্রিক গলায় সে বলল, ‘ফরিদা, তোমাকে এবার আমার একটি কাজ করতে হবে। গোবিন্দ রায়ের সংসর্গ করতে হবে। তার পেটের ভিতর থেকে সমস্ত কথা বার করতে হবে।’
ফরিদার মাথায় যেন বাজ পড়েছিল। সে কি সঠিক শুনছে! কিন্তু তার পরেই তার মন যেন ভেঙে যায়। চোখ দিয়ে ধারার মতো অশ্রু নামে। ঠিকই তো! সে যে একটা পতিতা। পতিতার কর্মই তাকে করতে হবে। এত দিন যা সে করে এসেছে, এখন প্রেমাস্পদের জন্য সে আবার তা করতে পারবে না! নিশ্চয়ই সে পারবে। সে হাত তুলে তার চোখের জল মুছল। কিন্তু চোখে যেন বান ডেকেছে। কিছুতেই সে কোনও বাধা মানছে না। শঙ্কর না জানুক, সে তো তার সমস্ত মন প্রাণ শঙ্করের কাছে সঁপে দিয়েছে। মন তো তার কলুষিত হয়নি আজও। এই পঙ্কিল শরীর প্রেমের ছোঁয়া না হয় নাই পেল। আল্লাও হয়তো তাই চাইছেন। সে নিজেকে শক্ত করল। সে তার প্রেমের জন্য সব পারবে। এমনকি যদি প্রয়োজন হয় তবে নিজের প্রাণও দিতে পারবে।
চোখের জলে ভেসে যাওয়া মুখ সে শঙ্করের মুখের দিকে তুলে বলেছিল, ‘আমি পারব প্রিয়। তুমি যা চাইবে সব আমি পারব। আমার প্রাণের বিনিময়েও তা পারব।’
ফরিদার মনের আর কোনও অর্গল নেই।
‘আমি তোমাকে ভালোবাসি। ভালোবাসার জন্য এইটুকু পারব না! কী করতে হবে বলে দাও।’
এই প্রথমবার ফরিদা তার সঙ্গে এমন ভাবে কথা বলল। শঙ্করের প্রথম দিনের কথা মনে পড়ল। ফরিদা সেদিন মহারানির সামনে তাকে নিয়ে প্রগলভতা করেছিল। আজ সে সম্পূর্ণ বদলে গিয়েছে।
কিন্তু শঙ্করের নিজেকে দুর্বল করলে চলবে না। তার যে দুই বাহু কোনও বশ মানছে না, উদগ্র নেশায় সে ছুটে গিয়ে ফরিদাকে জড়িয়ে ধরতে চাইছে। কিন্তু কিছুই করতে না পেরে তার সারা শরীর যেন ভীষণ রাগে থর থর করে কেঁপে উঠছে। কিন্তু কীসের রাগ! শঙ্কর ঠিক বুঝতে পারছে না। সে কোনও ক্রমে তার পরিকল্পনার কথা বলে ঝড়ের মতো বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।
সেই মতো আজ কয়েকদিন হল, তামিম পৌঁছে দেয় ফরিদাকে গোবিন্দ রায়ের প্রমোদ উদ্যানে। অবশ্য এই আয়োজন সহজে হয়নি, তামিম সব ব্যবস্থা করেছে। গোবিন্দের এক মোসাহেব তারিণী চাটুজ্জেকে অনেক অর্থের বিনিময়ে ক্রয় করতে হয়েছে।
তামিম পাথরের মানুষ হতে পারে। কিন্তু তার বুকের ভিতরেও একটা ব্যথা জমে আছে। ফরিদা তাকে আব্বা বলে ডাকে।
তামিম ভাবল আজ এত বিলম্ব হচ্ছে কেন! তবে কি কোনও বিপদ ঘটল! সে কি একটু এগিয়ে গিয়ে দেখবে? একটু দোলাচলের মধ্যে থেকেই সে এগিয়ে গেল। না, তাকে বিশেষ এগিয়ে যেতে হল না। সহসা প্রধান ফটক খুলে একটি বস্তুকে কে যেন ধাক্কা মেরে বাইরে ফেলে দিল। আবার শব্দ করে দরজা বন্ধ হয়ে গেল।
তামিম ছুটে গেল সেই দিকে। এ কী! কী অবস্থা হয়েছে ফরিদার! যেন তাকে ছিঁড়ে কুটি কুটি করেছে তারা। ঠোঁট কেটে ঠোঁটের কশ বেয়ে রক্ত বেরিয়ে আসছে। ভালো করে কথা বলতে পারছে না সে।
প্রচ্ছন্নভাবে একটি অশ্ব শকট লুকানো ছিল। তাতে করে দ্রুত ফরিদাকে গৃহে পৌঁছে দেয় তামিম।
প্রিয় মানুষের এই অবস্থা দেখে শঙ্করের মাথায় যেন রক্ত উঠে যায়। সে মাথার কাছে বসে ফরিদার কপালে হাত রাখে। ফরিদার চোখের কোণ দিয়ে কয়েক ফোঁটা অশ্রু নামে। জড়িয়ে যাওয়া কণ্ঠস্বরে সে বলে,
‘রাজ্যে বড়ো বিপদ। গোবিন্দ রায় ষড়যন্ত্র করছে চাঁদ রায়ের সঙ্গে। হরে শুঁড়িকে দিয়ে রাজ্যের অস্ত্র পাচারের পিছনে ছিল গোবিন্দ রায়।’
তার কথা যেন জড়িয়ে আসে। ততক্ষণে রাজবৈদ্য কালিপদ পণ্ডিতকে ডেকে নিয়ে আসা হয়েছে। কেউ কোনও দিন শঙ্করের চোখে জল দেখেনি। সেই চিরকালের শুকনো চোখ থেকে দুফোঁটা অশ্রু ফরিদার কপালে পড়ল। ফরিদা তা অনুভব করতে পারল কি না আল্লা জানেন।
পণ্ডিতমশাই বললেন, ‘শঙ্কর তুমি অন্যত্র যাও। আমি ভালো করে পরীক্ষা করি।’
শঙ্কর ধরা গলায় বলল, ‘যেমন করে হোক ফরিদাকে সুস্থ করে তুলতে হবে ঠাকুরমশাই।’
কালিপদ পণ্ডিত বেদনার হাসি হাসলেন।
‘সব কি আর আমার হাতে! মা যশোরেশ্বরীর কৃপা থাকলে সব সম্ভব।’
ঘর থেকে বেরিয়ে শঙ্কর মুখোমুখি হল তামিমের। তামিম ঠায় সেখানে বসে আছে। সে তার প্রিয় বিটিয়ার সুস্থতার সংবাদ না নিয়ে যাবে না।
শঙ্করকে দেখে সে বলল, ‘হুজুর, গোস্তাকি মাফ করবেন। আমি আগে বুঝতে পারিনি এমন হবে।’
সে কেঁদে ফেলল।
শঙ্কর তার কাঁধে হাত রাখল।
তামিম আবার বলল, ‘গোবিন্দ কিছু সন্দেহ করেছে। তারা ভেবেছিল ফরিদা বুঝি মরে গেছে। ফরিদা বেঁচে আছে সেই সংবাদ তারা পেয়েছে। আমার যে চর পরিচারিকার কাজ করে সেও তাই বলে গেল কিছুক্ষণ আগে। হুজুর আমাদের আর দেরি করা ঠিক হবে না। মহারাজকে সংবাদ দিয়ে দেওয়াই ভালো।’
শঙ্করও তাই ভেবেছে।
সে জিজ্ঞাসা করল, ‘গোবিন্দ কি প্রমোদগৃহ ছেড়ে গৃহে ফিরে গেছে?’
‘জি হুজুর। পাকা খবর।’
সে ঘোড়া ছুটিয়ে দিল প্রতাপের দুর্গের দিকে।
প্রহরীকে গিয়ে বলল, ‘মহারাজকে সংবাদ দিতে হবে। যাও এখনই।’
প্রহরী শঙ্করের এই মূর্তি দেখেনি।
প্রতাপ নেশার ঘোরে ঘুমিয়ে ছিল। অন্য একটি পালঙ্কে শয়ন করে ছিল শরৎকুমারী। তার কোলের কাছে আপন কন্যা আর খুল্লতাত বসন্ত রায়ের দ্বিতীয় পক্ষের কনিষ্ঠ পুত্রটি ঘুমিয়ে ছিল। এই পুত্রটি শরৎকুমারীর বড়ো ন্যাওটা। নিজের মার থেকে বেশি সে শরৎকুমারীর কাছেই থাকে।
প্রতাপ প্রথমে ক্রুদ্ধ হয়। এই ভোররাতে কে তার ঘুম ভাঙায়! পরে যখন সে শুনল শঙ্কর এসেছে দেখা করতে, তখন তার রাগ স্তিমিত হয়।
তারপরে শঙ্করের কাছ থেকে যখন সে বিস্তারিত শুনল তখন তার ক্রোধ কে দেখে! তার এমন ক্রোধ আগে কেউ দেখেনি! হুংকার দিয়ে সে অস্ত্রাগার থেকে তার প্রিয় খড়্গ নিয়ে এসে ছুটে যায় খুল্লতাতের বাসভবনের দিকে। ততক্ষণে প্রহরীরা জেগে গিয়েছে। চারদিকে একটা চাপা হইচই। প্রতাপ সেই ভবনে ঢোকার মুহূর্তেই গোবিন্দ রায় আগে থেকেই সংবাদ পেয়ে অস্ত্র হাতে নিয়ে নিয়েছে। প্রতাপকে দেখেই সে একটা ভল্ল নিক্ষেপ করল। কিন্তু নেশার ঘোরে থাকলে কী হবে প্রতাপের যুদ্ধকৌশল প্রশ্নাতীত। সে সেই ভল্লের আঘাত এড়িয়ে লাফিয়ে গোবিন্দ রায়ের কাছে গিয়ে এক আঘাতে তার মাথা ধড় থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে।
এদিকে গোবিন্দ রায়ের রক্ষীদের মহড়া নিচ্ছে শঙ্কর। তার তরবারির আঘাতে একের পার এক রক্ষী ভূমিশয্যা নিচ্ছে। বাকিরা আর এগোতে সাহস পাচ্ছে না।
প্রতাপ শুধু গোবিন্দ রায়কে বধ করে ক্ষান্ত হল না। সে খুল্লতাতের কক্ষে যেতে গিয়ে শুনল, বসন্ত রায় চিৎকার করে বলছে, ‘ওরে কে আছিস, আমার ‘গঙ্গাজল’ নিয়ে আয়।’
প্রতাপের মাথায় এমনিতেই আগুন জ্বলছিল। খুল্লতাতের ‘গঙ্গাজল’-এর কথা শুনে সেই আগুনে ঘৃতাহুতি পড়ল।
এক কোপে খুল্লতাতকেও বধ করল সে।
সমস্ত গৃহ রক্তে রক্তে ভেসে গেল। এক এক করে সমস্ত তুতো ভাইদের সে বধ করল। কাউকেই সে জীবিত রাখল না।
শুধু শরৎকুমারী এই ভীষণ সংবাদ পেয়ে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে নিজের কোলের কাছে শায়িত শিশু কাঁচু রায়কে এক পরিচারিকাকে দিয়ে অন্যত্র পাঠিয়ে দেওয়াতে বসন্ত রায়ের বংশ রক্ষা পেল।
ক্রোধের বশে এই পুত্রটির কথা প্রতাপের খেয়াল ছিল না।
যখন সে সংবাদ পেল, তখন কাঁচু রায়কে নিয়ে তার মাতুল সন্দ্বীপের উদ্দেশ্যে পাড়ি দিয়েছে। প্রতাপ আর তাকে হস্তগত করতে পারল না।
দূরদর্শী প্রতাপ স্ত্রীকে মৃদু তিরস্কার করে বলল, ‘শরৎ তুমি ঠিক করলে না! শত্রু আর আগুনের শেষ রাখতে নেই।’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন