নতুন যশোর

অবিন সেন

জী্ণ যশোরেশ্বরীর মন্দির নতুন করে সংস্কার করালেন বিক্রমাদিত্য। বিপুল ধুমধাম করে মা-র পুজো সম্পন্ন হল। ব্রাহ্মণদের লক্ষ মুদ্রা উপহার দিলেন। বিভিন্ন প্রদেশ থেকে দলে দলে ব্রাহ্মণ, কায়স্থগণ এলেন, তাঁদের জন্য উপযুক্ত বসবাসের ব্যবস্থা করে দিলেন বসন্ত রায়। সকলকে নিজের নিজের পছন্দমতো ভূমি প্রদান করা হল। বিদ্বান ব্রাহ্মণগণ পেলেন ব্রহ্মোত্তর ভূমি। ফলে গ্রামে গ্রামে বহু সংখ্যক চতুষ্পাঠী স্থাপিত হল। একদিন যে যশোর জঙ্গলাকীর্ণ ছিল, তা অল্পদিনেই জনবসতিপূর্ণ নগরে পরিণত হল। নতুন নতুন সড়ক নির্মাণ করা হল। ধূমঘাটের কাছে পদ্মার মোহানায় নতুন বন্দর স্থাপিত হল। কয়েক বৎসরের মধ্যেই নতুন নগর যশোর যেন বঙ্গের রাজধানী গৌড়েরও যশ হরণ করে নিল।

এদিকে খুল্লতাত বসন্ত রায়ের তত্ত্বাবধানে প্রতাপের শিক্ষা চলতে লাগল। বসন্ত রায় নিজের হাতে প্রতাপকে অস্ত্রশিক্ষা দিতে লাগলেন। মেধাবী প্রতাপের অস্ত্রশিক্ষার ব্যুৎপত্তি দেখে বসন্ত রায়ও মাঝে মাঝে চমকে ওঠেন। বালক বয়সেই অশ্বচালনাতে সে এতটাই দক্ষ হয়ে উঠল যে তার সমকক্ষ আর কেউ রইল না। সে যেন সবসময়েই এক কদম এগিয়ে থাকে।

বসন্ত রায় মনে মনে ভাবেন, ‘এমনটা বুঝি দেখা যায় না কোথাও।’

কি অসিচালনা, কি খড়্গচালনা, সবেতেই তার দক্ষতা প্রশ্নাতীত হয়ে দেখা দিতে লাগল। প্রতাপের শারীরিক গঠনও ছিল দেখার মতো। যত সে বড়ো হতে লাগল তত তাঁর শারীরিক সৌষ্ঠব শিল্পীর হাতের ভাস্কর্যের মতো সুন্দর হয়ে উঠতে লাগল। ঈশ্বর যেন তাকে গড়তে এতটুকু কার্পণ্য করেননি। উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ মুখটিতে কাঠিন্য ও লাবণ্য যেন নিক্তি মেনে নির্ধারিত হয়েছে। মাত্র বারো বৎসর বয়সেই তাঁর শরীর এক পূর্ণ যুবার ন্যায় হয়ে গিয়েছে। বেতসকাঠির মতো ঋজু আর কঠিন।

কিন্তু প্রভূত বুদ্ধিমান ও মেধাবী হওয়া সত্ত্বেও বিদ্যাশিক্ষার প্রতি তার মনোযোগ বিশেষ নেই। বসন্ত রায় ভ্রাতুষ্পুত্রকে পণ্ডিত লক্ষ্মণ ঠাকুরের কাছেই পাঠিয়েছিলেন বিদ্যাশিক্ষার জন্য। কিন্তু দেখা যায় অধিকাংশ দিনই সে সেখানে অনুপস্থিত।

এই সময়ে সমবয়সি আরও দুই কিশোরের সঙ্গে প্রতাপের বন্ধুত্ব হয়ে গেল। বাকলা থেকে আগত ব্রাহ্মণ সন্তান শঙ্কর চক্রবর্তী। আর চন্দ্রদ্বীপ থেকে আগত কায়স্থ পরিবারের সন্তান সূর্যকান্ত গুহ। উভয়ের চেহারাও প্রতাপের মতো সুগঠিত আর বলশালী। কিন্তু শঙ্কর ধীর স্থির শান্ত স্বভাবের আর সূর্যকান্ত ছিল ঠিক তার বিপরীত, উচ্ছল আর দামাল।

প্রতাপ টোল ফাঁকি দিয়ে দুই বন্ধুকে নিয়ে নদীর তীরে চলে যায়। বনে জঙ্গলে চলে যায়। সেখানে পশু পক্ষী শিকারই তার খেলা। সেই খেলাতেই তার যত আনন্দ। চতুষ্পাঠীর চার দেওয়ালের ভিতরে আবদ্ধ শিক্ষায় তার আগ্রহ নেই। মাঠে ঘাটে অরণ্যে প্রকৃতির নানা দুর্গমতা, বিরুদ্ধতা তার শিক্ষার পাঠ ঠিক করে দিয়েছে যেন।

দুই বন্ধু শঙ্কর আর সূর্যকান্তকে নিয়ে সে নদীর ধারে জঙ্গলে গিয়ে বসে থাকে। কে বলবে সে এই অঞ্চলের ভূস্বামী রাজার পুত্র। জেলে আর মল্ল প্রভৃতি অন্ত্যজ শ্রেণির বালক কিশোরদের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব। জেলেদের কাছ থেকে সে মাছ শিকার শিখছে। দণ্ডের পর দণ্ড সে চন্দনা নদীর তীরে ছিপ ফেলে বসে থাকে। কোনও দিন মাছ ওঠে। কোনও দিন ওঠে না। এ যেন তার ধৈর্যের পরীক্ষা হয়। তবু সে হাল ছেড়ে দেয় না। খাঁ খাঁ রোদ্দুর মাথায় নিয়ে জোলো হাওয়ায়, নগ্ন মস্তকে সে মাছের অপেক্ষায় বসে থাকে। কোনও দিন জেলেদের সঙ্গে ছোটো ডিঙি নৌকায় সে চলে যায় গভীর অরণ্যে। তির ধনুক চালনা করা সে শিখেছে, কিন্তু তা কি যথেষ্ট! একদিন এক নেকড়ের পিছনে ধাওয়া করে তাকে হত্যা করতে গিয়ে সে বুঝেছে, তার শিক্ষা যথেষ্ট নয়।

পর পর দুটি শর নিক্ষেপ করল সে। তার মধ্যে একটি সেই শ্বাপদকে বিদ্ধ করলেও, তাতে সেটি যথেষ্ট আহত হল না। শেষে সূর্যকান্তর নিক্ষেপ করা ভল্লে তার মাথা এফোঁড় ওফোঁড় হয়ে যায়।

শঙ্কর তাকে রাজা বলে ডাকে। সে মৃদু তিরস্কারের ভঙ্গিতে বলল, ‘এভাবে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ওই শ্বাপদের পিছনে যাওয়া তোমার উচিত হয়নি।’

প্রতাপ হা হা করে হেসে উঠে বলল, ‘একটা শ্বাপদকে যদি বধ করতে না পারি তবে কেমন করে শত্রুদের বধ করব!’

শঙ্কর তবু তর্ক করতে ছাড়ে না।

‘শত্রু কি নেকড়ের থেকেও শক্তিশালী? তুমি অনায়াসে তাকে বধ করতে পারবে। আর তোমার শত্রুই বা এখন কোথায়?’

‘শত্রুকে ছোটো করতে নেই বন্ধু। সে শত্রু যদি শ্বাপদের থেকে শক্তিশালী হয় তবে তো আমি শেষ! আর শত্রু! বন্ধু, আমাদের চারপাশে শত্রু। আমি একদিন শুধু যশোরের নয় এই বাংলার রাজা হব। তোরা দেখে নিস। আর রাজার তো শত্রু থাকবেই। জানিস তো তাকতই ঈশ্বরের মোহর। মোগলদের করদ হয়ে আমি থাকব না।’

কথাগুলি বলতে বলতে তার নাসা স্ফূরিত হয়ে ওঠে। তার শরীরের ভিতরে শোণিতধারা যেন খলবল করে নেচে ওঠে। শিশুকাল থেকে সে সুলেমানের ওড়িশা আক্রমণ আর তা প্রতিরোধ করতে ওড়িশাবাসীর প্রবল যুদ্ধ আর আত্মত্যাগের কাহিনি শুনে এসেছে। যখন সে খুল্লতাতের কাছে মোগলদের বিরুদ্ধে দাউদের প্রবল যুদ্ধের কাহিনি শুনত তখন সে তার শরীরের ভিতরে কী এক অনির্বচনীয় উত্তেজনা অনুভব করত। সেই কোন শৈশবকাল থেকেই যেন তার ভিতরে বদ্ধমূল ধারণা হয়ে গিয়েছে, মোগলরা তাদের শত্রু! অথচ এই কথা তার খুল্লতাত বসন্ত রায় তাকে শেখাননি। বরং বসন্ত রায় তাকে বারে বারে বলেছে, ‘মোগলদের সঙ্গে যুদ্ধ করে আদতে কোনও লাভ হবে না, তার থেকে তাদের সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে চলতে পারলে বাংলার বুকে স্বাধীনভাবে ভূস্বামী হয়ে থাকতে পারবে’। কিন্তু এই সকল ধারণা প্রতাপের মনঃপূত হয় না। সম্পূর্ণ স্বাধীন এক বাংলার স্বপ্ন তার মনের ভিতরে তরুশিশুর মতো ক্রমশ শাখা মেলেছে।

সে অন্যমনা হয়ে গিয়েছিল।

সূর্যকান্ত এক মনে সেই মৃত নেকড়েটিকে ভালো করে বেঁধে ডিঙিতে তোলার চেষ্টা করছিল। কাজ শেষ করে সে বলল, ‘তুমি ঠিকই বলেছ রাজা। আমরা তোমার সঙ্গে আছি।’

শঙ্করও তার কথায় সায় দেয়।

তাদের কথা শুনে প্রতাপ আনন্দিত হয়। এক ঝটকায় সে একটা দাঁড় হাতে তুলে নিয়ে শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে ছপাৎ করে সেই দাঁড় জলে ফেলে প্রবলভাবে তাতে টান দেয়। এক লহমায় ডিঙি যেন দশ হস্তের অধিক এগিয়ে যায়।

তারপরে একবার দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সে বলে, ‘কিন্তু শরচালনা শিক্ষা আমার যেন যথেষ্ট হয়নি। আমাকে তো সমগ্র আর্যাবর্তের সেরা শরনিক্ষেপকারী হতে হবে। আমার অস্ত্রগুরু মাধব ভট্টর কাছ থেকে যা শেখার তা শেখা হয়ে গিয়েছে। এখন আমাকে নতুন নতুন কৌশল শিখতে হবে।’

শঙ্কর আর সূর্যকান্তও ভাবছিল, কী করা যায় এই বিষয়ে। রাজার মাথায় যখন একবার এই চিন্তা প্রবেশ করেছে তখন সে একটা সুরাহা খুঁজে বার করবেই।

কিন্তু তাদের বিশেষ কিছু ভাবতে হল না। দৈবই যেন এই বিষয়ে তাদের সাহায্য করল।

প্রতাপ লক্ষ্য করল তাদের সামনে সামনে আর একটা ডিঙি মন্থর ভাবে চলেছে।

- হ্যাঁ রে শঙ্কর, ওই ডিঙিটা বেশ সুন্দর না!

- ঠিক বলেছ রাজা। ওটা মনে হচ্ছে পোর্তুগিজদের নৌকা। ওরা বেশ সুন্দর নৌকা তৈরি করে। ওদের নৌকাগুলো হালকা আর দ্রুতগামী। বাকলায় আমি দেখেছি। তবে ওদের নৌকা এখানে কেন?

সূর্যকান্ত গায়ের জোরে দাঁড় টেনে বলল, ‘শঙ্কর, একটু জোরে দাঁড় টানো তো আমাদের ডিঙিটাকে ওদের আরও কাছে নিয়ে যাই। দেখি ওরা কে?’

তিনজনে প্রবল ভাবে বাইতে শুরু করে। সামনের ডিঙিটি তাদের এই পশ্চাৎ অনুসরণ লক্ষ্য করেনি। তারা পিছনের ডিঙিকে রাস্তা ছেড়ে দেবার ঢঙে নদীর কিনারের দিকে সরে যায়। প্রতাপের ডিঙি ততক্ষণে সামনের ডিঙিটির আরও নিকটে পৌঁছে গিয়েছে। সামনের নৌকার মানুষদের এবার স্পষ্ট চেনা যাচ্ছে। তারা দুই জন, এক বৃদ্ধ ও একটি কিশোর। কিশোরটি প্রতাপদের সমবয়সিই হবে হয়তো। পোশাক-আশাকে চেহারায় বোঝা যায় তারা পোর্তুগিজ। কিশোরটির কাঁধে অদ্ভুতদর্শন এক গাণ্ডীব, পিঠের তূণীরে বেশ কয়েকটি শর। কিশোরটি নিমেষে শরযোজনা করে সহসা জলের মধ্যে একটি বৃহৎ মাছকে বিদ্ধ করে ফেলল। প্রতাপ ভাবল, ‘বাহঃ, অদ্ভুত তিরন্দাজ তো!’

অকস্মাৎ চোখের নিমেষে এক বিপজ্জনক ঘটনা ঘটে গেল। নদীর তীরের নাব্যতা অগভীর। এক করালদশন কুম্ভীর জল থেকে মাথা তুলে বিদ্যুদ্বেগে সেই সামনের ডিঙিটিকে আক্রমণ করেছে। কুমিরটি হয়তো খুব বৃহৎ নয় কিন্তু তার আক্রমণের তীব্রতা ভীষণ। সামনের অল্পভার ডিঙিটি সেই আক্রমণ প্রতিহত করতে পারল না। খেলনা নৌকার মতো সেটি উল্টে যায়। সঙ্গে সঙ্গে সেই কিশোর আর বৃদ্ধটি ছিটকে জলে পড়ে যায় প্রায় কুমিরের মুখের কাছে।

এদিকে প্রতাপও চোখের নিমেষে জলে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। তাকে অনুসরণ করে সূর্যকান্ত। তড়িৎ গড়িতে বিপুল বাহু সঞ্চালন করে তারা পৌঁছে গিয়েছে প্রাণভয়ে ভীত সামনের নৌকার যাত্রীদের কাছে। সে এক ভীষণ মহারণ। কালীয়দমনের সময়ে শ্রীকৃষ্ণ বোধহয় এমন মহারণ করেছিলেন। অবশেষে প্রতাপের তীক্ষ্ণ অসির আঘাতে কুমিরটির মাথা দ্বিখণ্ডিত হয়ে গেল।

বৃদ্ধটির একটি পা কুমিরের করাল দাঁতের আঘাতে ভালো রকমের আহত হয়েছে। কিশোরটি কোনোক্রমে রক্ষা পেয়েছে। কিন্তু এত সত্ত্বেও সে তার ধনুকটিকে হাতছাড়া করেনি। সূর্যকান্ত আর প্রতাপ মিলে তাদের দুজনকে ডিঙিতে তুলে নিয়ে আসে। তাদের ডিঙিটিকেও সোজা করে একটি রশি দিয়ে নিজেদের নৌকার সঙ্গে বেঁধে নেয়।

কিশোরটি প্রথমে কথা বলতে পারছিল না। ভয়ে তখনও সে কাঁপছিল। একটু ধাতস্থ হলে বৃদ্ধটি বলল, তারা ভুল করে এই নদীতে চলে এসেছে। জঙ্গলের ভিতরে এ নালা- সে নালায় তারা শিকার করছিল। পথ ভুলে সম্পূর্ণ উলটো দিকে তারা এই দিকে চলে এসেছে।

বৃদ্ধের নাম আন্তেনিও আর কিশোরটি তার নাতি কার্লোস। অনেকদিন তারা চ্যান্ডিক্যানে আছে। ফলে ভাঙা ভাঙা বঙ্গীয় ভাষা বলতে পারে।

প্রতাপ নিজেদের পরিচয় দিল না প্রথমে। সে কিশোরটিকে লক্ষ করে বলল, ‘তুমি তো অদ্ভুত তিরন্দাজ! জলের ভিতরে ওইভাবে মাছকে বিদ্ধ করতে পারো!’

কিশোরটির হয়ে বৃদ্ধ উত্তর দিল।

- ও সত্যি অদ্ভুত তিরন্দাজ। এই তিরন্দাজি করে শিকার করে আমাদের পেট চলে। শুধু মাছ কেন! ও তো উড়ন্ত পক্ষীকেও শরবিদ্ধ করতে পারে। শরগুলো তো জলে পড়ে গেল, না হলে এখনই তোমাকে দেখাতে পারত।

প্রতাপ বলল, ‘আমাকে শেখাবে?’

এবার কার্লোস উত্তর দিল।

‘কেন শেখাব না? তুমি আমার প্রাণ বাঁচিয়েছ।’

শঙ্কর এতক্ষণ চুপ করে ছিল। বলল, ‘ইনি কে জানো তো! যশোরের যুবরাজ। তোমরা আমাদের সঙ্গেই চলো। তোমাদের আর পেটের চিন্তা করতে হবে না।’

তারা সানন্দে রাজি হয়ে যায়। কারণ তারা হাঘরে। চালচুলো নেই তাদের। আজ এখানে কাল ওখানে ঘুরে বেড়ায় পেট চালাবার সন্ধানে।

প্রতাপও দেখল কার্লোস বেশ শক্তপোক্ত। উচ্চতা খুব বেশি নয়। তবে পেশিবহুল শরীর। মাথায় সোনালি বর্ণের চুল। চোখের মণি দুটো বাদামি কিন্তু গভীর। গায়ের গৌরবর্ণের উপরে লোনা জলের ছোঁয়াচ লেগে যেন একটা কালো আস্তরণ পড়ে গিয়েছে।

ছেলেটিকে বেশ মনে ধরল প্রতাপের। সে মনে মনে ভাবল এমনি করে এক এক করে তাকে কয়েক জন বিশ্বস্ত সঙ্গী জোগাড় করতে হবে।

তার বিশ্বস্ত বন্ধু বৃত্তে আরও একটি নাম যুক্ত হল, কার্লোস।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%