একবিংশ অধ্যায়

শ্রীজাত

এরপর এল সেই দিন। বিপ্লবীর মৃত্যুদণ্ড আজ। ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই তাকে স্নান করানো হয়েছে, পরানো হয়েছে আনকোরা পোশাক, খেতে দেওয়া হয়েছে সুস্বাদু সব খাদ্য, যার একটাও সে মুখে তোলেনি। এই প্রথম তার শরীরে উঠে এসেছে ধবধবে সাদা কয়েদির পোশাক, যাতে পাথর ছুড়লে প্রতি আঘাতে ফুটে ওঠা রক্তের রং ভাল করে প্রকাশ পায়। তারপর তার পায়ে বেড়ি পরিয়ে, হাতে কড়া পরিয়ে হাঁটিয়ে নিয়ে আসা হয়েছে অরণ্যের মাঝখানে, নদীর ধারে, সাদা বালির চরে। একখানা মোটা গুঁড়ির সঙ্গে শক্ত করে বাঁধা হয়েছে তাকে। চারপাশে নিশ্ছিদ্র প্রহরা। এসব করে ফেলা হয়েছে সকাল শুরুর আগেই। বেলার দিকে রাজামশাই আসবেন সপারিষদ। তারপর তার পেয়াদারা শুরু করবে বিপ্লবীকে তাক করে পাথর ছোড়া, যতক্ষণ না সে রক্তাক্ত হয়ে প্রাণ ত্যাগ করে। বলা যায় না, পাথর একবার ছুড়তে শুরু করলে পেয়াদাদের থামানো মুশকিল। তাই বিপ্লবী মরে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর অবধিও পাথর ছোড়া চলতে পারে, যতক্ষণ না পেয়াদাদের আক্রোশ মেটে। পেয়াদাদের অবশ্য নিজস্ব আক্রোশ বলে কিছু নেই, মাইনে করা আক্রোশ। কিন্তু তেমন আক্রোশের দায়ই বড় বেশি।

ভোর-ভোর, বিপ্লবীকে এখানে নিয়ে আসার আগেই চরের চারপাশ ঘিরে ফেলা হয়েছে কড়া বেষ্টনী দিয়ে, যার এপারে থাকবেন রাজা, তাঁর সভাসদ আর পেয়াদারা, এবং বিপ্লবীও বাঁধা থাকবে এপারেই। ওপারে এসে দাঁড়াবে সাধারণ মানুষ। অন্য সময় হলে সাধারণ মানুষের হাতেও তুলে দেওয়া যেত পাথর, কিন্তু রাজা আর তাদের বিশ্বাস করেন না। পাথর হাতে পেলে তারা কার দিকে ছুড়ে বসবে, তার ঠিক নেই। তাই তারা আজ কেবল দর্শক। যারই সমর্থক হও না কেন তুমি, বিপ্লবীর এই ভয়াবহ মৃত্যু দেখতে হবে। অবশ্য নাগরিকদের কাউকে জোর করে আনানো হবে না ঘর থেকে, কেবল বিপ্লবীর সঙ্গীসাথীদের পেয়াদা দিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখা হবে একপাশে, যাতে তারা তাদের নেতার এই ভয়াবহ মৃত্যু দেখতে পারে।

বাসিন্দাদের কাউকে অবশ্য ডাকতেই হয়নি। তারা সারা রাত জেগে থেকে সকালের আলো শুরু হতে না হতেই দলে-দলে এসে জমা হয়েছে নদীর চরে, বিপ্লবীকে শেষবারের মতো দেখবে বলে। তাদের হাতে কোনও নিশান নেই, কোনও অস্ত্র নেই, মুখে কথা নেই। তারা সকলে স্থির। কেবল চোখে অসহায়ের চাহনি আছে। সেইটা সম্বল করেই কাতারে-কাতারে মানুষ জড়ো হয়েছে, সেই সকাল থেকে। আর আজ অরণ্যের মাঝখান দিয়ে বয়ে চলা নদীও যেন অন্যান্য পাঁচটা দিনের চেয়ে বেশি গতিময়, উচ্ছ্বল। কেন কে জানে, কিন্তু তার স্রোতের মধ্যে একখানা লঘুত্ব চোখে পড়ছে সকলের, এত বছরে যা ছিল না। সে কি তবে মানুষের হয়ে কথা বলতে চাইছে? নদীর মন বোঝা মুশকিল।

রাজার মনমেজাজ আজ ভাল হওয়ারই কথা, কেননা রাজ্যের মানুষকে এরকম কড়া একটা বার্তা দিলেই বাকিদের ঠান্ডা করা যাবে। তা হলেই সমস্যা মেটে। কিন্তু মেজাজ তাঁর বেজায় খারাপ। দু’খানা ঘটনায়। এক, আজ ভোর থেকে, বিদূষকের কোনও খোঁজ নেই। সেপাইরা তল্লাশি চালাচ্ছে গোটা রাজ্যে, কিন্তু পাওয়া তাঁকে যাচ্ছে না কোথাও। এ এক আশ্চর্য ব্যাপার বটে। রাজা শুনে একটু ভেঙেই পড়েছেন। কূটনৈতিক ব্যাপারে বিদূষকই ছিলেন তাঁর বড় ভরসা। এখন নিজেকে বেশি মাথা খাটাতে হবে ভেবেই খারাপ লাগছে আরও। তিনি রাজ্য চালাবেন, না মাথা খাটাবেন, ভেবেই হয়রান লাগছে। আর এও ভেবে পাচ্ছেন না, বিদূষক হঠাৎ আজকের মতো একটা দিনের আগে উবে গেলেনই বা কোথায়? যদিও এসব ভাবতে ভাবতেই তিনি তৈয়ার হয়েছেন, রওনা দিতে হবে নদীর দিকে।

দু’নম্বর ঘটনা, রাজকন্যা। তার ব্যবস্থা যদিও তিনি বেশ পোক্তভাবেই করেছেন, কেননা সে নিয়ে তাঁর দুশ্চিন্তার অন্ত ছিল না। এ ক’দিন তো তাকে কেবল নজরবন্দি করে রাখা হয়েছিল, আজ ভোরের একটু আগে থেকে নিঃশব্দে তার কাঠের কুঠির চারপাশে মোতায়েন করা হয়েছে অজস্র পেয়াদা, যাতে সে কিছুতেই বাড়ি থেকে বেরোতে না পারে। কেননা রাজকন্যা নদীর চরে হাজির হলে কী কাণ্ড যে ঘটাবে, তার নেই ঠিক। আগের দিন প্রাসাদ চত্বরে রাজকন্যার লজ্জাজনক কীর্তির কথা মনে পড়লে এখনও রাগে গা কড়মড় করে রাজামশাইয়ের। তাই ভেবেছিলেন, বিপ্লবীকে খতম করার আগে একবার মুখোমুখি কথা বলবেন। যদি কোনওভাবে রাজকন্যাকে বোঝানো যায়। বিদূষকের শেষ পরামর্শ তো সেইরকমই ছিল। কিন্তু একেবারে ভোররাতে যখন তিনি রাজকন্যার সঙ্গে একবার দেখা করার জন্য রীতিমতো জরুরি তলব পাঠিয়েছিলেন তার কুঠিতে, সে পেয়াদাদের মুখের উপর সাফ বলেছে, ‘আমার বাবা-মা-র হত্যাকারীর সঙ্গে আমার কোনও কথা নেই’। পেয়াদারা নিজেদের মুখ যথাসম্ভব মাটিতে নামিয়ে যখন রাজামশাইকে জানিয়েছে এ-কথা, তখনই তিনি প্রমাদ গুনেছেন। কোত্থেকে কথাটা রাজকন্যার কানে গেল, তা না বুঝলেও তিনি এটুকু বুঝেছেন, এবার এ-মেয়েকে না আটকালে বিপদ আছে।

রাজকন্যা অবশ্য বেরোতেও চায় না আজ। তাই সকালে উঠে বারান্দায় গিয়ে বাড়ির চারপাশে এত সৈন্য-সামন্ত দেখে একটু ম্লান হেসে আবার দরজা দিয়েছে ঘরের। খিদে তো চলেই গিয়েছিল অনেক আগে, আজ কতদিন যে সে মুখে একটা দানাও কাটেনি, নিজেও জানে না। তবু যে সে হেঁটেচলে বেড়াচ্ছে কোনওরকমে, তা ওই ভালবাসার জোরেই। আজ সেই ভালবাসার সুতোর একটা দিক ছিঁড়ে ফেলা হবে। তারপর তার বেঁচে থাকার অনেকখানি অর্থ রক্তের মতোই মিশে যাবে নদীর জলে। ঘরে বসে এসবই ভাবছিল সে।

দুই সহচরী তার, সকাল থেকে কী করবে ভেবে পাচ্ছে না। তবে তারা এটুকু বুঝেছে, আজ রাজকন্যার কোনও সান্ত্বনার দরকার নেই, প্রয়োজন নেই কোনও স্তোকবাক্যের। তাই তারাও ভারী মনখারাপ করে কাঠের বাড়ির আনাচকানাচে ভেসে বেড়াচ্ছে। ইচ্ছে করছিল একবার, নদীর চরে হাজির হতে, কিন্তু রাজকন্যার কথা ভেবেই তারা আর যায়নি। বিপ্লবীকে ওই অবস্থায় দেখতে তাদেরও ভারী কষ্ট হবে নিশ্চয়ই।

বেলা বাড়ল, নদীর চরের সাদা বালিতে এসে আগে ঠিকরে পড়ত রোদ, বহু বছর হল এই অরণ্যে তার ঢোকা বারণ। তার বদলে কুয়াশায় ছেয়ে গেল গোটা অঞ্চল, যেমন রোজ যায়। নদীর চরটা একটু ফাঁকা-ফাঁকা বলে এখানে কুয়াশা ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে। মোটা গাছের গোড়ায় শক্ত করে বাঁধা আছে বিপ্লবী, সেই ভোর থেকেই। এখনই দড়ির ফাঁস বসে যাচ্ছে তার বুকে, কোমরে, ছিঁড়ে ফেলতে চাইছে কয়েদির সাদা পোশাক। তবু তার মুখ থেকে কোনও শব্দ বেরোচ্ছে না, চোখ থেকে ঝরে পড়ছে না এক ফোঁটা ভয়ও। নির্ভীকভাবে সে তাকিয়ে আছে সোজা। তার চোয়াল কিন্তু এখনও আগের মতোই শক্ত, বুক এখনও আগের মতোই টানটান। সে জানে, কী হবে এরপর। জ্যান্ত অবস্থা থেকে একটার পর একটা পাথরের ঘা খেতে-খেতে ক্ষতবিক্ষত আর রক্তাক্ত হতে-হতে মারা যেতে হবে তাকে। কিন্তু তার জন্যেও সে প্রস্তুত। কেবল তার নির্ভীক চোখ একবার দেখতে চেয়েছিল তার ভালবাসার মানুষটাকে, রাজকন্যাকে। কিন্তু সে নিশ্চিতভাবেই জানে, আজ অন্তত রাজা সেটা হতে দেবেন না।

বেলা আরেকটু বাড়লে খবর এল, রাজামশাই এবার এদিকটায় আসছেন তাঁর পারিষদ আর সৈন্য নিয়ে। পেয়াদাদের ঠেলায় বন্ধনীর ওপাশে জড়ো হওয়া মানুষ দু’ভাগে ভাগ হয়ে পথ করে দিল রাজা আর তাঁর বাহিনীর আসার জন্য। যেইমাত্র রাজার নিশান দেখা গেল ঘোড়সওয়ারদের হাতে-হাতে আর দেখা গেল রাজার ঘোড়ায় টানা উঁচু গাড়ি, বিপ্লবীর সঙ্গীসাথীরা মাথা তুলে, গলা ছেড়ে ধরল তাদের নতুন বাঁধা গান...

না কিছুতেই তোমায় আমরা ভুলব না, ভুলব না

আর কিছুতেই আমরা তোমায় ভুলব না

জান লড়িয়ে মরব তবু হারার কথা তুলব না

হারার কথা তুলব না

আর কিছুতেই আমরা তোমায় ভুলব না

এই কুয়াশাই সাক্ষী থাকুক, সাক্ষী থাকুক রোদ

অন্ধকারের মুখের উপর আলোর প্রতিশোধ

এক মেঘে দিন হয় না কাবার, এক ঘুমে নয় রাত

আলগা যত করবে ততই শক্ত হবে হাত

মিথ্যে যাদের বারান্দা, সেই দরজাগুলো খুলব না

দরজাগুলো খুলব না

আর কিছুতেই আমরা তোমায় ভুলব না

যাও তুমি আজ, আমরা আছি, রইল তোমার মন

তোমার কথা লক্ষ মুখে ফুটবে সারাক্ষণ

এমন যাওয়া হয় না বিফল, যায় না হেলায় কেউ

পাহাড় ঠেলে সরাবে ঠিক এই জেহাদের ঢেউ

রইল তোমার শরীর বাগান, রক্ত দিয়ে ফুল বোনা

রক্ত দিয়ে ফুল বোনা

আর কিছুতেই আমরা তোমায় ভুলব না

আর কিছুতেই আমরা তোমায় ভুলব না

পেয়াদারা আবারও হতভম্ব। গান ঠেকানোর অস্ত্র তাদের কাছে নেই। একদিকে রাজা ঢুকছেন সাদা বালির চরে, আরেকদিকে বিপ্লবীর জন্য গাইতে-গাইতে ঝরঝরিয়ে কাঁদছে কমবয়সি সব ছেলেমেয়েরা। বিপ্লবীর চোয়াল এখনও শক্ত, বুক টানটান। চোখের কোনায় জল বা অনুতাপ, কোনওটাই নেই।

রাজা এসে বসলেন তাঁর জন্য প্রস্তুত করা বেদিতে। গানটান নিয়ে রাজা ভাবিত নন, ওটা উনি ভেবেইছিলেন হবে বলে। গাক, শেষবার গেয়ে নিক বেচারারা, এরকম একখানা ভাব নিয়ে তিনি বসলেন বেদিজুড়ে। নদীর একদিকের চরে উঁচু আসন তৈরি করা হয়েছে, চারপাশটা ঘিরেও দেওয়া হয়েছে। সেখানে এসেই বসেছেন রাজামশাই, তাঁর মন্ত্রীদের বেশ কয়েকজন, আর সেনাপতি। এই আসনের চারপাশ সশস্ত্র সৈন্যে ঘেরা। নদীর ওপাশে গাছের সঙ্গে বাঁধা আছে বিপ্লবী। দূরত্ব বেশি নয়। পাথর তাক করে ছুড়লে সটান গায়ে গিয়ে লাগবেই।

রাজা আসনে বসে দেখলেন একবার চারপাশে। ছেলেমেয়েদের গান থেমেছে। কারও মুখে আর কোনও কথা নেই। কেবল নদী বয়ে যাওয়ার শব্দ। সে থাক। নদীকে তো আর চুপ করানো সম্ভব না, ভাবলেন তিনি। বিপ্লবীর দিকে তাকালেন এবার। তাকিয়েই তাঁর ভিতরটা রাগে খাক হয়ে যেতে লাগল। এই একরত্তি একটা ছেলের জন্য এতদিনের ভোগান্তি, এতরকম অশান্তি। অবশ্য সেসব একটু পরেই মিটে যাবে চিরতরে, এটা ভেবে ভালও লাগল তাঁর। দেখলেন, বিপ্লবী সোজা তাঁর চোখের দিকেই তাকিয়ে আছে। একটু অস্বস্তি হল রাজামশাইয়ের, তিনি চোখ সরিয়ে নিলেন। প্রথমে ভেবেছিলেন ছোকরাকে কিছু বলার সুযোগ দেবেন শেষবারের মতো। তারপর মনে হল, নাহ থাক। আবার একরাজ্য লোকের সামনে কী বলতে কী বলে বসবে, এর কেবল মৃত্যুই প্রাপ্য।

শুভ কাজে দেরি নয়। একবার সেনাপতির সঙ্গে কথা বলে তাঁকে নির্দেশ দিয়ে রাজা নিজের বেদিতে আঁটো হয়ে বসলেন। অনেকক্ষণ ধরে উপভোগ করতে হবে ব্যাপারটা। রাজা বলামাত্র সেনাপতি নির্দেশ দিলেন সৈন্যপ্রধানকে। তিনি আসন থেকে নেমে গিয়ে টানটান হয়ে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে পাথর ছোড়ার আদেশ দিলেন পেয়াদাদের।

আদেশ পাওয়ামাত্র পেয়াদারা বল্লম, তলোয়ার, লাঠিসোঁটা সব বালিতে ফেলে রেখে হুড়মুড়িয়ে এগিয়ে গেল তীরের দিকে, যেখানে ছোট, মাঝারি, বড় পাথর পড়ে আছে সেই কবে থেকে। আজ এতদিনে তারা কোনও কাজে লাগবে রাজ্যের। কিন্তু এরপর যেটা হল, সেটা রাজা ভাবেননি। কেননা সেটা ভাবার কথাও নয়। রাজা তাঁর বেদিতে বসেই দেখলেন, একজন পেয়াদাও হাতে করে পাথর তুলতে পারছে না। প্রথমেই তারা চেষ্টা করেছিল সবচাইতে বড় পাথরগুলো তুলে মারার। তাতে আঘাতটা জমবে ভাল। সেগুলোর ওজন যদিও খুব একটা বেশি নয়। কিন্তু দু’হাতের বেষ্টনী আর বেড় দিয়ে চেষ্টা করেও তারা একটা পাথরকেও নিজের জায়গা থেকে একচুল নড়াতে পারল না।

রাজা বেশ বিরক্ত হলেন, সেনাপতি সেটা টের পেয়ে প্রমাদ গুনলেন। কী যে ছাইভস্ম এরা খায় কে জানে। শরীরে একটুকুও তাকত নেই? ভাবলেন তিনি। এদিকে পেয়াদারাও অবাক। এর চেয়ে বহুগুণ ভারী লৌহগোলক ইদানীং তারা জমা করছে অস্ত্রশালায়, সেসব তো দিব্যি একা-একাই হাতে করে তুলে নেওয়া যায়। এই সামান্য পাথরগুলো এত ভারী হয়ে গেল কীভাবে? তাদের মাথায় কিছুতেই ঢুকল না ব্যাপারটা।

এরপর তারা বড়গুলোকে ছেড়ে দিয়ে মাঝারি পাথরগুলোর দিকে এগোল। কিন্তু কী অবাক কাণ্ড! সেগুলোও এত ভারী যে মাটি থেকে তোলা তো দূর, নড়ানো পর্যন্ত যাচ্ছে না! পেয়াদাদের অপমানের একশেষ। সারা রাজ্যের বাসিন্দাদের সামনে তারা সামান্য পাথর পর্যন্ত হাতে করে তুলতে পারছে না! এরা দেখাবে মানুষকে ভয়? এরা যাবে যুদ্ধে? ভাবতে-ভাবতে ক্রুদ্ধ হয়ে উঠে দাঁড়ালেন রাজা। তাঁর পেয়াদারা তখন লজ্জার মাথা খেয়ে ছোট নুড়িগুলো হাতের মুঠোয় তোলার চেষ্টা করছে, কিন্তু পারছে না।

রাজা একবার সেনাপতির দিকে বড়-বড় চোখ আর লাল মুখ করে তাকাতেই নিজের আসন থেকে নেমে বালির চরে দৌড়ে গেলেন খোদ সেনাপতি। এদিকে জমা হওয়া ভিড়ের মধ্যে তখন গুঞ্জন শুরু হয়েছে। অলৌকিক কিছু একটা যে ঘটে যাচ্ছে চোখের সামনে, সেটা সকলেই বুঝতে পারছে, কিন্তু তার কোনও ব্যাখ্যা কারও কাছেই নেই। বিপ্লবী কিছুটা অবাক হলেও, চুপ করে তাকিয়ে আছে সামনের দিকে। তার কাছেও এ-ঘটনার কোনও ব্যাখ্যা নেই। এতক্ষণে তার হাত পা পাথরের আঘাতে ভেঙে গুঁড়িয়ে যাওয়ার কথা। ইতিমধ্যে এই ঘটনা দেখে হাত তুলে হইহই করতে শুরু করেছে বিপ্লবীর সঙ্গীসাথীরা। অনেক মানুষ একে নেহাত দৈব ঘটনা ভেবে আকাশের দিকে মুখ তুলে তাকাচ্ছেন।

সেনাপতি নেমেই এগিয়ে গেলেন বড় একখানা পাথরের দিকে। তাঁর উচ্চতা বিরাট, অত বড় চওড়া কাঁধও এই নগরীতে আর কারও নেই। এক হাতে তাঁর দু’খানা পাথর তুলতে পারার কথা অনায়াসে। কিন্তু এতক্ষণে তিনি নিজেও টের পেলেন, কী বিষম ওজন এইসব পাথরের। শরীরের সমস্ত শক্তি জড়ো করে টেনেও বা ধাক্কা দিয়েও এসব পাথরকে একবারের জন্যেও নড়ানো যাচ্ছে না কণামাত্র। সকলের কাছেই ঘটনাটা অলৌকিক, কেননা তারা কেউ জানে না যে, এই সবক’টা পাথরের মধ্যে পুরে দেওয়া আছে সামনে দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীর বিপুল বয়স্ক স্মৃতির একটা করে অংশ। নদী বয়ে আসছে কত হাজার বছর ধরে, বয়ে আসছে কত অসংখ্য স্থান ধুইয়ে দিতে-দিতে, সেই স্মৃতির কণামাত্রের ভারও যে বিশাল।

রাজা, সেনাপতি বা জড়ো হওয়া মানুষদের কেউ জানে না এ-কথা। স্মৃতির চেয়ে ভারী আর কিছু এ-পৃথিবীতে নেই। মানুষ নিজের স্মৃতির ভারই বইতে পারে না। আর এসব পাথর তো এখন বইছে এক বহমান নদীর স্মৃতিদের। তার ভার অপরিসীম। মানুষ কেন, বলশালী দানবের পক্ষেও এখন এদের নড়ানো আর সম্ভব নয়। নদীর সমস্ত স্মৃতি বুকে করে এইসব ছোট, মাঝারি, বড় পাথরেরা চিরকালের মতো স্থাণু হয়ে গিয়েছে এই সাদা বালির চরে। আর অনেকখানি হালকা হয়ে, আগের চেয়ে বেশি স্রোত নিয়ে তরতরিয়ে এগিয়ে চলেছে নদী।

এ-কথা যদিও কেউ জানল না, তাই বুঝতে পারল না কিছুই। অবশ্য জানলেও বুঝতে পারত কিনা, সে এক প্রশ্ন। কিন্তু আপাতত এক ব্যাখ্যাহীন ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে এবার রাজা নিজেই বেদি ছেড়ে নেমে এলেন সাদা বালির চরে। ইতিমধ্যে বিপ্লবীর দলবল ছত্রভঙ্গ হয়ে গিয়েছে, তারা দুয়ো দিতে শুরু করেছে রাজাকে, সেই সঙ্গে বিপ্লবীর নাম ধরে জেহাদের বুলি তুলছে আকাশ বাতাস মাতিয়ে।

পেয়াদারা আপাতত তাদের ছেড়ে পাথর কুড়োতে নেমে গিয়েছে সকলেই। কোনও দিকে তাদের আর খেয়াল নেই, কেবল পাথর ছাড়া। কিন্তু কেউ একটি পাথরও নড়িয়ে উঠতে পারছে না। রাজাকে নেমে আসতে দেখে অনেকে সরে দাঁড়াল। সেনাপতি একবার বাধা দিতে গেলেন, কিন্তু রাজা তাঁকেও এক ধাক্কায় সরিয়ে এগিয়ে গেলেন বড় একটা পাথরের দিকে। তাঁর সমস্ত রোষ, আক্রোশ, ক্ষোভ গিয়ে তখন পড়েছে পাথরগুলোর উপর। আর কিচ্ছু তিনি দেখতে পারছেন না, ভাবতে পারছেন না। এমনকী বিপ্লবীও তাঁর সামনে তখন তুচ্ছ বিষয় হয়ে উঠেছে। আগে দরকার একটা পাথর তোলা। কিন্তু কোথায় কী। পাথরে হাত দিয়ে তাকে চাড় লাগাতে গিয়েই ক্রোধে অন্ধ রাজা টের পেলেন, এরা পাহাড়ের মতো স্থবির হয়ে রয়েছে। কিন্তু কেন? কীভাবে হল এরকম? তাঁর মাথায় ঢুকল না কিছু। আর মাথায় কিছু না ঢুকলে তিনি আরও রেগে যান। রাজামশাই তখন সাদা বালির চরে এ-পাথর থেকে সে-পাথর ছুটে বেড়াচ্ছেন, তাদের তোলার ব্যর্থ চেষ্টা করছেন, আর তাঁর মুখ থেকে ঝরে পড়ছে ক্রোধের হুঙ্কার, ভারী বিশ্রী সব গালিগালাজ।

এদিকে বিপ্লবীর দলের একটি ছেলে আর মেয়ে তো ছুটতে-ছুটতে এসেছে কাঠের কুঠিতে। তাদের জানলা দিয়ে দেখতে পেয়েই বারান্দায় ছুটে এসেছে রাজকন্যা, তার সহচরীরাও। এক লহমায় সবটা বলে দম নিতে থাকল সেই দুই ছেলেমেয়ে। তারা হাঁপাতে-হাঁপাতেই হাসছে তখন। নিমেষে রাজকন্যার মুখ ঝলমল করে উঠল। তাকে যারা পাহারা দিচ্ছিল, ঘটনা শুনে সেই পেয়াদারাও ছুট লাগিয়েছে নদীর দিকে। রাজকন্যা এবার চলল বিপ্লবীকে দেখবে বলে।

নদীর ধারে সে তখন এক দৃশ্য। বেষ্টনী ভেঙে ফেলে জেহাদি ছেলেমেয়েরা ছুটে এসেছে নদীর এপারে, তাদের আটকানোর আর কোনও উপায়ও নেই তখন। তারা এসেই দড়ি খুলে দিয়েছে বিপ্লবীর, একে-একে জড়িয়ে ধরেছে তাকে। যতোই অলৌকিক আর ব্যাখ্যাহীন হোক, এ তাদেরই জিত। রাজা তখন আর সজ্ঞানে নেই। প্রায় প্রত্যেকটা পাথর তোলার চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে এখন তিনি ঝুঁকে পড়ে এই পাথরে সেই পাথরে মাথা ঠুকছেন। সাধারণ নাগরিক সাহস পেয়েছে এইসব হতে দেখে, তারা এবার ফেটে পড়ছে হাসিতে, দুয়ো দিচ্ছে রাজাকে। যারা এতদিন প্রকাশ্যে রাজার কথায় সায় দিয়েছে, এমনকী তারাও এই ঘটনায় সাহস পেয়ে দুয়ো দিতে শুরু করেছে রাজাকেই। ক্ষমতাবানের ব্যর্থতা মানেই দুর্বলের সাহস সঞ্চয়, সহজ অঙ্ক।

ততক্ষণে রাজার কপাল ফেটে রক্ত বেরোচ্ছে, কিন্তু সেদিকে তাঁর আদপে কোনও নজরই নেই। লোকজনের ঠাট্টার আওয়াজও তাঁর কানে ঢুকছে না। সেনাপতি থেকে পেয়াদা, প্রত্যেকে তখন চেষ্টা করছে তাঁকে সরিয়ে আনতে, কিন্তু তিনি কারও কথা শুনছেন না। নদীর ধারে দাঁড়িয়ে থাকা ভারী আর স্থাণু পাথরদের প্রায় প্রত্যেকের গায়ে তখন রক্তের তিলক। রাজরক্ত।

এরই মধ্যে ছুটতে-ছুটতে এসে হাজির হয়েছে রাজকন্যা। দৃশ্য দেখে সে অবাক। খুশিও। সে আর তখন এর কারণ খোঁজার মতো মনের অবস্থাতেও নেই। দীর্ঘ এক মাস পর সে দেখছে তার ভালবাসার মানুষটাকে, বিপ্লবীকে। রাজকন্যাকে দেখামাত্র সাধারণ নাগরিকদের মধ্যেও একখানা শোরগোল পড়ে গেল, আর বিপ্লবীর দলের ছেলেমেয়েরাও এবার সরে দাঁড়াল দূরে। ওপার থেকে বিপ্লবী নামল নদীতে, এপার থেকে রাজকন্যা। রাজামশাই তখন নতুন পাথর খুঁজছেন মাথা ঠুকবেন বলে, আর তার পিছন-পিছন দৌড়চ্ছেন সেনাপতি, মন্ত্রী আর পেয়াদারা। তাঁদের কোলাহল আর দৌড় ছোট হতে-হতে মিলিয়ে গেল দূরে, অরণ্যের ওইপারে। আর মাঝনদীতে, বুকজলে এসে মুখোমুখি দাঁড়াল পরস্পরকে ভালবাসা দু’জন মানুষ। রাজকন্যা আর বিপ্লবী। বিপ্লবী রাজকন্যাকে জড়িয়ে ধরে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই রাজকন্যা তার ঠোঁটে ডুবিয়ে দিল নিজের ঠোঁট। এতদিনকার জমে থাকা অপেক্ষা নিয়ে সে ডুব দিল গভীরতর এক চুম্বনে। আর দেখতে-দেখতে তার মুখের সমস্ত স্বাদ ফিরে এল একে-একে। সেইসঙ্গে, হালকা হয়ে যাওয়া এই নদীও একখানা আনকোরা, টাটকা স্মৃতি পেল। দু’জন ভালবাসার মানুষের চুম্বনের স্মৃতি। যা তার এত সহস্র বছরের চলায় ছিল না কখনও।

এতসব আশ্চর্য ঘটনা একের পর এক এভাবে ঘটে গেল বলেই বোধহয় কারও নজরে পড়ল না, সেই শুরু থেকে চিনার গাছেদের আড়ালে, বেশ দূরে, কাকে যেন পিঠে নিয়ে দাঁড়িয়েছিল একখানা কালো তেজী ঘোড়া। এবার সে উপত্যকার দিকে পিছন ফিরে চলল দূরের দিকে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%