শ্রীজাত
খবরটা যখন দিচ্ছে আরেক সহচরী, তখনই সে জানত, রাজকন্যা এ-খবর শুনে আরওই খাওয়াদাওয়া ছেড়ে দেবে। এমনিতে সে ভারী জেদি মেয়ে, কারও কথা শোনার পাত্রী নয়, নিজে যা ঠিক মনে করে সেটাই করবে। সত্যি বলতে কী, সে যদি ক্ষমতায় এই প্রহরীদের সঙ্গে পেরে উঠত, তা হলে হয়তো কুঠুরিতে বন্দি থাকত না কখনওই।
“আমরা দু’জন কিন্তু চাইলেই তোমাকে উড়িয়ে নিয়ে যেতে পারি।” একথা একদিন দুপুরে, রাজকন্যার জট পড়তে থাকা বাদামি চুলে আলতো বিলি কাটতে-কাটতে বলেছিল এক সহচরী। সেটা রাজকন্যার নজরবন্দি হওয়ার দ্বিতীয় দিন।
তাইতে সে বিষণ্ণ আর ভারী চোখের পাতা তুলে উত্তর দিয়েছিল, “তুমি কি ভাবছ, সে-কথা আমার মাথায় আসেনি? কিন্তু মুক্ত হয়ে আমি যাব কোথায়? আরেক বন্দির কাছে? সেখানে তো আমাকে ঢুকতে দেবে না। যাকে ভালবেসেছি, সে নিজেই যখন বন্দি হয়ে আছে, তার সঙ্গে আমিও বন্দি থাকি বরং। আমাদের জীবন একসঙ্গে না হলেও, দূরে-দূরে কাটুক, কিন্তু একইরকমের কাটুক।”
“তা বেশ,” বলেছিল আরেক সহচরী, “কিন্তু খাওয়াদাওয়া একেবারে ছেড়ে দিয়েছ যে, সেটা কি ভাল হচ্ছে?”
“ছাড়িনি তো, ছাড়তে চাইওনি। কিন্তু সেদিন, সেই একখানা স্বাদ পেয়ে যাওয়ার পর থেকে মুখে আর কিছু রুচছেই না। অরুচি হলে কেউ কি কিছু খেতে পারে, বলো?” বলেছিল রাজকন্যা। সহচরীরা জানে, সে কোন স্বাদের কথা বলছে। যে-স্বাদ মুখে পাওয়ার জন্য আজ রাজকন্যার এই বন্দিদশা, সেই স্বাদ।
“তা হলে তুমিই বলো, এই অরুচি থেকে ছাড়া পাওয়ার উপায় কী? তা কি তুমি জানো? নাকি হাকিম ডাকব? রাজামশাই কিন্তু রোজ দু’বেলা লোক পাঠিয়ে খোঁজ নিচ্ছেন,” জিজ্ঞেস করে আরেক সহচরী।
“খোঁজ। সেই। আসলে খোঁজ নিতে চাইছে, আমি আদৌ বেঁচে আছি কি না।”
এ-কথাটা যে খুব একটা ভুল বলেনি রাজকন্যা, সেটা তার দুই সহচরীই জানে। আর জানে সেই একেবারে প্রথম দিন থেকেই। তাদের আলাপের প্রথম দিন।
“সেসব পরের কথা, কিন্তু বলো, কী পেলে তোমার মুখের রুচি ফিরবে? আমরা সেই ব্যবস্থা করি তা হলে,” বলে এক সহচরী।
রাজকন্যা জবাব দেয়, “সে তোমরা আর পারবে না। যে-স্বাদ একবারমাত্র পাওয়ার পর পৃথিবীর বাকি সমস্ত স্বাদ ফিকে হয়ে গিয়েছে, সেই স্বাদ আবার না পেলে আমার রুচি ফিরবে না।”
বলে রাজকন্যা শুকনো একটা হাসি রেখে দেয় রোদ্দুরে। চিনার গাছের খসে পড়া পাতার মতোই। দুই সহচরীর বুক ঠেলেই লম্বা-লম্বা দুটো শ্বাস বেরিয়ে এসে সেই হাসির টুকরোকে কাঠের মেঝেয় তাড়িয়ে বেড়ায়।
প্রেমে পড়লে মানুষ কেমন একটা যেন হয়ে যায়, এ-কথা রাজকন্যার দুই সহচরী শুনেছিল বটে, কিন্তু দেখল এই প্রথম। তাদের জীবনে প্রেম এভাবে আসেনি কখনও, তাই তারা এই একরকম বোধের কথা মন থেকে এখনও জানে না। কিন্তু বুঝতে পারে, সে ভারী জটিল ব্যাপার। নইলে একজন মানুষের জন্য আরেকজন মানুষ দূরে বসে এইরকম হয়ে যায়? তারাও অবশ্য রাজকন্যাকে ভালবাসে খুব, সেই প্রথম দিন থেকে, যেদিন তারা তাকে খুঁজে পেয়েছিল।
সেইদিনটার কথা আজও খুব স্পষ্ট ভাবেই মনে আছে দুই সহচরীর। রাজকন্যাও ভোলেনি। তারপর, অনেকটা বড় হয়ে সেই দিনটা সম্পর্কে সে যা জেনেছিল, সেটাও ভোলেনি। আর সেইদিনই সে বুঝেছিল, তার বাবা মা-র মৃত্যু কোনও দুর্ঘটনা নয়।
প্রথম দিকে নতুন রাজা, আগের মহামন্ত্রী তার সঙ্গে ভাল ব্যবহার করার চেষ্টা করলেও, রাজকন্যা ছ’বছর বয়স পেরোতে না পেরোতেই তাঁর ব্যবহার হয়ে ওঠে ভারী রুক্ষ আর কঠিন। তিনি মোটেই বেশি দেখা-সাক্ষাৎ করতেন না রাজকন্যার সঙ্গে, দাসদাসীদের উপরেই তার দেখভালের হাল ছেড়ে দিয়েছিলেন। যদিও রাজকন্যাকে তাঁর নির্দেশমতোই চলার কথা বলা হত, কিন্তু জেদি রাজকন্যা, ওই অতটুকু বয়সেই সেসব অমান্য করতে শুরু করেছিল। মন্ত্রী, মানে নতুন রাজা বুঝেছিলেন, এ-মেয়ে বড় হয়ে তাঁর পথের কাঁটা হয়ে দাঁড়াবে।
একদিন বিকেলে রাজ্যের নানা কাজ সেরে এসে নিজের প্রিয় জানলাটার পাশে দাঁড়িয়েছেন তিনি, এ-সময়ে বিদূষকের প্রবেশ। সেদিন সকালেই ভবঘুরেদের দলে ভিড়ে রাজকন্যাকে নাচতে দেখা গিয়েছে, এবং সে নিয়ে বেশ খবরও চাউর হয়েছে। ভবঘুরেদের একখানা দল উপত্যকার এক কিনারে এসে ডেরা ফেলেছে, সে-দলের এক বালকের সঙ্গে রাজকন্যার খুব বন্ধুত্ব হয়েছে, এ-কথাও হয়েছে দশকান। রাজকন্যা নাকি সুযোগ পেলেই সেই ছেলের হাত ধরে উপত্যকায় ছোটাছুটি করছে আর খেলছে। এমনিতে কয়েক বছর আগেও রাজ্যে এসব লেগেই থাকত, কিন্তু এখন এইসব অচেনা অজানা ভবঘুরেদের আগমন মোটেই বরদাস্ত করা হবে না, সেটা সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন রাজা, এবং তাদের তোল্লাই দিলে নাগরিকেরও শাস্তি হতে পারে, সেটাও জানিয়েছিলেন। নিজে গিয়ে বারণ করে এসেছিলেন রাজকন্যাকে। তবু, জেদি সেই রাজকন্যা, ওই ছ’বছর বয়সেই, তাঁর কথা অমান্য করে বন্ধুত্ব পাতাচ্ছে ভবঘুরেদের দলের এক তুচ্ছ বালকের সঙ্গে। তিনি বুঝতে পারেন, এ-মেয়ে দমবে না। তিনি এও বুঝতে পারেন রাজকন্যার হাবেভাবে যে, তার বাবা-মা-র মৃত্যুর সত্যতা সে না জানলেও, সে কেমন একখানা অবিশ্বাসের ভঙ্গিতে তাকায় তাঁর দিকে, এবং সব কথাই অমান্য করার একটা চেষ্টা সে করে। এখন নতুন রাজা স্থির বুঝতে পারছেন, অদূর ভবিষ্যতে যেভাবে শাসন কায়েম করার কথা তিনি ভাবছেন, রাজকন্যা বড় হয়ে তার বিরুদ্ধেই কথা বলবে। সবচাইতে বড় কথা হল, যৌবনে পা দিয়েই সে হয়ে উঠবে সিংহাসনের দাবিদার। নতুন রাজার এতদিনকার ক্ষমতা মুহূর্তে হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে তখন। তা হলে উপায়?
জানলার ধারে গম্ভীর মুখে এসব কথাই যখন ভাবছিলেন তিনি, তখনই বিদূষকের প্রবেশ। এই ক’বছরে তিনি আরও একটু ঝুঁকেছেন, আরও একটু শীর্ণ হয়েছেন, তাঁর বুদ্ধিও হয়েছে আরও একটু ক্রূর।
“রাজাকে যে চিন্তিত দেখছি বড়ই? কী বিষয়, বলা চলে কি?” স্বভাবসিদ্ধ খোনা গলায় প্রশ্নটা করলেন বিদূষক। প্রাসাদের সামনের চত্বরে তখন রোদ ঝলমলে বাজার বসেছে, প্রহরার মধ্যেই বিক্রি হচ্ছে হরেক রকমের পসরা।
“সেদিন ওর বাপ মা-র সঙ্গে মেয়েটাকেও যদি...” রাজা কোনও ভণিতা ছাড়াই দাঁত কিড়মিড় আর মুঠো শক্ত করে কথাটা বলে ফেললেন।
“ছি-ছি, এভাবে বলতে নেই! প্রাসাদেরও কান আছে। তবে কিনা অনুতাপ আপনার অমূলক নয়। এ-মেয়ে যে লতানে চারাগাছের মতোই তরতরিয়ে বেড়ে উঠছে। একদিন ওই লতাই হবে আপনার গলার ফাঁস,” খুব মিষ্টি স্বরে কথাটা বললেন বিদূষক।
“সেটা বুঝতে পারছি বলেই তো রাতে দুশ্চিন্তায় ঘুম হচ্ছে না বিদূষক।”
“সেদিন যদি আপনি ওকে কিছু করতেন রাজামশাই, অনেক প্রশ্ন উঠত। তারপর আরও তিনটে বছর কেটে গিয়েছে, মানুষজনের স্মৃতি থেকে অনেক কিছু ফিকে হয়ে গিয়েছে। এখন আপনি আবার চাইলে...” বলে একখানা মৃদু হাসি দেন বিদূষক, যেটা তিন বছর আগেকার এক রাতে শুনেছিলেন এই রাজা।
“কী বলতে চাইছেন, স্পষ্ট করে বলুন বিদূষক। এখন সময় বেশি নেই। প্রত্যেকটা দিন দামি,” গম্ভীরস্বরে বললেন রাজা।
“আপনি নিজে তো নিরামিষাশী, তাই না?” ভারী সরল কণ্ঠে প্রশ্নখানা করলেন বিদূষক।
রাজা তাকিয়েছিলেন বাইরের মানুষজনের ব্যস্ত যাতায়াতের দিকে, এ-প্রশ্নে একটু অবাক হয়ে কিছু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা বিদূষকের দিকে ফিরে তাকালেন, “হঠাৎ এই প্রশ্ন? হ্যাঁ, আমি কঠোরভাবে নিরামিষাশী। কেন জানতে চাইছেন এ-কথা?”
“কিছুই না, কিছুই না...” মিহিভাবে হাত কচলাতে-কচলাতে বলেন বিদূষক, “ভাবছিলাম যে, ভালুকেরা কিন্তু নিরামিষাশী নয়। তারা মাংস ভারী আয়েস করে খায়। বিশেষত সে-মাংস যদি হয় নরম, তুলতুলে এবং সুস্বাদু...”
রাজা এক ঝটকায় জানলা থেকে সরে বিদূষকের শীর্ণ শরীরটার সামনে নিজের বিশাল ছায়া নিয়ে দাঁড়ান। তার চওড়া কাঁধ, বিরাট বপু, উঁচু মাথা আর গোলাটে ভারী দাড়িগোঁফওলা মুখের সামনে বিদূষককে কেমন কাঠির মতো দেখাতে থাকে। রাজা গলাটা নামিয়ে এনে দাঁতে দাঁত চেপে প্রশ্ন করেন, “কী বলতে চাইছেন খোলাখুলি বলুন।”
“আজ্ঞে, সেরকম কিছুই না। রাজকন্যা তো অনেকদিন অরণ্যের রাজপ্রাসাদেও কাটান, আর রোজ বিকেলে রাজদাসী তাঁকে নিয়ে অরণ্যের পথে বেড়াতেও বেরোন। অরণ্যের পূর্বকোণের একেবারে শেষে একটি অন্ধ গুহা আছে। সেখানে শুনেছি এক ভালুকের বাস। ভারী বলবান ও হিংস্র সেই পশু। নরম মাংস পেলে সাবাড় করে ফেলতে তার পলকমাত্র লাগবে মহারাজ।”
হেসে-হেসে, মাথা নিচু করে কথাগুলো বলছেন বিদূষক।
“এ আপনি কী বলছেন?” রাজা জিজ্ঞেস করলেন।
“যা আপনি শুনতে চাইছেন। কেবল, রাজদাসীকে বুঝিয়ে দিতে হবে ব্যাপারটা, যেন গুহা অবধি গিয়ে সে একা ঘোড়ায় চেপে চম্পট দেয়। ভালুক ভালুকের কাজ ঠিকই করবে।”
“আর রাজদাসী?” আরও একটু এগিয়ে এসে প্রশ্ন করলেন রাজা।
“রাজদাসীকে আপনি না হয় এক থলে মোহর বখশিশ দেবেন? যেমন সেই দুই সান্ত্রীকে দিয়েছিলেন?” বলে নিজের খোনা সেই হাসিটায় এত উঁচু আর বড় রাজপ্রাসাদ ছেয়ে ফেলেন বিদূষক।
যেমন কথা, তেমন কাজ। এক পড়ন্ত বিকেলে এক হাতে ঘোড়ার লাগাম আর অন্য হাতে ছ’বছরের ফুটফুটে রাজকন্যার নরম হাত ধরে রাজদাসী এগোতে লাগল অরণ্যের পুবকোণের দিকে। আগের রাত জেগেই সে মানচিত্র পড়ে-পড়ে পথঘাট মুখস্থ করে নিয়েছে, নইলে এই গভীর অরণ্যে পথ হারানোর সম্ভাবনা প্রচুর। এতক্ষণে সে ঠিক জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে। একটু দূরেই দেখা যাচ্ছে গুহার মুখ, যার গভীরে সেই ভালুকের বাস। সে কি আছে গুহার ভিতরে, নাকি বেরিয়েছে বাইরে? এখানে বেশিক্ষণ দাঁড়ানো মানে নিজের জীবনেই বিপদ ডেকে আনা, ভাবল রাজদাসী। তাড়াতাড়ি রাজকন্যাকে গুহায় ঢুকিয়ে তাকে পালাতে হবে ঘোড়ায় চেপে। নইলে বখশিশের লোভে প্রাণটাই বেঘোরে যাবে।
“জানো তো, গুহার মধ্যে একটা আশ্চর্য ফুল ফোটে, যার গন্ধ কোনও দিন চলে যায় না, যা কোনওদিন শুকোয় না। আর রাতে, তার গা দিয়ে আভা বেরোয়।”
বানিয়ে-বানিয়ে যা মাথায় এল বলে দিল রাজদাসী। সে কেবল জানে, সুন্দর ফুলের প্রতি রাজকন্যার লোভ আছে।
“তাই? কীরকম সেই ফুল?”
“সেই ফুল... সেই ফুল...” একটু মাথা চুলকে রাজদাসী আবার বলল, “বেগুনি রঙের তার পাপড়ি, তারা ঝালরের মতো ছড়িয়ে আছে চারপাশে। প্রথমে দেখলে ফুল বলে মনেই হবে না, মনে হবে পশমের হাতপাখা। আর রাতে তাদের গা দিয়ে বেগুনি আভা বেরোয়। লক্ষ বছরে একবার তারা ফোটে। কিন্তু আর কোনওদিন শুকোয় না। পরের লক্ষ বছর তাদের আয়ু। তারা ওইরকমই থেকে যায়। গাছ থেকে ছিঁড়ে নিলেও মরে না, এমনই তাদের প্রাণ। আর কী যে তাদের সুগন্ধ, কী বলব!”
লহমার মধ্যে যা-যা কল্পনা রাজদাসীর মনে এল, সে একের পর এক বলে গেল।
“সত্যি সেই ফুল এই গুহার মধ্যে আছে?” ঘাড় হেলিয়ে অবাক হওয়া চোখে জিজ্ঞেস করেছিল রাজকন্যা।
“সত্যি। যাও, তুমি নিয়ে এসো ফুল, আমি এখানে দাঁড়াচ্ছি।”
“বেশ,” বলে একছুট্টে ফুল দেখার লোভে সরল সিধে রাজকন্যা সবটুকু বিশ্বাস করে ঢুকে গেছিল অন্ধকার সেই গুহায়, আর ঘোড়া ছুটিয়ে উপত্যকার দিকে ফিরে এসেছিল রাজদাসী। তাকে অবশ্য সেই শেষবারই দেখা গিয়েছিল। আর রাজকন্যা ভিতরে গিয়ে গা ছমছমে সেই গুহায় হারিয়ে ফেলেছিল পথ। পায়ের নীচে কবেকার পিছল শ্যাওলা, গুহার দেয়ালে ঝুলে থাকা চামচিকে, আস্তে-আস্তে বাইরের আলোও আর ভিতরে ঢোকা বন্ধ হয়ে গেল। রাজকন্যার সেসব কিছুতে ভয় নেই। সুন্দর ফুলের কথা সে শুনেছে, বিশ্বাস করেছে মনেপ্রাণে। ওরকম ফুলের জন্য সে খামোকা এই অন্ধকার গুহাকে ভয় পেতে যাবে কেন?
কিছুদূর গিয়েই সে দেখতে পেয়েছিল, গুহার মধ্যে, একখানা পাথরের গা থেকে বেরিয়েছে চারাগাছ, আর তারই মুখে ফুটে আছে সেই আশ্চর্য ফুল। ছ’দিকে তার ছ’খানা ঝালরের মতো পাপড়ি দুলছে, আর এই অন্ধকারে তাদের গা থেকে ছড়িয়ে পড়ছে আশ্চর্য আর শান্ত এক বেগুনি আভা। আর এমন সুগন্ধ সে কোনওদিন কোনও ফুলের গা থেকে পায়নি। কেমন এক মিষ্টি, ঝিম ধরানো গন্ধে ভরে আছে তার চারপাশ। সে ফুলের কাছে গেল, তার পাতায় আর পাপড়িতে হাত বোলালো, কিন্তু তাকে ছিঁড়ে আনতে রাজকন্যার মন চাইল না। এমন একখানা ফুল দেখতে পাওয়ার আনন্দেই তার মনে ভরে গিয়েছিল।
সমস্যাটা হল ফেরার সময়ে। কিছুতেই আর গুহার মুখ খুঁজে পাওয়া যায় না। সে চিৎকার করে রাজদাসীকে ডাকছিল, কিন্তু বাইরে থেকে তারও কোনও সাড়াশব্দ নেই। এমন সময়ে তারই বয়সি দুই অদ্ভুত মেয়ে কোত্থেকে যেন তার কাছে এসেছিল। অদ্ভুত, কেননা কাঁধে তাদের দুটো ছোট্ট গোলাপি ডানা আছে, আর পরনে কিচ্ছুটি নেই। কোনও পোশাক নয়। তেমনিভাবেই তারা এল, রাজকন্যার ডাক শুনে। তারপর তাকে রাস্তা চিনিয়ে বের করে নিয়ে এলে গুহার বাইরে। বন্ধুত্ব হল তাদের। যে-বন্ধুত্বের জেরে আজও এই কাঠের বাড়িতে রাজকন্যার পাশে, তার হাতে হাত রেখে বসে আছে তারা। সেই দুই সহচরী। ছবির মতো সেই বিকেলটা মনে পড়ে গেল এক সহচরীর, লহমায়।
উপোসী রাজকন্যার দিকে একবার তাকাল সহচরী। আরেক সহচরী গিয়েছে স্নানের জলের বন্দোবস্ত করতে। যদি রাজকন্যাকে আজ রাজি করানো যায়। কিন্তু ঘরভর্তি এত ফলমূল আর খাবারদাবারের একটি দানাও সে মুখে তুলছে না যে, এইটা আর বরদাস্ত হচ্ছে না সহচরীদের। তবে যে-যুক্তি আজ রাজকন্যা দিল, তারপর কী বলতে হয়, তাদের তা জানা নেই।
সহচরী কেবল জিজ্ঞেস করল, “তা হলে যতদিন না তুমি আবার বিপ্লবীর ঠোঁটচুম্বন করতে পারছ, ততদিন কোনও খাবার মুখে তুলবে না?”
এর উত্তরে কিছু না বলে জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকল রাজকন্যা। সহচরী দেখল, রাজকন্যার ঠোঁটে হেমন্তকালের চিনার পাতার রং ধরছে। আস্তে-আস্তে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন