যশোরেশ্বরী

অবিন সেন

মা, মাগো, মা যশোরেশ্বরী।

মা তাঁকে ডাকছেন! তিনি দেখলেন সাত আট বছর বয়সের ছোটো ছোটো ছেলেরা দল বেঁধে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলছে। তারপরে তারা একটি ছেলেকে বন্দি করে নিয়ে গিয়েছে যশোরেশ্বরীর মন্দিরে। সেখানে যূপকাষ্ঠে ছেলেটিকে শুইয়ে দিয়ে ছোটো ছেলেদের দলপতি খড়্গের মতো একটি বেতসকাঠিকে মাথার উপরে তুলে বলি দেবার ভঙ্গিতে যূপকাষ্ঠে বন্দি ছেলেটির মাথায় আঘাত করল। কী বিস্ময়, সেই বেতসকাঠির আঘাতেই শিশুটির মাথা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছে। বেতসকাঠি হাতে দলপতি ছেলেটি হা হা করে হেসে উঠেছে। বিক্রমাদিত্য শিশুটির মুখ দেখতে পাচ্ছেন না। সহসা সে মুখ ঘুরিয়ে তাকায়। ঘুমের ভিতরেই তিনি কেঁপে উঠলেন। এ কী! এ কী! এ যে তাঁর পুত্র প্রতাপাদিত্য! এমন নিষ্ঠুর!

ঘুম ভেঙে গেল বিক্রমাদিত্যের। তখন কত রাত্রি হবে! ছপ ছপ করে জলের শব্দ। নৌকার দাঁড়ের সঙ্গে জলের নিরন্তর সংঘর্ষ। অকস্মাৎ তিনি শয্যার উপরে উঠে বসলেন। নৌকার ভিতরে ছোট্টো জানালা দিয়ে হাওয়া আসছে। বাইরে অন্ধকারে কিছু দেখা যায় না ভালো করে। বহুদূরে যেন কালো আবছা গাছের সারি।

তিনি জোড়হাতে নমস্কারের ভঙ্গি করে কপালে ঠেকালেন। ঘুমের ভিতরে মা তাঁকে ডাকছেন। তিনি চোখ বুজে বিড়বিড় করে বললেন,

মা, মাগো, মা যশোরেশ্বরী। আমাকে ক্ষমা করো মা। তোমার মন্দিরে এমন অনাচার কেন দেখালে মা! আমার দ্বারা কী কোনও অপরাধ ঘটেছে মা?

সারা রাত্রি আর ঘুম হল না তাঁর। শয্যার উপরে বসে বসে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। প্রভাত হবার অপেক্ষা করতে করতেই তিনি সংকল্প করে ফেললেন, মা যশোরেশ্বরীর মন্দির তিনি আবার নতুন করে নির্মাণ করাবেন।

জলযাত্রার অন্তিম কয়েকটি দিন যেন তাঁর আর কাটতেই চায় না। কী এক ভীষণ আশঙ্কা আর দোলাচলের ভিতরে তাঁর কয়েকটি দিন কাটল। একটা পিপাসা! গৃহে ফিরে গিয়ে পুত্রকে কেমন দেখবেন তিনি! সাত বৎসরের পুত্র কি সত্যি এমন দুরন্ত হয়েছে! তাঁদের কুলপুরোহিত লক্ষ্মণ পণ্ডিতকে দিয়ে একবার পুত্রের ভবিষ্যৎ গণনা করিয়ে নেবেন তিনি।

জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার আগমনের হেতু বসন্ত রায় বিপুল সংবর্ধনার আয়োজন করেছেন নদী-ঘাটে।

সবে প্রভাত হয়েছে। পাখির দল কলকাকলিতে মেতে আছে গাছে গাছে। সাদা কাশের দল মৃদু শীতল বাতাসে দোল খাচ্ছে। নদীর জলে দ্রবীভূত হয়ে আছে আকাশের লাল রং। সুন্দর সজ্জিত বড়ো ভড় নৌকাটি নদীর কিনারায় এসে নোঙর ফেলতেই চারদিক থেকে কাঁসর ঘণ্টা বেজে উঠল। পুরোহিতগণ এসে মন্ত্রোচ্চারণ করতে করতে ফুল ছুঁড়ে দিতে লাগল। সেই ফুল বিছানো পথে ধীরে ধীরে বিক্রমাদিত্য নেমে এলেন। প্রিয় দাদাকে দেখে সামনে এগিয়ে এলেন বসন্ত রায়। তাঁর হাত ধরে ভ্রাতুষ্পুত্র প্রতাপাদিত্য।

প্রিয় পুত্রের হাত দিয়েই একটি ফুলের মালা তিনি দাদার গলায় পরিয়ে দিলেন। বিক্রমাদিত্যের চোখ জলে ভরে এল। তিনি হাত বাড়িয়ে পুত্রকে কোলে তুলে নিলেন। বিপুল স্নেহে মুখ চুম্বন করলেন পুত্রের।

প্রতাপ এই হট্টগোলের ভিতরে যেন কিছুটা বিরক্ত হয়ে গিয়েছে। খুল্লতাত তাকে বলে দিয়েছেন এই মানুষটি তার পিতা। কিন্তু শিশুর মনের পটে পিতা নামক মানুষটির কোনও স্মৃতি লগ্ন হয়ে নেই। পিতাকে সে শেষ যখন দেখেছিল তখন সে ছিল নিতান্তই শিশু। তারপরে মাতাই তার কাছে সব। পরবর্তীকালে খুল্লতাত আর খুড়িমা চন্দ্রলেখাকে সে সব থেকে বেশি কাছে পেয়েছে। বস্তুত পিতৃব্যই তার শৈশবে একধারে শিক্ষাগুরু, খেলার সাথি। অস্ত্রগুরুও বটে।

ছোট্ট প্রতাপ পিতার মুখের দিকে এক মনে তাকিয়ে থাকল। এক মনে কী যেন দেখতে থাকল।

বিক্রমাদিত্যের চোখের জল যেন বাধা মানছে না। বার বার বিপুল আবেগে পুত্রকে বুকে জড়িয়ে ধরছেন। কিছুতেই যেন তাঁর পিপাসা মিটছে না।

নদীর ঘাট থেকে শোভাযাত্রা করে তাঁরা গৃহে ফিরে এলেন। বসন্ত রায় লক্ষ করেছেন দাদার মুখের উপরে যেন একটা কালো মেঘের হালকা ছায়া লেগে আছে। তিনি বুঝতে পারছেন ভিতরে ভিতরে কিছু একটা ভাঙচুর হয়েছে। তবে এই আনন্দের আবহে তিনি এই বিষয়ে আর কিছু বললেন না। প্রাথমিক আবেগটা কাটিয়ে উঠে যশোমতীরও মনে হল প্রিয়তম স্বামীর মুখে আশঙ্কার কালো বাদল ঘনিয়ে আছে। স্বামীর মুখে যে আহ্লাদ, যে হাসি ফুটে ওঠার কথা তা যেন বিকশিত হতে গিয়েও কোথাও থমকে আছে। যেন স্বচ্ছ জলের উপরে পড়ে আছে বনরাজির আলতো ছায়া।

ক্রোড়ে শিশুপুত্রকে নিয়ে চন্দ্রলেখা প্রিয় জ্যেষ্ঠকে প্রণাম নিবেদন করল। তার অবগুণ্ঠনের বাহুল্য নেই। ভ্রাতার কাছে ভগিনীর লজ্জা কী! কিন্তু তবুও যেন কোথাও থেকে এক লজ্জা উড়ে এসে বসেছে। চন্দ্রলেখা প্রাণপণে সেই লজ্জাকে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করছে। মৃদু স্বরে বলল,

‘দাদা, ভালো আছেন?’

বিক্রমাদিত্য যথার্থ আনন্দের সঙ্গে লক্ষ করলেন চন্দ্রলেখাকে। বর্ষার কল্যাণকর বারিধারার স্পর্শে যেমন শাল-তরু ঋজু ও মঞ্জরিময়ী হয়ে ওঠে, তেমনি চন্দ্রলেখা যেন স্বকীয় সৌন্দর্যে ঐশ্বর্যময়ী হয়ে উঠেছে। বিক্রমাদিত্য স্নেহের ভ্রাতৃজায়াকে প্রাণভরে আশীর্বাদ করলেন।

রাত্রে দুই ভাই আহারে বসেছেন। যশোমতী পাশে থেকে তদারকি করছে। ছোটো বধূ চন্দ্রলেখা প্রতাপ আর নিজের পুত্র জগদানন্দকে ঘুম পাড়াতে গিয়ে যেন যুদ্ধ করছে। এমনটা তার নিত্যদিনের কাজ। প্রতাপের যত আবদার দস্যিপনা যেন সব খুড়িমার কাছে। নিজের মার কাছে সে অতটা পেরে ওঠে না।

আহার করতে করতে বিক্রমাদিত্য বললেন, ‘ভাই বসন্ত, জমিদারির কাজ ভালো করে শুরু করবার আগে একবার মা যশোরেশ্বরীর পুজো করা হোক ধুমধাম করে। দেশ-বিদেশের সহস্র ব্রাহ্মণ ভোজনের আয়োজন করা হোক। তুমি কী বলো?’

তিনি আহার থামিয়ে অগ্রজের মুখের দিকে তাকালেন।

বসন্ত রায় ভাবছেন, কিংবা অনুভব করতে পারছেন এই কয়েক বছরে অগ্রজের মধ্যে অনেক পরিবর্তন হয়েছে।

বিক্রমাদিত্য চিরকালই শান্ত স্বভাব, স্থিতধী ও চিন্তাশীল। সেই সঙ্গে তাঁর স্বভাবে নতুন করে ধর্মাচরণের ব্যাকুলতা যেন আরোপিত হয়েছে।

বসন্ত রায় এক কথায় জ্যেষ্ঠের প্রস্তাব আনন্দের সঙ্গে সমর্থন করলেন। বললেন, ‘আমি আগামীকালই বাকলা, বিক্রমপুর প্রভৃতি স্থানে দূত প্রেরণ করছি।’

সেই সঙ্গে তিনি বললেন, ‘এখানে আমরা কয়েকজন মাত্র স্বজাতি বসবাস করছি। বাকি যে সমস্ত মানুষ এখানে বসবাস করছে তারা সবই নিম্নবর্ণীয়। ফলে পূজা পার্বণে অনুষ্ঠানে যোগদান করার মতো আমাদের স্বজন-কুটুম্ব বিশেষ নেই। সেই অভাব দূর করবার জন্য আমরা বরং দূর দেশে আমাদের যে সমস্ত জ্ঞাতি-স্বজাতি আছে তাদের এখানে আনয়ন করাই। উপযুক্ত বসবাসের ব্যবস্থা যদি করে দিই তবে আমাদের আত্মীয়কুটুম্বের অভাব ঘুচবে। সেই সঙ্গে বিভিন্ন স্থান থেকে সুব্রাহ্মণ আর কায়স্থদের এই স্থানে এসে বসবাস করবার নিমন্ত্রণ জানাই।’

বিক্রমাদিত্য ভ্রাতার এই প্রস্তাবে যারপরনাই খুশি হলেন। বললেন,

‘তুমি উপযুক্তই চিন্তা করেছ। আমাদের স্বজাতির সংখ্যা এখানে বৃদ্ধি করবার দরকার আছে। সেই সঙ্গে আমাদের জমিদারির পরিধিও আস্তে আস্তে বৃদ্ধি করতে হবে। আমরা যদি শাহেনশা সম্রাট আকবরকে উপযুক্ত পরিমাণে রাজস্ব প্রদান করতে পারি তবে আমাদের প্রতিপত্তিও বৃদ্ধি পাবে।’

‘তুমি, ঠিকই বলেছ দাদা। এই যশোরকে আমরা উত্তমরূপে নগরে পরিবর্তন করব। রাস্তা-ঘাট নির্মাণ করতে হবে। পরিকল্পনা করে পরিখা খনন করে সেচ ব্যবস্থার উন্নতি ঘটিয়ে কৃষিকাজ বাড়াতে হবে।’

এমন উপযুক্ত ভাই পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। বিক্রমাদিত্য মনে মনে ভাবলেন। বললেন, ‘খুব উত্তম প্রস্তাব। তবে সবার আগে আমরা যশোরেশ্বরীর আরাধনা করব। মা আমাকে স্বপ্নে ডেকেছেন।’

কথাটি বলতে বলতে যেন তাঁর কণ্ঠ ভার হয়ে এল।

বসন্ত রায় তা লক্ষ করে বললেন, ‘দাদা, কিছু মনে কোরো না। মনে হয় কিছু বিষয়ে তুমি খুব চিন্তিত।’

