অবিন সেন
কয়েকদিন পরে আবার আকাশে মেঘ ডেকে উঠেছে। ঘনঘটা মেঘে আকাশের চাঁদ ঢাকা পড়েছে। মেঘের ছিন্ন আস্তরণের ফাঁক দিয়ে মাঝে মাঝে দু-একটা ক্ষীণ নক্ষত্র চোখ মেলে আছে। হয়তো অল্পক্ষণ পরেই বৃষ্টি নামবে।
সেই আশঙ্কায় একবার আকাশের দিকে তাকালেন বসন্ত রায়। তিনিও তাঁর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার মতো দীর্ঘকায়। কিন্তু তিনি জ্যেষ্ঠের মতো ফরসা নন, তাঁর গায়ের বর্ণ উজ্জ্বল গেঁহুর মতো। ব্যায়াম-পুষ্ট পেশিবহুল তাঁর শরীর। অসাধারণ রণনিপুণ। যেকোনো রকমের অস্ত্রই তাঁর হাতে বশ মানে অনায়াসে। তির-ধনুক, অসি, ভল্ল, সবেতেই তিনি দক্ষ। এমনকী দাউদের সেনানীদের মাঝে মাঝে তিনি অস্ত্রশিক্ষাও দিতেন। যদিও তাঁর নিজের সব থেকে প্রিয় অস্ত্র খড়্গ। সম্পূর্ণ এক হাতে খড়্গ চালনা করে এক আঘাতে মহিষকে দ্বিখণ্ডিত করতে পারেন তিনি। দাউদ তাঁকে পারস্য দেশের বিখ্যাত অস্ত্রশিল্পীকে দিয়ে এক খড়্গ বানিয়ে উপহার দিয়েছিলেন। বসন্ত রায় ভালোবেসে সেই অস্ত্রের নাম দিয়েছিলেন ‘গঙ্গাজল’। এই নামের পিছনে হয়তো একটা প্রচ্ছন্ন কারণও ছিল।
নিরীহ মুখ করে ‘কই রে, আমার গঙ্গাজল কই?’ বলে বৃহৎ খড়্গটি যখন বার করেন, তখন উলটোদিকে অবস্থানকারী মানুষটির মুখ দেখবার মতো হয়ে যায়। সেই ভয়-বিহ্বল মুখের দিকে তাকিয়ে বসন্ত রায় বিশেষ আমোদ অনুভব করেন। এহেন রসিক ও ভয়-প্রদানকারী নির্ভীক মানুষটির মুখ এখন ঈষৎ মলিন। অজানা একটা উদ্বেগে ম্লান হয়ে আছে।
তাঁদের আগত ভবিষ্যৎ কী অর্থ বহন করে নিয়ে আসছে, তা যেন তিনি বুঝে উঠতে পারছেন না।
তিনিও বাংলার নবনিযুক্ত নবাব টোডরমলের ঘোষণার কথা শ্রবণ করেছেন। কিন্তু এই ঘোষণার পিছনে সত্যি কী অর্থ লুকিয়ে আছে তা তিনি সম্যক বুঝে উঠতে পারছেন না। অনুগত এক দেহরক্ষী বলরামকে তিনি চর সাজিয়ে গৌড়ে নবাবের রাজসভার খবরাখবর সংগ্রহের জন্য পাঠিয়েছেন। কিন্তু বেশ কয়েকটি দিন অতিবাহিত হয়ে গিয়েছে। বলরামের কোনও সংবাদ নেই। ফলে তিনি আরও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন।
সেই সঙ্গে তিনি নিজেও কিছু করে উঠতে পারছেন না। ভিক্ষুর ছদ্মবেশে তিনি কীই বা করতে পারবেন! এই বিষয়ে অধিক কৌতূহলী হয়ে উঠলে মঠের অন্যান্য ভিক্ষুরা সন্দেহের চোখে দেখবে।
আকাশের দিকে আর একবার চোখ তুলে তিনি নিজের মনে একবার মাথা নাড়লেন।
না, এখনই বুঝি বৃষ্টি নামবে না।
আর নামলেই বা কী! তাঁকে দুই ক্রোশ পথ হেঁটে বড়ো ভ্রাতার কাছে পৌঁছাতেই হবে। বিক্রমাদিত্য দূত মারফত সংবাদ পাঠিয়েছেন।
নিরস্ত্র হয়েই তিনি পথে বেরিয়েছেন। ভিক্ষু হয়ে অস্ত্র হাতে তো আর পথে বের হতে পারেন না! তিনি আরও দ্রুত পা চালালেন।
সহসা লক্ষ্য করলেন দূরে এক লেলিহান আগুনের শিখা। তার পিছনেই জঙ্গল। তিনি আর একটু এগিয়ে গেলেন। যা আশঙ্কা করেছিলেন তাই। দস্যুরা লুঠ-তরাজের পরে কয়েকটি বাড়ি-ঘরে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। পরাজিত কিছু পাঠান সৈন্য বনের মধ্যে পালিয়ে গিয়ে ডাকাতির দল করেছিল। এ নিশ্চয়ই তাদের কাজ। তাঁর মুখ দিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল।
পরাজিত সৈনিকদের আবেগ এমনি করে মাঝে মাঝে উচ্ছৃঙ্খল হয়ে ওঠে। আবার না জানি কতগুলো পরিবারের সর্বনাশ হয়ে গেল।
তিনি সেই দিকে এগিয়ে গেলেন না। কিছুক্ষণ একটি বৃক্ষের নীচে দাঁড়িয়ে থেকে সেই আগুনের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। তিনি অস্ত্রহীন। একা এই হিংস্র শ্বাপদদের তিনি কী করতে পারবেন?
রাস্তা ছেড়ে ধান খেতের আলপথ ধরলেন। আগুনের হলকা, অসহায় মানুষের হাহাকার পিছনে পড়ে থাকল। কিছু পথ এগোলেই, একটা সরু নালা। কুলু কুলু করে জলের শব্দ আসছে। তারার মৃদু আলোকে তা এক হালকা রূপালি রেখার মতো অন্ধকারের বুকে শুয়ে আছে।
বসন্ত রায় মনে মনে অনুমান করলেন, জল হয়তো অধিক নয়। হলেও তাঁকে এই নালা পার হয়েই যেতে হবে। তিনি খেতের আল থেকে নালার দিকে নেমে যেতে গেলে সহসা কিছুতে তিনি হোঁচট খেয়ে পড়ে যেতে গিয়ে সামলে নিলেন নিজেকে। ঠাহর করে অনুভব করার চেষ্টা করলেন। একজোড়া মানুষের পা কি?
আবার এক বিদ্যুতের ঝলকানি। সেই তীব্র অলৌকিক নীল আলোর এক ঝলকে দেখলেন একটি নারীর দেহ পড়ে আছে জলের কিনারায়।
মৃতদেহ কি?
বসন্ত রায় নীচু হয়ে বসে অনুমানে একবার সেই দেহটির উপরে হাত বোলালেন। বিস্ময়ে অনুভব করলেন নারী দেহটি বিবস্ত্র। অনুমানে আবার তিনি দেহটি অন্বেষণ করে নাকের কাছে হাত নিয়ে গেলেন। নিশ্বাস পড়ছে মৃদু। তাঁর হাত নেমে এল নারী শরীরের বুকের উপরে। ছদ্মবেশী সন্ন্যাসীর বুকের ভিতরটা কি শিহরিত হয়ে উঠল!
তখন আবার বিদ্যুৎ চমক! সেই আবার আশ্চর্য নীল আলো। সে আলো যেন আলোর অধিক। বসন্ত রায়ের বুক এবার সত্যিই কেঁপে উঠল। এমন অসামান্য মুখ যেন তিনি কখনও দেখেননি। উদ্ভিন্নযৌবনা তরুণী। কিন্তু এই ক্ষণিকের আলোকে দেখে তাঁর মনে হল মেয়েটির সর্বস্ব বুঝি লুঠ করে নিয়ে গেছে দস্যুরা। তারপরে এখানে মৃত অনুমান করে ফেলে দিয়ে গেছে। হয়তো ওই দগ্ধ গ্রামের কোনও সম্পন্ন ঘরের সন্তান এই হতভাগ্য মেয়েটি।
তিনি এক মুহূর্ত মাত্র ভাবলেন। সন্ন্যাসীর যাবতীয় কঠোর অনুশাসন তাঁর মন থেকে নির্বাসিত হয়ে গেল নিমেষে। তাছাড়া, তিনি কি সত্যই ভিক্ষু! এতদিন কৌমার্য অবলম্বন করেছেন, সে তো কেবল নারী বিষয়ে অনুৎসাহের কারণে। তিনি অস্ত্রের সাধনা, শক্তির সাধনা করেছেন! তুচ্ছ নারীর প্রতি কোনও আকর্ষণ অনুভব করেননি এতদিন।
তিনি তাঁর কর্তব্য ঠিক করে নিয়েছেন। পতিতকে উদ্ধার করা বীরের ধর্ম। তিনি সেই কোমল অচেতন শরীরটিকে কাঁধে তুলে নিলেন। তার আগে তিনি নিজের গায়ের উত্তরীয় দিয়ে সেই নগ্ন শরীরটিকে ঢেকে দিয়েছেন। কী আশ্চর্যজনক সেই শরীরের স্পর্শ। এমনটা তিনি পূর্বে কখনও অনুভব করেননি। শীর্ণ নালায় জল অধিক নয়। কোমর পর্যন্ত মাত্র। তার পারে ধানের খেত। ওই তো আবার বিদ্যুতের চমক। সেই আলো যেন এক নিমেষে তাঁর চোখের সামনে অন্ধকারের দেওয়াল উন্মোচন করে পথ বাতলে দিয়েছে।
আর কিছুটা পথ মাত্র।
এইটুকু পথ বৃষ্টি আসার আগেই তিনি পেরিয়ে যাবেন। অনন্ত আকাশের মেঘও তাঁকে বুঝি সাহায্য করল। অরণ্যের প্রান্তে জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার বৌদ্ধ সংঘে যখন পৌঁছালেন, তখনই বৃষ্টি নামল। সে এক তুমুল বৃষ্টির তোড়। বৃষ্টির তোড় যেন রাত্রির সমস্ত অন্ধকারকে ধুয়ে মুছে ফরসা করে দিতে চায়।
কিন্তু বিক্রমাদিত্য ভ্রাতাকে এই অবস্থায় দেখে চমকে উঠলেন।
বসন্ত রায় কোনও কথা না বলে মঠে প্রবেশ করে প্রদীপের স্বল্প আলোকে আলোকিত ক্ষুদ্র একটি ঘরে কুশের শয্যায় নারী শরীরটিকে শুইয়ে দিলেন।
জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা যেন কিছুটা বিরক্তি নিয়ে বিষয়টা লক্ষ করলেন। বৌদ্ধ ভিক্ষুদের মঠে এই নারী শরীরের আগমন বেমানান! তিনি জানেন তাঁর এই কনিষ্ঠ ভ্রাতাটি কিছুটা হঠকারী। তবু ভ্রাতার সমস্ত কার্যের উপরে তাঁর সম্পূর্ণ আস্থা আছে। তিনি একদৃষ্টিতে সেই আশ্চর্য সুন্দর নারী -মুখটির দিকে তাকিয়ে থাকলেন। অপেক্ষা করলেন কনিষ্ঠের বক্তব্যের জন্য।
বসন্ত রায় তরুণীর শরীরটিকে উত্তম রূপে বস্ত্রাবৃত করে ভ্রাতার মুখোমুখি দাঁড়ালেন। ব্যাখ্যা করলেন পথের ঘটনা। কতকটা যেন আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য বললেন, অসহায়, আহত নারীটিকে তিনি কি করে এইভাবে ফেলে আসতে পারেন! সে তো এক রকম তাকে মৃত্যুমুখে ঠেলে দেওয়া! পতিতকে উদ্ধার করা কি সন্ন্যাসীর ধর্ম নয়? তিনি অপাঙ্গে লক্ষ্য করলেন সেই ক্ষুদ্র কক্ষের দ্বারের কাছে মঠের প্রধান থের উদয়ভানু দাঁড়িয়ে আছেন। বসন্ত রায় যেন শেষ কথাটা তাঁকেই শুনিয়ে বললেন।
ভিক্ষুর ছদ্মবেশী বিক্রমাদিত্য এবার কথা বললেন, ‘থের, সমস্ত কথা না হয় পরে হবে। আপাতত আহতকে শুশ্রূষা করে তোলা এখন সংঘের প্রধান কর্তব্য বলেই আমার মনে হয়। আর্তকে সাহায্যের অধিক আর কোনও কর্তব্য হতে পারে না।’
তারপরে ভ্রাতার দিকে ফিরে বললেন, ‘চন্দ্রকান্ত, তুমি বরং শীতল জলের সিঞ্চন দাও। আমি দেখি উষ্ণ দুগ্ধ ও ব্যথা উপশমকারী পানীয় কোথায় পাই!’
উদয়ভানু কোনও কথা না বলে গম্ভীর মুখে নিজের কক্ষে চলে গেলেন। তিনি যেন বিরক্ত হয়েছেন। বিনয়ধর এখানে কেন এসেছে! এরা কি সত্যই ভিক্ষু! তাঁর মনে যেন এক সন্দেহের উদয় হয়েছে।
সংঘের এক ভৃত্যস্থানীয় ভিক্ষু চণ্ডকে সঙ্গে নিয়ে বিক্রমাদিত্য ঘরে প্রবেশ করলেন। দেখলেন ভ্রাতা বসন্ত রায় পরম মমতায় শীতল জলে মেয়েটির মুখ মুছিয়ে দিচ্ছেন। অচেতন তরুণীটির সংজ্ঞা যেন ক্রমশ ফিরে আসছে। বহু কষ্টে সে একবার চোখ মেলল। সেই চক্ষে বিপুল বিস্ময়। সেই সঙ্গে একটা অজানা শঙ্কা। সে আবার চক্ষু মুদ্রিত করে ফেলল। তার ওষ্ঠাধর ঈষৎ নড়ে উঠল। তারপরে থরথর করে কেঁপে উঠল সেই রক্তিম ঠোঁটদুটি। সে কি মনে মনে কিছু বলতে চাইছে? তার বৃহৎ চক্ষুদুটি থেকে অশ্রুর কণা গড়িয়ে পড়ল।
বসন্ত রায় যেন সেই মুখের দিক থেকে চোখ ফেরাতে পারছেন না। কী এক পিপাসার ঢেউ তাঁর দুই চোখে খেলা করছে। তিনি দ্বারের দিকে ঘাড় ফেরালেন। দেখলেন চণ্ডও নির্নিমেষ চোখে তাকিয়ে আছে সূক্ষ্ম বস্ত্রাবৃত নারীশরীরের দিকে।
বিক্রমাদিত্য ভ্রাতার দৃষ্টি অনুসরণ করে চণ্ডকে লক্ষ্য করে বললেন, ‘চণ্ড, এবার তুমি যাও। আমি আর চন্দ্রকান্ত সেবা-শুশ্রূষা করছি। রাত্রি মধ্যযাম অতিক্রম করেছে। তুমি বরং এবারে বিশ্রাম করো।’
তরুণীটি উষ্ণ দুগ্ধ ও পানীয় সেবনে অল্পক্ষণেই কথা বলার মতো অবস্থায় ফিরে আসে। বিক্রমাদিত্য তাকে জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার তুল্য স্নেহে সেবা করছেন। একটা একটা করে তার সব কথা জেনে নিলেন।
মেয়েটির নাম চন্দ্রলেখা। তার পিতা অবস্থাপন্ন ভূস্বামী। তার চোখের সামনেই পিতাকে দস্যুরা হত্যা করে। কয়েকজন তাকে টেনে নিয়ে গিয়েছিল খেতের দিকে। তারপরে সে ভয়ে অচেতন হয়ে যায়।
বিক্রমাদিত্য তার মাথায় স্নেহের হাত বুলিয়ে তাকে ঘুম পাড়িয়ে দেন। তখন আর রাত শেষ হতে বেশি বাকি নেই। সারা রাত্রির বর্ষণে আকাশও ক্লান্ত। মেঘ সরে গিয়ে আকাশে অজস্র তারা ফুটে উঠেছে। পুবের আকাশে মৃদু আলোর আভাস দেখা দিয়েছে।
দুই ভ্রাতা সন্তর্পণে বাইরে বেরিয়ে এলেন।
বসন্ত রায় বললেন, ‘আমাদের গুপ্তচর বলরাম তো কোনও সংবাদ পাঠাল না! তোমার কাছে কি কোনও সংবাদ আছে? অনেক দিন হল আমরা ছদ্মবেশে এখানে অবস্থান করছি। আর কতদিনই বা এই ভাবে থাকতে পারব!’
বিক্রমাদিত্যের মুখে একটি মৃদু হাসির ভঙ্গি খেলে গেল যেন। চিন্তান্বিত স্বরে বললেন, ‘বলরাম তোমার কাছে যেতে পারেনি বলে সে আমার কাছে এসেছিল। সে যা বলল, তাতে করে তো ভয়ের কোনও কারণ আমি দেখছি না। তবু, একটা আশঙ্কা থেকেই যায়। বর্তমান শাসক ম্লেচ্ছ মুসলমান নন, কিন্তু তিনি প্রকৃতই ধূর্ত। মনে হয় আমি তাঁর দেখা পেয়েছি। তিনি অতীব মিষ্টভাষী কিন্তু রহস্যময়। আর আমার আশঙ্কার কারণ এখানেই। আমি তাঁর মতিগতি সম্যক বুঝে উঠতে পারছি না। সেই কারণে এমন এক অচেনা শাসকের প্ররোচনায় পা দেওয়া কি সমীচীন হবে! তোমার কী মত?’
একটানে কথাগুলি বলে থামলেন বিক্রমাদিত্য।
কথাগুলি শুনতে শুনতে বসন্ত রায়ের কপালেও ভ্রূকুটি ফুটে উঠেছিল। তিনিও ভাবছিলেন। ভাবতে ভাবতে একটা বেপরোয়া হাসি তাঁর মুখের বিভঙ্গে ফুটে উঠল। দৃঢ় স্বরে বললেন, ‘জ্যেষ্ঠ, জীবন বাজি রেখে না হয় আর একবার দেখা যাক। এতদিনে যখন বিরূপ কিছু ঘটল না তখন মা কালীর আশীর্বাদ স্মরণ রেখে একবার চলো যাই। টোডরমলের সঙ্গে দেখা করে আসি।’
বিক্রমাদিত্য ভ্রাতার কথায় সায় দিলেন। তিনিও যেন মনে মনে এটাই চাইছিলেন। শুধু ভ্রাতার মতামতের অপেক্ষায় ছিলেন।
বসন্ত রায়ের মুখ দিয়ে ক্ষুদ্র এক নিঃশ্বাস পড়ল। তিনি দূরের দিকে তাকালেন। পুবের আকাশে তখন উষার আলোর রং লেগেছে।
রাত্রি আর বাকি নেই। শয়নের প্রয়োজন বাহুল্য মনে করে তাঁরা ভিতরের কক্ষে গেলেন একবার। বসন্ত রায় একবার চন্দ্রলেখার মুখের দিকে তাকালেন। ঘরের প্রদীপের আলো নিভু নিভু। বাইরের মৃদু আলো, ক্ষুদ্র গবাক্ষ পথে বাঁকা ভাবে এসে সেই গভীর ঘুমে কাতর মুখের উপরে পড়েছে। আঘাতে পরিশ্রমে অনিন্দ্যসুন্দর মুখের উপরে যেন বাদলের কালো ছায়া পড়েছে। তিনি এক দৃষ্টিতে সেই মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। এক গভীর মায়ায় তাঁর বুকের ভিতরটা একবার থমথমে হয়ে উঠল।
বিক্রমাদিত্য ভ্রাতার মুগ্ধ-বিহ্বল মুখের দিকে তাকালেন। একটি ক্ষুদ্র নিঃশ্বাস ফেলে তিনি অন্তঃপুরে চলে গেলেন।
থের উদয়ভানু শয্যা ত্যাগ করে পূর্বাশা হয়ে টানটান বসে আছেন। সকালের রক্তিম আলোর আভা লেগেছে তাঁর মর্মর মূর্তির মতো মুখের উপরে। বাইরে একটা ঘুঘু ডাকছে এক মনে।
বিক্রমাদিত্য মৃদু স্বরে বললেন, ‘থের, আমাকে ক্ষমা করবেন।’
তাঁর কণ্ঠস্বর শুনে থের একবার মুখ ফিরিয়ে বিক্রমাদিত্যকে দেখলেন। তারপরে আবার বাইরের দিকে তাকালেন মুক্ত গবাক্ষপথে। বনের কাঁচা সবুজের উপরে এসে পড়েছে ভোরের নির্মল আলো।
এক মুহূর্ত অপেক্ষা করে বিক্রমাদিত্য আবার বললেন, ‘থের, আমি আপনার কাছে আজকের দিনটি ভিক্ষা চেয়ে নিচ্ছি, এই অসহায়া স্ত্রীলোকটির কোনও উপযুক্ত ব্যবস্থার্থে। শুধু মাত্র আজকের দিনটিই!’
তিনি কথা শেষ করে উত্তরের অপেক্ষা করলেন।
কিন্তু থের কোনও কথা বললেন না। তিনি একবার যেন মাথা আন্দোলিত করলেন। বিক্রমাদিত্য সেটিকেই সম্মতির লক্ষণ বলে ভাবলেন।
দুই ভ্রাতা তেমনি ছদ্মবেশেই বাংলার সুবেদার টোডরমলের রাজসভায় এসে উপস্থিত হলেন। তাঁদের সম্যক পরিচয় পেয়ে টোডরমল প্রকৃতই খুশি হলেন। এই দুই ভ্রাতার পরিচয় তিনি আগেই জ্ঞাত হয়েছিলেন। চর মারফত দুইজনের অবস্থানও তিনি জেনেছেন। তাই আশা করেছিলেন এঁরা নিশ্চয়ই একদিন তাঁর কাছে আসবেন।
তাঁর মুখে এক মৃদু হাসি খেলে গেল। তিনি একদৃষ্টিতে বিক্রমাদিত্যের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। পরস্পরের দৃষ্টি পরস্পরকে সসম্মানে অভিনন্দিত করল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন