অবিন সেন
কার্ভালোর হত্যার সংবাদ চারদিকে প্রচার হতে সময় লাগল না। পার্শ্ববর্তী রাজাদের মনে প্রতাপের বিরুদ্ধে এক বিশ্বাসঘাতকতার ধারণা তৈরি হয়ে উঠতে লাগল। এমনকি যে পোর্তুগিজ বণিকদের সঙ্গে এবং পোর্তুগিজ পাদরিদের সঙ্গে তার একটা সুসম্পর্ক বজায় ছিল সেটাও অনেকাংশে ব্যাহত হল। তারা ভাবল ‘বড়োর পিরিতি বালির বাঁধ’। সুতরাং প্রতাপের থেকে দূরে থাকাই ভালো। যে আরাকানরাজাকে তুষ্ট করার জন্য তার এই বিশ্বাসঘাতকতা সেই আরাকানরাজার কাছ থেকেও প্রতাপ মোগলদের বিরুদ্ধে সাহায্যপ্রাপ্তির কোনোরূপ আশ্বাস পেল না। অনেক গুণের অধিকারী হয়েও কিছু কিছু হঠকারী সিদ্ধান্তের কারণে রাজ্যের অনেক প্রভাবশালী মানুষের কাছে এমনকি নিজের অনেক প্রিয়জনের কাছে প্রতাপ একটা ভীতিপ্রদ মানুষে পরিণত হল।
প্রতাপ মাঝে মাঝে ভাবে, শঙ্করের কথাই তা হলে কি ঠিক ছিল! কিন্তু এই ভাবনা কেবল ক্ষণিকের জন্য। বস্তুত অধিকাংশ সময়ে সে নিজের সিদ্ধান্তেই অবিচল থাকে। তবে এই পরিস্থিতিতে ক্ষুব্ধ হলেও কিছু দিন মোগলদের বিরুদ্ধে সে চুপ করে থাকে। কোনোরূপ আস্ফালনও করল না। এমনকি রাজস্বও পাঠাতে লাগল, তবে তা নামমাত্র।
কিন্তু ভিতরে ভিতরে সে খাঁচায় আবদ্ধ বাঘের মতো ফুঁসতে লাগল। এই সব নানা কারণে তার ভিতরে আবার তন্ত্রসাধনা আর সুরাপানের নেশা অধিক পরিমাণে মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে লাগল। দিনের অধিক সময় সে সুরায় ডুবে থাকে। অন্তঃপুরে শরৎকুমারীর সঙ্গেও তার সাক্ষাৎ কমে গিয়েছে আজকাল।
একদিন শরৎকুমারী তাকে বলল, ‘ও গো, কন্যা তো বড়ো হয়ে উঠল, সে দিকে কোনও খেয়াল আছে তোমার?’
প্রতাপ আড় হয়ে তাকিয়ায় হেলান দিয়ে গড়গড়ায় টান দিচ্ছিল। সামনে পানপাত্র। রক্ত বর্ণ চোখ কড়িকাঠের দিকে তুলে সে মুখের মধ্যে ‘ঘঁৎ’ করে একটা শব্দ করল। শরৎকুমারীর কথা তার কানে প্রবেশ করেছে কি না বোঝা যায় না।
শরৎকুমারী আবার বলল, ‘কি গো, মেয়ের জন্য উপযুক্ত পাত্রের সন্ধান করতে হবে না!’
প্রতাপ যেন সহসা তার স্বপ্নের ভুবন থেকে ধরাধামে নেমে আসে। স্ত্রীর দিকে ঘোলাটে চোখ তুলে বলল, ‘ও তাই তো! ভালো মনে করিয়ে দিয়েছ। তা আমি দেখছি শঙ্করের সঙ্গে আলোচনা করে। উপযুক্ত পাত্রের অনুসন্ধান করতে হবে।’
মহারাজা প্রতাপাদিত্য এখন একা একাই অনেকটা সময় অতিবাহিত করে। বেশ কিছু দিন হল শঙ্কর ছদ্মবেশে পার্শ্ববর্তী রাজ্য পরিভ্রমণে গিয়েছে। উদ্দেশ্য কোন রাজ্যের কী মনোভাব সে নিজে এবার সরেজমিনে উপলব্ধি করে আসবে। এই বিষয়ে সে গুপ্তচরদের উপরে আর ভরসা রাখতে পারেনি। এদিকে তামিমকে সে রূপরাম বসু আর কাঁচু রায়ের অনুসন্ধানে লাগিয়েছে। তামিমের চর রাজ্যে রাজ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। পাতালে থাকলেও তামিমের লোক ঠিক ওদের খুঁজে বার করবে।
সূর্যকান্ত দিনে একবার মহারাজের সঙ্গে এসে দেখা করে যায়। নিকটবন্ধুরাও আসে মাঝেমধ্যে। কিন্তু সে শঙ্করের অনুপস্থিতির কারণে একটা শূন্যতা যেন অনুভব করে।
আরও প্রায় বৎসরের অধিক পরে শঙ্কর ফিরলে প্রতাপ যেন স্বস্তি পায়।
আনন্দে চঞ্চল হয়ে ওঠে ফরিদাও। অবশ্য প্রথমে কয়েক দিন মান অভিমান চলে। শঙ্করের ইচ্ছা করছিল, ফরিদাকে বুকে জড়িয়ে ধরে তাকে পিষে ফেলে। তাতেই কি সে শান্তি পাবে? এই দোটানায় সে কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে থেকেছে। শুধু তার চোখের তৃষ্ণা যেন আরও বেশি প্রকাশিত হয়ে গেছে ফরিদার চোখে।
একদিন বিরলে প্রতাপ আর শঙ্করের নানা বিষয়ে কথা হয়। শঙ্কর জানায়, মোগলদের বিরুদ্ধে বাংলার সমস্ত ভূস্বামীদের একত্রিত করার খোয়াব বুঝি খোয়াবই থেকে যাবে। সবাই সবার ক্ষুদ্র স্বার্থ নিয়ে ব্যতিব্যস্ত। শঙ্কর আর বলল না যে, প্রতাপের নানা হঠকারী সিদ্ধান্তের কারণে অনেকেই বিরূপ হয়েছেন। অবশ্য শঙ্কর ভাবে, তারা যদি সকলের সঙ্গে বন্ধুবৎসল হয়ে থাকত তা হলেও কি এই সব স্বার্থান্বেষী রাজারা নিজেদের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে মোগলদের সঙ্গে বিদ্রোহের আগুন জ্বালাতে রাজি থাকত? তার ঘোর সন্দেহ আছে! বঙ্গবাসীর এই স্বার্থপরতার কারণেই সামান্য কয়েকজন মোগল এখানে এসে তাদের উপরে ছড়ি ঘোরাচ্ছে।
শঙ্করকে অন্যমনস্ক হয়ে চুপ করে বসে থাকতে দেখে, প্রতাপ
বলল, ‘কী হল শঙ্কর, কী ভাবছিস?’
‘ভাবছি আমাদের হয়তো একাই মোগলদের সঙ্গে বিদ্রোহ করে যেতে হবে!’
প্রতাপ বুঝতে পেরেছে।
শঙ্কর আবার বলল, ‘এখন তো আগ্রার মসনদে শাহজাদা সেলিম বসেছেন। নিজেকে নুরুদ্দিন মহম্মদ জাহাঙ্গির বাদশাহ গাজি উপাধিতে ভূষিত করে নিয়ে রাজ্যশাসন করছেন। তোমার সঙ্গে ভালো সম্পর্কের খাতিরে তিনি হয়তো কিছুদিন চুপ করে থাকবেন। কিন্তু সেও তো এক ধরনের পরাধীনতা। আর তুমি তো জানোই তিনি ভীষণ ইন্দ্রিয়াসক্ত আর সুরাপায়ী। শুনেছি এক রাজকর্মচারীকে হত্যা করে তার বিধবা পত্নীকে তিনি বিবাহ করেছেন। তিনিই এখন সেলিমের সর্বময় কর্ত্রী। ফলে আমাদের উপরে আবার পরাধীনতার খড়্গ যে কোনও সময়েই নেমে আসবে।’ প্রতাপ শান্ত হয়ে বলল, ‘তুই ঠিক বলেছিস শঙ্কর। আমিও বুঝতে পারছি মোগলসম্রাট চুপ করে বেশিদিন বসে থাকবেন না। কারণ এখন ওড়িশায় পাঠান সর্দারদের বিদ্রোহ আবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে। বিহারের শাসক অস্বীকার করছে সম্রাটের বশ্যতা। বঙ্গের সুবেদার আজিম খাঁ-র অপশাসনে মানুষ ক্ষুব্ধ। বলা যায়, সমগ্র পূর্ব ভারতে এক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে। এই অবস্থাকে নিশ্চয়ই ধূর্ত মোগলরা বাড়তে দেবে না।’
‘তুমি যথার্থই বলেছ রাজা। আমাদের সব সময়ে প্রস্তুত থাকতে হবে। কোনও অবস্থাতেই সৈনিকদের মধ্যে শিথিলতা বাড়তে দিলে চলবে না।’
ভালো কথা, শঙ্কর, তোর সঙ্গে একটা বিষয়ে আলোচনা করব বলে অপেক্ষা করছিলাম।
‘কী রাজা?’
‘দেখছিস তো, বিমলা মা আমার বিবাহযোগ্যা হয়ে উঠেছে। এবার তো তাকে একটি উপযুক্ত পাত্রের হাতে অর্পণ করতে হবে। আমি তবে নিশ্চিন্ত হই। কবে হঠাৎ মোগল আক্রমণ নেমে আসবে, কে বলতে পারে। তুই ভাই একটা উপযুক্ত পাত্রের সন্ধান কর।’
শঙ্কর কয়েক মুহূর্ত চুপ করে ভাবল। তারপরে তার মুখের হাসি চওড়া হল।
তার হাসি লক্ষ করে প্রতাপ বলল, ‘হাসছিস যে!’
- এই বারে চন্দ্রদ্বীপের রাজা কন্দর্পনারায়ণ রায়ের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়েছিল। এখনও তাঁরা আমাদের বন্ধু।
একটু থেমে হাসতে হাসতে বলল, ‘তোমার বিবাহের সময়ের কথা তো মনে আছে! ওরা আমাদের কত সাহায্য করেছিল। দেখলাম চন্দ্রদ্বীপের রাজপুত্র রামচন্দ্র রায় বিবাহের উপযুক্ত হয়েছে। আমরা তাকেই আমাদের কন্যার পাত্র নির্বাচিত করি? তুমি কী বলো? আমার বিশ্বাস ওদেরও এই বিষয়ে কোনও আপত্তি হবে না!’
শঙ্করের প্রস্তাবে প্রতাপেরও নিজের বিবাহের কথা মনে পড়ল। তার মুখেও খেলে যায় চওড়া এক হাসি। সত্যি তো হাতের সামনে এমন সুন্দর পাত্র থাকতে কি না সে পাত্র খুঁজে বেড়াচ্ছে!
‘তা হলে তো হাতে স্বর্গ পাই রে ভাই। কিন্তু ওরা কি রাজি হবে!’
‘কেন হবে না! আমি নিজে যাব বিবাহের প্রস্তাব নিয়ে। আর রাজি করিয়েই আসব।’
শঙ্কর হাসতে হাসতে বলল। নিজের উপরে এইটুকু বিশ্বাস তার আছে। প্রতাপেরও তার উপরে অগাধ বিশ্বাস। সে জানে বাকপটু শঙ্কর ঠিক বাকলার রাজা কন্দর্পনারায়ণকে এই বিষয়ে রাজি করিয়ে আসবে।
এই পাত্র নির্বাচনে শরৎকুমারীও খুব খুশি হয়েছে। মেয়ে যে তার বাপের বাড়ির দেশের রানি হতে যাচ্ছে, এতে সে আরও বেশি খুশি হয়েছে।
ধুমধাম করে বিবাহের আয়োজন শুরু হয়ে গেল। অনেকদিন পরে যশোর রাজ্য আবার উৎসবে মেতে উঠল। সারা রাজ্য নতুন করে সাজানো হল। কন্যার বিবাহের খুশিতে মহারাজা প্রতাপাদিত্য প্রচুর দানধ্যান করল। কিন্তু বিবাহের আসরেও গোল বাঁধল প্রতাপের চণ্ডাল ক্রোধের কারণে।
বিবাহ সমাধান হয়েছে। সকলেই খোশমেজাজে গল্পগুজব করছে। বাসরঘরে নতুন জামাতা ও কন্যার সঙ্গে স্ত্রীলোকেরা নানারূপ হাসি-ঠাট্টায় মেতে আছে। এমন সময়ে বরযাত্রীদের সঙ্গে আগত রামাই ঢঙ্গী স্ত্রীবেশে অন্তঃপুরে ঢুকে বাচালতা করে ফেলেছে। রানিমা শরৎকুমারী প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হল তার এই আচরণে।
মহারাজা প্রতাপাদিত্য বান্ধব-পরিজনদের সঙ্গে বসে গল্পগুজব করছিল। সন্ধ্যা থেকেই তার সুরাপানের বিরাম নেই। হয়তো কন্যাবিদায়ের দুঃখ ভুলতে চাইছে সে।
এমন সময়ে অন্তঃপুরের এক দাসী মারফত রামাই ঢঙ্গীর অভব্যতার কথা প্রতাপের কানে গেল। নেশাগ্রস্ত প্রতাপের মাথায় রক্ত সওয়ারি হয় আবার। সে দিগ্বিদিক জ্ঞান হারিয়ে হুংকার দিয়ে উঠল, ‘কি এত বড়ো সাহস! ওরে কে আছিস, এখনই আমার খড়্গ নিয়ে আয়। আমি এখনই রামচন্দ্র আর তার ঢঙ্গীর মাথা কাটব।’
উপস্থিত শঙ্কর আর সূর্যকান্ত তাকে সামলাবার চেষ্টা করতে লাগল।
‘কী বলছ রাজা? তুমি জামাতাকে বধ করবে! তোমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে?’
কিন্তু ক্রুদ্ধ প্রতাপ কবে কার কথা শুনেছে?
প্রতাপ অন্তঃপুরের দিকে ছুটে যেতে চাইল। কিন্তু তাকে জড়িয়ে ধরে নিবৃত্ত করবার চেষ্টা করছে শঙ্কর আর সূর্যকান্ত।
ওই দিকে অন্তঃপুরে এই সংবাদ পৌঁছে গিয়েছে। চারদিকে শোরগোল পড়ে গেল। সবাই ভয়ে কাঁপছে। কী অনিষ্ট অপেক্ষা করছে সামনে কে জানে! শরৎকুমারী খুব ভয় পেয়ে গেল। বিষয়টা তো সে আগেই থামিয়ে দিতে পারত। সে নিজে আর একটু সাবধান হয়ে ওই ঢঙ্গীকে শাসন করলে বোধ হয় উচিত কাজ হত। যাই হোক যা হবার তা হয়ে গেছে, এখন তাকেই একটা কিছু করতে হবে, না হলে যে অনর্থ হয়ে যাবে। শরৎকুমারীও কঠিন স্বভাবের মহিলা। কালবিলম্ব না করে সে তার কর্তব্য স্থির করে ফেলেছে। পুত্র উদয়াদিত্যকে দিয়ে কন্যা ও জামাতাকে একটি দ্রুতগামী নৌকায় করে অন্ধকারেই রওনা করিয়ে দিল নিরাপদ গন্তব্যের দিকে। অন্ধকারে যখন সেই নৌকা মিলিয়ে গেল দূরে তখন নদীর তীরে দাঁড়িয়ে শরৎকুমারীর চোখ দিয়ে অশ্রুর প্লাবন নামল। এক মাত্র কন্যাকে বিবাহের পরে শেষে এই ভাবে বিদায় জানাতে হল! কিন্তু একটা আশঙ্কা তার বুকের মধ্যে কাঁটা বিধিয়ে দিয়ে ক্রমাগত রক্তক্ষরণ ঘটাচ্ছে। পিতার এই আচরণের প্রতিশোধ কন্যার উপরে নেমে আসবে না তো! শরৎকুমারী আকুল হয়ে মা যশোরেশ্বরীকে ডাকতে লাগল।
সবদিক রক্ষা করো মা। রক্ষা করো।
আগে কোনও দিন যা হয়নি, এই প্রথম স্বামীর প্রতি তার মন বিষিয়ে উঠল।
প্রতাপের এই অবিমৃশ্যকারিতায়, যে চন্দ্রদ্বীপের সঙ্গে তাদের সুসম্পর্ক ছিল তাও ছিন্ন হয়ে গেল চিরদিনের মতো।
তার এই আচরণের ফলে দিকে দিকে তার প্রতি ছিছিক্কার পড়ে গেল। যে নিজের জামাতাকে হত্যা করতে চায়, সে অন্য মানুষদের সঙ্গে কেমন আচরণ করবে!
এক সময়ে যারা তার অনুগত ছিল তারাও অনেকে তার বিরুদ্ধাচরণ করতে লাগল।
দিনে দিনে প্রতাপ নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ল। প্রতিবেশী কোনও রাজ্যই আর যশোররাজকে বিশ্বাস করতে পারে না। শঙ্কর আর সূর্যকান্ত বার বার মহারাজের বার্তা নিয়ে পার্শ্ববর্তী রাজাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করেছে। কিন্তু সকলেই মুখে মিষ্টতা দেখিয়েই ক্ষান্ত হয়েছে। এদিকে তামিমের লোকও দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু বৎসর ঘুরে গেলেও তাদের কাছ থেকে কার্যকরী সংবাদ না পেয়ে শঙ্কর একটু চিন্তিত হয়েছে। সে বুঝতে পারছে, সব ভালো মতো চলছে না। অথচ শঙ্কর আর সূর্যকান্ত মিলে চেষ্টার ত্রুটি রাখছে না। কিন্তু মহারাজা প্রতাপাদিত্য যেন দিনে দিনে ক্রমশ বদলে যেতে শুরু করেছে। তার চরিত্রের পরস্পরবিরোধী গুণগুলির অহিতকর দিক প্রকট হয়ে উঠতে শুরু করেছে। এই সবের কারণে প্রজাবৎসল সিংহ-হৃদয় প্রতাপ যেন তার উগ্র চণ্ডাল উচ্ছৃঙ্খল ব্যবহারের আড়ালে চাপা পড়ে যাচ্ছে। সুরাপানের পরে সে যেন আর মানুষ থাকে না। এই ভয়ংকর প্রতাপকে যেন এখন শরৎকুমারীও ভয় পায়। দুঃখও তার এমন অন্তহীন হয়ে গিয়েছে যে, সে আর তার আঁচ পায় না মনে। এই বুঝি স্বাভাবিক! তার জীবনের সঙ্গে স্বামীর এই অবহেলা যেন বৈষ্ণবদের রসকলির মতো সারা শরীরে জড়িয়ে গিয়েছে। সে আর অপসারণের নয়! তা ছাড়া এই দুঃখের কথা সে কাকেই বা বলবে! বাড়িতে দাসী আছে অনেক। নিত্যসঙ্গী সখী মাধবী আছে! কিন্তু তারা কি কেউ আপনার? শ্বশুরবাড়িতে কন্যা কেমন আছে? শত চিন্তার মাঝে এই চিন্তা যেন তাকে বড়ো বেশি বেদনা দেয়! যদি সে একবার কন্যার সংবাদ পেত? শরৎকুমারীর মুখ দিয়ে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে।
তবে এবার একজন কথা বলার মানুষ পেয়েছে শরৎকুমারী। ননদ মণিমালা বিধবা হয়ে আবার পিতৃগৃহে ফিরে এসেছে। সে তার সপত্নী দয়াময়ী দাসীকেও সঙ্গে নিয়ে এসেছে। মেয়েটি তারই সমবয়সি। সপত্নী হলেও তারা দুই ভগিনীর মতোই শ্বশুরবাড়িতে ছিল। কিন্তু যখন কপাল পুড়ল তখন দেখল, সে তো তার দাদা প্রতাপের গৃহে ফিরে যাচ্ছে, কিন্তু দয়াময়ী কোথায় যাবে! তার বাপের বাড়ির কেউই আর জীবিত নেই। তার এই অতুল রূপের ঐশ্বর্য নিয়ে সে কোথায় যাবে? দুই লম্পট দেওরের লালসার সামনে সে কি থাকতে পারবে! মণিমালার প্রস্তাবে দয়াময়ী তাই প্রিয় সখীর সঙ্গে যাওয়াই স্থির করেছিল।
প্রতাপ অন্তঃপুরের এই সব ঘটনার কোনও সংবাদ রাখে না। হয়তো শরৎকুমারী তাকে কোনও দিন এই সংবাদ জানিয়েছিল। কিন্তু নেশার ঘোরে প্রতাপ সব ভুলে গিয়েছে।
একদিন সন্ধ্যার পরে শরৎকুমারীর কেশ প্রসাধন করে দিচ্ছিল দয়াময়ী। শরৎ তাকে বড়ো আপন করে নিয়েছে কয়েকদিনেই। নিজের ভগিনীর মতো স্নেহ করে তাকে। এমন সময়ে সেখানে ঝড়ের মতো এসে হাজির হয় প্রতাপ। হয়তো শরৎকুমারীকে কিছু বলার ছিল। কিন্তু তার এই আকস্মিক আগমনে দয়াময়ী আর নিজেকে অবগুণ্ঠিত করার অবসর পায়নি! প্রদীপের নরম আলোয় দয়াময়ীর আশ্চর্য রূপে যেন প্রতাপের চোখ ধাঁধিয়ে যায়। সে মুগ্ধ হয়ে একদৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে থাকে। তার এই বিহ্বল দৃষ্টি লক্ষ করে শরৎকুমারী। সে কি ঠিক দেখছে? তার স্বামীর চোখে এমন লালসার দৃষ্টি সে কখনও দেখেনি। দয়াময়ী ততক্ষণে নিজের মাথায় ঘোমটা টেনে দিয়েছে। শরৎকুমারী তীব্র দৃষ্টিতে স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘তুমি কী যেন বলতে এসেছিলে?’
স্ত্রীর কথায় প্রতাপ নিজেকে সামলে নিয়েছে। কিন্তু কেন অন্তঃপুরে সে এসেছিল তা ভুলে গিয়েছে। ঈষৎ থতমত খেয়ে বলল, ‘ও হ্যাঁ, শঙ্কর যেন কী সংবাদ এনেছিল। তোমাকে দিতে চায়। তাকে বরং একবার ডেকে পাঠিও।’
তার পরে দয়াময়ীর শরীরের উপর থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে যেমন ঝড়ের বেগে ঘরে ঢুকেছিল তেমনি ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।
শরৎকুমারী স্বামীর গমনপথের দিকে অগ্নিদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল।
নিজের বিশ্রামঘরে ফিরে এসে ঢক ঢক করে এক পাত্র উষ্ণ পানীয় গলায় ঢেলে দেয় প্রতাপ। এই মুখ তার বাড়িতেই আছে আর সে জানতেও পারেনি! ওই মুখ যে সে কিছুতেই ভুলতে পারছে না। খাস চাকরকে ডেকে সে দয়াময়ীর সমস্ত সংবাদ জেনে নেয়।
বহু বৎসর পরে এমন একটা চিন্তা তার মাথার ভিতরে জেগে উঠল। হ্যাঁ, খিদে, শরীরের ভিতরে লেলিহান আগুনের মতো একটা খিদে সে টের পায়। এই আগুন তো সহজে নিভবে না। প্রতাপ যেন তার স্বাভাবিক সুস্থ চিন্তা করবার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। লেলিহান লালসার হাতেই সে নিজেকে সঁপে দেয়।
নাহ! ওকে পেতেই হবে।
শরীরের ভিতরে ভীষণ এক শয়তান জেগে উঠেছে। খাস চাকর বংশীকে ডেকে সে কিছু পরামর্শ করে। তারপরে রাত্রির অপেক্ষা করতে থাকল ঢুলু ঢুলু চোখে। আর বার বার তরল পানীয় গলায় ঢালতে লাগল।
এই দিকে শরৎকুমারীরও ঘুম আসছে না রাত্রে। অনবরত তার চোখের সম্মুখে ভেসে উঠছে স্বামীর ওই লালসাভরা দৃষ্টি। একটা ঘৃণার বোধ যেন বার বার তাকে শিহরিত করে তোলে। আজকাল আর প্রতাপ নিয়মিত অন্তঃপুরে আসে না। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেও কথাবার্তা এখন বিরল। শরৎকুমারী ভাবে, তার কি এখন প্রয়োজন ফুরিয়ে গিয়েছে স্বামীর জীবনে?
মনের ভিতরে কী একটা অস্বস্তিতে শরৎকুমারী শয্যা ছেড়ে উঠে পড়ে। নাহ! এমনি করে সে স্বামীকে দূরে সরে যেতে দেবে না! তিনি নাই বা আসুন! সে তো যেতে পারে স্বামীর কাছে। কেন যাবে না সে!
সে পায়ে পায়ে বাহির বাটিতে প্রতাপের ঘরের দিকে যায়।
বিশ্রামাগারের দরজা বন্ধ। বাইরে দুইজন পাইক। ভিতরে থেকে একটা গোঙানির শব্দ, হুটোপুটির শব্দ ভেসে আসছে।
শরৎকুমারীকে দেখে পাইক দুটি চমকে ওঠে। ভিতরের শব্দে শরৎকুমারী অন্য কিছুই ভেবেছিল। সেও ভয়ার্ত শঙ্কিত মনে ভীষণ ত্বরায় দরজায় ধাক্কা দিয়ে দরজা খুলে ফেলে।
এ কী!
তার বিস্ময়ের সীমা পরিসীমা থাকে না। সীমাহীন ঘৃণায় তার সারা শরীর রি রি করে ওঠে।
দয়াময়ীর মুখ হাত বাঁধা। বিবস্ত্র প্রায়। তাকে জোরপূর্বক বলাৎকার করার চেষ্টা করছে প্রতাপ।
শরৎকুমারীকে সহসা দেখে প্রতাপও থতমত হয়ে গিয়েছে। দয়াময়ীকে ছেড়ে দিয়ে সে উঠে দাঁড়িয়েছে।
দয়াময়ী থর থর করে কাঁপছে। চোখ ভেসে যাচ্ছে জলে। সেই জল ঠোঁট বেয়ে নামা রক্তের সঙ্গে মিশে গেছে। শরৎকুমারী তার কাছে গিয়ে তার বাঁধন খুলে দিয়ে মায়াভরা গলায় বলে, ‘আয়, ভয় নেই। আমি আছি।’
প্রতাপ এবার যেন প্রতিবাদ করতে চায়। চিৎকার করে বলে,
‘শরৎ!’
কিন্তু শরৎকুমারী তার দিকে অগ্নিদৃষ্টি হেনে দয়াময়ীকে সঙ্গে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।
কিন্তু প্রতাপ এত সহজে থামবার নয়। একবার তার মাথায় যে জেদ চাপে সেই জেদ আর তার মাথা থেকে নামে না।
শঙ্কর বলল, ‘এ কী বলছ রাজা? তুমি আবার বিবাহ করবে? বিধবা দয়াময়ীকে?’
প্রতাপ হা হা করে হেসে উঠে চিৎকার করে।
‘হ্যাঁ হ্যাঁ। আমি ওই বিধবাকেই বিয়ে করব।’
প্রতাপ কিছুতেই শরৎকুমারীর সেই অগ্নিদৃষ্টি ভুলতে পারছে না। এত সাহস বেড়ে গেছে তবে শরৎকুমারীর! শরৎকুমারীর প্রতি একটা হিংস্র রাগে সে ভিতরে তিতরে ফুঁসতে থাকে। দয়াময়ীকে বিবাহ করেই সে শরৎকুমারীকে শাস্তি দিতে চায়। শরৎকুমারীর গায়ে হাত তোলার থেকে এই ভাবেই তাকে অধিক শাস্তি দেওয়া হবে। সেই সঙ্গে দয়াময়ীকেও সে ইচ্ছামতো ভোগ করতে পারবে। সে তাকে তার তন্ত্রসাধনার সাধনসঙ্গিনী করবে। রোজ সুরাপান আর কানা কেষ্টর সঙ্গে পুজো-পাঠ করে করে জীবন বড়ো নিস্তরঙ্গ হয়ে গেছে। সে ভাবল, ধর্মচর্চার সঙ্গে এবার নারীমাংসের আয়োজন ঘটিয়ে বরং একটু বিলাসিতা করা যাক। দুষ্কর্মের সঙ্গে ধর্মের আতর মিশিয়ে দিলে জীবনে একটা নতুন রসের আমদানি হবে।
শঙ্কর তবু তাকে বিরত করার চেষ্টা করে।
প্রতাপ চিৎকার করে ওঠে, ‘বিধবাবিবাহের নিয়ম নেই বলছিস! তবে শোন, আমি রাজা এই রাজ্যের। আমি যা বলব, তাই নিয়ম। সেটাই সবাইকে মানতে হবে। আর যে ব্রাহ্মণ এই বিয়ে দিতে রাজি হবে না তাকে কুকুরের কান চাটাব।’
শঙ্কর স্তম্ভিত হয়ে যায়। এই প্রতাপকে সে কখনও দেখেনি। এই অন্যায় সে কোনও ভাবেই মানতে পারছে না। বৌঠানের জন্য তার বড়ো দুঃখ হয়। প্রতাপের ভগিনী অগ্রজের এই কাজের প্রতিবাদ করেছিল বলে প্রতাপ তাকে বেত্রাঘাত করেছে। সে ভাবে, অতিরিক্ত মদ্যপানে বোধহয় প্রতাপের মাথাটাই খারাপ হয়ে গিয়েছে। এক দিন প্রতাপের বিবাহের জন্য সে নিজের জীবন বাজি রেখে নারীহরণের মতো গর্হিত কাজ করেছে। সে বিবাহ ছিল ভালোবাসার বিবাহ। সেই কাজের জন্য সে নিজেকে অপরাধী ভাবে না। কিন্তু এই বিবাহ? নাহ! সে কিছুতেই মানতে পারছে না।
শঙ্করকে চুপ করে থাকতে দেখে প্রতাপ হুংকার দিয়ে বলল, ‘কী রে চুপ করে আছিস কেন? যা সব আয়োজনে লেগে পড়।’
শঙ্কর শান্ত কিন্তু গম্ভীর গলায় বলল, ‘আমায় ক্ষমা করো রাজা। এই বিবাহ অনুষ্ঠান থেকে তুমি আমাকে অব্যাহতি দাও।’
সে আর প্রতাপকে কিছু বলার সুযোগ দিল না। দ্রুত সেখান থেকে অন্তর্হিত হয়।
ও দিকে দয়াময়ীর জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। সবাই যেন কেমন আড়চোখে তার দিকে তাকায়। তারা কি মুখ টিপে হাসে! নিজের একান্ত প্রিয় সখীও এখন তার সঙ্গে ভালো করে কথা বলে না। এমনকি তার শরৎ দিদিও কি তাকে ভালো চোখে দেখে? যে দিদি তাকে এত স্নেহ দিয়েছে, তার সম্মান বাঁচিয়েছে, এই দিদির আজ সে সর্বনাশ করতে যাচ্ছে! না না সে তা কি করে পারবে?
শরৎকুমারী অলিন্দে দাঁড়িয়ে অন্ধকার প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে ছিল। আকাশে চাঁদ নেই। পিছন থেকে একটি ডাকে সে মুখ ফেরায়।
‘দিদি।’
দয়াময়ীকে দেখেই আবার সে বাইরের দিকে মুখে ফিরিয়ে নেয়। না তার চোখে কোনও জল নেই। চোখের সমস্ত জল আজ শুকিয়ে গিয়েছে। এই অভাগী মেয়েটির উপরে সে রাগ করছে কেন! সে তো ভালো করেই জানে দয়াময়ীর কোনও দোষ নেই। দোষ যত তার ভাগ্যের। সব বোঝে সে। দয়াময়ীর প্রতি কী যেন এক দুঃখের বোধ সে অনুভব করে। তবু, সে কোনও ভাবেই দয়াময়ীর প্রতি স্বাভাবিক হতে পারে না। সে আবার ভাবে, এই মেয়েটি যদি না আসত এখানে, তবে কি তাকে এই দিন দেখতে হত?
শরৎকুমারীর কোনও সাড়া না পেয়ে, দয়াময়ী আবার ডাকে, ‘দিদি।’
মুখ না ফিরিয়েই শরৎকুমারী বলে, ‘কিছু বলবি?’
ইতস্তত করে, দয়াময়ী বলে, ‘আজ তো চুল বাঁধোনি দিদি। বেঁধে দেব?’
শরৎকুমারী ঘাড় না ফিরিয়ে আবার বলে, ‘না রে। তুই যা এখন।’
দয়াময়ীর মুখ দিয়ে একটি ক্ষুদ্র নিশ্বাস পড়ে। শরৎকুমারী যদি মুখ ফেরাত তবে দেখতে পেত তার সারা মুখ, বুক যেন চোখের জলে ভেসে যাচ্ছে। সে ভূমিতে বসে গড় হয়ে দিদিকে প্রণাম করে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।
কোনও দিন সে আর তার প্রিয় দিদির চোখের সামনে আসবে না। পরদিন পিছনের দিঘির জলে দয়াময়ীর মৃতদেহ ভেসে উঠল।
কিন্তু, সাধারণ মানুষের মন থেকে দয়াময়ীর এই মৃত্যুর ঘটনা সহজে মুছে গেল না। বিপুল ঘৃণার সঙ্গে মানুষ এই ঘটনার কথা মনে রাখল।
তবে সময়ের প্রলেপে প্রতাপ আর শঙ্করের মধ্যে যে অভিমানের মেঘ জমেছিল তা অপসারিত হয়ে যায়। শঙ্কর আর সূর্য আবার নতুন উদ্যমে সমরসজ্জায় মেতে উঠেছে। কিন্তু শরৎকুমারীর সঙ্গে প্রতাপের সম্পর্ক স্বাভাবিক হয় না। শরৎকুমারী নিজেকে শম্বুকের মতো নিজের মধ্যে গুটিয়ে নিয়েছে। কোনও বিষয়েই তার যেন আর কোনও আগ্রহ নেই। শুধু একবার শঙ্করকে ডেকে বলেছিল, ‘ঠাকুরপো, আমাকে একবার বিমলার সংবাদ এনে দিতে পারো? সে কেমন আছে?’
‘আপনি চিন্তা করবেন না বৌঠান। আমাদের মেয়ে ভালোই আছে। দেশে দেশে তো আমাদের চর আছে। তারাই সংবাদ দিয়েছে। এই তো গতকালই একজন বার্তা নিয়ে এসেছে, আমাদের বিমলা মা তার শ্বশুরবাড়িতে নিজের অধিকারের জায়গাটা ফিরে পেয়েছে। এই সংবাদ আমি মহারাজকে দিয়েছি।’
শরৎকুমারীর চোখ দুটি উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।
কয়েক দিন পরেই তামিমের লোক সংবাদ দিল শঙ্করকে।
বসন্ত রায়ের জামাতা রূপরাম বসু ও কাঁচু রায়, সম্রাট জাহাঙ্গিরের দরবারে অভিযোগ জানিয়েছে। প্রতাপের বিভিন্ন নৃশংস আচরণের কথা, বসন্ত রায়ের হত্যার কথা সবিস্তারে বর্ণনা করে, প্রতাপের বিরুদ্ধে তাদের অনুযোগ জানিয়েছে।
আগেই প্রতাপের বিদ্রোহের সংবাদ সম্রাটের কানে পৌঁছেছিল। তা ছাড়া বাংলার সুবাদার দুই বার প্রতাপের কাছে পর্যুদস্ত হয়েছে। সম্রাট ভাবলেন এইবার প্রতাপের রাশ টানা দরকার। নতুবা বঙ্গ হয়তো হাতছাড়া হয়ে যাবে। তাছাড়া পূর্ব ভারতের সমস্ত বিশৃঙ্খলা স্তিমিত করার জন্য সম্রাট জাহাঙ্গির তাঁর সব থেকে বীর সেনাপতি মানসিংহকে বঙ্গে প্রেরণ করলেন। কৌশলী আর দূরদর্শী মানসিংহ বঙ্গে আগমনের সময়ে তাঁর বাহিনীর সঙ্গে বঙ্গে নিয়ে এলেন রূপরাম বসু আর কাঁচু রায়কে।
শঙ্কর এই সংবাদ প্রতাপকে দিলে তারা একটা জরুরি সভা ডাকল। সমস্ত দুর্গে দুর্গে বার্তা প্রেরিত হল সতর্ক থাকার। যথেষ্ট গোলাবারুদ ও খাদ্যদ্রব্য মজুত করার নির্দেশ দিল প্রতাপ।
মানসিংহ প্রবল বিক্রমে ঢাকার উদ্দেশ্যে সৈন্য-সাথি নিয়ে রওনা হলেন। পথে যে যে রাজ্য পড়ল, অনেকেই তাঁর বশ্যতা স্বীকার করে নিল, আর যারা তা করল না তাদের রাজ্য ছারখার করে দিল মোগলসেনারা।
প্রতাপ অপেক্ষা করছিল কবে বঙ্গে বর্ষা আসবে। ঠিক যখন বর্ষা আগতপ্রায় তখন মানসিংহ যশোরের কাছাকাছি মৌতালায় এসে পড়েছেন। প্রতাপের সৈনিকরাও এই সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। তারা বিপুল বিক্রমে ঝাঁপিয়ে পড়ল মোগল সৈনিকদের উপরে। কিন্তু বাংলার প্রবল বর্ষায় বীর মানসিংহও বিপাকে পড়লেন। তাঁর সৈন্যদের মধ্যে খাদ্যদ্রব্য প্রভৃতি রসদের অভাব দেখা দিল। বাংলার পতঙ্গ-বাহিত নানা রোগে মোগলসেনাদের মধ্যে মড়ক দেখা দিল। এদিকে অনবরত চলছে প্রতাপের সৈন্যদের প্রবল গোলাবর্ষণ। মানসিংহের প্রায় দিশাহারা অবস্থা। সেই অবস্থায় ভবানন্দ মজুমদার যাকে প্রতাপ একদিন হিজলির রাজস্ব আদায়ের অধিকার দিয়েছিল, সে প্রতাপের পক্ষ ত্যাগ করে মানসিংহের পক্ষে যোগ দিল। কারণ প্রতাপের নানা রকম স্বৈরাচারী আচরণে সে মনে মনে ক্ষুব্ধ হয়েছিল। তাই সুযোগ পেয়েই প্রতাপের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করতে সে দ্বিধা বোধ করল না। কৃষ্ণনগরের রাজার সঙ্গে মিলেমিশে ভবানন্দ মোগলদের যাবতীয় রসদের জোগান দিতে লাগল। এমনকি তার সৈন্য সাথিরাও মোগলপক্ষে যোগ দিল।
অবশ্য মানসিংহের যশোরে পৌঁছাবার বেশ কিছুদিন পূর্বেই প্রতাপের বিশেষ অনুগত লক্ষ্মীকান্ত পত্র লিখে রূপরাম বসুকে প্রতাপের সমরসজ্জা বিষয়ে সমস্ত সংবাদ বিশদে জানিয়ে দিয়েছিল। ফলে মোগল সৈন্যরা আগেভাগে সাবধান হয়ে যায়। তাই প্রতাপের যে কৌশল, শত্রুপক্ষকে চমকে দেওয়া তা অনেকাংশে ব্যর্থ হল। কৌশলী মানসিংহ তাই নদীনালা পরিহার করে নিজেরাই একটা রাস্তা নির্মাণ করতে করতে বারাসাত ও বসিরহাট উপবিভাগের মধ্য দিয়ে যশোরের দিকে এগিয়ে ছিলেন। ফলে প্রতাপের অতর্কিত আক্রমণের পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়েছিল। সেই কারণেই মানসিংহের সুন্দরবন অঞ্চলে ঢুকে পড়তে বেশি বেগ পেতে হয়নি।
উপরন্তু নিজের লোকদের বিশ্বাসঘাতকতা প্রতাপের সমস্ত প্রচেষ্টাকে দুর্বল করে দিয়েছে ক্রমাগত। মুকুট রায়, যাকে প্রতাপ যশোর রাজ্যের উত্তর প্রান্তে কেল্লাদার নিয়োগ করেছিল, সেও বিশ্বাসঘাতকতা করে মানসিংহের পক্ষে যোগ দিল। তার অধীনস্থ সৈনিকরাও মোগলদের হয়ে যুদ্ধ করতে লাগল। এই সময়ে আর কোনও বঙ্গীয় ভূস্বামী প্রতাপের সাহায্যে এগিয়ে এল না। জামাতা রামচন্দ্র বসুও মোগলদের বশ্যতা মেনে নিয়ে নজরবন্দি হয়ে থাকল।
কেদার রায় ও চাঁদ রায়ও যেন প্রতাপের বিরুদ্ধে প্রতিশোধের জন্য অপেক্ষা করছিল। তারাও মোগলদের পক্ষ নিল। এমনি করে কূটনীতিতে প্রাজ্ঞ মানসিংহ একে একে প্রতাপকে অন্যদের থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিল।
কিন্তু একাকী প্রতাপ, শঙ্কর, সূর্যকান্ত, কামাল খাঁ প্রভৃতি বীর প্রবল বিক্রমে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে লাগল। ততদিনে বর্ষা বিদায় নিয়েছে। মানসিংহের সেনাপতি ইসমাইল খাঁ প্রবল বিক্রমে প্রতাপের সৈন্যদের উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ল নতুন উদ্যমে।
এবারে মোগল বিক্রমের কাছে প্রতাপের এক একটি করে দুর্গের পতন হতে লাগল। ধূমঘাট দুর্গ রক্ষা করছিল তরুণ বীর উদয়াদিত্য। আমৃত্যু প্রবল বিক্রমে যুদ্ধ করে উদয়াদিত্য ধূমঘাট দুর্গ রক্ষা করেছিল। অবশেষে যুদ্ধক্ষেত্রে নিঃসঙ্গ অভিমন্যুর মতো সেও মৃত্যুর কাছে হার মানল। তার মৃত্যুতে সমস্ত প্রতিরোধ যেন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল। পুত্রের মৃত্যুতে দুঃখী অভিমানী মহারানি শরৎকুমারীও আত্মাহুতি দিল।
স্ত্রী ও পুত্রের মৃত্যুতে প্রতাপ একেবারেই ভেঙে পড়ল। তখন তার একমাত্র সম্বল যশোর দুর্গ। আর একটাই সান্ত্বনা এত দুর্দিনেও তার প্রিয় বন্ধু শঙ্কর, সূর্যকান্ত, কামাল তাকে ছেড়ে চলে যায়নি। ইসমাইল খাঁও বাইরে থেকে যশোর দুর্গ অবরোধ করে বসে থাকল।
খাদ্য পানীয়ের অভাবে দুর্গের মধ্যে মড়ক শুরু হয়েছে। অনাহারে অসুখে প্রাণত্যাগ করল কামাল খাঁ। কামাল খাঁর মৃত্যুতে সূর্যকান্ত আর স্থির থাকতে পারল না। মরণকামড় দিতে যেন সে ঝাঁপিয়ে পড়ল ইসমাইল খাঁর সেনাদের উপরে। কিন্তু অনাহারে অসুখে ক্লান্ত সে পারবে কেন! বীরের মতো যুদ্ধ করে সূর্যকান্ত প্রাণ বিসর্জন দিল।
নিঃস্ব, ক্লান্ত প্রতাপ আর কোনও উপায় না দেখে মানসিংহের কাছে সন্ধিপ্রস্তাব প্রেরণ করল। কিন্তু মানসিংহ সেই প্রস্তাব অগ্রাহ্য করে প্রতাপ ও শঙ্করকে বন্দি করলেন।
সুন্দরবনের বাঘ মহারাজা প্রতাপাদিত্যের যখন পতন ঘটল, তখন সে একা, নির্বান্ধব। শরীর ভেঙে পড়েছে। হয়তো আহত মনের কাছে হার মেনেছে তার শরীর। প্রতাপের তখন কতই বা বয়স! হয়তো পঞ্চাশৎ বৎসরের কাছাকাছি। এক নিঃসঙ্গ বিদ্রোহীর সমস্ত অহংকার মুছে গেল চূড়ান্ত অপমানের অন্ধকারে।
শঙ্করের আচার ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে মানসিংহ তাকে এই শর্তে মুক্তি দিল যে সে ভবিষ্যতে কোনও দিন মোগলদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করবে না।
তখন সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছে। ক্লান্ত শঙ্কর নিজের গৃহে ফিরে এসে দেখল, চারপাশ বড়ো শান্ত। দু-একটা পাখি ডাকছে। যেন একটা মৃত্যুপুরীতে সে প্রবেশ করেছে। চারদিকে অন্ধকার। কিন্তু দূরের একটি ছোট্ট আলোকবিন্দু তাকে যেন পথনির্দেশ করছে। সেই আলো লক্ষ করে সে পা চালায়। বাইরের বাতায়নে একটি মৃৎপ্রদীপ জ্বলছে। তার পায়ের শব্দ পেয়ে দরজাটা খুলে গেল। যে দরজা খুলে দিল সে যেন এই পায়ের শব্দের অপেক্ষায় দরজার পিছনে অপেক্ষায় ছিল এতদিন। প্রদীপ হাতে দাঁড়িয়ে আছে ফরিদা। তার পরনে সাদা বস্ত্র। নিরাভরণ। থর থর করে কাঁপছে তার হাতের প্রদীপটা।
শঙ্কর ভাবল, রাজ্য, রাজনীতি, যুদ্ধ সব মিথ্যা। এই দৃশ্যের থেকে বড়ো পুরস্কার আর কী আছে জীবনে!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন