ষড়যন্ত্র

অবিন সেন

আবু বকরের বয়স হয়েছে। দীর্ঘ চেহারা বয়সের ভারে সামান্য ন্যুব্জ হয়েছে। এককালের পেশিবহুল শরীর শীর্ণ আর শিথিল হয়েছে। কিন্তু প্রতাপ লক্ষ্য করেছে তার কর্মোদ্যম এতটুকু কমেনি বা বরং দিনে দিনে যত বয়স বেড়েছে তত আগ্রার রাজনীতির অলিগলিতে প্রভাব প্রতিপত্তি বেড়েছে।

আবু বকর আসলে গৌড়ের সুলতান দাউদের কর্মচারী ছিল। সেই সূত্রেই বিক্রমাদিত্যের সঙ্গে তার পরিচয় এবং সখ্য। দাউদের পতনের পরে সেও পলায়ন করেছিল, পরে টোডরমলের সময়ে বিক্রমাদিত্যই তাকে খুঁজে নিয়ে এসে রাজস্বব্যবস্থার কাজে লাগিয়েছিল। সেই কাজের সূত্রেই পরে আবু বকর আগ্রা চলে আসে।

আবু বকর বারবার প্রতাপকে বলেছে,

‘জনাব, আমি আপনাদের নমক খেয়েছি। আপনাদের সব বিষয়ে সাহায্য করা আমার ধর্ম।’

কিন্তু প্রতাপ তবু তাকে সঠিক ভাবে বুঝতে পারছে না, সে কি সত্যি তাদের লোক না মোগলদের হয়ে তাদের উপরে নজরদারি চালিয়ে যাচ্ছে?

প্রতাপ সেদিন শাহিনুর বেগমের কাছ থেকে অনেক রাত্রি করে ফিরেছিল। শঙ্কর তার জন্যে উৎকণ্ঠায় জেগে বসেছিল। যদিও সে জানত না প্রতাপের গন্তব্য বিষয়ে। ফিরে আসতে সে যেন প্রতাপের উপরে একটু বিরক্তিই দেখিয়েছিল। প্রতাপ তার কাছে কিছু লুকায়নি। সব শোনার পরে শঙ্কর বলেছিল, ‘রাজা, এই বিদেশ বিভুঁইয়ে তোমার এমন হঠকারী ভাবে কোথাও যাওয়া উচিত নয়।’

‘আমি হয়তো যেতাম না, কিন্তু আবু বকরের কথা আমি ফেলতে পারলাম না।’

শঙ্কর তখনই কোনও উত্তর দেয়নি। কিছুক্ষণ যেন সে ভেবেছিল। পরে বলেছিল, ‘রাজা, এই শাহিনুর বেগমের থেকে তুমি দূরে থাকলেই ভালো করবে। আমার বলা হয়তো ধৃষ্টতা হচ্ছে। তবে আমার থেকে বড়ো শুভাকাঙ্ক্ষী আর তোমার নেই। সেই অধিকারেই বলছি, তোমার প্রতি বৌঠানের বিশ্বাসের অমর্যাদা কোরো না।’

প্রতাপ আর কোনও কথা বলেনি সেদিন। ভোররাতে শুতে গিয়ে সে কিছুতেই ঘুমাতে পারেনি। সে যেন তার বুকের উপরে শরৎকুমারীর স্পর্শ অনুভব করছিল। মনে মনে ভেবেছিল, সত্যি কি সে শরৎকুমারীর প্রতি অবিশ্বাসী হবার কাজ করেছে! প্রতাপ বুকে হাত রেখে নিজের হৃদয়কে অনুভব করবার চেষ্টা করছিল। তার হৃদয় কি দ্বিধা বিভক্ত হয়েছে!

তারপরেই শাহিনুর বেগমের মুখটা তার মনে পড়ে। সে মুখের কী দুর্নিবার আকর্ষণ! সে তার নিকটে বসেছিল। গবাক্ষ পথে আগত বেহিসেবি হাওয়ায় অঢেল খোলা চুল উড়ছিল। কী সে স্বর্গীয় সুবাস! কী সেই আতর! কোন অন্ধ শিল্পী যেন তার সমগ্র হৃদয় নিংড়ে সেই আতর তৈরি করেছে! না কি তার সঙ্গে ওই অনুপম দেহবল্লরীর সুবাস, স্তনসন্ধির নিবিড় স্বেদের সঙ্গে মিশে গিয়ে ভেসে আসছিল হাওয়ায়! প্রতাপ এতটাই উদ্বেলিত হয়ে গিয়েছিল যে তা সম্যক অনুধাবন করতে পারেনি।

শয্যায় শুয়ে শুয়ে যখন সে অনুভব করেছিল ভোরের বাতাস আসছে ভেসে, তখন আবার যেন সেই হাওয়ার সঙ্গে সেই সম্মোহিত আতরের সুবাস পেয়েছিল। সেই সুবাসে ভাসতে ভাসতেই সে ঘুমিয়ে পড়েছিল।

প্রতাপ জানতে চেয়েছিল কে এই শাহিনুর?

কিন্তু আবু বকর কোনও উত্তর দেয়নি। শুধু তার রহস্যময় হাসিটা হেসেছিল।

সে দিনের পরে আরও দুদিন সে গিয়েছে শাহিনুরের কাছে। একা নয়। প্রতিবারই তার সঙ্গে ছিল আবু বকর।

কিন্তু প্রতাপের এই যাওয়াটা শঙ্কর বা সূর্য কেউই পছন্দ করল না।

সূর্যকান্তর মনেও ঘোর সন্দেহ আবু বকরের উপরে! কী করতে চাইছে সে! একদিন সে তাদের অনুসরণ করল নিজেকে গোপন রেখে। আগ্রায় এসে সূর্যকান্ত আর ক্ষৌরকর্ম করেনি। ফলে তার মুখ ভর্তি দাড়ি-গোঁফ। সে ভেবে দেখেছে এই ভাবে দাড়ি-গোঁফ রাখলে এখানে ছদ্মবেশ রাখতে খুব সুবিধা। সহজেই মানুষের ভিড়ে মিশে যেতে পারবে। অনুসরণ করে সেই নির্দিষ্ট গৃহের সামনে গিয়ে সূর্যকান্ত দেখল প্রতাপ ভিতরে ঢুকে গেলে আবু বকর বাইরে বেরিয়ে আসে। এসে সে আর একটা গলির ভিতরে ঢুকে পড়ে। সূর্য এবার আবু বকরকে অনুসরণ করে। এই গলি তস্য গলি পেরিয়ে তারা একটা ছোটো নিম্ন শ্রেণির বস্তিতে গিয়ে হাজির হয়। ছোটো ছোটো নোংরা অপরিচ্ছন্ন সব তাঁবুর মতো ঘর। ঘোড়া ও গবাদি পশুর বিষ্ঠা ছড়িয়ে আছে চারদিকে। রাস্তাও ভাঙা। সুরকি উঠে গিয়েছে। খোলা কসাইখানা। পচা মাংসের দুর্গন্ধ।

সূর্য অবাক হয়ে যায়। এই শ্রেণির বস্তিতে আবু বকরের মতো সম্ভ্রান্ত মানুষের কীসের প্রয়োজন? সূর্য একটি কসাইখানার দাওয়ায় বসে বসে এক খঞ্জ মানুষের সঙ্গে ভাব জমিয়ে ফেললে। এই তার এক আশ্চর্য ক্ষমতা। অনায়াসেই সে অপরিচিত মানুষদের সঙ্গে আত্মীয়তা জমিয়ে ফেলে।

মানুষটির মুখ ভর্তি দাড়ি গোঁফ। বয়স কত হবে, সূর্যর থেকে হয়তো সামান্য বেশিই। পনেরো বছর বয়স থেকে সে শাহজাদা সেলিমের নিজস্ব বাহিনীর সৈনিক ছিল। এক গুপ্ত আক্রমণ প্রতিহত করতে গিয়ে তার বাম পা জখম হয়েছে। কথা বলতে বলতে সূর্য তাকে কয়েকটি রুপিয়া দেয়। বলে, ‘আজ থেকে তুমি আমার দোস্ত। এই সেই দোস্তির নজরানা। তা তোমাদের এই মহল্লায় ওই ভদ্র-সভ্য তাজ মাথায় বৃদ্ধটিকে দেখলাম। কোথায় যেন দেখেছি তাকে এর আগে। তুমি চেনো নাকি?’

জুনাইদ, খ্যাঁক খ্যাঁক করে হাসল। হাসলে তাকে শেয়ালের মতো মনে হয়।

‘জানি না আবার! আমার মনিব, শাহজাদা সেলিমের খাস নোকর।’

‘তা সে এখানে এমন জায়গায় কেন আসে?’

সূর্য আরও একটা মুদ্রা তার হাতে দিল।

জুনাইদ আঙুল দেখিয়ে তাঁবুগুলোর দিকে নির্দেশ করে বলল, ‘ওরা তুর্কি ভবঘুরে। তবে কী জানো তো, তোমার কানে কানে বলি এস। বাতাসেরও তো কান আছে। কেউ জানে না আমি জানি।’ বলে সে একটা চোখ টিপল।

জুনাইদ ভণিতা করছে দেখে সূর্য কসাইকে লক্ষ করে বলল,

‘দোস্ত আমার এই জুনাইদ ভাইকে আমার তরফ থেকে গোস্ত দাওয়াত দাও তো দেখি।’

জুনাইদের মুখে আবার হাসি ফুটে উঠল। সূর্যের কানের কাছে মুখ নিয়ে এসে ফিস ফিস করে বলল, ‘ওরা নেশার ওষুধ তৈরি করে দেয়।’

তারপরে চোখ টিপে বলল, ‘যৌনবর্ধক নেশা। শরীরে তাকত আর জোশ আসে। তখন বিছানায় দু তিনটে জেনানার মহড়া নিতে পারে অনায়াসে। শাহজাদা সেলিমের তো অনেক কবুতর। ওই বুড়া আদমি শাহজাদাকে ওই ওষুধ সরবরাহ করে।’

জুনাইদ আবার খ্যাঁক খ্যাঁক করে হাসল।

সূর্যকান্ত ভাবছিল, আবু বকরের সঙ্গে যে শাহজাদা সেলিমের এত ভালো সম্পর্ক তা তো সে বলেনি কখনও! আবু বকরের প্রতি তার সন্দেহ আরও জোরালো হয়। নাহ, এই সংবাদটা প্রতাপ আর শঙ্করকে দিতে হবে।

প্রতাপ যেন একটা ঘোরের মধ্যে আছে এখন। ঘরে ফিরে এসে সে কেমন উদাস মনে বসে থাকে অলিন্দে।

শঙ্কর আর সূর্যকান্ত সন্দেহ করছে আবু বকর প্রতাপকেও নিশ্চয়ই নেশা করাচ্ছে! কিন্তু তাদের কাছে এখনও পরিষ্কার নয় ওই শাহিনুর বেগম কে? কেনই বা আবু বকর এমন করে প্রতাপকে তার সামনে এগিয়ে দিচ্ছে! তাদের স্থির বিশ্বাস এর পিছনে নিশ্চয়ই কোনও গভীর কারণ আছে।

তারা দুজনে গুটি গুটি পায়ে প্রতাপের কাছে গেল। মধ্য রাত্রি। এখান থেকে আকাশটাকে যেন কাছের মনে হচ্ছে। নক্ষত্রগুলিকে বুঝি হাত বাড়ালেই আকাশের কালো পোশাকের থেকে খুলে নেওয়া যাবে।

প্রতাপ তাদের উপস্থিতি প্রথমে খেয়াল করেনি। সে যেন কারোর ধ্যানে বুঁদ হয়ে আছে। শঙ্কর একবার গলার ভিতরে শব্দ করল।

প্রতাপ সেই শব্দে চমকে উঠে ঘাড় ফেরাল।

‘ও, তোরা! আয় বোস।’

ওরা দুজনে দুটি কুরসি টেনে নিয়ে এসে প্রতাপের মুখোমুখি বসে। তারার ম্লান আলো এসে পড়েছে প্রতাপের মুখের উপরে।

শঙ্কর বলল, ‘তুমি কি এখনও আবু বকরকে বিশ্বাস করছ?’

প্রতাপ শব্দহীন হাসল। অন্ধকারেও সেই হাসিটা লক্ষ করে তারা।

সূর্য বলল,

‘তুমি কি জানো আবু বকর শাহজাদা সেলিমের খাস নোকর?’

প্রতাপ সেই কথার সরাসরি উত্তর দিল না। ঘুরিয়ে বলল, ‘ওকে ধরেই সেলিমের কাছে আমাদের পৌঁছাতে হবে। আর ওই জেনানাও এক সময়ে সেলিমের কবুতর ছিল। এখন তাকে সেলিম ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে। কিন্তু তবু সে এখনও সেলিমের অনুগত। কিন্তু আমি বুঝতে পারছি না আবু বকর কেন আমাকে ওই জেনানার কাছে ঠেলে দিচ্ছে।’

শঙ্কর আর সূর্যকান্ত পরস্পরের মুখের দিকে তাকায়। তারা প্রতাপের সম্পর্কে যা ভেবেছে সেই নিয়ে মনে মনে লজ্জিত হল। আবার প্রতাপের জন্য গর্বও হল।

উৎসাহ নিয়ে শঙ্কর বলল, ‘আবু বকরের বিপথগামী শ্যালক খালদুনকে গত সাতদিন ধরে প্রায় হাজার মুদ্রা দিয়েছি। তোমার অনুমতি না নিয়েই। এবার সেই টঙ্কা কাজে দেবে।’

এই খালদুনকেই দিয়েই রাস্তা তৈরি করল প্রতাপ। কিন্তু আবু বকর এই বিষয়টা বার বার এড়িয়ে যেতে চাইছিল। সে বলেছিল, ‘জনাব, আপনি এত ব্যস্ত হচ্ছেন কেন? আমি যথাসময়ে আপনাকে কুমার সেলিমের কাছে নিয়ে যাব।’

কিন্তু শঙ্করদের এবার একটু মিথ্যার আশ্রয় নিতে হল। একদিন শঙ্কর উপযাচক হয়েই বকর সাহেবের গৃহে চলে গেল। মধুরভাষী শঙ্কর খুব সহজেই তার তৃতীয় পক্ষ ফরিদা বিবির সঙ্গে একটা কাল্পনিক সম্পর্ক পাতিয়ে ফেললে।

- আপনি তো হলেন আমার নিজের খালার মতো। আপনার জন্য যশোর থেকে উত্তম মসলিনের বস্ত্র এনেছি।

আগ্রা থেকে কেনা বস্ত্রকেই ঢাকার বস্ত্র বলে সে চালিয়ে দেয়।

ফরিদা বিবি নানাবিধ উপঢৌকন পেয়ে বরফের মতো গলে জল হয়ে গেল। সামনে বসিয়ে উত্তমরূপে আহার করাল।

কথায় কথায় শঙ্কর বলল, ‘খালা, আমাদের খালদুন কিন্তু খুব সরেস লেড়কা। কাজের ছেলেও। বকর চাচা যে কেন তাকে সহ্য করতে পারে না তা বুঝতে পারি না! তুমি তো জানোই, প্রতাপ এখান থেকে ফিরে গিয়েই যশোরের সিংহাসনে বসবে। প্রতাপের খুব মনে ধরেছে খালদুনকে। সে তো এক রকম ঠিকই করে রেখেছে, তাকে এখানে আলাদা করে একটা পদে বসাবে। চাচার তো বয়স হচ্ছে। সব কাজ তো আর সে দেখে উঠতে পারবে না। আলাদা করে খালদুনও কিছু দেখুক।’

‘ও, আল্লা, আমাদের খালদুনের তো নসিব ফিরে গেল।’

ফরিদা বিবি বাস্তবিকই খুশি হল। এই ভাইটিকে সে বোধহয় প্রাণাধিক ভালোবাসে।

‘কিন্তু, খালা তুমি আবার যেন আমাদের বকর চাচাকে এই কথা বোলো না। সে তা হলে দুঃখ পাবে। প্রতাপের উপরে ক্ষুব্ধ হবে।’

‘না না, বাছা, তোমরা চিন্তা কোরো না।’

তারপরে ঝাঁজিয়ে উঠে বলল, ‘হুঁ, রাগ করলেই হল! রাগ দেখিয়ে একবার দেখাক না ঝাঁটিয়ে বিষ ঝেড়ে দেব না, অমন মরদের!’

তারপরে আবার একটু শ্বাস নিয়ে বলল, ‘আমার বাছা খালদুনকে দুচক্ষে দেখতে পারে না ওই বুড়ো মিনসে।’

শঙ্কর মনে মনে হাসল। ফরিদা বিবির বয়স বেশি হয়নি। এখনও যৌবন ঢলঢল করছে। সেই গর্বেই হয়তো সে দজ্জাল হয়ে গেছে। মুখের ভাষায় তার কোনও লাগাম নেই। আবু বকরকে সে বুকে পা দিয়ে রেখেছে। কিন্তু আবু চাচাকে দাবিয়ে রাখা কি সহজ! মনে মনে ভাবল শঙ্কর।

কিন্তু আবু বকরের কাছে সে অন্য চাল চালল। বলল, ‘ফরিদা আপা খুব দুঃখ করছিল চাচা। বলছিল, তোমার চাচার বয়স হয়েছে, এখনও সন্ধ্যা, রাত্রি পর্যন্ত যে কোথায় কোথায় কাজ করে বেড়ায় জানি না। বড়ো ভাবনা হয়।’

আবু বকর তার দিকে খর চোখে তাকাল,

শঙ্কর আবার ইঙ্গিতপূর্ণ হেসে বলে, ‘আমি বললাম, কী এমন বয়স, এখনও যে কোনও জেনানাকে ঘায়েল করতে পারেন!’

কথাটা বলেই চোখের একটা ভঙ্গি করে হাসতে লাগল।

সেখানে প্রতাপ এসে গিয়েছে তখন। সে বলল, ‘বকর সাহেব কালই চলুন না কুমার সেলিমের সঙ্গে দেখা করে আসি।’

আবু বকর কিছু বলতে গেলেন, কিন্তু তাকে থামিয়ে দিয়ে প্রতাপ আবার বলল, ‘শাহিনুর বেগম আমাকে বলেছে, শাহজাদা সেলিম তার বিলাসগৃহে থাকবে।’

আবু বকর বুঝতে পারছে। এরা বড়ো কঠিন ঠাঁই। তা ছাড়া শঙ্করের ইঙ্গিতও ভালো নয়। সে যদি ফরিদার কাছে মুখ খোলে তা হলে, ফরিদা তাকে ঝাঁটা মারবে না, বরং তার বুকে ছুরি বসাতে পারে। সে জানে ফরিদার ক্রোধ।

শাহজাদা সেলিমের জন্য আলাদা করে প্রভূত উপহার নিয়ে এসেছিল প্রতাপ। সেই সমস্ত উপহারসম্ভার নিয়ে প্রতাপ আর শঙ্কর দুজনেই গেল কুমার সেলিমের সঙ্গে মোলাকাত করতে।

তারা প্রথমেই মোগল সম্রাটের প্রতি তাদের নিঃশর্ত আনুগত্যের কথা ব্যক্ত করে। বিভিন্ন বিষয়ে তারা মোগল শাসনের প্রশংসা করেতে থাকে। সেই সঙ্গে তাদের দেওয়া, রাজস্বের পরিমাণ কীভাবে বৃদ্ধি করা যায় সেই বিষয়ে তাদের পরিকল্পনার কথা ব্যক্ত করে।

এই দুই তরুণের বুদ্ধিমত্তা ও ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে গেলেন শাহজাদা সেলিম। তিনি আশ্বাস দিলেন ভবিষ্যতে প্রতাপকে তিনি সাহায্য করবেন।

ফিরে এসে প্রতাপ আর শঙ্করের সামনে একটা অন্ধকার রাস্তার উৎসমুখ খুলে যায়। শঙ্কর বলে, ‘রাজা, আমরা যে পরিমাণ রাজস্ব পাঠাতাম আর এখানে যা জমা পড়ছে তা কিন্তু সমান নয়। একটা চোখে পড়ার মতো পরিমাণ রাজস্ব এখানে জমা পড়ছে না।’

প্রতাপ বিস্মিত হয়ে বলল, ‘তুই সঠিক হিসাব করেছিস তো?’

‘করেছি রাজা। কিন্তু এখন প্রশ্ন হচ্ছে সেই অর্থ কে সরিয়ে নিচ্ছে?’

‘আবু বকর?’

‘তা ছাড়া আর কে হতে পারে! সেই সম্ভাবনাই বেশি। তবে আমাদের আরও বাজিয়ে দেখতে হবে।’

সেই সময়ে সেখানে এসে হাজির হয় সূর্যকান্ত। সূর্যকান্ত সব শুনে বলে, ‘আমি জুনাইদ বলে এক খঞ্জকে লাগিয়ে দিয়েছি আবু বকরের পিছনে।’

আরও কয়েকদিন কেটে গেল আবু বকরের পিছনে হন্যে হয়ে ঘুরে ঘুরে। শঙ্কর আর সূর্যকান্ত আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে। প্রতাপও বসে থাকল না। সেই শাহিনুর বেগমের সঙ্গে তার প্রেমের অভিনয় চালিয়ে গেল। কারণ তাদের আরও কয়েকদিন অপেক্ষা করতে হবে। যশোর থেকে রাজস্বের অর্থ আসতে আরও কয়েকদিন বাকি। সেই সঙ্গে প্রতাপ শাহজাদা সেলিমের সঙ্গে তার দোস্তি বাড়িয়ে ফেলেছে। সেলিম যত প্রতাপকে দেখছে তত সে মুগ্ধ হচ্ছে। সেই সুযোগকে কাজে লাগায় প্রতাপ। সে ক্রমাগত আবু বকরের বিরুদ্ধে সেলিমের কান ভারী করতে থাকে।

- সত্যি তো, জাঁহাপনা আপনার উপরে গুপ্ত হামলা হয় কীভাবে!

সেলিম প্রথমে সেই কথায় আমল দেয়নি।

- না না, আবু বকর আমার অনেক পুরানো নোকর।

প্রতাপ তখন সেই কথাই মেনে নেয়। এমন ভাব দেখায় যেন সেলিমের কোনও কথার অমর্যাদা সে করে না।

কিন্তু আবার এক দুদিন পরে সে সেই কথা ব্যক্ত করে। বার বার ঘর্ষণে ভোঁতা ছুরিতে একদিন যেমন তীক্ষ্ণতা ফিরে আসে, তেমনি প্রতাপ একদিন বুঝতে পারে এই কথা এবার বিশ্বাস করতে শুরু করেছে সেলিম। এদিকে শঙ্কর একদিন আবু বকরকে বলে, ‘প্রতাপ বলছিল, শাহজাদা সেলিম নাকি আপনার প্রতি সন্দেহ পোষণ করছে।’

আবু বকর তীব্র চোখে তার দিকে তাকায়।

শঙ্কর মনে মনে ভাবে তির সঠিক জায়গায় বিদ্ধ করেছে।

আবু বকর কোনও কথা বলল না। বিষণ্ণ ভাবে মাথা নাড়ল একবার। কিন্তু তার ঠোঁটের কোণে প্রচ্ছন্নভাবে একটা হাসি খেলে গেল।

- এত বছর ধরে এই কাজ করে আসছি। আমাকে ধরা কি এতই সহজ!

শঙ্করও মনে মনে যেন বলল, তোমাকে তো ধরতে চাই না! যুদ্ধ জয় করতে গেলে সৈনিকদের তো মরতেই হবে।

বাইরে উত্তাল বাতাস। প্রখর রৌদ্রের পরে সন্ধ্যা নামার পরেই আকাশ মেঘে ছেয়ে গিয়েছে। সেই মেঘের ডানা ধরে নেমে এল প্রবল বৃষ্টি। শাহিনুর বেগম, গবাক্ষের কপাট বন্ধ করে দিয়ে এসে ফরাসের উপরে বসল। আজ সে সন্ধ্যার পরে প্রসাধন করেনি। কারণ আজ প্রতাপের আসার কথা ছিল না।

প্রতাপের সামনে বসে সে অলস হাতে তার আলগোছে বাঁধা কবরী বন্ধন খুলে দেয়। প্রপাতের মতো কালো মেঘ যেন নেমে এল তার কাঁধ বেয়ে, স্তন বেয়ে, ঢেকে দেয় জানু-দেশ। বিকালেই সে স্নান করেছে। সারা ঘরে উদাসী এক সুবাস ছড়িয়ে পড়ে।

প্রতাপ এক দীর্ঘ শ্বাস নিয়ে তার কোলের কাছে ঝুঁকে পড়ে সেই মেঘের রাশির মধ্যে মুখ ডুবিয়ে দেয়।

সেখানে মুখ গুঁজেই মাদকীয় গলায় সে গুনগুন করে বলে, ‘আজ আমি মাতাল হব নুর। আমাকে তুমি বাধা দিও না!’

শাহিনুর প্রতাপের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। উদাস গলায় গুনগুন করে একটা বিরহের চৌপাই হাওয়ায় ভাসিয়ে দেয়।

প্রতাপ মুখ তুলে পানপাত্রে ভরে রাখা সুরা শাহিনুরের মুখের কাছে তুলে ধরে।

তেমনই মাদকীয় গলায় বলে, ‘আর..আর...না কোরো না নুর। চলো দুজনে মাতাল হয়ে যাই। মেঘ ডাকছে। আকাশ ডাকছে আমাদের। সব জানালা খুলে দাও। ঝালর উড়তে থাকুক পাগলের মতো।’

শাহিনুর এক চুমুকে পাত্র শেষ করে উঠে দাঁড়াতে যায়। তার সারা শরীর যেন পালকের মতো হালকা হয়ে যাচ্ছে। একটু যেন টলমল তার শরীর!

প্রতাপ প্রেম ভরা চোখে তার বস্ত্রাঞ্চল ধরে টান দেয়। শাহিনুর খিল খিল করে হেসে ওঠে। তারপরে খুশিতে যেন গোল করে ঘুরতে থাকে। পাকে পাকে তার বস্ত্র উন্মোচিত হয়ে প্রতাপের হাতে চলে আসে। মুক্ত, বাধাবন্ধহীন কালো চুল যেন তাকে কেন্দ্র করে ঘুরতে ঘুরতে এক আশ্চর্য শামিয়ানা রচনা করে। পায়ের মঞ্জীর বেজে ওঠে, ঝমঝম। সে যেন পাগল হয়ে গিয়েছে। তার পায়ের টোকায় ভরা একটি পানপাত্র ফরাসের উপরে উল্টে পড়ে ঢেলে দেয় রক্তিম সিরাজি। সেই লাল রঙের দিকে তাকিয়ে যেন শাহিনুর ঝমঝম করে হেসে ওঠে। কিন্তু সে হাসির ভিতরে ব্যথা। তার সারা শরীরের অলংকার সেই হাসির সঙ্গে যেন কেঁদে ওঠে। নেশাতুর গলায় সে বলে, ‘প্রতাপ তুমি জানো না! আমার বুকের ভিতরে কত ব্যথা। আহঃ আমার বুক জ্বলে যাচ্ছে।’

কথা বলতে বলতেই সে ফরাসের উপরে ঢলে পড়ে যায়।

প্রতাপ বুকে হেঁটে তার কাছে গিয়ে তার মুখের কাছে মুখ নিয়ে যায়। শাহিনুরের চোখের পাতা যেন পাথরের মতো ভারী। সে প্রাণপণ চেষ্টা করে চোখে খুলে রাখার। সে একবার প্রিয়তমের মুখটা দেখতে চায় কি? কিন্তু সে পারে না। তার চোখের কোণ দিয়ে জলের ধারা গড়িয়ে পড়ে। তার ঠোঁট দুটি কেঁপে ওঠে। কী বলতে চায় সে?

প্রতাপ তার ঠোঁট বিপুল আশ্লেষে একবার নিয়ে যেতে চায় তার ঠোঁটের কাছে। পানীয়ে মেশানো বিষে শাহিনুরের ঠোঁট এখন বিষাক্ত। প্রতাপ তাই বিপুল আবেগে দুই হাতে তাকে বুকের সঙ্গে পিষে দিতে দিতে কপালে চুম্বন করে। চুম্বন করতেই থাকে। একসময়ে প্রতাপের আলিঙ্গনে শাহিনুরের শরীরটা থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে থেমে যায়।

চিরকালের জন্য থেমে যায়।

প্রতাপের চোখ দিয়েও এক ফোঁটা জল গড়িয়ে নামে।

কিছুক্ষণ সে সেখানেই তেমনি করে বসে থাকে। তারপরে বড়ো মায়ায় তার শরীরটা ঢেকে দেয়। তাকে শঙ্করের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।

ঠিক সেই সময়ে সেই নোংরা বস্তির এক রাস্তায় অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে জুনাইদ। তার মাথায় কালো কাপড়ের পাগ বৃষ্টির জলে ভিজে ঝুপসু হয়ে আছে। তার সারা গা বেয়েও নামছে জলের ধারা। রাস্তায় কোনও আলো নেই। মাঝে মাঝে বিদ্যুতের আলো ঝলকে উঠলে সেই আলোকে সামনের পথটা দেখে নিচ্ছে সে। সহসা শিস দেবার মতো করে একটা শব্দ বৃষ্টির শব্দ ছাপিয়ে তার কানে আসে। সে সচকিত হয়। তার পরেই কানের কাছে ফিস ফিস করে এক কণ্ঠস্বর শোনে সে।

সূর্যকান্ত বাতাসের মতো মৃদু আবেশে বলল, ‘সব ঠিক আছে দোস্ত?’

- জনাব! খবর সহি আছে। চাচা এক খুনির কাছে এসেছে।

সূর্যর পেশি শক্ত হয়ে যায়। সংবাদ তাহলে সঠিক তার কাছে। খালদুনের পেট থেকে সে কথা বার করে ফেলেছে। প্রতাপকে বিপথে ঠেলে দেবার চক্রান্তকারী আবু বকর একা নয়। যশোর থেকেই সেই নির্দেশ তার কাছে এসেছিল। কিন্তু সেই নির্দেশকারী কে? সেটা তারা এখনও সঠিক বুঝে উঠতে পারেনি। বিক্রমাদিত্য না বসন্ত রায়!

নিজের ভাবনায় সে যেন কিছুটা অন্যমনা হয়ে গিয়েছিল। সহসা, জুনাইদের মৃদু স্পর্শে সে সজাগ হয়ে ওঠে। সে লক্ষ করে একটি ছায়ামূর্তি এগিয়ে আসছে সামনে। তখনই বিজলি ঝলকে উঠল আর চোখের নিমেষে বিদ্যুতের ফুলকির মতো একটি তীক্ষ্ণ ছোরা সামনের ছায়ামূর্তির বুকে গিয়ে বিদ্ধ হয়েছে। মানুষটির আর্তনাদ বজ্রনির্ঘোষের আড়ালে চাপা পড়ে গেল।

সূর্যকান্ত হাত দিয়ে জুনাইদের হাত স্পর্শ করে ইশারা করল। তারপরে তার কানের কাছে মুখ নিয়ে এসে বলল, ‘শত্রুর শেষ রাখতে নেই। ওই খুনিকেও শেষ করে দিই চলো দোস্ত।’

তারপরে তারা গুঁড়ি মেরে সামনের বস্তির ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। চারপাশে নিকষ অন্ধকার। হাওয়ার দামাল গর্জনের সঙ্গে বৃষ্টির শব্দ মিশে এক ভয়ের শব্দ সৃষ্টি করেছে যেন। সূর্যকান্ত তাকে কিছু ইশারা করতে জুনাইদ সেই দরজায় একবার ধাক্কা দিল। কিন্তু ভিতর থেকে কোনও সাড়া এল না। এবার জুনাইদ আবার অদ্ভুত ভঙ্গি করে দরজায় ধাক্কা দিল। এই কয়েকদিন আবু বকরকে অনুসরণ করে আবু বকরের দরজায় ধাক্কা দেওয়ার ভঙ্গি রপ্ত করে নিয়েছে জুনাইদ। এবার দরজাটা একটু ফাঁক হল। সেই ফাঁকটুকুই যথেষ্ট। সেই ফাঁক দিয়েই এক তীব্র বিষাক্ত শলাকা ঘরের ভিতরের মানুষটির কণ্ঠে বিদ্ধ হয়ে গিয়েছে।

এবার মৃতদেহ দুটিকে লুকিয়ে ফেলার কাজ। আবু বকরের মৃতদেহটিও সূর্যকান্ত সেই ঘরের মধ্যে বয়ে নিয়ে আসে। তার পরে দরজা বন্ধ করে। একটা মৃদু চর্বির লণ্ঠন জ্বালিয়ে তারা মৃতদেহ দুটিকে নগ্ন করে। তারপরে সেই দেহ দুটিকে তারা টুকরো টুকরো করে কসাইয়ের ছুরিকা দিয়ে। ততক্ষণে ঝড় থেমে গিয়েছে। কিন্তু বৃষ্টি পড়ছে মৃদুমন্দ ভঙ্গিতে।

তারা সেই টুকরো টুকরো দেহাবশেষকে কসাইখানার পিছনে যেখানে গোরু মহিষের দেহাবশেষ ফেলা হয় সেই পূতিগন্ধময় আবর্জনার মধ্যে চাপা দিয়ে আসে।

এদিকে শঙ্কর আর প্রতাপ মিলে শাহিনুরের দেহকেও তারই গৃহের একটি কক্ষে মাটি খুঁড়ে দাফন করে দেয়।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%