বিক্রমাদিত্য কিছুক্ষণ ভাবলেন। তাঁর মুখের ভঙ্গি বিমর্ষ হয়ে এল।

- ভাই, মনটা বড়ো বিক্ষিপ্ত হয়ে আছে। প্রতাপকে নিয়ে খুব খারাপ স্বপ্ন দেখলাম সেদিন। ভাবছি কালই একবার লক্ষ্মণ ঠাকুরকে দিয়ে প্রতাপের কোষ্ঠীবিচারটা করিয়ে নেব।

পরদিনই খুব সকাল থেকে আগামী অনুষ্ঠানের তোড়জোড় শুরু হয়ে গেল। দিকে দিকে ব্রাহ্মণদের দূত হিসাবে প্রেরণ করা হল আত্মীয় ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয়দের নিমন্ত্রণ করার জন্য। হাতে সময় বেশি নেই। সন্ধ্যার দিকে ্লক্ষ্মণ ঠাকুর এলেন।

প্রতাপ খুব দুষ্টুমি করছিল। তাকে খুব বেশি বসিয়ে রাখা সম্ভব হল না। পণ্ডিতমশাই তাঁর হাতের রেখা একবার দেখলেন।

বিস্মিত হয়ে তিনি বিক্রমাদিত্যকে বললেন, ‘তোমার পুত্রের হাতে তো রাজচক্রবর্তী লক্ষণ প্রকট।’

তারপরে তিনি জন্মছক পেতে জটিল গণনায় ডুবে গেলেন।

উৎসুক চোখে সামনে বসে থাকলেন বিক্রমাদিত্য আর বসন্ত রায়। অন্তঃপুরের আড়াল থেকে অপেক্ষা করতে লাগলেন পুত্রের মা ও খুড়িমা।

গভীর মনোযোগে গণনা শেষে লক্ষ্মণ ঠাকুর বললেন, ‘দেব, তোমার পুত্র একদিন মহা পরাক্রমশালী রাজা হবে, সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। একদিন সে অন্যতম শ্রেষ্ঠ বীর বলে পরিগণিত হবে। তবে...’

কথাটা বলে তিনি থেমে গেলেন।

বিক্রমাদিত্য ও বসন্ত রায়ের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। কিন্তু পণ্ডিতমশাইয়ের শেষ কথাটা শুনে সেই উজ্জ্বলতায় কালো ছায়া এসে পড়ল।

দু-জনেই পণ্ডিতমশাইয়ের মুখের দিকে উৎসুক হয়ে তাকিয়ে থাকলেন।

ভবিষ্যতে ইনি খুবই উচ্ছৃঙ্খল হয়ে উঠবেন। আত্মনিয়ন্ত্রণ না করতে পারলে ঘোর বিপদ।

তিনি আবার থেমে গেলেন।

- কী হল পণ্ডিতপ্রবর, থেমে গেলেন কেন?

লক্ষণ ঠাকুর নিজের মনে মাথা নাড়তে নাড়তে বললেন, ‘না না আমার গণনা এত ভুল হতে পারে না। দেব, তোমার সন্তানের ভিতরে আমি পিতৃহন্তা হবার যোগ দেখতে পাচ্ছি।’

কক্ষের ভিতরে যেন ভীষণ গভীর এক নীরবতা নেমে এল। এক কালো অশুভ পাখি তার বিপুল কালো ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে ঘরের ভিতরে ঢুকে পড়েছে। তার ডানার আন্দোলনে সমস্ত প্রদীপের আলো নিভু নিভু যেন।

বসন্ত রায় বললেন, ‘এ কী বলছেন ঠাকুর! আপনার গণনা সঠিক তো?’

লক্ষণ ঠাকুর বললেন, ‘ভুল হবার কোনও কারণ দেখছি না। তবে ভবিষ্যৎ কী পালটায় না! সব ওলট পালট হতে পারে। সবই পারে। মা যশোরেশ্বরী চাইলে সব অসম্ভবই সম্ভব হতে পারে।’

বিক্রমাদিত্য এবার কথা বললেন, ‘আমার মনে হয় এমনই কিছু সংকটের জন্য যেন মনের ভিতরে একটা অশুভ পাখি বারে বারে ডেকে উঠছিল।’

লক্ষণ ঠাকুর তাঁর বিধান দিয়ে চলে গেলে, দুই ভ্রাতা তেমনি মুখোমুখি বসে থাকলেন।

সহসা, বিক্রমাদিত্য তাঁর স্বভাববিরুদ্ধ ভাবে ক্রুদ্ধ হয়ে উঠলেন। গর্জন করে উঠলেন।

- এই পুত্রকে আমি পরিত্যাগ করব।

একটু থেমে আবার হুংকার দিয়ে বললেন, ‘বসন্ত, যাও ওই পুত্রকে গভীর অরণ্যে নিক্ষেপ করে এসো। লক্ষ্মণ ঠাকুরের এই ভবিষ্যদ্বাণী মিথ্যা হবার নয়। তাই মা যশোরেশ্বরী আমাকে স্বপ্নে সাবধান করে দিয়েছেন।’

বসন্ত রায় যেন আঁতকে উঠলেন। অন্তঃপুর থেকে যশোমতী আর চন্দ্রলেখা বেরিয়ে এসেছে।

‘এ কী বলছেন দাদা! নিজের পুত্রকে বিসর্জন দেবেন! হত্যা করবেন?’

‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, ভাই আমাকে বাধা দিও না। বিষবৃক্ষ সমূলে উৎপাটিত করাই উচিত।’

যশোমতী কেঁদে কেঁদে স্বামীর পায়ের উপরে লুটিয়ে পড়লেন।

- ওগো, এ তুমি কী বলছ! প্রাণ থাকতে আমি এ হতে দেব না।

চন্দ্রলেখাও ক্রন্দনরত, বসে পড়েছে তাঁর পায়ের কাছে।

বিক্রমাদিত্য বার বার মাথা নাড়ছেন।

- না না, তোমরা আমাকে বাধা দিও না! তোমরা বুঝতে পারছ না। মা আমাকে স্বপ্নে ইঙ্গিত দিয়েছেন। এ মিথ্যা হবার নয়।

বসন্ত রায় এবার গম্ভীর এবং দৃঢ় স্বরে বললেন, ‘দাদা, এই আবিল চিন্তা পরিত্যাগ করো। আমি কখনও তোমার বিরুদ্ধাচরণ করিনি। কিন্তু আজ করছি। প্রতাপকে তুমি কতটা কাছে টেনেছ! তুমি তো তার থেকে দূরে দূরেই থেকেছ। আমি তাকে কোলে পিঠে করে বড়ো করেছি। আমি জানি সে কেমন! ভবিষ্যতে সে কেমন হবে। তা ছাড়া, আমরা যেমন করে শিশুকে মানুষ করব, একদিন সে তেমনই হবে।’

এক নিঃশ্বাসে কথাগুলি বলে তিনি একটু থেমে যেন শ্বাস নিয়ে নিলেন। তারপরে আবার বললেন, ‘দাদা, তুমি যদি আমাকে বিশ্বাস করো তবে প্রতাপের শিক্ষা-দীক্ষার ভার আমার উপরে দাও। আমিও ভবিষ্যদ্বাণী করছি দাদা, দেখো সে একদিন আর্যাবর্তের শ্রেষ্ঠ বীর হয়ে উঠবে।’

বিক্রমাদিত্য এক দৃষ্টিতে ছোটো ভ্রাতার দিকে তাকিয়ে থাকলেন।

বসন্ত কি কোনও দিন তাঁর বিরুদ্ধতা করেছেন! এই প্রথম সে বিরুদ্ধতা করল। সে কার কারণে?

তিনি অনিচ্ছা সত্ত্বেও সবার অনুরোধের কাছে মাথা নত করলেন। তিনি কোনও দিনই তেমন দৃঢ় স্বভাবের ছিলেন না। এবারও কঠোর হতে পারলেন না।

- তবে তাই হোক। তোমরা সবাই যখন চাইছ।

বসন্ত রায় বিপুল আনন্দে, সজল নয়নে জ্যেষ্ঠের পদধূলি গ্রহণ করলেন।

সেই সময়ে অন্তরীক্ষ থেকে তাঁর ইষ্টদেবতা কি মুচকি হেসেছিলেন!

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%