প্রজাপতির জন্ম

অবিন সেন

এই সংবাদ লুকিয়ে রাখবার নয়। বিক্রমাদিত্য যখন এই সংবাদ পেলেন তখন তাঁর মতো শান্ত-স্বভাব মানুষও ক্রোধে ফেটে পড়লেন। সেই সঙ্গে অশেষ দুঃখও পেলেন। ভাবলেন মানুষের কাছ থেকে একদিন যে সম্মান তিনি অর্জন করেছেন আজ সেই সম্মান পুত্রের কর্মের কারণে ধুলায় লুটিয়ে যেতে বসেছে। তিনি কী করবেন ভেবে উঠতে পারেন না।

তাঁর সমস্ত কাজের ভরসার স্থল ভ্রাতা বসন্ত রায়ের সঙ্গে এই বিষয়ে আলোচনা করবেন?

কিন্তু বসন্ত রায়কে তলব জানাতে হল না, তিনি নিজেই অগ্রজের সঙ্গে দেখা করতে এলেন।

বিক্রমাদিত্য কোনও দিন যা করেননি সহসা তিনি তাই করে ফেললেন। ভ্রাতার উপরে ক্ষুব্ধ হয়ে চিৎকার করে উঠলেন।

‘বসন্ত, তুমি আমায় পিছন থেকে ছুরি মারলে?’

‘এ কী বলছ দাদা! আমি পিছন থেকে ছুরি মেরেছি!’

‘তা নয়তো কী? তোমার প্রশ্রয়ে আজ প্রতাপ এতটা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। আমি আগেই এর রাশ টানতে বলেছিলাম।’

বসন্ত রায় আহত হলেন। যে ভ্রাতার জন্য তিনি সর্বসময়ে সর্বস্ব দিতে প্রস্তুত, যে ভ্রাতার জন্য নিজের অংশের ভূমির অধিকার পর্যন্ত ছেড়ে দিয়েছেন, সেই দাদাই এই কথা বলছেন! তাঁকেও তো টোডরমল আলাদা করে ভূস্বামী হবার অধিকার দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু নিজের অগ্রজের সম্মানে তিনি তা গ্রহণ না করে প্রিয় দাদার অধীনেই থাকবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, সেই জ্যেষ্ঠই আজ তাঁকে এই অপবাদ দিলেন। তাঁর চোখ ফেটে যেন জল বেরিয়ে আসার উপক্রম হল।

অভিমানী গলায় বললেন, ‘তোমার কথা অমান্য করে কী অপরাধ করেছি! তোমাকে পুত্রহন্তা হওয়ার পাপ থেকে বরং প্রতিহত করেছি।’

বিক্রমাদিত্য বুঝতে পারলেন তাঁর কথায় তাঁর প্রিয় সহোদর বড়ো আঘাত পেয়েছেন। তিনি তো আঘাত দিতে চাননি আসলে। তিনি তা নিজেও ভালো করেই জানেন। প্রতাপের এই বেপরোয়া কাজের পিছনে কনিষ্ঠ ভ্রাতার কোনও ভূমিকাই নেই। বরং প্রতাপ যে আজ এতটা অস্ত্রশিক্ষায় পারদর্শী হয়েছে, তা কেবল বসন্তের জন্যই সম্ভব হয়েছে। তিনি পিতা হয়ে যে দায়িত্ব পালন করেননি, বসন্ত খুল্লতাত হয়ে পিতার দায়িত্ব পালন করেছেন। তবু ক্রোধের বশে তিনি ভ্রাতার মনে আঘাত দিয়ে ফেলেছেন।

যদিও তিনি এখনও সংবাদ পাননি যে তাঁর প্রিয় ভ্রাতৃবধূ চন্দ্রলেখা প্রতাপের জন্য ধূমঘাটে গিয়েছে। সে খবর পেলে তিনি হয়তো আরও আঘাত পেতেন।

তিনি এগিয়ে এসে বসন্তের কাঁধে হাত রাখলেন। একটু বিষণ্ণ গলায় বললেন, ‘বসন্ত রাগ কোরো না। আসলে আমার মাথাটা ঠিক নেই। তুমি তো জানো চন্দ্রদ্বীপের তরুণ জমিদার কন্দর্পনারায়ণ রায় আমার প্রায় পুত্রসম। সে আমাকে যথেষ্ট শ্রদ্ধা করে। আর আজ আমার নিজের পুত্রের কারণে সেই সম্মান হয়তো ভূলুণ্ঠিত হবে।’

বসন্ত রায় নিজেকে সামলে নিয়েছেন। তিনিও বুঝতে পেরেছেন অগ্রজ তাঁকে আঘাত দিতে চাননি। তিনি সহজ গলায় কথা বলার চেষ্টা করলেন। যদিও তাঁর কণ্ঠ থেকে অভিমান তখনও সম্পূর্ণ অস্তমিত হয়নি। তিনি বললেন, ‘আমার মনে হয় তারা এখনও বুঝতে পারেনি কে এই কাজ করেছে। নারীহরণ বাংলাদেশে নতুন তো নয়। দস্যু মোগল সেনারা এই গর্হিত কাজ অনায়াসেই করে চলেছে। আমার আছে সংবাদ আছে এবারও তাঁরা ভেবেছে এই কাজ মোগল দস্যুরাই করেছে। কিন্তু এই কথা বেশিদিন চাপা থাকবে না। তাদেরও চর আছে আমাদের জমিদারিতে।’

একটু থেমে তিনি আবার বললেন, ‘তুমি ঠিকই আশঙ্কা করেছ দাদা, এই সংবাদ প্রকাশ হয়ে পড়লে আমাদের সম্মানহানি হবে। তাই আমি তোমার কাছে একটা প্রস্তাব নিয়ে এসেছি।’

বিক্রমাদিত্য খর চোখে ভাইয়ের দিকে তাকালেন। মুখে কিছু বললেন না।

বসন্ত রায় একটু ইতস্তত করে বললেন, ‘আমি সংবাদ নিয়েছি মেয়েটি চন্দ্রদ্বীপের বিখ্যাত বণিক নাগবংশীয় জিতামিত্র নাগের কনিষ্ঠা কন্যা।’

তিনি একটু থামলেন আবার। অগ্রজের মুখের দিকে তাকিয়ে যেন মুখের ভাব যাচাই করে নিলেন। তারপরে বললেন, ‘দাদা, ওই কন্যার সঙ্গেই প্রতাপের বিবাহ দিয়ে দাও।’

বিক্রমাদিত্য যেন চমকে উঠলেন। এ কী বলছে তাঁর ভাই! অপহৃতা কন্যার সঙ্গেই পুত্রের বিবাহ দিতে হবে! বংশমর্যাদার কথা কি সে ভুলে গেছে?

তিনি ভর্ৎসনার ভঙ্গি করে বললেন, ‘কী বলছ তুমি?’

তুমি যা ভাবছ আমি তা বুঝতে পেরেছি। কিন্তু দেখো, প্রতাপ যা করেছে তা গর্হিত অপরাধ। এবং কাজটি একান্তই বর্বরোচিত। আমাদের বংশে তা শোভা পায় না। এখন কন্যাকে যদি প্রতাপ বিবাহ করে এতে করে আমরা বরং গর্বিতই হব। সেই সঙ্গে চন্দ্রদ্বীপের সঙ্গে আমাদের আসন্ন বিবাদের একটা সুষ্ঠু সমাধান হয়।

বিক্রমাদিত্য তবু রাজি হতে পারেন না।

বসন্ত রায় আবার অনুরোধের ভঙ্গি করে বললেন, ‘কন্যাটি উচ্চবংশীয় তা তো তোমাকে বলেছি। আমাদের বংশের পক্ষে সে অনুপযুক্ত হবে না। শুনেছি কন্যাটি বিদুষী ও সুলক্ষণা। প্রতাপের সঙ্গে তার বিবাহ দিলে তা প্রতাপের ভালোই হবে।’

বিক্রমাদিত্য ভ্রাতার মুখের দিকে যেন সন্দেহের চোখে তাকিয়ে বললেন, ‘তুমি এত সব জানলে কী করে?’

