শ্রীজাত
ঢিলেঢালা আলখাল্লা পরা লোকটাকে ঘিরে একখানা ছোটখাটো কৌতূহলী ভিড় জমেছে। ব্যাপারটা ঘটছে উপত্যকার বাজার এলাকার মাঝখানে, যেখানে সকাল-সকাল নানা কারিগরেরা হাতের কাজ নিয়ে বসেছে, সঙ্গে নানারকমের টাটকা সবজি,মাংস আর দুধও বিক্রি হচ্ছে। এমনিতেও এ-জায়গাটা এ-সময়ে ভারী জমজমাট থাকে। তার উপর আগামীকাল সকালে মিনার থেকে ভাষণ দেবেন রাজা, তাই কায়দা করে সাজানো হয়েছে গোটা বাজার অঞ্চলও। কিছু দূরে কুয়াশার চাদর ভেদ করে মাথা-উঁচু দাঁড়িয়ে আছে এই এলাকার সবচাইতে লম্বা পর্বত, ওই দেখা যায় তার বরফওলা শৃঙ্গে রোদ্দুর পড়ে ঝলমল করছে।
তা এইরকম একখানা সকালে, হঠাৎ ভোজবাজির মতো হাজির হওয়া লোকটাকে ঘিরে একটু-একটু করে ভিড় জমছে। এমনিতেই এসব অঞ্চলে প্রায় সকলেই সকলকে চেনে। বাজার করতে এসে দেখা সাক্ষাৎ হলে কুশল বিনিময়, সে তো আছেই, এমনকী ‘ছেলে কেমন মাছ ধরছে’ বা ‘মেয়ে কেমন কাঠের কাজ করছে’ বা ‘বউয়ের শরীর ভাল তো’ ইত্যাদি প্রশ্নপাটা চলতেই থাকে, এতটাই কাছ থেকে এখানে নিজেদের চেনে সাধারণ বাসিন্দারা। তার উপর কী এক আশ্চর্য কারণে গত ছ’মাসে অনেক বাসিন্দা উধাও হয়ে যাওয়ায় চেনা পরিচিতির গণ্ডিখানা আরওই ছোট হয়ে এসেছে। হুটহাট চেনা মানুষগুলো পরিবারসুদ্ধ কোথায় যে হাওয়ায় মিলিয়ে যাচ্ছে, কে জানে। জানে অবশ্য অনেকেই। কিন্তু পরের পরিবার তার নিজেরই হতে পারে, এই ভেবে ভয়ে আর মুখ খুলছে না। তাই অন্যান্য দিনের চেয়ে বাজার এলাকায় ভিড় একটু কেমন যেন কম-কম। কুশল বিনিময়ও তেমন হচ্ছে না। কেবল এ-ওর দিকে তাকিয়ে একটা শুকনো হাসি দিয়ে সরে যাচ্ছে, যে-হাসিতে আনন্দের চেয়ে ভয়ই যেন বেশি।
এমন একটা নিভে আসা সকালে, এমন একখানা সাজিয়ে রাখা একঘেয়ে দিনে এরকম একজন মানুষকে হুট করে দেখতে পেলে তাকে ঘিরে যে একজন দু’জন করে লোক জমবে, এ আর নতুন কী। লোকটার পরনে একখানা ঢিলেঢালা ধবধবে সফেদ আলখাল্লা, গলা থেকে পা পর্যন্ত। হাতা বেশ ঢোলা, সেই হাতার শেষ প্রান্ত থেকে লোকটার সরু সরু আঙুল বেরিয়ে আছে, যেমন আঙুল ঠিক এসব দিককার মানুষের হয় না। আলখাল্লাটা বেশ দামী পশমের তৈরি, বোঝাই যাচ্ছে দেখে, কেননা এই কুয়াশার ভাপা আলোতেও তার সাদাটেপনা চোখে এসে লাগছে। আর সেই আলখাল্লার গায়ে ভারী জুত করে সাঁটা রয়েছে নানা রঙের চৌখুপি সব কাপড়ের তাপ্পি। লোকটার পোশাকখানাই আগে চোখে পড়েছিল সকলের, কেননা এই নগরীতে এমন পোশাক কেউ কখনও পরে না। তারপর চোখে পড়েছিল মানুষটাকেও, যে এই পোশাকের মধ্যে হেঁটেচলে বেড়াচ্ছিল সেই সকালে, বাজার অঞ্চলে।
কাঁধে তার একখানা বেশ হৃষ্টপুষ্ট ঝোলা, সেও খুব দামি কাপড়ের তৈরি বলেই মনে হচ্ছিল এক ঝলক দেখে। ঝোলার মধ্যে কী আছে, সেইটা জানার জন্যে এপাশ ওপাশ থেকে মানুষজন উঁকি মারছিল বটে, কিন্তু ঝোলার মুখ সুতোর ফেট্টি দিয়ে কষে বন্ধ করে রাখা দেখে হতাশ হল অনেক নগরবাসী। পায়ের দিকে তাকালেও তার অবাকই হতে হয়। এমন জুতো কেউ কখনও এ-অঞ্চলে দেখেছে বলে মনে তো পড়ে না। এখানে রাজারাজড়াদের একরকম জুতো, পেয়াদাদের একরকম, কাঠুরেদের একরকম, মাছধরিয়েদের একরকম, আবার রাখালদের একরকম। নানারকম জুতো পরা পা এই উপত্যকায় আর অরণ্যে রোজ ঘোরাফেরা করে। কিন্তু এরকম একখানা জুতো? উহুঁ! কিছুতেই কেউ এমন জুতো দেখেছে বলে মনে করতে পারল না। সফেদ চামড়ার টানটান একখানা নাগরার মাথায় চকমকে মণি বসানো। সেও খুব দামি হবে নির্ঘাত। দেখেই বুঝল নগরীর লোকজন।
তারপর রইল তার টুপিখানা। সেও বেজায় কায়দার ব্যাপার। এমন টুপি এদিককার লোকজন দেখেইনি কখনও, পরা তো দূরের কথা। মাথায় এঁটে বসা টুপিখানাও সফেদ আর ভালই পশমে তৈরি। সে-টুপি মাথা থেকে চোঙার মতো উঠে গিয়েছে প্রায় আধহাতেক। আর যেখানে শেষ হয়েছে গিয়ে, সেখান থেকে কালো একখানা ঝালর ঝুলছে, চকচকে রেশমের। সব মিলিয়ে মাথা থেকে পা পর্যন্ত দেখার পরে আর বলে দিতে হয় না যে মানুষটি বেশ ধনী এবং কেতাদুরস্ত। যদিও এই নগরীতে ধনীদের এমন চেহারা দেখা যায় না। কিন্তু আছে নিশ্চয়ই কোনও নগরী, যেখানে লোকের ধনসম্পত্তি থাকলে এমন পোশাক পরে ঘুরে বেড়ায়।
ও হ্যাঁ, লোকটার সঙ্গে আছে একখানা কালো ঝকঝকে তেজী ঘোড়া, যার লাগাম তার হাতে ধরা আছে। ঘোড়ার কেশর উড়ছে ভারী বাতাসে, আর লেজের চামর মাঝেমধ্যে দুলে উঠে জানান দিচ্ছে তার চঞ্চলতা। এ-ঘোড়া যে এক চাপড়েই বাতাসের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে, সে আর বলে দিতে হয় না। ঘোড়াটাও, দেখেই বুঝল বাজারের লোকজন, এসব অঞ্চলের নয়। তাদের ঘোড়ারা একেবারে অন্যরকম দেখতে। এ-ঘোড়া এখানকার হতেই পারে না। কোত্থেকে এসেছে, এই লোক?
মুখটা তার বেশ অন্যরকম। ধারালো নাক, তীক্ষ্ণ অথচ উদাসীন একখানা চাহনি, চোয়াল অল্প ভাঙা, কিন্তু কঠিন নয়, কেমন এক নরম মায়া আছে তার মুখে জড়ানো। একখানা গোঁফ রেখেছে সে আলতো করে, কিন্তু গাল পরিষ্কার। আর কাঁচাপাকা এলোমেলো চুল টুপির দু’ধার থেকে নেমে লুটিয়ে পড়েছে কাঁধের উপর।
লোকটা টুকটুক করে ঘোড়া হাঁটাতে-হাঁটাতে কোত্থেকে যেন ঢুকে পড়ছিল বাজার এলাকায়। রেশমের কাপড় হাতে করে নিয়ে দেখছিল, গমের দানা হাতের পাতায় তুলে এনে শুঁকছিল, এমনকী মাটির একখানা পুরুল নিয়েও নাড়াচাড়া করছিল বেশ। কিন্তু কারও সঙ্গে কোনও কথা বলছিল না। সে না-ই বলুক, কিছুক্ষণ পর তার দিকে হাতের ইশারা করে একে অপরকে দেখাতে শুরু করেছিল নগরীর বাসিন্দারা। কানে-কানে ফিসফিস করে বলতে শুরু করেছিল কথা। অনেকে একসঙ্গে ফিসফিস করলে সেটাই গুঞ্জন হয়ে ওঠে। আগন্তুকের কানে সেইটা গিয়েছিল ঠিকই। তবু সে ঘোড়া হাঁটাতে-হাঁটাতে এসে দাঁড়িয়েছিল মাছের পসরার সামনে, হাত দিয়ে পরখ করে দেখছিল ধাতুর লন্ঠনের কারুকাজ। কিন্তু মানুষজনকে সে অগ্রাহ্য করতে পারল না মোটেই, যখন তারা দল বেঁধে নিঃশব্দ পায়ে তাকে আর তার ঘোড়াকে গোল করে ঘিরে দাঁড়াল। চোখ তুলে সকলের দিকে তাকাল একবার আগন্তুক। একসঙ্গে এতজন বিষণ্ণ মানুষ সে অনেকদিন দেখেনি।
তাকে ঘিরে গোল হয়ে দাঁড়ানোর পর মানুষের গুঞ্জন থেমেছিল ঠিকই, কিন্তু কেউ খোলাখুলি তাকে কিছু বলছিল না। এমনিতেই গত কয়েক মাসে এই নগরীতে কথা খুবই ভেবেচিন্তে বলতে হয়। কোন কথার কী প্রভাব কোথায় পড়বে এবং তার কী ফলাফল সহ্য করতে হবে, এটা কেউ ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। তাই বিষয় যা-ই হোক না কেন, কেউ কথা শুরু করতে চায় না। চায়, আগে কেউ কিছু বলুক, তারপর না হয় ভেবেচিন্তে যোগ দেওয়া যাবে, বা চুপ থাকা যাবে। এদিন সকালেও ঠিক সেটাই হচ্ছিল বাজার অঞ্চলে। মানুষটাকে ঘিরে ধরে তারা কেবলই তাকিয়ে চলেছিল তার দিকে। তার পোশাক, তার মুখ, তার জুতো, তার আঙুল, তার ঝোলা, সব কাছ থেকে খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে দেখছিল, কিন্তু কেউ বলছিল না কিছু। শেষমেশ চুপচাপ আবহাওয়ায় কথা বলে উঠল খোদ লোকটাই।
“আপনারা কি কিছু বলতে চান আমাকে?” ভারী মোলায়েম গলায় সে জিজ্ঞেস করল।
এ-প্রশ্ন শুনে জড়ো হওয়া বাসিন্দারা এ-ওর মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগল। লোকটা তাদেরই ভাষায় স্পষ্ট কথা বলছে। কিন্তু সত্যিই কি তারা কিছু বলতে চায় লোকটাকে? এই নিয়ে যখন সকলে ভাবনায় মশগুল, ভিড়ের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক বৃদ্ধ মাছধরিয়ে প্রশ্ন করলেন, “আপনি কোত্থেকে আসছেন?”
আগন্তুক লোকটি জবাব দিল, “আপাতত পশ্চিম দিক থেকে এখানে এসে পৌঁছেছি।”
সকলে এ-ওর মুখ চাওয়াচাওয়ি করে নিল আরও একবার। এটা এখন এখানকার বাসিন্দাদের একরকম অভ্যেসে দাঁড়িয়ে গিয়েছে।
বৃদ্ধ সেই মাছধরিয়ে আবার প্রশ্ন করলেন, “ও। তা যাবেন কোথায়?”
আগন্তুক বলল, “তা তো জানি না। আমি ঘুরে বেড়াই এমনিই। আমার কোথাও যাওয়ার নেই।”
এ-জবাবে সকলে বেশ অবাক হল। কোথাও যাওয়ার নেই আবার কেমন কথা!
তখন বুড়ো জেলে আবার পাল্টা প্রশ্ন করলেন, “তা বেশ, যাওয়ার যখন নেই, তখন থাকেন কোথায়?”
আগন্তুক এবার গোঁফের ফাঁকে ক্ষীণ একখানা হাসি ফুটিয়ে বলল, “আমার কোনও ঠিকানা নেই। আমি থাকি না কোথাও। আমি কোথাও যাইও না।”
এ-কথার মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে না পেরে সকলের মধ্যে আবার একখানা মৃদু গুঞ্জন উঠল। এ আবার কেমনতর কথা, যার কোনও মানেই নেই? বুড়ো জেলে তার ডান হাতের পাতা তুলে সকলকে কথা থামাতে বলে আবার জিজ্ঞেস করলেন, “এ-কথার তো কোনও অর্থ নেই আগন্তুক। সকলেই কোথাও না কোথাও থাকে। আপনার দেশ কোথায়?”
আবারও অল্প একটু হেসে জবাব দিল লোকটা, “অর্থ কেন থাকবে না। বুঝতে পারলেই অর্থ আছে। আমার কোনও দেশ নেই। আমার বাড়িঘর নেই কোনও। আমি এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় পাড়ি দিই কেবল। কিন্তু কোথাও পৌঁছনোর জন্য নয়। কেবল চলার জন্য।”
এবার ব্যাপারটা সকলের ধরতাইয়ের আরও বাইরে চলে গেল। লোকটা বলে কী? কোনও দেশ নেই, এরকম আবার হয় নাকি? আর কোথাও যাওয়ার নেই, তবু ঘোড়ায় চেপে ঘুরে বেড়াচ্ছে? নাহ, নেহাত বদ্ধ উন্মাদ হলেও আশ্চর্য ব্যাপার নয়, এমনটাই ভাবল সকলে।
বুড়ো জেলে তবু হাল ছাড়ার লোক নন। তিনি বললেন, “কিন্তু সকলেই তো কোনও না কোনও দেশের বাসিন্দা হয়ে থাকে আগন্তুক, তাই না? আপনাকে দেখে বোঝা যাচ্ছে আপনি এ-রাজ্যের নন, এমনকী এদিককার মানুষই নন। তাই আমরা জানতে চাইছি আপনার দেশ কোথায়। আপনার নাম কী।”
“দেশ কাকে বলে, সে হয়তো আপনারা বোঝেন, যারা গণ্ডির মধ্যে থাকেন। গণ্ডি দিলেই দেশ। তুলে দিলেই আর দেশ নেই। আমি তো ঘুরে-ঘুরে বেড়াই, গণ্ডি মানি না। থাকি না কোথাও, যাইও না কোথাও। তাই আমার কোনও দেশ নেই।”
নাহ, লোকটা নেহাত হেঁয়ালি করে সময় কাটাচ্ছে, মনে হল সকলের। কেবল বুড়ো মাছধরিয়ে থুতনি মুঠোয় পুরে কিছুক্ষণ ভাবলেন। তারপর জানতে চাইলেন, “বেশ, মানলাম, কোনও দেশ নেই আপনার। কিন্তু নাম? নাম তো একখানা আছে? নাকি সেটাও নেই।”
“ছিল, নাম ছিল একখানা,” জবাব দিল আগন্তুক, “কিন্তু কেউ না ডাকতে-ডাকতে সেই নামটা মুছে গিয়েছে। এখন আমার নাম ভিনদেশি।”
“ভিনদেশি? এ আবার কেমন নাম...?” বলে একখানা গুঞ্জন উঠল চারপাশ থেকে।
আগন্তুক হেসে জবাব দিল, “এই যেমন আপনারা জানতে চাইছেন আমার দেশ কোথায়, তেমন সকলেই জানতে চায়। কিন্তু আমার তো কোনও দেশ নেই। তাই সব দেশেই আমি ভিনদেশি। আপনারাও না হয় আমাকে সেই নামেই ডাকবেন।”
এ-লোক মোটেই সুবিধের নয়, মনে হতে লাগল সকলের। যেখানে দেশের লোকজনকেই পরিচয়ের ভিত্তিতে বের করে দেওয়া হচ্ছে ঘাড় ধরে, সেখানে কোন সাহসে একটা আহাম্মক লোক নিজেকে ভিনদেশি বলে পরিচয় দেয়, কে জানে। সকলে বুঝে গিয়েছে, এ-লোক কিছু বলবে না, এবার মানে-মানে যার-যার কাজে ফিরে যাওয়াই ভাল। এমনিতেও হাওয়া ভাল নয়, একসঙ্গে অনেককে মিলে জটলা করতে দেখলে রাজার পেয়াদা এসে হাজারটা প্রশ্ন করতে পারে। তাই ইদানীং একজোট হয়ে গল্পগুজব করা প্রায় হয়ই না কারও। তার উপর কাল রাজার ভাষণ, চারদিকে কড়া প্রহরা। তার মধ্যে এই ভিনদেশির সঙ্গে জটলায় তাদের দেখে ফেললে শাস্তি অবধি হয়ে যেতে পারে, মানুষজন ভাবছিল।
এই সময়ে বুড়ো জেলে আরও একখানা প্রশ্ন করে বসলেন, “তা বেশ। মানলাম তুমি ভিনদেশি। নাম নেই কোনও, ঠিকানাও নেই। মানলাম। কিন্তু কাজ? কাজ কী করা হয়?”
এইবার ভিনদেশির হাসিখানা যেন আরেকটু চওড়া হল। চারপাশের থমথমে মুখগুলোর সঙ্গে যা এক্কেবারেই বেমানান। তারপর সে সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে নিয়ে বলল, “সে ভারী সহজ কাজ। আমি স্মৃতির কারিগর।”
এমন কথা এখানে জম্মেও কেউ শোনেনি। তারা বুঝেই নিল, এ-লোকটা বদ্ধপাগল। কোথাও থেকে একখানা ঘোড়া আর আজব পোশাক জুটিয়ে নিয়ে ঘুরে বেড়াতে-বেড়াতে এ-অঞ্চলে চলে এসেছে। এর সঙ্গে কথা বাড়ানোই হয়েছে ঝকমারি। বুড়ো জেলে তখনও ভিনদেশির দিকে উৎসুক আর ভাঁজ-পড়া চোখে তাকিয়ে। তিনি মোটেই আর সকলের মতো পাগল ভাবছেন না ভিনদেশিকে। বোধহয় সেটা বুঝতে পেরেই ভিনদেশি বলল, “আপনাদের মধ্যেও নিশ্চয়ই অনেক ধরনের কারিগরেরা আছেন, তাই না? কেউ পোশাক তৈরি করেন আর রিফু করেন, কেউ ধাতু দিয়ে জিনিসপত্র তৈরি করেন, কেউ চামড়ার কাজ করেন, কেউ বা মাটির কাজ। আছেন না?”
নিজেদের মুখের দিকে চেয়েচিন্তে সকলেই অল্প মাথা নাড়ল বাসিন্দারা। সেটা দেখে হেসে ভিনদেশি বলল, “আমিও সেরকম। আমি স্মৃতি সারাই করি। শুধু সারাই কেন। সবরকম কাজ করি। স্মৃতি নষ্ট হয়ে গেলে বা মুছে গেলে সেটা সারাই করি, জোড়া লাগাই। আবার স্মৃতি বদলও করি। কেউ যদি খারাপ স্মৃতি মুছে ফেলে কোনও ভাল স্মৃতি বসাতে চান মনের মধ্যে। সে-কাজও জানি। স্মৃতির মধ্যে নেমে জোড়াতালি দিতে জানি। আবার এক্কেবারে অদেখা কোনও দৃশ্যকে স্মৃতি হিসেবে মনের মধ্যে বসিয়ে দিতে জানি। এই যেমন লোহার কাজ, চামড়ার কাজ বা মাটির কাজ, তেমনই আর কী। কেবল ভীষণ সাবধানে করতে হয়। স্মৃতি তো, একবার ভুল হয়ে গেলে আর ঠিক করা যায় না।”
সকলে হাঁ হয়ে শুনছিল কথাগুলো, যখন উপত্যকার বাজার অঞ্চলের কুয়াশা হয়ে আসছিল আরও ভারী, আর বেলার আলো হয়ে আসছিল পশমের মতোই নরম। ভিনদেশির কথা শেষ হওয়ার পর কেউ আর কথা বাড়াল না, নিজেদের মধ্যে গুঞ্জনও করল না। তারা এতই অবাক হল যে, আস্তে-আস্তে পায়ে-পায়ে যে-যার পসরার দিকে, দরদামের দিকে ফিরে গেল। আর বাজারের মাঝখানে ঘোড়া হাতে দাঁড়িয়ে থাকল আলখাল্লা পরা সেই আশ্চর্য আগন্তুক, যার কোনও দেশ নেই, নাম নেই, ঠিকানা নেই, গন্তব্য নেই। এই আগুন জ্বলতে থাকা অশান্ত দেশের মাঝখানে এসে দাঁড়াল সে, ভিনদেশি।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন