শ্রীজাত
সেদিনটা ছিল খুব বৃষ্টির, আর কারিগর অন্যান্য দিনের আগেই ফিরে এসেছিলেন বাড়িতে। উপত্যকার কিনার ঘেঁষে তাঁদের এই বাড়িতে বৃষ্টির তোড় এসে লাগে বড্ড বেশি। বাড়ির সবটুকু পাকা নয়, তাই ঝড় বৃষ্টি জোরদার হলে ভয়ই করে, মনে হয়, এই বুঝি হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ল। ঘোড়াটাকে খড়ের ছাউনিতে বেঁধে রেখে যখন খাবার ঘরে ঢুকলেন তিনি, তখন তাঁকে দেখাচ্ছে বেশ বিধ্বস্ত।
খাবার ঘর আর বসার ঘর আর অতিথি এলে আপ্যায়ন করার ঘর, সব ওই একখানাই। সেখানে বসেই বাঁশিতে ফুঁ দিচ্ছিল তাঁর কিশোর ছেলে। সে অবশ্য তখন যৌবনে পা দিতে চলেছে, আর এর মধ্যেই সে হয়ে উঠেছে যথেষ্ট তীক্ষ্ণ ও ধারালো বুদ্ধির একজন মানুষ, পেয়েছে বাবার জেদ আর মায়ের সাহস। এ-ছেলেকে নিয়ে কারিগর আর তার বউয়ের ভারী দুশ্চিন্তা হয়। আগেকার আমল হলে হত না মোটেই। আগের রাজা আর রানি ছিলেন উদার, সে-সময়ে বাসিন্দারা সব যে-যার মতো দিন কাটাতে পারত। এখন তো তা নয়।
বিশেষত, এবারের বর্ষায় তো নয়ই। কারণ আর কিছুই নয়, রাজামশাই যুদ্ধ চাইছেন। চাইছেন পাশের বাকি রাজ্যদের কবজায় আনতে। সেই যে সেই এক কুয়াশা-ঢুকে-আসা সকালে তিনি শপথ নিয়েছিলেন, সেইদিনই বোঝা গিয়েছিল, এবার আর তাদের রাজ্য আগেকার মতো করে চলবে না। সাধারণ কৃষক, পশুপালক, কাঠুরে, কামার, জেলে, পোশাক বুনিয়েদের যে-শান্তিতে ভরা একখানা জীবন, তাতে হইচই শুরু হবে এবার। এর পর যতবার নতুন রাজা মিনারে চড়ে ভাষণ দিয়েছেন, সাফ কথায় বুঝিয়ে দিয়েছেন, এই নরমসরম জীবনযাপন আর চলবে না। বরং সকলকে তৈরি হতে হবে যুদ্ধের জন্য, নিজেদের সম্পদ বাড়ানোর জন্য। আর যারা অনেকদিন ধরে এসে থাকছে এখানে, তাদের ফেরত পাঠাতে হবে যার-যার দেশে। সোজা কথায়, মানুষ কম, সম্পদ বেশি। এর জন্য যা-যা লাগে, করতে হবে। তাই করতে হবে যুদ্ধ।
এসব কথা নতুন রাজা ঠারেঠোরে অনেকবার বলেছেন ভাষণে, গোবেচারা শান্তিপ্রিয় বাসিন্দারা নিচুমুখে শুনে বাড়ি ফিরে এসেছে। কিন্তু বৃদ্ধ হয়ে আসা জেদি কারিগর আজ যেভাবে বাড়ি ফিরলেন, সেটাকে আর পাঁচদিনের ফেরার সঙ্গে মেলানো যায় না যে, তা দেখেই বুঝে ফেলল কৈশোর পার করতে থাকা তার চৌখস ছেলে। সে অবশ্য ওইসব ভাষণ শুনতে যায়নি কোনওদিনই, সেই একেবারে প্রথম দিন বাবা-মা-র সঙ্গে ছাড়া, যদিও তার কানে আসে সবটাই। বাবার হাতের কাজের অনেক কিছু সে পেয়েছে, কিন্তু লোহা পিটিয়ে গয়না বা খেলনা বানানোয় তার মন নেই। সে পেয়েছে মায়ের হাতের গুণ, দিব্যি নকশা কাটা দস্তানা সে চাইলেই বুনতে পারে, কিন্তু সেদিকেও তার মতিগতি নেই। সে বানিয়েছে সমবয়সি এক বন্ধুদের দল, ছেলেমেয়েরা মিলে সারাদিন পশু চরিয়ে বেড়ায় আর গান বাঁধে। এমন সব গান, যা এই উপত্যকার কেউ কখনও আগে শোনেনি। আগে-আগে যত গান এখানে বাঁধা হত, সে সবই নেহাত রোজকার কথা নিয়ে, প্রেমের দুঃখ নিয়ে, ভালবাসার গোলাপ নিয়ে। কিন্তু কারিগরের ছেলে যেসব গান বাঁধে, তারা কেমন যেন অন্যরকম। শুনলে শরীর চনমন করে, মন টলমল করে। ইচ্ছে হয় গেয়ে উঠতে। ছেলেকে নিয়ে তাই ভারী চিন্তা কারিগর আর তার বউয়ের। অবস্থা যেদিকে যাচ্ছে, তাতে খোলা গলায় নিজের গান গাওয়াও একদিন বন্ধ করে দিতে পারেন রাজামশাই। আর ছেলেকে তাঁরা চেনেন যতটুকু, তেমনটা হলে সে জেদের বশেই আরও-আরও করবে সেসব।
“কী হয়েছে বাবা, তোমার শরীর ঠিক আছে তো?”
ছেলে এগিয়ে এসে বাবাকে বসায় ক্ষয়াটে কেদারায়। কারিগরের রোগা হয়ে আসা শরীর আর পোশাক তখন ঘন বৃষ্টিতে চুপচুপে ভেজা, কাশরুপোলি চুল থেকে টপটপ করে গড়িয়ে পড়ছে জল। ছেলে দ্রুত কাপড়ের টুকরো এনে বাবার হাত পা মাথা মুছিয়ে দিয়ে এক পেয়ালা জল দিল। নিমেষের মধ্যে সেটা শেষ করছেন যখন কারিগর, তার বউ এসে দাঁড়িয়েছেন সামনে।
“কী হয়েছে তোমার? ভিজলে কেন এত? কোথাও একটু দাঁড়িয়ে নিলে পারতে তো?”
“দাঁড়ানোর উপায় ছিল না। দাঁড়ালেই ওরা আমাকে ধরে ফেলত।”
“ওরা? ওরা কারা? কী হয়েছে?”
“আমি পাশের রাজ্যের মেলা থেকে ফেরার সময়ে রাজার সেনা এসে আমাকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল রাজপ্রাসাদে।”
“রাজপ্রাসাদে?” প্রশ্নটা একসঙ্গে বেরিয়ে এল ছেলে আর তার মা-র মুখ থেকে।
“হ্যাঁ, রাজপ্রাসাদে। খোদ রাজামশাই নাকি আমাকে তলব পাঠিয়েছেন, এই বলে তাঁর পেয়াদারা আমাকে নিয়ে গেল সেখানে।”
পোশাক বুনিয়ে মা আর তার বাঁশি বাজিয়ে ছেলে এ-কথার আপাদমস্তক কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না। খেলনা আর গয়নার কারিগর হিসেবে তাঁর নামডাক আছে ঠিকই, কিন্তু সে তো সাধারণ মানুষের মাঝে। আগের রাজা আর রানি কারিগরের কদর বুঝতেন, তাঁর হাতের কাজ তখন রাজপ্রাসাদেও শোভা পেত। কিন্তু লোহার গয়না বা খেলনা নিশ্চয়ই এই নতুন রাজার কাজে লাগে না। তা হলে?
“তারপর?” প্রশ্নটা করল কারিগরের ছেলে।
“আমি তো গিয়ে হাজির হলাম সেখানে। একেবারে বৈঠকঘরে ধরে নিয়ে গেল রাজার পেয়াদারা। দেখি রাজা একলা দাঁড়িয়ে আছেন। চারপাশ ঘিরে দাঁড়াল পেয়াদারা, রাজা স্বয়ং আমার দিকে এক পেয়ালা পানীয় এগিয়ে দিলেন।”
“রাজা নিজেই?” অবাক গলায় প্রশ্ন করল কারিগরের বউ।
“নিজেই। তাঁকে বাধ্য হয়ে বললাম, ‘আমি সুরা পান করি না’। ভাবলাম বুঝি, খুব রাগ করবেন। তা না করে হেসে, নিজেই সেই পেয়ালা থেকে পান করতে লাগলেন। তারপর আমাদের কথাবার্তা শুরু হল...”
রাজা: তোমার ভারী নামডাক শুনেছি অনেকদিন থেকেই। এ-রাজ্যের অনেক মানুষ তোমার সুখ্যাতি করে থাকে, জানো নিশ্চয়ই।
কারিগর: সে নেহাত আপনার মহানুভবতা মহামান্য রাজামশাই। আমি সামান্য লোহার কারিগর, আমার কথা আলাদা করে বলার মতো কিছু নয়।
রাজা: তোমার কথা তো হচ্ছে না। হচ্ছে তোমার কাজের কথা। তোমার হাতের কাজের জুড়ি আশেপাশের কোনও রাজ্যে কারও নেই, এ আমি খতিয়ে দেখেছি।
কারিগর: শুনে খুব আনন্দ পেলাম। খোদ রাজামশাইয়ের কাছে প্রশংসা পাব, আমার মতো সামান্য কারিগরের সে-সৌভাগ্য আশা করাই উচিত নয়। কিন্তু আজ না চাইতেই তা পেয়ে গেলাম বলে নিজেকে ধন্য মনে হচ্ছে।
রাজা: বাড়িতে আছে কে-কে?
কারিগর: আজ্ঞে, বউ আর ছেলে।
রাজা: কী করে তারা?
কারিগর: আজ্ঞে, বউ পোশাক তৈরি করে, ছেলেটা সবে বড় হচ্ছে, বাঁশি বাজায়।
রাজা: বাঁশি? সে কি বাজানোর মতো একটা ব্যাপার?
কারিগর: আজ্ঞে, ওই খামখেয়াল আর কী। নিজের খুশিতে বাজিয়ে বেড়ায়। সে তেমন কিছু না।
রাজা: বাঁশি বাজিয়ে বেড়ানোটা কোনও কাজের কথা নয়। সে যাক গে, আমার আগের ভাষণটা শুনতে এসেছিলে কি?
কারিগর: তা এসেছিলাম রাজামশাই।
রাজা: বেশ। তা হলে নিশ্চয়ই এ-কথা বুঝতেই পেরেছ যে, রাজ্যে আমরা বড় ধরনের বদল আনতে চলেছি?
কারিগর: আজ্ঞে, আমি সামান্য মানুষ। বদল হলে টের পাই। আগে থেকে বুঝতে পারি না।
রাজা: টের পাওয়াটাই আসল কাজ। কিন্তু তোমার কাজ সেটুকু নয়। এই বদলে তোমাকেও হাত লাগাতে হবে। সেইজন্যেই আজ তোমাকে ডাকা এখানে।
কারিগর: আমি নেহাত খেলনা আর গয়না বানিয়ে দিন আনি দিন খাই। এত বড় কাজে আমাকে কী প্রয়োজন, তা তো আমি ঠিক বুঝছি না।
রাজা: বোঝানোর জন্যই ডাকা। বোঝানোর জন্য আমাদের লোক আছে চারপাশে। বুঝিয়ে বেড়ানোই তাদের কাজ। তারাই তোমাকে সবটা বুঝিয়ে দেবে। আমি শুধু বলি, রাজ্যের ভিতরে আর বাইরে যুদ্ধ হবে।
কারিগর: সে কেমন ব্যাপার?
রাজা: ব্যাপার অতি সহজ। রাজ্যের বাইরে বাকি যে-ক’খানা রাজ্য, সব আমাদের চাই। কেবল এ-রাজ্যের কৃষি আর সম্পদ দিয়ে বেশিদিন চালানো যাবে না। তাই অবিলম্বে আমরা আক্রমণ করতে চাই।
কারিগর: ও। আর ভিতরে?
রাজা: এ-কথাও আমি আগেই বলেছি। যুগের পর যুগ ধরে নানান ভিনরাজ্যের লোকজন এসে এখানে বসবাস করছে। তাদের না আছে কোনও পরিচয়, না আছে কোনও অধিকার। তাদের এবার শনাক্ত করার সময় এসেছে। যা বুঝছি, এর জন্যেও ঝামেলা কম হবে না।
কারিগর: এসব তো খুবই বড়-বড় ব্যাপার মহামান্য রাজামশাই। আমার মতো ক্ষুদ্র মানুষকে এসবের কোন কাজে লাগবে?
রাজা: যে-কাজে তুমি পারদর্শী, সেই কাজেই লাগবে। গত মাসে দেখা গিয়েছে, আমাদের বিপুল অস্ত্রভাণ্ডারের বেশিরভাগ অস্ত্রই মরচে পড়ে অকেজো হয়ে গিয়েছে। স্বাভাবিক। আগের রাজামশাই কোনও দিন অস্ত্রের ব্যবহার করেননি। তার আগেও কেউ করেনি। তাই এখন তারা বাতিলের দলে। সৈন্যের বেশিরভাগও বাতিলের দলে। যুদ্ধ না করে করে তাদেরও হাতে পায়ে জং ধরে গিয়েছে, তাদের দিয়েও আর কোনও জোরালো কাজ সম্ভব নয়। তাই আমরা কমবয়সি ছেলেদের নিয়ে নতুন সৈন্য বানাচ্ছি। তোমার ছেলেকেও পাঠিয়ে দেবে, কেমন? সামনের সপ্তাহ থেকে তৈয়ারি শুরু হবে প্রাসাদ চত্বরে।
কারিগর: বলে দেখব রাজামশাই।
রাজা: আর যে-কারণে তোমাকে ধরে আনা। তোমাকে আমাদের জন্য অস্ত্র বানিয়ে দিতে হবে। নতুন, ঝকঝকে, ধারালো অস্ত্র। বর্শা, কুঠার, তরবারি। সংখ্যায় কত হবে, সেটা আমাদের সেনাপতি বলতে পারবেন, তোমার কাছে খবর পৌঁছে যাবে। এর জন্য যা অর্থ লাগে, তা দেওয়া হবে। তা ছাড়া তোমার নিজের বখশিশও ভালই পাবে। তবে হ্যাঁ, সময় কিন্তু বেশি নেই। আর দু’বছরের মধ্যে আমরা যুদ্ধে নামব। তার আগে অস্ত্র নিয়ে মহড়া চালাতে হবে বছরখানেক। অতএব, বুঝতেই পারছ, বারো মাসের মধ্যে সমস্ত অস্ত্র তৈরি করে দেওয়া চাই।
কারিগর: যদি অপরাধ না নেন, একটা কথা বলি রাজামশাই।
রাজা: বলো?
কারিগর: এ কাজ তো আমি করতে পারব না।
রাজা: কী বললে তুমি? পারবে না? করতে পারবে না?
কারিগর: শান্ত হোন রাজামশাই, শান্ত হোন।
রাজা: আমারই মুখের উপর না বলে আমাকেই শান্ত হতে বলছ? এত বড় স্পর্ধা তোমার!
কারিগর: আমি ঠিক সেভাবে বলিনি। আমি আসলে বলতে চাইছি, এ আমার কাজ নয়। এর জন্য অন্য কারিগর লাগবে। যারা অস্ত্র বানায়, তাদের বলুন দয়া করে।
রাজা: তাদের বলা গেলে তোমাকে এখানে আনা হত না আর আমিও সময় ব্যয় করতাম না তোমার সঙ্গে অযথা কথা বাড়িয়ে। তুমি কি দর বাড়াতে চাইছ নিজের, দু’কলি প্রশংসা শুনেই? তা হলে খুলে বলো কত মুদ্রা বখশিশ চাও? সেরকমই ব্যবস্থা হবে।
কারিগর: আপনি আমাকে সম্পূর্ণ ভুল বুঝছেন রাজামশাই। আমি লোহা পিটিয়ে খেলনা আর গয়না বানাই। আমার তিন পুরুষ এই কাজই করে আসছে। কেউ কস্মিনকালেও অস্ত্র বানায়নি। আমি এ-কাজের কিছুই জানি না যে, কীভাবে বানাব?
রাজা: জানার তো কিছু নেই। লোহার কাজ তুমি ভালই জানো। বাকি অস্ত্রশস্ত্রের মাপজোক তোমাকে সব বুঝিয়ে দেওয়া হবে। তা হলেই তো হল! মাপ বুঝে কাজ করে দেবে।
কারিগর: আজ্ঞে, কাজ তো মাপ বুঝে হয় না রাজামশাই।
রাজা: মানে? কী বলতে চাও তুমি?
কারিগর: এ হল গিয়ে শিল্প রাজামশাই। এখানে কাজ মাপ বুঝে হয় না। মন বুঝে হয়। আর আমার যে-মন, সে অস্ত্র বোঝে না।
“একথা তুমি রাজার মুখের উপর বললে?” গরম এক পেয়ালা দুধ কারিগরের হাতে ধরিয়ে প্রশ্নটা করল তার পোশাক-বুনিয়ে বউ।
“মনের কথা বললাম। সে যদি ওঁর মুখের উপর গিয়ে পড়ে, আমি কী করতে পারি।”
“তারপর কী হল বাবা?”
প্রশ্ন করল ছেলে। তার হাতে তখনও বাঁশিটা ধরাই আছে।
“যা হওয়া উচিত। রাজামশাই আগুন হয়ে জ্বলে উঠলেন রাগে। আমাকে বেরিয়ে যেতে বললেন প্রাসাদ থেকে। বেরিয়ে আমি ঘোড়াটাকে নিয়ে কিছুদূর আসতেই দেখি, এক দল পেয়াদা ঘোড়ায় চেপে আমার পিছু নিয়েছে। আমার ঘোড়াটা বুড়ো হলে কী হবে, বিপদ ঠিকই বোঝে। সে দুদ্দাড় করে ছুটে আমাকে তড়িঘড়ি বাড়ির পথে নিয়ে এসেছে। এই তুমুল বৃষ্টিতে রাস্তাঘাট ঝাপসা আর পিছল বলে ওরা হয়তো একটু পিছিয়ে পড়েছে, কিন্তু তোমাদের বলি, ওরা এসে পড়তে আর বেশি দেরি নেই। আর একবার যদি আসে, ওরা আমাকে ছাড়বে না।”
“ছাড়বে না বললেই হল? আমরা আছি না?” গর্জে বলে উঠলেন ছেলের মা।
“হ্যাঁ বাবা, আমরা থাকতে তোমার কিচ্ছু হবে না।” শক্ত মুঠোয় বাঁশিটা চেপে ধরে বলে উঠল কিশোর ছেলেটি।
“একটা কথা বলি তোমাদের। সকলে মিলে মরে যাওয়া কোনও বুদ্ধির কাজ নয়। লড়তে হলে বেঁচে থাকতে হবে,” এটুকু বলে কারিগর হাত রাখলেন তার ছেলের কাঁধে। আর বললেন, “নিজের যা ইচ্ছে হয়, নিজের যা ঠিক মনে হয়, সেটাই করবে। কেমন? সারা জীবন।”
এটা বলার পরই দরজায় ঢকঢক করে সজোরে শব্দ হল। কেউ বা কারা ধাক্কা দিচ্ছে। বৃষ্টির তোড়ের আওয়াজ পেরিয়ে সেই শব্দ ঢুকে আসছে ঘরে। ছেলে আর মা দু’দিক থেকে জাপটে ধরেছিল কারিগরকে। তিনি তাদের সেই মুঠো আলগা করে উঠে দাঁড়ালেন, তারপর এগিয়ে গেলেন দরজার দিকে।
আবার সেই এক শব্দ। ঢকঢক। সজোরে ধাক্কা, দরজায়।
বিপ্লবী কয়েদখানার মেঝেয় বসেছিল, শব্দে তার ভাবনার চটক ভাঙল।
সে উঠে লোহার ভারী দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই তার তলা দিয়ে এক ঝটকায় তিরবেগে ঢুকে এল খাবারের ধাতব পাত্র।
ঠিক যেভাবে সেই বর্ষার রাতে তার বাবা দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়ানো মাত্র দু’কপাটের সামান্য ফাঁক দিয়ে ঢুকে এসেছিল তীক্ষ্ণ তরবারি, তাঁর পেট বরাবর।
কয়েদখানার মেঝেয় নিশ্চুপ পড়ে থাকা ধাতব পাত্র সে ঝরঝর করে ভরে উঠতে দেখল রক্তে। বাবার রক্ত। দশ বছর আগেকার।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন