অবিন সেন
বিবাহের পরে যে কয়েকটা দিন প্রতাপ আর শরৎকুমারী ধূমঘাটে মধুচন্দ্রিমা কাটাচ্ছিল সেই কয়টি দিন শঙ্করও একা একা নিজের সঙ্গে নিজের নিবিড়তায় মেতে ছিল। আসলে সে বুঝতে পারছে তাদের জীবনে এবার একটা পরিবর্তন আসতে চলেছে। প্রতাপ আর সেই সঙ্গে তারাও একটা সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে। এই পরিবর্তনের জন্য তাদের নিজেদের প্রস্তুত থাকতে হবে। প্রস্তুত করতে হবে অন্যদেরও। সে ভালো করেই জানে প্রতাপ এই সবের ধার ধারে না। প্রতাপের কর্মপন্থা পরিচালিত হয় আবেগের বশে। কতকটা হঠকারিতায়। এই ভাবে চললে তো বেশি দূর অগ্রসর হওয়া যাবে না! শঙ্কর ভালো করেই জানে, প্রতাপের হাতে প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক সিদ্ধান্তের রসদ তাকেই এগিয়ে দিতে হবে। কিন্তু তার জন্য তো তাকেও প্রস্তুত হতে হবে। উপযুক্ত প্রস্তুতি ছাড়া, শুধু মাত্র আকাশকুসুম কল্পনা করে তো আর রাজা হওয়া যায় না! সেও স্বপ্ন দেখে তার প্রিয় প্রতাপ একদিন গৌড়ের তখতে বসবে। তবে সে বিলক্ষণ জানে খোয়াবের আশমানে উড়ে বেড়ালে তো আর নসিব সাথ দেবে না!
এই কয়েকদিন নিভৃত অবসরে বসে সে শাস্ত্র অধ্যয়ন করল। অধ্যয়ন করল গণিত। আসলে নিয়মিতই সে তা করে আসছে তবে এ যেন চূড়ান্ত পরীক্ষার আগে নিজের মন ও মস্তিষ্ককে কেন্দ্রীভূত করবার অধ্যয়ন। যাতে করে উপযুক্ত সময়ে সে তার অধীত শিক্ষাকে কাজে লাগাতে পারে।
তারপরে পিতার নির্দেশে আগ্রা যাবার কথায় যখন প্রতাপ বন্ধুদের কাছে তার অনিচ্ছার কথা প্রকাশ করেছিল, তখন শঙ্কর তাকে ঠান্ডা মাথায় বুঝিয়েছিল। বলেছিল, ‘রাজা, আমাদের এখন সমঝদারি দিয়ে সব কিছু বিচার করতে হবে। এই নির্দেশকে শাপে বর হয়েছে বলেই মনে করো। দেখো, বাংলায় হুকুমত চালাতে হলে আগে আমাদের মোগলদের মতো দেশবিজয়ের শাহি শিক্ষায় শিক্ষিত হতে হবে। সেই শিক্ষা তো আর এখানে বসে হবে না। আগ্রাই হোক আমাদের সেই পাঠশালা। তোমার পিতা এমনিতেই তোমার প্রতি খুশি নন। এখন তাঁর নির্দেশ অমান্য করলে তিনি আরও ক্ষুব্ধ হতে পারেন। আর পিতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হওয়ার এটা উপযুক্ত সময় নয়।’
প্রতাপ অনুধাবন করতে পারে শঙ্করের যুক্তি। তার পরে সে রাজি হয়।
তবে আগ্রা যাত্রার পূর্বে শঙ্করেরও অনেক কাজ করার আছে। পিতার বয়স হচ্ছে। তা ছাড়া বাকলার ঘটনার পরে মানুষটা কেমন যেন হয়ে গিয়েছে। তিনি যেন এই পৃথিবীর যাবতীয় চলমান বিষয় থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন। তার উপরে বোনটা সবে কিশোরী। তবু দুই ভাই বোন মিলে পিতার দেখাশুনা করে। এখন দীর্ঘ সময় সে দূরে থাকলে কে তাদের দেখাশুনা করবে! একদিকে প্রতাপ আর একদিকে তার নিজের পরিবার—এই দুই দিকের কোনও দিককেই সে অবহেলা করতে পারবে না। এই উভয় চিন্তায় সে দীর্ণ হয়ে যাচ্ছিল।
একদিন প্রতাপ তাকে চিন্তান্বিত দেখে বলল, ‘কী রে শঙ্কর তোর মুখ চোখ এমন দেখাচ্ছে কেন? আগ্রা যাওয়া নিয়ে কি খুব চিন্তা করছিস?’
কতকটা নিমরাজি হয়েও শঙ্কর বলল, ‘রাজা একটা সমস্যায় পড়েছি, তুমি একটা সমাধান বাতলাও না!’
সে ধীরে ধীরে বোন সরমা আর পিতাকে দেখাশুনা করবার বিষয়টা বলল।
প্রতাপ যেমন একটু ক্ষুণ্ণ হয় আবার তেমনি তার প্রতি বন্ধুর এই স্বার্থত্যাগ তাকে আপ্লুত করে। তবু কিছুটা ক্ষুণ্ণ গলাতেই বলে, ‘শঙ্কর এই কথাটা আমাকে জানাতে তোর এত সংকোচ! তোর পরিবার তো আমার -ও পরিবার। আমি আজই দেখাশুনা করবার লোকের ব্যবস্থা করছি।’
কথাটা বলেই হঠাৎ তার নিজেরই যেন মনে হল, কাজের লোক তো বেতনভুক বাইরের লোক। তারা কি উপযুক্ত দেখাশুনা করবে! হঠাৎ বিজলি চমকের মতো তার মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে যায়। তাদের লক্ষ্মণ পণ্ডিতের কনিষ্ঠ পুত্রটি তো তাদের বয়সি। ছেলেটি ভালো। পালটি ঘর। শঙ্করের বোনের সঙ্গে সম্বন্ধ করলে কেমন হয়! এর ফলে সব দিক রক্ষা হয়। শঙ্করও নিশ্চিন্ত হতে পারবে।
সে মৃদু হেসে বলল, ‘শঙ্কর আমাদের বোন সরমার বিবাহের ব্যবস্থা করলে কেমন হয়! আমার সন্ধানে উপযুক্ত পাত্র আছে একটি।’
শঙ্কর একদৃষ্টিতে প্রতাপের দিকে তাকাল। রাজা মন্দ প্রস্তাব করেনি।
প্রতাপ তাকে চুপ থাকতে দেখে পাত্রের কথা বিস্তারিত ভাবে বলল।
শঙ্কর বলল, ‘কিন্তু পণ্ডিতমশাই কি রাজি হবেন?’
‘সে চিন্তা তোকে করতে হবে না। আমি যেখানে ঘটক সেই ঘটনা নিশ্চিত ভাবেই ঘটবে।’
প্রতাপ আর শরৎকুমারীর চেষ্টায় সরমার বিবাহ হয়ে গেল খুব ধুমধাম করেই। তার ফলে আগ্রা গমনের পূর্বে শঙ্কর অনেকটা চিন্তামুক্ত হয়। এর পর আগ্রা যাত্রার উদ্যোগে তারা কোমর বেঁধে নেমে পড়ে।
পোর্তুগিজদের নৌকার প্রতি প্রতাপের সব সময়েই একটা আকর্ষণ ছিল। তার মনে হয় বাঙালিদের নির্মিত নৌকার থেকে ওই সকল নৌকা অনেক বেশি উৎকর্ষ স্থানীয়। সেই কারণে আগ্রা যাত্রার পূর্বে পোর্তুগিজদের কাছ থেকে একটি উন্নতমানের ডিঙা খরিদ করল সে। এই ধরনের ডিঙা বাতাসের অনুকূল বা প্রতিকূল উভয় দিকেই সমানভাবে চলাচল করতে পারে।
চ্যান্ডিক্যানে আর এক যুবকের সঙ্গে পরিচয় হয় প্রতাপের। ফ্রেডারিক ডুডলী এখন তার বাবার ব্যবসাটা দেখাশুনা করে। তার বাবা আদ্রিয়ানো এক স্প্যানিশ জাহাজ কারিগরের কাছে কাজ করত। তার কাজে মুগ্ধ হয়ে এক পোর্তুগিজ নাবিক তাকে জাহাজে মেরামতির চাকরি দেয়। সেই সূত্রেই ভাসতে ভাসতে তার ভারতে আসা। কিন্তু চ্যান্ডিকানে এসে সে আর জলে ভাসেনি, বরং এখানেই একটা জলযান নির্মাণের কর্মশালা খুলে বসে। আদ্রিয়ানো দেখেছিল জলদস্যুদের কাছে উন্নত মানের নৌকার খুব প্রয়োজন। অচিরেই তার ব্যবসা ফুলে ফেঁপে ওঠে। সে ভেবে দেখেছিল দেশে ফিরে গিয়ে আর লাভ নেই! বরং এই স্থানেই থিতু হওয়া যাক। তা ছাড়া একটি বাঙালি কন্যাকে তার মনে ধরেছিল। এ দেশীয়দের গায়ের বর্ণ বাদামি। কিন্তু মেয়েরা বড়ো নমনীয়। শ্যামলা মেয়েটিকেই ঘরে তুলে পাকাপাকি ভাবে চ্যান্ডিকানেই সংসার পেতেছিল সে। সেই থেকে কত বছর হয়ে গেল। ফ্রেডারিক বাপের মতোই গায়ের রং পেয়েছে। কিন্তু বাংলার জলীয় হাওয়ায় সে রঙের উপরে এক পোঁচ মেঘলা রঙের আস্তরণ পড়েছে যেন। আদ্রিয়ানো এখন বৃদ্ধ হয়েছে। যৌবনে শরীরের উপরে অত্যাচার এখন যেন তার উপরে প্রতিশোধ নিচ্ছে। নানা রোগব্যাধি। চোখেও সে ভালো দেখতে পায় না। ফলে এখন কর্মশালা, ব্যবসার সমস্ত দায়িত্ব যুবক ফ্রেডারিকের উপরে। তবে যোগ্য হাতেই এই দায়িত্ব ন্যস্ত হয়েছে। এই অল্প বয়সেই নির্মাণ কৌশলে সে তার পিতাকে ছাড়িয়ে গিয়েছে।
কার্লোস তার সঙ্গে প্রতাপের পরিচয় করিয়ে দিল। বলল, ‘যশোরের যুবরাজ।’
যদিও চ্যান্ডিকান ঠিক যশোরের অধীনস্থ নয়। পোর্তুগিজরাই তাদের নিজেদের মতো করে শাসনব্যবস্থা কায়েম রেখেছে।
তবুও ফ্রেডারিক তাকে যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করে তার প্রিয় কয়েকটি নৌকার কার্যকারিতা ব্যাখ্যা করল। প্রতাপ ঘুরে দেখতে দেখতে বিস্মিত হয়ে যায়। সেই সঙ্গে সে মাথায় একটা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ছকে নিয়েছে। ভেবেছে ভবিষ্যতে এই ফ্রেডারিক মানুষটি তার কাজে আসবে।
শুভদিনে রওনা হবার পরে কয়েকটি দিন গঙ্গার তীরবর্তী প্রকৃতির শোভা দেখতে দেখতে কেটে গেল। তারপরে এই নিরন্তর যাত্রা তাদের কাছে বিরক্তিকর আর একঘেয়ে লাগতে লাগল। বার বার চেতনায় অবচেতনায় শরৎকুমারীর মুখটি মনে পড়ে প্রতাপের। কী করছে সে এখন? সেও কি প্রতাপের কথা ভাবছে?
একদিন সূর্যকান্ত বলল, ‘রাজা, চলো আমরা বরং কুস্তি অভ্যাস করি।’
প্রতাপও হেসে উঠল।
‘বাহঃ! ভালো বলেছিস তো।’
তবে শুধু শঙ্কর আর সূর্যকান্তই নয় প্রতাপের নৌকার মাঝিমল্ল সকলেই অংশ নেয় কুস্তির অনুশীলনে। এ শুধু সময় কাটানো নয়, শরীরচর্চাও।
একটানা জলযাত্রায় ক্লান্ত হয়ে তারা দুদিনের জন্য গৌড়ে অবস্থান করল। গৌড় এখন যেন এক মৃত শহর। মোগল আক্রমণে বিধ্বস্ত গৌড়ের আর কোনও জৌলুস অবশিষ্ট নেই। মোগলরা তাদের রাজধানীও গৌড় থেকে রাজমহলে স্থানান্তরিত করে নিয়েছে। কিন্তু প্রাচীন রাজধানীর সেই গৌরব আর ফিরে আসেনি। প্রতাপ আর শঙ্কর ছদ্মবেশ ধারণ করে দুদিন রাজমহলের পথে-ঘাটে ঘুরে বেড়াল। প্রত্যক্ষ করল মোগলদের অপশাসন। সাধারণ মানুষের উৎপীড়ন চোখের সামনে তারা প্রত্যক্ষ করল। দেখতে দেখতে তারা যেন তাদের রক্তের ভিতরে এর প্রতিবিধানের জন্য কল্লোল অনুভব করল।
সত্যি তো, সামান্য কয়েকজন বিদেশি কোন সুদূর থেকে এসে সমগ্র আর্যাবর্ত শাসন করছে! অথচ ভারতীয় রাজা মহারাজারা নিজেদের মধ্যে লড়াই করে বিবাদ করে মোগলদের কাজটিকে আরও সহজ করে তুলেছে।
বিষণ্ণ মনে ডিঙার প্রশস্ত পাটাতনের উপরে বসে বসে সূর্যাস্ত দেখতে দেখতে প্রতাপ বলল, ‘দেখ শঙ্কর, একদিন কী জৌলুসই না ছিল এই গৌড়ের। সমগ্র অবিভক্ত বঙ্গের রাজধানী। কত না গল্প শুনেছি ছেলেবেলায়। খুল্লতাত আমাকে গৌড়ের গৌরবের গল্প শোনাত। আর এখন দেখ। সে গৌড় আজ শ্মশানে পরিণত হয়েছে।’
একটু থেমে আবার বলল, ‘এমনকি বহিরাগত মোগলরা এসে আমাদের গৌরবকে ধ্বংস করে নতুন করে তাদের রাজধানী স্থাপন করেছে।’
শঙ্কর কোনও উত্তর দেয় না। কী বা উত্তর দেবে। প্রতাপ যা বলছে তা তো সর্বৈব সত্যি।
সহসা, খুল্লতাতের কথা মনে পড়তে একটা সম্ভাবনার কথা প্রতাপের মাথায় উদয় হয়। প্রতাপকে এই ভাবে আগ্রায় পাঠিয়ে দেবার পিছনে কি খুল্লতাতের হাত আছে! এতদিন তো সব বিষয়ে সে তাতর সব কথা মান্য করে এসেছে! খুল্লতাতও তাকে দুই হাত মেলে সমর্থন করে এসেছে। কিন্তু এই বারে খুল্লতাত যেন বড়ো বেশি নিশ্চুপ, শীতল। যে কাজের জন্য প্রতাপকে পাঠানো হচ্ছে, জন্মভূমি থেকে এত দূরে, সেই কাজ তো এতদিন তাদের রাজ-কর্মচারীরা করে এসেছে। এই কাজ এখনও তারাই করতে পারত! তা হলে এইবারে প্রতাপ কেন! তাকে কি আসলে যশোরের জমিদারী থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া হল? তার পিতার বয়স হয়ে গিয়েছে। তিনি তেমন করে আর রাজ্যশাসনে মন দিতে পারেন না। খুল্লতাতই এখন সর্বেসর্বা। কিন্তু সেই নিয়ে প্রতাপের মনে কোনও অনুযোগ ছিল না। কিন্তু আজ সহসা তার কেন মনে হয়, প্রতাপকে ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে সরিয়ে দিয়ে, খুল্লতাতই ক্ষমতার ভর-কেন্দ্রের দিকে এগিয়ে গেলেন।
তাতর প্রতি অবচেতনেই যেন একটা বিতৃষ্ণার কীট তাকে দংশন করে।
কিন্তু খুড়িমা এই কাজে বাধা দিল না কেন? হঠাৎ চন্দ্রলেখার শীর্ণ মুখটি তার মানস পটে ভেসে উঠল। প্রতাপ যখন তার সঙ্গে শেষদিন দেখা করে ফিরে আসছিল, সেই শেষ বিকালে দেখা চন্দ্রলেখার মুখটি কিছুতেই ভুলতে পারছে না! কী যেন একটা আকূতি ছিল সেই মুখে! বড়ো কাঙালের মতো সেই আকূতি। জীবনের সমস্ত শক্তিকে নিঃশেষিত করে যেন সেই মুখ হেসে উঠেছিল।
আগ্রা যাত্রার ঠিক আগে কার্লোস তাকে বলেছিল, তার খুল্লতাত বসন্ত রায় নাকি নাটমন্দিরে এক মেয়েছেলেকে নিয়ে এসে তুলেছেন।
এত ব্যস্ততার মধ্যে প্রতাপ আর এই বিষয়ে তলিয়ে ভাবেনি। আজ কথাটা মনে পড়তে সে একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলল।
গৌড় থেকে যাত্রা করে তারা গয়ায় কয়েক দিন অবস্থান করে আবার আগ্রার উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। আগ্রা নগরীর জাঁকজমক দেখে প্রতাপের চোখ ধাঁধিয়ে গেল। সত্যি, নগরী বুঝি একেই বলে! অজস্র মানুষের সমাগম। সুপ্রশস্ত রাজপথ। যশোরের কর্মচারীরা প্রতাপকে সংবর্ধনা করে এক সুরম্য অট্টালিকায় নিয়ে গেল। অট্টালিকা ও তৎসহ ব্যবস্থা দেখে প্রতাপ খুবই খুশি হল। তাদের খাস কর্মচারী আবু বকর উত্তমরূপে প্রতাপের আহার ও বিশ্রামের ব্যবস্থা করল।
এই দীর্ঘ পথশ্রমে ক্লান্ত প্রতাপ সম্পূর্ণ একটি দিন বিশ্রাম নিয়ে অতিবাহিত করল। প্রতাপ লক্ষ্য করল আবু বকর খুবই করিৎকর্মা কর্মচারী। সে ইতিমধ্যেই শাহেনশা আকবরের সঙ্গে রাজসভায় দেখা করার এক ব্যবস্থা করে রেখেছে। তার মতো এক সামান্য ভূস্বামীর কর্মচারীর সঙ্গে যে সম্রাট যে দেখা করবেন এটা ভাবতেই সে আপ্লুত হয়ে গেল। বুঝতে পারল এটা সহজে সম্ভব হয়নি। আবু বকরই এই অসাধ্য সাধন করেছে।
পরদিন মোগল সম্রাটের রাজসভায় গিয়ে প্রতাপের চোখের যেন পলক পড়ে না। সে তাজ্জব হয়ে গেল। কী জৌলুস। কী তার জাঁকজমক। সারা আর্যাবর্তের জ্ঞানী গুণী মানুষ সেই সভা আলো করে বসে আছেন।
সম্রাট দেখতে নাতিখর্ব। রং উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ। সম্রাটের নাকের বাঁপাশে একটি বড়ো আঁচিল যেন মুখটিকে আরও ব্যক্তিত্বশালী করে তুলেছে। তাঁর গলার স্বর গম্ভীর কিন্তু বচন সুমধুর।
প্রতাপ সম্ভ্রমে আভূমি নত হয়ে কুর্নিশ করে যশোর থেকে আনত মূল্যবান উপঢৌকনাদি সম্রাটের পায়ে নিবেদন করল।
সম্রাট আকবর একবার বরাভয়ের ভঙ্গিতে হাত তুললেন। কিন্তু কোনও বাক্য বিনিময় করলেন না। প্রতাপ তা আশাও করেনি।
রাজসভা থেকে ফিরে এসে প্রতাপ যেন আর স্থির হয়ে বসতে পারে না। উত্তেজিত হয়ে সে পায়চারি করে। তার মনে সাধ হয় সেও কবে একদিন এমনি করে সারা বঙ্গের রাজা হতে পারবে! কবে সে মোগলদের হাত থেকে বাংলাকে ছিনিয়ে নিয়ে নিজের হুকুমত প্রতিষ্ঠা করবে!
প্রতাপকে এমন অশান্ত মন দেখে শঙ্কর বলল, ‘রাজা, কী হয়েছে তোমার? এত উত্তেজিত হয়ে আছ? প্রাসাদে কি কিছু হয়েছে?’
প্রতাপ তার দিকে ঘুরে দাঁড়াল। তারপরে স্থির চোখে তাকিয়ে বলল, ‘কী বলব তোকে শঙ্কর! কী জৌলুস রাজপ্রাসাদের। আর ওরা আমাদের রাজস্বের উপরে দাঁড়িয়ে আমাদের উপরে হুকুমত চালাচ্ছে। আমরা কেন এদের করদ হয়ে থাকব!’
‘কিন্তু শুধু খোয়াবের আশমানে ভাসলে তো হবে না রাজা। আমাদের পরিকল্পনা করে এগোতে হবে।’
‘আয় তবে পরিকল্পনা করি। সূর্য কোথায়?’
‘সে হয়তো আবু বকরের সঙ্গে নগরে বেরিয়েছে। তবে পরিকল্পনার আগে আমাদের আরও বেশি করে মোগলদের মতো করে যুদ্ধ কৌশল শিখতে হবে। শিখতে হবে কূটনীতি। রাজস্বব্যবস্থা। কিন্তু তোমার পিতা বা খুল্লতাত কি মোগলদের বিরুদ্ধে বাগী হতে সায় দেবেন!’
প্রতাপ তার কথার কোনও উত্তর দিল না। তার মুখে একটা বাঁকা হাসি খেলে গেল। সেই হাসিটা মুখে নিয়েই বলল, ‘আবু বকরকে কি বিশ্বাস করা যায়? মানে সে কি আমার কথা শুনে চলবে?’
এখনই তা বলা যায় না। তবে তাকে এখন আমাদের দরকার। কারণ আমার মনে হয় তোমার একবার টোডরমলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা দরকার। শুধু সাক্ষাৎ নয় ভাব জমাতে পারলে আরও ভালো। কারণ তিনি এক সময়ে তোমার পিতার খুব গুণগ্রাহী ছিলেন। তাঁর কাছ থেকে কূটনীতি বিষয়ে তুমি অনেক কিছু শিখতে পারবে। মোগলদের পরাজিত করতে গেলে, আমাদের মোগলদের মতো করেই ভাবতে হবে।
‘তুই ঠিকই বলেছিস শঙ্কর। আবু বকরকে আমাদের এখন দরকার।’
টোডরমল বৃদ্ধ হয়েছেন। মোগল সাম্রাজ্যের রাজস্ববিভাগের সর্বময় কর্তা। তিনি অবসর গ্রহণ করতে চেয়েছিলেন কিন্তু সম্রাট আকবর সেই প্রস্তাব সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করে তাঁকে স্বপদেই বহাল রেখেছেন।
প্রতাপের পরিচয় পেয়ে তিনি যারপরনাই খুশি হলেন। বয়সের কারণে এখন তিনি মাঝে মাঝেই স্মৃতি-কাতর হয়ে পড়েন। প্রতাপকে পেয়ে তাঁর গল্পের যেন শেষ হয় না। বার বার তিনি প্রতাপের কাছ থেকে তাঁর পিতা বিক্রমাদিত্যের কথা জেনে নিলেন। নিজের সন্তানের মতো স্নেহে তিনি প্রতাপকে অনেক মহার্ঘ্য পরামর্শ দিলেন। বললেন, ‘ভালো শাসক হতে গেলে সবার আগে নিজের ক্রোধকে বশ মানাতে হবে। উলটোটা অর্থাৎ ক্রোধের কাছে পরাধীন হলে চলবে না। তুমি সম্রাটকে দেখেছ তো! নিশ্চয়ই লক্ষ করেছ, সর্বদা তাঁর মুখে হাসি লেগেই থাকে। তিনি হয়তো প্রচণ্ড ক্রুদ্ধ হয়েছেন কিন্তু সেই মনের ভাব তিনি কাউকে বুঝতে দেন না।’
এই উপদেশ প্রতাপ কতটা আত্মস্থ করতে পারল তা সেই জানে। তবে সে মন্ত্রমুগ্ধের মতো মহারাজ আকবরের সিংহাসন আরোহণের গল্প শুনছিল। কী প্রতিকূল পরিস্থিতিতে এমনকি মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে তিনি তাঁর সাম্রাজ্যকে ধরে রেখেছেন।
প্রতাপ যত এই গল্প শুনছিল তত সে নিজের ভিতরে রক্তের কল্লোল টের পাচ্ছিল।
টোডরমল আবার বললেন, ‘দেখো! শত্রুকে কখনও ছোটো করবে না। আর চেষ্টা করবে সবসময়ে কাসিদ পাঠিয়ে তার দুর্বলতা জেনে নেওয়ার। যদি একবার দুর্বলতাগুলো জেনে যাও তবে তো অর্ধেক জয় সেখানেই হয়ে যাবে।’
একটু থেমে নিজের মনে মনে বললেন, আমাদের মানসিংহ বলে, শত্রুকে যুদ্ধক্ষেত্রে চমকে দিতে না পারলে সহজে যুদ্ধে জেতা যায় না।
প্রতাপ রাত্রে ফিরতে ফিরতে এই কথাটাই ভাবছিল।
চমকে দিতে হবে। চমকে দিতে হবে।
হয়তো হাঁটতে হাঁটতে ‘চমক’ শব্দটা তার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিল।
সেটা শুনে আবু বকর মুচকি হাসল। বলল, ‘রাজা, একটা চমক দেখবেন?’
প্রতাপ কৌতূহলী হয়।
তাকে চুপ থাকতে দেখে আবু বকর তার সম্মতি ধরে নিয়ে প্রতাপকে অলিগলি মোড় পেরিয়ে একটি হাভেলির সামনে নিয়ে যায়। ভিতরে ঢুকে প্রতাপের চোখ ঝলসে যায়। চার দিকে বাহারি ঝাড়লণ্ঠনের আলো। পারস্য পর্দা উড়ছে গবাক্ষে। সেই পর্দায় ঝলমলে পাথরের উপরে আলো পড়ে যেন এক বিচিত্র আলোর উদযাপন সৃষ্টি করেছে।
লাল মখমলের উপরে রবাব-ই-দখন হাতে শুভ্র বসনে সালংকারা হয়ে বসে আছে ও কে?
প্রতাপের চোখ ঝলসে যায়।
টুং টুং তারের ঝংকার থামিয়ে সুমধুর কণ্ঠে সেই নারী বলেন, ‘আবু বকর, এ তুমি কাকে নিয়ে এসেছ?’
তার কথা বলার সময়ে হিরের নাকছাবিতে আলো প্রতিফলিত হয়ে যেন ঝলমল করে ওঠে।
আর কী সুমধুর সেই কণ্ঠ!
প্রতাপের মনে হয় এমন কণ্ঠ সে পূর্বে কখনও শোনেনি।
সে বিহ্বল হয়ে সেই অপরূপ শ্বেতমূর্তির দিকে তাকিয়ে থাকে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন