অবিন সেন
দুই দিন প্রতাপ নিশ্চুপেই গৃহে বসে থাকল। দুই দিন আকাশের মুখ ভারাক্রান্ত। দুই দিন ধরে বারে বারে বৃষ্টির দাপট ঘুরে ফিরে এসেছে। বৃষ্টি যেন আশীর্বাদ হয়ে নেমে এসেছে। ভাবল প্রতাপ। এই দুদিনের নিরন্তর দুর্যোগপূর্ণ দিনের অন্তরাল তার প্রয়োজন ছিল। তার মনে হচ্ছে নসিব তার সঙ্গে আছে।
এই দুর্যোগের মধ্যেই যশোর থেকে রাজস্বের অর্থ এসে গিয়েছে। আবু বকরের সঙ্গে সেই অর্থ সংগ্রহ করতে জাহাজঘাটে গিয়েছিল শঙ্কর আর সূর্যকান্ত। কিন্তু আবু বকর আর সেই অর্থ রাজকোশে জমা দেবার অবসর পায়নি। প্রতাপ সেই সমস্ত অর্থ এক গোপন স্থানে লুকিয়ে রাখল।
সেই দিন আকাশে আর মেঘ নেই। সকাল থেকে রোদের আলোয় ঝলমল করে উঠছে চরাচর। দুই তিন দিনের ঘরবন্দি মানুষ যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচল। সকাল থেকেই তারা হই হই করে নেমে পড়েছে নগরের পথে পথে।
সকালে প্রতাপ, শঙ্কর আর সূর্যকান্ত বাতায়নে বসে নিজেদের মধ্যে আগামী পরিকল্পনা নিয়ে আলাপ আলোচনা করছিল। যে দুঃসাহসী পথে তারা পা বাড়িয়েছে সেখানে প্রতি পদে পদে বিপদ। প্রতি পদে পদে বিশ্বাসঘাতকতার ভয়। জুনাইদকেও তারা তাই নিজেদের গৃহের আশ্রয়ে লুকিয়ে রেখেছে। এখন কয়েকদিন এইভাবেই তাকে থাকতে হবে। অবশ্য এই ব্যবস্থায় সে যে খুব অখুশি হয়েছে তা নয়। ঘরে বসে বসেই সে পর্যাপ্ত আহার আর পানীয় পেয়ে যাচ্ছে। প্রতাপ তাকে আশা দেখিয়েছে, তাকে যশোরে নিয়ে গিয়ে নিজের বাহিনীর সেনানী নিয়োগ করবে। জুনাইদ সেই লোভে পড়ে গিয়েছে। এখানে তার কোনও পিছুটান নেই। শাহজাদা সেলিমের বাহিনী থেকে বরখাস্ত হয়ে পেট চালাবার জন্য তাকে নানা উঞ্ছবৃত্তি করতে হয়েছে। সে দামাল শিকারি যুবক। সারা গায়ে তার তলোয়ারের নখের আঁচড়। সে কি ভিক্ষাবৃত্তিতে খুশি থাকতে পারে! তাই প্রতাপের কথায় সে হাতে চাঁদ পেয়েছে। প্রতাপও দেখল জুনাইদ মোগলদের যুদ্ধপদ্ধতি বিষয়ে খুঁটিনাটি জানে। অস্ত্র পরিচালনা, সমর কৌশল বিষয়ে তার সম্যক ধারণা আছে। জুনাইদের সঙ্গে বরকত নামে এক গোলন্দাজ বাহিনীর সমরকৌশলীর দোস্তি আছে। প্রতাপ তেমনটাই চাইছিল। মোগলদের উন্নত কামান ও বারুদের বিষয়ে তাকে জানতে হবে। আপাতত আগামী কয়েকদিন তার এই সবই কাজ। প্রতাপ মনে মনে ভেবে রেখেছে।
প্রতাপ দূরের দিকে তাকিয়ে দেখল এক দল পায়রা যেন খুশিতে পাগল হয়ে উড়ে বেড়াচ্ছে। সত্যি এই পায়রাগুলিকে সে গত দুই দিন দেখেনি। পায়রাগুলো কেমন মুক্ত স্বাধীন। তাদের এই দ্বিতল হাভেলিটি আগ্রা শহরের এক প্রান্তে। কাছেই যমুনা নদী। বাতায়নে বসলে যমুনার শীতল বাতাস অনুভব করা যায়। দ্বিতলের বাতায়নটি বেশ বড়ো। অনেকটা আকাশ দেখা যায়। প্রতাপ দেখল আকাশের রং বৃষ্টির জলে ধুয়ে যেন অনাবিল পরিচ্ছন্ন নীল হয়ে গিয়েছে। আকাশের থেকে মুখ ফিরিয়ে সে সূর্যকান্তকে বলল, ‘সূর্য, তুই বলছিস আবু বকরের কাছে নির্দেশ যশোর থেকে এসেছিল। তা সেই নির্দেশদাতা কে? আমার পিতা না খুল্লতাত?’
সূর্য মাথা নামিয়ে প্রতাপের মুখের উপর থেকে চোখ সরিয়ে গালিচার উপরে তাকাল। লাল আর হলুদের কারুকার্য করা নরম পারস্য গালিচা। সে কথার উত্তর না দিয়ে সেই দিকেই তাকিয়ে থাকল।
‘কী রে তুই কি গালিচা বিষয়ে কিছু অনুসন্ধান করছিস নাকি?’
রসিকতার ভঙ্গিতে প্রতাপ কথাগুলি বলল। তার মুখে হাসি।
সূর্যকান্তর হয়ে শঙ্কর উত্তর দিল, ‘সূর্য হয়তো তোমার মুখের উপরে কথাটা বলতে সংকোচ অনুভব করছে।
‘আমার অনুমান তোমার পিতা রাজা বিক্রমাদিত্যই এই নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু এই বিষয়ে অবশ্য আমার কাছে কোনও প্রমাণ নেই।’
সূর্য এবার মুখে তুলে চাইল। ইতস্তত করে বলল, ‘দেখো, আবু বকর ছিল তোমার পিতার কাছের লোক। কারণ আবু বকরকে যখন তিনি আগ্রায় নিয়োগ করে পাঠালেন তখন তোমার খুল্লতাত গৌড়ে ছিলেন না। তিনি তখন ছিলেন যশোরে। তাই তিনি কি স্বল্প পরিচিত এক কর্মচারীকে এমন গোপন নির্দেশ দিতে পারেন! আর নির্দেশ দিলেও আবু বকর তা শুনবেন কেন?’
প্রতাপ একদৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে থাকল। সূর্যর যুক্তি ফেলে দেওয়ার নয়।
শঙ্কর বলল, ‘খালদুনের সঙ্গে কথা বলে আমার মনে হয়েছে আবু বকর দুই তরফেরই লোক ছিল। সে কুমার সেলিমের হয়ে যশোরের রাজস্বের উপরে নজর রাখত। হয়তো যে অর্থ সে সরিয়ে রাখত তা ছিল মোগলদের তরফ থেকে তার পারিশ্রমিক। আর এটা হয়তো শাহজাদা সেলিমের নির্দেশেই হয়েছিল।’
সহসা সেইখানে হুড়মুড় করে চলে এল খালদুন। বড়ো চঞ্চল তার মতিগতি। প্রতাপ তার দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাতে সে হাউমাউ করে যা বলল তার মর্মার্থ হল, গত তিনদিন আবু বকর ঘরে ফেরেনি। কোনও খবরও পাঠায়নি। আগে এই রকম কোনও রাজকার্যে কোথাও গেলে সে খবর পাঠিয়ে দিত। তার আপা খুবই চিন্তিত হয়ে পড়েছে।
প্রতাপ মুখে এক চিন্তার মুখোশ ঝুলিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ। আমিও তাই ভাবছিলাম। গত দুদিন বকর চাচা কোথায় গেল? এখানে কেন আসছে না! আমরাই তোমাদের ওখানে যাব ভেবেছিলাম খবরাখবর নিতে। কিন্তু গত দুদিন ধরে যা দুর্যোগ!’
শঙ্কর বলল, ‘খালদুন, আবু চাচা কোথায় যেতে পারে বলো তো! চাচার কি অন্য কোনও জেনানা ছিল নাকি!’
এই পরিস্থিতিতে সে রসিকতার ভঙ্গি করতে ছাড়ল না।
খালদুন যেন ফুঁসে উঠল, ‘তা আবার নেই! কিন্তু আমার আপা জানে না। তুমিও তো জানো।’
প্রতাপ শঙ্করের দিকে ইশারা করল। শঙ্কর উঠে দাঁড়িয়ে তার কাঁধে হাত রেখে বলল, ‘তুমি চিন্তা করো না। তিনি যদি কোথাও গিয়ে থাকেন তাহলে নিশ্চয়ই ফিরে আসবেন। তা তুমি যখন এত উতলা হয়ে উঠেছ, চলো তবে আমরা সম্ভাব্য জায়গাগুলি খুঁজে দেখি।’
খালদুনকে সঙ্গে নিয়ে শঙ্কর বেরিয়ে পড়ল। সে তো জানে কোথায় কোথায় সে যাবে।
এই রাস্তা সেই রাস্তা ঘুরে ঘুরে তারা শাহিনুর বেগমের গৃহের সামনে গিয়ে উপস্থিত হল। খালদুনকে সে বলল, ‘এখানে তুমি কখনও আগে এসেছ?’
‘সে মাথা নাড়ল।’
সে একবার এসেছিল।
‘এটা কার হাভেলি জানো তো?’
‘সে এবার ঘাড় নাড়ল।’
শঙ্কর বুঝল খালদুন জানে না, এই গৃহ কার। শঙ্কর তাকে নানা কাল্পনিক রং চড়িয়ে শাহিনুরের গল্প শোনালো।
কিন্তু হাভেলির কাঠের দরজায় তো বাইরে থেকে কড়ি লাগানো।
‘কী হবে! গৃহে কি নেই কেউ?’
শঙ্কর যেন আলগোছে প্রশ্ন করল।
খালদুন কিছু বলতে পারছে না। সে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল।
শঙ্কর বাড়ির চার দিক ঘুরে ফিরে ভালো করে লক্ষ্য করার চেষ্টা করল। জানালার ফাঁক দিয়ে উঁকি ঝুঁকি দেওয়ার চেষ্টা করল। সেই গৃহের দিকেই তাকিয়ে তাকিয়ে বলল, মনে হচ্ছে কেউ নেই গৃহে। যেভাবে গাছের ঝরা পাতা বৃষ্টির সঙ্গে, হাওয়ার সঙ্গে ভেসে এসে সদর দরজার সামনে জড়ো হয়েছে, মনে হয় গত দুদিন এখানে কেউ পা দেয়নি।
দুএকজন প্রতিবেশীর কাছে শঙ্কর গৃহের মানুষদের সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে জানল গত দুদিন এই গৃহে তারা কাউকে দেখেনি।
শঙ্কর জানে প্রতাপ কৌশলে আবু বকরকে দিয়ে এই গৃহের তিনজন পরিচারক-পরিচারিকাদের চারদিনের ছুটি দিয়ে দিয়েছে। প্রতাপ বলেছিল, সে এই চারদিন শাহিনুরকে নিয়ে যমুনার বুকে ভাসমান নৌকায় একান্তে কাটাবে। তাই পরিচারকরা থেকে আর কী করবে!
শঙ্কর এখান থেকে বেরিয়ে আবু বকরের গৃহে গিয়ে তার বিবিকে সান্ত্বনা দিয়ে এল।
আবু বকরের বিবি চোখের জল মুছতে মুছতে ঝামরে উঠে বলল, ‘বুড়ো বয়েসে ভীমরতি ধরেছে। নষ্ট জেনানা নিয়ে ফুর্তি করতে বেরিয়েছে! ফিরে আসুক একবার, ঝাঁটিয়ে বিষ ঝেড়ে দেব তার।’
তার এখনও বিশ্বাস, তার মরদ নিশ্চয়ই ফুর্তি সারা হলে তার কাছে ফিরে আসবে।
শঙ্কর বলল, ‘আমিও আমাদের হুজুরকে বলব শাহজাদা সেলিমের কাছে যেন দরবার করে। আবু চাচাকে যাতে খুঁজে নিয়ে আসা যায়।’
এই ভাবে এক মহিলার সঙ্গে মিথ্যাচার করতে শঙ্করের খুব খারাপ লাগছিল। কিন্তু সে কী করবে! যুদ্ধের নিয়মই তাই।
শঙ্কর জানে খালদুন হাতে কিছু অর্থ পেলে এই দুঃখ সহজেই ভুলে যাবে। তা ছাড়া তার ব্যবস্থা তো তারা ভেবে রেখেছে।
পরদিনই প্রতাপ শাহজাদা সেলিমের কাছে গিয়ে দরবার করল, গত কয়েক দিন থেকে আবু বকরকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। শাহিনুর বেগমের কথাটা সে ইচ্ছা করেই উহ্য রাখল। কারণ এই সংবাদ কি আর সেলিমের অবগত নেই? নিশ্চয়ই আছে। এবং প্রতাপের মনেও হল তাই। দেখল এই বিষয়ে সেলিম তেমন একটা উৎসাহ দেখালেন না। নিতান্ত সাধারণ ভাবে বললেন, ‘ও, তাই নাকি! তবে তো ভাবনার কথা! তা আমরা তার অনুসন্ধানে লোক পাঠাব।’
প্রতাপ ভেবেছিল সেলিম এবার রাজস্বের বিষয়টা তুলবেন। কিন্তু তুললেন না। প্রতাপ দেখল সেলিম এখন অন্য কয়েকটি বিষয় নিয়ে ব্যস্ত। তা ছাড়া রাজস্বের বিষয়ে তিনি সাধারণত ভাবিত থাকেন না। বরং নারী, সুরা, যুদ্ধ প্রভৃতি বিষয় নিয়ে তিনি বেশি ভাবিত। আমোদ আহ্লাদ নিয়েই তিনি মেতে থাকেন।
কিন্তু কয়েকদিন পরে টোডরমল প্রতাপকে তলব করলেন।
‘কী প্রতাপ এইবারে তোমাদের রাজস্ব কি এখনও আসেনি?’
প্রতাপ যেন আকাশ থেকে পড়ল।
- সে কী, রাজস্ব তো কবেই এসে গিয়েছে। আমাদের আবু চাচা নিজে সেই রাজস্ব নিয়ে এসেছিলেন। জমাও দিয়েছেন বলে শুনেছি।
প্রতাপ খেয়াল করল টোডরমল একদৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছেন।
সে তার কথা থামাল না। বলল, ‘কিন্তু তার পরদিন থেকেই আর আবু চাচাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না! আমি শাহজাদা সেলিমের কাছে এই নিয়ে দরবার করেছি। তবে কি আবু চাচা বিশ্বাসঘাতকতা করে রাজস্বের টাকা নিয়ে চম্পট দিল!’
টোডরমল তবুও কিছু বললেন না। চুপ করে তাকিয়ে থাকলেন।
তাঁর তাকানো দেখে প্রতাপের যেন অস্বস্তি হচ্ছিল। সে মনে মনে আশঙ্কা করল, তবে কি টোডরমল তার কথা বিশ্বাস করছেন না! কিন্তু সেও নিজেকে সংবরণ করল। এই অবস্থায় বেশি কথা বললে বেফাঁস কিছু বেরিয়ে যেতে পারে।
কিন্তু টোডরমল এবার কথা বললেন। তেমনি শান্ত আর তাঁর স্বভাবসুলভ স্মিত ভঙ্গিতে।
- আবু বকর তো তোমাদেরই কর্মচারী। সে যদি রাজস্ব জমা না দেয় তার দায় তো তোমাদেরই নিতে হবে। তাই না? রাজস্ব না পেলে সম্রাট তো আর শুনবেন না!
টোডরমল যা বললেন প্রতাপ বুঝতে পারল তার গুরুত্ব অনেক। সে মাথা নীচু করে থাকল কিছুক্ষণ। তারপরে ধীর কণ্ঠে বলল, ‘আপনি ঠিকই বলেছেন মহামতি। সম্রাটের রাজকোশ পর্যন্ত যথাযথভাবে রাজস্ব পৌঁছে দেওয়া আমাদেরই দায়িত্ব।’
কিছুক্ষণ থেমে সে আবার শুরু করল, ‘আসলে আমার পিতা বৃদ্ধ হয়েছেন। ধর্মকর্ম নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে জমিদারির দেখাশুনা প্রায় ছেড়েই দিয়েছেন। খুল্লতাত নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী জমিদারি চালাচ্ছেন। ফলে রাজস্ব ব্যবস্থাটাই অগোছালো হয়ে পড়েছে। এখানে এসে সব দেখেশুনে আমার মনে হয়েছে সম্রাটের প্রাপ্য রাজস্ব তাঁরা পাঠাচ্ছেন না।’
প্রতাপ নিজের খুল্লতাত সম্পর্কে আরও মনগড়া কুৎসা করে যেতে লাগলেন। যেন বসন্ত রায়ের কারণেই যশোরে অরাজকতা শুরু হবার উপক্রম হয়েছে। এই অবস্থায় শাহেনশা আকবর হস্তক্ষেপ করলেই বোধহয় সবদিক রক্ষা হবে। না হলে বাংলার একটা অংশ হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে।
টোডরমল মন দিয়ে তার সব কথা শুনলেন। কিন্তু তিনি মুখে কিছু বললেন না দেখে প্রতাপ একটু চিন্তান্বিত হল।
টোডরমল তেমনি ভাবে প্রতাপকে কিছুটা চিন্তিত রেখে বললেন, ‘তুমি আজ এস প্রতাপ। আমি এই বিষয়ে সম্রাটের সঙ্গে কথা বলে তোমাকে জানাব।’
কয়েকদিন অতিবাহিত হয়ে গেল, কিন্তু টোডরমল তাকে ডেকে পাঠালেন না। প্রতাপ বসে থাকল না। সে এই কয়েকদিন শাহজাদা সেলিমকে তোষামোদ করতে লাগল। বার বার সেলিমকে বোঝাতে চাইল, সে সর্বতোভাবে চেষ্টা করবে কীভাবে রাজস্বের পরিমাণ বাড়ানো যায়। তা ছাড়া যশোরের পার্শ্ববর্তী যে দু-একটি স্বাধীন ভূস্বামী আছে তাদেরও মোগল সাম্রাজ্যের অধীনে নিয়ে আসার চেষ্টা করবে।
এই ক্রমাগত তোষামোদের ফলেই কাজ হয়েছে বলে প্রতাপের মনে হল। কারণ কয়েকদিন পরেই সম্রাট আকবর তাকে রাজদরবারে ডেকে পাঠালেন। এইদিন তিনি প্রতাপকে ভালো করে লক্ষ্য করলেন। টোডরমলের মুখ থেকে তিনি রাজস্ব না আসার কথা শুনেছিলেন। টোডরমলের মতো প্রাজ্ঞ মানুষের কথা তিনি বিশ্বাস করেছেন। তাই তিনি আর প্রতাপকে এই বিষয়ে বিস্তারে কিছু বললেন না। সম্রাট আকবর তাঁর স্বাভাবিক জলদগম্ভীর স্বরে বললেন, ‘তুমি যদি আমাদের প্রাপ্য রাজস্ব কোনও ভাবে আমাদের আবার প্রদান করতে পারো, তবে আমি তোমাকে উপযুক্ত পুরস্কার প্রদান করব।’
প্রতাপ আভূমি নত হয়ে শাহেনশাকে তার আনুগত্য জানাল। তেমনি দৃঢ়স্বরে বলল, ‘মহারাজা আমি এই বিষয়ে যশোরে আমার বিশ্বস্ত লোক প্রেরণ করেছি। সেই সঙ্গে পিতার কাছে আমার বার্তা প্রেরণ করেছি। আমি কিছু সময় পেলে এই রাজস্ব আমি আবার রাজকোশে জমা দিতে পারব।’
শাহজাদা সেলিম সেখানে উপস্থিত ছিল। সে এই বিষয়ে প্রতাপের কর্মতৎপরতার কথা সম্রাটের কাছে ব্যক্ত করল।
সম্রাট আকবর রাজি হলেন।
এই কয়েকটি দিন প্রতাপ, শঙ্কর আর সূর্যকান্ত মিলে গোপনে ছদ্মবেশ ধারণ করে আগ্রা নগরে ঘুরে বেড়াল। মোগল রাজত্ব বিষয়ে সংবাদ সংগ্রহ তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য। সেই সঙ্গে সূর্যকান্ত একদিন গোপনে গয়া চলে গেল। সেখান থেকে উপযুক্ত নৌকা সহযোগে আবার সে আগ্রায় ফিরে আসবে।
প্রায় মাসাধিক কাল পরে এক দিন অপরাহ্ণে, সেদিনও আকাশকে মেঘে ঢেকে দিয়ে বৃষ্টি নামল। আগ্রার উপকণ্ঠে যমুনার তীরে এক অলীক নাট্য অভিনীত হল। যেন যশোর থেকে নৌকাযোগে আবার রাজস্ব এসে পৌঁছাল। পরদিনই প্রতাপ ও শঙ্কর লুক্কায়িত রাজস্ব টোডরমলের তত্ত্বাবধানে রাজকোশে জমা দিয়ে এল। টোডরমল আর সেলিম খুব খুশি হয়ে প্রতাপকে প্রভূত প্রশংসায় ভরিয়ে দিল। তাঁরা সম্রাটের কাছে নিয়ে গেলে আকবরও প্রভূত খুশি হলেন। তিনি এতটাই খুশি হলেন যে সেই রাজস্ব থেকে তিন লক্ষ অর্থ প্রতাপকে প্রত্যর্পণ করলেন। সেই সঙ্গে তিনি প্রতাপকে ফরমান প্রদানপূর্বক যশোরের সুবাদার নিয়োগ করে বাংলাদেশে প্রেরণ করলেন।
প্রতাপ মনে মনে যেন এতটা আশা করেনি। কিন্তু তার অভীষ্ট সাধন হতে এখনও কিছু বাকি আছে। সে একদিন শাহজাদা সেলিমের কাছে দরবার করল।
জাঁহাপনা, আপনার কাছে একটি নিবেদন আছে। আমার পিতা যদি আমার হাতে রাজ্যের রাজস্বভার অর্পণ করতে রাজি না থাকেন তা হলে বলপূর্বক আমাকে রাজ্য অধিকার করতে হবে। সেই জন্য আমি আপনার কাছ থেকে কিছু সংখ্যক সৈন্যসামন্ত ভিক্ষা চাইছি।
সেলিম তাকে প্রয়োজনের তুলনায় বেশিই, প্রায় দ্বাবিংশ সহস্র সৈন্য প্রদান করলেন। প্রতাপও নিজের অর্থে কিছু সৈন্য নিয়োগ করল। সেই বাহিনীর নায়ক হল জুনাইদ।
খালদুনকে আগ্রায় যশোরের প্রতিনিধি নিয়োগ করে প্রতাপ পিতার রাজ্যের রাজস্বভার অধিকার করার উদ্দেশ্যে যাত্রা করল।
এতদিন পরে যেন লক্ষ্মণ পণ্ডিতের ভবিষ্যদ্বাণী সত্যি হয়ে প্রতিভাত হতে শুরু করল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন