অবিন সেন
গোধূলির আলো গাছপালার মাথার থেকে ক্রমশ গুটিয়ে গিয়ে অন্তহীন দূরের দিকে অপসৃত হয়ে যাচ্ছে। সেই অপসৃয়মাণ আলোর শূন্যতার আস্তে আস্তে ঢুকে পড়ছে শান্ত অন্ধকার। ঘরে ফেরা পাখিদের কলকাকলিতে সেই শান্তি মাঝে মাঝে ঝনঝন করে ভেঙে যাচ্ছে। তারপরেই সেই পাখির স্বরের উপরে গলা তুলে গৃহস্থের বাটীতে বেজে উঠল সন্ধ্যার শঙ্খধ্বনি। যারা কিছুটা সম্পন্ন গৃহস্থ তাদের ঘরে ঘরে জ্বলে উঠছে
মৃৎ-প্রদীপের আলো।
খড়ের চাল মাটির একতলা গৃহের দাওয়ার একটা খেজুরপত্রের আসনে বসে মৃৎ-প্রদীপের আলোর সামনে একটি পুঁথি খুলে বসল শঙ্কর।
প্রতাপের সঙ্গে নিবিড় সখ্য সত্ত্বেও শঙ্করের নিজের জীবন সহজ ও আড়ম্বরহীন। দরিদ্র ব্রাহ্মণের সন্তান সে। স্থিতধী আর প্রখর বুদ্ধি ধরে সে। আসলে সময় তাকে এমন করে গড়ে পিঠে নিয়েছে। সে জানে জীবনের যে কোনও প্রতিকূল পরিস্থিতির জন্য তাকে প্রস্তুত থাকতে হবে। ছোটোবেলা থেকে বিরুদ্ধ পরিস্থিতির আগুন তাকে পুড়িয়ে পুড়িয়ে কঠিন করে তুলেছে। এখনও তার চোখের সামনে ভাসছে লেলিহান আগুন তাদের ছোট্ট কুঁড়ে ঘরের খড়ের চালটিকে গ্রাস করে নিতে চাইছে। সেই ঘরের এক কোণে দুধের শিশু ছোট্ট বোনটিকে বুকে চেপে ধরে ভয়ে কাঁপছে। তার বয়সই বা তখন কত! সাত আট বছরের বেশি তো নয়। রাতের অন্ধকার আগুনের ধোঁয়ায় যেন আরও গভীর হয়ে উঠেছে। ছোট্ট শঙ্কর ভালো করে চোখে দেখতে পাচ্ছে না। বিপুল ভয়ের চাপে তার শরীর স্থবির হয়ে গিয়েছে। মোগল দস্যুরা তাদের গৃহে লুঠ-পাট চালিয়ে গৃহে অগ্নিসংযোগ করে তার তরুণী মাকে টেনে নিয়ে গিয়েছে। তার পিতা তখন গৃহে উপস্থিত ছিলেন না। শঙ্কর কোনওক্রমে লুকিয়ে থেকে নিজেকে আর ছোট্ট বোনটিকে দস্যুদের হাত থেকে রক্ষা করতে পেরেছিল।
ধোঁয়ায় আর ভয়ে সে হয়তো তার চেতনা হারাতে বসেছিল, তখনই একটি ঝাঁকুনিতে সে আবার চেতনার উপরে ভেসে ওঠে। তার পিতা সেই লেলিহান আগুন ঠেলে তাদের দুই ভাইবোনকে বুকে তুলে নিয়েছে।
সেখান থেকে এবার তাদের দৌড়। যেন অন্তহীন দৌড়। মৃত্যুর দিক থেকে জীবনের দিকে দৌড়। কথাটা মনে পড়লেই শঙ্করের শরীর কঠিন হয়ে ওঠে। মা’র মুখটা মনে পড়ে। মা’র চোখে সেই সীমাহীন ভয় আর কাতর আকূতি। সেই মুখটি মনে পড়লে শঙ্কর বুকের ভিতরে কী এক অসহ্য যন্ত্রণা অনুভব করে। বোন সরমার মুখে যেন অবিকল মায়ের মুখের ছায়া। এই সব ভাবতে ভাবতে আত্মবিস্মৃত হয়ে সে তাকিয়েছিল সরমার মুখের দিকে। বোনটি এখন বড়ো হয়েছে। বিবাহের বয়স হয়েছে। সরমা সন্ধ্যার প্রদীপ দিয়ে একটি রেকাবিতে কিছু ভাজা চিঁড়া দিতে এসেছিল। দাদাকে নিষ্পলক তাকিয়ে থাকতে দেখে বলল, ‘কী এমন দেখছ দাদা?’
শঙ্কর যেন ভাবনা থেকে বাস্তবের মাটিতে নেমে আসে। সে কিছু বলল না। মৃদু হাসল। একটু থেমে বলল, ‘আজ যে এখনও পুঁথি নিয়ে বসলি না!’
সরমা রোজ দাদার কাছে ব্যাকরণ, গণিত, শাস্ত্র অধ্যয়ন করে। অস্ত্রশিক্ষা করে।
সরমা কিছু বলতে গেল, ঠিক তখনই অন্ধকার ফুঁড়ে প্রতাপের এক পেয়াদা এসে হাজির হল। সরমা দ্রুত অন্তঃপুরে চলে যায়।
প্রতাপ তাকে ডেকে পাঠিয়েছে। সে উঠে পড়ল। আজ তার কোথাও যাবার ইচ্ছা ছিল না। কিন্তু বন্ধুর ডাক সে ফেরাতে পারে না। বন্ধুর আড্ডায় সে সবার সঙ্গে মেতে থাকলেও সে অন্য মানুষ। সবার মধ্যে থেকেও সে যেন সবার থেকে আলাদা।
সারা রাত্রি হুল্লোড় চলল প্রতাপ আর তার বন্ধুদের। যে আহার্য সামগ্রী দিয়ে গিয়েছিল তা চারজনের জন্য যথেষ্ট ছিল না। প্রতাপের নির্দেশে বরকন্দাজরা আগে থেকে ধরে রাখা বনমুরগি মেরে তার মাংস ঝলসে নিয়ে আসে। সেই মাংস ও সুরা পানে মাঝরাত্রি পর্যন্ত অতিবাহিত হয়ে যায়। কার্লোস সংগ্রহ করে নিয়ে এসেছে পোর্তুগিজদের উত্তম সুরা।
সেই সুরা পান করতে করতে নিমীলিত চোখে প্রতাপ সেই সুরার খুব প্রশংসা করল।
কিন্তু প্রতাপের মনে হয়, সুরাতেও তার নেশা ঠিক জমছে না। বার বার তার মনের আকাশে পূর্ণ শশীর মতো ভেসে উঠছে একখানি মুখ। সে বুঝতে পেরেছে এই মুখ থেকে তার কোনও নিস্তার নেই। তার মুক্তিও নেই। একটি অত্যাশ্চর্য মুখের মাধুরীতে সে বন্দি হয়ে গিয়েছে।
কিন্তু প্রতাপ এখনও তার বন্ধুদের কাছে তার এই চিত্তচাঞ্চল্যের কথা ব্যক্ত করেনি। কিন্তু শঙ্কর তার এই চঞ্চলতা লক্ষ করেছে। মুখে এতক্ষণ সে কিছু বলেনি। যখন প্রতাপ বাইরে বেরিয়ে এসে অন্ধকারে একাকী দাঁড়িয়ে ছিল তখন শঙ্করও তার পিছনে পিছনে বেরিয়ে এল। প্রতাপকে অন্ধকার আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে সে অবাক হয়। প্রতাপ তো আকাশের দিকে তাকিয়ে তারা পর্যবেক্ষণ করার পাত্র নয়। সে জিজ্ঞাসা করল, ‘রাজা, তোমার কি কিছু হয়েছে? এত চঞ্চল দেখছি তোমাকে? পিতার তিরস্কার কি এখনও ভুলতে পারছ না?’
প্রতাপ অন্ধকারে তার দিকে তাকাল। আঁধারে যেন মৃদু হাসল সে।
‘সে কি আর ভোলা যায়! তবে তা নয়!’
‘তবে?’
প্রতাপ তবু তার মনের কথা সরাসরি বলতে পারে না। সে যেন ভণিতা করে।
‘পিতা হয়তো আমাকে দূরে কোথাও পাঠাতে চায়।’
‘দূরে? নির্বাসন?’
‘তা হয়তো নয়! আবার সেই রকমই কিছু হয়তো। কিন্তু তা হবে কোনও কাজের ছুতোয়। তবে আমি সে নিয়েও ভাবছি না।’
আবার সে ইতস্তত করে। অথচ শঙ্করের কাছে সে তো কোনও কথা লুকায় না! তবে এখন সে কেন বলতে পারছে না! সে কি লজ্জায়?
শঙ্করের সনির্বন্ধ পীড়াপীড়িতে প্রতাপ আস্তে আস্তে তার
চিত্ত-চাঞ্চল্যের কারণ ব্যাখ্যা করল। সে থামলে শঙ্কর কয়েক মুহূর্ত ভাবল। তারপরে ইতস্তত করে বলল, ‘তা, তোমার খুড়িমাকে এই কথা বললে তো পারতে। তিনি নিশ্চয়ই সাহায্য করতেন।’
- তা, পারতাম। কিন্তু পিতা যদি এই কথা না মানেন! তাঁর মনে যদি অন্য কোনও কন্যাকে পুত্রবধূ করবার বাসনা কিংবা বৈষয়িক উদ্দেশ্য থাকে তা হলে তিনি তা মানবেন না। তা ছাড়া আমি সেই কন্যাটির পরিচয় এখনও জানি না। সে কে? কী তার জাতি! কিছুই তো জানি না! যদি সে স্বজাতি না হয়! তা হলে? সমস্ত আশা তবে অঙ্কুরেই লুপ্ত হবে। প্রথমেই একবার সমস্ত জানাজানি হয়ে গিয়ে ফের তা নস্যাৎ হয়ে গেলে অন্য সমস্ত রাস্তাগুলোও দুরূহ হয়ে পড়বে। পিতা আমাকে ত্যাজ্যপুত্র করবেন হয়তো। আমি এখনই পিতার সঙ্গে বিবাদে যেতে চাই না।
এক টানে কথাগুলি বলে প্রতাপ থামল। তার মুখ দিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে।
ততক্ষণে সূর্যকান্ত ও কার্লোসও তাদের পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে। প্রতাপ নিজের মনে এতটাই নিমজ্জিত হয়েছিল যে সেই দিকে তার খেয়ালই ছিল না।
সূর্যকান্ত বলল, ‘তা, তুমি কী করতে চাও রাজা?’
‘ওই কন্যাকে আমার পেতেই হবে। নিশ্চয়ই পেতে হবে।’
প্রতাপের মুখ থেকে যেন এক দৃঢ় সংকল্প হুংকার বেরিয়ে এল। সে আবার বলল, ‘যেমন করেই হোক পেতেই হবে তাকে। না হলে কিছুতেই আমার বুকের আগুন নিভবে না।’
শঙ্কর বলল, ‘তা কিছু ভেবেছ তুমি?’
‘তাকে হরণ করব।’
প্রতাপের মুখ থেকে এক শিকারি হায়নার মতো হাসি বেরিয়ে এল। সে বড়ো লালসার হাসি।
তারপরে বন্ধুদের দিকে ফিরে বলল, ‘এবার তোরা উপায় বার কর।’
তারা আবার কক্ষে প্রবেশ করে গভীর আলোচনায় বসে। এমন একটা দুঃসাহসী কাজ, এই তাদের প্রথম। এতদিন প্রতাপ ভয়ংকর শ্বাপদ শিকার করেছে। নিরীহ হরিণী। নিরীহ পশু পাখি শিকার করে উল্লাস পেয়েছে। ভয়ংকর বাঘ-নেকড়ে শিকার করতে সে জীবনকে বাজি রাখতেও কসুর করেনি। কিন্তু এখন তারা যা করতে যাচ্ছে তা সম্পূর্ণ ভিন্ন। হয়তো তা একটা রাজনৈতিক সংকটও ডেকে নিয়ে আসতে পারে। প্রতাপ জানে না সেই কন্যার পিতা কে। কী তার পরিচয়। কয়েক মুহূর্তের দর্শনে প্রতাপ বুঝতে পেরেছে কিশোরী খুব সাধারণ ঘরের নয়। বরং তার মধ্যে একটা আভিজাত্য লক্ষ্য করেছে। সুতরাং তাদের খুব সাবধানে পা ফেলতে হবে। খুব সাবধানে আর গোপনে পরিকল্পনা করতে হবে।
সূর্যকান্ত বলল, ‘রাজা, যে স্থানের কথা তুমি বলছ ওই স্থান বোধকরি চন্দ্রদ্বীপের রাজার অধীনস্থ। তোমার পিতার সঙ্গে চন্দ্রদ্বীপের রাজার সুসম্পর্ক আছে। এমতাবস্থায় কোনও প্রকার বিরূপ কাজ কিন্তু এই সম্পর্ককে নষ্ট করে দিতে পারে।’
শঙ্করও এই কথায় সায় দেয়। বলে, ‘সূর্য কিন্তু ঠিকই বলেছে।’
প্রতাপ যেন কিছুটা ক্ষুব্ধ হয়। বিরক্ত মুখে বলে ‘আমি কি তবে ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে বের হব? এই তোরা বলতে চাস? আর পিতা যদি নিষেধ করে তবে কি আমি মাথা নীচু করে হাত গুটিয়ে বসে থাকব? তোরা কি সেটাই চাইছিস?’
একটু থেমে সে আবার গর্জে ওঠে।
‘দ্যাখ, আমার জন্ম ভিক্ষাবৃত্তির জন্য হয়নি।’
তার বন্ধুরা বুঝতে পারল, প্রতাপ নিরস্ত হবার পাত্র নয়। এখন তাদের এমন একটা পরিকল্পনা করতে হবে যাতে করে উভয় দিক রক্ষা করা যায়।
চারজনে আবার গভীর আলোচনায় মগ্ন হয়ে যায়। অনেক মতানৈক্যের পরে তারা একটা সিদ্ধান্তে উপনীত হয়।
শঙ্কর হাঁপ ছেড়ে বাইরে তাকাল। দেখল, গাছের ফাঁক দিয়ে ক্রমশ জেগে উঠছে আলো। কান পেতে শুনল পাখিরা ডাকছে দিকে দিকে। এমন নির্ঘুম রাত্রি তাদের আগেও অনেক কেটেছে। ভবিষ্যতেও হয়তো কাটবে। কিন্তু তাদের চোখে কোনও ক্লান্তি নেই। কর্মই যেন তাদের সমস্ত ক্লান্তি লাঘব করিয়ে দেয়। সেই কর্মেই তাদের বিশ্রাম।
পূর্বসিদ্ধান্ত অনুসারে সূর্যকান্ত আর কার্লোস চ্যান্ডিকানের উদ্দেশ্যে রওনা হল। সেখান থেকে তারা দ্রুতগামী ছিপ নৌকা ভাড়া করে চন্দনা নদীতে প্রবেশ করবে। অন্যদিকে ঘোড়ায় চড়ে একই স্থানের উদ্দেশ্যে রওনা হল প্রতাপ আর শঙ্কর।
মাথার উপরে সূর্য তার অগ্নি বর্ষণ করছে। বাতাসে তেমন মাধুর্য নেই। দক্ষিণের বাতাসে এখন জলীয় বাষ্প মিশে আছে। তাদের দুজনেরই মোগল দস্যুদের মতো কালো আলখাল্লার পোশাক। মাথায় কালো পাগ, তার একটা প্রান্ত দিয়ে মুখের অর্ধাংশ ঢাকা। শুধুমাত্র চোখদুটি আচ্ছাদনমুক্ত। কোমরে লম্বা তরবারি। পিঠে আড়াআড়ি ভাবে রাখা ধনুক। এক কাঁধে তূণীর। মাঠঘাট ছাপিয়ে, বনবাদাড় ছাপিয়ে তারা বিরামহীন ভাবে দৌড়ে চলেছে। তারা নিজেদের গোপন রাখার অভিপ্রায়ে পরিচিত পথ পরিত্যাগ করেছে।
নির্দিষ্ট একটি নদীর ঘাটে তারা অপেক্ষা করতে লাগল। তখন মধ্য দুপুর। শঙ্কর একটি ঝোলায় কিছু চিড়া ও শর্করাপিণ্ড নিয়ে এসেছিল। একটি নির্জন গাছের ছায়ার বসে তারা দুই জনে আহার করে। এখনও অনেকটা সময় আছে। অপরাহ্ন হতে এখনও ঢের বাকি।
শঙ্করের মনের ভিতরে একটা আশঙ্কা যেন মাঝে মাঝে কেঁপে কেঁপে উঠছে। তারা যে কাজ করতে এসেছে সে কাজ তারা সহজেই করতে পারবে। কিন্তু তার পরের সম্ভাব্য অপ্রীতিকর ঘটনা বিষয়ে তার যত চিন্তা। প্রতাপের কোনও চিন্তা নেই। সে বড়ো নির্ভীক আর উদ্ধত। প্রতাপের এই স্বভাবটিকেই বেশি ভয় করে শঙ্কর। কিন্তু শঙ্কর হঠকারী নয়। সে বুদ্ধি দিয়ে বিচার করে কাজ করে। এই বেপরোয়া কাজ করতে গিয়ে যদি কোনও বিপত্তি ঘটে তবে তা তাকেই সামলাতে হবে। প্রতাপের স্বার্থে। তাদের সবার স্বার্থে। এই সব ক্ষেত্রে নিজেদের তাকতের সঙ্গে সঙ্গে নসিবের উপরেও ভরসা রাখতে হবে। শঙ্কর তা ভালো করেই জানে।
অন্যদিকে কামাল আলি একটি ঘোড়া নিয়ে ছদ্মবেশে চন্দনা গ্রামে পৌঁছে গিয়েছে নিশ্চয়ই এতক্ষণে। সেখানে সে বেসাতি করার ছদ্মবেশে গিয়েছে। তার টাট্টু ঘোড়ার পিঠে একটি ঝোলায় ঝোলানো বেশ কিছু পারস্য মসলিনের সূক্ষ্ম বস্ত্র। মহিলাদের প্রসাধনের চুয়া আর আতর। কিছু কাশ্মীরি কাঠের অলংকার রাখার কৌটো। এসব সে যেন ঘুরে ঘুরে ফেরি করবে। বিকালের হাটে গিয়ে হয়তো সে বসে গিয়েছে তার পসরা সাজিয়ে। এই বেশে যেন তাকে মানিয়েছে ভালো।
দেখতে দেখতে সূর্য ঢলে পড়ল পশ্চিম পারে। বাতাসের উষ্ণতা যেন কিছু লাঘব হয়েছে। কিন্তু সূর্যকান্ত আর কার্লোসের কোনও দেখা নেই।
প্রতাপ একটু চিন্তিত হয়ে পড়ে যেন।
এত দেরি হয় কেন?
শঙ্কর বলল, ‘দেরি তো একটু হবে রাজা, তাদের তো স্রোতের বিপরীত দিকে আসতে হবে।’
প্রতাপ আরও কিছুক্ষণ ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করে। সূর্য আরও ঢলে পড়েছে পশ্চিমে।
প্রতাপ এবার বিরক্ত হতে শুরু করেছে। পায়চারি করতে করতে তার মাথার ভিতরে এবার একটা ক্রোধের দমক যেন নড়ে চড়ে উঠছে।
- নাহ! এরা কি আমাকে আজ ডোবাবে! রাত্রি নেমে যাবার পরে তারা কি উপস্থিত হবে?
তখনই শঙ্কর দূরের দিকে তার অঙ্গুলি নির্দেশ করে বলল,
‘ওই! ওই দেখো। একটা কালো বিন্দু। মনে হয় ওরা আসছে।’
সেই কালো বিন্দু খুব দ্রুত প্রকাশিত হচ্ছে। দেখতে দেখতে একটি ডিঙির প্রতিচ্ছবি তাদের দৃষ্টিগোচর হয়।
সেই ডিঙি আরও সামনে আসতে প্রতাপের মুখ থেকে ভ্রূকুটির মেঘ কেটে গিয়ে হাসি ফুটে ওঠে। তারা নিকটে এসে ঘাটে নৌকা ভিড়িয়ে দিতে এক লাফে প্রতাপ ও শঙ্কর সেই নৌকায় উঠে পড়ে। ডিঙিটির মুখ অদ্ভুত সূচালো আকারের। চারজন মিলে তাতে দাঁড় বাইতে পারে। ডিঙিটি একেবারে ছোটো নয়। ডিঙির মাঝে বেত আর বাঁশের বাখারি দিয়ে তৈরি একটি ছই, সেটি কালো কাপড়ে আচ্ছাদিত। সেই ছইয়ের ছায়ায় দুই জন অনায়াসে বৃষ্টির থেকে মাথা বাঁচাতে পারে। সেই সঙ্গে নিজেদেরও লুক্কায়িত রাখা যায়। নৌকাটি আকারে সাবেক ডিঙির থেকে বড়ো। অনেকটা পানসি’র মতো। আবার সেটি ‘ছিপ’ নৌকার থেকেও অধিক দ্রুতগামী। চারজন মিলে দাঁড় বাইলে তা হাওয়ার বেগে জল কেটে দৌড়াতে পারে।
চারজনে দ্রুত বেগে দাঁড় বাইতে লাগল। প্রতাপের বুকের ভিতরে একটা আশঙ্কা। দেরি হয়ে গেল কি? আবার একবার মনে হয় আজ যদি সে না আসে?
কিন্তু প্রতাপের মন বলছে আজ সে এসেছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা দেখতে পেল দূরে সেই স্নানের ঘাটে মহিলারা কেলি করছে।
তখন বেলা পড়ে এসেছে একেবারে। জলের উপরে অস্তগামী সূর্যের আভায় যেন আবির গুলে দিয়েছে।
তারা লক্ষ করল মহিলারা এবার কলসে জল ভরতে শুরু করেছে। ‘এই তো উপযুক্ত সময়।’ প্রতাপ মনে মনে মনে বলল। সে চোখের ইশারা করে। সঙ্গে ‘হেঁইও’ বলে চারজনে প্রবল বিক্রমে চারখানি দাঁড়ে টান দিয়েছে। নিমেষে জলের পানসি যেন হাওয়ার পানসিতে পরিণত হয়ে গেল।
মহিলারা কিছু ভালো করে বুঝে ওঠার আগেই সেই হাওয়ার পানসি তাদের সামনে পৌঁছে গিয়েছে। তখনই জলের উপরে ঝপ্ করে একটি শব্দ। কয়েক পল সময় যেন অতিক্রান্ত হয়েছে। জলে ঝাঁপিয়ে পড়ে প্রতাপ বলিষ্ঠ হাতে তার কাঙ্ক্ষিত প্রেয়সীকে সঙ্গে করে আবার নৌকার কাছে চলে এসেছে। চক্ষের পলকে বন্ধুদের সাহায্যে সেই ভয়বিহ্বল নারীকে নৌকায় তুলে নিয়েছে। কিশোরীর কোমল হাত পায়ের সংগ্রাম নগণ্য মাত্র প্রতাপের প্রবল শক্তির কাছে। প্রতাপ সঙ্গে করে একটি উত্তম শক্তিশালী বেহুঁশকারী কোহল নিয়ে এসেছিল। সেটি সে মুহূর্তের মধ্যে তার প্রেয়সীর নাকের কাছে চেপে ধরে তাকে অচেতন করে ফেলেছে। তারপরে সেই অচেতন কোমল নারী শরীরকে সে ছইয়ের ভিতরে শুইয়ে দেয়। হাত ও পা শক্ত করে করে বেঁধে দেয় কাপড়ের রশি দিয়ে। আধো অন্ধকারে সেই অচেতন মুখের থেকে সে যেন চোখ সরাতে পারছে না। কিন্তু এখন দুর্বল হবার সময় নয়।
এদিকে তিন বন্ধু প্রবল বেগে দাঁড় বাইতে শুরু করে দিয়েছে। পক্ষীরাজ ঘোড়ার মতো সে পানসি সমবেত মহিলাদের চিৎকারকে পিছনে ফেলে দিয়ে অনেক দূরে চলে গিয়েছে।
কিছুটা দূরে গিয়ে তারা কার্লোসকে একটি অন্ধকার ঘাটে নামিয়ে দেয়। কারণ প্রতাপ আর শঙ্করের ঘোড়াগুলি আছে ঘাটে বাঁধা। কার্লোস ঘোড়া দুটি নিয়ে ফিরে যাবে। না হলে তার ঘোড়া আবিষ্কৃত হলে তাদের পরিকল্পনা ব্যাহত হতে পারে।
তারা ঘুরপথে যশোরে ফিরে গেল না। অন্ধকারেও সমস্ত নদীপথ প্রতাপের মগজে গাঁথা হয়ে আছে। চোখ বুজেও সে নৌকা বেয়ে নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে যেতে পারে। যশোরের বদলে প্রতাপ সোজা মোহানার কাছাকাছি ধূমঘাটে চলে গেল। এখানে তার পিতার এক প্রমোদভবন আছে। বস্তুত সেই প্রমোদভবন এখন প্রতাপের অধিকারে চলে গিয়েছে।
কোহলের যা তীব্রতা তাতে করে কিশোরীর আজ সারা রাত্রি আর ঘুম ভাঙবে না।
ধূমঘাটের প্রমোদকাননে যখন তারা উপস্থিত হল তখন মধ্যরাত্রি।
প্রতাপ তার প্রেয়সীকে কাঁধে করে নিয়ে গিয়ে একটি উত্তম শয্যায় শয়ন করিয়ে দিয়েছে। হালকা পালকের মতো যেন তার শরীর। ঘরের প্রদীপের আলোকে প্রতাপ সেই মুখের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। কী মায়া সেই মুখে! প্রতাপের সমস্ত অন্তরের সমস্ত কামনা বাসনা যেন সেই মায়া ভরা মুখের মাধুর্যে দ্রবীভূত হয়ে যায়। সে যেন বুকের ভিতরে এক মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি শুনতে পাচ্ছে। বহু দূর থেকে আগত যশোরেশ্বরীর মন্দিরের ঘণ্টা সে শুনতে পাচ্ছে বুকের ভিতরে। সামনে শায়িত নারীমূর্তিকে সে স্পর্শ করতেও যেন সাহস পাচ্ছে না। কী পবিত্র সেই সৌন্দর্য!
ওদিকে সূর্যকান্ত প্রতাপকে না বলেই বেরিয়ে পড়ল। একটা ঘোড়া নিয়ে যশোরের উদ্দেশ্যে পাড়ি দিল। প্রতাপের নিষেধ শুনলে তার চলবে না। বিলম্বে হয়তো পরিস্থিতি হাতের বাইরে বেরিয়ে যেতে পারে। সে গিয়ে সরাসরি খুড়িমা চন্দ্রলেখার সঙ্গে দেখা করবে।
শঙ্কর অপেক্ষা করছে কামাল আলির জন্য। এতক্ষণে সে নিশ্চয়ই সংবাদ সংগ্রহ করে ফেলেছে, কার কন্যাকে তারা অপহরণ করেছে। সেই মতো তাদের পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
অন্যদিকে প্রতাপও বসে আছে শয্যার পায়ের কাছে। সে অপেক্ষা করছে ভোরের আলোর। সেই সঙ্গে মনে মনে প্রার্থনা করছে ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই যেন তার দয়িতার চেতনা ফিরে আসে। ভোরের প্রথম আলোতেই তারা যেন পরস্পর পরস্পরকে দেখতে পায়। অন্তর্যামী হয়তো তার প্রার্থনা শুনতে পেয়েছিলেন। ভোরের প্রথম আলোকে প্রতাপ দেখল দুটি আশ্চর্য চোখ যেন নীলপদ্মের মতো পাপড়ি মেলছে। সে কখনও ফুল ফোটা দেখেনি। তার মনে হল যেন আজ একটি ফুলকে পাপড়ি মেলতে দেখল।
কিশোরীও চোখ মেলেই দেখল দুটি উৎসুক চোখ অপলক তার দিকে তাকিয়ে আছে। কী গভীর সেই চোখের দৃষ্টি। নারীর মতো এমন করে কে আর পুরুষের চোখের ভাষা পড়তে পারে! তার বয়স অল্প হতে পারে, কিন্তু সহজাত ক্ষমতায় সে প্রতাপের চোখের ভাষা পড়তে পারে। সকালের আলোর মতোই সেই চোখের দৃষ্টি। সেখানে কোথাও কোনও মালিন্য নেই।
তার পরেই সে দুটি চোখ মুদিত হয়ে যায়।
সেই মুখের উপরে এবার মুক্ত গবাক্ষ পথে তরুণ রোদের রেণু যেন আশীর্বাদের মতো ঝরে পড়ছে।
প্রতাপ তার গম্ভীর গলায় তাকে দেখার পর থেকে তার মনের অবস্থা ব্যাখ্যা করে যায়। যেন সে পাগল হয়ে গেছে। অন্য কেউ শুনলে তা প্রলাপ বলেই ভুল করবে। কিন্তু এত কথার একটাই সার অর্থ ছিল, তা শুধু ভালোবাসা।
কিন্তু শরৎকুমারী চোখ মুদিত করেই সেই কথাগুলি শুনে গেল। যতক্ষণ প্রতাপ কথা বলল ততক্ষণ সে আর চোখ খুলল না।
প্রতাপ কথা শেষ করে যখন অপেক্ষা করছিল তখন আবার শরৎকুমারী চোখ খুলল। আবার তাদের চোখে চোখে মিলন ঘটল।
তখনই বাইরে থেকে শঙ্কর একবার গলা খাঁকারি দিল। প্রতাপের উঠতে ইচ্ছা করছিল না। কিন্তু, সে জানে জরুরি না হলে শঙ্কর তাকে ডাকবে না!
সে বাইরে বেরিয়ে একটু অবাক হল। কামাল এসে গিয়েছে। সে কিশোরীর সমস্ত সংবাদ জোগাড় করে নিয়ে এসেছে।
এ যে চন্দ্রদ্বীপের সম্ভ্রান্ত বণিক জিতামিত্র নাগ মহাশয়ের কনিষ্ঠ কন্যা শরৎকুমারী। চন্দনা গ্রামে জ্যেষ্ঠ ভগিনীর গৃহে শরৎকুমারী বেড়াতে এসেছিল। চন্দ্রদ্বীপে তো হইচই পড়ে গিয়েছে।
প্রতাপ এবার তার পরম ভরসার স্থল শঙ্করের দিকে তাকাল। যেন তার ভঙ্গি বলতে চাইছে, ‘এবার কী?’
শঙ্কর বন্ধুর মনের ভাব বুঝতে পেরে বলল, ‘এখন আমরা কিছু করব না। চুপ করে বসে থাকব।’
সূর্যকান্ত যে যশোরে চলে গেছে সেই কথা সে গোপন করে রাখল। প্রতাপও তা খেয়াল করল না। একটু থেমে শঙ্কর আবার বলল, ‘এখন দেবী যদি তোমাকে স্বেচ্ছায় গ্রহণ করে তাহলেই আমাদের সমস্ত সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। তুমি বরং সেই দিকটা দেখো। আর বাকি সব আমি দেখছি। তোমাকে ভাবতে হবে না।’
এমন একটা দীর্ঘ দিন প্রতাপ আগে কখনও কাটায়নি। সময় যেন কাটতেই চায় না।
সে বার বার শরৎকুমারীর কাছে গিয়ে প্রলাপের মতো আকাশ পাতাল বকে গিয়েছে। শরৎকুমারী কিন্তু কোনও কথা বলেনি। আবার তার অসন্তোষও ব্যক্ত করেনি। শুধু মাঝে মাঝে সে এক দৃষ্টিতে প্রতাপের দিকে তাকিয়ে থাকে। আবার ঘাড় ঘুরিয়ে গবাক্ষের সামনে দাঁড়িয়ে অকারণে তার দীর্ঘ সর্পিল বেণী অলস হাতে মোচন করে, তারপরে আবার এক মনে তা রচনা করে। এমনি করে সারা দিন কেটে গেল। কাজের পরিচারিকারা খাদ্য রেখে যায়। সে খাদ্য পড়েই থাকে।
কী করে যে রাত্রি অতিবাহিত হল তা কেবল প্রতাপই জানে। দুই রাত্রি নির্ঘুম অতিবাহিত করার পরে সে ঘুমিয়ে পড়েছিল। কিন্তু স্বপ্নের ভিতরে শুধু সেই একটিই মুখ।
কিন্তু ভোরের দিকে এক কোলাহলে তার ঘুম ভেঙে গেল।
ত্বরিতগতিতে সে শয্যায় উঠে পড়ে। বিপুল আশঙ্কা তার ঘুম জড়ানো চোখে। কী ঘটল! সে শরৎকুমারীর ঘরের উদ্দেশ্যে দৌড়াল। এ কী ঘরের দ্বার খোলা!
কিন্তু ঘরের ভিতরে পৌঁছে তার বিস্ময়ের সীমা থাকল না।
শরৎকুমারী ঘুম ভেঙে উঠে শয্যায় বসে আছে। আর তার সামনে বসে কথা বলছে খুড়িমা। প্রতাপের বুক থেকে যেন একটা পাথর নেমে গেল। সে দৌড়ে গিয়ে ভূমিতে বসে পড়ে খুড়িমার পায়ের কাছে মাথা রাখল।
বুকের গভীর থেকে নিশ্চিন্ত একটা কণ্ঠস্বরে সে বলল, ‘খুড়িমা, তুমিই আমার ভরসা!’
চন্দ্রলেখা নির্মল হাসিতে ভরে গিয়ে একবার প্রতাপের মাথার ঝাঁকড়া চুলগুলি নেড়ে দিল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন