সপ্তম অধ্যায়

শ্রীজাত

শুকনো হয়ে আসা রাজকন্যার মন ভাল করার জন্য আর কী-কী করতে পারে ভেবেই হয়রান তার দুই সহচরী। ইতিমধ্যে তারা তাকে আজব সব জাদুর খেলা দেখিয়েছে, পশ্চিমের গানবাজনা শুনিয়েছে নিজেরাই, ছায়াবাজি করে দেখিয়েছে দেয়ালে, এমনকী একদিন আগুনের নকশা কেটেও দেখিয়েছে, কিন্তু রাজকন্যার মন কিছুতেই ভাল হয় না। যে-রাজকন্যা শত অসুবিধে বা দুঃখেও একচিলতে হাসি টাঙিয়েই রাখত ঠোঁটে, তার রংহীন ঠোঁট এখন প্রায় ফাঁকই হয় না। যে-রাজকন্যা নিজের মর্জির বাইরে এক পা-ও ফেলত না আর সেসব করার জন্য সে কাউক্কে ভয় পেত না, আজ তারই যেন কোনও কাজ করার ইচ্ছে নেই। যে-রাজকন্যা কোথাও অন্যায় দেখতে পেলে রুখে দাঁড়াত তার রাজপরিচয় ভুলে গিয়ে, আজ এতগুলো দিন সে জানতেই চায়নি, রাজ্যজুড়ে কী কী ঘটে চলেছে। কেবল স্বাদ নয়, তার ঠোঁট থেকে কথা, ভাষা, ইচ্ছে, সবই কেড়ে নিয়েছে সেদিনের সেই চুম্বন, যা সে নিজেই বিপ্লবীকে উপহার দিয়েছিল।

আজ দুপুরেও এক সহচরী কথা বলতে গিয়ে খেয়াল করল, রাজকন্যার দৃষ্টি সামনের দীর্ঘ গাছের সারিদের ছাড়িয়েও অনেক দূরে গিয়ে পড়েছে। যেন সে তাকিয়ে আছে অতীতের দিকে। আরেক সহচরীকে ডেকে নিয়ে তারা দু’জন মিলে বসল রাজকন্যার সামনে। রাজকন্যা বুঝল বটে, তারা আবার চেষ্টা করছে তার মন ভাল করার, কিন্তু ভারী শুকনো একখানা হাসি হাসার চেষ্টা ছাড়া সে কিছুই করে উঠতে পারল না।

সহচরীরা একখানা ছোট মতলব কষেই নিয়েছিল। সেইমতো এক সহচরী জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা রাজকন্যা, ছোটবেলার কথা কিছু মনে পড়ে তোমার?”

রাজকন্যা কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল চুপ করে। কথা বলতে তার মোটেই ইচ্ছে করছে না। কিন্তু এই দুই সহচরী তাকে ভাল রাখার এতরকম চেষ্টা করছে যে, তাদের প্রতি রাজকন্যার মায়াই হচ্ছে একরকম। তাই সে কোনওরকমে উত্তরে বলল, “তা কেন পড়বে না? পড়ে তো। কিন্তু অল্পস্বল্প। খুব অল্প মনে পড়ে বাবা আর মায়ের কথা, তাঁদের আদরের কথা। আর সেই সকালটার কথা, যখন মন্ত্রী এসে খবর দিল যে...” বলে রাজকন্যা চুপ করল।

সহচরীরা বুঝল, মন ভাল করতে গিয়ে খারাপ হওয়ার উপক্রম হচ্ছে। তারা নিজেদের মধ্যে একটিবার চোখ চাওয়াচাওয়ি করে নিল। এবার আরেক সহচরী জিজ্ঞেস করল, “সে তো খুব ছোটবেলাকার কথা। আমি বলছি, মন ভাল হয়, এরকম কিছু? আরেকটু বড়বেলাকার কিছু?”

এবার রাজকন্যা উত্তর দেওয়ার আগেই আরেকখানা প্রশ্ন জুড়ে দিল এক সহচরী, “আচ্ছা রাজকন্যা, সেই ফুলটার কথা মনে পড়ে তোমার?”

এবার রাজকন্যা একটু যেন অবাক হয়ে তাকাল। সহচরী আবার বলল, “আহা, সেই যে, যেদিন তোমার সঙ্গে প্রথমবার দেখা হল আমাদের, সেই গুহার মধ্যে? একখানা ফুল তুমি দেখেছিলে সেখানে, মনে আছে?”

রাজকন্যা এক মুহূর্তে ওই অতগুলো বছর পিছিয়ে গেল। আর ফুলের কথাটা শোনামাত্র তার কানে বেজে উঠল এক বালকের গলার স্বর, যে বলছে, “এই ফুলটা যদ্দিন থাকবে, আমি তদ্দিন তোমাকে মনে রাখব রাজকন্যা। আর তুমিও আমাকে ভুলে যেও না।”

কুয়াশাঘেরা কাঠের বাড়ির মধ্যে যেন ফিসফিস করে কথাগুলো শোনা গেল রাজকন্যার কানের কাছেই কোথাও। আর দেখতে দেখতেই যেন রাজকন্যার চারপাশের ঠান্ডা কাঠের কর্কশ দেয়ালগুলো হয়ে উঠল কুয়াশামোড়া পর্বতের সারি, আর পায়ের তলার স্যাঁতসেঁতে মেঝেখানা বদলে গেল সবুজ ঘাসের মখমলে মোড়া ঢালু উপত্যকার কিনারে, যেখানে এই তো ক’দিন আগে তাঁবু ফেলেছে কোন সব দূরের দেশ ঘুরে আসা ভবঘুরেদের দল। তাদের ধরন-ধারণ রাজকন্যার ভারী ভাল লাগে। তারা যখন খুশি রান্না করে, যেমন খুশি সাজে আর কতরকমের গানবাজনা আর নাচ যে তারা পারে, তার লেখাজোকা নেই। সারাক্ষণ খুব আনন্দে মেতে থাকে। রাজপ্রাসাদ থেকে ছুট্টে বেরিয়ে এসে, রাজদাসীদের চোখকে ফাঁকি দিয়ে তাই সে মাঝেমধ্যেই চলে আসে এইখানে। যদিও তাকে শেষমেশ রাজদাসীরা ঠিক খুঁজে বের করে আর সে-নালিশ নতুন রাজার কানেও পৌঁছয়, কিন্তু তাতে রাজকন্যা মোটেই ভয় পায় না। এমনকী একদিন তো নতুন রাজা সাফ বারণই করে দিলেন এদের সঙ্গে মিশতে, আর তাতে রাজকন্যার জেদ গেল আরও বেড়ে। আগে সে হপ্তায় তিন চার দিন আসত, এখন রোজ আসছে ভবঘুরেদের এই ছোট্ট ডেরায়। আর তারাও এই ক’দিনে ভালবেসে ফেলেছে কমবয়সি ফুটফুটে রাজকন্যাকে।

“তোমার বুঝি বাড়ি নেই কোনও?”

রংবেরঙের পাথর নিয়ে খেলতে-খেলতে একদিন ছেলেটাকে প্রশ্ন করেছিল রাজকন্যা। রাজপ্রাসাদে তার কোনও বন্ধু ছিল না, কেবল দাসদাসী, যারা সারাক্ষণ তার যত্ন নিচ্ছে আর নজরদারি করছে। আর দু’জন বন্ধু অবশ্য আছে তার, কিন্তু সেই দুই আশ্চর্য মেয়েদের তো সারাক্ষণ হদিশ মেলে না। এই প্রথম, প্রাসাদের বাইরে, রোজ দেখা করার মতো কোনও বন্ধু সে পেয়েছে। তার চাইতে বেশ কয়েক বছরের বড় একখানা ছেলে, তার বাবা আর মা এই ভবঘুরেদের দলেই খেলা দেখায়, নাচে গায়। অনেকটাই বড় হবে সে রাজকন্যার চাইতে, কিন্তু এমনভাবে মিশতে পারে, যেন তারই সমবয়সি। রাজকন্যার এই প্রশ্নের উত্তরে একটু লম্বা, উদাস চোখের আর দোহারা গড়নের ছেলেটা উত্তর দিয়েছিল,

“বাড়ি? কই, না তো! আমরা তো ঘুরে-ঘুরে বেড়াই। বাড়ি থাকলে তো আর ঘুরে বেড়ানো যাবে না, বাবা বলেন। তাই সব দেশ, সব পাহাড়, সব নদীই আমাদের বাড়ি। কিন্তু তা ছাড়া আমাদের কোথাও কোনও বাড়ি নেই।”

“ইশ, কী ভাল! আমারও বাড়ি ভাল লাগে না, জানো?”

“তুমি তো রাজপ্রাসাদে থাকো, আমাকে মা বলেছেন। আমরা অনেক রাজপ্রাসাদ দেখেছি, কিন্তু বাইরে থেকে। রাজপ্রাসাদের ভিতরটা নিশ্চয়ই খুব সুন্দর?”

“মোটেই না, একেবারে বিচ্ছিরি। ভীষণ বাজে। কিন্তু তুমি দেখতে চাইলে আমি তোমাকে নিয়ে যেতে পারি। যাবে আমার সঙ্গে?”

“না-না, আমি যাব না। এমনিতেই বাবা-মা আমাকে বলেছে, তোমার সঙ্গে খেলাধুলো কম করতে।”

“তাই? কেন?”

“আমরা এখানে এসে তাঁবু ফেলেছি বলে নাকি রাজামশাই খুব রাগ করেছেন, দলের সর্দারকে ডেকে বলেছেন এখান থেকে ডেরা তুলে নিতে। তার উপর যদি জানতে পারেন যে আমি তোমার সঙ্গে রোজ বিকেলে খেলি...”

“খেলবই তো। বেশ করব খেলব। আমরা তো বন্ধু, তাই না?”

ছেলেটা একটু থতমত করে তাকিয়ে থাকে। সে এর আগে বেশ কিছু দেশ পার করেছে, সেসব দেশের উঁচু-উঁচু প্রাসাদও দেখেছে। কিন্তু কোথাও এমন রাজকন্যা দেখেনি। উত্তরে সে কিছু না বলে একটু হাসল। সে জানে ভালই, এ-দেশেও তাদের থাকা হবে না বেশিদিন। এমনিতেই তারা কোথাও মাস তিন চারেকের বেশি থাকে না, এখানে তো তার উপরে রাজামশাইয়ের রোষ-নজর পড়েছে, তাই আগেভাগেই তাঁবু গুটিয়ে রওনা দিতে হবে।

রাজকন্যা আবার বলল, “আমাকে তোমাদের দলে নেবে?”

প্রশ্নটা শুনে একগাল হেসে উঠল ছেলেটা, তার খিলখিল হাসি রোদ্দুরের মধ্যে যেন ছড়িয়ে পড়ল ভাঙা কাচের টুকরো হয়ে। হাসি দেখে ছোট্ট রাজকন্যার রাগই হল একটু, “হাসছ যে বড়? জানো, আমি গান গাইতে পারি? নাচতেও পারি।”

ছেলেটা রাজকন্যার বাদামি একঢাল চুলের কপালের কাছটা ঘেঁটে দিয়ে বলল, “ধুর বোকা। তুমি তো রাজকন্যা। তুমি কী করে আমাদের দলের হবে?”

“কেন? রাজকন্যারা বুঝি খারাপ হয়?”

“না-না, তারা তো খুব ভাল হয়। কিন্তু তাদের জন্যে তো রাজ্য আছে, প্রাসাদ আছে। তোমাকে বড় হয়ে এই রাজ্যের রানি হতে হবে না?”

কথাটা শুনে একটু মুষড়েই পড়ল ছোট্ট রাজকন্যা। তারপর বলল, “আর তুমি? তুমি বড় হয়ে কী করবে?”

“আমি আর কী করব। এই ঘুরে ঘুরেই বেড়াব। নানান দেশ দেখব, নানান লোকের সঙ্গে আলাপ করব, তাদের জন্য গাইব, নাচব, খেলা দেখাব...”

“আমিও তো এরকম চাই। আমি পারব না তোমাদের সঙ্গে চলে যেতে?”

“তাই কি হয়? তুমি ওসব পারবে না।”

“তা হলে তুমি অনেক লোকের সঙ্গে মিশে ভুলে যাবে আমাকে?”

“মোটেই না। আমরা তো বন্ধু, তাই না? বন্ধু কি বন্ধুকে ভোলে কখনও, বলো?”

এ-কথা শুনে ছেলেটার হাত চেপে ধরে উপত্যকার কিনারে ঝাঁপিয়ে পড়া ঝরনার দিকে ছুট লাগিয়েছিল রাজকন্যা। কুয়াশা তখন ঢেকে দিচ্ছে সবুজ ঘাসের গালিচা, চিনারে ঠান্ডা বাতাস বয়ে যাচ্ছে শনশন, আর তাদের সবকিছুকে ছাপিয়ে তারা দু’জন ছুট দিয়েছিল অনেকক্ষণ ধরে, আজও মনে আছে তার।

তাদের রোজকার খেলা যখন রাজকন্যার অভ্যেসে দাঁড়িয়ে গিয়েছে, তখনই একদিন ভবঘুরে ছেলেটা তাকে বলল, “জানো রাজকন্যা, কাল আমরা তোমাদের রাজ্য ছেড়ে চলে যাব।”

রাজকন্যা শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “কই, তুমি তো আমায় আগে বলোনি?”

“কী করে বলব? আমরাই তো আজ জানলাম। আরও তিন মাস আমাদের এখানে থাকার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু আজ রাজার পেয়াদারা এসে জানিয়ে গিয়েছে, কালকে জায়গা খালি না করে দিলে লাঠি চলবে। কী আর করা, তাই কাল দুপুর-দুপুর আমরা বেরিয়ে পড়ব।”

“কোথায় যাবে তোমরা এবার?”

“তা কি আর আমরা নিজেরাও জানি? সব নিয়ে হাঁটা দেব। আবার যেখানে একটু বসতি পাব, লোকজন পাব, বসে যাব সব নিয়ে, এই।”

“আর কোনওদিন আসবে না এখানে ফিরে?”

প্রশ্নটা করার সময়ে ছোট্ট রাজকন্যার চোখে জল চলে এসেছিল, আর কেঁপে উঠেছিল ঠোঁট। সেটা দেখে তাকে জড়িয়ে ধরে ছেলেটা বলেছিল, “আসব তো। আমি বড় হয়ে যাই, একা-একা ঘুরে বেড়াই, তখন আবার ফিরে আসব। কিন্তু তুমি তো তখন রানি। তুমি কি আর আমায় চিনতে পারবে?”

এর উত্তর না দিয়ে রাজকন্যা নিজেকে ছাড়িয়ে হাতের পিঠে চোখ মুছে বলেছিল, “কাল সকালে এসো একবার, যাওয়ার আগে, কেমন?”

বলে ছুট্টে পালিয়েছিল প্রাসাদের দিকে। এই একজন ছিল তার রোজকার মেলামেশার ভাল বন্ধু, সেও চলে যাবে, এটা ভেবে নিতেই তার কষ্ট হচ্ছিল। পরদিন সকালে কুয়াশাঘেরা উপত্যকার কিনারে যখন তাদের দেখা হল। ভবঘুরে সেই কিশোর বলল, “আজ তো আমরা চলে যাচ্ছি। কিন্তু তোমাকে কী উপহার দিই বলো তো? আমার কাছে তো কিছুই নেই।”

তখন রাজকন্যা বলল, “যাওয়ার আগে, আমাকে তোমাদের একখানা গান শিখিয়ে দিয়ে যাবে? আমি সেটা গাইব।”

“বেশ। তা হলে নতুন এই গানটাই তুলে নাও তুমি,” বলে চনমনে গলায় সেই কিশোর গেয়ে উঠল...

এই বেশ! এই বেশ!

পায়ে-পায়ে হেঁটে গেলে পৃথিবী তোমার, আর সীমান্ত মানলেই দেশ

এই বেশ! এই বেশ!

তুলে নাও বাঁশি আর বেহালা বাজাও

আছে গাছে-গাছে পাখি যত ডাকো

চলো পেরোই পাহাড় আর ডিঙোই সাগর

আর পার করি নদীদের সাঁকো

জানি না কোথায় কার শাসন কায়েম আছে, মানি না কারওর নির্দেশ

এই বেশ! এই বেশ!

পায়ে-পায়ে হেঁটে গেলে পৃথিবী তোমার, আর সীমান্ত মানলেই দেশ

এই বেশ! এই বেশ!

হাতে হাত মিলে গেলে কত রং ফোটে

দ্যাখো মানুষের কতশত মুখ

সাদা আছে কালো আছে, আছে কত মিলমিশ

সব রঙে ফুলেরা ফুটুক

জেনো এই মেতে থাকা একদিন মুছে যাবে, তুমি হবে একদিন শেষ

এই বেশ! এই বেশ!

পায়ে-পায়ে হেঁটে গেলে পৃথিবী তোমার, আর সীমান্ত মানলেই দেশ

এই বেশ! এই বেশ!

বন্ধু বানাও তবে, মুঠো ভরে ভালবাসা

রেখে দাও সঞ্চয় করে

গানে আর বাজনায়, পুতুলখেলার নাচে

বিলিও তা অন্য শহরে

সকলেই তুমি জেনো, তুমিও সকলে তাই প্রত্যেকে পাবে তার রেশ

এই বেশ! এই বেশ!

পায়ে-পায়ে হেঁটে গেলে পৃথিবী তোমার, আর সীমান্ত মানলেই দেশ

এই বেশ! এই বেশ!

গান শেষ হতে চোখ খুলে ভবঘুরে সেই ছেলেটা দেখল, রাজকন্যা তার সঙ্গে সঙ্গে চুপিসাড়ে ঠোঁট নেড়ে গাইছে।

“কেমন গান? পছন্দ তোমার?” ছেলেটা জিজ্ঞেস করল।

“ভীষণ পছন্দ। খুব ভাল গান। আমি মনে রাখব। আমি গাইব,” বলল রাজকন্যা। এতক্ষণ তার হাত দু’খানা কোমরের দিকে পিছমোড়া করে লুকোনো ছিল। এইবার সে দু’হাত সামনে আনতেই ছেলেটা দেখতে পেল, এক আশ্চর্য ফুলের বৃন্ত ধরা আছে রাজকন্যার দু’হাতের মুঠোর মধ্যে। ছ’দিকে ছ’খানা ঝালরের মতো পাপড়ি তার এলিয়ে আছে, বেগুনি আভায় ছেয়ে গিয়েছে চারপাশ, আর অদ্ভুত এক ঝিম ধরানো মিঠে গন্ধে ভরে উঠছে উপত্যকার বাতাস। ছেলেটা যখন অবাক চোখে সেদিকে তাকিয়ে আছে, তখন রাজকন্যা ফুলটা তার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “এই ফুলটা তোমার জন্য এনেছি। এটা তুমি নিয়ে যেও। সঙ্গে রেখো।”

কিশোরের চোখ থেকে অবাক ভাব তখনও কাটেনি। সে জিজ্ঞেস করল, “আমি এত-এত দেশ ঘুরেছি, এমন ফুল তো কক্ষনও দেখিনি? কী ফুল এটা?”

রাজকন্যা বলল, “সে তো আমিও জানি না। কিন্তু এই ফুল আরও এক লক্ষ বছর থাকবে। আমি তোমার জন্যে তুলে এনেছি। হারিয়ে ফেলো না কিন্তু...”

এমন সময়ে পিছন থেকে শোনা গেল ভবঘুরেদের দলের ডাক, তল্পিতল্পা বেঁধে তারা রওনা দিচ্ছে। রাজকন্যার বন্ধুকেও চলে যেতে হবে। ফুলটা হাতে নিয়ে সে কেবল বলল, “এই ফুলটা যদ্দিন থাকবে, আমি তদ্দিন তোমাকে মনে রাখব রাজকন্যা। আর তুমিও আমাকে ভুলে যেও না।”

সে পিছু ফিরে মিলিয়ে গিয়েছিল এক কুয়াশায়, আরেক কুয়াশার সকালে তার গলার স্বর বেজে উঠল বিষণ্ণ রাজকন্যার কানের ঠিক পাশটাতে। এক লহমায় অনেকগুলো বছর আগে ঘুরে এল সে। তারপর, সামনে বসে থাকা দুই সহচরীর দিকে তাকিয়ে অনেকদিন পর একখানা মিথ্যে বলল, “উঁহু, সেসব কথা আমার কিচ্ছু মনে নেই।”

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%