শ্রীজাত
“অবস্থা কিন্তু এর পরেও বিশেষ ভাল নয় রাজামশাই। সে-কথা নিশ্চয় জেনেছেন আপনিও।”
বিদূষকের ভাঙা-ভাঙা খোনা গলায় বাক্যটা উচ্চারিত হল নগরীর রাজপ্রাসাদের খাসমহলে, সন্ধেবেলার দিকে। মেঘ করেছিল, একটু আগে বৃষ্টি হয়ে গিয়েছে এক পশলা। এবারে সামনের চত্বরে লোকের আনাগোনা ফের স্বাভাবিক হওয়া উচিত, কিন্তু কাঠের মশমশে মেঝেতে জুতোর আওয়াজ তুলে পায়চারি করা রাজামশাই জানলার পর্দা সরিয়ে দেখলেন, সেখানে একটি লোকও নেই। এ যেন এক মৃতনগরী।
আজ তেমন কোনও বৈঠক ছিল না। একটু আগে সেনাপতি এসে রাজ্যের নানাদিকের খবর পেশ করে গিয়েছেন। বিপ্লবী আর তার দলবল কয়েদ হওয়ার পর অসন্তোষ আর ঝুটঝামেলা একটু কমেছিল ঠিকই, কিন্তু ক’দিন আগে বিপ্লবীর মৃত্যুদণ্ড ঘোষিত হওয়ার পর জায়গায় জায়গায় ফের বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। এবারে নাকি কিশোর কিশোরীরাও পথে নেমেছে, বুড়ো বুড়িদেরও দেখা যাচ্ছে কিছু। তারা বিপ্লবীর মুক্তি চায়, অবিলম্বে।
এসব শোনার পর স্বাভাবিকভাবেই রাজামশাইয়ের মেজাজ ছিল তিরিক্ষি। একটু হালকা হবেন বলেই সন্ধের অন্ধকারে তিনি ডেকে পাঠিয়েছিলেন বৃদ্ধ বিদূষককে। কিন্তু তাঁরও মুখে একই কথা শুনে রাজা বুঝলেন, এ-আলোচনার হাত থেকে আজ অন্তত নিস্তার নেই।
“জানি বিদূষক, জানি। আমি এ-রাজ্যের রাজা। সব খবর সবার আগে আমার কানেই আসে। কিন্তু খারাপ বলছেন কেন? সময় থাকতে বিদ্রোহ দমন করা গিয়েছে, এর চেয়ে ভাল খবর আর কী বা হতে পারে?”
বিদূষকের হাসি সন্ধের পর দেখা যায় না। শোনাও যায় না। কিছুক্ষণ নীরবতার পর শোনা গেল তাঁর জবাব, “আজ্ঞে তা বটে, তা বটে। ভাল তো নিশ্চয়ই। তবে একখানা বিষয় কিনা যাকে বলে ভারী চিন্তার।”
“কী সেটা? শুনি?” জানতে চাইলেন রাজামশাই।
বিদূষক বলল, “আজ্ঞে, এর আগে রাজ্যজুড়ে যারা ওইসব বিদ্রোহ-টিদ্রোহ করছিল, সবই ওই বিপ্লবীর স্যাঙাত বা ইয়ারদোস্ত। তাদের তো আপনি কয়েদ করে আচ্ছা এক সাজা দিয়েছেন, আপনার তুলনা হয় না। কিন্তু বিপ্লবীর মৃত্যুদণ্ড ঘোষিত হওয়ার পর এই যে দিকে-দিকে মশাল হাতে মিছিল হচ্ছে, এই যে প্রান্তে-প্রান্তে মানুষ পথে নামছে আর গাইছে রাজবিরোধী গান, এরা কিন্তু কেউ রাজামশাই ওই বিপ্লবীর বন্ধু-টন্ধু নয়। এরা এ-রাজ্যের সাধারণ নাগরিক। এরা কেউ হয়তো বিপ্লবীকে চোখেও দেখেনি কোনওদিন, হাত বা পা মেলানো তো দূরের কথা। চিন্তা বিপ্লবীকে নিয়ে নয়, সে তো আপনি সামনের পূর্ণিমাতেই নিকেশ করে ফেলবেন। তার দলবলও সব খতম হবে। কিন্তু বলছিলাম কী, গোটা রাজ্যই যদি পথে নামতে থাকে, তা হলে এ ভারী বিপদের কথা।”
রাজামশাই কথাখানা শুনে বেশ খানিকক্ষণ পায়চারি করলেন। কাঠের উপর জুতোর শব্দে গমগমিয়ে উঠল বিশাল ঘর। আরও বেশি করেই শোনা গেল তাঁর জুতোর আওয়াজ, কেননা বাইরে জনমানবের গুঞ্জন আজ নেই। তারপর এক জায়গায় থিতু হয়ে তিনি বললেন, “এ আপনাদের অতিরঞ্জন বিদূষক। আমি তো সেনাপতির কাছেও খবর পাচ্ছি। সব রাজ্যে সব সময়েই কিছু না কিছু দিক-ভুল-করা মানুষ থাকে। তাদের বোঝাতে হবে, পথে আনতে হবে। আর যদি সেভাবে না হয়, তা হলে...”
“তা হলে কী, মহামান্য রাজামশাই?” হাত কচলে জিজ্ঞেস করলেন বিদূষক।
“তা হলে তাদের সকলের জায়গা হবে বহিরাগত শিবিরে। সোজা হিসেব,” চোয়াল শক্ত করে জবাব দিলেন রাজামশাই। বাইরে তখন জোনাকিরা কুয়াশার মধ্যে অরণ্যে ফেরার পথ খুঁজছে।
“আজ্ঞে, ছোট মুখে বড় কথা রাজামশাই, সেটা বোধহয় ঠিক হবে না। সকলেই যদি শিবিরে চলে যায়, তা হলে রাজ্যে আর থাকবে কে, বলুন?”
অন্য কেউ হলে রাজা হয়তো রেগেমেগেই উঠতেন, কিন্তু বৃদ্ধ এই বিদূষক অকাজের কথা কখনও বলেন না বলেই শান্ত হয়ে শুনলেন। তারপর বললেন, “কথাটা আপনি ভুলও বলেননি বিদূষক। সামনের বছরে আমরা যুদ্ধে যাব। মানুষ তো চাই। মানুষ শুধু চাই না, মানুষকে পাশে চাই। কী করা যায় বলুন? আপনার বুদ্ধি কী বলছে?”
বিদূষক কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, “আজ্ঞে, এই যে বিপ্লবীকে না চিনে না জেনেও মানুষ পথে নামছে, তারা কিন্তু বিপ্লবীকে বাঁচাতে নামছে না কেবল।”
“তা হলে?” জিজ্ঞেস করলেন ধাঁধায় পড়া রাজা।
“আজ্ঞে, মানুষের চেয়েও ভয়ংকর শক্তিশালী হল তার ভাবনা। তার চিন্তা। তার দর্শন। তার আদর্শ। এইসব খুব সাংঘাতিক জিনিস রাজামশাই। এসব জিনিস সহজে মরে না। বিচ্ছিরি রোগ একেবারে। বিপ্লবী যদি মরেও যায়, তার ভাবনা যদি বেঁচে থাকে, তা হলে সেই মৃত্যুদণ্ডে কোনও লাভ হবে না আখেরে।”
রাজা কথাটা অনুধাবন করার চেষ্টা করলেন বটে, কিন্তু পুরোপুরি পারলেন না। পালটা প্রশ্ন করলেন, “তা হলে আপনি বলছেন, যে-ছেলে সারা নগরীর সামনে আমাকে অপমান করার স্পর্ধা দেখাল, তাকে ছেড়ে দেব?”
বিদূষক ফের হেসে মাথা নেড়ে বললেন, “না-না, ওকে আপনি মেরে ফেলুন। তাতে কিছু না। চিন্তা আরেকজনকে নিয়ে। সে যতদিন এভাবে চলবে, ততদিন বিপ্লবীর ভাবনার মৃত্যু নেই।”
রাজা বুঝতে না পেরে বললেন, “হেঁয়ালি না করে বলুন, কী বলতে চাইছেন? কে সে?”
