অবিন সেন
বিক্রমাদিত্য ও বসন্ত রায় এক এক করে বঙ্গ বিহার ওড়িশার রাজস্ব বিষয়ের নানা গুপ্ত কথা সবিস্তারে ব্যাখ্যা করলেন। টোডরমল দেখলেন এই ভ্রাতৃদ্বয় প্রকৃতই গুণী। সেই সঙ্গে তাঁদের আনুগত্য প্রকাশের ভঙ্গিকে সত্যি বলেই মনে করলেন তিনি। তাঁর মানুষ চিনতে ভুল হয় না। তবু এককথায় তাঁদের পুনর্বহাল করলেন না। ভাবলেন আগে ভালো করে পরীক্ষা করে দেখা দরকার। কারণ দুজনেই প্রকৃত বুদ্ধিমান। তবে সেই মনোভাব টোডরমল মুখে প্রকাশ করলেন না। বললেন, ‘তোমাদের দুজনের প্রজ্ঞা ও মেধা দেখে আমি খুবই খুশি হয়েছি। তোমরা বরং আবার আগামীকাল আমার কাছে এসো। একদিনে তো সব বিষয়ে আলোচনা করা যায় না। আগামীকাল বরং আমাদের ভবিষ্যতের কর্মপন্থা নিয়ে আলোচনা করব।’
দুজনেই বুঝলেন টোডরমল এখনও তাঁদের সম্পূর্ণরূপে বিশ্বাস করছেন না। অবশ্য এমনটাই স্বাভাবিক।
বিক্রমাদিত্য একবার ভাইয়ের দিকে তাকালেন। চোখে চোখে দুজনের কথা হল। দুজনেই যেন দুজনের মনের কথা পড়তে পারেন। বিক্রমাদিত্য কিছুটা ইতস্তত ভঙ্গি করে বললেন, ‘মহারাজ, আপনার কাছে দীনের একটি নিবেদন আছে।’
টোডরমল স্মিত মুখে বললেন, ‘তোমরা নির্ভয়ে বলো।’
বিক্রমাদিত্য বললেন, ‘গতকাল আমার ভ্রাতা এক অসহায় নারীকে দস্যুদের হাত থেকে উদ্ধার করেছে। সেই যুবতীর পিতা মাতা পরিজন সকলেই নিহত হয়েছে। এখন উপস্থিত সেই নারী এক বৌদ্ধ সংঘে আশ্রিত। এই অবস্থায় আপনি যদি তার কোনওরূপ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে দেন, তাহলে হতভাগিনীর উদ্ধার হয়!’
কথাটি বলে তিনি একদৃষ্টিতে মহারাজের মুখের দিকে তাকালেন।
টোডরমলের মুখের সেই হাসি বিলীন হয়ে গেল না। বরং সেই হাসিতে গূঢ় এক প্রসন্নতার প্রলেপ লাগল যেন। তিনি চোখ ফিরিয়ে বসন্ত রায়ের মুখের দিকে, চোখের দিকে তাকালেন। দেখলেন বসন্ত রায়ের চোখে মুখে এক করুণ আকূতি, এক মৃত আকাঙ্ক্ষা যেন লগ্ন হয়ে আছে।
টোডরমল বুঝতে পারছেন, বিক্রমাদিত্য বড়োই ধূর্ত। তবে তিনি বিরক্ত হলেন না। কারণ এই সত্যভাষণের পিছনে সততাও আছে। তিনি মুখের হাসি বজায় রেখে বললেন, ‘যদিও রাজ্যের সকল নর-নারীর উপরে মহারাজের অধিকার। তবে রাজ্যের দায়িত্বশীল ও অনুগত নাগরিক হিসাবে গণ্য করে তোমাদের উপরেই অভিভাবক হিসাবে ওই নারীর দায়িত্বভার প্রদান করছি।’
একটু থেমে কিছুটা রহস্য করে আবার বললেন, ‘তবে মনে রেখো, যদি সে নারী কখনও অভিযোগ করে তবে তার জন্য তোমাদের কিন্তু উপযুক্ত শাস্তি পেতে হবে।’
ভ্রাতৃদ্বয়ের মুখ এক নির্মল হাসিতে ভরে উঠল। তাঁরা টোডরমলের হৃদয়ের বিপুলতা অনুভব করলেন।
তারপরে কয়েকদিন নিবিড় অভিনিবেশে বিক্রমাদিত্য ও বসন্ত রায় তাঁদের প্রজ্ঞা উজাড় করে দিলেন টোডরমলের কাছে। শুধু দাউদের যে সম্পদ দুই ভাই যশোরে প্রেরণ করেছিলেন সেই বিষয়কে প্রচ্ছন্ন রাখলেন। বরং, সেই সম্পদের অনেকটাই হয়তো পাঠান সৈন্যরা লুঠ করে নিয়ে গিয়েছে, এমন একটা ধারণার কথা তাঁরা টোডরমলকে জানালেন। তবে টোডরমল আর এই বিষয়ে আলোচনা করেননি। তিনি যা বোঝার বুঝেছেন। তবে দুই ভাইয়ের কাজ দেখে বঙ্গের সুবেদার বুঝলেন তিনি দুই রত্ন পেয়েছেন তাঁর হাতের কাছে। তিনি আর দেরি করলেন না। সত্বর তিনি দুই ভাইকেই উচ্চ রাজকার্যে নিযুক্ত করলেন। বিশেষ করে বিক্রমাদিত্যকে প্রথমে মুনসেফ হিসাবে বহাল করলেন। সেই সঙ্গে পূর্বতন রাজা দাউদের কাছ থেকে তাঁরা যে জমিদারি প্রাপ্ত হয়েছিলেন তারও অধিকার তিনি কেড়ে নিলেন না। বরং সম্রাট আকবরের কাছ থেকে এই মর্মে একটি আদেশপত্র আনয়ন করে এই বিষয়কে পাকাপোক্ত করে দিলেন।
হেমন্তের এক বিকালে চন্দ্রলেখা একাকী বসে আছে বাতায়নে। বৌদ্ধ সংঘ থেকে বেরিয়ে এসে তাঁরা সেই দুই মহলা বাড়িতেই উঠে এলেন, যুদ্ধের আগে দুই ভাই যে বাড়িতে বসবাস করতেন। ভিতরের মহলে চন্দ্রলেখার থাকার ব্যবস্থা হল। পরদিনই তার জন্য দুই খাস পরিচারিকার ব্যবস্থা করা হল। কিন্তু দুজনেই বয়স্কা। ফলে সারাদিন কথা বলার সঙ্গী পাওয়া বিরল। মূক বাড়িটার পাথর আর কাঠের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব হতে থাকল। কিছু পুরাতন পুঁথিপত্র ছিল বাড়িতে। তার ধুলো, শুষ্ক পাতা আর মৃত পোকার গন্ধের সঙ্গে তার পরিচয়ের নিবিড়তা বাড়তে লাগল। তার নিজের সঙ্গে নিজের যেন নতুন করে পরিচয় হতে লাগল। এ কেমন জীবন তার? এক নারী তার সর্বস্ব হারিয়ে জীবনের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে দেখল এক মৃত প্রস্তরখণ্ড হয়ে গিয়েছে সে! তার না হয় কথা বলবার মানুষ নেই! আর কথা বলবার মানুষ থাকলেই কি প্রগলভ হতে পারবে সে! নিজের অন্তরের অন্ধকারে অবগাহন করে সে দেখল সেখানে আবেগের সমস্ত প্রস্রবণ শুকিয়ে গিয়েছে। শুষ্ক আর বন্ধ্যা হয়ে গিয়েছে মাটি। ব্যথা, বেদনা, ইচ্ছা, অনিচ্ছা কোনও কিছুই যেন সে বাহ্যত প্রকাশ করতে পারে না। পরিচারিকারা আহার্য সামগ্রী দিয়ে যায়। সে আহার্য অবহেলায় পড়ে থাকে। স্নান সেরে এসে তেমনি ভিজে বসনে সে বসে থাকে। ভিজে চুল অকারণে পিঠের উপরে পড়ে থাকে। সে মেঘচুলের কোনও পরিচর্যা হয় না।
মাঝে মাঝে বিক্রমাদিত্য একান্ত আপনজনের মতো এসে তার কুশল জিজ্ঞাসা করেন। চন্দ্রলেখা মুখ তুলে তাকায় না। তাকাতে ইচ্ছা কি করে না! সমস্ত প্রশ্নের উত্তর তার মাথা আন্দোলন ভিন্ন আর কিছুই নয়।
আবার যখন বসন্ত রায় তার সামনে আসে? সে যে কী নিদারুণ লজ্জা! এই মানুষটির সামনে তার সমস্ত কিছু উন্মোচিত হয়ে গিয়েছে ভাবলেই যেন তার দ্বিধা হও ধরণী হয়ে যেতে ইচ্ছা করে। কেন? কেন এই অর্থহীন জীবনের কাঠামো বহন করে বেড়ানো? প্রতিমা বিসর্জনের পরে তার শরীর থেকে সমস্ত মাটি ঝরে গিয়েছে। এখন রিক্ত খড়ের কাঠামোয় প্রাণ নেই বুঝি। সে ভাবতে বসে।
তবু কি একদিন মৃত পাথরের গায়ে সবুজের মুকুল ফুটে উঠতে চায়! যে মানুষটার চোখের উপরে সে রিক্ত হয়ে গিয়েছে একদিন। সেই মানুষটিকে কেন মাঝে মাঝে খুব দেখতে ইচ্ছা করে তার! ইচ্ছা করে একবার মুখের উপরে মুখ তুলে তাকায়!
দুই ভাই সারাদিন কাজে কর্মে মহা ব্যস্ত থাকেন। সকালে যখন বসন্ত রায় রাজসভার উদ্দেশ্যে বের হন তখন তিনি একবার ঘাড় ফিরিয়ে উপরের অলিন্দের দিকে তাকিয়ে দেখেন! সেই তৃষিত চোখের দৃষ্টিতে কী অন্বেষণ! বাতায়নের এক পাশে আড়ালে দাঁড়িয়ে তা লক্ষ করে চন্দ্রলেখা। মানুষটার চোখের ভাষা সে পড়তে পারে। খুব ইচ্ছা করে সেই তৃষিত চোখের সামনে গিয়ে সে দাঁড়ায়! তারপরেই একটা মন্দ ভাগ্যের দোহাই তার মনকে কঠিন করে তুলে তাকে আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য করে।
সুশাসন আর শাসকের বিচক্ষণতায় বঙ্গে শান্তি ফিরে আসতে সময় লাগল না। বারে বারে যুদ্ধে যুদ্ধে আর অপশাসনে মানুষ হয়তো একটু শান্তি চাইছিল। টোডরমল বাংলায় সেই শান্তি ফেরি করলেন। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ভূ-স্বামীদের সঙ্গে তিনি সুসম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করলেন।
এরপরে টোডরমল রাজস্ববৃদ্ধির কাজে মনোনিবেশ করলেন। এই ব্যাপারে তাঁকে সর্বতোভাবে সাহায্য করতে অক্লান্ত পরিশ্রম করলেন বিক্রমাদিত্য। কিন্তু সমস্ত দিনের নিরলস শ্রমের পরে যখন তিনি ঘরে ফিরে আসেন তখন তাঁর মন সুদূর যশোরের দিকে চলে যায়। ভীষণ একাকিত্ব আর মনোবেদনা অনুভব করেন তিনি। শিশুপুত্রটির মুখ মানসপটে ভেসে ওঠে বার বার। কেমন দুরন্ত হল পুত্র প্রতাপাদিত্য? কচি হাতের স্পর্শ! কচি মুখের সুবাস বুক ভরে নেবার একটা দুর্নিবার আকর্ষণ যেন মাঝে মাঝে পেয়ে বসে তাঁকে। প্রিয়তমা পত্নী যশোমতী কেমন আছে! অন্ধকার বাতায়ন পথে কালো আকাশের বুকে চন্দ্রমার দিকে তিনি তাকিয়ে থাকেন! চাঁদের বুকে তিনি কি যশোমতীর মুখ দেখতে পাচ্ছেন!
মাঝে মাঝে শঙ্কাও হয়! কেমন আছে সবাই? যদি কোনও বিপদ আপদ ঘটে। তিনি সংবাদ পেয়েছেন পদ্মার মোহানার কাছে চ্যান্ডিকানে ঘাঁটি পেতেছে পোর্তুগিজ বণিকেরা। তারা কী সত্যি বণিক? তারা দস্যু! তারা অত্যাচারী! তারা যদি অতর্কিতে যশোর আক্রমণ করে! তিনি এত দূরে বসে কিছুই করতে পারবেন না। খুল্লতাতের বয়স হয়েছে। তিনি কি পারবেন এই দস্যুর আক্রমণ ঠেকাতে!
যদি সব জ্বলে-পুড়ে ছারখার হয়ে যায় তবে কীসের জন্য এই পরিশ্রম! কীসের জন্য মোগল বাদশাহের প্রতি এই আনুগত্য। কিছু একটা তাঁকে করতে হবে!
বিভিন্ন দুশ্চিন্তা তাঁকে কুরে কুরে খায়। কিছুতেই ঘুম আসে না তাঁর! অন্ধকার আকাশের দিকে—আকাশের বুকের উপরে চাঁদের দিকে তিনি নির্ঘুম তাকিয়ে থাকেন।
গৃহের আরও দুটি কক্ষে আরও দুটি মানুষ নির্ঘুম হয়ে আছেন।
চন্দ্রলেখা বাতায়নের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। বাইরে একটা রাতচরা পাখি মাঝে মাঝে ডেকে উঠছে। কী করুণ সেই ডাক। সেই ডাক বাতাসে অনুরণিত হতে হতে দূরে ফিরে যাচ্ছে আর চন্দ্রলেখার বুকের ভিতরটা কেঁপে কেঁপে উঠছে। বুকের ভিতরে একটা অনির্দিষ্ট বেদনা। যে সমস্যা বুকের ভিতরে বাসা বেঁধেছে সেখান থেকে বুঝি তার কোনও মুক্তি নেই। সে ভেবে পায় না। কেন এমন হয়। ওই মানুষটার দিকে তাকালে বুকের ভিতরটা কেন এমন করে ফাঁকা হয়ে যায়। তখন যেন মনে হয় বাতাসহীন এক পৃথিবীতে সে একমাত্র জীবিত প্রাণী নির্বাসিত হয়ে গিয়েছে। এর থেকে কোনও মুক্তি নেই তার। অকারণে যেন প্রাণ তার কেঁদে কেঁদে ওঠে! কীসের জন্য এই অহেতুক রোদন! সে তা কিছুতেই মুখ ফুটে বলতে পারে না! পারবেও না! কী লজ্জা!
ওদিকে বসন্ত রায়েরও ঘুম আসে না। ঘর ছেড়ে তিনি বাইরে বেরিয়ে আসেন। অঙ্গনে পদচারণা করেন। মালতীলতার কোরকগুলিতে একবার হাত বুলিয়ে দেন। আকাশে চাঁদ ঢেলে দিচ্ছে অঢেল জ্যোৎস্না। কিন্তু জ্যোৎস্নার আলোকে যেন অসহ্য মনে হয় তাঁর। অকারণেই তাঁর চোখ উপরের দিকে চলে যায়। ওই তো সেই নির্দিষ্ট অলিন্দে সেই ছায়ামূর্তিটি। তেমনি স্থির, পাথরের মতো। চাঁদের আলোর উপরে তাঁর আবার রাগ হয়। কেন, কেন সে আরও স্পষ্ট হয়ে ওই মুখের উপরে লগ্ন হয়ে অপরূপ মুখটিকে উদ্ভাসিত করে তুলছে না! তাঁর রাগ সহসা তীব্র হয়ে যায়! সহসা একটা দুঃসাহস যেন তাঁর মাথার উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে! তিনি এতদিন যা করেননি এবার তাই করলেন! তরতর করে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে পড়লেন। তারপরে সেই দরজার সামনে দাঁড়ালেন। এবার কি দরজায় আঘাত করবেন? কিন্তু তিনি বিস্মিত হয়ে দেখলেন তাঁর দুই হাত অসাড় হয়ে গিয়েছে। বীর বসন্ত রায়ের দুই হাত পাথরের মতো ভারী। মনের ভিতরে কোথাও একটা বেদনা। তিনি সেখান থেকে ফিরে আসতে যাবেন সহসা তাঁকে চরম বিস্মিত করে দিয়ে সেই দরজাটা খুলে গেল। শুধু কি একটা দরজা! শুধু কি অন্ধকারে মৃদু আলোর একটা রেখা! যেন একটা পথই খুলে গেল। সেই পথের সামনে এক প্রস্তরমানবী। সেই মানবীর হৃদয়ে কি প্রাণ প্রতিষ্ঠা হয়েছে? কিন্তু কেউ কোনও কথা বলছেন না। তবু পরস্পরের মুখের সামনে যেন কোনও আর অন্ধকার নেই।
অবশেষে বসন্ত রায়ের বুকের ভিতর থেকে এক অনিঃশেষ আকূতি যেন কথা বলল, ‘আমি তো এবার যশোরে ফিরে যাব। আমাদের আদি বাড়ি!’
কথাটা বলে তিনি অপেক্ষা করলেন। কিন্তু অন্ধকারের দূরত্বে দাঁড়ানো প্রস্তরমূর্তিটির মুখে কোনও ভাষা নেই।
আরও বহু মুহূর্ত এমনি অপেক্ষা করে বসন্ত রায় পিছু ফিরলেন। সহসা পিছন থেকে অন্ধকার বলে উঠল, ‘আর আমি?’
এ তো শুধু প্রশ্ন নয়। এ যেন সহস্র প্রশ্নের সহস্র উত্তরের অধিক।
বসন্ত রায় মুখ ফেরালেন। তাঁদের দুজনের মুখের উপরে কোন অলীক পৃথিবী থেকে চাঁদের আলো এসে পড়েছে।
বিক্রমাদিত্য আর বিলম্ব করলেন না। একদিন তিনি টোডরমলের কাছে নিবেদন করলেন, ‘রাজন্, আমার জমিদারির কাছেই দস্যুর বেশে পোর্তুগিজ বণিকেরা ঘাঁটি পেতেছে। এখন আমার বৃদ্ধ খুল্লতাতের পক্ষে যদি প্রয়োজন হয় তাদের প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে না। আমি চাইছি বসন্ত এবার যশোরে ফিরে যাক। সে গিয়ে ওখানের রাজস্ব আদায়ে মন দিক।’
টোডরমল ভাবলেন। বললেন, ‘তুমি যখন ভেবেছ তখন নিশ্চয়ই ঠিকই ভেবেছ।’
একটু থেমে আবার হাসি মুখে বললেন, ‘তবে তোমাকে কিন্তু ছাড়ছি না এখন!’
বিক্রমাদিত্য ঘাড় নাড়লেন। বললেন, ‘প্রভু, আমি আপনার একান্ত অনুগত।’
টোডরমল খুশি হলেন।
বিক্রমাদিত্য আবার বললেন, ‘প্রভু, আমার আর একটি মিনতি আছে।’
টোডরমল জিজ্ঞাসু চোখে তাকালে, বিক্রমাদিত্য এবার বললেন, ‘যে নারীটিকে একদিন ভাই বসন্ত উদ্ধার করেছিল, বসন্ত সেই মেয়েটিকে বিবাহ করতে চায়। চন্দ্রলেখারও মত তাই। এখন আপনি যদি অনুমতি করেন।’
টোডরমলের সারা মুখে এক নির্মল হাসি বিস্তৃত হল। তিনি আন্তরিকভাবে বললেন, ‘আমি তাদের প্রাণভরে আশীর্বাদ করছি।’
বসন্ত রায় ও চন্দ্রলেখার বিবাহ হয়ে গেল ধুমধাম করে। মহারাজা টোডরমল নিজে এসে তাঁদের আশীর্বাদ করে গেলেন।
নববধূ নিয়ে বসন্ত রায় চলে গেলেন যশোরে।
বিক্রমাদিত্যকে সঙ্গে নিয়ে টোডরমল এবার বাংলার শাসনব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাবার দিকে মন দিলেন। এই সময়ের মধ্যে তাঁকে কোনও যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে হয়নি বলে তিনি বিনা বাধায় রাজ্যে জরিপের কাজ করালেন।
তিনি সমগ্র বাংলাকে সাতটি সরকারে বিভক্ত করেন। সাতটি সরকারে সব মিলিয়ে মহাল ছিল ৬৮২টি। আবার বিহার প্রদেশকেও সাতটি সরকারে বিভক্ত করলেন। আর ওড়িশাকে ভাগ করলেন পাঁচটি সরকারে।
টোডরমল অবিভক্ত বঙ্গ-প্রদেশকে শৃঙ্খলায় বেঁধে দিয়ে রাজস্ব আদায়ের পরিমাণকে বিপুলভাবে বাড়িয়ে তুললেন।
এই ভাবে বাংলা থেকে মোগল সাম্রাজ্যের আয় বিপুল ভাবে বর্ধিত হওয়ায় সম্রাট আকবর খুশি হয়ে টোডরমলকে রাজা উপাধিতে ভূষিত করে তাঁকে দিল্লির রাজস্ব বিভাগের প্রধান দেওয়ান পদে নিযুক্ত করলেন। তিন বছর পরে বাংলা থেকে বিদায় নেবার আগে তিনি বিক্রমাদিত্যকে প্রভূত ধনসম্পদ উপহার দিলেন।
টোডরমলের দিল্লি চলে যাওয়া স্থির হয়ে গেলে বিক্রমাদিত্য আকমহল থেকে নৌকা যোগে যাত্রা করলেন যশোরের উদ্দেশ্যে।
বাংলার নতুন শাসনকর্তা হলেন আজিজ খাঁ।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন