শ্রীজাত
কয়েদখানায় বসে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল বিপ্লবী। তার শব্দ অবশ্য নিষ্ফল বাতাসে কিছুক্ষণ ভেসেই মিলিয়ে গেল, পৌঁছল না কারও কান অবধি। ঘুটঘুটে অন্ধকার এই চার দেয়ালের মধ্যে আর কিছুই দেখা যাচ্ছে না। কেবল লোহার দরজার সেই চৌকোনো ফোকর থেকে একফালি বাইরের আলো এসে পড়েছে তার পাশে শুয়ে রাখা বাঁশিটার গায়ে। বেচারা। অনেকক্ষণ ধরে তাকে বাজিয়েছে আজ বিপ্লবী। সেই বাঁশিকেও এখন ক্লান্ত দেখাচ্ছে যেন। বিপ্লবীর চেয়েও খানিক বেশি। বিপ্লবীর মৃত্যু হলে, কে বাজাবে এই বাঁশি?
খেয়াল করল বিপ্লবী, জানলার ফোকর দিয়ে কেবল একফালি আবছা আলোই নয়, ঢুকে আসছে মিহি কুয়াশাও। ছোটবেলার কথা তার ভারী ঝাপসাভাবে মনে পড়ে এখন। কিন্তু এটুকু সে মনে করতে পারে, আগে এই অরণ্যে সারা বছর এমনটা কুয়াশা থাকত না মোটেই। শীতকালে যেটুকু হওয়ার, হতই, কিন্তু বছরের অন্যান্য ঋতুতে কুয়াশার তেমন আনাগোনা ছিল না এখানে। সব কিছু ছিল ঝকঝকে, স্পষ্ট, সাফসুতরো। মেঘের সময়ে মেঘ, রোদের সময়ে রোদ। কিন্তু সারা বছরের এই আশ্চর্য কুয়াশা যে কোত্থেকে এসে তাদের এই বিশাল অরণ্যকে ঘিরে ফেলল একদিন, তা কেউ আজও জানে না। কোথাকার কুয়াশা যে ভাসতে-ভাসতে এসে একেবারে চিরকালের বাসিন্দা হয়ে গেল এখানকার, তা আজও অজানা সকলের। কিন্তু কবে এসেছিল এই বিশালদেহী কুয়াশার চাদর, তা বোধহয় সকলেরই মনে আছে। যেমন আছে বিপ্লবীরও।
“তৈরি হয়ে নাও, রওনা হতে হবে আমাদের।”
বাবার সেই ধরে আসা গলাখানা বাতাসে কান পাতলে আজও শুনতে পায় বিপ্লবী। সে ছিল একখানা মেঘলা সকাল, টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়ছে। পাহাড় থেকে নগরীর দিকে ছুটে আসছে বৃষ্টির চাদর, সেই ভোরবেলা থেকে। গতকালের দিনটাও এমন ছিল না, বাড়ির খুদে ছেলেটার সে-কথা দিব্যি মনে আছে। কিন্তু আজ সকাল থেকে এমন খারাপ আবহাওয়া। সে অবশ্য কেবল বাড়ির বাইরেই নয়, ভিতরেও।
অরণ্য যেখানে শেষ আর নগরী যেখানে শুরু, সেইখানেই তাদের বাড়ি। তিনজন মানুষের বাস। মাঝবয়সি এক পুরুষ, এক নারী ও তাদের খুদে একখানা ছেলে, যার বয়স মাত্র দশ। তার বাবা, সেই মাঝবয়সি পুরুষ ধাতুর কাজ জানেন ভারী ভাল। তিনি এই নগরীর একজন নামকরা কারিগর। নানা ধরনের ধাতু গলিয়ে পিটিয়ে কেটে জুড়ে তৈরি করতে পারেন অপূর্ব সব গয়না আর খেলনা। লোকে বলে, আশেপাশের সব রাজ্য মিলিয়েও ধাতুর এমন কারিগর আর একজনও নেই। বউয়েরও তাঁর বেশ নামডাক। তিনি বুনতে পারেন নানা ধরনের রংবেরঙের পোশাক। এই খেলনা, গয়না আর পোশাক বিক্রি করেই তাঁদের চলে যায়। আর দশ বছর বয়সি তাঁদের খুদে ছেলেটি এখনই বাজাতে পারে বাঁশি। কে জানে, বড় হয়ে কী করবে সে।
কিন্তু আজ, এই দশ বছরের বয়সে সে প্রথম, একইসঙ্গে চোখের জল ফেলতে দেখছে বাবাকে ও মাকে। মা তার ভারী শক্তপোক্ত মানুষ, কখনও কিছুতে তাঁকে ভেঙে পড়তে দেখেনি সে। বাবাও অনেক ঝড় পেরিয়ে এসেছেন জীবনে। কিন্তু দু’জনের চোখে একসঙ্গে চিকচিক করছে জল, তা সে এই প্রথমই দেখল।
খেসের খরখরে চাদরটা গায়ে আলতো করে জড়াতে-জড়াতে বাবা তাকে বললেন, “তৈরি হয়ে নাও, রওনা হতে হবে আমাদের।”
বেশি কথা বাবা বলেন না, কিন্তু যা বলেন ভেবেচিন্তেই বলেন।
“ওকে কি আজ না নিয়ে গেলেই নয়?” হেঁশেলের দরজায় ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা তার মা জিজ্ঞেস করলেন বাবাকে।
“নতুন রাজার হুকুম, নগরীর প্রত্যেককে আজ হাজির থাকতে হবে জমায়েতে। প্রত্যেককে। বৃদ্ধ থেকে শিশু অবধি। আমরা সাধারণ মানুষ। সে-হুকুম অমান্য করি বা কীভাবে। চলুক সঙ্গে, বড় তো হয়েছে খানিকটা।”
বাবার বলা কথাগুলো শুনে একখানা দীর্ঘশ্বাস ফেলে একটা উড়নি চাপিয়ে নিলেন মা-ও। খুদে ছেলেটা বাঁশিতে সুর ভাঁজছিল এলোমেলো, সেটা নামিয়ে রেখে উঠে দাঁড়াল, “কী হয়েছে বাবা? আমরা এখন কোথায় যাব?”
মা আর বাবা তার, একবার মুখ চাওয়াচাওয়ি করলেন নিজেদের মধ্যে, ব্যাপারটা চোখ এড়াল না খুদে ছেলেটির।
“কাল একখানা দুর্ঘটনা ঘটে গিয়েছে, এইমাত্র সকলে সে-খবর পেয়েছি। তোমাকেও আমরা জানাতাম।”
“কী হয়েছে বাবা? আমাকে বলো!”
“কাল পাহাড়ি পথের খাদে পড়ে গিয়ে আমাদের রাজা আর রানি প্রাণ হারিয়েছেন।”
মৃত্যুসংবাদ এর আগেও এ-বাড়িতে এসেছে, তাই বিষয়টা ছেলে বোঝে। কিন্তু খোদ রাজ্যের রাজা রানি একসঙ্গে মারা গিয়েছেন শুনে সেও কেমন থতমত খেয়ে গেল। আর বুঝতে পারল, সেই কারণেই বাবা-মা-র চোখে আজ জল। রাজা আর রানি যে তার বাবা-মা-র কারিগরি বেশ পছন্দ করতেন, সেটা তার অজানা নয়।
বাবার চোখ আর গলা, দুই-ই শুকিয়ে এসেছে। তিনি ফের বললেন, “অমন দু’জন মানুষ এ-রাজ্যে আর কোনওদিন হবে না। আজ রাজা আর রানির স্মরণসভা, প্রাসাদের বাইরের চত্বরে। তা ছাড়া...” বলে আরেকবার ছেলের মায়ের দিকে তাকালেন কারিগর।
“তা ছাড়া...?” জিজ্ঞেস করল খুদে।
এবার জবাব দিলেন তার মা, “তা ছাড়া, কাউকে তো রাজ্য চালাতে হবে, তাই আমাদের মহামন্ত্রীমশাই আজ রাজার পদে শপথ নেবেন। রাজ্যবাসীর প্রতি ভাষণ দেবেন। সেখানে তিনি সকলকে যেতে বলেছেন। সক্কলকে।”
“আর রাজকন্যা?” দুঃখী দু’চোখ মেলে প্রশ্নটা করল খুদে ছেলে।
মা এগিয়ে এলেন কাছে। বাবা তার দু’কাঁধে হাতের চাপ দিয়ে হাঁটু মুড়ে বসলেন সামনে। তারপর বললেন, “রাজকন্যা তো ভারী ছোট্ট, সে এখন এসবের কিছুই বুঝছে না। যখন বড় হবে, তখন সে জানবে, দুঃখ কাকে বলে। তাকেই তো সামলাতে হবে এই রাজ্যের ভার। কিন্তু যতদিন না সে বড় হয়, মন্ত্রীমশাইকেই দেখভাল করতে হবে সব কিছুর। এবার ঝটপট তৈরি হয়ে নাও। বৃষ্টিটাও বাড়ছে। বেশি দেরি হলে পৌঁছনো কঠিন হবে আজ।”
গত শীতে বাবা একখানা ঘোড়া কিনেছেন। বুড়ো, কিন্তু তেজ আছে তার। গতবার পাশের রাজ্যের মেলায় তাঁর হাতের খেলনা বিক্রি হয়েছিল প্রচুর। সেই অর্থের সঙ্গে কিছুটা ধার জুড়ে কিনেছেন এই ঘোড়া। এতদিন পর্যন্ত হেঁটে হেঁটেই রাজ্যে ঘুরে বেড়িয়েছেন বাবা আর মা, ছেলে জানে সে-কথা। এখন তাঁদের বয়স হচ্ছে, একখানা ঘোড়া হলে সুবিধে হয় খুব।
প্রাসাদ চত্বরের পথ এখান থেকে নেহাত বড় একটা কম নয়। ভাগ্যিস বৃষ্টিটা ধরে এসেছে, নইলে তাঁদের ভিজে ভিজেই যেতে হত। সামনে খুদে ছেলে, আর পিছনে বউকে চাপিয়ে নিয়ে লাগাম ধরে রওনা দিলেন কারিগর। পিছল পাথুরে পথ, ঘোড়া জোরে ছুটিয়ে লাভ নেই।
কিছুদূর যেতে না যেতেই মুখ তুলে তাকালেন কারিগর আর তার বউ। রোদ উঠছে আস্তে আস্তে, মেঘ কেটে গিয়ে। পিছনে আর পাশে পাহাড়ের সারি, মাঝখানে এই উপত্যকা জুড়ে তাদের এতদিনকার নগরী সেই রোদে কেমন যেন অচেনা দেখাচ্ছে। রোজকার চেনা রাস্তাকেই মনে হচ্ছে অজানা। নতুন নয়। নতুন আর অজানার ফারাক করতে তাঁরা জানেন এতদিনে। পাহাড়ের উপর থেকে মেঘ কাটিয়ে ঠিকরে আসা সকালবেলার এই রোদ্দুরে যত দূর দেখা যায়, যেন এক অজানা রাজ্য ফুটে উঠছে তাঁদের চোখের সামনে। এ তাঁদের মনেরই ভ্রম হবে বা, ভাবলেন কারিগর। বড় রকমের বদল ঘটলে অনেক কিছুকেই অজানা মনে হয়, এও হয়তো তাই। চারপাশে তাঁদেরই মতো অগুনতি সাধারণ নাগরিক চলেছে প্রাসাদ চত্বরের উদ্দেশে। কেউ ঘোড়ায়, কেউ বা হেঁটে। মানুষের গুঞ্জনে পথঘাট রমরম করছে, যেন এক বিরাট শোকমিছিল, যেন এক মহোৎসব। এক লহমায় তাকালে এ-দুয়ের তফাত বোঝা ভার, মনে হল কারিগর আর তাঁর বউয়ের। খুদে ছেলে অবাক হয়ে থাকল সারাটা পথ।
“আমাদের মহামান্য রাজা ও রানির যে করুণ পরিণতি ঘটেছে গতকাল, তার শোক ভাষায় বর্ণনা করার ক্ষমতা আমার নেই। আশা রাখি, কোনও একদিন আমরা এই শোক কাটিয়ে উঠতে সমর্থ হব।”
পাহাড়ের গায়ে-গায়ে ধাক্কা লেগে এই বাক্যের প্রতিটি শব্দ ভেঙে-ভেঙে ঘুরে বেড়াচ্ছে উপত্যকা নগরীর নানা প্রান্তে। গলাখানা যে মহামন্ত্রীমশাইয়ের, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। কারিগরের ঘোড়া যখন পৌঁছল বিশাল প্রাসাদ চত্বরের জমায়েতে, তখন তিল ধারণের জায়গা পর্যন্ত নেই। প্রাসাদের সর্বোচ্চ মিনারের মাথায় রোদকে চিতিয়ে নিয়ে উড়ছে রাজ্যের উজ্জ্বল পতাকা, আর তার ঠিক নীচে, সভাসদদের সঙ্গে নিয়ে দাঁড়িয়ে কথাগুলো বলছেন মহামন্ত্রীমশাই। অনেক দূরে ঘোড়া দাঁড় করাতে পারলেন কারিগর, এর পর আর এগোনোর উপায় নেই, মানুষে মানুষে ঠাসা। ঘোড়ার পিঠে বসেই কথাগুলো শুনতে পেল খুদে ছেলে তাঁদের। আর মিনারের দিকে তাকিয়ে দেখল, মহামান্য মন্ত্রীমশাইকে ঠিক তার বাবার হাতে তৈরি পুতুলের মতোই দেখতে লাগছে, এই এত দূর থেকে।
ঘোড়ার পিঠে বসেই তারা শুনতে লাগল মহামন্ত্রীমশাইয়ের ভাষণ, “আমার সমস্ত সমবেদনা আজ ঝরে পড়ছে মহামান্য রাজা ও রানির একমাত্র শিশুকন্যা, আমাদের রাজকন্যার প্রতি। তিনি জানলেনও না, কত বড় দুর্দিন আজ তাঁর। আশা করি, বালিকা বয়স পার করে এই দুঃখের সম্মুখীন হওয়ার শক্তি তিনি অর্জন করবেন। আপনারা সকলে তাঁর জন্য প্রার্থনা করবেন, এই আমার অনুরোধ। তিনিই এ-রাজ্যের সর্বেসর্বা কর্ত্রী। কিন্তু এই মুহূর্তে, তাঁর হয়ে আমাকেই এ-রাজ্যের শাসনভার হাতে তুলে নিতে হচ্ছে। ততদিন পর্যন্ত এ-রাজ্য ও তার বাসিন্দাদের আমি বুকে করে আগলে রাখব, যতদিন না রাজকন্যা পূর্ণবয়স্কা হন এবং এ-রাজ্যের শাসনভার নিতে সক্ষম হন। আপনারা কি এই সিদ্ধান্তে সহমত?”
রাজ্যের সমস্ত বাসিন্দা এক জায়গায় জড়ো হওয়া সত্ত্বেও, এই প্রশ্নের উত্তরে নিবিড় গুঞ্জন ছাড়া বিশেষ কোনও কিছুই শোনা গেল না। রাজা ও রানির মতো সজ্জন দু’জন মানুষকে এত আকস্মিকভাবে হারানোর যে-শোক, সাধারণ মানুষ সেটা কাটিয়ে উঠতে পারেনি একবেলায়। তাই মহামন্ত্রীর প্রশ্নের উত্তরে ঝাঁকে ঝাঁকে হাত তুলে সরবে সমর্থন জানানোর ব্যাপারটা হল না তেমন, যা নাকি প্রয়াত রাজার সব ভাষণেই হয়ে থাকত স্বতঃস্ফূর্তভাবে, রাজাকে সমর্থন চাইতে হত না।
মহামন্ত্রী একবার কানাঘুষো করতে থাকা জনতার দিকে আশ্চর্য এক হাসিমুখে তাকালেন, তারপর তাঁদের হ্যাঁ বা না-এর অপেক্ষা না করেই শুরু করলেন শপথগ্রহণ পর্ব। বেজে উঠল শিঙা, তার গম্ভীর মন্দ্র স্বর পর্বতমালার পাথুরে গায়ে ধাক্কা খেয়ে-খেয়ে গোটা চত্বরটাকে গমগমে করে তুলল। আর এসবের পর, রাজপুরোহিত মহামন্ত্রীমশাইয়ের মাথায় রাজার মুকুটখানা বসাতেই ঘটল ঘটনাটা।
পর্বতমালার চূড়া ডিঙিয়ে, ওপাশ থেকে, অদ্ভুত এক কুয়াশার চাদর ভারী শ্লথ গতিতে, ধোঁয়ার পালের মতো নেমে এসে ঢেকে ফেলল গোটা প্রাসাদ চত্বর। মানুষজন এমনটা আগে দেখেনি কখনও, তাই আবারও, ভিড় করে থাকা বাসিন্দাদের মধ্যে এক ধরনের গুঞ্জন শুরু হল। কারিগরের ঘোড়ার কেশর মুঠোয় আঁকড়ে বসে থাকা খুদে ছেলেটি খেয়াল করল, পাহাড়ের যতগুলো চূড়া, সবক’টা পার করে নেমে এসে ভারী কুয়াশার দল ঢেকে ফেলছে এই চত্বরটাকে। এই একটু আগে সূর্য যেখানে ঝলমল করে রোদ ঢালছিল, সেখানে এখন কেমন যেন ছায়া-ছায়া অন্ধকার ভাব। শুধু তাই নয়, কেমন যেন ভিজে-ভিজে লাগছে সবকিছু। এক লহমার জন্য এমনকী রাজপ্রাসাদের উঁচু মিনারটাও ঢেকে গেল সেই ভারী কুয়াশার চাদরে। ঢেকে গেল মহামন্ত্রীমশাইয়ের গমগমে গলার স্বরখানাও, যা এখন কী বলছে, ঠিক বোঝা যাচ্ছে না।
এই সময়টায় এরকমটা হওয়ার কথা নয় মোটেই। কুয়াশা একটু আধটু হয় ঠিকই, সেও ওই শীতকালের দিনকতক। অরণ্যের মধ্যেই তার ঘোরাফেরা থাকে বেশি, উপত্যকায় বা এই চত্বরে কুয়াশার এমন আনাগোনা মানুষ তাই এই প্রথম দেখছে। হাত বাতাসে কেটে কুয়াশা সরানোর চেষ্টা করল খুদে ছেলে, কাটল না। কেবল তারা এই এত দূরে দাঁড়িয়েও ক্ষীণ শুনতে পেল, মহামন্ত্রীর হারিয়ে যাওয়া স্বর বলছে,
“আমরা এর বদলা নেব। বদলা। প্রতিশোধ। আমাদের মহামান্য রাজা ও রানিকে কারা হত্যা করেছে তা আমরা খুঁজে বের করব এবং তাদের উচিত শিক্ষা আমরা দেব। পার্শ্ববর্তী রাজ্যদের আমার বরাবরই সন্দেহ হত কুটিল ও চক্রান্তকারী বলে। রাজামশাইকে বহুবার সে-কথা বলাতেও তিনি ছিলেন সরল ও অকুতোভয়। মানুষকে বিশ্বাস করতে ভালবাসতেন। আজ তাঁকে ও মহামান্য রানিকে সেই সারল্যের মাসুল দিতে হল প্রাণের বিনিময়ে। এ আমরা কখনও মেনে নেব না। আপনারা মেনে নেবেন?”
খুদে ছেলে শুনল, ভারী কুয়াশার চাদর ঠেলে বেশ কিছু আবছা ‘না’ শোনা যাচ্ছে। বাবা আর মা-র দিকে তাকিয়ে সে দেখল, তাঁদের মুখ আশ্চর্য উদাস আর দুঃখী। যেন এসব কথার কিছুই তাঁদের কানে ঢুকছে না।
“আজ এর বেশি আর কিছু নয়। কেবল জানাই, এ-রাজ্যকে অনেক নতুনভাবে ভাবতে হবে, এগোতে হবে, নিজেদের সুরক্ষিত করতে হবে বাইরের ও ভিতরের শত্রুদের থেকে। আজ আমাদের কারও মনই ভাল নেই, তাই আজ কোনও অন্য কথা নয়। পরশু মহামান্য রাজা ও রানির শোকসভা। তারপর আমরা ঢেলে সাজাব আমাদের রাজ্যকে ও তার রীতিনীতিকে। আশা করি আপনাদের সকলকে পাশে পাব। এই ঋতুর শেষদিন সকাল থেকে সাতদিন চলবে উদযাপন। শেষদিন আমি আমার ভাষণ পেশ করব। আজ যেমন সকলে এসেছেন, সেদিনও আসবেন, এই অনুরোধ রইল...”
মহামন্ত্রীমশাইয়ের এই বাক্যগুলো কিছুটা স্পষ্টভাবে শোনা গেল, কেননা কুয়াশার চাদরখানা খানিক হালকা হয়েছে, চারপাশ আগের চেয়ে বেশি ভাল করে দেখা যাচ্ছে। কিন্তু সে-চাদর সরে যায়নি মোটেই। তবু, তার মধ্যেই ঘাড় ঘুরিয়ে অবাক হওয়া খুদে ছেলেটি দেখতে পেল, দূরে, অনেক দূরে, পাহাড়ের খাঁজে একখানা নাম-না-জানা আঁকাবাঁকা গাছের রোগা-রোগা ডালে কয়েকটা হাড় জিরজিরে পাখি এসে বসছে একে-একে। তারাও, তারই মতো, ঘাড় ঘুরিয়ে দেখছে এদিক সেদিক। পাখিগুলোকে সে চেনে না।
মানুষগুলোকেও সে চিনতে পারেনি ঠিকঠাক সময়ে, কয়েদখানায় বসে ভাবছিল বিপ্লবী। কেবল তার কারিগর বাবা, পোশাক বুনিয়ে মা ছাড়া। হ্যাঁ, আরও একজন ছাড়া, যে এখন নাকি তারই মতো বন্দি, এই অরণ্যেরই অন্য প্রান্তে। এই তিনজন ছাড়া অবশ্য আর একখানা বন্ধু তার আছে। কুয়াশার মিহি স্তর ঢুকে আসা আবছা অন্ধকার কয়েদখানায় সে তাকেই তুলে নিল হাতে। বাজাল না আর। একবার ঠোঁটের ছোঁয়া দিল কেবল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন