দ্বাদশ অধ্যায়

শ্রীজাত

এর ঠিক দু’রাত্রি আগে, আরও দু’খানা ঘটনা ঘটে গিয়েছিল এই কুয়াশানগরীতে। একখানা ভারী গোপনে, রাতের বেলায়, অন্যখানা সক্কলের সামনে, দিনের কুয়াশামোড়া আলোয়। রাজকন্যা তো তার বাস উঠিয়ে নিয়ে এসেছে অরণ্যের প্রাসাদে, বেশ কিছু মাস হল। নতুন রাজার সঙ্গে তার কথা না হলেও, দু’জনেই দিব্যি বুঝেছে, একে অন্যের ঠিক উলটোদিকে তারা দাঁড়িয়ে আছে। তাই রাজাও রাজকন্যাকে কিছু বলতে আসেন না তেমন, রাজকন্যাও নগরীতে যায়, উপত্যকায় ঘোরে, কিন্তু মূল প্রাসাদের ছায়া মাড়ায় না। অরণ্যের মাঝারি প্রাসাদেও তার নিজস্ব চৌহদ্দি আলাদা, রাজামশাই তাঁর দলবল নিয়ে গোপন বৈঠকে এলেও তাই রাজকন্যার সঙ্গে দেখা হয়ে যাওয়ার কোনও সম্ভাবনাই নেই।

সেদিন সন্ধেবেলা, অরণ্যের এক শুকিয়ে আসা হ্রদের ধারে ছিল বিপ্লবী আর তার ছেলেমেয়েদের গোপন বৈঠক। এক রাত পেরোলে কীভাবে তারা মিছিল করবে, কীভাবে জমায়েত নিয়ে পৌঁছবে রাজার ভাষণের ঠিক মাঝখানটাতে, আর সেদিন কোন-কোন গানই বা গাওয়া হবে, সব ঠিক করা হচ্ছিল সন্ধেবেলা। সকলে চলে যাওয়ার পর রাজকন্যা আর বিপ্লবী কিছুক্ষণ কথা বলছিল। এ এক আশ্চর্য সময়। লড়াই আর ভালবাসা এমনভাবে মিলেমিশে গিয়েছে যে, কিছুতেই তাদের আলাদা করা যাচ্ছে না। নদীর থেকে প্রতিফলন যেমন, ঠিক তেমন। এ-কথাই বিপ্লবীকে বলছিল রাজকন্যা। হাতে হাত আঁকড়ে তারা আরও একবার ঝালিয়ে নিচ্ছিল তাদের ধারালো প্রত্যয়, এক রাতের পরের দিন সকালে যা হোক, যেমনই হোক, তাদের জেহাদকে সফল হতেই হবে। প্রয়োজনে প্রাণ যায় যাক, কিন্তু সকলের সামনে রাজার মুখের উপর বিরোধ তারা নামিয়ে আনবেই।

এমন সমস্ত কথা যখন শেষ হয়ে আসছে, তখন অরণ্যের সেই মজে আসা হ্রদের ধারে ফুরিয়ে আসছে দিনের আলোও। ভেজা-ভেজা হাওয়ায় একে অপরকে বিদায় দিয়ে যে-যার রাস্তা ধরল তারা। বিপ্লবীকে হাঁটতে হবে অনেকটা পথ, অরণ্য পার করে উপত্যকার কিনারে তার ছোট বাড়িতে ফেরা। সেখানে বৃদ্ধা মা তার অপেক্ষা করেন রোজ, লন্ঠন জ্বেলে। বৃদ্ধা তিনি বটে, কিন্তু কমজোরি নন। ছেলে ফিরে এলে রোজ তিনি তার কাছ থেকে গল্প শুনতে চান, বিপ্লবের কাজ কতদূর এগোল। সত্যি বলতে কী, আড়াল থেকে মা এমন জোর না দিলে বিপ্লবীর অনেক কিছু করাই হত না।

রাজকন্যার অবশ্য বেশিদূর ফিরতে হবে না, সামান্যই হাঁটাপথ। সেদিন জ্যোৎস্না বেশ ভালরকম। পূর্ণিমার আশেপাশেই হবে হয়তো। কুয়াশাকে পেঁচিয়ে ধরে আস্তে-আস্তে অরণ্যের শুকনো পাতার মেঝেয় ছড়িয়ে পড়ছে রুপোলি জ্যোৎস্নার সেই চাদর। রাজকন্যা একটু হাঁটতেই কোত্থেকে নিজেদের গোলাপি আর সুগন্ধী ডানা ঝাপটাতে-ঝাপটাতে উড়ে এল তার দুই সহচরী। তারা জানতে চাইল বিপ্লবীর খবর, তারা জানতে চাইল জেহাদের খবর, তারা জানতে চাইল, বিপ্লবী এখনও রাজকন্যাকে তেমন-তেমন আদর করেছে কি না। এই শেষ প্রশ্নে রাজকন্যা তাদের একটু বকুনি দেওয়ায় তারা ফের ডানা খুলে ঝাপটাতে শুরু করল। রাতে নাকি ভেড়ার মাংসের সুস্বাদু পদ রান্না করবে তারা দু’জন, তাই জোগাড় করতে হবে হেঁশেলের। এই বলে তারা উড়ে গেল অন্যদিকে।

তারপর তো রাজকন্যা আপনমনে হাঁটছে, জ্যোৎস্নার মধ্যে তার মনে পড়ছে বিপ্লবীর হাতের স্পর্শের কথা, তার বলা কথাগুলোর মধ্যে লুকিয়ে থাকা আগুন, আর তার দুই চোখের আশ্চর্য তাকিয়ে থাকা। ওইরকম চোখ সে মাত্র আর একজনের দেখেছিল, সেও ভারী ছোটবেলায়। কিন্তু এ-বয়সে এসে সোজাসুজি কাউকে এমনভাবে তাকাতে দেখেনি সে। এসব ভাবতে-ভাবতে এগোতে গিয়ে তার হঠাৎ খেয়াল হল, এতখানি সময় তার লাগার কথা নয়। হ্রদের ধার থেকে অরণ্যের মধ্যেকার প্রাসাদের দূরত্ব মোটে এক ক্রোশও নয়, অথচ সে হাঁটছে ভারী দীর্ঘ সময় ধরে। তা হলে কি সে পথ হারাল?

মুখ তুলে তাকিয়ে অবশ্য তার চলা বন্ধ হয়ে গেল। জ্যোৎস্না আর কুয়াশায় ভরা অরণ্যের মাঝখানে দাঁড়িয়ে সে দেখতে পেল, সামনের উঁচু গাছ থেকে দু’খানা ছায়া ঝুলে আছে মাটি অবধি। এমনিতে রাজকন্যা ভয় পাওয়ার মেয়ে নয় মোটেই, কিন্তু সে দেখে বুঝে উঠতে পারল না, কীসের ছায়া ও-দুটো। গাছের ঝুরি একেবারেই নয়, কেননা এসব গাছের গুঁড়ি সটান উঠে যায় আকাশের দিকে, তাদের শাখাপ্রশাখা কক্ষনও মাটির দিকে ঝুঁকে থাকে না। অথচ, জ্যোৎস্নার মধ্যে, কুয়াশা গায়ে জড়িয়ে দু’খানা লম্বা, ছায়া-ছায়া অবয়ব ঝুলছে গাছের শিখর থেকে মাটি পর্যন্ত। আর তারা বাতাসে দুলছেও। কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রাজকন্যা ঠাহর করতে পারল, তাদের অবয়ব একটু-একটু মানুষের শরীরের মতো। ঠিক করে তাকালে একখানা করে মাথা, দু’খানা করে হাত আর পা দেখা যাচ্ছে। কিন্তু এমনিতে মানুষ যেমন হয়, তেমন নয়। কোনও মানুষের শরীরকে মাথা আর পায়ের দিক থেকে ধরে অনেকখানি টেনে লম্বা আর সরু করে দিলে যেমন হয়, তেমন। অবশ্য শরীর বলতে কিছুই নেই এখানে। কেবল ছায়া। দু’খানা ছায়া। রাজকন্যা তার নির্ভীক আর শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল, “কে তোমরা? কী চাও?”

দুই ছায়ার একজন বলে উঠল, “আমরা প্রেত। তোমার সঙ্গে কথা বলতে চাই।”

যে-গলায় উত্তরটা এল, সেটাও যেন ঠিক গলা নয়। কণ্ঠস্বরের ছায়া। যেন অনেকদূর থেকে গোঙানির মতো ভেঙে-ভেঙে ভেসে আসছে। জড়ানো-জড়ানো শব্দ আর তরল এক ধরনের গম্ভীর আওয়াজ। যার মধ্যে যন্ত্রণা আছে। আক্রোশ নেই।

‘প্রেত’ শব্দটা শুনলে অন্য যে-কেউ ভয় পেত, এমনকী রাজার সশস্ত্র পেয়াদারাও। কিন্তু রাজকন্যা যেমন দাঁড়িয়ে ছিল, তেমনই দাঁড়িয়ে থেকে জিজ্ঞেস করল, “কাদের প্রেত তোমরা? কী বলতে চাও আমাকে?”

কিছুক্ষণের নিস্তব্ধতা। তারপর দুই ছায়ার দিক থেকে কথা ভেসে এল, “আমরা স্বীকারোক্তি করতে চাই। স্বীকারোক্তি ছাড়া আমাদের মুক্তি নেই। আর চাই ক্ষমা। নইলে এই অরণ্যে আমাদের প্রেত হয়ে ঘুরে বেড়াতে হবে। তাই আমরা তোমার কাছে এসেছি।”

“আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। কী স্বীকারোক্তি? কাদের প্রেত তোমরা?”

“আমাদের অপরাধের স্বীকারোক্তি, যে-অপরাধের কোনও ক্ষমা হয় না। কিন্তু তোমার ক্ষমা ছাড়া আমাদের মুক্তি নেই এই প্রেতাবস্থা থেকে। আমরা তোমার বাবা, মহামান্য রাজামশাইয়ের অসংখ্য সান্ত্রীদের দু’জন ছিলাম।”

“সে তো অনেককাল আগেকার কথা। তোমাদের মৃত্যু কবে হয়?” নির্ভয়ভাবে জিজ্ঞেস করল রাজকন্যা।

সেই অদ্ভুত তরল স্বর জবাব দিল, “তোমার বাবা আর মা-র মৃত্যু যেদিন হয়, আমাদেরও মৃত্যু সেদিন হয়।”

রাজকন্যা এক লহমা চুপ করে থাকল। তারপর বলল, “তা হলে এতদিন আমাকে কিছু বলোনি কেন তোমরা? আমি তো এই অরণ্যের প্রাসাদেই থাকি।”

প্রেতেরা বলল, “বলিনি, কেননা আমাদের স্বর লুপ্ত হয়ে গিয়েছিল, বিশ্বাসঘাতকতার শাস্তি হিসেবে। এক যুগের জন্য আমাদের কোনও স্বর ছিল না। এখনও স্বর পুরোপুরি ফিরে পাইনি আমরা, খুব কষ্ট করে কথা বলতে হচ্ছে তাই। তিন প্রহর আগে আমাদের কণ্ঠে অল্প স্বর ফিরে আসে। আর তখন থেকেই আমরা তোমাকে অনুসরণ করে চলেছি, যাতে তুমি একা হলে আমরা তোমার কাছে স্বীকারোক্তি পেশ করতে পারি।”

“বেশ, কী বলার আছে বলো,” দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়েই বলল রাজকন্যা। পাশেই বসার মতো একখানা বড় পাথর ছিল, কিন্তু সে বসল না। তার সামনে দু’খানা দীর্ঘ ছায়া তখন দুলছে সন্ধের জ্যোৎস্নায়।

তারা বলল, “আমরা দু’জন তোমার বাবা ও মা-র হত্যাকারী।”

এই বলে তারা চুপ করল, হয়তো রাজকন্যার উত্তরের আশায়। রাজকন্যা এমন একখানা বাক্য হঠাৎ শুনে সেটাকে বুঝে উঠতেই কিছুটা সময় নিল। যদিও নড়ল না একচুল, মুখ দিয়ে তার কোনও আওয়াজ বেরোল না, ভেঙে পড়ল না কান্নায়। সে চুপ করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল সামনে, সেই ঝুলন্ত দুই প্রেতচ্ছায়াকেও পার করে, দূরের দিকে। এ-কথা কোনও জীবন্ত মানুষ এসে বললেও কি সে এভাবেই দাঁড়িয়ে থাকত? ভাবল একবার নিজের মনে-মনে। প্রেত তো বাতাসমাত্র। তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়া মানে মূর্খতা।

সংবিৎ ফিরিয়ে এনে রাজকন্যা বলল, “কিন্তু তাঁদের মৃত্যু তো ধস নামার ফলে হয়েছিল। সে তো দুর্ঘটনা। এর মধ্যে হত্যা কোত্থেকে আসছে?”

প্রেতেরা গোঙাতে-গোঙাতে বলে উঠল, “দুর্ঘটনা হিসেবে সাজানো হয়েছিল, রাজকন্যা। আসলে হত্যাই। পাহাড়ের মাথা থেকে বড়-বড় পাথরের চাঁই তাক করে নীচে ফেলে দিয়ে আমরাই রাজা ও রানিকে হত্যা করি। আমরা দু’জন মিলে।”

“তোমরা আমার বাবা আর মাকে হত্যা করেছিলে? কেন? তাঁরা কি তোমাদের কোনও অনিষ্ট করেছিলেন?”

“নাহ, মহামান্য রাজামশাইয়ের মতো সৎ ও রানিমার মতো দয়ালু ব্যক্তি এ-রাজ্যে আর ছিল না, আজও নেই।”

“তবে? তবে তাঁদের হত্যা করলে কেন?”

এবার কাঁপা-কাঁপা স্বরে প্রেতেদের কণ্ঠ বলল, “মহামন্ত্রীর নির্দেশে। যিনি এখন এ-রাজ্যের রাজা। তাঁর কথাতেই আমরা এ-কাজ করেছিলাম।”

এ-কথাটা শুনেও কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়াল রাজকন্যা। যদিও তার বাবা-মাকে হত্যা করা হয়েছে, এই সংবাদের চেয়ে বেশি অবাক করে দেওয়ার মতো নয় এটা। মহামন্ত্রীকে সে ছোটবেলা থেকে যেমন দেখেছে, তাতে তিনি ক্ষমতা হাতে পাওয়ার জন্য যা নয় তাই করতে পারেন। এখনও যেমন করছেন। এখন যেটা চলছে সেটা গণহত্যা। তবে রাজহত্যা না করলে গণহত্যার অধিকার তিনি পেতেন না, তাই এ-কাজ তিনি করে থাকতেই পারেন, এমনটা মনে হল রাজকন্যার। তবু সে জিজ্ঞেস করল, “তোমরা যে-কথাগুলো বলছ, তাকে আমি সত্যি হিসেবে ধরে নেব কেন?”

প্রেতেরা বলল, “ধরে নেওয়ার কোনও কারণ তোমার কাছে নেই রাজকন্যা। কিন্তু এটা বলতে পারি, প্রেতেদের অনেক ক্ষমতা থাকে না। কেড়ে নেওয়া হয় প্রেতাবস্থায় আসার পরেই। তার একটি হল মিথ্যে বলার ক্ষমতা। মিথ্যে কেবল মানুষ বলতে পারে। জীবিত মানুষ। কোনও পশু, পাখি, মাছ বা মৃত মানুষের পক্ষে মিথ্যে বলা সম্ভব নয়।”

“তোমরা কি অনেক বখশিশের লোভে কাজটা করেছিলে?” প্রশ্ন করল রাজকন্যা। তার গলাও এখন বাতাসেরই মতো শীতল।

“হ্যাঁ। কিন্তু সে-বখশিশ আমরা হাতে পেয়েছিলাম মাত্র। তার পরেই নিজে হাতে আমাদের বিষ পান করিয়ে হত্যা করেন মহামন্ত্রী। সেই রাত্রেই। এ-সবের এক বিন্দুও মিথ্যে নয়।”

রাজকন্যা আবার চুপ। ছায়াদুটো আবছা কুয়াশার মধ্যে দুলছে। কিছুক্ষণ হাওয়া ছাড়া অন্য কিছুর শব্দ নেই জ্যোৎস্নার এই অরণ্যে। তারপর রাজকন্যা বলল, “মৃত্যুর পর ক্ষমারও কি কোনও দাম থাকে?”

প্রেতেরা জবাব দিল, “থাকে। ক্ষমা মহামূল্যবান। ক্ষমা আয়ুর চেয়েও দীর্ঘ। তাই মৃত্যুর পরও তা অমূল্য। আমাদের কাছে তার দাম একরকম, তোমার কাছে আরেকরকম। তুমি যদি আজ আমাদের ক্ষমা করে দাও, তোমার শক্তি কোটিগুণ বৃদ্ধি পাবে। আর আমরা পাব মুক্তি।”

রাজকন্যা ভাবার জন্য আর সময় না নিয়েই বলল, “তোমাদের আমি ক্ষমা করলাম। যেন তোমাদের প্রেতাবস্থার সমাপ্তি হয়।”

এ-কথা বলামাত্র সামনে থেকে দু’খানা দীর্ঘ ঝুলন্ত ছায়া একটা হালকা শিসের মতো শব্দ করে গুঁড়ো-গুঁড়ো হয়ে সন্ধের ঘন বাতাসে মিলিয়ে গেল। রাজকন্যা চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকল কিছুক্ষণ। একইসঙ্গে তার খুব ভারী লাগছে নিজেকে, আর বড্ড হালকাও লাগছে। অরণ্যের মধ্যেকার প্রাসাদের দিকে সে এবার হাঁটা দিল আস্তে-আস্তে। এখন আর পথ হারাবে না তার।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%