অবিন সেন
বসন্ত রায়ের হত্যা সারা রাজ্যে যেন একটা ঝড় বইয়ে দিল। এই নৃশংসতার কথা ফিসফাস বাতাসে ঘুরে বেড়াতে লাগল। কিন্তু কেউই প্রকাশ্যে কিছু বলার সাহস পায় না। সবাই বুঝতে পারছে, রাজা যখন নিজের মানুষদের এই ভাবে হত্যা করতে পারে, সে অন্যদের কী সাজা দেবে!
প্রতাপ নিজেই নিজেকে রাজ্যে অভিষিক্ত করল। সমস্ত রাজ্য এখন তার নিজের। অনেক দিনের একটা স্বপ্ন এবার তার সফল হতে চলেছে।
সে রায়চাঁদকে ডেকে পাঠাল একদিন। চাকসিরিতে বিশাল একটি নৌবন্দরের পরিকল্পনা করতে হবে। সেই সঙ্গে ফ্রেডারিক ডুডলীও পরামর্শ দিল কী ভাবে যুদ্ধ উপযোগী একটা নৌ-বন্দর গড়ে তোলা যায়।
তবে কালের নিয়মে এই ভয়ও একদিন মানুষের মন থেকে কেটে যেতে লাগল। তারা দেখতে পাচ্ছে, সারা রাজ্যে নতুন নতুন রাস্তা নির্মাণ হচ্ছে। কৃষিকাজে সেচ ব্যবস্থার জন্য নতুন নতুন খাল খনন করা হচ্ছে। সাধারণ মানুষের চাহিদা অল্প। তারা খেয়ে পরে বেঁচে থাকতে পারলে বেশি কিছু চায় না।
এদিকে সন্দ্বীপের অধিপতি চাঁদ রায়ের প্রতি প্রতাপের ক্ষোভ কিন্তু প্রশমিত হল না। সে মনে মনে সুযোগের অপেক্ষায় থাকল কী ভাবে চাঁদ রায়কে শায়েস্তা করা যাবে। এই বিষয়ে সে শঙ্কর আর সূর্যকান্তর সঙ্গে পরামর্শ করল।
শঙ্কর পরামর্শ দিল, ‘রাজা, আমাদের এখন প্রতিবেশী রাজাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বাজায় রাখতে হবে। মোগলদের বিরুদ্ধে সমস্ত শক্তিকে একত্রিত করতে হবে। আমরা নিজেরাই যদি পরস্পরের সঙ্গে বিবাদ করি তাতে আমাদের নিজেদেরই শক্তি ক্ষয় হবে। আমরা দুর্বল হয়ে পড়ব।’
প্রতাপ তার কথায় সায় দিলে, শঙ্কর আবার বলল, ‘আমি ঠিক করেছি, পার্শ্ববর্তী রাজাদের কাছে আমাদের গুপ্তচরদের প্রেরণ করব। কারণ গোপনে আমাদের জেনে নিতে হবে কোন কোন রাজা আমাদের পক্ষ নিয়ে মোগলদের বিরোধিতা করবে! তারপরে সেই বিষয়ে আমরা পরিকল্পনা করব। অন্যথায় দেখা যাবে কোনও কোনও রাজ্য মুখে আমাদের বন্ধুত্ব স্বীকার করলেও পিছনে আমাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত আছে। যেমন ধরো, চাঁদ রায় তো এক সময়ে তোমার বন্ধু ছিল, অথচ তার অধীনস্থ কার্ভালো কেমন গোবিন্দের সঙ্গে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিল।’
কার্ভালোর নাম উল্লেখে আবার প্রতাপের মাথায় ক্রোধের বাষ্প উত্তপ্ত হয়ে উঠল। সে মনে মনে ভাবল, এর প্রতিশোধ সে একদিন নেবে।
মুখে বলল, ‘হ্যাঁ, শঙ্কর তুই ঠিকই বলেছিস। আমাদের গুপ্তচরদের ভালো করে প্রশিক্ষণ দে। ঠিক মোগলরা যে ভাবে মুষ্টিমেয় মানুষ নিয়ে আমাদের উপরে প্রভুত্ব করছে, ঠিক সেই ভাবে আমাদেরও পরিকল্পনা করতে হবে।’
সেই সময়ে সেখানে উপস্থিত হল প্রতাপের পুত্র উদয়াদিত্য। এখনও কৈশোরের গণ্ডি পেরোয়নি সে, কিন্তু এই বয়সেই সে প্রতাপের মতো বীর কেশরী হয়ে উঠছে। তার শস্ত্রশিক্ষার ভার নিয়েছে স্বয়ং সূর্যকান্ত। তিরন্দাজি শেখাচ্ছে কার্লোস।
উদয়াদিত্যকে দেখে সূর্যকান্ত বলল, ‘রাজা, তোমার পুত্রের শিক্ষা কেমন হচ্ছে এবার সেই দিকে নজর দাও। তুমি নিজেও তোমার কৌশলগুলি পুত্রকে শিখিয়ে দাও। এই রাজ্যে তোমার থেকে শ্রেষ্ঠ অস্ত্রধারী আর কে আছে!’
প্রতাপ হাসতে হাসতে পুত্রের গায়ে হাত বুলিয়ে বলল, ‘কেন, তুই তো শেখাচ্ছিস, তোর শিক্ষাই কি যথেষ্ট নয়!’
তারপরে একটু থেমে হাসতে হাসতে সে বলল, ‘জানিস তো, বীর হলেও সবাই আবার ভালো শিক্ষাগুরু হতে পারে না। মহাভারতে শ্রেষ্ঠ বীর ছিলেন ভীষ্ম, কিন্তু রাজপুত্রদের অস্ত্রশিক্ষার ভার দিয়েছিলেন দ্রোণাচার্যের উপরে।’
সূর্য স্মিত মুখে উদয়াদিত্যকে বলল, ‘পুত্র, চলো তো তোমার পিতাকে তোমার অস্ত্রশিক্ষার মহড়া দেখাই।’
উদয়াদিত্য প্রথমে পিতাকে ও তারপরে গুরু সূর্যকান্তকে প্রণাম করে গুরুকে অস্ত্র ধরতে আহ্বান করল।
শুরু হল গুরুশিষ্যের অসিযুদ্ধ। সে এক আশ্চর্য কৌশলী যুদ্ধ। প্রতাপ মুগ্ধ হয়ে গেল। মনে মনে ভবল, পুত্রের উপযুক্ত শিক্ষাই হচ্ছে।
অগ্রজের সঙ্গে সঙ্গে সেই স্থানে এসে উপস্থিত হয়েছিল, রাজকন্যা বিমলা। প্রতাপাদিত্য পুত্রের তারিফ করতে করতে কন্যাকে কোলের কাছে টেনে নিয়ে বলল, ‘আমার এই মা’টির শিক্ষার ভার কে নেবে বলো তো?’
বিমলা ছোটো থেকেই বড়ো মেধাবী। মা’র কাছে এতদিন তার শিক্ষা হয়েছে।
বিমলাকে শঙ্কর ডাকল নিজের কাছে,
‘আয়, আমার কাছে। আমার সাথে গল্প করবি!’
বিমলা তার ছোট্টো ঘাড়টি নাড়ল।
শঙ্কর মৃদু হেসে বলল, ‘এই তো, রাজকন্যা আমার কাছে পড়বে।’
সে বিমলাকে কোলে তুলে নেয়।
সেই দিন সন্ধ্যাবেলায়, শঙ্কর ডেকে পাঠাল তামিমকে। তামিম এসেই প্রথমে বলল, ‘হুজুর, আমার বিটিয়া কেমন আছে?’
শঙ্করের মুখে একটা নির্মল হাসি খেলে যায়, ‘যাও না, এত্তেলা দিয়ে একবার দেখা করে এস।’
এক কঞ্চুকী তাকে ভিতরে নিয়ে যায়।
শঙ্করের মুখ দিয়ে যেন একটা শান্তির নিশ্বাস পড়ল। যমেমানুষে টানাটানির পরে, আস্তে আস্তে সুস্থ হয়ে উঠেছে ফরিদা। এই ঘটনায় তাদের দুইজনের মধ্যের পর্দাটা যেন সরে গিয়েছে। শঙ্কর এখন তার সঙ্গে সহজ ভাবে কথা বলে। ফরিদার মনেও আর কোনও জড়তা নেই। সে তো তার মনকে আগেই উজাড় করে প্রকাশ করে দিয়েছে শঙ্করের কাছে। তবু একটা দূরত্ব দুজনের মধ্যে রয়ে গিয়েছে। পাওয়া হয়েও যেন তারা পরস্পরকে পায়নি।
তামিম ফিরে এলে শঙ্কর বলল, ‘তোমার শাগরেদদের আবার চারদিকে ছড়িয়ে দাও। বিশেষ করে বাকলা, চন্দ্রদ্বীপ, হিজলি, সন্দ্বীপ, আরাকান সবদিকে পাঠিয়ে দাও।’
তারপরে তার দিকে ঝুঁকে গোপনে তাকে কিছু পরামর্শ দিল।
এদিকে ওড়িশা আর প্রতাপের মিলিত আক্রমণের কাছে পর্যুদস্ত হয়ে মোগলরা ফুঁসছিল। তার উপরে যশোর থেকে রাজস্ব আদায়ও অনিয়মিত হয়ে পড়েছে।
এই সময়ে বাংলার সুবাদার হয়ে এলেন আজিম খাঁ। দুর্ধর্ষ বীর হিসাবে আজিম খাঁর সুনাম ছিল মোগল সাম্রাজ্যে। তিনি বঙ্গের মসনদে বসার পরেই করদ রাজ্যগুলির কাছে ফরমান পাঠালেন। যে যে রাজ্য রাজস্ব দিতে অস্বীকার করবে, তাদের বিরুদ্ধে তিনি অস্ত্র ধারণ করবেন।
প্রতাপ এই ফরমান পেয়ে ঘৃণা ভরে মোগল দূতকে ফিরিয়ে দিল। দূত চলে গেলে তিনি প্রিয় সঙ্গীদের একত্রে ডেকে পাঠালেন। সকলে মিলে মন্ত্রণা করলেন। সকল বাহিনীর সেনাদের প্রস্তুত হতে বললেন। সূর্যকান্ত বলল, ‘এখন বৈশাখ মাস। সামনের কয়েক মাস আমরা বরং মোগল রাজাদের তোয়াজ করে চলি। ঠিক বর্ষার সময়ে আমরা যুদ্ধের প্রস্তুতি নেব। আর আমরা মোগলদের সঙ্গে জলপথে যুদ্ধ করব।’
সকলে একবাক্যে তার প্রস্তাব মেনে নেয়।
প্রতাপ বলল, ‘সূর্য ঠিকই বলেছে। মোগলরা বাংলার এই নদীনালায় যুদ্ধ করতে অভ্যস্ত নয়। তাছাড়া তাদের পদাতিক ও ঘোড়সওয়ার সৈন্যই বেশি। এই বাংলার কর্দমাক্ত মাটিতে বর্ষায় তারা পেরে উঠবে না। আর নদী উপচে বন্যা দেখা দিলেও সেই বন্যার সঙ্গে তারা যুঝে উঠতে পারবে না।’
সেই দিন থেকে সৈন্যদের মধ্যে সাজোসাজো রব পড়ে গেল। তবে তা অনেকটাই প্রচ্ছন্নভাবে। রণতরীগুলিতে কামান ও গোলাবারুদ মজুত হতে লাগল। এদিকে চাকসিরিতে যুদ্ধসজ্জায় সজ্জিত নৌবন্দর নির্মাণের কাজ প্রায় শেষের পথে।
এই সময়ে প্রতাপ বকেয়া কিছু রাজস্ব মোগলদের কাছে পাঠিয়ে দিল। যশোরের থেকে কর পেয়ে আজিম খাঁর গোঁফ যেন চওড়া হল। প্রতাপাদিত্যের তবে সুবুদ্ধি হয়েছে। তবে তিনি কৌশলী শাসক। তিনি ভালো করেই জানেন শত্রুকে বিশ্বাস করতে নেই। ভিতরে ভিতরে সেনাপতি ইব্রাহিম খাঁকে প্রস্তুত থাকতে বললেন।
তিনিও ছড়িয়ে থাকা কাসিদদের সজাগ করে দিলেন। তিনিও জানতে চান বাংলার আর কোন কোন করদ রাজ্য প্রতাপাদিত্যের মতো বিদ্রোহী বা প্রতাপের সঙ্গে আছে। আর কোন কোন রাজ্য প্রতাপের বিরুদ্ধতা পোষণ করছে।
তিনি সংবাদ পেলেন হিজলি-কাঁথির প্রবল পরাক্রান্ত ঈশা খাঁ প্রতাপের প্রতি প্রবল বিদ্বেষ পোষণ করে।
ঠিক একই ভাবে গুপ্তচর তামিম এসে বলল শঙ্করকে, ‘বসন্ত রায়ের জামাতা রূপরাম বসু আর তার শ্যালক কাঁচু রায়কে সঙ্গে নিয়ে হিজলির রাজা ঈশা খাঁ-র কাছে গিয়েছে সাহায্যের জন্য।’
শঙ্কর বিস্মিত হয়ে বলল, ‘তাই নাকি!’
‘আমাদের রাজা তো অনেক দিন ধরে কাঁচু রায়কে খুঁজে বেড়াচ্ছে।’
‘হুজুর, আপনি হয়তো অবগত নন, কাঁচু রায়কে বিক্রমপুর থেকে আমাদের সৈন্যদের হাত থেকে উদ্ধার করে নিয়ে গিয়েছিল ঈশা খাঁর সেনাপতি বলবন্ত।’
‘তাই নাকি!’
‘জি হুজুর।’
‘সেই সঙ্গে আমাদের কাছে সংবাদ আছে মোগল শাসকের দূত আনাগোনা করছে হিজলি দরবারে। সম্ভবত মোগল সুবাদার আজিম খাঁ গোপনে সাহায্য করবে ঈশা খাঁকে। সেই ব্যাপারে একবার হিজলি গিয়েছিল সেনাপতি ইব্রাহিম খাঁ। মনে হয় ছদ্মবেশে সৈন্যরাও এসে উপস্থিত হয়েছে হিজলিতে।’
শঙ্কর চুপ করে শুনতে থাকল। মনে মনে সে তার পরিকল্পনা ছকতে শুরু করে দিয়েছে।
তামিম আবার বলল, ‘চাঁদ রায় আর কেদার রায়কেও মোগল সুবাদার উৎসাহ দিচ্ছে। যাতে তারা প্রতাপের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। হয়তো কিছু কর মকুবের নামে উৎকোচও দেবার কথা বলেছে।’
সেই দিন রাত্রেই শঙ্কর সমস্ত কিছু ব্যক্ত করল প্রতাপকে। তারপরে দুইজনে বসে পরিকল্পনা করল। প্রতাপ বলল, ‘সবার আগে আমাদের ঈশা খাঁকেই আক্রমণ করতে হবে। তাকে আগে যমের বাড়ি পাঠিয়ে কাঁচুকে কুচি কুচি করে কেটে জলে ভাসিয়ে দেব। আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র! আর হিজলির রাজকোশ লুঠ করে আমাদের ক্ষতি পূরণ করব।’
ক্রুদ্ধ হয়ে সে গলায় ঢক ঢক করে পানপাত্র থেকে পানীয় ঢেলে দিল।
ডেকে পাঠাল তান্ত্রিক কানা কেষ্টকে।
‘কী ঠাকুর, তোমার মন্ত্রের জোর এবার দেখাও তো। কালই আমার সমস্ত রণতরীগুলিকে মন্ত্রপূত করে আসবে।’
কানা কেষ্ট ঘাড় নাড়তে নাড়তে প্রতাপের সামনে বসে পড়ল। প্রতাপ বুঝতে পেরে মুচকি হাসল। কানা পণ্ডিতেরও কিছু পানীয় চাই।
দেখতে দেখতে বাদরিয়া এসে গেল। বঙ্গদেশের প্রবল বর্ষা। মেঘে মেঘে সারা আকাশ যেন বর্ষার দখলে চলে গেল। কয়েকদিনের মধ্যেই নদীগুলি ফুলে ফেঁপে উঠল। প্রতাপের খনন করা খাল বিল জলে পরিপূর্ণ।
জাহাজঘাটা থেকে একের পর এক রণতরী জলে ভেসে পড়ল। প্রতাপ, সূর্যকান্ত, কার্লোস, রুডা, কামাল সকল বীরগণ এক এক বাহিনীর সঙ্গে বেরিয়ে পড়ল। এই প্রথম রাজা প্রতাপাদিত্য একটি পূর্ণ যুদ্ধে যাত্রা করছে।
অল্পকালের মধ্যে বর্ষার উত্তম বাতাসের অনুকূলে তারা হিজলি মছন্দরী পৌঁছে ঈশা খাঁ-র রাজ্য আক্রমণ করল। ফিরিঙ্গিদের তৈরি এমন ‘ঘুরাব’ রণতরি বঙ্গে কেউ দেখেনি আগে। সেই সব রণতরি থেকে তারা মুহুর্মুহু কামান দাগতে শুরু করল। সেই সুযোগে বড়ো বড়ো ‘বালাম’ নৌকা থেকে পদাতিক ও অশ্বারোহী সৈনিকরা স্থলভূমিতে নেমে হিজলি রাজ্যকে অবরুদ্ধ করে তুলল। বাইরে থেকে কোনও সাহায্য পাওয়ার পথ রুদ্ধ করে দিতে চাইল। কিন্তু মোগল সৈনিকদের সাহায্যে ঈশা খাঁ-র সৈনিকরা প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তুলল। মোগল সেনাপতি ইব্রাহিম খাঁও যুদ্ধক্ষেত্রে হাজির। মোগলদের উন্নত কামান বন্দুক নিয়ে ঈশা খাঁর সৈনিকরা বীর বিক্রমে প্রতাপের বাহিনীর উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ল। ঘোরতর যুদ্ধ শুরু হল। ফিরিঙ্গি কামানের গোলার তেজ যেন পরীক্ষা হতে লাগল। হিজলির সেনাপতি বলবন্ত তার বাহিনী নিয়ে প্রতাপের পদাতিক সৈনিকদের উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ল।
এই সময়ে সূর্যকান্তের নির্দেশে তারা একটা কৌশল গ্রহণ করল। একদিন প্রবল বৃষ্টির মধ্যে রাতের অন্ধকারে যশোরের সৈন্যেরা কোদাল দিয়ে গর্ত খুঁড়ে সেই গর্তের মধ্যে ঢুকে বসে থাকল। তাদের হাতে থাকল বিষাক্ত তির আর গাদা বন্দুক। যখন প্রতিপক্ষের পদাতিক সৈনিকরা পরদিন রণক্ষেত্রে এল তখন মাটির গর্ত থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে তির ছুটে গেল। মুহূর্তের মধ্যে বহু সৈন্য ধরাশায়ী। প্রবল পরাক্রমে যশোবন্তের উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে নিহত করল সূর্যকান্ত। সেনাপতির মৃত্যুর পরে হিজলির সৈনিকরা, সেই সঙ্গে মোগল সৈনিকরা কিছুটা দিশাহারা হয়ে গেল। এই সময়ে প্রতাপের নৌবাহিনী চারদিকে ছড়িয়ে গিয়ে চারদিক থেকে গোলাবর্ষণ করতে লাগল। তাছাড়া মোগল সৈনিকরা এই বর্ষার কর্দমাক্ত ভূমিতে যুদ্ধ করতে অভ্যস্ত নয়। তারা পিছু হঠতে শুরু করল। সেই সঙ্গে বঙ্গের প্রবল মশার দংশনে মোগল সৈন্যরা নানা রকম জ্বরজালায় পড়তে লাগল।
বিপদ বুঝে অবশিষ্ট মোগল সৈন্যরা পিছু হঠতে শুরু করল অচিরেই।
এই দিকে প্রতাপের ফিরিঙ্গি নৌসেনাপতি রুডা তার রণতরি থেকে প্রবল ভাবে গোলাবর্ষণ শুরু করেছে। এই গোলার আঘাতেই ঈশা খাঁ নিহত হল। রাজার মৃত্যুতে তার সমস্ত সৈন্য দিশাহারা। মোগল সেনাপতি ইব্রাহিম খাঁ পলায়ন করেছে আগেই।
প্রবল বিক্রমে প্রতাপ হিজলি অধিকার করে নিল। সমস্ত রাজকোশ ভেঙে অর্থ সোনাদানা নিয়ে জাহাজ বোঝাই করা হল। প্রতাপ হিজলি রাজ্যে ঢ্যাঁড়া পিটিয়ে প্রচার করল, ‘আজ থেকে হিজলি রাজ্য যশোররাজের অধীনস্থ হল।’
কিন্তু অনেক খুঁজেও প্রতাপ আর সৈন্যরা রূপরাম বসু ও কাঁচু রায়কে খুঁজে পেল না। যুদ্ধ লাগার শুরুতেই তারা নৌকাযোগে গোপনে এই রাজ্য ত্যাগ করে গিয়েছে। এই সংবাদে প্রতাপ বৃথা আস্ফালন করতে লাগল।
রাজকর্মচারী ভবানন্দকে প্রতাপ হিজলির রাজস্বের ভার অর্পণ করে যশোরে ফিরে এল।
যুদ্ধজয় করে ফেরার পরে কয়েকদিন রাজ্যে উৎসব চলল। এই সময় থেকে প্রতাপের মধ্যে অহংকার বড়ো বেশি করে দেখা দিল।
সেই সঙ্গে বাড়ল তার তন্ত্রচর্চা আর সুরাপান।
শঙ্কর তাকে বার বার এই বিষয়ে সাবধান করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু তার বেশি সে এখন বলতে পারে না। মহারাজা প্রতাপাদিত্যের প্রতাপ এখন অনেক বেশি। সে বদরাগী, সে নিষ্ঠুর। তার মধ্যে যে সকল ভালো গুণ ছিল তা যেন ধীরে ধীরে চাপা পড়ে যাচ্ছে তার সীমাহীন উচ্ছৃঙ্খলতার আড়ালে।
প্রতাপের কাছে পর্যুদস্ত হয়ে মোগলরা চুপ করে থাকল কিছুকাল। কারণ সরাসরি তারা আর যশোর আক্রমণ করতে চাইছে না। বরং তারা অন্য সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা করছে। তারা অভিজ্ঞ যুদ্ধবাজ। তারা জানে কখন পিছু হঠতে হয় আর কখন অগ্রসর হতে হয়।
এই সময়ে বাংলার মোগলবিরোধী শক্তিকে একত্রিত করার বদলে প্রতাপ ভুল করে বসতে লাগল। সে যেন তাদের কয়েকজনের সঙ্গে বৈভবের রেষারেষি শুরু করল। আসলে তার আকাশচুম্বী দেমাক তাকে তার সুস্থ চিন্তার থেকে দূরে সরিয়ে রাখছে। শঙ্কর নীরবে লক্ষ করা ছাড়া আর কোনও উপায় দেখতে পেল না। বার বার প্রতাপকে বোঝাতে গিয়ে সে ব্যর্থ হয়েছে।
আজকাল শঙ্করের নিজেকে ক্লান্ত লাগে। একটা হতাশা যেন তাকে গ্রাস করছে! এই প্রতাপকে সে আগে যেন দেখেনি। যত দিন যাচ্ছে তত যেন প্রতাপের মধ্যে বদল আসছে। যে বিদ্রোহের খোয়াব তারা সবাই মিলে দেখেছিল, সেই বাংলার তখতের খোয়াব, তা কি অধরাই থেকে যাবে। শঙ্করকে মাঝে মাঝে চিন্তামগ্ন হয়ে বসে থাকতে দেখলে ফরিদা এসে তার পাশে বসে। আলগোছে শঙ্করের একটি হাতের উপরে তার নরম হাতটা রাখে। শঙ্কর ঘাড় ফিরিয়ে ফরিদার মুখের দিকে তাকায়। ফরিদার চোখে যেন এক আশ্চর্য উজালা দেখতে পায় সে। তার পরেই অনুভব করে সেই উজালার আড়ালে চাপা আছে এক ক্ষুধিত অন্ধকার। তাদের সম্পর্কটা অদ্ভুত। তাদের দুজনের হৃদয় দুজনের কাছে উন্মুক্ত হয়ে গেছে কবেই। তবু দুই হৃদয় যেন কাছে আসতে পারছে না কিছুতেই।
কেন? কেন?
নিজেকে প্রশ্ন করে শঙ্কর। কীসের বাধা? সব বাধা তো ঘুচে গেছে কবে। রাজাও তার পক্ষে আছে। তার পিতাও আজ আর নেই যে পিতার অনুমতির প্রয়োজন হবে। তবে কি বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে তার নিজের ভিতরের সংস্কার!
শঙ্কর ঠিক বুঝে উঠতে পারে না।
ওদিকে ফরিদা তো কবেই তার খসম মেনে বসে আছে শঙ্করকে। কিন্তু শঙ্কর যেন একটা পাথরের মতো দূরে সরে আছে। তবু সে মাঝে মাঝে শঙ্করের চোখে এক ক্ষুধা দেখতে পায়। শঙ্করও তা বুঝতে পেরে চোখ থেকে চোখ সরিয়ে নেয়। তবু কী এক পাথর প্রমাণ বাধায় সে ফরিদার শরীর থেকে দূরে সরে থাকে। অথচ ফরিদা যখন তার পাশে এসে বসে তখন যে কী শান্তি! কী এক অনাস্বাদিত শান্তি অনুভব করে সে। এ কি ভালোবাসা? এ কি দোস্তি? শঙ্কর বুঝে উঠতে পারে না। তখনই সে নিজের মনকে ঝাঁকিয়ে নাড়া দিয়ে রাজ্যের চিন্তায় মগ্ন হয়। সে মনে করে আরাকান নিয়ে তাদের এবার ভাবতে হবে।
আরাকান রাজ্য তখন স্বাধীন রাজ্য। তারা তখনও মোগলদের বশ্যতা স্বীকার করেনি। শঙ্করের পরামর্শে প্রতাপ ঠিক করল আরাকান রাজাকে সে তোয়াজ করে চলবে। ভাবল, ভবিষ্যতে হয়তো তা হলে মোগলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সময়ে সাহায্য পাওয়া যাবে। কারণ সে জানে মোগলদের সঙ্গে তার যুদ্ধ প্রায় অবশ্যম্ভাবী।
আরাকান রাজের সঙ্গে সেই সময়ে বিক্রমপুরের অধিপতি কেদার রায়ের সদ্ভাব নষ্ট হয়ে গিয়েছে। সেই সুযোগে প্রতাপ দূত পাঠাল কেদার রায়ের কাছে। জানাল সে সন্ধি করতে চাইছে। তিনি বা তাঁর সেনাপতি কার্ভালো যদি তাঁর আতিথেয়তা গ্রহণ করেন সন্ধির নিদর্শন হিসাবে তা হলে সে খুবই খুশি হবে। তাছাড়া কেদার রায় রাজি থাকলে উভয়ে মিলে আরাকানরাজের বিরুদ্ধে যুদ্ধ যাত্রা করবে। যদিও তার মনে তখন অন্য ভাবনা।
কেদার রায় দূত মারফত এই সমস্ত অমায়িক প্রস্তাবে মুগ্ধ হয়ে সেনাপতি কার্ভালোকে পাঠালেন সন্ধির নিদর্শন হিসাবে।
কার্ভালো ধূমঘাটে পৌঁছালে প্রতাপ নিজে গিয়ে তাকে সাদর অভ্যর্থনা করে নিজের দুর্গে নিয়ে এল। কার্ভালো এই আন্তরিকতায় মুগ্ধ হয়ে গেল। সে ঘুণাক্ষরেও জানতে পারেনি প্রতাপের অভিসন্ধি।
প্রতাপ তার অভিসন্ধির কথা শঙ্করকেও জ্ঞাত করেনি। করলে হয়তো সে বাধাপ্রাপ্ত হত।
পরদিন রাত্রিকালে অতর্কিতে কার্ভালোকে ও তার রক্ষীদের বন্দি করে কারাগারে নিক্ষেপ করল প্রতাপ। আর প্রভাত হবার আগেই কার্ভালোকে নিহত করে তার ছিন্ন মস্তক উপহারস্বরূপ সে আরাকানরাজের কাছে পাঠিয়ে দেয়। এক সময়ে এই কার্ভালো খুব বেগ দিয়েছিল আরাকানরাজাকে। সেই কার্ভালোকে হত্যা করে প্রতাপ আরাকানরাজের বন্ধুত্ব অর্জন করতে চাইল।
শঙ্কর এই সংবাদ পেয়ে বড়োই দুঃখিত হল। একান্তে সে প্রতাপকে বলল, ‘রাজা, এমন বিশ্বাসঘাতকের কাজ তুমি কেন করলে?’
প্রতাপ তখন তার নিষ্ঠুর অহংকারে অন্ধ। হা হা হাসিতে সে বলল,
‘তুই দেখ না, এবার আমরা আরাকানরাজের বিশ্বাস অর্জন করতে পারব।’
শঙ্কর শিহরিত হয়ে মনে মনে বলল, ‘বিশ্বাসঘাতকতার বিনিময়ে কখনও বিশ্বাস অর্জন করা যায় না।’ সে যেন একটা অন্ধকার ভবিষ্যৎ কল্পনা করে একবার চোখ বুজল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন