পঞ্চদশ অধ্যায়

শ্রীজাত

এই ঘটনার পর থেকে নগরী থমথমে। কুয়াশাও যেন বেশ জাঁকিয়েই বসেছে চারদিকে। বেড়ে গিয়েছে কয়েকগুণ। আর তার মধ্যেই শুরু হয়েছে টিপটিপ আর ঝিরঝির বৃষ্টি। এরকমটা হলে যেন মনখারাপ আরও বেড়ে যায়। সাধারণ বাসিন্দারা যতই নিশ্চুপ হোক, মনে-মনে তারা সকলেই প্রায় ভালবাসত বিপ্লবীকে। তাই আসছে পূর্ণিমার সকালে তাকে মেরে ফেলা হবে শুনে সকলেই ভারী মনমরা হয়ে উঠেছে। কারওই তেমন মন নেই নিজের কাজে। কাঠুরে তার কুড়ুল জঙ্গলে ফেলে বাড়ি ফিরছে, জেলে মাছ ধরে ভুলে যাচ্ছে তাকে গেঁথে তুলতে। আর রাজকন্যা কেবল ভাবছে, গত পূর্ণিমার সন্ধেবেলাতেই তার সঙ্গে কত ভালবাসার আর স্বপ্নের কথা হয়েছিল বিপ্লবীর, কত সুন্দর দিনের আশাই না করেছিল তারা। কিন্তু পরের পূর্ণিমায় সেই মানুষটাই থাকবে না আর।

রাজকন্যা অবশ্য প্রায় ঠিকই করে ফেলেছে, বিপ্লবীহীন এ-রাজ্যে সেও থাকবে না আর। কার জন্যেই বা থাকবে? বাবা আর মা চলে যাওয়ার পর এই একজনমাত্র মানুষকে সে তার সবটুকু মন দিয়ে ভালবেসেছে। সে না থাকলে, এই অত্যাচারী ভণ্ড রাজার দেশে রাজকন্যা হয়ে বেঁচে থেকেই বা লাভ কী? আরও একখানা ব্যাপারে সে নিশ্চিত। অন্তত সে-রাতে ওই দুই প্রেতের দেখা পাওয়ার পর তো আরও বেশি করেই নিশ্চিত যে, এই রাজা তাকেও হত্যা করিয়ে দেবে যে-কোনও দিন। সেই দুই প্রেতের কথায় যে সে সম্পূর্ণ আস্থা রাখতে পেরেছে, এমন হয়তো নয়, কিন্তু কে জানে কেন, সে কিছুতেই পুরোপুরি অবিশ্বাসও করতে পারছে না তাদের সেসব কথা। তাই সে প্রায় ঠিকই করে নিয়েছে, বিপ্লবীকে মেরে ফেলা হলে সেইদিনই সে বিষপান করবে। নিজের এই জীবন আর রাখবে না। বিপ্লবীর দলবলকেও গায়েব করে দেওয়া হবে, সে জানে। ফলে জেহাদ চালিয়ে যাওয়ারও কোনও উপায় থাকবে না তখন।

এমনটা হলে নিজেকে শেষ করে দেওয়াই ভাল, এ-কথা বারবার মনে হচ্ছে রাজকন্যার। বেঁচে থেকে আর লাভ কী হবে এখানে? মনে হচ্ছে এমনটাও। আবার এও মনে হচ্ছে, সে তো কোনওদিন পালায়নি কোনও পরিস্থিতি থেকে, তা হলে এখনই বা পালাবে কেন? বিপ্লবীর কাছের বন্ধুদল যতই ছত্রখান হয়ে যাক, নিকেশ হয়ে যাক, রাজ্যজোড়া ছেলেমেয়েরা তো আছেই। রাজকন্যা যদি সামনে এসে দাঁড়াতে পারে, তারা কি ফের নিশান তুলে নেবে না হাতে? তারা কি আবার ঝাঁপিয়ে পড়বে না, মিথ্যের এই শাসন ঘুচিয়ে ফেলার তাগিদে? হ্যাঁ, বিপ্লবী না থাকলে ভাল সে আর বাসতে পারবে না কাউকেই। কিন্তু এই লড়াইও তো ভালবাসারই অংশ। এতে জিতে গেলে অন্তত এই রাজ্যকে অন্ধকারের বাইরে নিয়ে আসা যাবে। আর সত্যি হয়ে উঠবে বিপ্লবীর স্বপ্ন। একজীবনে সেই বা কম কী। তাই রাজকন্যা এখন ভারী দোটানায়। পূর্ণিমার সকালের পর তার সামনে দু’খানা রাস্তা খোলা। কোন পথে সে হাঁটবে, সেটা তাকে স্থির করে ফেলতে হবে শিগগির।

এই যখন নগরীর অবস্থা, তখন এক হাতে কালো আর চকচকে অস্থির ঘোড়ার লাগাম আঁকড়ে, অন্য কাঁধে ভারী ঝোলা নিয়ে নগরীর এ-পথ সে-পথ ঘুরে ঘুরে দেখছে ভিনদেশি। পরনে তার সেই আশ্চর্য পোশাক। যদিও তাকে আর তেমন আড়চোখে দেখছে না কেউ। মানুষ এতই মনমরা হয়ে আছে যে, এই কুয়াশার মতোই হয়ে উঠেছে তাদেরও নজর। ঝাপসা, আবছা। তাই সামনে দিয়ে ভিনদেশি হেঁটে গেলেও, কেউ তেমন ফিরে তাকাচ্ছে না আর। ভিনদেশি অবশ্য সেটাই বেশি উপভোগ করছে, কেননা নিজেকে ঘিরে মানুষের অহেতুক কৌতূহল তাকে ক্লান্ত করে তোলে সহজেই, প্রথম দিন এ-নগরীতে ঢোকার পরপরই যেটা হয়েছিল। এখন বরং সে অনেক নিশ্চিন্তে ঘোরাফেরা করতে পারছে আর দেখতে পারছে, নতুন এই নগরীর কোথায় কী আছে, কোথায় কী ঘটে চলেছে।

সেদিন মানুষজনকে সে কিন্তু কিছু মিথ্যে বলেনি বা বানিয়ে বলেনি মোটেই। তার সত্যিই কোনও দেশ নেই। সে কেবল মনে করতে পারে, ছোটবেলা থেকে সে ঘুরে বেড়িয়েছে এক মাটি থেকে আরেক মাটি, এক বাতাস থেকে অন্য বাতাস, এক নগর থেকে আরেক মরুর পথে। সে নিজে স্মৃতির কারবারি বটে, কিন্তু তার নিজের ছোটবেলাকার স্মৃতি খুব একটা তরতাজা নেই আর। বছর পনেরো বা সতেরো অবধি এখন অনেকটাই ঝাপসা হয়ে এসেছে। সে জানে, এর পর সেটা পঁচিশ বা আঠাশেও পৌঁছবে। গোড়ার দিক থেকে মুছে যেতে-যেতে উঠে আসবে স্মৃতি, তার বর্তমানের কাছাকাছি।

সে কেবল মনে করতে পারে, ছেলেবেলা তার ছিল বেজায় আনন্দের আর খুশিতে ভরপুর। কেননা তাকে থেমে থাকতে হত না। বাবা-মা-র মুখ স্পষ্ট মনে পড়ে না আর, বন্ধুবান্ধবের মুখও নয়। আর কোনও আত্মীয়পরিজন ছিল কি? ছিল নিশ্চয়ই। কিন্তু তাদেরও চেহারা সরে-সরে গিয়েছে মন থেকে। মনে আছে কেবল বেড়িয়ে বেড়ানোর কথা। সেসব স্মৃতি কেউ কেড়ে নিতে পারেনি। তারপর কখন যেন একলা হয়ে সে বেরিয়ে পড়েছে বিরাট এই পৃথিবী ঘুরে দেখবে বলে। সঙ্গের ঘোড়া ছিল তার ছেলেবেলার বন্ধু, সে এখনও বদলে যায়নি। বিশ্বস্ত এই বন্ধু তাকে পিঠে করে কত যে উপত্যকা আর খাড়াই পাহাড় পার করিয়ে দিয়েছে, তার লেখাজোকা নেই কোনও।

এই মাঝবয়সে এসে তার এত বেশি স্মৃতি ঝাপসা হয়ে যাওয়ার অবশ্য একখানা কারণ আছে। তার কৈশোরের একেবারে গোড়ায়, মহল্লার এক বৃদ্ধের মাথায় মালিশ করতে গিয়ে যখন সে তাঁর কপালের দু’পাশ টিপে ধরেছিল, তখন সে খালি আর খোলা চোখেই ফুটে উঠতে দেখেছিল এমন সব দৃশ্য, যা তার অচেনা। চেনা বলতে সেই দৃশ্যের মধ্যে ছিলেন কেবল ওই বৃদ্ধ, যাঁর বয়স সেই দৃশ্যে বেশ কম। তিনি একখানা বুনো শুয়োর শিকার করবেন বলে তাকে তাড়া করতে-করতে গিয়ে পড়েছিলেন বুনো শুয়োরদের দঙ্গলের মধ্যে, আর সকলে মিলে তাঁকে ঘিরে ধরে এগিয়ে আসছিল আস্তে-আস্তে। তিনিও তৈরি হচ্ছিলেন সামনের গাছ থেকে নেমে আসা একখানা লম্বা ঝুরি বেয়ে উপরে উঠে যাওয়ার জন্য, আর সেটা টের পেয়েই একটা বুনো শুয়োর তাঁর ডান পায়ে এসে সটান বিঁধিয়ে দেয় তার ধারালো আর বাঁকানো দাঁত। আর সঙ্গে-সঙ্গে পা ফালা হয়ে গিয়ে ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে আসে রক্ত। এই অবধি যখন সে দেখেছে, কেমন যেন ঝিম ধরে গিয়েছিল তার। তারপর সে জিজ্ঞেস করেছিল সেই বৃদ্ধকে, এমন ঘটনা সত্যি ঘটেছিল কি না। বৃদ্ধ তখন ডান পায়ের পোশাক তুলে দেখিয়েছিলেন গভীর ক্ষতের পুরনো দাগ আর অবাক হয়ে জানতে চেয়েছিলেন, এসব কথা সে কী করে জানল? খুদে ভিনদেশি সেদিন কিছু না বললেও, এ-জিনিস চলতে লাগল।

তার নিজেরও ধরে গেল নেশা।

মাথায় মালিশ করার জন্য ছোট থেকেই তার বেশ খ্যাতি ছিল নিজেদের লোকজনদের মধ্যে। তাই এর-ওর মাথায় মালিশ করতে গিয়ে এবারে সে দেখতে পেতে লাগল এমন সব দৃশ্য, যা তার জন্মেরও বহু আগেকার ঘটনা। সত্যি ঘটনা। যাদের মাথা সে মালিশ করছে, তাদের কোনও না কোনও স্মৃতি স্পষ্ট হয়ে উঠতে শুরু করল তার সামনে। সেটা দুর্ঘটনার হতে পারে, ভাল কিছুরও হতে পারে, আবার মামুলিও হতে পারে। কিন্তু ফুটে উঠছেই কিছু না কিছু। আর যা সে দেখতে পাচ্ছে, মানে অন্য লোকজনদের স্মৃতি, সেটা সে নিজের মন থেকে মুছে ফেলতে পারছে না কিছুতেই। সে অবশ্য বুঝতে পারছিল, অন্য মানুষজনের অতীতে ভরে উঠছে তার আজকের মন। ভারী হয়ে উঠছে মাথা, ভিড় জমছে মনের মধ্যে। কিছুতেই আর আগের মতো ফুরফুরে হালকা থাকতে পারছে না সে।

এ-ক্ষমতা যে সকলের থাকে না, সেটা তখনই সে বুঝতে পেরেছিল। এসব জিনিস বেশিদিন লুকিয়ে রাখা যায় না, তাই খবর ছড়িয়ে পড়তেও সময় লাগল না বেশি। তারপর শুরু হল তাকে ঘিরে মানুষের উপচে পড়া কৌতূহল। ততদিনে সে নিজেও এ-ব্যাপারে আরেকটুখানি হাত পাকাতে শুরু করেছে, তা দিয়ে যদি মানুষকে কিছু সাহায্য করা যায়, এই ভেবে। সেটা দু’রকমভাবে।

প্রথমটা হল এই যে, আগে থেকেই মানুষের কাছে জেনে নিয়ে সেই স্মৃতির কাছে পৌঁছনো যায় কিনা। এ পর্যন্ত যা হচ্ছিল, আপনা-আপনি হচ্ছিল, তার অলৌকিক ক্ষমতার জোরে। এবার সে সেই ক্ষমতাকে আরও পালিশ দিয়ে নিজের করে তুলতে থাকল। যেমন, কেউ হয়তো বললেন, আমি আজ থেকে তেত্রিশ বছর আগে এক পাহাড়ি পথে সূর্যাস্ত দেখেছিলাম, সেটা ছিল হেমন্তকাল। এইবার কিশোর ভিনদেশির কাজ হত সেই লোকের স্মৃতির ভিতরে ঢুকে সেই দিনের সেই সময়ের সেই দৃশ্যটাকে খুঁজে বার করা। এ ভারী কঠিন ব্যাপার। স্মৃতি তো আর কমলালেবুর ঝুড়ি নয়, যে সবচাইতে বড়টা তুলে আনো বললে চোখ বন্ধ করে হাতড়ে ঠিক পেয়ে যাওয়া যাবে, স্মৃতি হল অস্পৃশ্য এক বোধ, যা মগজের কোনও এক অঞ্চলে বাসা বাঁধে। কেবল মনের ক্ষমতার জোরে সেখানে পৌঁছনো এবং অগণন স্মৃতির ভিড় থেকে ঠিক সেই স্মৃতিখানা খুঁজে বের করা, যেভাবে রাজপথের চলতি ভিড়ে লালটুপিওলা একজন লোককে খুঁজে বের করতে হয়, এ-ব্যাপার নেহাত দুঃসাধ্য। কিন্তু আস্তে আস্তে সেইটাই করতে শুরু করেছিল ভিনদেশি, তার হাতযশে।

তারও মজা লাগত, বুড়ো বুড়ি, মাঝবয়সি লোকজনের মনের মধ্যে ঢুকে কোনও এক নির্দিষ্ট দিনের নির্দিষ্ট ছবি খুঁজে বের করতে। যখন শেষ হত সেই দেখা, তখন হয়তো বুড়ি প্রশ্ন করত, ‘হ্যাঁ রে, সেদিন কী পোশাক পরেছিলাম রে?’ বা বুড়ো জিজ্ঞেস করত, ‘তা হ্যাঁ বাছা, বঁড়শিতে কী মাছ উঠেছিল সেইটা দেখতে পেলে কি?’ ভিনদেশি তখন গর্বের হাসি হেসে পটাপট ঠিক উত্তর দিয়ে দিত। আর উত্তরের সঙ্গে-সঙ্গে স্মৃতি তাজা হয়ে উঠত সকলের। সে যে কী এক আনন্দ, বলার নয়।

এরপর তার কৌশল আরও ধারালো হয়ে উঠতে লাগল। অনেকদিনের চেষ্টায় সে নিজেই আবিষ্কার করল, স্মৃতি মুছে ফেলার পদ্ধতি। ততদিনে এ-রাজ্য সে-রাজ্য তার কথা অল্পবিস্তর ছড়িয়েছে। যেখানে-যেখানে সে যাচ্ছে, খবর পেয়ে লোকজন আসছে, স্মৃতির সমস্যা নিয়ে। বেশিরভাগ মানুষই ভুলে গিয়েছেন অনেক কিছু, কিন্তু মনে করতে চান। আবার অনেকেই বহু তিক্ত স্মৃতি বয়ে বেড়াচ্ছেন বহু বছর ধরে, সেসব ভুলে যেতে পারলে ভাল হয়। এই সমস্ত কিছুর জন্য তখন একমাত্র ত্রাতা, উদ্ধারকর্তা, কারিগর হয়ে দাঁড়াল সে।

নিজের মানুষজনের কাছ থেকে টুকটাক বখশিশ তো পেতই ভিনদেশি, এবার সে বুঝল, এইটাকেই করতে হবে তার উপার্জনের উপায়। কেননা যেখানেই সে যায়, এত লোকজন তার কাছে ছুটে আসেন সমস্যা নিয়ে, অন্য কিছু করার সময়ই সে পায় না। তা ছাড়া সে এক জায়গায় বসত করার লোক নয়। তাই খেতখামার, পশুপালন, কাঠের কাজ, এসব তাকে দিয়ে হবে না। অবশ্য এসব সে করেওনি কোনওদিন। তাই সে এবার স্মৃতির কারিগরি করার জন্য পারিশ্রমিকও নিতে লাগল। মানুষের তাতেও আপত্তি নেই। একটা বয়সের পর মুছে যাওয়া অতীত অনেক বেশি দামি হয়ে ওঠে, জীবনের সমস্ত সঞ্চয়ের থেকে। তাই সে যেটুকু চাইত, মানুষজন তার বেশিই দিয়ে যেত তাকে, খুশি হয়ে।

এরপর আরও এক ধাপ এগোল তার কারিগরি। পৃথিবীতে কিছুই খালি রাখার জো নেই। এক জায়গা থেকে কিছু সরিয়ে নিলে তাকে আবার ভরে দিতে হয় সেই মাপে, নইলেই টাল সামলানো দায় হয়ে ওঠে। স্মৃতি সে যেমন খুঁজে দিত, তার চেয়ে বেশি করে মুছেও দিত। কারও পরিজন বিয়োগের স্মৃতি, কারও যুদ্ধের আমলের স্মৃতি, কারও খামারে আগুন লাগার স্মৃতি, তো কারও আবার প্রেম ভেঙে যাওয়ার স্মৃতি। খুঁজে-খুঁজে সেসব বের করে আস্তে-আস্তে মুছে দিত সে। যখন কেউ চোখ খুলত তার হাতের স্পর্শ পাওয়ার পর, তখন আর সে সেই স্মৃতি মনেই করতে পারত না, এতই নিখুঁত হয়ে উঠেছিল ভিনদেশির হাতের কাজ।

কিন্তু সমস্যা বাঁধল অন্য জায়গায়। মুছে তো সে দিচ্ছে না হয়। কিন্তু সে-জায়গায় ভরবে কী? মগজের কোনও কোনা তো আর খালি পড়ে থাকতে পারে না। এ ভারী সতর্ক হয়ে করার কাজ। একটু এদিক ওদিক হলে সবকিছু ওলোটপালোট হয়ে যেতে পারে মনের মধ্যে। তখন সে শুরু করল তার নয়া কারিগরি। স্মৃতি বিনিময়। অর্থাৎ, কারও কোনও খারাপ স্মৃতি যখন সে মুছে ফেলছে, তখন তার বদলে কোনও ভাল স্মৃতি সে রোপণ করে দিচ্ছে সেই মনের মধ্যে। ভিনদেশি ছোট থেকেই পাহাড়ে পর্বতে মালভূমিতে তৃণভূমিতে সমুদ্রে নদীতে বরফে বালিতে অরণ্যে শহরে ঘুরে বেড়িয়েছে। বহু অপূর্ব দৃশ্য এমনিতেই তার স্মৃতিতে স্পষ্ট হয়ে আছে, যেগুলো গ্রামে-গ্রামে আটকা পড়ে থাকা মানুষের স্মৃতিতে নেই। সে তখন এই সব সুন্দর দৃশ্যের ছোট-ছোট টুকরো করে পুরে দিতে লাগল মানুষের মনে। আর বদলে বের করে আনতে থাকল তাদের খারাপ স্মৃতি।

যেমন কারও পোষা ভেড়া মরে যাওয়ার স্মৃতি মুছে গিয়ে সেখানে ফুটে উঠল সুন্দর ফুলের উপত্যকার এক গ্রীষ্মের দুপুরের স্মৃতি, যেখানে সে যায়ইনি কোনওদিন। বা কারও অস্ত্রের ঘায়ে আঘাত লাগার স্মৃতি সরে গিয়ে সেখানে জেগে উঠল সমুদ্রের ধারে পাখিদের উড়ে বেড়ানোর দৃশ্য, যা সে জীবনে দ্যাখেনি। এ-কাজে ভিনদেশি এতটাই দক্ষ হয়ে উঠতে থাকল যে, এই গ্রাম থেকে সেই নগরী প্রায় জাদুকরের মতো তার নাম ছড়িয়ে পড়ল। সেসব অবশ্য এই কুয়াশানগরী থেকে অনেক-অনেক ক্রোশ দূরের কথা।

একখানা ব্যাপার যদিও তার অজান্তেই ঘটে যেতে লাগল এইসব করতে গিয়ে, আর সেটা সে, মানে ভিনদেশি যখন টের পেল, তখন অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। সে বুঝতে পারল, যেসব খারাপ স্মৃতি সে মানুষের মন থেকে শুষে নেয়, সেসব থেকে যায় তারই মনের মধ্যে। সহজ অঙ্কের খেলা। সে যেমন সেসবের বদলে সুন্দর দৃশ্যের স্মৃতি ভরে দিচ্ছে অন্যদের মগজে, তেমনই তার বদলে তাদের মগজের এইসব স্মৃতি ভিড় করে জমা হচ্ছে তার নিজেরই মনে। আর ভারী হতে থাকছে তার মন। ঘুম চলে যাচ্ছে রাতের। স্বপ্নের বদলে জেগে-জেগে দুঃস্বপ্ন দেখছে সে। যেসব যুদ্ধ সে কোনওদিন দ্যাখেনি, যেসব প্রেম তার ভাঙেনি কখনও, যেসব কষ্টের মধ্যে দিয়ে তাকে হাঁটতে হয়নি একবারও, তাদেরই স্মৃতি তাড়া করে বেড়াচ্ছে তাকে সারাক্ষণ। ক্লান্ত হয়ে পড়ছে সে ভারী অল্পতেই, কথা কমে আসছে তার। নিজের মধ্যে থেকে একে-একে হারিয়ে যাচ্ছে সুন্দর মুহূর্তদের স্মৃতি। আর সবচাইতে বড় যে-ক্ষতি তার হয়েছে, তা হল, এইসব খারাপ স্মৃতিদের ভিড় চাপতে-চাপতে তার নিজের ছেলেবেলার প্রায় সব স্মৃতি মুছে গিয়েছে কবে যেন। সে টেরই পায়নি। এখন তার স্মৃতি বেয়ে নীচে নামতে থাকলে সে তার কুড়ি-একুশ বয়সের গভীরতা পর্যন্ত নামতে পারে, তার নীচে অনেকখানি ফাঁকা অন্ধকার, যেখানে তার ছেলেবেলা আর কৈশোর থাকার কথা। হ্যাঁ, কখনও সখনও কিছু-কিছু চোখে পড়ে গেলে হুট করে তার মনে পড়ে যায় ছেলেবেলার চাদরের কোনও একখানা কোনা, কিন্তু পুরো নকশাটা সে আর কিছুতেই দেখতে পায় না।

এহেন ভিনদেশি তো ঘুরে-ঘুরে বেড়াচ্ছিল কুয়াশানগরীর এদিক সেদিক। দিন দশেক আগে সে ছিল সেই জমায়েতে, যেখানে বিপ্লবী বন্দি হয়। দিন তিনেক আগে তার ফাঁসির হুকুমও ভিনদেশির কানে এসেছে বটে। আজব এই রাজ্য, এখানে সত্যি বললে সাজা পেতে হয়। এরকমটা সে কোথাও শুনেছে বলেও মনে করতে পারল না।

এইদিন সে যখন আপনমনে শুকনো পাতা মাড়িয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে বনের মধ্যে আর বুঝতে পারছে যে একটু পরেই বৃষ্টি নামবে, তখন সামনের কুয়াশার আড়াল থেকে হঠাৎ যেন ভেসে উঠল দুই যুবতী। তাদের দু’কাঁধে দু’খানা ডানা দেখে একটু অবাক হল বটে ভিনদেশি, কিন্তু চমকে উঠল না, কেননা এই পৃথিবীর নানা পথে সে নানা আশ্চর্য দেখেছে। আশ্চর্য তার অভ্যেস হয়ে গিয়েছে এখন। তাদের পরনে ঝলমলে পোশাক, তাদের কালো এলোমেলো চুল নেমে এসেছে পিঠ ছাপিয়ে, আর তাদের অপরূপ মুখের সর্বত্র ঝকমক করছে তীক্ষ্ণ বুদ্ধির জেল্লা, এই ঘন কুয়াশাতেও। তারা তাদের গোলাপি ডানা মুড়ে নিয়ে বলল, “তোমাকে আমাদের ভারী দরকার।”

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%