মনোযোগ

অবিন সেন

প্রতাপের জীবন যে শিকার, হুল্লোড়, খেলাধুলা প্রভৃতি গতানুগতিক ভঙ্গিতে প্রবাহিত হচ্ছিল সেই প্রবাহের হঠাৎ যেন দিকবদল হল। এই আশ্চর্য পরিবর্তনের জন্য সে হয়তো মনে মনে প্রস্তুত ছিল না। এতদিন সে নারীশরীরকে ক্রীড়ার বস্তু ভেবে এসেছে। সেই বিষয়ে তার যা ছিল তা কেবল ক্রীড়া-সুখ। কিন্তু শরৎকুমারীর ভালোবাসার সোনার কাঠি, রূপোর কাঠিতে সে যেন শিহরিত হয়ে উঠল। অনাবিল সুখের এক স্রোতধারায় সে যেন ভেসে গেল। এই সুখের সঙ্গে তার আগে কখনও পরিচয় ঘটেনি। কিছুদিন তাই সে এমনি করে ভেসে গেল সুখ সাগরে। কিন্তু ছোটো থেকেই সে বাইরে বাইরে বন্ধুদের সঙ্গে হুল্লোড়, শিকার ইত্যাদি করে বেড়িয়েছে। জমিদারির বিষয়-আশয়ের ব্যাপারে সে মাথা ঘামায়নি।

শরৎকুমারীর বিচক্ষণতায় এই বিষয়ে তার প্রভূত পরিবর্তন ঘটল। তার প্রকৃতির শান্ত একটি দিক যেটি এতদিন উদ্দামতার আড়ালে চাপা পড়ে ছিল, সেটি এবার যেন মুখ তুলে প্রকাশিত হল। ফলে এই নবলব্ধ শান্তিকে উদযাপন করার জন্য তার মন একটি শান্ত পরিবেশ চাইছে। জমিদার বাড়িতে এই লোক-লশকর হট্টগোলের ভিতরে সে হাঁপিয়ে উঠছিল। তাই তার শত আবদারের প্রশ্রয়দাতা চন্দ্রলেখাকে একদিন বলল, ‘খুড়িমা, আমরা বরং কয়েক দিন ধূমঘাটে কাটিয়ে আসি। এখানে হট্টগোলে ভালো লাগছে না।’

সন্ধ্যাবেলা, নিজের ঘরে তখন কেশ প্রসাধন করছিল চন্দ্রলেখা। এক পরিচারিকা পায়ের কাছে বসে অলক্তক রাগে রাঙিয়ে দিচ্ছে পা। প্রদীপের আলোয় আয়নার প্রতিফলনে প্রতাপকে ঘরে প্রবেশ করতে দেখে চন্দ্রলেখার মুখে হাসি ফুটে উঠল। বিবাহের পরে কয়েক দিন সে খুড়িমার ঘরে আসেনি। না হলে বাড়িতে থাকলে সন্ধ্যাবেলা সে একবার খুড়িমাকে দেখা দিয়ে যায়। প্রতাপ না এলেও এই কয়েক দিনে শরৎকুমারী তার খুব অনুগত হয়ে গিয়েছে।

প্রতাপের কথা শুনে চন্দ্রলেখার মুখে হাসি আরও প্রসারিত হল।

‘বাবুর এত দিন পরে খুড়িমার কাছে আসার সময় হল!’

চন্দ্রলেখা মুখ ফেরায় না। আয়নার ভিতর দিয়েই সে প্রতাপের মুখে লজ্জা-ভাব লক্ষ করে। প্রতাপ উত্তর দিল না। সে তেমনি মুখ করে দাঁড়িয়ে থাকল। চন্দ্রলেখা বুঝতে পারছে, প্রতাপ আর শরৎকুমারী এখন একটু নিরিবিলি চাইছে।

সে মুখ ঘুরিয়ে প্রতাপের মুখের দিকে তাকায়। তার সারা মুখে যেন রসিকতার এক হাসি উপচে পড়ছে। নির্মল হাসিতে সে বলল, ‘আমি জানি বাবা, তোমাদের এখন আর আমাদেরকে ভালো লাগছে না। শরতও মুখ শুকিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমি তাই তোমার তাতকে বলেছি।’

প্রতাপের মুখে থই থই খুশি দেখে চন্দ্রলেখা আবার বলল, ‘তবে, আগামীকাল যাওয়া হচ্ছে না। লক্ষ্মণ পণ্ডিত বলেছেন আগামী পরশু শুভ দিন। সেই দিন যেও। আমরা সব ব্যবস্থা করে রেখেছি।’

চন্দ্রলেখা এগিয়ে এসে প্রতাপের আনত চিবুক ধরে একবার আদরে নাড়া দিল।

‘আর একটা দিন কষ্ট করে আমাদের সহ্য করো!’

সে খিল খিল করে হেসে উঠল।

সেই সময়ে ঘরে ঢুকছিল শরৎ। চন্দ্রলেখার হাসির লহর শুনে আর প্রতাপকে দেখতে পেয়ে লজ্জায় দৌড়ে পালিয়ে গেল।

চন্দ্রলেখা তার কাপড়ের আঁচল দেখতে পেয়েছিল। সে হাঁক দিল,

‘এই মেয়ে পালাচ্ছিস কোথায়! দাঁড়া বলছি।’

কিন্তু সেই কথা সে শুনলে তো!

প্রায় এক পক্ষকাল তারা ধূমঘাটে অতিবাহিত করল। এই সময়ের অবসরে আর নির্জনতায় তারা পরস্পরকে জানল। বুঝল। আর ভালোবাসায় ভেসে গেল। রোজ বিকালের পরে তারা কাছের একটি শীর্ণ নদীর ধারে চলে যায়। একটি ঝোপঝাড় অরণ্যের ভিতর দিয়ে সেই নদীর শীর্ণ ধারা যেন অবহেলায় পড়ে আছে। শরৎকুমারী বাগিচার পরিচারককে কাজে লাগিয়ে সেই নদীর তীরবর্তী একটি নির্জন স্থান উত্তমরূপে পরিচর্যা করিয়েছে। এ যেন তার একান্ত নিজস্ব প্রেমের কুঞ্জ। প্রতাপকে যখন সেই কুঞ্জে নিয়ে গেল তখন তো সে বিস্ময়ে হতবাক। সেও যেন শরৎকুমারীর প্রেমের ছোঁয়ায় নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করছে।

পক্ষকাল পরে তারা যখন আবার যশোরে ফিরে এল, তখন সবাই লক্ষ করল, প্রতাপ যেন অন্য মানুষ হয়ে গিয়েছে।

এবার সে খুল্লতাত ও পিতার সঙ্গে প্রশাসনিক কাজ শিখতে শুরু করল। মেধাবী প্রতাপ খুব কম সময়েই সেই কাজে তার ব্যুৎপত্তি প্রকাশ করল। এই দেখে বসন্ত রায় তাকে ধূমঘাট, চ্যান্ডিক্যান প্রভৃতি মোহানা ও পদ্মা অববাহিকার সংলগ্ন স্থানের রাজস্ব আদায় ও প্রশাসনিক কাজের দেখাশুনার দায়িত্ব দিল। ফলে আবার প্রতাপ স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে ধূমঘাটে ফিরে গেল। তবে এবার সে একা সেখানে গেল না, সঙ্গে নিয়ে গেল শঙ্কর, সূর্যকান্ত, কার্লোস, কামাল ও আরও কয়েক জন বিশ্বস্ত বন্ধু ও সঙ্গীকে।

প্রতাপের মধ্যে একজন উপযুক্ত শাসককে দেখে সবাই খুশি হয়। সে যখন দীনদরিদ্র প্রজাদের দুঃখের কথা শ্রবণ করে তখন মনে হয় তার মতো দয়ালু শাসক বুঝি আর নেই। কিন্তু এ মাত্র প্রথম কয়েক মাস। তার পরে আস্তে আস্তে তার ভিতর থেকে এক আগ্রাসী শাসক মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। ছোটোবেলা থেকে যে সুপ্ত বাসনা তার মনের ভিতরে বাসা বেঁধে ছিল সেই উচ্চাকাঙ্ক্ষা আবার মাথা তুলতে শুরু করল। এই খালবিলের রাজত্ব ছেড়ে অবিভক্ত বাংলার স্বাধীন শাসক হয়ে উঠতে হবে তাকে। ফলে এখান থেকেই সে মাটি প্রস্তুত করতে শুরু করল। ধূমঘাট অঞ্চলের রাজস্বব্যবস্থাকে সে নিজের মতো করে সাজাতে শুরু করল। এই সময়েই মাঝে মাঝে তার ভিতরের নিষ্ঠুর দিকটা প্রকট হয়ে পড়তে লাগল। প্রতাপ অনাদায়ি কর আদায়ের জন্য নিষ্ঠুরতায় কোনোরূপ কার্পণ্য করে না। এই বিষয়ে তার ডান হাত ছিল কামাল খাঁ। একবার এক বিধবা কর দিতে না পারায় প্রতাপ তার স্তন কর্তন করার নির্দেশ দেয়। সেই বিধবা কেঁদে-কেটে এসে প্রতাপের পায়ে পড়লে সেই খবর কোনও ভাবে শরৎকুমারীর কানে যায়। শেষে শরৎকুমারীর হস্তক্ষেপেই সেই বিধবা মুক্তি পায়। প্রতাপ বাইরে নিষ্ঠুরতা দেখালেও শরৎকুমারীর কথার কোনওরূপ অমান্য করে না। বরং নিজের প্রিয়তমা পত্নীর সুখ আহ্লাদের বিষয়ে তাঁর সদা সতর্ক দৃষ্টি থাকে। কিন্তু এই নিষ্ঠুরতার খবর গোপন থাকল না। ধূমঘাটের সামান্য চৌহদ্দি পেরিয়ে সেই সংবাদ যশোরেও ছড়িয়ে পড়ল। রাজা বিক্রমাদিত্যের কানে এই সংবাদ পৌঁছালে তিনি ক্রোধে আগুন হয়ে গেলেন।

সত্যিই এতদিন ধরে তিলে তিলে তিনি যে তাঁর প্রজাবৎসল সুনাম অর্জন করছেন, যে গুণীর কদরকারী, ব্রাহ্মণদের সম্মানকারী, দানবীর মূর্তিটি প্রতিভাত হয়েছে প্রজাদের কাছে সেই সুনাম কি ধুলায় লুটাবে এবার? তাঁর মতো শান্ত মানুষও এই অন্যায়ে হুংকার দিয়ে উঠলেন। সেই ধার্মিক ভূস্বামীর পুত্র হয়ে প্রতাপের এই অনাচার?

যদিও জমিদারি শাসনের অনেকটা ভার এখন তিনি বসন্তকেই দিয়ে দিয়েছেন। নিজে ধর্ম-কর্ম নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। তার উপরে তিনি তরুণী দ্বিতীয় পত্নীর প্রতি অনুগত হয়ে পড়েছেন অধিক। তবু প্রতাপের এই অনৈতিক কাজে তিনি ধৈর্যচ্যুত হলেন।

কনিষ্ঠ ভ্রাতা বসন্ত রায়কে ডেকে পাঠালেন একদিন।

‘দাদা, আমায় ডেকে পাঠিয়েছ?’

‘প্রতাপের কার্যকলাপ নিশ্চয়ই তোমার অগোচরে নেই!’

‘দাদা, তুমি কী বিষয়ে বলছ বুঝতে পারছি না! প্রতাপ তো এখন খুব ভালো কাজ করছে। রাজকার্যে তার মন বসেছে। রাজস্ব আদায়ে তার নজর তীক্ষ্ণ। আগে যে অঞ্চল থেকে, আমি বলতে চাইছি গঙ্গা-পদ্মার মোহানা অঞ্চল থেকে আমাদের রাজস্ব একেবারেই আদায় হত না, সেই অঞ্চল থেকেও এখন ভালো রাজস্ব আদায় হচ্ছে। সে সবই প্রতাপের নতুন নতুন পরিকল্পনার ফল।’

বসন্ত রায় এমনি করে তার প্রিয় প্রতাপের বিষয়ে প্রশংসা করে ভরিয়ে তুললেন।

কিন্তু বিক্রমাদিত্য খুশি হবার বদলে বরং বিরক্তই হলেন। পুত্রের কৃতকার্যের ফলে পিতার আনন্দিত হবার কথা। অথচ পুত্রের প্রতি বিরাগ তাঁকে বিরক্তই করে তুলল। তিনি যেন মনে মনে প্রতাপকে তাঁর নিজের প্রতিভূ হিসাবেই গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তার বদলে প্রতাপ হয়ে দাঁড়াল বেপরোয়া, উচ্ছৃঙ্খল। তিনি নিজেও যৌবনকালে কম ধুরন্ধর ছিলেন না। কিন্তু তাঁর আচরণে, কাজে সর্বদাই একটা আভিজাত্য, একটা প্রজাবাৎসল্যের ছাপ ছিল। কিন্তু প্রতাপের মধ্যে সেই কোমলতার ছিটেফোঁটাও নেই। তার আচরণ রাজার মতোই। কিন্তু সে রাজা যেন অরণ্যের রাজা।

বিরক্ত মুখ করে তিনি বললেন, কতকটা তিরস্কারের ভঙ্গি করেই যেন বললেন, ‘তুমি কি কিছুই সংবাদ রাখো না! নাকি প্রতাপের বিষয়ে একটি কান তুমি বন্ধ করে রাখো! প্রতাপ যে প্রজাদের সঙ্গে অনাচার করে চলেছে সে সংবাদ তুমি জানো না বলতে চাও?’

বসন্ত রায় মাথা নত করে অগ্রজের এই তিরস্কার সহ্য করলেন। তারপরে শান্ত হয়ে বললেন, ‘শুনেছি সামান্য। তবে কানে দেবার প্রয়োজন মনে করিনি। কারণ সে রাজ্যের ভালোর জন্য, রাজস্ব বৃদ্ধির জন্য কিছু কাজ অতি উৎসাহে করে ফেলেছে। তার বয়স অল্প। আর একটু অভিজ্ঞতা বাড়লে সে আর এমন কাজ করবে না। তা ছাড়া বউমা আছে। সে বড়ো বিদুষী মেয়ে। সে ঠিক প্রতাপকে সঠিক পথে চালিত করবে।’

‘না না বসন্ত তুমি স্নেহে অন্ধ হয়ে এই কথা বলছ। আস্তে আস্তে আবার তার মাথায় বিপথগামিতার নেশা চেপে বসেছে। এখনই তার এই অভ্যাসে অর্গল দিতে হবে।’

‘মাফ করো দাদা। আমার মনে হয় তুমি বড়ো বেশি চিন্তা করছ।’

‘বেশি চিন্তা? লক্ষ্মণ ঠাকুরের গণনা তুমি ভুলে যেতে পারো। আমি পারি না। আমি বেঁচে থাকতে আমার রাজ্যে কখনও আত্মীয়বিবাদ মাথা তুলতে দেব না।’

ভ্রাতা বসন্ত যেন এবার একটু বিরক্ত হলেন।

‘তুমি কী করতে চাইছ দাদা?’

‘তুমি আজই প্রতাপকে যশোরে চলে আসতে সনদ পাঠাও। সে যেন সংবাদ পেয়েই এখানে চলে আসে। আর তার সব সঙ্গীরাও।’

‘কিন্তু কেন দাদা?’

আমি প্রতাপকে এখান থেকে দূরে পাঠাব।

বসন্ত রায় যেন আঁতকে উঠলেন।

‘এ কী বলছ দাদা? অবশেষে তুমি প্রতাপকে নির্বাসনে পাঠাবে?’

‘না, নির্বাসন কেন বলছ। আগ্রায় আমাদের যে কর্মচারী আছে, তার পরিবর্তে আমি প্রতাপকে সেখানে পাঠাব। সে সেখানে মোগল বাদশাহের দরবারে বিষয়-আশয় পরিচালনায় আরও জ্ঞান লাভ করবে। রাজ্যশাসন সম্পর্কে আরও অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করবে। সেই সঙ্গে মোগল বাদশাহের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক আরও নিবিড় হবে।’

প্রস্তাব মন্দ নয় মোটেই। তবু বসন্ত রায় যেন নিমরাজি হন।

‘প্রতাপের বয়স কি এখনও এই কাজের উপযুক্ত পরিণত হয়েছে? তা ছাড়া এতটা দূরে তাকে পাঠানো! সদ্য বিবাহ হয়েছে তার। দাদা তুমি বরং আর একবার বিবেচনা করে দেখো।’

‘দেখো বসন্ত, নববধূ, সেই সঙ্গে আত্মীয় পরিজনদের থেকে দূরে গিয়ে আশা করি তার মনোভাবে কিছুটা কোমলতা আসবে। আমি চাই সে আরও কোমল হৃদয়ের অধিকারী হোক।’

অরাজি হয়েও যেন বসন্তকে রাজি হতে হয়। বার বার শরৎকুমারীর মুখটা তার মনে পড়ল। ওই মেয়েটা কি অপরাধ করল! তার ভাগ্যে এমন সাজা কেন?

বসন্ত রায় দূত প্রেরণ করলেন।

প্রতাপ হন্তদন্ত হয়ে ফিরে এল। তবে সে একাই এসেছে। খুল্লতাতের কাছে গিয়ে বলল, ‘কী হল তাত, এত জরুরি তলব? কিছু কি ঘটেছে?’

বসন্ত রায় মৃদু হাসার চেষ্টা করলেন। কিন্তু সে হাসি যেন ঠিক ফুটে উঠল না তাঁর মুখে। কৃত্রিম একটা হাসির চিত্র যেন শুধু লগ্ন হয়ে থাকল।

প্রতাপ যেন সেই হাসিটা লক্ষ করে।

বসন্ত রায় নিজের গলাটা পরিষ্কার করে বললেন, ‘দাদা তোমার জন্য খুব ভালো একটা প্রস্তাব দিয়েছেন। যাতে তুমি খুব ভালো করে রাজকার্য পরিচালনা বিষয়ে শিখতে পারো।’

প্রতাপ কিছু বলল না, শুধু জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে থাকল। তবে তার মুখের উপরে কালো একটি ছায়ার স্তর পড়ল। মনে মনে সে কিছু আশঙ্কা করল।

‘দাদা, তোমাকে আগ্রায় মোগল দরবারে আমাদের প্রদেশ প্রতিনিধি হিসাবে পাঠাচ্ছেন। এর ফলে রাজ্যশাসনের কায়দা কানুন শিখবে। সেই সঙ্গে মোগলদের সঙ্গে তোমার বন্ধুত্ব হয়ে যাবে।’

প্রস্তাবটা যে খারাপ নয় সেটা প্রতাপও বুঝতে পারে। সে নিজেও জানে সমগ্র বঙ্গের রাজা হতে গেলে তাকে রাজ্য পরিচালনার আরও অনেক খুঁটিনাটি কূটনীতি শিখতে হবে। আবার আর একটি বিষয়ও তার মাথায় খেলে যায়, এমনি করে পিতা তাকে নির্বাসন দিতে চাইছেন না তো!

সন্দেহের চোখে প্রতাপ জিজ্ঞাসা করে, ‘শুধু কি এই কারণ? না অন্য কোনও গভীর কারণ আছে?’

বসন্ত রায় আবার মুখে মেকি হাসিটা ঝুলিয়ে বললেন, ‘না না, আর কোনও কারণ নেই। আমাকে তুমি বিশ্বাস করো না?’

‘তোমাকেই তো এতদিন বিশ্বাস করে এসেছি তাত।’

তবু প্রতাপ এককথায় রাজি হতে পারে না। শরৎকুমারীকে ছেড়ে সে কী করে থাকবে? কিন্তু খুল্লতাতকে সে এই কথা মন খুলে বলতে পারছে না। তা ছাড়া মুখ দেখেই সে বুঝেছে তাত মানবেন না আর। তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েই নিয়েছেন। তাই সে তার অন্তিম ভরসার স্থল খুড়িমার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।

চন্দ্রলেখা ঘরেই শুয়ে ছিল। এবারে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে তার শরীর যেন বড়ো বেশি পরিশ্রান্ত হয়ে গিয়েছে। এর আগে তিনটি সন্তানের জন্ম দিয়েছে সে। কিন্তু কনিষ্ঠটির জন্মের পরে সে অনেক দিন অসুখে ভুগেছিল। সেই ধকল যেন তার শরীর আর কাটিয়ে উঠতে পারেনি। এবারে সে একেবারেই শয্যা নিয়েছে প্রায়।

খুড়িমাকে দেখে প্রতাপ বড়ো বিস্মিত হয়ে গেল। সে মাত্র কয়েক মাস ধূমঘাটে গিয়েছে। এরই মধ্যে কী চেহারা হয়েছে! অমন সুন্দর চোখের নীচে কালি। চোখ যেন কোটরগত হয়ে গিয়েছে। কণ্ঠার হাড় ঠেলে বেরিয়ে আসছে। দৃষ্টির গভীরে যেন সেই প্রাণ নেই। প্রতাপকে দেখে সেই চোখে ঈষৎ আলো জ্বলে উঠল। ম্লান গলায় সে বলল, ‘আয়, বোস আমার পাশে।’

প্রতাপ গিয়ে চন্দ্রলেখার শয্যার একপাশে বসল। তার চোখ দিয়ে যে জল বেরিয়ে আসছে।

‘কী হয়েছে তোমার খুড়িমা?’

আবার তার চোখে হাসির আলোটা ফিরে আসে। তবে তা ম্লান।

প্রতাপ খুড়িমার শরীরের দিকে ভালো করে তাকায়। সে বুঝতে পারে। তবে এখনও চন্দ্রলেখার শরীরে মাতৃত্বের চিহ্ন শীর্ণ শরীরের স্থূল উদরে যেন ততটা প্রকট হয়নি।

সে আলতো করে একবার চন্দ্রলেখার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। যে কথা, যে দাবি নিয়ে সে খুড়িমার কাছে এসেছিল তা আর জানাতে ইচ্ছা হল না। খুড়িমাকে কোনও ভাবে ব্যতিব্যস্ত করতে তার মন চায় না। এমনকি মাতা যশোমতীকেও এই বিষয়ে সে কিছু জানাল না। সেই সঙ্গে অভিমানে পিতার সঙ্গে সে আর সাক্ষাৎ করল না।

বিষণ্ণ মনে সে আবার ধূমঘাটে ফিরে যায়। সে ঠিক করে ধূমঘাট থেকেই সে নৌকায় নদীপথে আগ্রার উদ্দেশ্যে যাত্রা করবে।

শরৎকুমারী যখন এই কথা শুনল তখন সে প্রথমে কাঁদল, তারপরে প্রতাপের উপরেই তার অভিমানের পাহাড় জমা হল।

প্রতাপ তার বন্ধুদের সঙ্গে আগামী আগ্রা যাত্রা নিয়ে আলোচনায় বসল। ঠিক হল তার সঙ্গে শঙ্কর ও সূর্যকান্তও আগ্রায় যাবে।

লক্ষ্মণ পণ্ডিত দিনক্ষণ গণনা করে দিলেন। খুল্লতাত বসন্ত রায় ধূমঘাটে এলেন প্রতাপকে বিদায় জানাতে। কিন্তু, প্রতাপের মন মুহ্যমান হয়ে আছে। যখন শরৎ তার জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গুছিয়ে দিচ্ছিল তখন সে কিছুতেই তার দিকে তাকাতে পারছিল না। শরৎকুমারীও কিছুতেই আর প্রিয় স্বামীর মুখের দিকে তাকায় না। সে হয়তো তার চোখের জল লুকাতে চাইছে।

কিন্তু যাত্রার আগের মুহূর্তে প্রতাপ কিছুতেই শরৎকুমারীকে খুঁজে পায় না। কোথায় গেল সে? তবে কি যাওয়ার আগে তার সঙ্গে দেখা হবে না! তা কি হয়! প্রতাপ অন্যমনে হাঁটতে হাঁটতে শরৎকুমারীর প্রিয় কুঞ্জকাননে এবার গেল। ওই তো! গাছপালার নিবিড় ছায়ায় ঘাসের শয্যায় উপুড় হয়ে শরৎকুমারী শুয়ে আছে। বিপুল রোদনে তার সারা শরীর ফুলে ফুলে উঠছে। প্রতাপ গিয়ে আলতো করে তার পিঠে হাত রাখতেই বাঘিনীর মতো শরৎকুমারী তার উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ল। তারপরে সেই কুঞ্জকাননের শান্ত ছায়া যেন আরও নিবিড় হয়ে এল। ক্লান্ত দেহে শরৎকুমারী প্রতাপের বুকের উপরে শুয়ে শুয়ে স্বামীর প্রশস্ত বুকের উপরে আঁকিবুকি কাটছিল।

এক ফোঁটা অশ্রু প্রতাপের বুকের উপরে পড়লে প্রতাপ তাকে আরও নিবিড় করে জড়িয়ে ধরে। কী বলে সান্ত্বনা দেবে সে যেন বুঝে উঠতে পারছে না। শরৎ বলল, ‘নগরের মেয়েরা জাদুকরি হয়। বলো তুমি কারোর দিকে তাকাবে না!’

‘না!’

‘সত্যি!’

‘সত্যি-সত্যি-সত্যি।’

শরৎকুমারী নিজের নগ্ন বুকের উপরে স্বামীর হাতটি চেপে ধরে বলল, ‘আমাকে ছুঁয়ে বললে কিন্তু।’

তারপরে নিজের মনে কথা বলছে এমনি ভঙ্গিতে প্রতাপের বুকের উপরে আঁচড় কাটতে কাটতে বলল, ‘তোমার বুকের উপরে আমার নাম লিখে দিলাম। এখানে আর কেউ থাকবে না। শুধু আমি।’

প্রতাপ কোনও কথা বলল না। শুধু সে আরও শক্ত করে শরৎকুমারীকে বুকে চেপে ধরল।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%