নবম অধ্যায়

শ্রীজাত

এই কয়েক বছর আগেও তো রাজকন্যা আপনমনে ঘুরে বেড়াত অরণ্যের নানা কিনারে। এই কয়েক মাস আগেও তো সে হাত পেতে চুমুক দিত ঠান্ডা ঝরনার জলে। এই কয়েক সপ্তাহ আগেও তো সে উপত্যকার গাছ থেকে পেড়ে নিত নতুন সব কচি ফল। এই কয়েক দিন আগেও তো অরণ্য আর উপত্যকার মাঝখান দিয়ে বয়ে যাওয়া একমাত্র নদীর ধারে চুপ করে বসে থাকত পাথরে পিঠ দিয়ে।

এসব সে নিজেই করে বেড়াত, সেই ছোট থেকে। ছিল বটে তার দুই আশ্চর্য সহচরী, কিন্তু তাদেরও তো উড়ে-উড়ে বেড়ানো আছে, তাই ঘুরে-ঘুরে বেড়ানোর একার স্বাদ রাজকন্যা দিব্যি পেত সারাটা দিন ধরে। যদিও সে বুঝতে পারছিল, তাদের রাজ্যটা পালটাচ্ছে খুব দ্রুতই। তার ছোটবেলায়, বাবা মা বেঁচে থাকতে যেমন নিরিবিলি শান্তির রাজ্য বলে এটাকে জেনে এসেছে, তেমনটা যে নেই আর কিছুতেই, সে-কথা সে নিজেও টের পাচ্ছে।

সবচেয়ে বড় কথা, দু’খানা দলে ভাগ হয়ে গিয়েছে মানুষ। যাচ্ছে, রোজই। রাজকন্যা হেঁটে যেতে-যেতে, ঘুরে বেড়াতে-বেড়াতে সক্কলের সঙ্গে কথা বলে। সে রাজপেয়াদাই হোক বা কাঠুরে, সে গণিতজ্ঞই হোক বা মাছধরিয়ে। তারাও রাজকন্যাকে সমীহের পাশাপাশি ভালবাসে, কেননা তাকে সকলেই ছোট থেকে নিজেদেরই আশেপাশে খেলে বেড়াতে দেখেছে। তাই রাজকন্যার সঙ্গে মনের কথা খুলে বলতে কেউ দ্বিধা করে না, এটা রাজকন্যা নিজেও বোঝে বেশ।

কী সেই দু’খানা দল? এক দলের মানুষ রাজা যা বলে তাই মেনে নেয়, আরেক দলের মানুষ রাজার সব আদেশ নির্দেশের বিরোধিতা করে। কোনওটাই খুব জোরালো হয়ে ওঠেনি এখনও। বিশেষ করে বিরোধ তো বটেই। রাজার কথায় ঘাড় হেলিয়ে সায় দেবে, এতে আর লুকনোর কী আছে। কিন্তু রাজার কথার উলটোদিকে দাঁড়িয়ে ‘না’ বলবে, এটা একটু বুঝেশুনেই করতে হয় বই কী। নইলে যা অবস্থা, তাতে সকলের পরিণতিই ওই কারিগরের মতো হতে পারে।

সত্যি বলতে কী, কারিগরের ছেলেই দল পাকাচ্ছে, তার বাবার মৃত্যুর পর থেকে। এ-কথা রাজকন্যারও কানে এসেছে। প্রাণের ভয় বেশিরভাগেরই আছে, তারা রাজার সুরে সুর মিলিয়ে বলছে, “হ্যাঁ, যুদ্ধ হওয়া উচিত, কেননা পাশের রাজ্যগুলো সবাই শত্রুতে ভরা।” তারা রাজার স্বরে স্বর মিলিয়ে বলছে, “ঠিকই, যারা অনেক জম্মো ধরে এ-রাজ্যে এসে বসবাস করছে, তাদের এবার বেরিয়ে যাওয়া উচিত, আর নইলে প্রমাণ দেওয়া উচিত যে তারা চিরকাল এ-রাজ্যের বাসিন্দা।” সব মিলিয়ে চারপাশে একটা ফিসফিস, একটা ভয়-ভয় আবহাওয়া তৈরি হয়েছে। এও নাকি শোনা যাচ্ছে, যাদের কাছে রাজ্যবাসী হওয়ার প্রমাণ নেই, তাদের ধরে-ধরে এক বিশেষ ধরনের কয়েদে পোরা হবে শিগগির। পাহাড়ের ঢাল ঘেঁষে মস্ত সব পাথরের পাঁচিল তোলা হচ্ছে, এ-দৃশ্য অনেকেই দেখেছে। সেই পাঁচিলের ওপাশে নাকি রাখা হবে তাদের, যাদের কাছে রাজ্যের বাসিন্দা হওয়ার কোনও প্রমাণ নেই। এসবেও বেশিরভাগ লোক সায় দিচ্ছে আজকাল, তাও রাজকন্যা দিব্যি জানে। আর জানে, অনেকেই ভেবে হয়রান হচ্ছে, ভয়ে শুকিয়ে মরছে, রাজপেয়াদা দরজায় কড়া নাড়লে কীভাবে প্রমাণ দাখিল করবে।

এরই মধ্যে বিরোধী একখানা দল পাকাচ্ছে নাকি কারিগরের জোয়ান ছেলে। সে বাঁশি বাজায়, পশু চরায়, আর দল পাকায়। তারই মতো জোয়ান ছেলেমেয়েদের দল, যারা রাজার এসব হুজ্জুত মানে না। হ্যাঁ, মনে-মনে এমন সব কথাকে রাজকন্যা নিজেও হুজ্জুত বলেই মনে করে, মুখে এখনও কিছু বলেনি, এই যা। কিন্তু সে ভালই জানে, খোদ রাজকন্যা হয়ে রাজনির্দেশের উলটোদিকে দাঁড়ালে রাজ্যজুড়ে ঢি ঢি পড়ে যাবে। লোকে হাঁ হয়ে দেখবে কাণ্ডকারখানা। আর এও জানে, রাজামশাই মোটেই সে-কাণ্ড বরদাস্ত করবেন না। কিন্তু তাতে জেদি, একরোখা, মর্জিময়ী রাজকন্যার কিছুই এসে যায় না। সে ছোট থেকে যা-যা ঠিক বলে মনে করে এসেছে, তাই-তাই করেছে। আর এখন তার মনে হচ্ছে, এই উদ্ভট রাজনির্দেশের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোই ঠিক। কেননা তার বাবা রাজ্য চালালে এমনটা কক্ষনও হতে দিতেন না।

কারিগরের ছেলের তৈরি দল ইদানীং দিকে-দিকে গান গেয়ে বেড়াচ্ছে, কানে এসেছে রাজকন্যার। রাজার এইসব সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তাদের গান। নানা ভাষায় তাদের মতামত লিখে-লিখে ঝুলিয়ে রাখছে গাছে-গাছে, রাতভর। সকাল থেকে পেয়াদাদের কাজ হচ্ছে এখন সেইসব খুঁজে-খুঁজে নামিয়ে এনে পুড়িয়ে ফেলা। রাজামশাই বলেই দিয়েছেন, এইসব বিরোধীদের সামনে পেলে দু’ঘা কষিয়ে দিতে, আর তেমন বাড়াবাড়ি দেখলে সোজা কয়েদ করতে। কিন্তু কারিগরের ছেলের দল অশান্তি পাকায়নি আজ অবধি। শান্তিপূর্ণ কৌশলেই তারা তাদের কাজ করে চলেছে। তবে হ্যাঁ, শোনা যাচ্ছে, তাদের দলে নাকি লোক বাড়ছে। আর বাড়তে থাকা লোক কারিগরের ছেলেকে এক নতুন নামে ডাকছে, যে-নামের চল এ-রাজ্যে এর আগে ছিল না। বিপ্লবী।

সেই বিপ্লবীকে খুঁজতে-খুঁজতে একদিন নদীর ধারে তাকে পেল রাজকন্যা। এ-জায়গাটা গাছপালার ছাউনি একটু কম বলে কুয়াশা মাঝেমধ্যে কেটে-কেটে যায়। অনেকখানি আকাশকে পুরোটা ঢেকে ফেলতে পারে না বলেই আলো একটু বেশি থাকে। পাহাড়ের মাথা থেকে বেরিয়ে এসেছে যে-নদী, সে এখানে বয়ে যায়। গোটা অরণ্যের মাঝখান দিয়েই সে বয়ে চলে, আর বয়ে যেতে-যেতে হাজির হয় উপত্যকায়, কিন্তু এইখানটায় তার চেহারা সবচাইতে ভরপুর। খোলামেলা আকাশের নীচে শব্দ করতে-করতে ঠান্ডা জল বুকে সে বয়ে চলেছে, আর তার পাড় ঘেঁষে অনেক, অনেক দূর পর্যন্ত বড় আর মাঝারি শান্ত পাথরের চাঁই। ছোট ছোট নুড়ির দলও আছে। কারও রং রুপোলি, কারও ছাই-ছাই, আবার কারও-বা বাদামি। একটু দূরে শাখা মেলে দাঁড়িয়ে আছে নানারকম গাছ। এখানে রাজকন্যা মাঝেমধ্যেই এসে বসে থাকে একা-একা। এদিনও সে এসেছিল একাই বসবে বলে, এসে দেখল অনেকে সে-জায়গা দখল করে কাজ করছে।

কেউ গাছের হালকা ডাল কেটে তাতে কাগজ বাঁধছে, কেউ-বা নদীর জলে তুলি ডুবিয়ে কাগজে মনের কথা লিখছে, কয়েকজন আবার গোল হয়ে বসে হাতে তালি দিয়ে গান বাঁধছে। আর এদের মাঝখানে সবচাইতে উজ্জ্বল, সুঠাম ছেলেটির এক হাতে কুঠার, অন্য হাতে বাঁশি। তার মুখভর্তি দাড়িগোঁফ আর কাঁধ অবধি এলানো চুল, কিন্তু তাতে সুষমা ভেঙে যায়নি কোথাও। রাজকন্যা এক দেখাতেই বুঝল, এ-ছেলেটিই বিপ্লবী। এমন তাকানোর সাহস না থাকলে বিপ্লব করা যায় না, সে জানে। তারপর তারা কিছুক্ষণ কথা বলে উঠেছিল।

বিপ্লবী: এ কী! তুমি আমাদের রাজকন্যা না?

রাজকন্যা: কী করে চিনলে তুমি আমায়?

বিপ্লবী: তোমাকে কে না চেনে? তুমি তো আর পাঁচ রাজ্যের রাজপুত্র-কন্যাদের মতো নও, তাই এই নগরীর সকলেই তোমাকে ভাল করে চেনে। আমিও তেমনই চিনি।

রাজকন্যা: আর তুমি নিশ্চয়ই সেই বিপ্লবী? যার কথা এখন সকলের মুখে-মুখে?

বিপ্লবী: তাই বুঝি? তেমন হলে তো বলতে হবে কপাল খাসা আমার। তুমি চিনলে কী করে?

রাজকন্যা: আমি মানুষ দেখেই চিনতে পারি।

বিপ্লবী: তা হলে তো এও তুমি জানো নিশ্চয়ই যে, আমরা কী করি।

রাজকন্যা: হ্যাঁ, জানি তো। তোমরা রাজার বিরুদ্ধে দল গড়েছ।

বিপ্লবী: তা হলে এও জানো নিশ্চয়ই যে, রাজা এর মধ্যেই আমাদের রাজদ্রোহী বলে ঘোষণা করেছেন? আমরা যারা যুদ্ধ চাই না, মানুষের উৎখাত চাই না, তাদের হয়ে কথা বলি, তারা সকলে এখন ঘোষিত রাজদ্রোহী। সে-কথা জানো না তুমি?

রাজকন্যা: রাজপ্রাসাদের ভিতরে থাকব, অথচ এ-কথা জানব না, এমন কি হতে পারে?

বিপ্লবী: আশ্চর্য! এত সব কিছু জানার পরেও তুমি এখানে দাঁড়িয়ে আরাম করে আমার সঙ্গে কথা বলে যাচ্ছ? তোমার কি ভয়ডর নেই?

রাজকন্যা: কথা বলতে হলেও ভয় পেতে হবে নাকি?

বিপ্লবী: হবেই তো। এখন তো কথা বলার আগে দশবার ভাবতে হচ্ছে। কোন কথা বলতে গেলে ভয় পাওয়া উচিত, সেটা বুঝে নিতে হচ্ছে। আমরা অবশ্য কেউ কিছুতেই ভয় পাই না। তাই যা-যা ঠিক মনে করি, তাই-তাই বলি।

রাজকন্যা: আমিও তাই। ভয় পাই না কিছুতেই। যা ঠিক মনে হয়, তা-ই করি।

বিপ্লবী: কিন্তু তুমি নিজে তো রাজবাড়ির মেয়ে, খোদ রাজকন্যা। রাজনির্দেশের বিরুদ্ধে যারা, তাদের সঙ্গে কথা বলা কি তোমার উচিত?

রাজকন্যা: সেটা কে ঠিক করে দেবে, আমি ছাড়া? আমার কাছে উচিত। একশোবার উচিত। কেননা রাজা যে-নির্দেশ দিয়েছেন, তাকেই আমি অনুচিত বলে মনে করি।

বিপ্লবী: তুমি ভেবেচিন্তে বলছ কথাগুলো, রাজকন্যা?

রাজকন্যা: যারা শান্তিপ্রিয়, তাদের যুদ্ধে নামানো যে অন্যায়, আর যারা এতদিন এ-রাজ্যের বাসিন্দা তাদের পরিচয় জানতে চাওয়া যে আরও বড় অন্যায়, এটা বোঝার জন্য ভাবনাচিন্তা লাগে না যে বিপ্লবী!

বিপ্লবী: তুমি তো আমাদের দলের একজনের মতো কথা বলছ রাজকন্যা!

রাজকন্যা: নেবে আমাকে? তোমাদের দলে?

বিপ্লবী: তুমি তো রাজকন্যা। তুমি কী করে আমাদের দলের হবে?

রাজকন্যা: আশ্চর্য! অনেক, অনেক বছর আগে এক বন্ধু আমাকে ঠিক এই কথা বলেছিল। আমি তখন তার কথা মেনে নিয়েছিলাম। কিন্তু আজ যদি তোমার কথা না মানি? তবে?

বিপ্লবী: তোমার এই সমর্থনই আমাদের পক্ষে অনেকখানি। কিন্তু তুমি খোদ রাজপ্রাসাদের বাসিন্দা। রাজামশাই জানতে পারলে...

রাজকন্যা: আমার কিছু আসে যায় না। আজ না হোক কাল মানুষ পথে নামবে। তোমাদের পাশে। তখন আমি উঁচু মিনারের চোরা জানলায় বসে সেই দৃশ্য দেখতে পারব না। আমিও পথে নামব। তাতে যা হওয়ার হবে। আমি ভয় করি না।

বিপ্লবী: তোমার সাহস দেখে আমি অবাক হয়ে যাচ্ছি। আবার ভালও লাগছে। একটা কথা মনে রেখো। একবার আমাদের দলে নাম লেখালে কিন্তু আর ফেরার পথ থাকবে না।

রাজকন্যা: কে বলতে পারে, এটাই আমার ফেরার পথ কিনা? নেবে আমায়, বলো?

বিপ্লবী কুঠার ফেলে দিয়ে তার হাতটা বাড়িয়েছিল, রাজকন্যাও তার মুঠোয় আঁকড়ে ধরেছিল সেই হাত। যখন নদীর ঢেউয়ের শব্দকে ছাপিয়ে ছেলেমেয়ের দল হাতে তালি বাজিয়ে গেয়ে উঠেছিল এই গান...

কাদের তুমি চাও পরিচয়, রাজা!

ওহো, কাদের তুমি ফন্দি এঁটে চাইছ দিতে সাজা!

এ-দেশ যারা ভরল ধানে, মাটির জন্য মাতল গানে

তাদের তুমি তাড়িয়ে বলো যা যা!

কাদের তুমি চাও পরিচয়, রাজা!

ওহো, কাদের তুমি ফন্দি এঁটে চাইছ দিতে সাজা!

কেউ যাবে না যুদ্ধে জেনো, কেউ হবে না শেষ

যেইখানে যে যখন থাকে সেটাই তো তার দেশ

আহা সেটাই তো তার দেশ

ধরবে না কেউ অস্ত্র তোমার, যতই করো জোর

এ-পথ সে-পথ নামবে মানুষ, তুলবে জবর শোর

আহা তুলবে জবর শোর

তাদের হাতের রক্ত জেনো জলের চেয়েও তাজা...

কাদের তুমি চাও পরিচয়, রাজা!

ওহো, কাদের তুমি ফন্দি এঁটে চাইছ দিতে সাজা!

আয় রে তোরা হাত চেপে ধর, ছাড়িস না কেউ পাশ

বুক ঠুকে সব দে বলে আজ, সক্কলে যা চাস

আহা সক্কলে যা চাস

গান বেঁধে নে যেমন নিশান, মিছিল নিয়ে চল

দেখুক রাজা কোন পথে যায় মানুষ-নদীর জল

আহা মানুষ-নদীর জল

সুখের কথায় ভুলিস না আর, বুকের পাঁজর বাজা...

কাদের তুমি চাও পরিচয়, রাজা!

ওহো, কাদের তুমি ফন্দি এঁটে চাইছ দিতে সাজা!

এ-গান শেষ হওয়ামাত্র সকলের হইহইয়ে জলের তোড়ের মতোই মিশে গিয়েছিল রাজকন্যারও উল্লাস, আর তারা নতুন সদস্যকে পেয়ে সক্কলে হয়ে উঠছিল খুশিতে দিশেহারা, তাই কারওই চোখে পড়েনি, কিছুদূরের এক টিলার উপরে কখন যেন এসে দাঁড়িয়েছে এক পাল কালো ঘোড়া, যাদের পিঠে সওয়ার রাজপেয়াদারা সটান তাকিয়ে আছে এইদিকেই।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%