শ্রীজাত
এর কিছুদিনের মধ্যেই ঘর বাঁধল রাজকন্যা আর বিপ্লবী। প্রাসাদে তারা থাকল না, বরং অরণ্যের এক কিনারের সেই কাঠের ছোট্ট বাড়িকেই সাজিয়ে নিল নিজেদের মনের মতো করে। আর খুব সুখে,শান্তিতে, ভালবাসায় তাদের দিন কাটতে লাগল। রাজকন্যা ঘুরে-ঘুরে বেড়াতে লাগল আগের মতোই, বিপ্লবীর হাতেও আবার বেজে উঠল মিঠে বাঁশি। দলবল নিয়ে সে ফের চরাতে লাগল পশু, আগের মতোই।
অনেকদিন পর নিজেদের প্রিয় বান্ধবীকে সুখী দেখে ভারী আনন্দ হল দুই সহচরীরও। এক জায়গায় বেশিদিন তাদের ভাল লাগে না। তাই রাজকন্যার কাছে বিদায় নিয়ে তারা উড়ে-উড়ে চলে গেল দূর-দূর দেশে বেড়াতে। ফিরতে তাদের অনেক দেরি হবে।
বিপ্লবের বা জেহাদের আর দরকার রইল না, কেননা ওই ঘটনার দিনই রাজামশাইয়ের মাথা গেল বিগড়ে। প্রথমে তাঁকে বাধ্য হয়ে নজরবন্দি অবস্থায় রাখা হল উপত্যকার রাজপ্রাসাদে। শোনা যায়, সেখানেও নাকি দেওয়ালের পাথরে মাথা ঠোকার জন্য তেড়ে যেতেন তিনি। তাই শেষমেশ একখানা মাটির কুঠুরি বানিয়ে তাঁকে সেখানে বন্দি করে রাখা হয়েছে। ছাড়া পেলেই ফের মাথা ফাটিয়ে ফেলবেন, এই ভয়ে।
হিসেবমতো রাজকন্যারই চালানোর কথা দেশ, আর এই ঘটনার পরপরই একদিন সে পা দিল আঠারোয়, কিন্তু নিজের জন্মদিনেই সে বিপ্লবী আর তাদের দলবলকে নিয়ে প্রাসাদে ঢুকে ভেঙে ফেলল সিংহাসন। আর ঘোষণা করল, এখন থেকে এ-রাজ্য কারও একার কথায় চলবে না। চলবে সক্কলের কথায়। তাই রাজ্যের আর কোনও রাজা বা রানি রইল না।
ভেঙে ফেলা হল পাহাড়ের গায়ে তৈরি করা সেই বিশাল প্রাচীর, আর সেখানে বন্দি সকল মানুষ বেরিয়ে এসে আবার মিশে গেল নগরীর জনস্রোতে। সে ভারী আনন্দের দিন। সাতদিন সাতরাত ধরে চলল নাচগান খানাপিনা। মানুষ দুঃখের কথা ভুলেই গেল একরকম। সকলে সমানভাবে মিলেমিশে দিন কাটাতে লাগল।
কেবল এক গভীর রাতে, কেন যেন ঘুম ভেঙে গেল রাজকন্যার। তার হাত জড়িয়ে তখন বিপ্লবী অঘোরে ঘুমোচ্ছে। সে টের পেল, জানলার বাইরে কীসের যেন আবছা আলো। বিপ্লবীর ঘুম না ভাঙিয়ে, ভারী সন্তর্পণে বিছানা থেকে নেমে সে এসে দাঁড়ালো বারান্দায়। আর অবাক হয়ে দেখল, বারান্দার কাঠের হাতলের কোনায় এক আশ্চর্য ফুল রাখা আছে। ছ’দিকে তার ছ’খানা ঝালরওলা লম্বা পাপড়ি নেমে গিয়েছে, আর সেই ফুলের শরীর থেকে বেরোচ্ছে এক চাপা বেগুনি রঙের আভা, যাতে চারপাশ এই রাতের অন্ধকারেও একটু-একটু দেখা যাচ্ছে। এমন ফুল এই অরণ্যে ফোটে বুঝি? মনে করতে পারল না রাজকন্যা। যেন সে এই প্রথমবার দেখছে এমন কোনও ফুল, এরকমভাবেই এগিয়ে গেল তার কাছে। হাতে তুলে নিয়ে নাকের কাছে আনল তারপর। অবশ্য ততক্ষণে এমনিতেই সেই কাঠের বাড়ির চারপাশ ছেয়ে গিয়েছে এই ফুলের অজানা, মিঠে, ঝিম ধরানো গন্ধে। রাজকন্যা সে-রাতে ফুলটাকে যত্ন করে বুকে আঁকড়ে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকল বারান্দায়। কেমন এক অবাক-করা ভাললাগায় ভরে গেল তার সমস্ত শরীর আর মন। কেন যে হল এমন, সে বুঝতে পারল না। তারপর ফিরে গেল বাড়ির মধ্যে, যেখানে তার ভালবাসার মানুষ ঘুমিয়ে আছে। ফুলটা সে রেখে দিল বিছানার পাশে। তখনও রাজকন্যা জানে না, কেবল সারা রাত নয়, সারা জীবন আলো আর সুগন্ধ দেবে এই ফুল।
পুনশ্চ: দু’খানা খবর তো দেওয়াই হয়নি। অবশ্য সে তেমন বড় ব্যাপার কিছু নয়। এক, এই নগরী, উপত্যকা আর অরণ্য থেকে কুয়াশা সরে গিয়ে আবার আগের মতোই ঢুকে পড়ল রোদ। মানুষজনের খুশির আর অন্ত রইল না। চনমন করে উঠল চিনার গাছেদের সারিও। আর দুই, ভিনদেশিকে আর কোনওদিন কোথাও দেখতে পাওয়া গেল না। অবশ্য মনেও তাকে এই নগরীর কেউ রাখেনি। কেবল একজন ছাড়া।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন