অবিন সেন
বেশ কিছুদিন পরে যশোরে ফিরে শঙ্কর নিজের মধ্যে খুব একটা শান্তি অনুভব করল। বাংলার মাঠঘাট শ্যামলিমার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে সে উদাস হয়ে যায়। পিতার পাশে বসে সবুজের দিকে তাকিয়ে থাকে। বোন সরমা শ্বশুরবাড়িতে ভালো আছে। সুখে শান্তিতে আছে। পিতা-পুত্রের কাছে এর থেকে স্বস্তির সংবাদ আর কী থাকতে পারে! অনন্ত শূন্য মাঠের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে তারা দুজনে গল্প করে। এ তো সাময়িক কয়েক দিনের বিশ্রাম মাত্র। প্রতাপ ধূমঘাটের রাজা হয়েছে। এবারে আস্তে আস্তে তাদের সবার খোয়াবকে আশমান থেকে মাটির উপরে নামিয়ে নিয়ে আসতে হবে। ধূমঘাট থেকে কয়েকদিন হল সে যশোরে ফিরেছে প্রতাপের কাছ থেকে ছুটি নিয়ে। তা ছাড়া যশোরে গোপনে কিছু কাজও সে সারবে। তবে এবারে সে ঠিক করেছে পিতাকে সঙ্গে করে ধূমঘাটে নিয়ে যাবে। সেখানে নতুন করে আবার পিতাপুত্রের সংসার নির্মাণ করবে। পিতা তাকে মাঝে মাঝে বিবাহের কথা বলেন। কিন্তু শঙ্কর সেই কথা হেসেই উড়িয়ে দেয়। এই তো সে ভালো আছে। কেমন মুক্ত বিহঙ্গ!
প্রতাপও মাঝে মাঝে এক স্বাধীন অখণ্ড বাংলার স্বপ্নে আনমনা হয়ে যায়। কিন্তু স্বপ্ন কি শুধু স্বপ্নই রয়ে যাবে! যশোর থেকে কয়েকদিন হল সে চলে এসেছে। পিতার থেকে প্রাপ্ত সামান্য দশ আনা অংশের সে রাজা। ধূমঘাটে তার রাজধানী। যশোরের রাজা এখন তার খুল্লতাত বসন্ত রায়। তার পিতা বিক্রমাদিত্যও যশোরেই বসবাস করছেন।
ধূমঘাটে পূর্বের বাগানবাড়িটিকেই সে আরও বৃহৎ আকারে বর্ধিত করে নিয়ে নিজের বসবাসের উপযুক্ত করে নিয়েছে। একটি বিশাল পুষ্করিণী খনন করিয়েছে বাড়ির পিছন দিকে। মাঝে মাঝে সন্ধ্যার পরে সে একাকী দ্বিতল অলিন্দে বসে বসে বিশাল পুষ্করিণীর কালো জলের দিকে তাকিয়ে থাকে। দূরের আকাশের থেকে কোনও দিন চাঁদের ছায়া এসে সেই জলের উপরে ভাসতে থাকে। সেই দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে প্রতাপ যেন অন্য মানুষ হয়ে যায়। নিশ্চল পাথরের মূর্তি।
সহসা পায়ের শব্দে, সে যেন সংবিৎ ফিরে পায়। সে ঘাড় ফিরিয়ে তাকায়। অন্ধকারেও শঙ্করকে তার চিনতে কোনও অসুবিধা হয় না।
- আয় বোস শঙ্কর। যশোর থেকে আজই ফিরেছিস বোধ হয়।
শঙ্কর একটা দিবানের উপরে বসে।
প্রতাপ ভৃত্যকে হাঁক দিয়ে একটি আলো নিয়ে আসতে বললে, শঙ্কর তাকে নিষেধ করে।
- অন্ধকারই ভালো। আলো নিয়ে এসে তোমাকে বিরক্ত করব না।
অন্ধকারে তার মুখে যেন হাসির রেখাগুলি নড়েচড়ে ওঠে।
- তুমি কী ভাবছ আমি জানি।
- জানিস?
একটু থেমে প্রতাপ আবার বলে, ‘এই ক্ষুদ্র ধূমঘাটে বসে সুন্দরবনের রাজা হয়েই কি থেকে যেতে হবে?’
তার গলায় যেন একটা হতাশার সুর টের পায় শঙ্কর। এই প্রতাপ যেন তার কাছে অচেনা।
‘রাজা, তোমাকে তো কখনও এইভাবে কথা বলতে দেখিনি। এতদিন যে কোনও পরিস্থিতিতে তুমি আমাদের উৎসাহ জুগিয়ে এসেছ। আমাদের ভরসা দিয়ে এসেছ।’
একটু থেমে শঙ্কর আবার বলল, ‘চলো, আমরা শূন্য থেকে শুরু করি। আমি আগামী কালই সূর্য ও অন্য সবাইকে ডেকে নিয়ে পরিকল্পনা করতে বসি।’
প্রতাপ কোনও উত্তর দিল না। সে চুপ করে আবার অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে থাকে। সহসা শঙ্করের মনে পড়ে যায়। তাই তো! সেই কারণে আজ প্রতাপের মন এত বিক্ষিপ্ত। এই কথা সে কেমন করে ভুলে যেতে পারল। আজ যে বৌঠান সূতিকাঘরে প্রবেশ করেছেন। প্রাণাধিক পত্নীর চিন্তায় প্রতাপ মুহ্যমান হয়ে আছে।
সে ভরসা দেওয়ার সুরে বলল, ‘তুমি এত চিন্তা করছ কেন! সূর্যকান্ত আজ যশোরেশ্বরী মন্দিরে পুজো দিতে গিয়েছে।’
প্রতাপ এবার শঙ্করের দিকে ঘাড় ফেরায়।
‘চিন্তা তো করতে চাই না শঙ্কর। কিন্তু নানা আশঙ্কা আজ মনের ভিতরে এসে ভর করছে। খুড়িমার কথা তো জানিস। সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে তিনি চলে গেলেন। শরতের কিছু হবে না তো ভাই?’
সে একটা হাত বাড়িয়ে শঙ্করের হাতের উপরে হাত রাখল। শঙ্কর বিপুল আবেগে তার দুটি হাত জড়িয়ে ধরল।
‘তুমি, কিচ্ছু চিন্তা কোরো না। বৌঠানের কিচ্ছু হবে না।’
সহসা এক পরিচারিকা দৌড়ে এল। তার পায়ের মঞ্জীরের শব্দে প্রতাপ আর শঙ্কর উঠে দাঁড়িয়েছে। এক বিপুল আশঙ্কার মেঘ যেন প্রতাপের মুখের উপরে নেমে এসেছে।
- হুজুর, রানিমার পুত্র হয়েছে।
কিন্তু এই সংবাদ প্রতাপ সম্যক উপলব্ধি করল কি না কে জানে! সে ভীষণ আশঙ্কান্বিত গলায় বলে উঠল, ‘শরৎ ঠিক আছে তো?’
তার গলার স্বর যেন বিপুল হাহাকারের মতো শোনায়।
পরিচারিকা ভরসার গলায় বলল, ‘হ্যাঁ, হুজুর। তিনি সংজ্ঞা ফিরে পেয়েছেন। কথাও বলেছেন।’
প্রতাপের মনে হল, বিপুল এক পাথরের বোঝা যেন তার বুকের মধ্যে থেকে খসে পড়ল। সে বিপুল আবেগে শঙ্করকে বুকে জড়িয়ে ধরল।
প্রতাপ একটা মুক্তার মালা গলা থেকে খুলে সেই পরিচারিকাকে বকশিশ দিল। এদিকে শঙ্কর চেঁচিয়ে সবাইকে ডাকতে লাগল। সমস্ত গৃহের থমথমে পরিবেশটা যেন এক মুহূর্তে এক আনন্দের মহলে পরিণত হল। দিকে দিকে জ্বলে উঠল প্রদীপের আলো।
শঙ্কর দৌড়ে নীচে চলে গেল। সমস্ত বন্ধুপরিজনদের কাছে সংবাদ পৌঁছে দিতে হবে।
পরদিন প্রভাতে সূর্যের প্রথম আলোকে প্রতাপ পুত্র ও পুত্রের মাতাকে দেখল। শরৎকুমারী বেদনার্ত মুখেও এক বিপুল আলোর মতো হাসিতে স্বামীকে যেন পুরস্কৃত করল। প্রতাপ কাঁপা কাঁপা হাতে একবার তাকে ছুঁয়ে দেখল। তার কোলের কাছে ওই কে! যেন সূর্যের আলোয় এক সোনার পুতুল শুয়ে আছে। কীভাবে যেন এই আবেগকে সে প্রকাশ করবে প্রতাপ যেন তা বুঝে উঠতে পারছে না। তার সারা শরীর থরথর করে কেঁপে উঠল। চোখে আবেগের অশ্রু।
শরৎকুমারী স্বামীকে ইশারায় পাশে বসতে বললে প্রতাপ তার শয্যার উপরে বসল। শরৎকুমারী আবার তার ভুবনভোলানো হাসি হেসে বলল,
‘কি খুশি তো?’
প্রতাপ আবেগ ভরে স্ত্রীর কপালে চুম্বন করল। তার পরে কপালে হাত ছুঁইয়ে মৃদু হেসে বলল, ‘তুমি ভালো আছ তো?’
‘হ্যাঁ গো।’
‘তুমি ভালো থাকলেই আমি সব থেকে সুখী।’
প্রতাপ তার হাতের উপরে শরৎকুমারীর হাতের মৃদু চাপ অনুভব করল।
কুলপুরোহিতের সঙ্গে পরামর্শ করে নবজাতকের নাম রাখা হল উদয়াদিত্য। প্রতাপ মনে মনে ভাবল তার জীবনের আকাশে যেন নতুন সূর্য উদিত হল।
পুত্রের জন্মের পরে প্রতাপ যেন বিপুল উদ্যম ফিরে পায় তার ভিতরে। সেটা তার নিকট বন্ধুরাও টের পেয়েছে। সবার প্রথমে তারা ঠিক করে, আগে নিজের রাজ্যকে সুরক্ষিত করতে হবে। সেই কারণে প্রতাপ পরিকল্পনা করে সমগ্র রাজ্যে কয়েকটি দুর্গ নির্মাণ করাবে।
এই বিষয়ে উপযুক্ত কারিগরের খোঁজ শুরু করে তারা। শেষে আগ্রা থেকে আগত মোগল সেনানী জুনাইদের এক পূর্বপরিচিত সেনার সাহায্যে রায়চাঁদ নামের এক ব্যক্তিকে তারা রাজমহল থেকে নৌকাযোগে ধূমঘাটে নিয়ে আসে।
রায়চাঁদ বয়সে প্রবীণ। খর্বকায় কৃষ্ণবর্ণ চেহারা। চোখের দৃষ্টি ভীষণ তীব্র। থপ্ থপ্ করে তার হাঁটার ভঙ্গি অনেকটা যেন বন-মানুষের মতো। জন্মসূত্রে সে কায়স্থ পরিবারের হলেও এক মুসলমান নির্মাণকারিগরের গৃহে প্রতিপালিত হবার কারণে তার আচারে ব্যবহারে মুসলমান রীতিনীতিই প্রকাশ পায়। প্রথম দর্শনে তাকে দেখে প্রতাপের ভক্তি হয় না। এ কাকে ধরে নিয়ে এল জুনাইদ! কিন্তু অচিরেই তার ভুল ভাঙে কিছুটা। রায়চাঁদের নির্মাণ শিল্প নিয়ে কথাবার্তা শুনে তার প্রতি কিছুটা ভক্তি ফিরে আসে। পরদিনই সূর্যকান্ত ও রায়চাঁদকে সঙ্গে নিয়ে প্রতাপ দুর্গ নির্মাণের উপযুক্ত স্থান অন্বেষণে বেরিয়ে পড়ল। তারপরে ধূমঘাটে নিজেদের বাসস্থানের থেকে কিছুটা দূরে দৈর্ঘ্যেপ্রস্থে প্রায় পাঁচ ক্রোশ পরিমাণ স্থান তারা নির্বাচন করে। কাছেই একটি সরু মজা নদী। রায়চাঁদ পরামর্শ দিল এই নদীকেই সে একটি পরিখায় রূপান্তরিত করবে, যাতে করে বিপদের সময়ে, যখন একান্তই কোনও উপায় থাকবে না তখন এই পরিখা দিয়ে দ্রুত বেগের নৌকা সহযোগে মোহানায় গিয়ে পৌঁছানো যাবে।
কয়েক দিনেই মধ্যেই রায়চাঁদ দুর্গের একটি নকশা তৈরি করে রাজা প্রতাপাদিত্যকে দেখাল। সমগ্র দুর্গটি মৃন্ময় প্রাকারে পরিবেষ্টিত থাকবে। স্থানে স্থানে থাকবে উচ্চ পর্যবেক্ষণ মিনার। সমগ্র প্রাকারটি স্থানে স্থানে বহুসংখ্যক কামান দ্বারা সুরক্ষিত থাকবে। চারপাশে থাকবে মাত্র চারটি দ্বার। আবার এই প্রাকারের মধ্যে একই রকম আরও চারটি দুর্গ নির্মিত হবে। প্রত্যেকটি আবার একই রূপে কামান দ্বারা সুরক্ষিত থাকবে। এই সুবৃহৎ দুর্গের ভিতরেই প্রতাপ পরবর্তী কালে পরিবারপরিজন সহ বসবাস করবে, সেই কারণে দুর্গের মধ্যে অসংখ্য গৃহ, পুষ্করিণী, উদ্যান, প্রশস্ত পথ ও পণ্য বীথিকা নির্মাণের পরিকল্পনা করা হল। বহুসংখ্যক মানুষ যাতে স্বচ্ছন্দে বসবাস করতে পারে, সেই কথা মাথায় রেখে চিকিৎসালয়ও নির্মাণ করার জন্য নকশা করল রায়চাঁদ। এই চারটি দুর্গ দ্বারা বেষ্টিত থাকবে মধ্যের পঞ্চম দুর্গটি। সেই দুর্গের ভিতরে নির্মিত হবে রাজপ্রাসাদ। এই বিষয়ে সুদূর মিশর থেকে কারিগর আনয়নের কথা জানাল রায়চাঁদ। সমগ্র দুর্গের পরিকল্পনা দেখে প্রতাপ যারপরনাই আনন্দিত হল।
রায়চাঁদ জানাল প্রায় তিনশত শ্রমিক এই সমগ্র দুর্গ নগরী নির্মাণের কাজে দিনরাত্রি ব্যাপী কাজ করবে। এর জন্য প্রায় পাঁচ বৎসর সময় লাগবে।
ধূমঘাটের দুর্গ নির্মাণের পরিকল্পনা ও কার্য শুরু করে দিল প্রতাপ৷ রায়চাঁদ, সূর্যকান্ত আর জুনাইদকে পাঠিয়ে দিল বিভিন্ন স্থান পরিভ্রমণ করে দেখতে, আরও কোথায় কোথায় এমনি দুর্গ নির্মাণের পরিকল্পনা করা যায়। সেই সঙ্গে স্থান চিহ্নিতকরণ ও নকশা করবে তারা।
সূর্যকে দুর্গ নির্মাণের সমস্ত দায়িত্ব প্রদান করে প্রতাপ শঙ্করকে নিয়ে বসল, সৈন্য বাহিনী গঠনের পরিকল্পনায়।
উভয়ে পরামর্শ করে এক দল শ্রমজীবী সৈনিক নিয়োগ করা শুরু করল। তারা একধারে যেমন কর্মঠ পরিশ্রমী, তেমনি হিংস্র। এই সৈন্যদলের সাহায্যে প্রাকৃতিক ভাবে দুর্গম সুন্দরবনের অরণ্যভূমিকে আরও দুর্গম করে তোলার কাজে হাত দিল। এই সৈনিক-দল এতটাই কর্মকুশলী হয়ে দেখা দিল যে তারা অল্পসময়ের মধ্যেই যেমন শুষ্ক ভূমিতে খাল খনন করতে পারে, তেমনি অরণ্য ছেদন করে তাকে বাসযোগ্য ভূমিতে রূপান্তরিত করতেও পারে। এই শ্রেণির শ্রমিকদের মূলত অস্ত্র খড়্গ, কুঠার আর তির-ধনুক। সেই সঙ্গে প্রতাপ সমস্ত সৈনিককে একটি কোদাল ও একটি কুঠার সঙ্গে রাখার নির্দেশ দিল। কুঠার আর কোদালের দুইটি সুবিধা— তা যেমন যুদ্ধে অস্ত্র হিসাবে কাজে লাগবে, তেমনি বৃক্ষ-ছেদন আর পরিখা খননে কিংবা যুদ্ধের সময়ে আত্মগোপনের জন্য গহ্বর নির্মাণে কাজে লাগবে।
প্রতাপ সমস্ত পল্লিতে একটি করে ব্যায়ামাগার নির্মাণ করার নির্দেশ দিল শঙ্করকে। সমস্ত যুবার ব্যায়ামাগারে যোগদান বাধ্যতামূলক। তিরন্দাজি শেখাবার কেন্দ্র গড়ে ওঠে কয়েকটি। অল্পদিনেই সৈন্যরা তিরন্দাজিতে পোক্ত হয়ে যায়। প্রতাপ এই কাজের তদারকির দায়িত্ব দিল কার্লোসকে।
একদিন শঙ্কর বলল, ‘রাজা, মহামতি টোডরমলের সেই কথা কি তোমার মনে আছে! সেই যে তিনি বলেছিলেন, প্রতিপক্ষকে চমকে দিতে হবে যুদ্ধের সময়ে।’
প্রতাপ আর সে সন্ধ্যাবেলা অন্যান্য কর্মক্লান্ত দিনের মতো দ্বিতল অলিন্দে বসেছিল। প্রতাপের সুরাপানের নেশা যেন বেড়েছে ইদানীং। শরৎকুমারী তাকে কত নিষেধ করে! প্রতাপ তার সমস্ত কথা শোনে। সে কালে কোন স্বামী তার স্ত্রীর কথা মেনে চলত? শরৎকুমারী সৌভাগ্যবতী, এই গর্বে সে গর্বিত। কিন্তু এই একটা ব্যাপারে প্রতাপ তার নিষেধ হেসে উড়িয়ে দেয়। হেসে হেসে বলে, ‘শরৎ তুমি মিছে চিন্তা করো। আমি নীলকণ্ঠ। বিষে আমার কিছু হবে না।’
কথাটা বলেই সে হা হা করে হেসে উঠে। শরৎ তার হাসিতে ভুলতে পারে না। সে রাগ দেখায়, অভিমান করে মাঝে মাঝে। প্রতাপ আদর করে তার মান ভাঙায়।
শঙ্করের কথার উত্তরে প্রতাপ বলল, ‘হ্যাঁ ভাই মনে আবার নেই। তাই তো এত আয়োজন।’
শঙ্কর বলল, ‘রাজা, একটা বিষয়ে পরিকল্পনা করলে কেমন হয়!’
‘কী বল তো?’
‘দেখো, আমাদের এই অঞ্চল নদীমাতৃক। কাছেই আবার নদীর মোহানা। উত্তাল সাগর। সেই সঙ্গে পোর্তুগিজ বণিকরা আছে। তাই বলছিলাম, আমাদের নৌবহর বাড়াতে হবে। আমরা প্রধান যুদ্ধটা করব নৌপথে। পদাতিক সৈন্যের থেকে অনেক আগেই আমরা গৌড়ে কিংবা ওড়িশায় পৌঁছে গিয়ে অতর্কিতে আক্রমণ করতে পারব। তেমনি নৌকা থেকে কামান দেগে স্থলভাগের সৈন্যদের ধ্বংস করে দিতে পারব।’
শঙ্করের পরিকল্পনা তার খুবই মনঃপূত হয়।
‘তাই তো! তুই ঠিকই বলেছিস। আমরা অতর্কিতে জলদস্যুদের মতো আক্রমণ করব।’
হা হা করে হেসে উঠে সে আবার বলল, ‘স্থলের যুদ্ধ করব জলযুদ্ধের মতো করে। আমাদের যুদ্ধ হবে জল-জঙ্গলের যুদ্ধ। তুই খুব ভালো বলেছিস।’
সে তার বিপুল হাতের একটা স্নেহের চপেটাঘাত করে শঙ্করের পিঠে।
শঙ্করও হেসে উঠে বলল, ‘জঙ্গলের যুদ্ধের কথায় মনে পড়ল, আমাদের সৈন্যদের বৃক্ষ আরোহণে পারদর্শী করে তুলতে হবে। গাছের পাতার আড়ালে নিজেদের লুক্কায়িত করে তারা বসে থাকবে। তারপরে অতর্কিতে শত্রুদের উপরে শর নিক্ষেপ করতে থাকবে গাছের উপর থেকে। শত্রুদের হতভম্ব আর নিহত করে তারা পালিয়ে যাবে। অতর্কিতের এই যুদ্ধের কৌশল আমাদের সৈন্যদের শেখাতে হবে। তির ছাড়াও তাদের কাছে বন্দুকও থাকবে। তুমি কী বলো, রাজা? এই ধরনের যুদ্ধ বেশ কার্যকরী হবে, তাই না!’
প্রতাপ মনে মনে ভাবে। সে তার বন্ধুবৃত্তে একটি রত্ন পেয়েছে।
‘শঙ্কর, তুই যখন আছিস আমার কোনও কিছুতেই ভাবনা নেই।’
পরদিন প্রতাপ, শঙ্কর আর কার্লোস মিলে চ্যান্ডিকানে গেল। সেখানে আগে থেকেই তাদের সঙ্গে জাহাজনির্মাতা ফ্রেডারিক ডুডলীর পরিচয় ঘটেছিল। প্রতাপ আগ্রা যাবার পূর্বে তার কাছ থেকেই জাহাজ ক্রয় করেছিল। ফলে সেই জাহাজের কার্যকারিতা প্রতাপ হাতে কলমেই বুঝেছিল।
প্রতাপকে দেখে ফ্রেডারিক অভ্যর্থনা করে নিয়ে গিয়ে উত্তম আসনে বসাল। তার পিতার মৃত্যু হয়েছে। ফ্রেডারিকই এখন এই কর্মকাণ্ডের প্রাণপুরুষ। সে জানে প্রতাপাদিত্য এখন ধূমঘাটের রাজা হয়েছে। ফলে এখন প্রতাপের খাতির অনেক বেশি।
প্রতাপ ধূমঘাটের সিংহাসনে বসার পরে একটা দূরদর্শী কাজ করেছিল। এই অঞ্চলে পোর্তুগিজ নাবিকদের প্রতি সাধারণ মানুষের একটা ক্ষোভ ছিল। সাধারণ মৎস্যজীবীদের উপরে মাঝে মাঝেই পোর্তুগিজ জলদস্যুদের অত্যাচার নেমে আসত। শুধুমাত্র নৌকার মালোদের উপরেই নয়, তারা মাঝে মাঝে জেলেদের বস্তিতেও ঘোড়া ছুটিয়ে এসে
লুঠ-তরাজ নারীহরণ প্রভৃতি অত্যাচার চালিয়ে যেত। ফলে এই অঞ্চলে সর্বদাই একটা বিশৃঙ্খলা লেগে থাকত। রাজস্ব আদায়ও ব্যাহত হত। সব দিক বিবেচনা করে প্রতাপ পোর্তুগিজ নাবিকদের সর্দার কার্ভালোর সঙ্গে একটি সম্মানজনক সন্ধি স্থাপন করে। প্রতাপ বলেছিল ‘েদখো, অকারণে রক্তক্ষয় করে কারোরই লাভ নেই, বরং দুজনে দুজনের থেকে তফাতে থেকে যাতে লাভবান হতে পারি তার চেষ্টা দেখি।’ সেই সময়ে কার্ভালোর সঙ্গে আরাকানের রাজার একটা সন্ধি-পূর্ণ সম্পর্ক ছিল। আবার প্রতাপের সঙ্গেও আরাকান রাজের বৈরিতা ছিল না। কার্ভালো এই ত্রিভুজ সম্পর্কের কথা ভেবে প্রতাপের সঙ্গে সন্ধির শর্ত মেনে নেয়।
প্রতাপ বলল, ‘ফ্রেডারিক, তোমার সঙ্গে এবার আমি বাণিজ্য করতে চাই। আমি চাই আমার রাজ্যের সমস্ত জাহাজ, যুদ্ধজাহাজ, নৌকা তুমি নির্মাণ করো।’
বাংলার কারিগররা যে নৌকা প্রস্তুত করে না, তা নয়। সুন্দরী কাঠের উত্তম নৌকা তারা নির্মাণ করতে পারে। কিন্তু প্রতাপ আরও উন্নত ধরনের আর বিভিন্ন প্রকারের নৌকা নির্মাণ করতে চায়। নৌবহরই হবে তার রাজ্যের প্রধান সমরসম্ভার। সে চায় অধিক পরিমাণে চৌষট্টি দাঁড় বিশিষ্ট দ্রুতগামী ‘কোশা’ যুদ্ধজাহাজ। সেই জাহাজে থাকবে উন্নত মানের পোর্তুগিজ কামান। তা ছাড়া আরও নানান রকমের জাহাজ যেমন পণ্য বহনের জন্য ‘বালাম’ নৌকা, বড়ো নৌকা বা ‘ডিঙা’, একখানি বৈঠা বিশিষ্ট ছোটো নৌকা ‘ডিঙি’, ছই বিশিষ্ট দশ বিশ জন মানুষ পরিবহণকারী দ্রুতগামী ‘পানসি’, সেই সঙ্গে শক্তপোক্ত ভারবাহী ‘বাছাড়ী’, সংবাদ প্রেরণের জন্য বা গুপ্তচরবৃত্তি করার জন্য ‘ছিপ’ নৌকা, হাতি, ঘোড়া পরিবহণের জন্য ‘পাটুয়া’, ‘জঙ্গ’, ‘ভড়’ প্রভৃতি সকল প্রকারের নৌকাই সে নির্মাণ করাতে চায়। এই ধরনের নৌকা নির্মিত হবে পাঁচ শতাধিক। সেই সঙ্গে সহস্রাধিক ‘ঘুরাব’, ‘জালিয়া’ আর ‘কোশা’ শ্রেণির প্রকৃত রণতরী নির্মাণের পরিকল্পনা করে প্রতাপ।
এই কাজে প্রতাপের একটি সুবিধা ছিল। এখানে সুন্দরী গাছের কাঠ নৌকা নির্মাণে অধিক উপযোগী। এই কাঠে গিঁট কম, ফলে চিরে দিলে লম্বা তক্তা হয়। এই কাঠ লবণাক্ত জলে নষ্ট হয় না। ফ্রেডারিক এই সুন্দরী কাঠের কাজে অধিক পারদর্শী। আর প্রতাপের নিজস্ব অঞ্চলেই সুন্দরী গাছ সহজলভ্য। এই কাঠে নির্মিত জাহাজের তলদেশ, পাটাতন ও আবরণ অন্য কাঠ অপেক্ষা অধিক উপযোগী।
অবশ্য রণতরী নির্মাণে সেগুন কাঠ বেশি উপযোগী। এই কাঠ প্রায় বারো বৎসরের অধিক লোনা জলেও ভালো থাকে। ফলে সেগুনে তলা আর শাল ও শিশু কাঠে অন্যান্য অংশ নির্মাণ করবে বলে জানাল ফ্রেডারিক। আরাকান থেকে সেগুন কাঠ আনয়ন করতে অসুবিধা হবে না বলেই প্রতাপের ধারণা। এই বিষয়ে সে কামাল আলিকে আরাকানে দূত হিসাবে পাঠাবে ঠিক করল। আর ফ্রেডারিক নিজেও কিছু ওক কাঠ আনয়ন করবে সুদূর পোর্তুগাল থেকে।
প্রতাপের সমস্ত পরিকল্পনা শুনে ফ্রেডারিক যারপরনাই উত্তেজিত হয়ে উঠল। অচিরেই সে প্রতাপের এক বন্ধুস্থানীয় হয়ে উঠল। সে বুঝতে পারছে এই সমস্ত কর্মকাণ্ডের পিছনে প্রতাপের এক বিপুল পরিকল্পনা আছে। সে এই পরিকল্পনায় যুক্ত হতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে করল।
এই সমস্ত কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য প্রতাপ যমুনা নদীর পূর্বতীরে একটি বিস্তৃত অঞ্চল চিহ্নিত করে সেই ভূমি ফ্রেডারিককে প্রদান করল। অতি দ্রুততার সঙ্গে সেই স্থানকে জাহাজ নির্মাণের কর্মশালা হিসাবে গড়ে তোলা হল। তৈরি হল কর্মচারীদের বাসস্থানের জন্য গৃহ। প্রতাপ এই স্থানের নাম দিল ‘জাহাজঘাটা’।
বিবিধ পরিকল্পনা ও তার রূপায়ণে একাধিক বৎসর অতিক্রান্ত হয়ে গেল। এই সময়ের মধ্যেই প্রজাবৎসল রাজা হিসাবে প্রতাপ নিজেকে প্রতিপন্ন করে তুলতে পেরেছে। রোজ সকালে সে পুত্রকে সঙ্গে নিয়ে একবার উদ্যানে পরিভ্রমণ করে। পুত্র উদয়াদিত্যের মধ্যে সে যেন নিজেকে খুঁজে পায় মাঝে মাঝে। কোনও কোনও দিন তার সঙ্গে শরৎকুমারীও উদ্যানে পরিভ্রমণ করে। কিন্তু এই মাসাধিক সময় হল শরৎ আর এই ভোরের বেলা বাইরে বের হচ্ছে না। আরও একবার সে সন্তান-সম্ভবা হয়েছে। শীত আসছে। সকালের হিম গায়ে লাগানো একেবারেই অনুচিত। প্রতাপ তাই জোর করেই তাকে বের হতে দেয় না। সন্তানের জন্মের সময়টা বড়ো ভয়ের মনে হয় প্রতাপের কাছে। খুড়িমার স্মৃতি একটা ব্যথার কাঁটা হয়ে যেন তার বুকের ভিতরে বিঁধে আছে। সেই ক্ষতস্থান থেকে সে মাঝে মাঝেই রক্তক্ষরণ টের পায়। অন্তঃসত্ত্বা শরৎকুমারীর রোগা মুখের দিকে তাকালে তার বুকের ভিতরটা চিন্ চিন্ করে ওঠে। প্রতাপের মুখের ভাবে তার ভিতরে এই ভয় যেন প্রকাশ হয়ে পড়ে মাঝে মাঝে। শরৎকুমারী সেই ভয়কে হেসে উড়িয়ে দিতে চায়। স্ফীত উদরের ভার প্রতাপের শরীরের সঙ্গে মিশিয়ে দিয়ে বলে, আমার বীরপুরুষ স্বামী এত ভয় পায় কেন বলো তো? সবাই আমার স্বামীকে সুন্দরবনের বাঘ বলে ডাকে। তার এত ভয় পেলে হবে?
প্রতাপ খুব সাবধানে স্ত্রীকে আকর্ষণ করে হাসবার চেষ্টা করল। কোনও উত্তর দিল না।
প্রতাপ, শঙ্কর, সূর্যকান্ত, কামাল প্রভৃতি সমবয়সি কয়েকজন তরুণ এক জোট হয়ে স্বপ্ন দেখতে লাগল কী ভাবে বিদেশি মোগলদের হাত থেকে বঙ্গকে মুক্ত করে আবার স্বাধীন করে তোলা যায়। শুধু স্বপ্ন দেখাই নয়, এই স্বপ্নকে সফল করার প্রয়াসে তারা নিরলস পরিশ্রম করতে লাগল। রাজস্বব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ নতুন করে সাজাতে লাগল। যাতে করে অর্থের অভাব না দেখা দেয়। তারা দিকে দিকে লোক পাঠিয়ে উপযুক্ত সৈন্য সংগ্রহ করতে লাগল। অন্যদিকে রায়চাঁদের তত্ত্বাবধানে নানা স্থানে দুর্গ নির্মাণ শুরু হয়ে গিয়েছে। প্রতাপ, বন্ধুদের সঙ্গে পরামর্শ করে সমস্ত সৈন্য বিভাগকে আট দলে বিভক্ত করল— ঢালী, অশ্বারোহী, তিরন্দাজ, গোলন্দাজ, নৌসেনা, গুপ্তসৈন্য, রক্ষীসৈন্য আর হস্তীসৈন্য। তারা বিচার বিবেচনা করে প্রতি বিভাগের জন্য একজন করে অধিনায়ক নির্বাচন করল। ঢালী সৈন্যের অধিনায়ক হল কালিদাস রায় ও মদন মল্ল, অশ্বারোহী সৈন্যের প্রধান হল প্রতাপসিংহ দত্ত, আর তার সহকারী মহিউদ্দিন ও নুরমোল্লা। তিরন্দাজদের অধ্যক্ষ করা হল সুন্দর আর ধুলিয়ান বেগকে। নৌবহরের অধ্যক্ষ হল এককালের দুর্ধর্ষ পোর্তুগিজ জলদস্যু অগাস্টাস পেড্রো। গোলন্দাজ বাহিনী দেখভাল করবে জুনাইদ। আর গুপ্তচর বৃত্তির জন্য এক ছোটো অথচ অকুতোভয় বাহিনী গঠন করা হল, যার অধ্যক্ষ হল সুখা নামের এক অসমসাহসী বীর। রক্ষীবাহিনীর প্রধান হল রঘু। রক্ষীবাহিনীতে অনেক ত্রিপুরার কুকী উপজাতির সৈন্যদের নিয়ে এসে যোগদান করানো হয়। আর হস্তী-বাহিনীর অধিনায়ক করা হল জগৎসহায় দত্তকে।
গোলাবারুদে কামানের জন্য প্রতাপ পোর্তুগিজ ও ফারসি বণিকদের বরাত দিল।
কিন্তু একটা খেদ নিরন্তর তার মনের ভিতরে মাথা কুটে মরে। চাকসিরি তার দখলে এল না। সমুদ্রবন্দর স্থাপনের জন্য চাকসিরির থেকে উপযুক্ত জায়গা আর নেই তাদের সারা যশোরে। সেখানে সে বিশাল এক নৌ-বন্দর নির্মাণ করার স্বপ্ন দেখে এসেছে। সে কি হাল ছেড়ে দেবে? না না সে হাল ছাড়বে না! চাকসিরি তার চাই।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন