যশোরের সিংহাসন

অবিন সেন

শরৎকুমারী সংবাদ পেয়েছে আগ্রা থেকে প্রতাপের দূত এসেছে। সে যেন চাতক পাখির মতো কোনও সংবাদের অপেক্ষায় ছিল। কিন্তু তার জন্য আলাদা করে কোনও লেফাফা আসেনি। শরৎকুমারীর চোখ ফেটে জল আসে। অভিমানে বিদীর্ণ হয় তার হৃদয়। এত দিন অদর্শনেও তার প্রিয়তম স্বামীর কি তাকে মনে পড়ে না? তিনি কি এত ব্যস্ত যে দু লাইন খতও লিখে উঠতে পারেনি তার জন্য! সারাদিন অভিমান করে সে ঘুরে বেড়ায়। কার কাছে সে মন খুলে এই পাহাড় প্রমাণ অভিমন উজাড় করে দেবে! খুড়িমা চন্দ্রলেখা অসুস্থ। তার কাছে শরৎ আর গল্প করতে পারে না। চন্দ্রলেখার কনিষ্ঠ পুত্রটিকে বুকে চেপে ধরে বিছানায় শুয়ে শুয়ে সে চোখের জল ফেলে। সে তো জানে না তার স্বামী আজ বাগী হয়েছে।

ওদিকে সূর্যকান্ত ও কিছু সংখ্যক সৈন্য নৌকাযোগে যমুনা নদীতে ভেসে পড়ল যশোরের উদ্দেশ্যে। প্রতাপ ও শঙ্কর বাকি সৈন্যদের নিয়ে পিতৃভূমির উদ্দেশ্যে রওনা হল। প্রতাপের জীবনে এই অভিজ্ঞতা প্রথম। সমরসজ্জা সহযোগে এই ভাবে কখনও সে কোথাও যাত্রা করেনি।

পথে যেতে যেতে যত গ্রাম, নগর তাদের যাত্রাপথে পড়ল, তা সে ভালো করে পর্যবেক্ষণ করে। এই শিক্ষা তাকে মহাপ্রাজ্ঞ টোডরমল দিয়েছিলেন। খুব শিক্ষানবিশের ভঙ্গিতে প্রতাপ এই সকল পর্যবেক্ষণ করে বুঝতে পারছে কী ভাবে এই মুষ্টিমেয় বিদেশিরা আজ আর্যাবর্ত শাসন করছে। আবার কোথাও কোথাও মোগলদের অত্যাচারের চিহ্নও তার চোখে পড়ে। তখনই তার রক্তের মধ্যে কল্লোল শুরু হয়। সে ভাবতে থাকে কীভাবে এই বিধর্মীদের হাত থেকে বঙ্গদেশকে উদ্ধার করতে পারবে। সে ভুলে যায় যে, মোগলদের সৈন্য সাহায্য নিয়েই পিতার রাজ্যে অধিকার বুঝে নিতে যাচ্ছে।

প্রতাপের আগমনের সংবাদও মহারাজ বিক্রমাদিত্য পেয়েছিলেন। প্রতাপ একটা দূত পাঠিয়েছিল কিছু সাধারণ সংবাদ দিয়ে। তবে আবু বকরের কাছ থেকে খাস কাসিদ মারফত কোনোরূপ সংবাদ না পেয়ে তিনি অনুমান করে নিয়েছেন, আগ্রায় অনভিপ্রেত কিছু একটা ঘটেছে। কিন্তু এই বিষয়ে যাবতীয় কথা তিনি মনের ভিতরেই চাপা দিয়ে রাখলেন। এমনকি ভ্রাতা বসন্ত রায়ের কাছেও তিনি মনের ভাব প্রকাশ করলেন না।

প্রতাপ যে সৈন্য-সাথি সঙ্গে নিয়ে আসছে সেই সংবাদ তিনি প্রথমে পাননি। তিনি এও জানতেন না যে শাহেনশা আকবর, ফরমান দিয়ে প্রতাপকে প্রেরণ করেছেন। মনে মনে তিনি পুত্রের আগমনে খুশি হয়েছেন কি না তা আর প্রকাশ করলেন না। বরং ভ্রাতা বসন্ত রায়কে নির্দেশ দেন, পুত্রের যেন যথাযথ সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়। বসন্ত রায়ও, প্রিয় ভ্রাতুষ্পুত্রের আগমন হেতু খুশি হয়েছিলেন। কিন্তু, তখনই তাঁর মনের মধ্যে একটা বিষণ্ণতার মেঘ খেলে গেল। বদমেজাজি প্রতাপ যে এই সংবাদ কীভাবে সহ্য করবে তিনি ভেবে পেলেন না। তবু বিষণ্ণ মন নিয়েই তিনি প্রতাপের যথাযথ সংবর্ধনার কাজে লেগে গেলেন।

কিন্তু কয়েক দিন পরেই এক কাসিদ তাঁর কাছে সংবাদ নিয়ে এল, প্রতাপ সৈন্য সাথি সঙ্গে নিয়ে যশোরের উদ্দেশ্যে এগিয়ে আসছে। এই সংবাদ শুনেই তিনি অগ্রজের কাছে দৌড়ে গেলেন।

‘দাদা, শুনলাম প্রতাপ সৈন্যসাথি লোকবল নিয়ে যশোরের সীমান্তে পৌঁছে গিয়েছে। সে এত সৈন্য নিয়ে আসছে কেন? আর কোথা থেকেই বা সে সৈন্য পেল?’

বিক্রমাদিত্যের মুখে এক ম্লান হাসি খেলে গেল। তিনি যেন মনে মনে বুঝতে পারছেন। এখন মা যশোরেশ্বরীই ভরসা। তিনি ভ্রাতার চিন্তিত মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কী আর করবে! আমরা কী করতে পারি? এখন কি আর পুত্রের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ শোভা পাবে আমাদের! আমরা বরং তার জন্যই অপেক্ষা করি!’

বসন্ত রায় আর কী বলবেন! তাঁর আর কিছু বলার মুখ নেই। তিনি অগ্রজের বিরুদ্ধে যেমন বলতে পারেন না তেমন প্রতাপের প্রতি তাঁর স্নেহ এখনও অটুট। তবু প্রতাপ কেন সৈন্য নিয়ে আসছে বা সে এত সৈন্য কোথায় পেল সেই বৃত্তান্ত জানতে এক চর প্রেরণ করলেন গোপনে।

এই একই মনোভাব প্রতাপেরও। সে ভাবছিল তার পিতা বা পিতৃব্য যদি তার অভীষ্ট সাধনে বাধা প্রদান করে, তা হলে তার এত দিনের পরিশ্রম ব্যাহত হবে। অনর্থক লোকক্ষয় হবে, রক্তপাত হবে। এই বিবেচনা করে সেও এক গুপ্তচর প্রেরণ করল তার পিতা ও খুল্লতাতের গতিবিধির উপরে নজর রাখার জন্য। প্রতাপের গুপ্তচরের হাতে বসন্ত রায়ের গুপ্তচর দুর্ভাগ্যবশত ধরা পড়ে গেল। এই ঘটনায় প্রতাপ ভীষণ ক্ষুব্ধ হয়।

তার বিরুদ্ধে তার খুল্লতাত গুপ্তচর নিয়োগ করেছে!

সে হুংকার দিয়ে উঠল। শঙ্করকে তৎক্ষণাৎ নির্দেশ দিল নগর আক্রমণের। সেই সঙ্গে রাজকোশেরও দখল নিতে হবে।

সেই রাত্রেই শঙ্করের নেতৃত্বে মোগল সেনা যশোর নগর আক্রমণ করল। কিন্তু বিরুদ্ধ পক্ষের কোনও প্রস্তুতি বা প্রতিরোধ না থাকার জন্য বিনা বাধায় প্রতাপ রাজকোশের দখল পেয়ে যায়। প্রতাপ সেখানেই শিবির স্থাপন করে অবস্থান করল। তার সঙ্গীরা প্রচার করে দিল যে মোগল সম্রাটের ফরমান বলে সে এখন যশোরের প্রধান মোগল প্রতিনিধি। রাজকোশ এখন তারই দায়িত্বে থাকবে।

প্রতাপের এই আচরণে বিক্রমাদিত্য ও বসন্ত রায় বড়োই ব্যথিত হলেন। এমনকি প্রতাপের এই উদ্ধত আচরণ যশোরের সাধারণ মানুষও ভালো চোখে দেখল না। সুশাসক বিক্রমাদিত্যের শাসনে তারা সুখেই ছিল।

কিন্তু প্রতাপের এই বিজয়ে একজনের গর্বের সীমা পরিসীমা ছিল না।

কতকাল সে স্বামীকে চক্ষে দেখেনি। সকলের চক্ষু এড়িয়ে দুই কপোত-কপোতীর যেন মিলন ঘটল। পরস্পর পরস্পরকে পেয়েও যেন কিছুতেই আশ মিটছে না। শিবিরের ক্ষুদ্র পরিসর যেন তাদের কাছে দিগন্তের মতো বৃহৎ হয়ে দেখা দিল। কিছুতেই দুজন দুজনের কাছে কীভাবে পৌঁছবে তা যেন ভেবেই কুল কিনারা পেল না। কেমন করেই বা তারা পরস্পরকে গ্রহণ করবে! প্রথম মিলনের প্রাথমিক আবেগ কাটিয়ে ওঠার পরেই শরৎকুমারীর মন যেন অভিমানে বাধাহীন হয়ে যায়। তার মুখ দিয়ে চিরাচরিত নারীর অমোঘ বাণী বেরিয়ে এল, ‘তুমি আমাকে একটুও ভালোবাসো না! এতদিন না দেখে কোনও সংবাদ না নিয়ে কী করে থাকতে পারলে?’

প্রতাপ এই কথার কোনও উত্তর দেয় না। এই কথার একটাই উত্তর হয়।

প্রতাপ ভালোবাসায় তাকে ভরিয়ে তুলল। ভালোবাসায় হাঁপিয়ে দিতে চাইল প্রাণের প্রিয়াকে। সারা রাত্রি তাদের জেগেই কাটল। তবে এই ভাবে লুকিয়ে মিলিত হবার যেন আলাদা একটা মাধুর্য আছে!

চলে যাবার আগে শরৎকুমারী বলল, ‘এবার গৃহে চলো। পিতা কিছুই বলবেন না! তুমি অযথা ভুল ভেবেছ তাঁকে। তিনি এমন মানুষই নন। আমাকে কত ভালোবাসেন তিনি!’

প্রতাপও যেন নিজের ভুল বুঝতে পারছে। এই ভাবে হঠকারী উপায়ে নিজেরই রাজ্য আক্রমণ করা তার উচিত হয়নি।

মৃদু গলায় সে বলল, ‘যাব। কতকাল খুড়িমাকে দেখিনি। মাকে দেখিনি।’

সহসা শরৎকুমারীর মুখ বিষণ্ণ হয়ে গেল। প্রদীপের মৃদু আলোয় প্রতাপ লক্ষ্য করল তার দুই চোখ জলে ভরে উঠছে।

- খুড়িমা আর নেই। তিনি আমাদের ছেড়ে না ফেরার দেশে চলে গিয়েছেন।

‘কী বলছ তুমি?’

প্রতাপ পাগলের মতো স্ত্রীর দুই স্কন্ধ ধরে ঝাঁকাতে লাগল। তার মাথার ভিতরে যেন এক অবোধ পাগল চেপে বসেছে।

‘না না এ হতেই পারে না!’

কেউ কোনও দিন প্রতাপের চোখে অশ্রু দেখেনি। শরৎকুমারীর মনে হল, প্রতাপের দুই চোখ যেন জলে ভরে উঠেছে।

প্রতাপ যে এই ভাবে ভেঙে পড়তে পারে এ যেন শরৎকুমারীর কাছে বিস্ময়।

প্রতাপ মৃদু গলায় বলল, ‘তুমি এস এখন। ভোর হয়ে এল। শঙ্কর তোমাকে পৌঁছে দেবে।’

শরৎকুমারী একবার প্রতাপকে বুকে জড়িয়ে ধরল শক্ত করে। বুকে মাথা রেখে মনে মনে বলল, ‘তুমি এত ভেঙে পোড়ো না। তোমার এই ভাবে ভেঙে পড়া মানায় না।’

এই কথা প্রতাপ শুনতে পেল কি না কে জানে। কিন্তু, তার চোখ দিয়ে জলের ধারা নামলেও সে শক্ত করে স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরে থাকল। সে যেন মনে মনে শক্তির সন্ধান করছে। এবং সেই শক্তির অবলম্বন যেন সে খুঁজে পেয়ে গিয়েছে অবশেষে।

রাজা বিক্রমাদিত্য তাঁর কনিষ্ঠকে ডেকে বললেন, ‘চলো, আমরাই বরং প্রতাপের কাছে যাই। পুত্র যা অন্যায় করেছে, পিতা হিসাবে আমাকে তা ক্ষমা করতেই হবে। না করলে রাজ্যের অমঙ্গল। প্রাণ থাকতে আমি এই রাজ্যের কোনও ক্ষতি হতে দিতে পারি না।’

বসন্ত রায় আর কী বলবেন! প্রতাপের আচরণে তিনি ক্ষুব্ধ হবার থেকে মনে মনে যেন লজ্জিত হয়েছেন বেশি। শিশুকাল থেকে তিনি কি প্রতাপকে ভুল শিক্ষা দিয়ে এসেছেন?

দুই ভ্রাতা আর অধিক বিলম্ব না করে প্রতাপের শিবিরে গিয়ে উপস্থিত হলেন। প্রতাপ তখন শঙ্কর, সূর্যকান্ত, কার্লোস, কামাল প্রভৃতি বন্ধুদের সঙ্গে পরবর্তী পদক্ষেপের বিষয়ে আলাপ আলোচনা করছিল। পিতার আগমনের সংবাদ পেয়ে অতি দ্রুত সে বাইরে বেরিয়ে এসে পিতৃব্যদের সাদর আমন্ত্রণ জানিয়ে উত্তম আসনে উপবেশন করাল। পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলে উভয়েই তাকে আশীর্বাদ করলেন।

প্রতাপকে অধোবদনে লজ্জিত দেখে বিক্রমাদিত্য বললেন, ‘বাছা, এইসবের কি কোনও প্রয়োজন ছিল? আমি বৃদ্ধ হয়েছি, আমার পরে তো সিংহাসনে তুমিই বসবে! আর তুমি যে মোগল বাদশাহের কাছ থেকে ফরমান লাভ করেছ এতে আমি খুবই আনন্দিত হয়েছি। পুত্রের সাফল্যে কোন পিতার না গর্ব হয়!’

প্রতাপ কিছু বলল না। সেই একই ভাবে মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে থাকল।

বিক্রমাদিত্য আবার বললেন, ‘প্রতাপ গৃহে ফিরে চলো। রাজ্যের কার্যভার বুঝে নাও।’

বিক্রমাদিত্যের এই কথায় বসন্ত রায়ের মুখে যেন একটা কালো ছায়া পড়ল। কিন্তু তিনি মুখে কিছু বললেন না।

তাঁর এই ভাব পরিবর্তন কেউ না লক্ষ করলেও, বিক্রমাদিত্য লক্ষ করেছেন। তিনি মনে মনে বুঝতে পেরেছেন কনিষ্ঠ ভ্রাতার মনোভাবের কারণ।

প্রতাপ আর কাল বিলম্ব করল না। সে বুঝতে পারল, এই মুহূর্তে পিতার সঙ্গে বিবাদে কোনও লাভ নেই। বা তার কারণও এই মুহূর্তে অনুপস্থিত। প্রতাপ গৃহে ফিরে এসে পূর্ণ উদ্যমে রাজস্ব আদায়ের কাজে মনোনিবেশ করল। বিক্রমাদিত্য নামেই রাজা হিসাবে সিংহাসনে বসে থাকলেন। এমনকি খুল্লতাত বসন্ত রায়ের পরামর্শ নিল না প্রতাপ। সে তার চারপাশে পুরানো বন্ধুদের একে একে বিভিন্ন পদে বসিয়ে রাজকার্য সামলাতে লাগল।

বিক্রমাদিত্য আলগোছে থেকে সব কিছু লক্ষ করতে লাগলেন। তিনি বুঝতে পারছিলেন ভ্রাতা বসন্ত রায় মনে মনে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছে। দ্বিতীয়বার বিবাহ করে বসন্ত রায় আরও বেশি করে অগ্রজের থেকে দূরে সরে যেতে লাগলেন।

বিক্রমাদিত্য দেখলেন গৃহবিবাদ আসন্ন। চন্দ্রলেখার মৃত্যুও যেন প্রতাপ আর বসন্ত রায়ের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি করেছে। প্রতাপ হয়তো মনে মনে তার প্রিয় খুল্লতাতকেই চন্দ্রলেখার মৃত্যুর কারণ হিসাবে দায়ী করছে। প্রতাপ যখন একা একা বিরলে থাকে, তখন সে খুড়িমার অভাবটা বেশি করে অনুভব করে। ভাবে, তার এই সাফল্য দেখলে খুড়িমা বুঝি কত খুশি হত। খুল্লতাতের অবহেলাই শেষের দিকে তার প্রিয় খুড়িমাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে। নতুন খুড়িমাকে সে একেবারেই সহ্য করতে পারে না। এমনকি সে দেখাও করতে যায় না কখনও বসন্ত রায়ের নতুন পত্নীর সঙ্গে।

বিক্রমাদিত্য সবই বুঝতে পারছিলেন। নিজের পুত্রের সঙ্গে নিজের ভ্রাতার যাতে বিবাদ এবার বড়ো আকার ধারণ না করে সেই কারণে তিনি একটি উপায় ভাবলেন। ঠিক করলেন রাজ্যের সীমানা তিনি দুই ভাগে ভাগ করে দেবেন। সেই মতো তিনি একদিন প্রতাপ আর বসন্ত রায়কে ডেকে বললেন, দেখো, আমার বয়স হয়েছে। এখন আর এই বিষয়আশয়ে বদ্ধ থাকতে আমার মন চায় না। আমি আমার অবশিষ্ট কয়েকটি দিন
ধর্ম-কর্ম নিয়েই কাটিয়ে দিতে চাই। তাই ঠিক করেছি এই রাজ্য তোমাদের দুজনকে দুই ভাগে ভাগ করে দেব।’

প্রতাপ আর বসন্ত রায় উভয়ে চুপ করে শুনতে লাগল।

বিক্রমাদিত্য বুঝলেন উভয়ের এই বিষয়ে আপত্তি নেই। তাই তিনি তাঁর রাজ্যবণ্টনের সিদ্ধান্ত জানালেন। প্রতাপ পেল দশ আনা আর বসন্ত রায়কে দিলেন ছয় আনা। যশোর রাজ্য ভাগীরথী থেকে মধুমতী পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। পূর্ব ভাগ তিনি দিলেন প্রতাপকে আর পশ্চিম ভাগ হল বসন্ত রায়ের অংশ।

বসন্ত রায় কিন্তু এই বণ্টনে খুশি হতে পারলেন না। বললেন, ‘ভ্রাতা জীবিত থাকতে প্রতাপকে অধিক অংশ প্রদান করা কি বিবেচনার কাজ হল?’

বিক্রমাদিত্য বললেন, ‘দেখো বসন্ত, তুমি তো অধিক উর্বর আর সম্পন্ন অংশ পেলে। বরং প্রতাপের অংশে অনুর্বর আর জঙ্গলাকীর্ণ ভাগই বেশি পড়েছে।’

কিন্তু প্রতাপও এই বণ্টনে খুব একটা খুশি হল না। সমুদ্র-তীরবর্তী চাকসিরি খুল্লতাতের ভাগে থাকায় সে বলল, ‘পিতা, চাকসিরি আমাকে প্রদান করুন। আমি ওই স্থানে একটি বন্দর স্থাপন করার পরিকল্পনা করেছি।’

তার পিতা কিছু বলার আগেই, বসন্ত রায় বলে উঠলেন, ‘না প্রতাপ এ ঠিক হচ্ছে না। তুমি এমনিতেই অধিক অংশ পেয়েছ। চাকসিরি তুমি আর পাবে না।’

খুল্লতাতের এই কথায় প্রতাপ ক্ষুব্ধ হয়ে উঠল। পিতার সামনেই সে আসন থেকে উঠে দাঁড়িয়ে তীব্র ভাষায় কিছু বলতে গেল।

কিন্তু বিক্রমাদিত্য হাত তুলে তাকে বিরত করলেন। মৃদু ভর্ৎসনার স্বরে বললেন, ‘প্রতাপ, তোমাদের মধ্যে যাতে কোনও বিবাদ উপস্থিত না হয় সেই কারণেই আমি এই ভাবে রাজ্য বণ্টন করেছি। কারণ আমি চাই না তিল তিল করে গড়ে তোলা যশোর গৃহবিবাদে নষ্ট হয়ে যাক! তুমি যেমন দ্বীপ অঞ্চলে তোমার পরিকল্পনায় রাজ্যের রাজস্ব বৃদ্ধি করছ, সেই কারণেই বিবেচনা করে সেই অংশ তোমার হাতে দিয়েছি। তা ছাড়া ধূমঘাট তো তোমার অধিক প্রিয় স্থান, যশোর অপেক্ষাও। তাই তোমাকে ওই অংশ প্রদান করেছি। এ ছাড়া সমগ্র যশোরের সীমানা এই ভাবে তোমাদের দুজনের হাতে থাকলেও, রাজস্ব একই সাথে মোগল বাদশাহের কোশাগারে প্রেরিত হবে। এই বিষয়ে, এই রাজ্য বণ্টন নিয়ে আমি শাহেনশা আকবরকে পত্র দিয়ে জানিয়েছি। তাঁরও এই বিষয়ে আপত্তি নেই। মহামতি টোডরমল আমাকে দূত মারফত জানিয়েছেন। সুতরাং তোমরা যদি উভয়ে উভয়ের স্থান সুষ্ঠু ভাবে শাসন করো, তাতে তোমাদের দুজনেরই মঙ্গল।’

একটানে কথাগুলি বলে তিনি যেন হাঁপিয়ে উঠলেন। প্রতাপ কিছু বলল না। সে পিতাকে প্রণাম জানিয়ে কক্ষ হতে বেরিয়ে গেল। কিন্তু চাকসিরি নিয়ে তার মন খুল্লতাতের প্রতি ভীষণ ভাবে বিষিয়ে গেল। সে মনে মনে যে পরিকল্পনা করে রেখেছে, তা কি ব্যর্থ হয়ে যাবে?

না না, প্রতাপ এত সহজে হাল ছাড়বে না।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%