বসন্ত রায় আর অগ্রজের কাছে গোপন করলেন না। তিনি একে একে সমস্ত ঘটনা ব্যক্ত করলেন। যতটা তিনি সূর্যকান্তর মুখে শুনেছেন। তারপরে চন্দ্রলেখা যে ধূমঘাটে গিয়েছে সে কথাও বললেন।

বিক্রমাদিত্য একদৃষ্টিতে ভ্রাতার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। তাঁর মুখে একটা কষ্টের হাসি খেলে গেল যেন। ভাবলেন তাঁর চোখের আড়ালে এত কিছু ঘটে গিয়েছে। সবই কি তাঁর পুত্রের ভালোর জন্য? লক্ষ্মণ ঠাকুরের গণনা এই ভাবে ফলতে শুরু করেছে! প্রতাপ তো তাঁর পুত্র! তবু সে কেন এমন হল! কই অন্য পুত্র-কন্যারা তো এমন দুর্বিনীত হয়নি!

অনিচ্ছার সঙ্গে তিনি বললেন, ‘তোমরা তো সব ব্যবস্থাই করে ফেলেছ। তবে আমার পরামর্শ যদি শোনো, তবে একবার লক্ষ্মণ ঠাকুরকে দিয়ে কন্যার ভবিষ্যৎ গণনা করে নাও।’

বসন্ত রায় ঘাড় নেড়ে সায় দিলে তাঁর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা আবার বললেন, ‘কন্যার পিতাকে আর চন্দ্রদ্বীপের কন্দর্পের সঙ্গে যেন কোনও ভুল বোঝাবুঝি না হয় সেই বিষয়টা তুমি ভালো করে দেখো।’

বসন্ত রায় অনুভব করলেন, অগ্রজের কণ্ঠে অভিমান।

বিক্রমাদিত্য যে কেদারায় বসে ছিলেন এবার বসন্ত রায় সেই কেদারার পায়ের কাছে বসে পড়লেন। এতক্ষণ তিনি দাঁড়িয়েই কথা বলছিলেন। পায়ে হাত রেখে বললেন, ‘দাদা, আমাকে তুমি ক্ষমা করো। বিশ্বাস করো, তোমার মর্যাদার হানি হতে পারে এমন কোনও কাজ আমার দ্বারা হতে পারে না। হবেও না কোনও দিন। এই তোমার পায়ে হাত দিয়ে আমি শপথ করে বলছি।’

বিক্রমাদিত্য পা সরিয়ে নিলেন না। তাঁর মনও আস্তে আস্তে দ্রবীভূত হয়ে যায়। সত্যি তো! বসন্ত ছাড়া তাঁর এমন ভরসার স্থল কে আছে! বসন্তের চোখ দিয়ে তিনি দেখেন। শ্রবণও করেন তিনি ভাইয়ের কান দিয়ে। তিনি একটা হাত আলগোছে ভ্রাতার মাথার উপরে রাখলেন। কোনও কথা বললেন না।

বসন্ত রায় আবার ভারী গলায় বললেন, ‘আমাদের বংশে জ্যেষ্ঠ পুত্রের বিবাহ। দাদা, তুমি আলগোছে থাকলে তো তা হতে পারে না।’

বিক্রমাদিত্য উদাস গলায় বললেন, ‘আমি তো আছি তোমাদের সঙ্গে।’

তারপরে একটু থেমে বললেন, ‘দেখো, এই বংশের জ্যেষ্ঠ পুত্রের বিবাহ যখন তখন সবার আগে মা যশোরেশ্বরীর পুজো হবে। এত ধুমধাম করে যা আগে কখনও হয়নি। সেই সঙ্গে বিবাহের আয়োজনে যেন কোনও মর্যাদার ক্ষুণ্ণ না হয়। লক্ষ্মণ ঠাকুরকে ডেকে বিবাহের উপযুক্ত লগ্ন নির্বাচন করো। দিন স্থির করে দিকে দিকে দূত প্রেরণ করে আমার নিমন্ত্রণবার্তা পৌঁছে দাও। দেশ-বিদেশের দ্বাদশ সহস্র ব্রাহ্মণভোজনের ব্যবস্থা করো।’

বসন্ত রায় জ্যেষ্ঠের কথা শুনে প্রভূত খুশি হলেন। বললেন, ‘সমস্ত তোমার ইচ্ছাতেই হবে।’

ঠিক সেই সময়ে কয়েক ক্রোশ দূরে ধূমঘাটের প্রমোদকাননের উত্তম কক্ষে বসে প্রতাপাদিত্য ঠিক একই কথা বলল, ‘সমস্ত তোমার ইচ্ছাতেই হবে।’

প্রতাপ কোনও দিন লাজুক ছিল না। তবু তার মুখের উপরে পতিত শেষ বিকালের আলোতে লজ্জার আভা যেন চলকে উঠল। সে কথাটা বলেই মুখ নীচু করে ফেলে।

চন্দ্রলেখা এক দৃষ্টিতে তার পুত্রসম ভাসুরপোর দিকে তাকিয়ে থাকল। গভীর গলায় বলল, ‘ঠিক তো! বিবাহ কিন্তু ক্ষণিকের মোহ নয়। সারাজীবনের জন্য ভালোবাসার অঙ্গীকার। ওকে কখনও অবহেলা করবি না তো? কথা দে?’

‘হ্যাঁ খুড়িমা। কথা দিলাম।’

চন্দ্রলেখার মন উদাস হয়ে গেল। বহুদিন আগের এক রাত্রির কথা যেন তার মনে পড়ে গেল। সে বাইরের উদাস আলোর দিকে তাকিয়ে উদাসী গলায় বলল, ‘তোমাকে আমার বিশ্বাস কী? আমার গা ছুঁয়ে শপথ করো।’

প্রতাপ এবার নীচু হয়ে চন্দ্রলেখার পায়ের কাছে বসল। জানুর কাছে চিবুকের ভার রেখে খুড়িমার মুখের দিকে ঘাড় তুলে তাকিয়ে বলল, ‘এই তো তোমার গায়ে হাত দিয়ে বলছি।’

- বল, সারা জীবন ভালবাসবি!

- বাসব। কিন্তু ও তো কোনও কথা বলছে না! কেন কিছু বলছে না!

‘বলবে গো বলবে। তুমি তাকে অর্বাচীন দস্যুর মতো অপহরণ করে নিয়ে এসেছ। ডাকাতের পায়ে কে আর প্রেম নিবেদন করে!’

চন্দ্রলেখা মুচকি হাসল।

প্রতাপ যেন বুঝতে পারল না, খুড়িমা সত্যি বলছে না মিথ্যা বলছে! জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল।

চন্দ্রলেখা তার মনের ভাব বুঝতে পেরে বলল, ‘হ্যাঁ রে বাবা! কথা বলবে। আমি তো আছি। এখন যাই মেয়েটা এই দুদিন ভালো করে আহার করেনি। তার ব্যবস্থা দেখি গিয়ে।’

পরদিন প্রভাতেই বসন্ত রায় ধূমঘাটের এই প্রমোদকাননে এলেন।

সারারাত শরৎকুমারী যেন শিশুর মতো চন্দ্রলেখার বুকের ভিতর মুখ গুঁজে শুয়ে ছিল। মাঝরাতে একবার ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠেছিল। হয়তো ভয় পেয়েছিল। চন্দ্রলেখা গভীর মমতায় তাকে শক্ত করে নিজের বুকের সঙ্গে মিশিয়ে নিয়েছিল। বলেছিল, ‘ভয় কী রে মেয়ে! কোনও ভয় নেই। আমি তাকে পেটে ধরিনি তবু বলছি তুই খুব সুখী হবি। ওই দামাল ছেলেকে তুইই পারবি বেড়ি পরিয়ে রাখতে।’

চন্দ্রলেখা নিজের বুকে শরৎকুমারীর চোখের জলের স্পর্শ পেল। গভীর মমতায় মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, ‘প্রতাপ একটু দস্যু। একটু রুক্ষ। কিন্তু সে বীর। আমি জানি তার বুকটা আকাশের মতো বড়ো।’

মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে প্রতাপের ছেলেবেলার কত গল্প শোনাল চন্দ্রলেখা। একসময় গল্প শুনতে শুনতে শরৎকুমারী ঘুমিয়ে পড়েছিল। কিন্তু চন্দ্রলেখার আর ঘুম হল না। সে ভাবছিল, ‘দাদা, সত্যি মানবেন তো এই সম্পর্ক! যদি না মানেন! তবে কী হবে!’

এই আশঙ্কা তার চোখ থেকে ঘুমকে চুরি করে নিয়ে গেল।

প্রভাতে সে গবাক্ষের সামনে দাঁড়িয়েছিল। শরৎকুমারী তখনও ঘুম থেকে ওঠেনি। প্রতাপ উঠেছে। সে আর শঙ্কর পিছনের বিস্তৃত উদ্যানে মুগুর ভাঁজতে বেরিয়ে পড়েছে।

নীচে ঘোড়ার খুরের শব্দে চন্দ্রলেখা সচকিত হয়ে উঠল। তার সারা মুখ হাসিতে ভরে উঠল। বসন্ত রায় এসে গিয়েছে। সে ছুটে চলে গেল বাইরের অলিন্দে।

বসন্ত রায়ের সারা মুখে নিশ্চিন্ত এক হাসি। চন্দ্রলেখা তাঁর হাত ধরলে, তিনি প্রিয় পত্নীর হাতে মৃদু চাপ দিয়ে বললেন, ‘কোনও চিন্তা নেই। দাদা রাজি হয়েছেন। এখন আর একটা কাজ বাকি। মেয়েটির বাবা জিতামিত্র নাগ রাজি হলেই সব মিটে যায়।’

চন্দ্রলেখা বলল, ‘এদিকেও সব ঠিক আছে। শরৎকুমারীও রাজি আছে। আর প্রতাপের তো তর সইছে না। এখনই বে দিলেই হয়।’

সে খিল খিল করে হেসে উঠল।

‘কিন্তু কথা হচ্ছে শরৎকুমারীর পিতার কাছে কে যাবে?’

চন্দ্রলেখা খর চোখে তাকিয়ে বলল, ‘তার মানে? তুমিই যাবে!’

বসন্ত রায় যেন নিমরাজি হবার ভঙ্গি করে বললেন,

‘না, কথা হচ্ছে পাত্রপক্ষ হয়ে কন্যার পিতার কাছে হাত পাততে যাব? তুমি তাই বলছ?’

চন্দ্রলেখা যেন ঝাঁঝিয়ে ওঠার ভঙ্গি করে।

‘আহা! তোমাদের ছেলে যে গর্হিত কাজ করল! তার বেলা!’

‘আমরা রাজা! রাজপুত্রের নারীহরণে কোনও পাপ নেই। এ তার স্বধর্ম।’

‘ছিঃ!’

‘ছিঃ কেন? জানো তো অর্জুন সুভদ্রাকে হরণ করেই বিবাহ করেছিলেন।’

বসন্ত রায় হাসি মুখে মশকরা করার ভঙ্গিতে বললেন।

চন্দ্রলেখা অদ্ভুত এক মুখের ভঙ্গি করে স্বামীর রসিকতার যেন প্রত্যুত্তর দিল।

বসন্ত রায় মনে মনে অন্য পরিকল্পনা করেছেন।

ততক্ষণে প্রতাপ ফিরে এসেছে। তিনি সব কথা প্রতাপকে খুলে বললেন। প্রতাপের খুশি যেন বাঁধনছাড়া। তা লক্ষ করে বসন্ত রায় বললেন, ‘দাদার আর একটি শর্ত আছে, যতদিন না বিবাহ হচ্ছে ততদিন তুমি এই বাড়িতে থাকতে পারবে না। আমরা এখানে থাকব আর আমাদের কাছে থাকবে শরৎকুমারী। তুমি এখানের ত্রিসীমানায় থাকবে না। তোমার সঙ্গে আমাদের মেয়ের সেই বিবাহের দিনে দেখা হবে। তার আগে যশোরেশ্বরীর পুজো হবে। আজই লক্ষ্মণ ঠাকুর গো-শকটে আসছেন এখানে, তিথি নক্ষত্র বিচার করবেন।’

প্রতাপের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ার উপক্রম। এর থেকে তাকে যদি নির্জন দ্বীপে নির্বাসন দেওয়া হত, তাহলেও বোধহয় সে এত দুঃখ পেত না।

‘এ কী বলছেন তাত?’

চন্দ্রলেখা খিল খিল হেসে উঠলেন।

এই ঠিক হয়েছে। বিয়ের আগে একেবারে আর আমাদের মেয়েকে বিরক্ত করবে না।

বসন্ত রায় আর বিলম্ব করলেন না। কার্লোসকে সঙ্গে দিয়ে তিনি প্রতাপকে যশোরে পাঠিয়ে দিলেন। আর তিনি নিজে বেরিয়ে পড়লেন চন্দ্রদ্বীপের উদ্দেশ্যে। সঙ্গে নিলেন শঙ্করকে।

প্রথমেই তিনি চন্দ্রদ্বীপের রাজা কন্দর্পনারায়ণ রায়ের প্রাসাদে গিয়ে উপস্থিত হলেন। কন্দর্পনারায়ণ যৎপরোনাস্তি খুশি হলেন বসন্ত রায়কে দেখে। যথোচিত মর্যাদায় তিনি বসন্ত রায়ের আপ্যায়ন করলেন। কথায় কথায় নারীহরণের কথা উঠল। বসন্ত রায় মনে মনে প্রমাদ গুনলেন।

তিনি বললেন, ‘ভাই কন্দর্প আজ তোমার কাছে একটা সাহায্যের জন্য এসেছি।’

কন্দর্পনারায়ণ ঠোঁটের কোণে হাসি নিয়ে ভ্রূ-কুঞ্চিত করে তাকালেন। তিনি যেন কতকটা অনুমান করতে পেরেছেন বসন্ত রায়ের আগমনের হেতু। কিন্তু মুখে তিনি কিছু বললেন না। বসন্ত রায় বললেন, ‘আমাদের প্রতাপ একটা গর্হিত কাজ করে ফেলেছে। তুমি তো শুনেছ হয়তো। প্রতাপকে নিয়ে সব সময়েই দাদার একটা দুশ্চিন্তা ছিল।’

তিনি একটু থামলেন। অপেক্ষা করলেন কন্দর্পনারায়ণ কিছু বলেন কি না, সেটা শোনার জন্য। কিন্তু কন্দর্পনারায়ণ মুখে কিছু বললেন না। শুধু তাঁর মুখের বাঁকা হাসি যেন একটু দীর্ঘ হয়।

বসন্ত রায় এক এক করে সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করলেন। অবশ্য সেই বর্ণনার মধ্যে সত্যভাষণের থেকে আবেগের বহিঃপ্রকাশ ছিল বেশি আর ছিল শরৎকুমারীর প্রতি প্রতাপের প্রেমের কতকটা অতিরঞ্জিত কাহিনি। শেষে বললেন, ‘এখন তোমার কাছে এসেছি বাবা, কী করলে সবদিক রক্ষা পায়?’

কন্দর্পনারায়ণ বললেন, ‘সবই তো বুঝলাম, কিন্তু জিতামিত্র নাগ বড়ো প্রভাবশালী মানুষ। মোগলদের সঙ্গে সে বাণিজ্য করে। তা ছাড়া, মেয়েটিরই বা কী হবে?’

‘না না কন্দর্প, মেয়েটির ক্ষতি হোক তা কি আমরা চাইতে পারি! দাদা ঠিক করেছেন শরৎকুমারীর সঙ্গে প্রতাপের বিবাহ দেবেন। এখন তুমি যদি জিতামিত্র মহাশয়কে ডেকে ব্যাপারটা একটু বুঝিয়ে বলো। যদি ব্যবস্থা করো। হাজার হোক জিতামিত্র তোমার অধীনস্থ প্রজা। সে নিশ্চয়ই তোমার কথা ফেলতে পারবে না।’

কন্দর্পনারায়ণ কিছুক্ষণ ভাবলেন। প্রস্তাবটি খারাপ নয়। এই সূত্রে যশোরের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় হবে। কারণ, বঙ্গে মোগল শাসনে আবার কখন বিপর্যয় নেমে আসবে তার কোনও ঠিক নেই। তখন প্রতিবেশি ভূস্বামীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক না থাকলে বিপদে পড়তে হতে পারে।

মৌনতা ভেঙে তিনি বললেন, ‘আপনি উত্তম প্রস্তাব দিয়েছেন। যশোরের যুবরাজকে জামাতা করতে নিশ্চয়ই অরাজি হবেন না জিতামিত্র। তবে কন্যাশোকে সে এখন পাগলের মতো হয়ে গেছে। আমার কাছেও এসেছিল। আজ অপরাহ্নেই আমি তাকে ডেকে পাঠাব।’

সন্ধ্যার পূর্বে জিতামিত্র এলেন। দীর্ঘ মানুষটি যেন বিপর্যস্ত হয়ে গিয়েছেন। তারপরে যখন তিনি তাঁর কন্যার কথা জানলেন তখন বিপুল ক্রোধে তিনি ফেটে পড়লেন। তারপরেই শিশুর মতো কেঁদে উঠে বললেন,

‘আপনারা ঠিক বলছেন? আমার কন্যা জীবিত আছে তো! আপনারা মিথ্যা প্রবোধ দিচ্ছেন না তো?’

বসন্ত রায় উঠে গিয়ে প্রৌঢ় মানুষটির হাতে হাত রাখলেন। গভীর গলায় বললেন, ‘আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন তাত। আপনার কন্যার গায়ে সামান্য আঁচড়ও পড়েনি। আপনার কন্যা যে এখন আমাদেরও কন্যা। তার প্রতি কি অবিচার হতে দিতে পারি আমরা?’

বৃদ্ধ ছলছল চোখে বসন্ত রায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। বসন্ত রায়ের হাতের মধ্যে তার হাত থরথর করে কাঁপতে থাকল। চোখ দিয়ে নামতে থাকল জলের ধারা।

বসন্ত রায় ধূমঘাটে ফিরে এসে ধুমধাম করে বিবাহের আয়োজনে লেগে গেলেন। দিকে দিকে দূত ছুটল নিমন্ত্রণের বার্তা নিয়ে। গৌড়ের সুলতানের কাছেও দূত প্রেরিত হল। কয়েক দিনের মধ্যেই আত্মীয়রা যশোরে পৌঁছাতে শুরু করল। নানা স্থানে রাস্তা ও নদীঘাটের সংস্কার শুরু হল, যাতে নিমন্ত্রিত অতিথিদের যাতায়াতের কোনোরূপ ক্লেশ না হয়।

যশোরেশ্বরীর মন্দির নতুন করে সেজে উঠতে লাগল। তিনদিন ব্যাপী সেখানে পুজো অর্চনা শুরু হল। সেই উপলক্ষ্যে ও তৎপরবর্তী পর্যায়ে বিবাহ অনুষ্ঠানে সারা নগর নতুন করে সেজে উঠতে শুরু করল।

খুল্লতাত তো প্রতাপকে ধূমঘাট থেকে নির্বাসন দিয়েছেন। কিন্তু চোরা না শুনে ধর্মের কথা। সে গোপনে ঘোড়া নিয়ে চলে আসে ধূমঘাটের প্রমোদ-উদ্যানের পিছনের কাননে। সেখান থেকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে নির্দিষ্ট একটি অলিন্দের দিকে। শরৎকুমারীও জানে সেই গবাক্ষের সামনে দাঁড়াবার সঠিক সময় কখন। সেও সেই গবাক্ষের সামনে দাঁড়ায়। মুখে বিজয়িনীর হাসি। একদিন সাহস করে সে উদ্যানে নেমে আসে। বিবাহের আয়োজনে ব্যস্ত কেউই তাকে লক্ষ করে না।

প্রতাপের তো প্রলাপ বকার কোনও শেষ নেই।

শরৎকুমারী শুধু তার ভুবনমোহিনী হাসি হেসে বলে, ‘ডাকাত!’

‘তবে রে!’

প্রতাপ তার হাত ধরতে যায়।

শরৎকুমারী দৌড়ে চলে যায় গৃহের দিকে।

সমগ্র যশোরবাসী প্রায় মাসাধিক কাল ধরে উৎসব করল। বিক্রমাদিত্য দুঃস্থ প্রজাদের দান-ধ্যানের জন্য লক্ষাধিক মুদ্রা ব্যয় করলেন। কত সহস্র ব্রাহ্মণ ভোজন করালেন তার যেন কোনও হিসাব নেই। সকলে একবাক্যে স্বীকার করলেন ‘রাজকুমারের বিয়ে বুঝি এমনি করেই হয়।’

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%