দশম অধ্যায়

শ্রীজাত

এর পরপরই শুরু হল রাজ্য জুড়ে অশান্তি। এমন অশান্তি, যা কেউ কখনও আগে দেখেনি। চিনারের পাতাঘেঁষা শীতল বাতাসের উপত্যকা, পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নামা শান্ত সবুজ ঘাসের চাদর, অরণ্যের পাতামোড়া আধভেজা মাটি, বা পাথরের টুকরোঘেরা নদীর পাড় হয়ে উঠল অশান্ত। নির্বিবাদী একখানা রাজ্য এই প্রথম এভাবে ঝমঝম করে বেজে উঠল অশান্তিতে, আর পাহাড়ে-পাহাড়ে সেই বেজে ওঠার প্রতিধ্বনি ছড়িয়ে পড়তে লাগল সবখানে। সবাই জেনে গেল, কুয়াশানগরীতে ভারী গণ্ডগোল বেঁধেছে। সব কেমন যেন মুষড়ে পড়ল রাজ্যের মধ্যে। মুষড়ে পড়ল সব বাসিন্দারা। কেবল, কেন যেন, চনমন করে উঠল ভারী কুয়াশার দল। তারা যেন আরও বেশি করে ঘিরে ফেলতে লাগল এই রাজ্যের চারধার।

অবশ্য এই অশান্তির ভেজা-ভেজা কুয়াশাঘেরা উপত্যকাতেই বদলে যেতে লাগল রাজকন্যার এতদিনকার জীবন। তার একার নয় যদিও, সেই সঙ্গে বিপ্লবীর জীবনও বদলাতে লাগল। বদল মানে কিন্তু এমন নয় যে, তারা তাদের সবকিছু নতুন করে সাজাল। বরং যে-পথে তারা হাঁটছিল, সে-পথেই আরও বেশি করে এগিয়ে যাওয়ার জোর পেল। হ্যাঁ, এই প্রথম, রাজকন্যা ভালবেসে ফেলল কোনও যুবককে, তাকে নির্দ্বিধায় দিয়ে ফেলল নিজের একরোখা, জেদি, সোজা, টানটান আর নরম মনখানা। এমন তো নয় যে, এই প্রথম কোনও পুরুষের সঙ্গে দেখা হল তার। কিন্তু পূর্ণ বয়স হওয়ার পর, এই প্রথম কোনও যুবককে দেখল সে, চোখের দিকে তাকিয়ে সত্যি কথাটা সত্যির মতো করে বলতে। এই প্রথম দেখল, নির্ভীক একজন যুবক, যে সত্যির জন্য সব ছেড়ে লড়াইয়ে নামতে পারে, লোক জোটাতে পারে, দল বাঁধতে পারে। এই প্রথম এমন কেউ, যে অন্য কাউকে ভয় পায় না। রাজকন্যার মতোই। এসব দেখেই সে দিয়ে ফেলল নিজের মন। একদিনে নয় অবশ্য, মেলামেশা করতে-করতে, দেখাশোনা করতে-করতে, দিকে-দিকে হাঁটতে-হাঁটতে আর দল বেঁধে গাইতে-গাইতে কখন যে সে বিপ্লবীকে খুব বেশিরকম ভাবে ভালবাসতে লাগল, তা সে নিজেও বুঝতে পারল না। কেবল এটুকু বুঝতে পারল, প্রথম আলাপে যেমনভাবে সে আঁকড়ে ধরে ছিল বিপ্লবীর শক্ত মুঠো, তেমনভাবেই সে আঁকড়ে থাকতে চায়, সারা জীবন।

বিপ্লবীও এর আগে এভাবে চায়নি কাউকে, সেটা সে এতদিনে টের পেতে শুরু করেছে। তাদের দলে তো কত-কত তরুণী এসে জুটেছে, এ-রাজ্য আর আশেপাশের অঞ্চল থেকে। তারা সবাই বিপ্লবীর খুব ভাল বন্ধু, সহযোদ্ধা। কিন্তু কই, তাদের মধ্যে একজনকেও একদিন মাত্র না দেখতে পেলে তো সব কাজ ভুলে বসে থাকতে ইচ্ছে করেনি একবারও? সকলে যখন বিপ্লবের নিশান তৈরি করার জন্য গাছের ডাল আর কাঠকুটো জোগাড়ে ব্যস্ত, তখন সবার আড়ালে একবার নদীর ধারে এসে সাদা বালিতে নখের আঁচড়ে আর কারও নাম লেখার ইচ্ছে তো হয়নি কখনও? তাদের গোপন জমায়েতে যখন সবাই হাজির সেই একজন ছাড়া, তখন জোট বেঁধে প্রতিরোধের গান গাইবার সময়ে নিজেরই লেখা শব্দগুলো ভুলে তো যায়নি এর আগে? তা হলে এ কেমন বন্ধুত্ব, যার জন্য রাত জেগে বাঁশি বাজাতে ইচ্ছে করে, আর দিনভর ইচ্ছে করে গান শোনাতে? এ কেমন বন্ধুত্ব, যার স্বাদ ছাড়া পৃথিবীর সমস্ত কিছু এক নিমেষে বেরং ঠেকতে শুরু করে? কাউকে সে কিছু বলল না ঠিকই, কিন্তু দলের জোট বাঁধা ছেলেমেয়েরা দিব্যি বুঝতে পারল, রাজকন্যা আর বিপ্লবী একে অপরকে ভালবেসে ফেলেছে খুব। আর এই লড়াইয়ের মরসুমে তাদের ভালবাসা ফুটে উঠছে কাঁটাগাছে গোলাপের মতোই।

এমনই এক ভালবাসার দিনে, যখন সারা দুপুরের বৈঠক আর মহড়ার পর ছেলেমেয়েরা যে-যার বাড়ি ফিরে যাচ্ছে, বয়ে যাওয়া সন্ধের নদীর ধারে, একখানা চিনার গাছের তলায় হেলান দিয়ে বসেছিল রাজকন্যা আর বিপ্লবী। অশান্তি আর ভয় ছড়িয়ে গিয়েছে রাজ্যের দশদিকে, সাধারণ মানুষের ভরসা এখন এই বিপ্লবীর জেহাদি দল। এ ছাড়া বুক চিতিয়ে সত্যি বলার সাহস এখন কারও নেই। সামনের মাসেই রাজা বহিরাগতদের বন্দি করার আইন ঘোষণা করবেন রাজপ্রাসাদের মিনার থেকে, কানাঘুষো এমনটাই। সেইসঙ্গে ঘোষণা করবেন যুদ্ধও। বিপ্লবী ঠিক করেছে, সেইদিন প্রথম তারা সমক্ষে এই সব কিছুর বিরোধিতা করবে। তাতে যা হয় হোক। সেসবেরই পরিকল্পনা চলছিল দুপুর জুড়ে। এখন সন্ধের বাতাসে নদীর পাড় শীতল হয়ে এসেছে। আর শীতল হয়ে এসেছে রাজকন্যার হাতের পাতা, যা ধরা রয়েছে বিপ্লবীর গরম মুঠোর মধ্যে।

বিপ্লবী: তুমি কেন আমাকে ভালবাসছ, রাজকন্যা?

রাজকন্যা: তোমাকে তো বুদ্ধিমান বলে মনে হয় বিপ্লবী! এমন প্রশ্ন তো বোকারা করে। ভালবাসার কারণ কেউ জিজ্ঞেস করে কখনও? বাসছি, তাই বাসছি।

বিপ্লবী: কিন্তু তুমি তো জানোই, আমার পরিণতি ভারী অনিশ্চিত। তবে?

রাজকন্যা: সে তো আমাদের সকলের। এই যে এখন তোমার বুকে মাথা রেখে শুয়ে আছি, কেউ বলতে পারে, এরপর কী হবে? প্রতিটা মুহূর্তই তো অনিশ্চিত। অত ভেবেচিন্তে লোকে রাজনীতি করতে পারে, ভালবাসতে পারে না।

বিপ্লবী: আমি আর তুমিও তো রাজনীতিই করছি। করছি না?

রাজকন্যা: করছি তো। একশোবার করছি। কিন্তু সে-রাজনীতি ভালবাসার হয়ে, ভালবাসার জন্য। ক্ষমতা ভোগ করার জন্য নয়, মানুষজনকে ভয় দেখানোর জন্য নয়, নিজের সম্পদ বাড়ানোর জন্য নয়। বরং সব ভুলে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য। এও তো এক ধরনের ভালবাসাই, না? বলো?

বিপ্লবী: নাহ, তোমার সঙ্গে দেখছি কথায় পারা যাবে না।

রাজকন্যা: চেষ্টা কোরো না তা হলে।

বিপ্লবী: আমি কেবল ভাবছি, ঘোষণার দিন, যেদিন প্রথমবার আমরা আমাদের জেহাদ দেখাব, সেদিন আমাদের দলে তোমাকে দেখে রাজামশাই আর তাঁর সভাসদদের কী অবস্থা হবে!

রাজকন্যা: খুব অবাক উনি হবেন না মোটেই। ওঁর চোখ কান যথেষ্ট খোলা। তা ছাড়া উনি ছোট থেকে চেনেন আমাকে, জানেন কেমন বেয়াড়া মেয়ে আমি।

বিপ্লবী: একটা কথা বলি? তুমি বরং আড়ালে-আড়ালে থাকলে আমাদের সঙ্গে। গান বাঁধলে, নিশান তৈরি করে দিলে, ভাবনাচিন্তা করলে, কেবল সামনে গেলে না। তা হলে কেমন হয়? আমার পরিণতি নিয়ে আমি ভাবি না। কিন্তু জেহাদ ঘোষণার পর তোমাকে দলের সামনে দেখতে পেলে তোমারও যে শাস্তি হতে পারে, এটা ভেবেই আমার ঘুম হয় না।

রাজকন্যা: তোমার পরিণতির সঙ্গে যে আমার পরিণতি জড়িয়ে গিয়েছে আষ্টেপৃষ্ঠে, এ-কথা তুমি এখনও বুঝতে পারছ না? তোমার যা হবে, আমারও তাই হবে। আর আড়াল থেকে অন্য যা-ই হোক, লড়াই হয় না। সে-কথা তোমার চেয়ে ভাল কে আর জানবে? আড়াল থেকে ভালবাসা যায় বিপ্লবী, লড়াই করতে গেলে সামনে আসতেই হয়। হ্যাঁ, অনেকে হয়তো আছে, যারা মুখে সমর্থন জানাবে, বড়-বড় কথা বলবে, কিন্তু কাজের সময় ঘরের দরজা দিয়ে বসে থাকবে। তারা মৃত। তাদের সমর্থনে কিছু যায় আসে না। তাদের উপর ভরসা করা আর কবরখানায় মিছিল ডাকা একই ব্যাপার। তুমি কত ছেলেমেয়েকে পাশে পেয়েছ, আমিও তো তাদেরই একজন। হলাম না হয় রাজকন্যা। কিন্তু সব্বার আগে মানুষ তো! অত ভেবো না। যা হবে, আমাদের সকলের হবে। শুধু মনে রেখো, একদিন যখন এই উপত্যকার, এই কুয়াশানগরীর ইতিহাস লেখা হবে, তখন তোমার নাম, আমার নাম, আমাদের সকলের নাম লেখা হবে। হবেই হবে। এই আমি বলে দিলাম।

বিপ্লবী: অত কিছু তো ভাবছি না রাজকন্যা। আমার বাবাকে চোখের সামনে খুন হতে দেখেছি। এখন চারপাশে বাড়িঘর পুড়িয়ে দিচ্ছে রাজপেয়াদারা, এদিকে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে। একটা শান্তিপূর্ণ রাজ্যকে কয়েক বছরের মধ্যে বদলে যেতে দেখেছি। এ আমার একার লড়াই নয়। হারালে সকলের অনেক কিছু হারাবে।

রাজকন্যা: জানি। একার লড়াই লড়লে তোমাকে এভাবে নিজের মন দিয়ে দিতাম না। যে সকলের জন্যে লড়ে, আমার মন তার কাছেই যেতে চায় যে।

বিপ্লবী: তোমার মন যে আমার মনের হদিশ বদলে দিচ্ছে, তার কী হবে?

রাজকন্যা: কিছুই হবে না। আমরা দু’জন তো একই দিকে হাঁটছি, একই মিছিলে শরিক হয়ে। আমাদের মন ঠিক আমাদের বুঝে নেবে।

বিপ্লবী: তা হলে কি আজ তোমার ঠোঁটে একবার ঠোঁট রাখতে পারি? ভারী ইচ্ছে করছে।

রাজকন্যা: ইচ্ছে কি আমারও করে না? ভরপুর, আরামের, ডুবে যাওয়ার একখানা চুম্বন। প্রথম চুম্বন। কিন্তু সব কিছুরই একখানা সঠিক সময় আছে বিপ্লবী। এখনও সেই সময় আসেনি।

বিপ্লবী: তোমাকে জোর করতে পারি না, চাইও না। কিন্তু সঠিক সময় কোনটা?

রাজকন্যা: সময় এলে আমরা নিজেরাই তা বুঝতে পারব। দ্যাখো, নদীর ধারে সূর্য কেমন ডুব যাচ্ছে!

বিপ্লবী সামনে তাকিয়ে দেখেছিল, সাদা বালির চর, ধূসর পাথর আর স্বচ্ছ জলে গাঢ় কমলা রঙের গনগনে ছায়ার আঁচ ফেলে সূর্য আস্তে-আস্তে মিলিয়ে যাচ্ছে দিগন্তের ওপারে। এই উপত্যকায় সূর্য ডোবা মানেই লহমায় অন্ধকার নেমে আসা, যেমন ঠিক তখনই নেমে এসেছিল রাজপ্রাসাদের বৈঠকঘরের মধ্যে। রাজকন্যা যখন আধো অন্ধকারে বিপ্লবীর হাত ছাড়িয়ে ফিরে আসছিল অরণ্যের মধ্যেকার নির্জন প্রাসাদে, ঠিক তখনই দাসদাসীরা বৈঠকঘরে ব্যস্ত ছিল বাতিগুলো জ্বেলে দিয়ে তড়িঘড়ি চলে যেতে, কেননা সেখানে তখন জরুরি আলোচনা চলছে। হাজির আছে স্বয়ং রাজামশাই, সেনাপতি, কয়েকজন হোমরাচোমরা মন্ত্রীও। আর সবার আড়ালে, অন্ধকারে নিজের পোশাকের কোনা লুকিয়ে নিয়ে হাজির আছেন বৃদ্ধ বিদূষক, প্রায় না থাকার মতো করেই।

সেনাপতি জানালেন, রাজ্যের চারপাশে কী-কী হচ্ছে। কোথায়-কোথায় ঘরদোর খালি করা হচ্ছে, কোথায়-কোথায় রাজার সংবাদ পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে রোজ, কোথায়-কোথায় পথেই হচ্ছে সভা, যাতে আসন্ন যুদ্ধের কথা মানুষজন জানতে পারে। আর সবচেয়ে বড় ব্যাপার, এক মহাপ্রস্তুতি চলছে আসছে মাসের মাঝামাঝির জন্য। সেইদিন সারা উপত্যকা ও অরণ্যের মানুষ উপচে পড়বে রাজপ্রাসাদ চত্বরে, সেই রাজা আর রানির মৃত্যুর পরদিন যেমন পড়েছিল। যুদ্ধের নিশানে সেদিন সেজে উঠবে রাজ্যের চারপাশ। সেদিন রাজা জীবনের সবচেয়ে বড় ঘোষণাটি শোনাবেন মিনার থেকে দাঁড়িয়ে। এসব নিয়ে এদিন সারা দুপুর চলেছিল ভারী গম্ভীর বৈঠক। কথা শেষ হলে রাজামশাইকে দেখতে বেশ সন্তুষ্টই মনে হচ্ছিল সেনাপতির। নিয়মমাফিক সেলাম ঠুকে তিনি বেরিয়ে এসেছিলেন বৈঠকমহলের বাইরে, বাকি মন্ত্রীদেরও তখন ছুটি। তাঁরাও বেরিয়ে পড়েছিলেন যার যার বাড়ির দিকে।

বেরোননি শুধু একজন। বিদূষক। রাজামশাই সেটা খেয়াল করেছেন। তাঁর ভারী ক্লান্ত লাগছিল। সারাদিন ধরে ষড়যন্ত্র করেছেন। ষড়যন্ত্র বড় ক্লান্তিকর। খুব খাটুনি যায়। একখানা আড়মোড়া ভেঙে দেরাজ থেকে পানীয়ের বোতলটা বের করে এক পেয়ালা নিলেন। বিদূষকের এ-সমস্ত চলে না, তাই তাঁকে আর বিব্রত করলেন না রাজা। তিনি স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিমায় পানীয়ে দীর্ঘ একখানা চুমুক লাগিয়ে গিয়ে দাঁড়ালেন কাচের জানলার পাশে। আর অন্ধকারকে গায়ে জড়িয়ে নিঃশব্দে পায়ে তাঁর পাশটিতে এসে দাঁড়ালেন বৃদ্ধ বিদূষক।

বিদূষক: কী দেখছেন, রাজামশাই?

রাজামশাই: দেখছি, আগামী মাসে এ-চত্বরটা সেজে উঠবে অন্যভাবে।

বিদূষক: ঠিক ঠিক। সব যেমনটা চাইছেন, তেমনটা হবে। শুধু...

রাজামশাই: শুধু?

বিদূষক: যদি অপরাধ না নেন তো বলি...

রাজামশাই: আপনি তো জানেন বিদূষক, ভণিতা আমি পছন্দ করি না।

বিদূষক: সেদিন ভারী ঝামেলা বাধার যোগ রয়েছে।

রাজামশাই: সে আর বলতে! ঝামেলা তো বেধেই আছে। বিপ্লবীদের দল তো দিকে-দিকে তাদের গোপন প্রচার শুরু করেছে। সে-খবর কি আমি রাখি না? সেদিন পেয়াদারা থাকবে চত্বরে। ঝামেলা পাকাতে এলে পিটিয়ে একেবারে ঠান্ডা করে দেবে সবক’টাকে।

বিদূষক: আজ্ঞে, সব ক’জনকে বোধ হয় পারবে না।

রাজামশাই: কী বলতে চান খোলসা করে বলুন তো! হেঁয়ালি আমার মোটেই ভাল লাগে না।

বিদূষক: আজ্ঞে, রাজপেয়াদার কী ক্ষমতা, খোদ রাজকন্যার গায়ে হাত দেয়। সে তো হয় না। তাই না? আপনিই বলুন?

রাজামশাই: ওহ, ব্যাপার তা হলে এতদূর গড়িয়েছে?

বিদূষক: সে যদি আপনি ব্যাপারের কথা বলেন, তা হলে আমি বলব, গড়িয়েছে অনেক দূরই।

রাজামশাই: কীরকম?

বিদূষক: আজ্ঞে, বারদশেক প্রমাণ না পেলে আমি নিজের চোখকেও বিশ্বাস করি না। আপনি এত ব্যস্তসমস্ত থাকেন, আমি নিজে কয়েকজন পেয়াদাকে একটু চোখে-চোখে রাখতে বলেছিলাম। তা তাতে তারা যা বলল আমায়...

রাজামশাই: কী বলল দয়া করে বলবেন কি?

বিদূষক: আজ্ঞে, আজ তাদের দু’জনকে আলিঙ্গনাবদ্ধ অবস্থায় নদীর ধারে দেখা গিয়েছে। এই একটু আগেই। একেবারে তাজা খবর। মিথ্যে হলেই আমি খুশি হতাম, কিন্তু ব্যাপারটা সত্যি।

রাজামশাই: কাদের?

বিদূষক: এসব কথা বলতেও খারাপ লাগে। কিন্তু আপনার আদেশ অবজ্ঞা করি আমার সাহস কী। আজ্ঞে, সেই বিপ্লবী আর আমাদের রাজকন্যা। তারা একে অপরের প্রেমে পড়েছে।

রাজামশাই: প্রেম? কতদিন পর শুনলাম শব্দটা। তা, প্রেম তো এদের এই রাজপরিবারে বড় একটা ছিল না? যা হয়েছে সব দেখেশুনে নিয়মমাফিকই হয়েছে।

বিদূষক: আজ্ঞে, কী আর বলি। যুগের বাতাস রাজামশাই। প্রেম ছিল না। কিন্তু এসেছে। বাতাসে ভেসে এসেছে। বাইরে থেকে এসেছে এখানে। আপনার ঘরে এসে পড়েছে একেবারে।

রাজামশাই: বহিরাগত?

বিদূষক: আজ্ঞে। বহিরাগত।

রাজামশাই: এ তো এক সামলাতে আরেক ঝামেলার উদ্রেক হল দেখছি! তবে এখন উপায়?

বিদূষক: উপায় তো আপনার জানা।

রাজামশাই: কীরকম?

বিদূষক: আজ্ঞে, এ-রাজ্যে বহিরাগতদের ভবিষ্যৎ কী, সে নিশ্চয়ই আমার আপনাকে বলে দিতে হবে না। তাই না?

রাজা মৃদু হাসলেন। যদিও অন্ধকারে বিদূষকের হাসিটা দেখতে পেলেন না। সেটা কেবল দেখতে পেল বাতাস। বাইরে থেকে আসা।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%