বিংশ অধ্যায়

শ্রীজাত

তার ঠিক পরের রাতে, পূর্ণিমার ঠিক আগের রাতে, ভিনদেশি একা এসে চুপচাপ দাঁড়াল নদীর ধারে, সাদা বালির চরে। ঘোড়াটাকে সে বেঁধে রাখল পাশেরই একখানা গাছের সঙ্গে। সে ভারী বাধ্য, আওয়াজ করবে না। শীতের ওই গভীর রাতে, প্রায় ধবধবে জ্যোৎস্নার মধ্যে ভিনদেশি একা এসে দাঁড়াল অরণ্যের মাঝবরাবর বয়ে যাওয়া চওড়া নদীর ধারে। কুয়াশা ভেসে আছে এদিক ওদিক, পাতলা দুধের সরের মতোই। কোথাও বা ঘন কুয়াশায় আবছা হয়ে আছে গাছের দল। তার মধ্যেই সে দাঁড়িয়ে থাকল চুপ করে অনেকক্ষণ। কেউ কোত্থাও নেই। তারপর সে পোশাক খুলে রেখে নেমে দাঁড়াল নদীর বুকজলে, ঠান্ডা স্রোতের মধ্যে, টানটান হয়ে। এখানটায় নদী তেমন গভীর নয়, তার দু’পা শক্ত করে সে গেঁথে নিল নদীর পেটে, নরম পলিতে। তারপর নিজের দু’চোখ বন্ধ করে সে মেলে ধরল তার দু’হাতের তর্জনী আর মধ্যমা, কুলকুল করে বয়ে যাওয়া শীতল কালো স্রোতের দু’পাশে। তার দীর্ঘ, শান্ত, মাঝবয়সী, সতর্ক জোড়া-আঙুলের বন্ধনীকে দু’পাশে কাটিয়ে বয়ে যেতে থাকল নদীর স্রোত, যে না-জানি কত সহস্র বছর ধরে কত অযুত পথ আর দৃশ্য পার করতে-করতে বয়ে আসছে এতদূর। সারা রাত ধরে ওই হিমশীতল জলের মধ্যে বুক অবধি ডুবে ওইভাবে দাঁড়িয়ে থাকল ভিনদেশি। তারপর ভোর যখন হব-হব, উঠে এল চোখ খুলে সাদা বালির চরে। এই চরের চারপাশ ভর্তি ছোট, মাঝারি আর বড় সব পাথরের চাঁইয়ে। তাদের কেউ সাদাটে, কেউ ধূসর, কেউ বাদামি, কেউ বা আবার নীলচে। কিন্তু বিরাট ওজন নয় কারওই, চাইলে হাতে করে তোলাই যায়। ভিনদেশি অবশ্য তুলল না একটাও পাথর। বদলে সে, ওই রাতের শেষ চরের এপাশ ওপাশ এদিক সেদিক ঘুরে-ঘুরে প্রত্যেকটা পাথরের দু’পাশে রাখল তার দু’ হাতের আঙুলজোড়া। তর্জনী আর মধ্যমা। একটা পাথরও বাকি থাকল না আর যখন, তখন ভোরের আলো সামান্য ফুটছে আকাশে। পোশাক গলিয়ে নিয়ে, গাছ থেকে ঘোড়া খুলে তার পিঠে চেপে ভোরের কুয়াশার মধ্যেই মিলিয়ে গেল ভিনদেশি। কেউ সাক্ষী থাকল না এই ঘটনার, কেবল এই অরণ্য আর তার মাথার উপরকার রাতের আকাশ ছাড়া।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%