শ্রীজাত
সেই আশ্চর্য আর অল্প জ্যোৎস্নার মধ্যেই, অরণ্যের একেবারে অন্য প্রান্তে সম্মোহিতের মতো পথ হাঁটছেন আরও একজন মানুষ। বৃদ্ধ বিদূষক। তাঁর মন আর তাঁর নিজের বশে নেই, এমনকী তাঁর শরীরও কেমন যেন ঝিমঝিম করছে সব মিলিয়ে। হাত পা ভারী লাগছে, পিঠ আরও ঝুঁকে এসেছে যেন, পায়ে তেমন জোর পাচ্ছেন না হাঁটতে গিয়ে। কিন্তু তবু তিনি চলেছেন ওই দুই সুন্দরী যুবতীর পিছুপিছু, যারা তাঁর কয়েক হাত আগেই কেমন যেন ভেসে-ভেসে এগিয়ে চলেছে অরণ্যের আরও গভীরে। তাদের পোশাকহীন মোমের মতো ত্বকে জ্যোৎস্না লেগে পিছলে পড়ছে এমন ভাবে, যেন তাদের পিঠে বা কোমরের ঢেউয়ে হাত পাতলে তরল চাঁদের আলো কাঁচিয়ে তুলে পান করা যাবে। কুয়াশায় ছেয়ে আছে চারিদিক, তবু তাদের শরীরের রাস্তাঘাটে ঠিকরে পড়া চাঁদের আলো দেখা যাচ্ছে দিব্যি।
ব্যাপারটা গোড়া থেকেই তাঁর নিয়ন্ত্রণে ছিল না। ওই যে তাঁর দু’হাত থেকে দুটো মরা হাঁস থপ করে ঝরে পড়ল মাটিতে, ব্যস। তিনিও যেন নিজের হাত থেকেই টুপ করে মরা হাঁসের মতোই মাটিতে খসে পড়লেন একইসঙ্গে। আর তাঁকে কুড়িয়ে নিল ওই দুই নগ্ন অপরিচিতা, যাদের দিকে তিনি হাঁ করে তাকিয়ে ছিলেন। একটাই প্রশ্ন তারা করেছিল বিদূষককে, তিনি সেটুকুরও উত্তর দেওয়ার মতো অবস্থায় থাকলেন না আর। শেষ কবে কোনও পূর্ণ যুবতীকে নগ্ন অবস্থায় দেখেছেন, তাঁর স্মরণে নেই। আর এমন রূপসী মেয়ে তো তিনি জীবনে দেখেনইনি। তাই তাঁর মরে যাওয়া, ঘুন ধরে যাওয়া, ন্যুব্জ হয়ে যাওয়া বাঁকাচোরা শরীর জেগে উঠল একমুহূর্তে। আসলে শরীর নয়, শরীরের বোধ জেগে উঠল তাঁর। আর তিনি পিছুপিছু হাঁটতে লাগলেন ওই দুই নগ্নিকা’র। তারা তাঁকে হাতের আঙুলের সরু ইশারায়, সম্মোহনে, বের করে নিয়ে এল নগরীর চোরাপথ দিয়ে সোজা অরণ্যে। তখন সন্ধে নামছে, কুয়াশা হচ্ছে আরও ঘন।
তারপর থেকে তিনি এ-দু’জনের পিছনে হাঁটছেন তো হাঁটছেনই। বাক্যব্যয় করেননি একবারও, করার মতো ক্ষমতাও তাঁর নেই। কেবল ভাবছেন, কখন এ-দু’জনের উপর সব শক্তি নিয়ে একসঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারবেন একবার। সে-সামর্থ্য হয়তো তাঁর নেইও আর, কিন্তু ভাবনার জোরটা এখনও চলে যায়নি। সেই লোভে-লোভেই দুই নারীর পিছনে হেঁটে চলেছেন তিনি, যেন কোনও সুতোয় বাঁধা মানুষ হেঁটে যাচ্ছে। নিশ্চয়ই এরা বেশ সুরক্ষিত আর নিরাপদ কোনও স্থানে নিয়ে যাচ্ছে, যেখানে এদের ভোগ করলেও ব্যাপারটা রটবে না, দশ-কান হবে না, লোকজনের নিন্দেমন্দ হবে না। ভাবলেন বৃদ্ধ বিদূষক। এও ভাবলেন, এরা কি বিনিময়ে কিছু চাইবে? নিশ্চয়ই চাইবে। নইলে এমন মেয়েদের যে জোয়ান পুরুষের অভাব হওয়ার কথা নয়, সে তিনি ভালই বোঝেন। যা চাইবে চাক গে যাক, সব দিয়ে দেব, মনে মনে নিজেকেই বললেন বিদূষক।
রাত যত গাঢ় হচ্ছে, যত কুয়াশা কাটিয়ে শুকনো পাতার স্তূপের উপর নেমে আসছে প্রায় গোল হয়ে ওঠা চাঁদের আলো, তত তাঁর চিন্তাশক্তি নিভে আসছে, সেটা টের পাচ্ছেন বিদূষক। এখন আর ফিরে যেতে চাইলেও উপায় নেই, কেননা এরা যে কোন চোরাপথে তাঁকে এতদূর নিয়ে এল, চলার সময়ে সে-খেয়াল তিনি করেননি। তা ছাড়া, অরণ্যের এই দিকটায় কোনওদিন পা দেওয়া হয়নি তাঁর। অবশ্য ফেরার প্রশ্নই বা উঠছে কেন। এতদূর অন্ধের মতো আসা তো ভোগ করার জন্য। সম্ভোগ। এই বৃদ্ধ বয়সের এমন কিনারায় এসে তিনি যে এই আকস্মিক উপহার পেয়ে যাবেন, ভাবতেও পারেননি।
শেষমেশ নগ্ন দুই যুবতী স্থির হল। সামনেই একখানা গুহামুখ, বেশ বড়, তার ভিতরটা অন্ধকার। জ্যোৎস্নাও তার ভিতরে প্রবেশ করার সাহস পায়নি, সেটা খেয়াল করলেন বিদূষক। দুই নগ্নিকা এবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে তাঁর দিকে, আর হাসছে কেমন অদ্ভুতভাবে। এমন হাসিও তিনি অনেকদিন দেখেননি বলে মনে হল। তাদের নিরাভরণ উঁচুনিচু ঢেউ খেলানো ভরপুর দুই শরীর থেকে রুপোলি চাঁদের আলো চুঁইয়ে নামছে এখনও, অজান্তেই জিভটা মুখের ভিতর থেকে আবার বেরিয়ে এল বিদূষকের। কিন্তু কোথায় যেন একটা খটকা, একটা অস্বস্তি হচ্ছে তাঁর। এই অদেখা গুহাটা চেনা-চেনা লাগছে কেন? আগে কি এখানে এসেছেন তিনি? নাকি শুনেছেন কোথাও এর কথা? এরকমটা ভাবছেন যখন বিদূষক, তখন একজন নগ্নিকা বলে উঠল, “কী, বিদূষকমশাই, গুহাটা দেখে মনে পড়ছে কিছু?”
বিদূষকের সম্মোহন এবার কাটছে আস্তে-আস্তে। মনে হচ্ছে, গণ্ডগোল আছে কিছু একটা। এভাবে এদের পিছপিছু এতখানি গভীর অরণ্যে এই রাতের বেলা চলে আসাটা উচিত হয়নি। উত্তর দিতে গিয়ে নিজেও বুঝলেন, তাঁর গলা কাঁপছে। তিনি বললেন, “কোথায় যেন...কোথায় যেন এর কথা...তোমরা কারা? তোমরা কী চাও, হ্যাঁ?”
“আমরা তো আপনাকে চাই,” খিলখিলিয়ে হেসে উঠে বলল আরেকজন নগ্নিকা। তার হাসির মধ্যে কোনও আনন্দ টের পেলেন না বিদূষক। বরং ভারী হিংস্র হয়ে তাঁর কানে আছড়ে পড়ল সেই হাসি। বিদূষক বললেন, “আমার বয়স হয়েছে। আমি বৃদ্ধ। আমি এ-রাজ্যের বিদূষক। তোমরা কি আমার সঙ্গে মস্করা করছ নাকি, হ্যাঁ?”
একজন নগ্নিকা উত্তর দিল, “উঁহু। মস্করা তো আপনার কাজ। গুহাটা চিনতে পারছেন না, না?”
বিদূষকের এবার বেশ ভয়ই করতে শুরু করল। সেটাকে চাপা দেওয়ার চেষ্টা করে তিনি বললেন, “আমি কি অরণ্যবাসী, যে কোথায় কোন গুহা আছে, সব চিনে রাখব?”
এর উত্তরে গলাটা আশ্চর্য রকম ঠান্ডা করে আরেকজন নগ্নিকা বলল, “তা হলে ছোট্ট রাজকন্যাকে অত বছর আগে রাজদাসীর হাত দিয়ে কীভাবে পাঠালেন এই গুহায় আপনি? ভালুকের খাদ্য হওয়ার জন্য?”
বিদূষকের শুধু গলাই নয়, হাত-পা ঠান্ডা হয়ে এল এবার। তিনি এতক্ষণে বেশ সাফ বুঝতে পারলেন, এদের মতলব সিধে নয়। কিন্তু এখন আর পালাবার পথ নেই। তাই বললেন, “এসব কী উলটোপালটা কথা বলছ? জানো এর শাস্তি কী হতে পারে? এত বড় অভিযোগ আনার জন্য আমি তোমাদের কয়েদ করাতে পারি, জানো সেটা?”
শুনে এক নগ্নিকা বলল, “আপনি আর কিচ্ছু পারেন না। কোনটা মিথ্যে আর কোনটা সত্যি, তার হদিশ এখনই পাওয়া যাবে।”
বিদূষক বললেন, “এসব কথার মানেটা কী?”
আরেক নগ্নিকা উত্তর দিল, “কিছুই না। আমাদের একখানা পোষা ভালুক আছে। বিরাট বড়। বেচারার একটু খিদে পায় রাত বাড়লে। বেশি না, অল্প। তাই ভাবলাম ওর জন্য খাবার নিয়ে আসি। এই যেমন আপনি নিজের জন্য নিয়ে ফিরছিলেন আজ...”
দুই নগ্নিকা আবার খিলখিলিয়ে হেসে উঠল। আর তাদের হাসি থামতেই, গুহার ভিতর থেকে একটা গর্জন শুনতে পেলেন বিদূষক, জঙ্গলের পাতাও যাতে কেঁপে উঠল। সেটা ভালুকের ডাক ছাড়া আর কিছুই নয়। বিদূষক পিছু হঠতে চাইছেন, কিন্তু পায়ে কোনও জোর পাচ্ছেন না। তিনি কোনওরকমে বললেন, “কিন্তু...কিন্তু এ-গুহায় তো কোনও ভালুক ছিল না। আমি তো ভুল বলেছিলাম...”
এবার এক নগ্নিকা বলল, “বিদূষকমশাই, এ হল বিশ্বাসের গুহা। এ-গুহার পাথর মানুষের মনের বিশ্বাস দিয়ে তৈরি। যে যেমন বিশ্বাস নিয়ে এ-গুহার সামনে আসে, এই গুহাও তাকে সেভাবেই নিজের মধ্যে টেনে নেয়। আপনি বিশ্বাস করতেন এ-গুহার মধ্যে এক হিংস্র ভালুক আছে। কিন্তু ছোট্ট রাজকন্যা তা জানতই না। বরং রাজদাসী তাকে ভুলিয়ে-ভালিয়ে ভিতরে পাঠানোর জন্য গল্প বলেছিল এক আশ্চর্য ফুলের, কেননা রাজকন্যা ফুল ভারী ভালবাসত। রাজকন্যা সেই গল্প বিশ্বাস করেই গুহার ভিতর ঢুকেছিল, ফুলের খোঁজে। তাই সেদিন সে ভালুকের দেখা পায়নি, ফুলের খোঁজ পেয়েছিল। ওই যে বললাম, যার যেমন বিশ্বাস। আপনি বিশ্বাস করতেন এই গুহায় হিংস্র ভালুক থাকে। আপনার এতদিনের বিশ্বাস কি মিথ্যে হতে পারে, বিদূষকমশাই?”
কথাগুলো যখন শেষ করছে এক নগ্নিকা, বিদূষক ওই অল্প কুয়াশামাখা জ্যোৎস্নায় দেখতে পেলেন এক দৈত্যাকার রোমশ ভালুককে, যে তার বিশাল আর ভারী চার থাবায় ভর করে এসে দাঁড়িয়েছে গুহার বাইরে। তার দৃষ্টি সোজা তাক করা, বিদূষকের দিকেই। আর জ্যোৎস্নায় ঝিলিক দেওয়া ধারালো দাঁত থেকে খিদের লালা ঝরে পড়ছে মাটিতে। আরও একবার আকাশ বাতাস মাটি কাঁপিয়ে হুঙ্কার দিয়ে উঠল সেই অতিকায় প্রাণী। তারপর এগিয়ে আসতে থাকল আস্তে-আস্তে তার শিকারের দিকে।
বিদূষক মাটিতে পড়ে গেলেন হঠাৎ, চিৎকার করারও শক্তি অবশিষ্ট নেই তাঁর। কেবল দেখতে পেলেন, ওই দুই নগ্নিকার কাঁধে একজোড়া করে ডানা উঠে এল, যাদের নিমেষে মেলে দিয়ে তারা উড়ে চলে গেল অন্যদিকে। আর ক্ষুধার্ত ভালুক, পায়ে-পায়ে এসে একেবারে তাঁর সামনে দাঁড়াল। এর পরের থাবাটাই তাঁর বুকে পড়বে, সে যদি আর এক পা-ও এগোয়। বিদূষক আর কিছুই ভাবতে পারলেন না। কেবল চারপাশে হঠাৎ কিছু ঝটাপট শব্দ পেয়ে একবার ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলেন, ডানা ঝাপটে আশেপাশের সব গাছের শাখায়-শাখায় নেমে আসছে একদল পাখি।
শকুন। বহিরাগত।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন