অষ্টাদশ অধ্যায়

শ্রীজাত

বিস্তৃত জলরাশির সামনে রাজকন্যা দাঁড়িয়ে আছে। কেবল বিস্তৃত বললে বোঝানো যাবে না অবশ্য। যতদূর চোখ যায়, ততদূর কেবল জল। জল আর জল আর জল। রাজকন্যা দাঁড়িয়ে আছে চিকচিক করতে থাকা বালির উপর খালি পা রেখে। রোদ বেশি নেই, আবার মেঘও নেই তেমন। তাই বালির একখানা মিঠে উত্তাপ পায়ে লাগছে, যার মধ্যে আঁচ নেই, আরাম আছে।

জলের রং পালটাতে-পালটাতে দূরে মিলিয়ে যেতে-যেতে এক সময়ে মিশে গিয়েছে আকাশের গায়ে। সেই আকাশ, যেখানে ভাঙা মেঘের ফাঁক থেকে সূর্যের রশ্মি এসে পড়েছে জলে, বালিতে। জলের একটা অংশ চিকচিক করছে সোনালি হয়ে, বাকি অংশের কিছুটা সবজেটে, কিছুটা ধূসর, কিছুটা আবার গাঢ় নীল। একেক দূরত্বে একেক রকমের রং। অথচ সেই একই জলের শরীর।

এরকমটা কখনও এর আগে দ্যাখেনি রাজকন্যা। ছোটবেলায় সে গল্প শুনেছে বটে সমুদ্রের, তার বাবা একবার গিয়েছিলেন দূরদেশে, তিনি ফিরে এসে শুনিয়েছিলেন সমুদ্র কত বিশাল, কেমন বড় বড় তার ঢেউ। ওইটুকু বয়সে রাজকন্যা সেসব শুনলেও, কল্পনা করার মতো জোর তার ছিল না। আর একবার, সে যখন কিশোরী, তখন এক ভারী বৃদ্ধ জেলে গ্রামের পথে বলছিলেন সমুদ্র থেকে বেঁচে ফেরার গল্প, রাজকন্যা আপনমনে ঘুরে বেড়াতে-বেড়াতে শুনে ফেলেছিল সেসব। সমুদ্রে নাকি জলদৈত্য থাকে, একেক জায়গায় এমন ঘূর্ণি থাকে যে বিরাট সব জাহাজও নিমেষে তলিয়ে যায়, আর সমুদ্রের বুকে ঝড় উঠলে তাদের প্রাসাদের চেয়েও উঁচু ঢেউ এসে আছড়ে পড়ে সৈকতে, এসব গল্প সে শুনেছিল সেই বৃদ্ধ জেলের মুখে। কিন্তু সেসবের কিছুই আজকের এই দৃশ্যের সঙ্গে পাশাপাশি রেখে তুলনা করা যায় না।

একবার পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখতে পেল, বালির এই সৈকত যেখানে শেষ হচ্ছে, সেখানে উঠে গিয়েছে পাহাড়। নানারকম শ্যাওলা রঙের গাছগাছালিতে ঢাকা পাহাড়, মাঝেমধ্যে যাদের ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে তার বাদামি বা ছাই-ছাই পাথর। রুক্ষ, বয়স্ক। যতদূর সৈকত বিছিয়ে আছে, তার ধারে-ধারে দাঁড়িয়ে আছে এমন সব উঁচু পাহাড়। যেন ছোট্ট মেয়েকে পাহারা দিচ্ছে তার প্রৌঢ় পিতা, এমন মনে হল রাজকন্যার।

কিন্তু এতক্ষণ ধরে দেখার পরেও, রাজকন্যার দু’চোখ ভরে গিয়েও সমুদ্রকে দেখা শেষ হচ্ছে না কিছুতেই। একসঙ্গে এতখানি জলের বিস্তারকে নিজের মধ্যে বুঝে নিতেই বেলা পেরিয়ে যাচ্ছে। অবশ্য, কী বেলা, সেটা বোঝা যাচ্ছে না। এ কি ভোরের আলো, না সন্ধের মুখ, তা বলে দেওয়ার জন্য কেউ আর এই সৈকতে নেই। জনহীন বালির চাদরে পা বিছিয়ে রাজকন্যা একাই দাঁড়িয়ে আছে সমুদ্রের সামনে। তার পায়ের কাছে এসে সাদা আর ঘন ফেনায় শব্দ করে ভেঙে পড়ছে ঢেউ। এ-দৃশ্য প্রথমবার দেখতে পাওয়ার রোমাঞ্চে তার সারা শরীর জেগে উঠছে কেমনভাবে যেন, যেমনটা আগে আর কক্ষনও হয়নি। এই বিশালত্বের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের দেখা, জানা, বোঝা সমস্ত কিছুকে এত ছোট, এত তুচ্ছ লাগছে যে একইসঙ্গে বিষণ্ণ আর আনন্দিত হয়ে উঠছে সে। এই বোধের নাম কী? তা অবশ্য রাজকন্যা জানে না।

তার এতদিনকার অযত্ন করা শুকনো চুলগুলোকে সে আর কিছুতেই বাধ্য রাখতে পারছে না আজ। সমুদ্রের দূর বুক থেকে ছুটে আসা বেলাগাম বাতাসের মুখে তারা মেলে ধরছে নিজেদের, যেন তাদেরও ইচ্ছে করছে হাওয়ার সঙ্গে খেলা করতে। তার পোশাকের হাতা আর পায়ের কাছের নকশাদার ঘের ফুলে-ফুলে উঠছে সেই সোঁদা, ভেজা, আর নোনা বাতাসের দমকা ঝাপটা লেগে। এমন শব্দও তো সে শোনেনি কোনওদিন। এ-শব্দের সঙ্গে তার এত বছরের শোনা কোনও শব্দের এতটুকু মিল নেই। এক শান্ত গর্জন, এক উদাসীন ডাক, যা মুহূর্তের জন্যও ক্লান্ত হয়ে থেমে যাচ্ছে না।

দূরে, খুউব দূরে, সমুদ্রের বুকে একখানা পালতোলা জাহাজ বুঝি দেখা যাচ্ছে। ছোটই দেখা যাচ্ছে বটে, কিন্তু বোঝা যায়, বিশাল তার আকৃতি। পঞ্চাশখানা পাল তো হবেই, আর নিশ্চিত হবে কাঠের উপর ধাতুর কারুকাজ করা তার চওড়া পাটাতনের শরীর। সে কেমন হেলতে দুলতে ভেসে যাচ্ছে সমুদ্রের বুকে। ইশ! যদি রাজকন্যা আজ সেই জাহাজের সওয়ার হতে পারত! ভাবতে-ভাবতে রাজকন্যা বালিতে পোশাক পেতে বসল। এই হাওয়ার মধ্যে কেমন যেন একখানা ঝিমধরানো নেশা আছে, শরীর তার আস্তে-আস্তে ভারী হয়ে আসছে যেন। কোথাও যেতে ইচ্ছে করছে না এখান থেকে। কেবল মনে হচ্ছে ধু ধু জলের দিকে তাকিয়ে থাকতে, যতক্ষণ না নেমে আসে রাত। কিন্তু চোখের পাতা, সেও যে ভারী হয়ে আসছে। ভাবতে-ভাবতে, বালির উপর এলিয়ে পড়ে ঘুমিয়ে গেল রাজকন্যা।

তার চোখ যখন খুলল, সে দেখতে পেল সে বসে আছে নিজের কাঠের বাড়ির বাইরের ঘরে, সেই দোলনকেদারার উপর, আর তার শরীর দুলছে অল্প-অল্প। কেমন একখানা ঘোরলাগা আচ্ছন্ন চোখ আর ভারী মাথা নিয়েই রাজকন্যা টের পেল, তার কপালের পাশ থেকে দু’জোড়া লম্বা আর শীতল আঙুল সরে যাচ্ছে আস্তে-আস্তে। রাজকন্যা ঘুরে তাকাতেই ভিনদেশি বলল, “কী, দেখতে পেলে?”

ভিনদেশির মুখে একখানা ক্লান্ত আর অবসন্ন হাসি। কেন কে জানে, ঘুমিয়ে পড়ার আগেও তাকে এমনটা দেখাচ্ছিল না, স্পষ্ট বুঝতে পারল রাজকন্যা। যদিও তার ঘোর কাটেনি তখনও, তবু সে উঠে দাঁড়িয়ে ভিনদেশির হাতদুটো নিজের মুঠোয় চেপে ধরে বলল, “এ তুমি আমায় কী দেখালে ভিনদেশি?”

ভিনদেশি চোখ নামিয়ে নিল একবার। কাঠের মেঝের দিকে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ। তারপর রাজকন্যার চোখের দিকে তাকিয়ে, আবারও সেই ক্লান্ত হাসিখানা হেসে জবাব দিল, “যা তুমি দেখতে চেয়েছিলে রাজকন্যা। সমুদ্র। একে আমি দেখেছিলাম পূর্বদিকের এক দেশের শেষপ্রান্তে থাকাকালীন। সেখানে আকাশ, বালি, গাছপালা সব অন্যরকম। আর ভারী অন্যরকম সেখানকার সমুদ্র। সেই দৃশ্যই আজ থেকে তোমার মনে থাকবে, স্মৃতি হয়ে।”

রাজকন্যার চোখে আবার অল্প জল চলে এল। সেটাকে চোখের কোণে ধরে রেখে সে বলল, “আর তুমি কী দেখলে, আমার স্মৃতির মধ্যে নেমে?”

ভিনদেশি বলল, “সে তো আর তোমার জানতে চাওয়ার কথা নয়। যা-যা তুমি ভুলে যেতে চেয়েছিলে, তার মধ্যে নেমেছি, হেঁটে বেড়িয়েছি, তারপর হাতে করে শুষে নিয়েছি তোমার সে-সমস্ত স্মৃতি। আর সে নিয়ে কোনও কথা নয়। আর কখনও তোমার সেসব মনে পড়বে না। তার বদলে রইল এই সমুদ্র। তোমার যখন ইচ্ছে, মনে মনে তার ধারে গিয়ে দাঁড়িও। দেখবে, শান্তি পাবে ঠিক।”

এমনভাবে কথাগুলো বলল ভিনদেশি, তার উত্তরে রাজকন্যা আর কিছু বলতে পারল না। বরং আরও-একটু শক্ত করে চেপে ধরল ভিনদেশির হাত। আর সেই চাপ লেগেই, কী আশ্চর্য, তার দু’চোখের কোণ বেয়ে গড়িয়ে নীচে নামল, এতক্ষণের আটকে থাকা জল। যা উষ্ণ আর নোনতা। ঠিক তার প্রথম দেখা সমুদ্রের জলের মতোই।

এমনভাবে কিছুক্ষণ থাকার পর, যখন কাঠের কুঠির বাইরে ঝিঁঝিঁডাকা রাত নামছে, রাজকন্যা জিজ্ঞেস করল, “আমি জানি এই কাজের মূল্য অর্থ দিয়ে ধার্য করা যায় না। তবু, ভিনদেশি, আমি তোমার পারিশ্রমিক হিসেবে এইটা দিতে চাই।”

বলে, সেই ঘরেরই কাঠের দেরাজ থেকে বের করে আনল একখানা মণিমুক্তো বসানো কণ্ঠহার, যার দাম বাজারে আকাশছোঁয়া। ভিনদেশির বিষণ্ণ হাসিটা আরও একবার দেখতে পেল রাজকন্যা, যখন ভিনদেশি উত্তরে বলল, “সমুদ্রের বিনিময়ে আমার যা পাওয়ার, আমি পেয়েই গিয়েছি। তার দাম তুমিও দিতে পারবে না। বরং আমার তোমাকে কিছু উপহার দেওয়ার আছে। আজ নয়, কিন্তু শিগগির। ভাল থেকো রাজকন্যা। আজ আসি। যদি আর কখনও দেখা না-ও হয়, আমি ভুলব না তোমাকে।”

এরপর, রাজকন্যাকে আর কোনও কথা বলার সুযোগ না দিয়েই বেরিয়ে পড়ল ভিনদেশি। রাজকন্যা একছুট্টে বারান্দায় বেরিয়ে দেখল, অল্প জ্যোৎস্নায় ঢাকা অরণ্যে পায়ের শব্দ তুলে, ঘোড়ার লাগাম হাতে হেঁটে চলে যাচ্ছে সফেদ আলখাল্লা পরা এক মানুষ। তার পোশাকে আশ্চর্য আলো ফেলেছে সেই চাঁদ, যে আর দু’রাত পরেই তৈরি করবে পূর্ণিমা।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%