তৃতীয় অধ্যায়

শ্রীজাত

খবরটা একটু আগেই শুনেছে বিপ্লবী। সেনাপতি স্বয়ং এসেছিলেন, সন্ধে নিভে যাওয়ার পর-পর। আজ আবার, এই শীতের মাঝামাঝি, বৃষ্টি শুরু হয়েছে অরণ্যে। উপত্যকার অংশে যারা আছে, তাদের তবু চলে যায়, কিন্তু নিতান্ত অরণ্যবাসীদের জন্য এ মোটে ভাল আবহাওয়া নয়। আর দু’দিন পর গাছের পাতায়-পাতায় একটু-একটু বরফ পড়বে, হ্রদের ধারের জলের ঢেউ একটু-একটু জমে উঠবে, তখন তবু একরকম। কিন্তু শীতকালের বৃষ্টি, তাও আবার এই কুয়াশার মধ্যে, সে সহ্য করা যায় না। অসুখবিসুখ ঘটে যেতে পারে। তা ছাড়া, পাহাড়ের গা থেকে মেঘ নেমে এসে চারপাশ আরও ঘোলাটে করে তোলে।

অরণ্যের মাঝপথে দাঁড়ালে লম্বা-লম্বা গাছেদের তখন মনে হতে পারে, জোব্বা পরা মস্ত সব মানুষ। কিংবা ভূতই বুঝি। নীলচে-শ্যাওলা-সবুজ রঙের চেহারা নিয়ে তারা দাঁড়িয়ে থাকে গোটা অরণ্য জুড়ে, আর তাদের পাশ কাটিয়েই চলাফেরা করতে হয় মানুষজনকে, অতি সাবধানে। ভুল জায়গায় পা পড়েছে তো বেদম আছাড় নিশ্চিত। সেনাপতি এই কয়েদখানায় আসার আগে, দরজার সামনে বসে দুই প্রহরী সেই কথাই বলছিল। সেইসঙ্গে বন্দি বিপ্লবীর জন্যে তাদের কষ্টও হচ্ছিল বটে, কিন্তু সেসব তো আর জোরে-জোরে বলা যায় না। কথায় বলে, গাছেরও কান আছে।

উলটোদিকে অরণ্যের একেবারে শেষপ্রান্তে, রাজকন্যা যেখানে নজরবন্দি আছে, তার ঠিক কোনাকুনি এই কয়েদখানা। চারপাশে উঁচু গাছে ঢাকা, পাথরের একখানা কালকুঠুরি, যাতে ঢোকার রাস্তা তো আছে, কিন্তু বেরোনোর উপায় নেই। মোটা পাথরের একচিলতে এই কালকুঠুরিতে মস্ত ভারী লোহার দরজা, যার উপরের দিকে একফালি ফাঁক, যেখান দিয়ে ভিতরকার বন্দির দিকে নজর রাখা যায়।

সত্যি বলতে কী, বহু বছর ধরে বন্ধ ছিল এই কালকুঠুরি। আগের রাজার সময়ে অপরাধ ছিল না কোনও, তাই বিচার বা সাজার প্রশ্নই উঠত না। কয়েদিই যখন নেই, কয়েদখানাতেই বা কাজ কীসের। তাই শ্যাওলা আর লতাপাতায় ঢাকা পড়েছিল এই বন্দিশালা। কিন্তু সেই রাজার পর যিনি রাজা হলেন, তিনি এসে সাফসুতরো করে আবার একে চালু করলেন। শুধু তাই নয়, এর মধ্যে ঘর বানালেন আরও, যাতে অনেককে একসঙ্গে বন্দি রাখা যায়।

তিনি অবশ্য অনেক কিছুই করলেন নতুন-নতুন, দুই বুড়ো প্রহরী বসে-বসে সেই গল্পই করছিল। কেননা তারা সেই আগের রাজার আমল থেকে এই একই কাজ করে আসছে, তাই এত বদল তাদের ঠিক সহ্য হয় না। চোখে লাগে। যদিও ফিসফিস করেই বলতে হচ্ছিল, কেননা জোনাকিদেরও কান আছে এ-অরণ্যে।

প্রহরী ১: আচ্ছা, সে-সময়ে কোনওদিন এখানে প্রহরার কাজ করেছ?

প্রহরী ২: কী যে বলো ভায়া, সে-সময়ে তো এসব বন্ধ ছিল। আমি তখন মূল প্রাসাদের আশেপাশে বহাল থাকতাম, আর তুমি বসতে রাজকোষের বাইরের দরজায়।

প্রহরী ১: সে যা বলেছ। ওই ঝলমলে রোদ্দুর আর বাতাসে বসে পাহারা দিতে কী ভালই না লাগত। আর এখন দ্যাখো, এই স্যাঁতসেঁতে অন্ধকার আর কুয়াশার মধ্যে বসে জ্যান্ত মানুষ পাহারা দেওয়া। এ কি আমাদের কাজ?

প্রহরী ২: সত্যি। আগের রাজামশাই যেন অন্য মানুষ ছিলেন। তোমার মনে আছে, যেদিন ওঁর মৃত্যুসংবাদ ঘোষণা হল! সকলে কেমন ভেঙে পড়েছিল?

প্রহরী ১: সে আবার থাকবে না? ওই দিন থেকেই তো সব বদলে গেল। আমাদের নতুন রাজা, মানে আগের মহামন্ত্রীমশাই ভার নিলেন রাজত্বের, আর ওমনি...

প্রহরী ২: ঠিকই। এক বছরের মধ্যে গোটা রাজ্যটাকে বদলে ফেললেন। আইন কানুন বদলে ফেললেন। নতুন-নতুন নিয়ম আনলেন। নতুন সব নীতি। সবচেয়ে বড় কথা ভায়া, আমাদের আগের রাজার সময়ে পাশের রাজ্যগুলোর সঙ্গে কী ভাল খাতির ছিল তুমি বলো, হ্যাঁ?

প্রহরী ১: ঠিকই তো। তখন রাজায়-রাজায় বন্ধুত্ব ছিল, মেলামেশা ছিল, আর এখন...

প্রহরী ২: এখন তো ভায়া কখন কী হয় কিছুই বলা যায় না। এই যে আমাদের এই বন্দির কথাই ধরো না কেন। দিব্যি ছিল। কী থেকে কী বলে ফেলল, ব্যস। এখন থাকো।

প্রহরী ১: আজ তো রায় বেরোবে বিচারের। জানো না?

প্রহরী ২: জানি তো। আর কী রায় হবে, তাও জানি। খারাপ লাগে। ছোকরার বাবাকে চিনতাম। ভারী এলেমদার লোক ছিল। আগের রাজার সঙ্গে-সঙ্গে সারাক্ষণ থাকত। আর তার ছেলের কিনা আজ...

প্রহরী ১: তোমার আবার বেশি-বেশি দরদ। দেখছ খোদ রাজকন্যাই নজরবন্দি হয়ে জঙ্গলের কুঠিতে পড়ে আছেন, তার আবার এই ছোকরা।

প্রহরী ২: ছোকরা তো একা নয়, তার স্যাঙাত সাকরেদরা আছে সব। তারাও তো বন্দি, তাদেরও তো বিচার হবে।

প্রহরী ১: শোনো ভায়া, মুড়োটি কেটে দিলে গাছই থাকে না, বুঝলে? ছোকরাকে বশে আনতে পারলে বাকিরাও বশ। ছোকরাই তো সে-দলের নেতা। সে ছাড়া অমন লাগামছাড়া দল চালাবেই বা কে?

প্রহরী ২: তবে যা-ই বলো, ছোকরার এলেম আছে। রাজার মুখের উপর অতগুলো কথা দিল তো বলে? আজ অবধি কেউ পেরেছে?

প্রহরী ১: পারেনি বলেই আজ অবধি কেউ বন্দিও হয়নি, সেটা ভাবো। লোকে বেঁচেবর্তে থাকবে, না বিপ্লব করবে? এ-ছেলের তিন কুলে কেউ নেই, বাপ মরেছে, মা পা বাড়িয়েই রেখেছে কবরে, তাই এ পারছে। বাকিদের বাড়িতে মানুষজন নেই বুঝি? তাদের বিপ্লব করলে চলবে?

প্রহরী ২: কিন্তু এ-ছেলে তো বাকিদের হয়েই কথা বলছিল।

প্রহরী ১: আর বলবে না।

এই বাক্যটি বলার সময়ে তারা দু’জনেই দূর থেকে ধেয়ে আসা অনেকগুলো ঘোড়ার ক্ষুরের শব্দ পেল। তারা হাতের বল্লম নিয়ে ঠিকঠাক উঠে দাঁড়াতে না দাঁড়াতেই কালকুঠুরির সামনে এসে দাঁড়ালেন স্বয়ং সেনাপতি আর তাঁর ঘোড়সওয়ারের দল। সে এক মস্ত ব্যাপার। প্রহরী দু’জন কায়দা করে সেলাম ঠুকল, সেনাপতি ইশারায় কুঠুরির দরজা খুলে দিতে বললেন।

ভিতরের প্রথম ঘরটাতেই বন্দি রাখা হয়েছে বিপ্লবীকে, সে-ঘরেই প্রবেশ করলেন সেনাপতি। ভারী অপরিচ্ছন্ন, শ্যাওলাধরা তার এবড়োখেবড়ো দেয়াল আর মেঝে, তারই এককোণে একখানা চৌকিতে বসে আছে বিপ্লবী। কতই বা বয়স হবে, বড়জোর পঁচিশ? এই বয়সে এমন জেদ আর সাহস কারও মধ্যে দেখেননি সেনাপতি। যদিও সেটাই তার বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এখন। এবং মোক্ষম বিপদ।

সেনাপতি ঢোকায় বিপ্লবী একবার মুখ তুলে তাকাল, কিন্তু উঠে দাঁড়াল না। অন্য কেউ হলে সেনাপতি এমন বেয়াদবির জবাব তলব করতেন, কিন্তু বিপ্লবীর মুখের দিকে তাকিয়ে সেটা পারলেন না। বিপ্লবী সোজা তাকিয়ে আছে সেনাপতির দু’চোখের দিকে। তার চওড়া বলিষ্ঠ কাঁধের উপর লুটিয়ে পড়ে আছে এলোমেলো লম্বা চুল, মুখভর্তি দাড়ি, স্নানের অভাব যেখানে স্পষ্ট। কিন্তু এত অবহেলা অযত্নেও তার দু’চোখের তেজ মোটেই নিভে যায়নি। সেটা দেখে অবশ্য অবাক হলেন না সেনাপতি, কেননা বিপ্লবীর সাহস আছে। সত্যি বলতে কী, দুঃসাহস আছে। ভয় পেয়ে যাওয়ার মানুষ সে নয়।

বন্দি হওয়ার দিন এই পোশাকই সে পরেছিল, এই অরণ্য উপত্যকা রাজ্যের বেশিরভাগ পুরুষ যেমন পরে থাকেন। মাঝখানে বোতাম দেওয়া মোটা চামড়া ও পশমে বোনা আলোয়ান, কোমরে পা-চাপা পোশাক। পায়ে অবশ্য জুতো নেই, সেটা সেদিনই খুলে নেওয়া হয়েছিল। কালকুঠুরির মধ্যে যথেষ্ট বেশি ঠান্ডা, কিন্তু বিপ্লবী কোনও শীতবস্ত্র চায়নি। দেওয়াও হয়নি অবশ্য। আর, খেয়াল করলেন সেনাপতি, মেঝের একপাশে থালার মধ্যে দুটো রুটি ও একখানা পাত্রে সুরুয়া পড়ে আছে। নিশ্চয়ই সন্ধের মুখে দিয়েছে প্রহরীরা, বিপ্লবী তা ছুঁয়েও দেখেনি। ক’দিন ধরে নাকি এরকমই করছে সে, খবর পেয়েছেন সেনাপতি।

সেনাপতি: খাবার খাওনি কেন?

বিপ্লবী: ইচ্ছে হচ্ছে না, তাই।

সেনাপতি: তোমার কি ধারণা, না খেয়েদেয়ে শরীর খারাপ করলে তোমার জন্যে হাকিম ডাকা হবে?

বিপ্লবী: আপনার কি ধারণা, আপনারা হাকিম ডাকলে আমি সেই চিকিৎসা গ্রহণ করব?

সেনাপতি: অন্য কেউ আমার কথার এ-জবাব দিলে তার হাল আমি কী করতাম, জানা আছে তোমার?

বিপ্লবী: তবু আমাকে কিছু করছেন না। কেন বলুন তো?

সেনাপতি: থাক এসব কথা। তোমার অনুশোচনা হয় না?

বিপ্লবী: কীসের জন্য অনুশোচনা?

সেনাপতি: যা করেছ, তার জন্য? যে-কারণে এখানে বন্দি আছ, তার জন্য?

বিপ্লবী: আমি তো আলাদা করে কিছু করিনি। সত্যি কথাটা বলেছি শুধু। সত্যি বলার জন্য অনুশোচনা হবে, এমন রাজ্য তো এটা ছিল না।

সেনাপতি: রাজ্যের বিষয়ে একটি কথাও আমি তোমার কাছ থেকে শুনব না।

বিপ্লবী: মুশকিল তো এইখানেই সেনাপতিমশাই। আপনারা আমাদের ভরসায়, আমাদের শৌর্যে রাজারাজড়া হবেন, রাজ্য চালাবেন, কিন্তু আমাদের কাছ থেকে রাজ্য বিষয়ে কিছু শুনবেন না। হ্যাঁ, শুনবেন, যখন মানুষ ভাল-ভাল কথা বলবে, তখন। সেসব ভাল কথা কত ভয় থেকে বলা, মার খাবার ভয় থেকে বলা, সেটা বুঝেও শুনবেন। কেননা সেই ভয় আপনি এবং আপনার দলবলই দেখিয়ে রেখেছে। চারপাশে যা ঘটছে, তাকে ভাল বলো। নইলে মরতে হবে। কিন্তু আমি তো সেই ভয় পাওয়ার দলের লোক নই সেনাপতিমশাই। তাই আমি বলব।

সেনাপতি: বলতে দিলে তবে তো বলবে।

বিপ্লবী: আপনাদের মজা কী জানেন, আপনারা দূর পর্যন্ত দেখতে পান না। আপনি কেবল আমাকে দেখছেন। আমার সঙ্গে যে কয়েকজনকে বন্দি করেছেন? পারবেন তো, সকলকে চুপ করাতে? যদি পারেন, সে নিয়ে রাজ্যের বাকিরা কেউ একটাও প্রশ্ন তুলবে না, এ-বিষয়ে আপনি নিশ্চিত তো? আমি কিন্তু নিশ্চিত নই। আমি জানি, যে-ছেলেটা আজ রাতে ঘুমোতে যাচ্ছে, যে-মেয়েটা আজ রাতে গল্প শুনছে, কাল সে প্রশ্ন তুলবে। হিসেব চাইবে। ক’জনকে বন্দি করবেন আপনি? গোটা রাজ্যটাই তো কয়েদখানা হয়ে যাবে তা হলে।

সেনাপতি: তোমার সঙ্গে বাক্যব্যয় বৃথা। আমি যা বলতে এসেছিলাম, সেইটুকু বলে চলে যাওয়াই বোধহয় ভাল।

বিপ্লবী: নিশ্চয়ই। সেটাই বলুন। আমিও আর উত্তেজিত বোধ করতে চাই না।

সেনাপতি: তোমাকে নিয়ে আজ বিচারসভা বসেছিল, জানো নিশ্চয়ই?

বিপ্লবী: নাহ, বন্দি থেকে তো খবর পাওয়া সম্ভব নয়। এই এখন জানলাম। তবে তা যে বসবে, সেটা বিলক্ষণ জানতাম। তা, কী শাস্তি ঠিক হল আমার?

সেনাপতি: তার আগে আমার একখানা প্রশ্ন আছে।

বিপ্লবী: বলুন!

সেনাপতি: তুমি কি সর্বসমক্ষে রাজার কাছে ক্ষমা চাইতে প্রস্তুত?

বিপ্লবী: আমি তো কোনও অন্যায় করিনি যে, ক্ষমা চাইব।

সেনাপতি: ছেলেমানুষের মতো কথা বোলো না হে! সেদিন সাধারণ মানুষের অত বড় জমায়েতের সামনে, সমস্ত সেনার সামনে দাঁড়িয়ে তুমি রাজার প্রতিটি বক্তব্যকে মিথ্যা বলোনি? একের পর এক তাঁর যুক্তির বিরোধিতা করোনি? তুমি তোমার অনুগামীদের রাজার বিরুদ্ধে খেপিয়ে তোলোনি?

বিপ্লবী: অবশ্যই। কিন্তু এর কোনওটাই যে অন্যায় নয় সেনাপতিমশাই! বরং রাজা যা করছেন, আপনারা যা করতে চলেছেন, সেটা অন্যায়। ক্ষমা চাইতে হলে আপনাদেরই চাওয়া উচিত, সাধারণ মানুষের কাছে। আমার নয়।

সেনাপতি: নাহ, তুমি দেখছি নিজের প্রাণ খোয়াতে বদ্ধপরিকর। ক্ষমা চাইতে রাজি হলে আমি তোমার জন্য একবার খোদ রাজামশাইয়ের কাছে তদবির করতে পারতাম। তোমার যা কর্মকাণ্ড, তার প্রতি আমার বিন্দুমাত্র সমর্থন না থাকলেও, সহানুভূতি কিছুটা আছে। কেননা তোমার বাবাকে এক সময় আমি দেখেছি। তিনি ভারী সৎ মানুষ ছিলেন। কিন্তু...

বিপ্লবী: বাবা আজ জীবিত থাকলে আমাকেই সমর্থন করতেন। সেই যা-ই হোক, মৃত্যুদণ্ডের হুকুম হয়েছে তো?

সেনাপতি: তুমি জানলে কী করে?

বিপ্লবী: আমি এই নতুন রাজাকে যতটুকু চিনি, তাতে তিনি নিজের জন্য কোনও বিপদ জিইয়ে রাখার পাত্র নন। বিশেষত সে-বিপদ যদি আমার মতো কেউ হয়।

সেনাপতি: তোমার সাহস দেখে আমি আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছি।

বিপ্লবী: আর আমি আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছি এই ভেবে যে, সত্যি কথা বলাকে এখন অপরাধযোগ্য সাহসের মধ্যে ধরা হচ্ছে। কী দিনকাল! তা, কবে ধার্য হল তারিখ? মৃত্যুদণ্ডের?

সেনাপতি: সামনের পূর্ণিমা।

বিপ্লবী: বেশ। আর কতদিন দেরি আছে তার?

সেনাপতি: খুব বেশি নেই, দিনদশেক।

বিপ্লবী: যথেষ্ট। শুভরাত্রি আপনাকে। আর হ্যাঁ, ধন্যবাদ, নিজে এসে খবরটা জানানোর জন্য।

সেনাপতি: যত বড় শত্রুই হোক, তাকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ শোনানোর মধ্যে কোনও আনন্দ থাকতে পারে না।

বিপ্লবী: আপনার মধ্যে এ-বোধ এখনও জেগে আছে জেনে ভাল লাগছে।

সেনাপতি: ও হ্যাঁ, আরেকটা কথা। তোমার কোনও শেষ ইচ্ছা?

বিপ্লবী: হ্যাঁ, আছে তো।

সেনাপতি: কী?

বিপ্লবী: বলব না।

সেনাপতি: কেন? খুব অসম্ভব না হলে তোমার মৃত্যুর আগে তা পূর্ণ করা হবে।

বিপ্লবী: মানুষকে মেরে ফেলার আগে তার কোনও একটা ইচ্ছাকে পূরণ করার দয়াভিক্ষা আমি আপনাদের হাত থেকে নেবো না। শুভরাত্রি।

সেনাপতি: বেশ। যদি তাই তোমার মত হয়, তবে তাই। শুভরাত্রি।

সেনাপতি কিছুটা ম্লান মুখ নিয়েই বেরিয়ে এলেন কুঠুরি থেকে, দুই বয়স্ক প্রহরী ফের ভারী কায়দায় সেলাম ঠুকে কয়েদখানার দরজায় মস্ত তালা ঝুলিয়ে দিল। ঘোড়সওয়ারের দল বাইরেই অপেক্ষা করছিল, তাদের নিয়ে রাজপ্রাসাদের উদ্দেশে রওনা হলেন সেনাপতি।

বিপ্লবী এমনটাই আশা করছিল, তাই এ-খবরে তার বিশেষ হেলদোল হল না। সে বরং কোমরের বন্ধনী থেকে তার প্রিয় ছোট্ট বাঁশিখানা বের করে আনল। ছোটবেলা থেকে এইটাই তার বন্ধু, শেষ মুহূর্ত অবধি এ-ই তার বন্ধু থেকে যাবে। একটা সুর বাজাতে ভারী ইচ্ছে করছে বিপ্লবীর। তারই বাঁধা গানের সুর, যে-গান সেদিন তারা গেয়েছিল জমায়েতে, বন্দি করার পর কয়েদখানায় নিয়ে আসার পথেও তাদের সকলের গলায় ছিল যে-গান। গানখানা এরকম...

এসো আজ জড়ো হও আকাশতলে

জুড়ে জুড়ে থাকো যারা সত্যি বলে

এমন সময়ে তুমি কাটিও না অবকাশে

না বুঝে সোরো না বন্ধু, আহা বেঘোরে মোরো না বন্ধু

রুটি খাবে মানুষ, না যুদ্ধে যাবে

বেঁচে নেবে মানুষ, না ঘর সাজাবে

এমন সময়ে তুমি দাঁড়াও নিজেরই পাশে

ভুলটা কোরো না বন্ধু, আহা বেঘোরে মোরো না বন্ধু

ঘরে ঘরে হানা দেবে রাজার সেনা

ঘরে ঘরে শিশুরাও পার পাবে না

এমন সময়ে তুমি বার্তা ছড়াও ঘাসে

ঘুমিয়ে পোড়ো না বন্ধু, আহা বেঘোরে মোরো না বন্ধু

দেখা হবে ফের যদি সূর্য ওঠে

দেখা হবে ফের যদি গোলাপ ফোটে

এমন সময়ে তুমি হাত রাখো বিশ্বাসে

মাটিতে ঝোরো না বন্ধু, আহা বেঘোরে মোরো না বন্ধু

এ-গানের সুর এখন এ-রাজ্যের সব বাসিন্দা জানে। এ-সুর, বিপ্লবীর সুর। বাঁশিতে সেই সুর বাজাতে শুরু করল বিপ্লবী। কয়েদখানার ভারী লোহার দরজার একফালি ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে এসে সেই সুর ভেসে-ভেসে এগোতে শুরু করল ভারী বাতাস আর কুয়াশার ভেজা চাদর ঠেলে। মানুষ কেবল মানুষকেই বন্দি করতে পেরেছে, তার সুরকে পারেনি। এ-কথা ভেবে, আপনমনেই অল্প হেসে নিল বিপ্লবী।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%