বিদূষক বললেন, “আজ্ঞে অপরাধ নেবেন না। স্বয়ং রাজকন্যা।”
এমন যখন চলছে রাজপ্রাসাদের অন্তরালে, তার একপ্রহর আগে ভিনদেশিকে অরণ্যের কাঠের বাড়ি অবধি নিয়ে এসেছে রাজকন্যার দুই সহচরী। ভিনদেশি তো আপনমনে দেখে বেড়াচ্ছিল অরণ্যের চারপাশ, সহচরীরা এসে তাকে ভারী অনুরোধ করে, রাজকন্যার কাছে একবার যাওয়ার জন্য।
সে যখন জানতে চায়, রাজকন্যার কাছে কেনই বা যেতে হবে তাকে, তখন দুই সহচরী শেষ কয়েকদিনের কথা বলে ভিনদেশিকে। তারা বলে, সেদিনের ঘটনার পর থেকে রাজকন্যার জিভের স্বাদ, মুখের রুচি, সব গায়েব হয়ে গিয়েছে। বেচারি আজ এতদিন হল একটা দানাও দাঁতে কাটেনি। তার শরীর হয়ে পড়ছে ক্লান্ত ও অবশ, ত্বক হয়ে পড়ছে নির্জীব ও শুকনো। তারপর যখন থেকে সে শুনেছে বিপ্লবীর মৃত্যুদণ্ডের আদেশ হয়েছে, সেও একরকম নিজেকে শেষ করে দেওয়ার দিকেই এগিয়ে চলেছে। অথচ রাজকন্যা যে মোটেও ছিল না এমনটা, সে যে ছিল ভীষণ জেদি আর তেজী একজন মেয়ে, সে-কথাও ভিনদেশিকে বলে দুই সহচরী। আর বলে, তারা রাজকন্যাকে এভাবে শেষ হয়ে যেতে দিতে পারে না। তারা খবর পেয়েছে ভিনদেশি কে, সে কী করে। তাই এসেছে তার সাহায্য প্রার্থনা করতে।
এসব কথা বলতে-বলতে বিকেলের অরণ্য ধরে তারা হাঁটছিল কাঠের বাড়ির দিকেই, যেখানে নজরবন্দি আছে রাজকন্যা। বৃষ্টি হচ্ছে অল্প স্বল্প, ভিজে যাচ্ছে ভিনদেশির পোশাক, দুই সহচরীর গোলাপি ডানা আর কালো ঘোড়ার কেশর। ভিনদেশি যখন জিজ্ঞেস করল সে তা হলে কী সাহায্য করতে পারে, তখন দুই সহচরী তাকে জানাল, বিপ্লবীকে চুমু খাবার পর থেকেই রাজকন্যার মুখের স্বাদ চলে গিয়েছে। ভিনদেশি যেন তার মন থেকে সেই চুম্বনের স্মৃতি মুছে ফেলে। বিপ্লবী শুনল সবটা, কিন্তু বলল না যে, সেই চুম্বনের সময় সেও একজন সাক্ষী ছিল। অবশ্য ভিনদেশি জানতে চাইল, যদি রাজকন্যা তাতে রাজি না হয়, তখন কী হবে? তাতে দুই সহচরী বলল, তাকে সত্যি কথাটা বলার দরকারই বা কী। বরং বলা যাবে, ক’দিন শরীর খারাপ বলে মাথায় মালিশ করার লোক নিয়ে আসা হয়েছে।
মাথা নেড়ে এতে অসম্মতি জানাল ভিনদেশি। সে সাফ বলেই দিল দুই সহচরীকে যে, যার স্মৃতি নিয়ে কাজ, তার সম্মতি ছাড়া এ-জিনিস হতেই পারে না। সে ভারী নীতিবিরুদ্ধ কাজ হবে। তা সে করতে পারবে না কক্ষনও। তখন দুই সহচরী বলল, তা হলে সে যেন রাজকন্যাকে বোঝানোর চেষ্টা করে।
এই করতে-করতে তারা এসে পৌঁছল কাঠের বাড়ির দরজায়, যেখানে দুই প্রহরী দাঁড়িয়ে আছে। ভিনদেশিকে আসতে দেখে তারা আরও সজাগ হল। একবার তল্লাশি চালাল সারা শরীরে হাত বুলিয়ে, তারপর ছেড়ে দিল। রাজকন্যা একটু অবাকই হল ভিনদেশিকে দেখে, আরও অবাক হল দুই সহচরীর মুখে তার কাজের পরিচয় পেয়ে। স্মৃতি বদল করে দেয়, এমন মানুষও তা হলে আছে? ভারী অদ্ভুত তো! মনে মনে ভাবল রাজকন্যা। মুখে যদিও তার কিছুই সে টের পেতে দিল না। আর রাজকন্যাকে দেখেই সেদিনের চত্বরের তাজা টগবগে মেয়েটির সঙ্গে তফাত করতে পারল ভিনদেশি। এ যেন একেবারে আলাদা কোনও মানুষ।
সহচরীরা অবশ্য বলে-বলে হাল ছেড়ে দিল। উঁহু, রাজকন্যা কোনও মূল্যেই বিপ্লবীকে চুম্বন করার স্মৃতি হারাতে চায় না। তাতে যদি তার মুখে স্বাদ না ফেরে না ফিরুক, তাতে যদি সে উপোস করতে-করতে মরে যায় যাক, কিন্তু জীবনের শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত ওই চুম্বনের স্মৃতিকে সে আঁকড়ে ধরে রাখতে চায়। মন বড্ড দুঃখেই ভরে গেল দুই সহচরীর। তাদের প্রিয় বান্ধবীকে সারিয়ে তোলার তা হলে আর কোনওই উপায় রইল না।
“তা হলে তোমরা গল্প করো দু’জনে...” বলে দুই সহচরী বাড়ির বাইরে এসে তাদের গোলাপি সুগন্ধী ডানা মেলে উড়ে গেল নগরীর দিকে। সন্ধের সময় বাড়িবন্দি থাকা তাদের এক্কেবারে ভাল লাগে না। একটু এদিক ওদিক ঘুরে না বেড়ালে খুব মনখারাপ হয়। তাদের ডানা ঝাপটানোর শব্দ বাতাসে মিলিয়ে গেলে শুরু হল রাজকন্যা আর ভিনদেশির কথা বলা।
রাজকন্যা: সত্যি তুমি স্মৃতি বদলে দিতে পারো, ভিনদেশি?
ভিনদেশি: লোকে তো তাই বলে রাজকন্যা।
রাজকন্যা: কীভাবে পারো তুমি এমনটা?
ভিনদেশি: সে তো আমি জানি না। পারি, এটুকু বলতে পারি। কিন্তু আপনি তো প্রমাণ করার সুযোগ দেবেন না আমাকে।
রাজকন্যা: আমাকে আপনি-আজ্ঞে করতে হবে না তোমায়।
ভিনদেশি: সে বললে চলে? আপনি এ-রাজ্যের রাজকন্যা।
রাজকন্যা: নামেই রাজকন্যা। দেখছই তো, বন্দি আছি। আমি চাই না রাজকন্যা হতে। আমি চাই এ-রাজ্যের হাজার মানুষের একজন হতে, যারা অধিকারের লড়াই লড়ছে আজ।
ভিনদেশি: বেশ। তোমাকে তুমিই বলব তা হলে। কিন্তু রাজকন্যা হয়েও যে তুমি তাদের সঙ্গে সামিল হয়েছ, এখানেই তুমি আরও আলাদা হয়ে গিয়েছ। বাকি সব রাজ্যের রাজকন্যারা কিন্তু ভারী মামুলি। তাদের মতো তো নও তুমি।
রাজকন্যা: মিশে আর থাকতে পারলাম কই। বন্দি হয়ে গেলাম তার আগেই। জানি না এর পর কী হবে। একেক সময়ে মনে হয় সব ভেঙে বেরিয়ে যাই, আবার মনে হয় অপেক্ষা করি মৃত্যুর জন্য। বিপ্লবীর কাছ থেকে আলাদা হয়ে গিয়ে আমার কেমন যেন দিক হারিয়ে গিয়েছে ভিনদেশি।
ভিনদেশি: তুমি তোমার বিপ্লবীকে খুব ভালবাস, না?
রাজকন্যা: আমার নয়, সকলের বিপ্লবী। সবাই তাকে ভালবাসে। আমিও বাসি। আমার মতো করে। কিন্তু তাকে পাওয়ার উপায় আমার আর নেই।
ভিনদেশি: দ্যাখো, এখনও তো সময় আছে ক’দিন। যদি রাজা তাঁর মত বদলান।
রাজকন্যা: বহুদিন পর হাসির কথা শোনালে ভিনদেশি। বদলানোর মতো মত এ-রাজার নেই।
ভিনদেশি: তা হলে এখন আমার কী করণীয় রাজকন্যা? তুমি তো স্মৃতি বিনিময় করতে চাও না।
রাজকন্যা: ঠিক তা নয়। তোমার সঙ্গে কথা বলতে-বলতেই আমার মনে হল, একখানা স্মৃতি আছে, যা আমি ভুলে যেতে চাই। তুমি পারো, সেই স্মৃতি মুছে নতুন কোনও স্মৃতি ভরে দিতে?
ভিনদেশি: সেটাই তো আমার কাজ রাজকন্যা। আমি যে এই একটি কাজই পারি। বলো, কোন স্মৃতি ভুলে যেতে চাও তুমি?
রাজকন্যা: ছোটবেলায় এক ভারী অদ্ভুত ছেলের সঙ্গে খুব বন্ধুত্ব হয়েছিল আমার। সে এই দেশের নয়। এসেছিল কোথাও থেকে, আবার চলেও গিয়েছে কোথাও। কোথায় গিয়েছে, জানি না। ফিরেও আসেনি কোনওদিন। তার কথা মনে পড়লে বড় কষ্ট হয় আমার আজও। ভেবেছিলাম বাবা-মা-র মৃত্যুসংবাদ ভুলিয়ে দিতেও বলব তোমায়, কিন্তু নাহ। সেটা থাক। আগুন জ্বালাতে হলে কয়লা লাগেই। তা সে যতই কালো হোক। এই বন্ধুর সঙ্গে কাটানো দিনগুলো ছিল সত্যিই সুন্দর। কিন্তু আজ সেসব মনে করলে বড় কষ্ট পাই, কেন কে জানে। তুমি পারবে, আমার স্মৃতির ভিতর নেমে সেইসব দিনগুলো খুঁজে বের করে তাদের মুছে ফেলতে? পারবে, ভিনদেশি?
ভিনদেশি: পারব রাজকন্যা। অনেকখানি গভীরে নামতে হবে আমায়, আর তোমাকে দিতে হবে বেশ কিছুটা সময়। আজ তো হবে না।
রাজকন্যা: কাল? কাল এসো তা হলে?
ভিনদেশি: বেশ। কাল বেলা দ্বিপ্রহরে আসব তবে। আর বলো, এই বন্ধুর স্মৃতির বদলে তুমি কোন স্মৃতি পেতে চাও?
রাজকন্যা: সমুদ্র। ঢেউ ওঠা, গর্জন করা, ঝাঁপিয়ে পড়া সমুদ্রের স্মৃতি। জানো ভিনদেশি, আমি কক্ষনও সমুদ্র দেখিনি।
রাজকন্যা আর ভিনদেশির যখন কথা হচ্ছে অরণ্যের মাঝখানে কাঠের বাড়িতে, তখন নেমে এসেছে রাত আর নগরীর প্রাসাদে রাজার সঙ্গে বিদূষকের কথা আরও কিছু দূর গড়িয়েছে। রাজা বললেন, “ও মেয়ে বরাবরের বেয়াড়া। আমি জানতাম এমন একটা কিছু লোক হাসানো কাণ্ড সে ঘটাবেই।”
শুনে বিদূষক বললেন, “লোক কিন্তু হাসেনি রাজামশাই। লোক অনেক বেশি জোর পেয়েছে। আজ যদি রাজকন্যা বিপ্লবীর হাত ধরে পাশে এসে না দাঁড়াতেন, বা সেদিন সকলের সামনে যাকে বলে ওইসব না করতেন, তা হলে এ-আন্দোলন এত জোর পেত না। হ্যাঁ, পেত, ও-ছেলেরও এলেম কিছু কম নয়। কিন্তু তাদের নিকেশ করে ফেললে সবটা চুকে যেত। এখন এই যে গোটা নগরী জেনে গিয়েছে যে খোদ রাজকন্যাও আন্দোলনে নেমেছেন, এইটাতে তারা ভারী এক জোর পেয়ে গিয়েছে। তাদের ন্যায় অন্যায় গুলিয়ে গিয়েছে একেবারে। রাজকন্যা তো কেবল রাজকন্যাই নন, তাঁর স্বর্গীয় পিতা ও মাতার উত্তরাধিকারী। আর আপনি তো জানেন, প্রয়াত রাজা-রানির জন্য নগরবাসীদের দরদ আজও মরেনি।”
রাজা এবার দাঁত কিড়মিড় করে এগিয়ে এসে বললেন, “এর জন্যে তো আপনিই দায়ী। সেই কোন ছোট বয়সেই মেয়েটা মরে নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারত। আপনি বললেন ওই গুহায় মাংসখেকো ভালুক থাকে। সেই মতো রাজকন্যাকে পাঠানোও হল সেখানে রাজদাসীকে দিয়ে। কিন্তু কোথায় ছিল আপনার ভালুক? বদলে সে দিব্যি খিলখিল করতে-করতে আবার প্রাসাদে ফিরে এল। আমি তো ভেবেছিলাম ভালুক তাকে খেয়ে হজম করে ফেলেছে। আপনার মতো বিচক্ষণ মানুষ এরকম একখানা ভ্রান্ত বুদ্ধি দিলে তো এই অবস্থাই হবে। সেদিন রাজকন্যা মরে গেলে আজ আর এই ঝামেলা আমাকে পোহাতে হত না।”
বিদূষক কিছুটা কাঁচুমাচু মুখ করেই বললেন, “আমার এ-অপরাধের ক্ষমা নেই, আমি জানি। কিন্তু আমার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, ওই গুহায় এক ভয়ানক আর বিশালদেহী ভালুক থাকে। আর সে নরমাংস পেলে কিচ্ছুটি চায় না, নিমেষে সাবাড় করে ফেলে। এটা আমি মন থেকে বিশ্বাস করতাম বলেই বলেছিলাম আপনাকে। আমারই এক অনুচর আমাকে এ-তথ্য দিয়েছিল। বোঝাই যাচ্ছে সে ঠিকমতো জানত না ব্যাপারটা। তবে এখন তো আর এ নিয়ে ভেবে লাভ নেই রাজামশাই।”
“তা হলে আপনিই বলুন, রাজকন্যাকে নিয়ে কী করা যায়। মেরে আমি তাকে ফেলতেই পারি। কিন্তু তা হলে চারপাশের অশান্তি আরও বাড়বে বই কমবে না।”
কেদারায় পিঠ হেলান দিয়ে বসে কথাটা বললেন রাজা। বিদূষক বললেন, “রাজকন্যাকে মেরে লাভ নেই। ওর ভাবনাকে, আদর্শকে, দর্শনকে মারতে হবে যে করে হোক। ভিতরে-ভিতরে না পারুন, অন্তত উপরে-উপরে। এর পরের জনসভায় তিনি যেন আপনার পাশে দাঁড়িয়ে মিনার থেকে সকলের উদ্দেশে বলেন যে, আন্দোলনের পথ ভুল ছিল। ব্যাস। তা হলেই কাজ হবে। তবে এখনই নয়। আগে বিপ্লবী মরুক, তারপর।” বলে একখানা দেঁতো আর খোনা হাসি হাসলেন বিদূষক। সে-রাতে তাঁরা কেউ আর জানলার ধারে গিয়ে দাঁড়ালেন না বলে বুঝতে পারলেন না, জানলার নীচে, বাগানের ঘাসে, কয়েকখানা টাটকা খসে পড়া পালক শুয়ে আছে। সুগন্ধী, আর গোলাপি।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন