কলকাতার রহস্য-ঠিকানা

উপমন্যু রায়

আমি উত্তর কলকাতার ছেলে। জন্মও উত্তর কলকাতায়। তাই উত্তর-সহ সম্পূর্ণ কলকাতাটাকে আমি হৃদয় দিয়ে অনুভব করতে পারি। কলকাতার ভালো-মন্দ আমাকে সমানভাবে প্রভাবিত করে।

বেশ মনে পড়ে। তখন আমি খুবই ছোটো। বাংলায় বাম জমানার প্রথম পর্ব আটের দশকের প্রথম ভাগ সেটা। এখনকার মতো এত ঘিঞ্জি ছিল না কলকাতা। যদিও কবি-সাহিত্যিকেরা তাঁদের এই হৃদয়ের শহরকে চিরদিনই ‘কল্লোলিনী’ বলে উল্লেখ করে থাকেন। তবু সেই সময় কলকাতা শহরের পথে-ঘাটে চলতে গিয়ে মানুষে মানুষে এত ধাক্কাধাক্কি হত না।

আমার বাবা ব্যবসায়ী মানুষ ছিলেন। তাই সরকারি চাকুরেদের মতো বিকেলে বাড়ি ফিরতেন না। ফিরতে রাত হত। গরম কালে প্রায় দশটা আর শীতকালে ন-টা। শীতের সময় রাত সাতটা বাজতে-না-বাজতেই রাস্তাঘাট ফাঁকা হয়ে যেত। পাড়ায় গোটা কয়েক ছেলে ব্যাডমিন্টন খেলত। কখনো বাড়ির প্রধান দরজার সামনে গিয়ে আবার কখনো জানালা দিয়ে উঁকি মেরে ব্যাডমিন্টন খেলা দেখতাম।

আর বাবা যখন ন-টা নাগাদ ফিরতেন, কলকাতা প্রায় শুনশান হয়ে যেত। দশটা, সাড়ে দশটা বাজতে-না-বাজতেই ঘুমের কোলে ঢলে পড়ত বাড়িগুলি। তখন আমহার্স্ট স্ট্রিট প্রায় অন্ধ রাস্তা ছিল। দু-ধারের বড়ো বাড়িগুলি ফুটপাথে গাড়িবারান্দা নিয়ে ভূতের মতো দাঁড়িয়ে থাকত। সারা দিনে একটা কী দুটো বাস যেত। সেই আমহার্স্ট স্ট্রিটকে দেখে খুব রহস্যময় মনে হত তখন।

উত্তর কলকাতায় তখনও অধিকাংশ বাড়িই ছিল বাঙালিদের। পাড়ায় পাড়ায় রবীন্দ্র জয়ন্তী, নেতাজি জয়ন্তী, স্বাধীনতা দিবস, প্রজাতন্ত্র দিবস হত। কখনো রবীন্দ্রনাথ, কখনো নজরুলের গানে-কবিতায় জমে যেত ওই বিশেষ দিনগুলির সন্ধ্যা। রাস্তাঘাটেও বাঙালির ছড়াছড়ি।

রবিবার দিনটারও তখন বিশেষত্ব ছিল। সকাল থেকে দুপুরে পাড়ার রকে আড্ডা জমাত ছেলেছোকড়া থেকে মাঝবয়সি মানুষ। বিকেল থেকেই ফাঁকা হয়ে যেত শহরটা। তখন পুরো কলকাতাটাকেই কেমন যেন রহস্যনগরী বলে মনে হত। ব্রিটিশ আমলে পাওয়া ‘প্রাসাদ নগরী’ উপমা আর গত শতকের ছয় ও সাতের দশকে রাজনৈতিক কারণে পাওয়া ‘মিছিল নগরী’র ভার বহন করেও কলকাতার আলাদা একটা বৈশিষ্ট্য ছিল তখন।

কলকাতার বিভিন্ন অলিগলিতে ছড়িয়ে থাকা অট্টালিকাগুলিকে তখন যেমন রহস্যময় মনে হত, তেমনই সেগুলিকে নিয়ে শোনা যেত নানা ভৌতিক কাহিনি। অনেকে গল্প করে সেসব কথা বলতেনও। সেসব কথা শুনে একটা রোমাঞ্চ হত শরীর ও মনে। আর লোডশেডিঙের সময় বাস্তবিকই শহরটাকে ভূতুড়ে মনে হত। ছোটোবেলায় তো রীতিমতো ভয় পেতাম তখন।

এ ব্যাপারে রাজশেখর বসুর একটা কথা মনে পড়ছে। তিনি বলেছিলেন, ‘এই কলকাতা শহরে রাস্তায় যারা চলাফেরা করে, —কেউ কেরানি, কেউ দোকানি, কেউ মজুর, আর কেউ বা অন্য কিছু। তা মোটেই নয়। তাদের মধ্যে সর্বদাই দু-চারটে ভূত পাওয়া যায়। তবে চিনতে পারা দুষ্কর।’ তাঁর এই কথাটা সত্যিই ভাবার মতোই।

আর এখন কলকাতা কী অস্বাভাবিক বদলে গেছে! রাত একটার সময়ও এই শহর ঘুমোয় না। রাস্তায় গাড়ি চলে। লোকজনও যাতায়াত করে। আর হঠাৎ করেই উত্তর কলকাতায় বাঙালি একেবারেই কমে গিয়েছে।

এখন কসমোপলিটান শহর হয়েছে এই কলকাতা। নানা ভাষা-সংস্কৃতির শহর হয়ে গিয়েছে এই শহর। বাংলা কথা শোনা যায় কম। তার বদলে জায়গা করে নিয়েছে হিন্দি। আর সেইসঙ্গে কলকাতা থেকে উধাও হয়ে গিয়েছে যেন আগের সেই রহস্য-রোমাঞ্চের অনুভূতিও।

কবি স্বপ্ন দেখেছিলেন, কলকাতা নাকি একদিন কল্লোলিনী তিলোত্তমা হবে। আমার ঠিক উলটো মনে হয়। মনে হয় কলকাতা একদিন কল্লোলিনী নরককুন্ড হবে। কল্লোল যেমন বেড়েছে, তেমনই বেড়েছে শহরজুড়ে নোংরা-আবর্জনা। পুরপ্রশাসন যদিও তাদের কাজ নিয়ম মেনে করে, কিন্তু এত লোকের বদভ্যাস না বদলালে শহরটা সুন্দর হবে কী করে?

এখানকার বাড়িগুলিও ভেঙেচুরে এখন মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে বহুতল। সেখানে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর অসংখ্য পরিবার বাস করে। কলকাতার মানসিকতা থেকে তাই হারিয়ে গিয়েছে চিরন্তন বাঙালিয়ানা। সেইসঙ্গে শহরের রহস্য-রোমাঞ্চেরও যেন বিসর্জন ঘটে গিয়েছে একটু অসতর্কভাবেই।

এই কলকাতায় আর আগের মতো ভৌতিক কাহিনি তেমন-একটা শোনা যায় না। কে জানে এত মানুষভূত দেখেই হয়তো অশরীরী না-মানুষ লুকিয়ে পড়েছে অত্যন্ত গোপন কোনো জায়গায়!

তবু কিছু বাড়ি বা স্থান এখনও আছে, যেগুলি নিয়ে আগে অনেকের কাছেই অনেক রহস্যকথা শোনা যেত। প্রভাবশালী প্রোমোটারদের শ্যেনদৃষ্টি উপেক্ষা করে সেসব বাড়ির যে-কয়েকটি এখনও বেঁচে রয়েছে, সেই বাড়ি বা স্থানগুলি নিয়ে নতুন করে আজ তেমন কিছু-একটা শোনা যায় না সত্য, তবু পুরোনো রহস্যকথাগুলির মৃত্যু হয়নি।

সাউথ পার্ক স্ট্রিট কবরস্থান

কলকাতার সাহেব পাড়া হিসেবে পরিচিত পার্ক স্ট্রিট। যদিও এই রাস্তার পুরোনো গরিমা এখন অনেকটাই ফিকে হয়ে গিয়েছে, তবু এখনও এই পাড়ার একটা আভিজাত্য আছে। ব্রিটিশ আমলে এই পার্ক স্ট্রিটে বহু অভিজাত ব্রিটিশ বাস করতেন। অবশ্য এই রাস্তার আশপাশের গলিগুলিতে অনেক সাধারণ সাহেব থেকে অসংখ্য অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানদেরও বাস ছিল।

এই পার্ক স্ট্রিট অঞ্চলে অসংখ্য ভৌতিক ঘটনার কথা শোনা যায় সাহেবি আমল থেকেই। আগে এই রাস্তার নাম ছিল ব্যুরিং গ্রাউণ্ড রোড। অর্থাৎ এটা ছিল মূলত কবরস্থানের রাস্তা।

আগে পার্ক স্ট্রিট অঞ্চলে অনেক কবরস্থান ছিল। এখনও আছে একটি কবরস্থান। নাম ‘সাউথ পার্ক স্ট্রিট কবরস্থান’। এই কবরস্থানটি তৈরি হয়েছিল ১৭৬৭ সালে। এখানে মূলত যুদ্ধে হত ব্রিটিশ সৈনিকদের কবর দেওয়া হত। তাই এই জায়গাটিকে সাহেবি কবরস্থান বলা হত।

তবে শুধু নিহত ব্রিটিশ সৈনিকদেরই এখানে কবর দেওয়া হত তা নয়। বহু বিখ্যাত সাহেবকেও এখানে কবর দেওয়া হয়েছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন এলিজাবেথ বারওয়েল, লুই হেনরি ভিভিয়ান ডিরোজিও, ইলাইজা ইম্পে, উইলিয়াম জোন্স, চার্লস হিন্দু স্টুয়ার্ট, ইংরেজি সাহিত্যিক চার্লস ডিকেন্সের ছেলে ওয়াল্টার ল্যাণ্ডর ডিকেন্স প্রমুখ।

এখানকার সবচেয়ে প্রাচীন কবরটি হল মিসেস এস পিয়ারসনের ১৭৬৮ সালের কবর। সাউথ পার্ক স্ট্রিট কবরস্থানটি স্থাপিত হয় ১৭৬৭ সালে। তবে এই কবরস্থান বন্ধ হয়ে যায় ১৮৩০ সালে। এখানে মোট ষোলো-শো কবর রয়েছে।

স্বভাবতই এই কবরস্থান সম্পর্কে এ দেশের মানুষের মুখে নানা কথা শোনা যেতে থাকে। যেমন, রাত হলেই নাকি কফিন থেকে জেগে ওঠে বহু পুরোনো আত্মা। আবার অনেকেই নাকি গভীর রাতে পার্ক স্ট্রিটে অনেক রহস্যময় সাহেবকে ঘোরাফেরা করতে দেখেছেন। এখনও নাকি কেউ কেউ দেখেন!

বিশেষ করে শেষ রাতে ওই সাউথ পার্ক স্ট্রিট কবরস্থানে শোনা যায় বহু সাহেব এখনও পায়চারি করেন। শোনা কথা থাকুক। এবার বলা যাক একটি ঘটনার কথা। ওই কবরস্থানেই শুটিং হয়েছিল সন্দীপ রায়ের ‘গোরস্থানে সাবধান’ সিনেমার।

‘গোরস্থানে সাবধান’ হল সত্যজিৎ রায়ের লেখা ফেলুদা সিরিজের একটি কাহিনি। শুটিংয়ের জন্য ওই কবরস্থানের দরজা তখন একবার খোলা হয়েছিল। কিন্তু শুটিং করতে গিয়ে মারাত্মক বিপত্তি ঘটে। অদ্ভুত সব শব্দ শোনা আর অস্পষ্ট কিছু ছায়া দেখা গিয়েছিল নাকি সেখানে। ওই ঘটনায় শুটিং মাথায় উঠেছিল সিনেমাটির কলাকুশলীদের।

ওই ঘটনা মানুষের মনে বেশ প্রভাব ফেলে। আগে থেকেই ওই কবরস্থানে মানুষ কম যেত। সিনেমার ঘটনা প্রকাশ্যে আসতেই সেখানে আরও কমে যায় সাধারণ মানুষের যাতায়াত। অনেকেই মনে করেন, ওই কবরস্থানে নাকি অশরীরীদের প্রকট উপস্থিতি রয়েছে।

এবার বলা যাক আর একটি কবরস্থানের কথা। এই কবরস্থানটিও সাউথ পার্ক স্ট্রিট সিমেট্রির কাছাকাছিই। সেটি রয়েছে লোয়ার সার্কুলার রোডে। মানে আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু রোডের ওপর। এই কবরস্থানটিকেই পার্ক সার্কাসের বিশাল কবরস্থান বলা হয়ে থাকে।

কলকাতায় বাইরে থেকে যেসব পর্যটক ঘুরতে আসেন, বিশেষ করে খ্রিস্টান পর্যটকরা এই কবরস্থানে এক বার হলেও বেড়াতে যান। হয়তো গাইডদের সৌজন্যেই তাঁদের সেই কবরস্থানে ভ্রমণ হয়ে থাকে।

লোয়ার সার্কুলার রোডের কবরস্থানটি সাধারণ বিশপদের কবরস্থান নামেও পরিচিত। এই কবরস্থানটি রয়েছে পার্ক স্ট্রিট এবং আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু রোডের সংযোগস্থলে।

পার্ক স্ট্রিট অবশ্য এখন মাদার টেরেজা সরণি নামে পরিচিত। আর আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু রোডের আগে নাম ছিল লোয়ার সার্কুলার রোড। কবরস্থানের প্রবেশপথটি রয়েছে আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু রোড বা আগের লোয়ার সার্কুলার রোডে। তাই কবরস্থানটিকে লোয়ার সার্কুলার সিমেট্রি বলা হয়।

লোয়ার সার্কুলার রোডের কবরস্থানটি তৈরি হয়েছিল ১৮৪০ সালে। এখনও এই কবরস্থানটি ব্যবহৃত হয়। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মী-সহ মোট বারো হাজার মৃত মানুষের কবর রয়েছে এখানে।

বিখ্যাত বহু মানুষের কবরও এখানে রয়েছে। যেমন চার্লস ফ্রিয়ার অ্যান্ড্রিউজ (তিনি মারা যান ১৯৪০ সালে), স্যার উইলিয়াম কেসমেন্ট (তিনি ছিলেন ব্রিটিশ সেনার মেজর জেনারেল, তৎকালীন সুপ্রিম কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়ার সদস্য, তিনি মারা যান ১৮৪৪ সালের ১৬ এপ্রিল), লেসলি ক্লডিয়াস (তিনি মারা যান ২০১২ সালে), হেনরি হোভার লক, জুলস হেনরি জিন শ্যমবার্গ, হেনরি হোয়াইটলক টোরেনস প্রমুখ।

এ ছাড়াও এখানে রয়েছে ভাগ্যবিড়ম্বিত বাঙালি কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তর কবর। ১৮৭৩ সালে এই বাঙালি কবির মৃত্যু হয়।

এখানকারই একটি কবরে নাকি শায়িত রয়েছেন স্যার উইলিয়াম হে ম্যাকনাটেন। শোনা যায়, প্রথম ইঙ্গ-আফগান যুদ্ধে নির্মমভাবে খুন করা হয় স্যার উইলিয়ামকে। প্রবল আক্রোশে শত্রুপক্ষ তাঁর দেহটি ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছিল। উইলিয়ামের স্ত্রী সেই দেহই এনে কবর দেন এখানে।

এরপরই শোনা যায় নতুন এক কাহিনি। স্যার উইলিয়ামের কবরটি নাকি জীবন্ত! এই কবরের কাছাকাছি গেলে নাকি স্যার উইলিয়ামের আত্মা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। তার প্রমাণ পাওয়া যায় কবরসংলগ্ন একটি বড়ো গাছে।

সেই গাছটি নাকি পরম মমতায় স্যার উইলিয়ামের কবরে ছায়া দেয়। কেউ কাছে গেলেই গাছটি নাকি তখন মারাত্মকভাবে কাঁপতে শুরু করে। আর তা হয় স্যার উইলিয়ামের ক্রুদ্ধ আত্মার আস্ফালনেই! এখনও নাকি একই ঘটনা ঘটে ওই কবরে।

এই কবরস্থান ও পর্যটকদের নিয়েও একটি কাহিনি শোনা যায়। এক পর্যটক নাকি এখানে গিয়ে অনেক ছবি তুলেছিলেন। ছবি তোলার সময় হঠাৎ ক্যামেরার সামনে একটি সাদা পোশাকের অস্পষ্ট মহিলাকে দেখতে পান। দেখে নিজের স্নায়ুর চাপ তিনি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেননি। অজ্ঞান হয়ে পড়ে যান।

এমন কবরস্থানের মতো বড়ো কবরস্থান এই শহরে আর নেই। শোনা যায়, এই অঞ্চলের বাসিন্দারা ভোরে বা সন্ধ্যার পর তাঁদের বাড়ির জানালা নাকি বন্ধ করে রাখেন। অনেকেই বলেছেন, এই কবরস্থানে গাছপালা অনেক বেশি। কলকাতার মতো শহরে এমনটা সাধারণত দেখা যায় না।

তাঁদের বক্তব্য, স্থানীয় মানুষের মধ্যে অনেকেই নাকি এখানকার অশরীরী অস্তিত্ব বহু বার অনুভব করেছেন। তাই প্রকাশ্যে কিছু না বললেও তাঁরা সেই ভীতি কাটাতে বেশ কিছু ধর্মীয় নিয়ম মেনে চলেন।

রাইটার্স বিল্ডিংস

শোনা যায় আমাদের রাইটার্স বিল্ডিংসও ভৌতিক উপদ্রব থেকে মুক্ত নয়। দিনের বেলায় সরকারি কাজের দফতর হিসেবে ব্যস্ত থাকলেও রাতে নাকি এখানকার শূন্য লবিতে নানারকম ঘটনা ঘটে। সন্ধ্যার পর এখনও কেউ একা এই বাড়িতে থাকার কথা ভাবতে পারেন না।

যাঁরা এখানে সাহস করে রাত কাটিয়েছেন, মাঝরাতে তাঁদের ঘুম হঠাৎ ভেঙে যাওয়ার কথা তাঁদের অনেকেই জানিয়েছেন। সেইসময় তাঁরা আচমকা কারও হাসি, কখনো কারও কান্না, আবার কখনো কাউকে চিৎকার করতে শুনেছেন। নৈশ প্রহরীরাও এই বিল্ডিংসকে বিশেষ পছন্দ করেন না। তাঁরা এই অট্টালিকার পাঁচ নম্বর ব্লকটিকে অশরীরীদের লীলাক্ষেত্র বলে মনে করেন।

এখনকার মহাকরণ কিন্তু রাইটার্স বিল্ডিংসের আদিবাড়ি নয়। যদিও আদিবাড়ির অস্তিত্ব আজ বোঝা কঠিন। শোনা যায়, ১৬৯৫ সালের ২৫ জুন ভয়ংকর ঝড়ে এই আদিবাড়ি ধ্বংস হয়ে যায়। ১৭০৬ সালে পুরোনো বাড়ি ভেঙে নতুন এক-তলা বাড়ি তৈরি হয়। সেই বাড়িই রাইটার্স বিল্ডিংসের দ্বিতীয় বাড়ি। ১৭৭৭ সালে নতুন করে এই বিল্ডিংসের নকশা তৈরি করেন থমাস লিওন।

বর্তমান রাইটার্স বিল্ডিংসের নির্মাণ শুরু হয় ১৮২০-২১ সাল নাগাদ। সম্পূর্ণ গথিক স্থাপত্যে নির্মিত হয় বাড়িটি। এই বিল্ডিংসের বারান্দার দৈর্ঘ্য ১২৮ ফুট। এই রাইটার্স বিল্ডিংসেরই বর্তমান নাম আমাদের সকলেরই পরিচিত মহাকরণ। যা-ই হোক, ব্রিটিশ আমলে রাইটার্স বিল্ডিংসের ব্যাপ্তি ছিল জিপিও থেকে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের এলাকা পর্যন্ত।

রাইটার্স বিল্ডিংসের মধ্যে ছিল অনেকগুলি বাড়ি। চার-তলা বাড়ি ছিল ন-টি এবং ছ-তলা বাড়ির সংখ্যা চারটি। মোট ঘরের সংখ্যা ১,৪২৪টি। পাশাপাশি হলঘর ৪৩টি। বাথরুম ছিল ১৬০টি। এখন অবশ্য বাথরুমের সংখ্যা অনেক বেশি। এই বিল্ডিংসের প্রধান বাড়িটি চার-তলা।

ব্রিটিশ জমানা থেকেই এই রাইটার্স বিল্ডিংস নিয়ে অনেক ভৌতিক কাহিনি শোনা যেত। এখানকার নৈশপ্রহরীরা নাকি ছিল সেই সব ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী। এখানে রাত গভীর হলে কখনো শোনা যেত হাড়-হিম-করা রহস্যময় হাসি, অথবা ক্রুদ্ধ মানুষের চিৎকার।

এই বিল্ডিংসেই রাতের অন্ধকারে নাকি দেখা যায় অচেনা এক সশস্ত্র রক্ষীকে চলাফেরা করতে। হঠাৎ হঠাৎ দোতলার সিঁড়িতে কারা যেন উঠে আসে, আবার নেমেও যায়। শোনা গিয়েছে অশরীরী ফিসফিসানি। রাতে কাদের যেন কর্মব্যস্ত যাওয়া-আসার বহু প্রমাণ পেয়েছেন অনেক নৈশপ্রহরীই।

এখনও নাকি গভীর রাতে রাইটার্স বিল্ডিংসে টাইপ করার শব্দ শুনতে পাওয়া যায়। তখন যদি কেউ সাহস করে খেয়াল করেন তাহলে বুঝতে পারবেন, রাতের ওই সময়েও রাইটার্স বিল্ডিংস যেন অসম্ভব ব্যস্ত রয়েছে। কারা যেন মনোযোগ দিয়ে কাজ করে চলেছেন।

ইতিহাস বলছে, রাইটার্স বিল্ডিংস তৈরি হওয়ার আগে সেখানে ছিল ভাং আর কলা গাছের জঙ্গল। তা ছাড়া বেশ কয়েক জন ব্রিটিশকে নাকি এখানেই কবর দেওয়া হয়। আরও একটি তথ্য পাওয়া গিয়েছে লর্ড ভ্যালেন্টিনের লেখায়। দিল্লি থেকে যেসব নব্য রাইটার কলকাতায় আসত, অবসরসময় তারা পরস্পরের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় মেতে থাকত।

কখনো তাদের মধ্যে চলত টানা গাড়ির খেলা, আবার কখনো চলত ডুয়েল। তাই নিজেদের মধ্যে ঝামেলা, মারামারি, খুনোখুনি লেগেই থাকত তাদের। তাদের অতৃপ্ত আত্মারাও নাকি রাইটার্সের আনাচে-কানাচে এখনও ঘুরে বেড়ায়।

১৯৩০ সালে এই রাইটার্স বিল্ডিংস দখল করার জন্য অভিযান চালিয়েছিলেন বিনয় বসু, বাদল গুপ্ত ও দীনেশ গুপ্ত। তাঁরা গুলি করে খুন করেছিলেন ব্রিটিশ কর্নেল সিম্পসনকে। তিন বিদ্রোহীর গুলিতে আহত হন টোয়াইনাম, প্রেন্টিস এবং নেলসন।

যদিও ব্রিটিশ পুলিশের সঙ্গে লড়াইয়ে তাঁরা শেষপর্যন্ত জয়ী হতে পারেননি। তবে পুলিশের কাছে ধরাও দেননি। বাদল পটাশিয়াম সায়ানাইড খেয়ে আত্মহত্যা করেন। বিনয় এবং দীনেশ নিজেদের নিজেরাই গুলি করেন। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে বিনয় সেখানে মারা যান। পরে দীনেশের ফাঁসি হয়।

আগে সরকারি কর্মীদের থাকার ব্যবস্থা ছিল সেখানে। কিন্তু পরবর্তীকালে সরকারি কর্মীদের সেখান থেকে সরিয়ে অন্যত্র নিয়ে যাওয়া হয়। তারপর বহু বছর ধরে নাকি রাইটার্স বিল্ডিংসের বহু ঘর বন্ধ ছিল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর রাইটার্স বিল্ডিংস সংস্কারের কাজ শুরু হয়। তখন মহাকরণ থেকে সরকারি দফতর সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় হাওড়ার নবান্নে।

সাতের দশকে সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের মুখ্যমন্ত্রিত্বের সময়কালে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী ছিলেন সুব্রত মুখোপাধ্যায়। তখন জরুরি অবস্থার সময়। সাংবাদিকদের সমস্ত কপি দেখতে হত তাঁকে। সেই সময় তাঁকে এই বিল্ডিংসে বহু ভৌতিক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল বলে তিনি নিজেই জানিয়েছেন।

ভূতের ভয়ে এখানে কখনো একা কাজ করতে চাইতেন না সুব্রতবাবু। রাতে রাইটার্স বিল্ডিংস ফাঁকা হয়ে গেলে তিনি সকলকে একসঙ্গে নিয়ে কাজ করতেন। একবার এখানে তিনি নিজের চোখে এক গার্ড ভূতকে দেখেন। তার পরই রাইটার্স নিয়ে ভীতি জন্মায় তাঁর মনে। সেই ভীতি তাঁর আজও কাটেনি।

এ ছাড়া হলওয়েল সাহেব রটিয়েছিলেন, সিরাজ-উদদৌলার নির্দেশে তাঁর সৈন্যরা নাকি এই অঞ্চলেই চালিয়েছিল ‘অন্ধকূপ হত্যা’। তাতে এক-শো তেইশ জন ব্রিটিশ সেনা নাকি খুন হয়। তবে হলওয়েল সাহেবের ওই বক্তব্য সঠিক নয় বলে অনেক ইতিহাসবিদই দাবি করেছেন।

অনেকেই বলেন, তিনশো বছরের পুরোনো এই অঞ্চলের রাইটার্স বিল্ডিংস, জিপিও, রিজার্ভ ব্যাঙ্ক হানাবাড়ি ছাড়া আর কিছু নয়। এইসব বাড়িতে অশরীরী অস্তিত্বের প্রমাণ পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন অনেকেই। দেখেছেন অনেক অস্বাভাবিক তথা ব্যাখ্যাতীত ঘটনা।

লালবাজার

যেকোনো বাঙালির কাছেই ‘লালবাজার’ নামটি অতিপরিচিত। আসলে এটি বউবাজার থেকে বিবাদী বাগের উত্তর-পূর্ব কোণ পর্যন্ত একটি অঞ্চলের নাম। আবার, কলকাতা পুলিশের প্রধান কার্যালয় এই লালবাজারেই। এই কার্যালয়ে বাড়িগুলির কাঠামোও ব্রিটিশ আমলেরই।

কিন্তু কথা হল, এই জায়গাটিকেও অনেকে রহস্যময় ও ভৌতিক বলে মনে করেন। আর যাঁরা এমন মনে করেন, তাঁদের মধ্যে খোদ পুলিশ কর্তাদের মধ্যেও বেশ কয়েক জন রয়েছেন।

ইতিহাস বলছে, এই লালবাজারের সেন্ট্রাল লক-আপেই রহস্যমৃত্যু হয়েছিল চারু মজুমদারের। নকশাল আন্দোলনের প্রাণপুরুষ ছিলেন এই অসীম সাহসী মানুষটি। তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭২ সালের ২৮ জুলাই এই লক-আপে চারু মজুমদার মারা যান। অনেকেই মনে করেন, তাঁর মৃত্যু স্বাভাবিক ছিল না।

তাই মৃত্যুর পর চারু মজুমদারের অশরীরী আত্মা নাকি সেই জায়গা ছেড়ে যায়নি। সেখানে সেই আত্মাকে অনেকেই দেখেছেন বলে দাবি করেন। এখনও নাকি গভীর রাতে এখানকার সেন্ট্রাল লক-আপের আশেপাশে এই নকশাল নেতাকে ঘোরাফেরা করতে দেখা যায়। শুনলে চমকে উঠতে হয়।

আমরা জানি, কমিউনিস্টরা কখনো কল্পনার রাজ্যে বাস করেন না। তাঁরা চরম বাস্তববাদী হয়ে থাকেন। তাই যে কমিউনিস্টরা ঈশ্বর বা অশরীরী অস্তিত্বে বিশ্বাসী হন না, যাঁরা শুধুই পার্থিববাদী হন, তাঁদেরই এক বিখ্যাত নেতার অশরীরী আত্মা ঘুরে বেড়াচ্ছে কলকাতা পুলিশের প্রধান কার্যালয়ে!

এর প্রভাবও পড়েছে সাধারণ পুলিশকর্মীদের ওপর। তাই রাত হলে বেশিরভাগ পুলিশকর্মীই নাকি বাধ্য না-হলে সেন্ট্রাল লক-আপের দিকে যান না। রাত গভীর হলেই চারু মজুমদারের ছায়ামূর্তিকে সেন্ট্রাল লক-আপে দেখা যায়। ঠিক সেইরকম চোখ, সেইরকম হাঁটাচলা আর ব্যক্তিত্ব!

তবে বার বার তাঁকে দেখা যায় না। কেউ যদি এক বার তাঁকে দেখতে পান, তো পরমুহূর্তে তাঁকে অন্ধকারে বাতাসে মিলিয়ে যেতে দেখেন। দ্বিতীয় বার আর তাঁকে দেখতে পান না। কেন যে এমন হয়, তার ব্যাখ্যা কেউ দিতে পারেননি। অনেকের ধারণা, চারুবাবু হয়তো এমনই একরোখা ছিলেন!

আর একটি ভয়ংকর কথা শোনা যায়। সেন্ট্রাল লক-আপ থেকেই কার যেন আর্তচিৎকার শোনা যায়। অনেকে মনে করেন, ওই চিৎকার নাকি চারু মজুমদারেরই। তাঁর ওপর ওই লক-আপে নাকি নিষ্ঠুর অত্যাচার করা হত। সেই স্মৃতিই যেন ফিরিয়ে দেয় নকশাল নেতার অশরীরী আত্মা!

এই বিষয়টি প্রথম প্রকাশ্যে আনেন এক সমাজবাদী নেতা। তিনিও সাতের দশকে কিছুদিন বন্দি হয়ে লালবাজারে ছিলেন। বিষয়টি তাঁকে অত্যন্ত বিস্মিত করেছিল। তবে তখন যা ঘটেছে, তা তিনি অস্বীকারই-বা করবেন কী করে?

১৯৭৫ সালে জরুরি অবস্থার সময় পশ্চিমবাংলায় সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের জমানায় তাঁকে লালবাজারের সেন্ট্রাল লক-আপে বন্দি করে রাখা হয়। সারাদিন নানা মানুষের আনাগোনায় সরগরম থাকত এই লক-আপ চত্বরটি। কিন্তু রাত হলেই সব শুনশান হয়ে যেত।

এমনকী কোনো পুলিশকর্মীকে ডেকেও সেখানে পাওয়া যেত না। ব্যাপারটা তিনি কয়েক দিন পর বুঝতে পারেন। আসলে ভয়েই পুলিশকর্মীরা সেন্ট্রাল লক-আপের দিকে রাতে যেতে চাইতেন না।

তাঁর আগে থেকে যাঁরা সেখানে বন্দি ছিলেন, তিনি সেখানে যাওয়ার পর তাঁদের মধ্যে যাঁদের সঙ্গে তাঁর আলাপ হয়েছে, তাঁদের মুখেই তিনি শোনেন চারু মজুমদারের কথা। অনেকে তো চাঁছাছোলা ভাষায় বলেই দিতেন, সেন্ট্রাল লক-আপে নাকি চারু মজুমদারের ভূত আছে!

নিমতলা শ্মশানঘাট

উত্তর কলকাতার শ্মশানঘাট অত্যন্ত প্রাচীন। তবে শ্মশানঘাট হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে অনেক পরে। তথ্য বলছে, ১৮২৭ সাল থেকে এই ঘাট কার্যকর হতে শুরু করে। তারপর যত সময় গিয়েছে, এই অঞ্চলে মানুষের বসবাসও বেড়েছে। ততই বেড়েছে এই ঘাটের ব্যস্ততাও।

এই নিমতলা মহাশ্মশানেই দাহ হয়েছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের। তখন অবশ্য এই ঘাটকে বলা হত উত্তর কলকাতা শ্মশানঘাট। রবীন্দ্রনাথের শেষকৃত্যের স্থলটিকে বঁাধিয়ে রাখা হয়েছে। গড়া হয়েছে একটি স্মারক। ২০১০ সালে সেই স্থানটি সাজিয়ে-গুছিয়ে সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। এ ছাড়া আরও এক বিখ্যাত সাহিত্যিকেরও মৃতদেহ এখানে দাহ করা হয়। তিনি হলেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়।

২০১০ সালে এই শ্মশানঘাটের আধুনিকীকরণের জন্য কেন্দ্রীয় সরকার চোদ্দো কোটি টাকা বরাদ্দ করে। রাজ্য সরকারও এই ঘাটের উন্নয়নকল্পে কিছু পদক্ষেপ করে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার এই ঘাটকে আলো দিয়ে সাজিয়ে দেয়। উন্নত করা হয় এই ঘাটের পরিসেবাও।

এমনিতেই যেকোনো শ্মশান সম্পর্কেই সাধারণ মানুষের কাছে একটি ভীতিজনক ধারণা রয়েছে। নিমতলা ঘাট নিয়েও তেমনই অনেক কাহিনি আছে। বিশেষ করে আগে যখন এই জায়গাটি এত আলোকোজ্জ্বল ছিল না, তখন এই মহাশ্মশানে নাকি অনেক আধিভৌতিক বিষয় দেখা গিয়েছে।

হয়তো তাই নিমতলা ঘাটকে শুধুই শ্মশান বলা হয় না, বলা হয় মহাশ্মশান। অনেকেই মনে করেন, এই মহাশ্মশান নাকি অশরীরীদের প্রধান আশ্রয়স্থল। এ ছাড়া কালী পুজোর দিন ভারতের বিভিন্ন জায়গা থেকেই অনেক তান্ত্রিক এখানে আসেন। গভীর তন্ত্রসাধনা করেন।

তবে এখানে বহু মন্দির, বাড়ি থাকার পাশাপাশি মৃতদেহ সৎকারের জন্য সংরক্ষিত স্থান এই মহাশ্মশানের আয়তনকে সীমাবদ্ধ করে দিয়েছে। ফলে সেই ভয় ভয় পরিবেশ এখন আর নেই। আগে নিমতলা মহাশ্মশানের নাম শুনলে সকলের মানসিকতাতেই যেন একটা ঠাণ্ডা স্রোত বয়ে যেত।

শোনা যায় অঘোরি তান্ত্রিকরাও নাকি তখন এখানে আসতেন। তাঁদের কঠোর ও কঠিন নিয়ম মেনে তন্ত্রসাধনা করতেন।

স্বভাবতই অতিপ্রাকৃত শক্তির বিষয়টি এই মহাশ্মশানের সঙ্গে জড়িয়ে যায়। তাই এখানে কিছু কাহিনি প্রচলিত রয়েছে। অনেকে বলেন, মৃতদেহ থেকে পিশাচকে মাংস খুবলে খেতেও নাকি এখানে দেখা গিয়েছে। আবার, এই শ্মশানে আগে নাকি মাঝে মাঝেই শ্মশানকালীকে ভয়াবহ রূপে দেখা যেত!

কলকাতা জিপিও

কলকাতার বিবাদী বাগে জিপিও-র সুবিশাল অট্টালিকার দিকে তাকালে মুগ্ধ না-হয়ে পারা যায় না। যদিও বিভিন্ন সময়ে অট্টালিকাটির বিভিন্ন অংশের সংস্কারের কাজ হয়েছে। তবে কখনোই মূল কাঠামোর কোনো পরিবর্তন হয়নি আজও। সাদা রঙের ওই অট্টালিকা যেন কলকাতার অহংকার হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু রোডে।

কলকাতা জিপিও-র পুরো নাম জেনারেল পোস্ট অফিস, কলকাতা। পশ্চিমবাংলায় ভারতীয় ডাকঘরের প্রধান কার্যালয় এই জিপিও-ই। এর প্রকৃত অবস্থান ছিল প্রথম ফোর্ট উইলিয়ামে। ১৮৬৪ সালে এই অট্টালিকার নির্মাণকাজ শুরু হয়। শেষ হয় ১৮৬৮ সালে। বাড়িটির নকশা ও নির্মাণকাজের দায়িত্বে ছিলেন ওয়াল্টার বি গ্রিনভিল।

সরকারিভাবে জিপিও-তে ডাকঘরের কাজ শুরু হয়ে যায় ১৮৭০ সালে। আর ১৮৯৬ সালে বাড়িটির মাথায় বসানো হয় বিশাল একটি ঘড়ি। সেই সময় সাত হাজার টাকা দিয়ে ঘড়িটি কেনা হয়েছিল লণ্ডনের ‘বিগ বেন’ কোম্পানির কাছ থেকে।

এই ঘড়ি বসানো নিয়েও একটি গল্প রয়েছে। শোনা যায়, ঘড়িটি থেকে বিভিন্ন সময় বিকট শব্দে ঘণ্টা বাজত। সমস্যা দেখা দেয় রাতে। ওই অঞ্চলে তখন অনেক সাহেব-মেমের বাস ছিল। কিন্তু ঘড়ির আওয়াজে তাঁদের রাতের ঘুম নষ্ট হত। স্বভাবতই তাঁরা ওই ঘড়ি নিয়ে আপত্তি জানান। তখন ঘড়িটির আওয়াজ কমিয়ে দেওয়া হয়।

কলকাতা জিপিও-র ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে অন্ধকূপ হত্যার কথা। ১৭৫৬ সালে ব্রিটিশদের ওপর নাকি এখানেই গণহত্যা চালিয়েছিলেন তৎকালীন বাংলার নবাব সিরাজ উদদৌলা। তবে পরবর্তীকালে ভারতীয় ইতিহাসবিদরা জানিয়েছেন, ওই অন্ধকূপ হত্যার কাহিনি ছিল আসলে ব্রিটিশ সরকারের অপপ্রচার। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুও ওই হত্যার কাহিনি যে মিথ্যে, তার প্রমাণে এগিয়ে এসেছিলেন।

এই জিপিও-কে জড়িয়েও বহু ভৌতিক কাহিনি শোনা যায়। এখানে দিনরাত সবসময়ই কাজ চলে। এখন ক্যুরিয়ার সার্ভিস, ইন্টারনেট প্রভৃতি চালু হয়ে যাওয়ায় ডাকঘরের কাজ অনেকটাই হয়তো কমেছে। তবু রাতদিনের ব্যস্ততা এখনও রয়েছে এখানে।

আগে রাতে যখন এই ভবনে কাজ চলত, তখন অনেকেই নাকি অশরীরী শক্তির অস্তিত্ব টের পেয়েছেন। বিশেষ করে যাঁরা নিজেদের টেবিলে বসে গভীর রাতে চিঠিতে সিলমোহর মারতেন, তাঁরা হঠাৎই যেন অনুভব করতেন, কখনো-বা দেখতে পেতেন, একটা দীর্ঘ ছায়া যেন তাঁদের সামনে দিয়ে চলে যাচ্ছে। এই দৃশ্য নির্দিষ্ট কোনো একজন দেখেননি, দেখেছেন অনেকেই।

এ ছাড়া জিপিও-র একদিকের কোণে নাকি একটি বড়ো ঘর রয়েছে। আগে গভীর রাতে নাকি ওই ঘর থেকে নূপুরের আওয়াজ পাওয়া যেত। আর মনে হত, নূপুর পরিহিতা কেউ যেন ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছে। অনেকটা যেন নিজের মনের মানুষের সঙ্গে গোপনে দেখা করে কোনো মহিলার ফিরে যাওয়ার মতো। এখন অবশ্য তেমন আওয়াজ কেউ শোনেন না।

আসলে বিবাদী বাগ অঞ্চল চিরকালই যেন আভিজাত্যের সঙ্গে সঙ্গে একটা নৃশংসতারও অতীত বহন করে চলে। ব্রিটিশ আমল থেকেই এই অঞ্চলে কত যে খুন, জখম, রাহাজানির ঘটনা ঘটেছে, তার ইয়ত্তা নেই। অনেকের ধারণা, হয়তো তাই এই অঞ্চলে অশরীরী আতঙ্ক এত বেশি!

জিপিও-র এক মুসলিম কর্মচারীর একটি কাহিনি শোনা যায়। এক বর্ষার রাতে নাইট ডিউটি চলার সময় তিনি নাকি ঘোড়ার ডাক শুনেছিলেন। অন্য কর্মীদেরও সেকথা জানিয়েছিলেন। কিন্তু কেউই তাঁর কথায় পাত্তা দেননি।

তখন তিনি নিজেই ওই আওয়াজের উৎস সন্ধানে এগিয়ে যান। তারপর যে দৃশ্য দেখেছিলেন, তা রীতিমতো বিস্ময়কর। দেখেছিলেন, সারি সারি বিশাল আকৃতির ঘোড়া। সেগুলি সজ্জিত রাজকীয় পোশাকে। গলায় ঘণ্টা বঁাধা। ঘোড়াগুলি মাথা দোলাচ্ছে আর মাঝে মাঝে ডেকে উঠছে। এই দৃশ্য সহ্য হয়নি সেই কর্মচারীর। তারপরই অজ্ঞান হয়ে যান তিনি।

তাঁকে উদ্ধার করেছিল জিপিও-র কেয়ারটেকার। সে-ও এই বিশাল বাড়িটির অনেক কিছু জানত। জ্ঞান ফেরার পর সেই কর্মচারীকে কেয়ারটেকার বলেছিল, অত রাতে এভাবে ওদিকে যাওয়া তাঁর ঠিক হয়নি। একসময় ওই জায়গাটি ছিল নবাবের ঘোড়া রাখার জায়গা, মানে আস্তাবল!

সিরাজ-উদদৌলা যে এখানে ঘাঁটি গেড়েছিলেন, তা সকলেরই জানা। এই ঘাঁটিতে তাঁর জন্য ব্যবস্থা ছিল সুন্দরী নাচিয়েদেরও। তাঁদের কেউ কেউ সিরাজকে মুগ্ধ করেছিল। আবার কেউ কেউ পারেনি। কারও কারও ওপর ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন নবাব। তাঁর নির্দেশে অনেক সুন্দরীকে জবাইও করা হয়েছিল। সেই সুন্দরীদের চলাফেরা করার শব্দও নাকি অনেকে এই জিপিও-র বিল্ডিংয়েই শুনেছেন।

জিপিও-র এক এলডি ক্লার্ক নাকি তেমনই এক সুন্দরীকে এখানেই দেখেছিলেন। তার শরীর থেকে মোহময়ী সুবাস বের হচ্ছিল। সেই সুন্দরী হাঁটতে হাঁটতে তাঁর সামনে দিয়ে চলে গিয়েছিলেন। আতঙ্কে গোঙাতে শুরু করেছিলেন অবসরের দোরগড়ায় পৌঁছে যাওয়া এলডি ক্লার্কটি। অফিসের অন্য কর্মীরা ছুটে এসে তাঁর সংবিত ফিরিয়েছিলেন।

এমনই সব রহস্যজনক নানা কাহিনি শোনা যায় কলকাতার জিপিও-কে নিয়ে। রাতে জিপিও-র সামনে ফুটপাথে অনেক হিন্দুস্থানি মুটে-মজুরকে শুয়ে থাকতে দেখা যায়। একবার তাদেরই একজন এই জিপিও নিয়ে অদ্ভুত কথা শুনিয়েছিল। মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেলে সেফুটপাথ থেকে দেখেছিল এক আশ্চর্য দৃশ্য।

দেখেছিল, এক সাহেব ও মেম কোনো কাজে যেন ব্যস্ত হয়ে জিপিও-র বাড়িটিতে ঢুকছেন। তাঁদের পরনে ছিল পুরোনো সময়ের ব্রিটিশ পোশাক। কিছুক্ষণ পর তাঁদের বেরিয়ে যেতেও দেখেছে ওই মজুর।

ব্রিটিশ আমলে এই বাড়িতে সাহেবদেরই আনাগোনা ছিল। হয়তো তাঁদের কোনো অশরীরী আত্মা এখনও এই বাড়ির আনাচে-কানাচে ঘোরাফেরা করে। কখনো কখনো সেই দৃশ্য আমাদের কেউ কেউ দেখে ফেলেন।

চৌরঙ্গির ‘ইন্ডিয়ান মিউজিয়াম’

ভারতের সর্ববৃহৎ ও প্রাচীন জাদুঘর হল আমাদের চৌরঙ্গির ‘ইন্ডিয়ান মিউজিয়াম’। ১৮১৪ সালের ২ ফেব্রুয়ারি এশিয়াটিক সোসাইটি এই জাদুঘরের প্রতিষ্ঠা করে। এই জাদুঘরের প্রতিষ্ঠাতা কিউরেটর ছিলেন ডেনিস উদ্ভিদবিজ্ঞানী নাথানিয়েল ওয়ালিক।

আর যেহেতু এটি জাদুঘর, তাই ভবনটি মৃত প্রাণীদের হাড়গোড়ে ভরতি। আছে প্রায় চার হাজার বছরের পুরোনো এক মিশরীয় ব্যক্তির মমিও। স্বভাবতই এই জাদুঘর নিয়ে বহু ভৌতিক কাহিনি শোনা যায়। এ ছাড়াও শুধু এই জাদুঘরই নয়, তার আশেপাশের এলাকায় নাকি অদ্ভুত সব শব্দ শুনতে পাওয়া যায়। অনেকে উদ্ভট সব ঘটনা ঘটতেও দেখেছেন।

জাদুঘরের নানা ভয়ংকর ও রোমহর্ষক কাহিনি নাকি লিখেছেন স্বয়ং অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর। সেই লেখার পান্ডুলিপিগুলি নাকি এখনও জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে।

এবার বলা একটি ঘটনার কথা। জাদুঘরের পাশের রাস্তাটির নাম এখন সদর স্ট্রিট। আজ থেকে দু-শো বছর আগে নাকি এখানেই বাড়ি ছিল স্পিক সাহেবের। একদিন রাতে স্পিক সাহেব বাড়ি থেকে সবে বেরিয়েছেন, তখনই তাঁর মুখোমুখি হয় এক শিখ যুবক।

শিখ যুবকটি তার একটি আর্জির কথা জানায় স্পিক সাহেবকে। কিন্তু স্পিক সাহেব সেই আর্জি নাকচ করে দেন। আর্জিটি ঠিক কী ছিল, তা জানা সম্ভব হয়নি। তবে স্পিক সাহেবের সেই প্রত্যাখ্যান মেনে নিতে পারেনি শিখ যুবকটি। সেস্পিক সাহেবের সঙ্গে বচসায় জড়িয়ে পড়ে।

শুধু তাই নয়, ধাক্কাধাক্কিও শুরু করে দেয়। জাদুঘরের প্রশাসনিক ভবন থেকে তখন বেরিয়ে আসে রাত-প্রহরীরা। তারা গুলি করে মারে শিখ যুবকটিকে। শিখ যুবকটির মৃত্যুর পর থেকেই বেশি রাতে নাকি অদ্ভুত সব ঘটনা ঘটতে দেখা যায় জাদুঘর ও তার আশেপাশের এলাকায়।

আচমকা নাকি কথাকাটাকাটি থেকে রাইফেলের গুলির শব্দ, সবই শোনা যায়। গভীর রাতে শিখ তরুণটিকে নাকি জাদুঘর ও তার পাশের রাস্তায় দেখা যায়। তাই বেশি রাতে এখনও অনেকে ওই চত্বর এড়িয়ে চলতে পছন্দ করেন।

এ ছাড়া আরও একটি ঘটনার কথা শোনা যায়। জাদুঘরের ছাদের স্কাইলাইট পরিষ্কার করতে গিয়ে এক শ্রমিক নাকি দু-টি শোকেসের মাঝে চাপা পড়ে মারা যায়। আবার একথাও শোনা যায়, জুওলজি গ্যালারি রং করতে গিয়ে এক শ্রমিক উঁচু থেকে পড়ে মারা যায়।

তবে দুই শ্রমিকই একই ব্যক্তি কি না তা অবশ্য জানা যায়নি। সেই শ্রমিককেও নাকি রাতের দিকে মাঝে মাঝে দেখা যেত বলে নৈশপ্রহরীদের অনেকেই দাবি করেছেন। বেশি রাতে নাকি এখনও মাঝে মাঝে দেখা যায়, কে যেন গায়ে কাপড় মুড়ি দিয়ে ছাদ থেকে নেমে আসছে! তবে সেশ্রমিক কি না তা নিশ্চিত করে কেউই বলতে পারেননি।

আবার একথাও শোনা যায়, রাতে নাকি জাদুঘর থেকে কে একজন বাইরে বেরিয়ে যায়। তারও শরীর সাদাকাপড় দিয়ে ঢাকা থাকে। অনেকটা মমির মতো। উল্লেখ্য, কলকাতার এই জাদুঘরে কাঠের বাক্সে একটি মমি রাখা আছে। ওই অচেনা ব্যক্তিটি তারই আত্মা কি না তা অবশ্য কেউ বলতে পারেননি।

রাত অনেক হলে জাদুঘরে নাকি এখনও মাঝে মাঝে গান-বাজনার শব্দ শুনতে পাওয়া যায়। অনেকে বলেন, ওই শব্দ নাকি নতর্কীদের আত্মারা করে থাকে। কিন্তু জাদুঘরে কেন গানবাজনার আসর বসে, তা কিন্তু জানা যায়নি!

ন্যাশনাল লাইব্রেরি

বেলভেডিয়ার প্যালেস, ওয়ারেন হেস্টিংস এবং হেস্টিংস হাউসের কথাতেই রহস্যের শেষ হয় না। এর বাইরেও ন্যাশনাল লাইব্রেরির আলাদা ভৌতিক চরিত্র রয়েছে। অনেকে তার প্রত্যক্ষদর্শীও হয়েছেন।

আলিপুরের ন্যাশনাল লাইব্রেরিটি বেলভেডিয়ার প্যালেসেই অবস্থিত। ভারতের বৃহত্তম লাইব্রেরি হিসেবে এই গ্রন্থাগার স্বীকৃত। এই লাইব্রেরি ভারত সরকারের সংস্কৃতি দফতর এবং পর্যটন ও সংস্কৃতি মন্ত্রকের অধীন।

ত্রিশ একরের বেলভেডিয়ার এস্টেটের ওপরেই রয়েছে এই গ্রন্থাগার। এই লাইব্রেরিতে বাইশ লক্ষ বই রয়েছে। স্বাধীনতার আগে বাংলার লেফটেন্যান্ট গভর্নরের সরকারি আবাস ছিল এখানে।

সারাদিন এই লাইব্রেরি গ্রন্থপিপাসুদের যাতায়াতে সরগরম থাকে। কিন্তু রাত হলেই এই লাইব্রেরির রূপ পালটে যায়। সন্ধ্যারাতে এই লাইব্রেরির করিডোর বরাবর হেঁটে গেলে এখনও গা-ছমছম করে। কখনো কখনো ঘাড়ের কাছেই ঠাণ্ডা শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দ শোনা যায়।

আবার রাতের দিকে কারা যেন এই লাইব্রেরি জুড়ে হেঁটে বেড়ায়। তাদের পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়। কখনো মনে হয় কেউ যেন হন্তদন্ত হয়ে কোথাও যাচ্ছে। আবার এমনও মনে হয়, কেউ যেন উদাসীনভাবে হেঁটে চলেছে।

এমনকী মধ্যদুপুরেও এখানে অশরীরী অস্তিত্ব টের পেয়েছেন অনেকে। যাঁরা টের পেয়েছেন, তাঁদের অনেকেই বলেছেন, ঠিক জায়গায় বই রাখা না-হলেই নাকি অদ্ভুত পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হয় গ্রন্থপ্রেমিককে। তাঁর ঘাড়ে কাদের যেন ঘন ঘন ক্রুদ্ধ নিশ্বাস পড়তে থাকে।

ন্যাশনাল লাইব্রেরির নৈশপ্রহরীরা নানা ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছেন বলে অনেকবারই বলেছেন। রাতের দিকে লাইব্রেরি রুমগুলিতে যেন পড়াশুনোর আসর বসে। এটা রীতিমতো অস্বাভাবিক ব্যাপার, কারণ সন্ধ্যা ছ-টার পর ন্যাশনাল লাইব্রেরি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।

অথচ রাতের দিকে মাঝে মাঝে মনে হয় যেন বই নিয়ে কেউ বসে পড়ছে। বইয়ের পাতা ওলটানোর শব্দও শোনা যায় তখন। শুধু নৈশপ্রহরীরাই নন, অনেক রাজনৈতিক নেতার মুখেও ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে অশরীরী অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়ার কথা শোনা গিয়েছে।

হাওড়া ব্রিজ

হাওড়া ব্রিজের কথা জানেন না এমন মানুষ শুধু পশ্চিমবাংলায় কেন সারা ভারতেই কম রয়েছেন। এখন অবশ্য দ্বিতীয় হুগলি সেতু বা বিদ্যাসাগর সেতু থেকে বালি ব্রিজ, অনেক বিখ্যাত সেতুই রয়েছে কলকাতায়। সেইজন্য হাওড়া ব্রিজের গরিমায় কিছুটা টান পড়লেও এই সেতুর ঐতিহ্য কিন্তু এখনও অটুট।

হাওড়া ব্রিজ তৈরি হয় ১৮৭৪ সালে। কলকাতা এবং হাওড়ার শহরের মধ্যে সংযোগরক্ষাকারী সেতুগুলির মধ্যে অন্যতম হল এই ব্রিজ। ১৯৪৫ সালে সেতুটির আমূল সংস্কার হয়। পুরোনো সেতুটির বদলে সেই সময় বর্তমান ক্যান্টিলিভার সেতুটির উদবোধন হয়।

আগে ব্রিজটির নাম ছিল শুধুই হাওড়া ব্রিজ। আর এই অঞ্চলের নাম ছিল মল্লিকঘাট। এই এলাকায় কলকাতা শহরের ফুলের বাজার ছিল আগে থেকেই। ১৯৬৫ সালে ব্রিজের নাম বদলে যায়। ওই বছরের ১৪ জুন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নামানুসারে এই সেতুর নতুন নামকরণ হয় রবীন্দ্র সেতু। যদিও সাধারণ মানুষের কাছে এখনও সেতুটির পরিচিতি রয়েছে হাওড়া ব্রিজ হিসেবেই।

এই ব্রিজটিকে ভারতের অন্যতম মজবুত ব্রিজ হিসেবে মনে করা হয়। নির্মাতাদের মতে, বঙ্গোপসাগরে তৈরি প্রবল ঝড়ঝঞ্ঝায় এই সেতুর কোনো ক্ষতি হবে না। দিনে প্রায় দশ লক্ষ মানুষ নাকি এই ব্রিজ দিয়ে যাতায়াত করে থাকেন। গাড়িঘোড়া চলে প্রায় আশি হাজারের মতো। এই দিক থেকে পৃথিবীর ষষ্ঠ বৃহত্তম সেতু বলা হয় এই ব্রিজকে।

সাধারণ বাঙালির কাছেও এই ব্রিজের আবেদন অনেকখানি। এই ব্রিজকে নিয়ে তাদের দৈনন্দিন জীবনচর্চায় অনেক গল্পকথা রচিত হয়েছে। সেতু নিয়ে আলোচনায় উদাহরণ হিসেবে এই ব্রিজের কথা উল্লেখ করা হয়ে থাকে।

একটা সময় আত্মহত্যাপ্রবণ মানুষের কাছে অতিসহজ ও আকর্ষণীয় স্থান ছিল এই ব্রিজ। বহু মানুষ এই ব্রিজ থেকে গঙ্গায় ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। এখনও শহরের অন্যতম সুইসাইড জোন হিসেবে ব্রিজটি চিহ্নিত হয়ে রয়েছে। তবে এই সেতু থেকে আত্মহত্যার সংখ্যা এখন অনেকটাই কমে এসেছে।

এই ব্রিজ থেকে অনেককে আত্মহত্যা করতে দেখেছেন এমন মানুষও সংখ্যায় কম নেই। কারণ, সারাদিন এই ব্রিজ মানুষে-গাড়িতে জমজমাট থাকে। এমনকী রাতেও ব্রিজ একেবারে জনশূন্য হয়ে যায় না।

মল্লিকঘাটে ভোররাতে যেসব কুস্তিগিররা মুগুর ভাজতে গঙ্গার পাড়ে যায়, তাঁদের অনেকেই বহু আত্মহত্যার ঘটনা দেখেছেন বলে দাবি করেন। অনেকে আবার অতিপ্রাকৃত বা অস্বাভাবিক ঘটনাও দেখেছেন বলে জানিয়ে থাকেন।

অবশ্য এই ঘাটকে কোনোদিনই সেভাবে নিরাপদ মনে করা হত না। গঙ্গায় পড়ে গিয়ে বহু মানুষের অপমৃত্যু ঘটেছে এখানে। যাঁরা এখানে অতিপ্রাকৃত দৃশ্য বা ঘটনা দেখেছেন বলে দাবি করেন, তাঁদের অনেকেই বলেছেন, মাঝে মাঝে তাঁরা কাউকে যেন গঙ্গায় ডুবে যেতে দেখেন। আর দেখেন বঁাচার আশা বা চেষ্টায় জলে তাদের হাত-পা ছুড়তে।

কখনো কখনো দেখা যায় জলের উপর একটামাত্র হাত উঠে রয়েছে। দেখে মনে হবে কেউ বোধ হয় বঁাচার জন্য তার একটা হাত এখনও জলের উপরে তুলে রেখেছে। কেউ যদি তখন তাকে বঁাচানোর জন্য জলে ঝাঁপ দেয়, তাহলে তারও পরিণতি মর্মান্তিক হয়। তারও নাকি মৃত্যুই হয়।

এ ছাড়াও ঝড়-বৃষ্টির রাতে হাওড়া ব্রিজ যখন জনশূন্য হয়ে পড়ে, তখন নাকি এই ব্রিজ ধরে অনেক সুন্দরী মেয়েকে হেঁটে যেতে দেখা যায়। তবে তাদের প্রতি আগ্রহ না দেখানোই ভালো। মনে করা হয়, সেই সুন্দরীরা আগে কোনো সময় কোনো কারণে এখানেই ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেছে।

এ ছাড়াও গঙ্গার ঘাটে সাদাশাড়ি পরা এক মহিলাকে নাকি ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়। প্রাথমিকভাবে দেখে ওই মহিলাকে সাধারণ কোনো মহিলা বলেই মনে হবে। কিন্তু দূর থেকে যদি মহিলার প্রতি লক্ষ করা যায়, তাহলে বোঝা যাবে স্বাভাবিক কোনো মানুষ নয় সেই মহিলা।

মনে করা হয়, কোনো কারণে হয়তো এই ঘাটেই জলে ডুবে ওই মহিলার মৃত্যু হয়। তারপর থেকে তাঁর অতৃপ্ত আত্মা গঙ্গার ঘাটে এখনও ঘুরে বেড়ায়। বেশি রাতের দিকে মাঝে মাঝে অদ্ভুত গলায় তাঁকে কাঁদতেও শোনা যায়।

যাঁরা অশরীরী অস্তিত্বে বিশ্বাসী, তাঁদের মতে, আত্মহত্যার কারণে অনেকের আত্মা নাকি মুক্তি পায় না। তাদেরই অতৃপ্ত আত্মা এখনও হাওড়া ব্রিজে ঘুরে বেড়ায়। কখনো কখনো নাকি মানুষকে আত্মহত্যায় প্রভাবিতও করে।

মাঝেরহাট ব্রিজ

কলকাতার মাঝেরহাট ব্রিজের কথা কে না জানে! এখনও নাকি বেশি রাতে মাঝেরহাট ব্রিজের ওপর লাল কুর্তা-পাঞ্জাবি পরা একটি লোককে দেখা যায়। লোকটি ব্রিজের নীচে পর্যন্ত কাকে যেন খুঁজে চলেন।

কোনো সাহসী ব্যক্তি যদি তাঁর দিকে এগিয়ে যান এবং কিছু জিজ্ঞাসা করেন, তাহলে সেই লোকটি তাঁর দিকে এক বার তাকিয়েই মুখ ফিরিয়ে নেবেন। তার পর এমন ভাব করবেন যেন যাকে খুঁজছিলেন তিনি, তাকে পেয়ে গিয়েছেন। আর মুহূর্তেই অন্ধকারে মিলিয়ে যাবেন।

শুধু সেখানেই নয়, ব্রিজের কাছাকাছি একটি বিশাল বাড়ির সামনেও লোকটিকে দেখা যায়। সেখানেও লোকটি কাকে যেন খুঁজে বেড়ান।

এখন প্রশ্ন হল, লোকটি কে? এর জবাব এখন হয়তো অনেকেই জানেন না। তবে শোনা যায়, এখানকার প্রাচীন বাসিন্দারা নাকি তাঁর পরিচয় জানতেন। আসলে ঘটনাটি কয়েক-শো বছর আগেকার।

তখন ব্রিটিশ আমল। সেই বিশাল বাড়িটির বাসিন্দা ছিলেন মানু পাল নামে এক বাবু। যেমন পয়সা, তেমনই চরিত্রহীন। তাঁর নিজের ছিল চার স্ত্রী। তবু রাত হলেই বাইজিবাড়ি হত তাঁর প্রধান গন্তব্য।

ফুর্তি করতে গিয়ে ওই মানু পাল কিন্তু অস্বীকার করে যাচ্ছিলেন নিজের স্ত্রীদেরই। বিশেষ করে ছোটো স্ত্রী কুসুমকুমারীকে। ছোটোস্ত্রীর বয়স ছিল খুবই কম, তাই বঞ্চিত হচ্ছিল সে-ই বেশি।

তাই নিজের সুখ সেনিজেই খুঁজে নিয়েছিল মানু পালের আশ্রিত বিনোদানন্দের কাছে। বিনোদানন্দ ছিল ব্যবসায়ী। সিল্কের ব্যাবসা করত সে। বয়সও ছিল অনেক কম। কলকাতায় এসে বিনোদের পরিচয় হয় মানু পালের সঙ্গে। দু-জনের ভালো বন্ধুত্ব হয়ে যায়।

সেই বন্ধুত্বের সূত্র ধরে মানু পালের বাড়ি আসে সে। তখনই তার চোখে পড়ে যায় কুসুমকুমারী। তাকে দেখে কুসুমকুমারীও। দু-জনের তখনই চোখের দৃষ্টিতে অনেক কথা হয়ে যায় যা মানু পাল বুঝতে পারেননি।

স্বভাবতই বিনোদ ছলের আশ্রয় নেয়। কলকাতায় একটা ভাড়াবাড়ি খুঁজে দেওয়ার জন্য বিনোদ অনুরোধ করে মানু পালকে। মানু পাল তখন তাঁর বাড়িতেই আশ্রয় দেন বিনোদকে।

আর সেই সুযোগে কুসুমকুমারী ও বিনোদানন্দের শরীরী সম্পর্ক জমে ওঠে। বিষয়টি মানু পাল জানতেও পারেননি। কিন্তু তাঁর অপর তিন স্ত্রীকে ফাঁকি দিতে পারেনি কুসুমকুমারী। তারা নানাভাবে মানু পালকে বিষয়টি নিয়ে অবহিত করার চেষ্টা করতে থাকে।

যদিও সরাসরি তারা মানু পালকে অভিযোগ করার সাহস পেত না। কারণ অল্পবয়সি সুন্দরী স্ত্রী কুসুমকে খুব ভালোবাসতেন তিনি। তাই তাদের কথা বিশ্বাস করবেন না ভেবেই তারা সরাসরি বলত না। ইঙ্গিতে বোঝাতে চাইত তারা।

কিন্তু একদিন একটা ভুল করল কুসুমই। বাইজিবাড়ি যাবে বলে মানু পাল যখন তৈরি হচ্ছিলেন, তখন তাঁকে আটকানোর চেষ্টা করে সে। এমনকী জড়িয়ে ধরে থাকার জন্য অনুরোধও করে। যদিও পুরোটাই ছিল তার অভিনয়।

আর তাই সন্দেহ হয় মানু পালের। অন্য স্ত্রীদের ইঙ্গিতবহ কথাগুলি তাঁর মনে পড়ে। তাই বাইজিবাড়ি গেলেও সেখানে থাকতে তাঁর মন চায় না। নাচ-গানের মাঝপথেই ফিরে আসেন বাড়িতে। আর হাতেনাতে ধরে ফেলেন সম্পূর্ণ নগ্ন কুসুমকুমারী ও বিনোদানন্দকে।

গোপন সম্পর্কের কথা ফাঁস হয়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়ে যায় দু-জন। পোশাক না-পরেই কোনোরকমে গায়ে কাপড় জড়িয়ে পালাতে যায় বিনোদ। বাড়ি থেকে বের হতে পারলেও শেষপর্যন্ত ধরা পড়ে যায় মানু পালের হাতে। মানু পালের হাতে ছিল কুকরি।

আর তা দেখে চিৎকার করে অজ্ঞান হয়ে যায় কুসুম। কুকরির এক আঘাতেই মানু পাল বিনোদের মাথা তার ধড় থেকে আলাদা করে দেন। তখন এতটাই ক্রুদ্ধ ছিলেন মানু পাল যে তাঁর কুকরির আঘাতও ছিল মারাত্মক। ধড় থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর বিনোদের মাথা বেশ কিছুটা দূরে ছিটকে পড়ে গড়িয়ে যায়।

তারপরই নাকি অভিশপ্ত হয়ে যায় মানু পালের বাড়ি। শোনা যায়, তখন থেকেই নাকি রাতে ওই লাল কুর্তা-পাঞ্জাবি পরা লোকটিকে দেখা যেতে থাকে। কয়েক-শো বছর কেটে গেলেও ওই ক্রুদ্ধ আত্মার নাকি এখনও মুক্তি ঘটেনি!

গারস্টিন প্লেসে আকাশবাণী ভবন

কলকাতার এখন যেখানে ‘আকাশবাণী ভবন’, সেটি কিন্তু তার আদিবাড়ি নয়। এক নম্বর গারস্টিন প্লেসে ছিল সেই বাড়ি।

বর্তমান বিবাদী বাগ ছাড়িয়ে পশ্চিম দিকে আদালতের বিপরীতে দক্ষিণমুখো রাস্তাটিই ছিল গারস্টিন প্লেস। সেখানেই খোলা হয় ‘ইন্ডিয়ান ব্রডকাস্টিং কোম্পানি’। পরে এই সংস্থাটিই রূপান্তরিত হয় ‘অল ইন্ডিয়া রেডিয়ো’-তে। সেটা ১৯২৭ সাল।

ওই বছরই ২৬ আগস্ট এই বাড়ি থেকেই প্রথম শোনা যায় ‘ক্যালকাটা কলিং’। এই কেন্দ্রের প্রথম দায়িত্বে ছিলেন পি সি ওয়ালিক। পরে সম্পূর্ণ দায়িত্বে আসেন স্টেপলটন সাহেব। যা-ই হোক, কলকাতার ভূতুড়ে বাড়িগুলির মধ্যে সবচেয়ে ভয়ের ছিল নাকি এই গারস্টিন প্লেসের বাড়িটাই।

এই বাড়ির পাশেই ছিল একটি কবরখানা। যেসব ইংরেজ কর্মচারী কর্মরত অবস্থায় মারা যেতেন, তাঁদের এখানে কবর দেওয়া হত। এ ছাড়া এখানেই আছে কলকাতার প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে স্বীকৃত জব চার্নক-সহ অনেক বিখ্যাত সাহেব-মেমের কবর।

এখন অবশ্য এই কবরস্থানটি সেন্ট জনস চার্চের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গিয়েছে। গারস্টিন প্লেসের এই বাড়ির মধ্যে অনেকেই ভূত দেখেছেন বলে জানিয়েছেন। ফাঁকা লম্বা করিডোর, অজস্র স্টুডিয়ো আর ব্রিটিশ অবকাঠামো—সব কিছু মিলিয়ে বিচার করলে, সেখানে ভূতুড়ে অস্তিত্ব অস্বীকার করা একটু কঠিনই।

ওয়ালিক সাহেবের কেয়ারটেকার জগমোহনের মুখেই প্রথম সেখানকার ভৌতিক কাহিনি শোনা যায়। বিহার থেকে আসা জগমোহনই জানিয়েছিলেন, তিনি নাকি অনেক বার এখানে অশরীরী অস্তিত্বের প্রমাণ পেয়েছেন।

আবার শোনা যায় এক ব্রিটিশ মহিলা অ্যানাউন্সারের বলা একটি ঘটনার কথা। তিনি এক রাতে তিন-তলার চেম্বারে বসে নিজের কাজ করছিলেন। কিন্তু কাজ করার ফাঁকে ফাঁকা স্টুডিয়োতে চোখ গিয়েছিল তাঁর। সেখানে এক বিদেশি ভদ্রলোককে বসে থাকতে দেখে তিনি অবাক হয়েছিলেন।

একটু পরে নীচে নেমে তিনি দারোয়ানকে জিজ্ঞাসা করে জেনেছিলেন, কোনো বিদেশিকে সেই দারোয়ান উপরে যেতে দেখেনি। অবাক হয়েছিলেন সেই মহিলা অ্যানাউন্সার। তৎক্ষণাৎ তিনি উপরে ফিরে আসেন। তারপর ভয়ে ভয়ে সেই স্টুডিয়োর দিকে তাকিয়ে দেখেন।

হ্যাঁ, তখনও সেই ভদ্রলোককে তিনি দেখেছিলেন। তবে তখন সেই ভদ্রলোক আর বসে নেই। মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রয়েছেন সেই বিদেশি অতিথি! কিন্তু মুখটা অস্পষ্ট, চোখ যেন ঠিক চোখে নেই!

ভয় পেয়ে সেই মহিলা অ্যানাউন্সার সেই যে রেডিয়ো স্টেশন থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন, আর ফিরে আসেননি। কয়েক দিন পর তাঁর ইস্তফাপত্র পৌঁছে গিয়েছিল রেডিয়ো স্টেশনে।

এ ছাড়া গভীর রাতে এই রেডিয়ো স্টেশনে কাজের টেবিলে বসে অনেক অপরিচিত সাহেবকে কাজ করতে দেখেছেন অনেকেই, যাঁরা এখানকার কর্মী নন। তাঁদের বেশভূষা ব্রিটিশ ধারার। শুধু তাই নয়, অনেকে ব্রিটিশ কর্মীকেও চোখে পড়েছে অনেকেরই।

কেউ কেউ বলেছেন, রাতের দিকে মাঝে মাঝে কোট, টুপি পরে সিগারেট মুখে কোনো সাহেব নাকি এই ভবনে ঢুকে পড়েন। তারপর বিভিন্ন ঘরে গিয়ে নানা ফাইলপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করেন। শেষে একসময় বেরিয়ে যান।

এ ছাড়া অনেকেই দেখেছেন, রেকর্ডিং ঘরের বাইরে যে বারান্দা রয়েছে, সেখানে বসে কে যেন তন্ময় হয়ে গান শুনছেন! কিছুক্ষণ পরে তাঁকে আর দেখা যায় না।

এখন ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ রেকর্ড বাজানো হয় মহালয়ার দিন। আগে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ সরাসরি (লাইভ) সম্প্রচার হত। সেই অনুষ্ঠানে যোগ দিতে এসে অনেক শিল্পীই অনেক বার এমন ধরনের বহু ভৌতিক ঘটনার সম্মুখীন হয়েছেন বলেও অনেক বার জানিয়েছেন।

‘মহিষাসুরমর্দিনী’র সেই বিখ্যাত প্রভাষক বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র ছিলেন ইন্ডিয়ান ব্রডকাস্টিং কোম্পানির প্রথম দিকের কর্মী। তিনিও এখানকার বহু ভৌতিক কাহিনি জানতেন। কথা প্রসঙ্গে বলেছেনও সেসব ঘটনার কথা।

ভৌতিক রহস্য জড়িয়ে রয়েছে নতুন ভবনের সঙ্গেও। আকাশবাণীর নতুন ভবনেও নাকি রাত গভীর হলে বিভিন্ন স্টুডিয়ো থেকে ভেসে আসে নানা ধরনের যান্ত্রিক সুর। কিন্তু অনেকেই জানেন, তেমন যন্ত্র এখন আর আকাশবাণীতে কেউ বাজান না। তা হলে কারা বাজান ওই সব যন্ত্র?

কলকাতা হাই কোর্ট

কলকাতা হাই কোর্ট ভারতের সবচেয়ে পুরোনো হাই কোর্ট। এটিই পশ্চিমবাংলা রাজ্য এবং আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের মতো কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের জুরিসডিকশন। বেলজিয়ামের ইপ্রেসের ক্লদ হলের অনুসরণে কলকাতা হাই কোর্টের নকশা তৈরি হয়েছে। যদিও আদালত হিসেবে ফোর্ট উইলিয়ামেই প্রথম কলকাতা হাই কোর্ট তৈরি হয় ১৮৬২ সালের ১ জুলাই।

কলকাতা হাই কোর্ট এবং তার চত্বরেও নাকি অতিপ্রাকৃত বা অশরীরী শক্তির আনাগোনা রয়েছে। ব্রিটিশ আমলে এবং তার পরবর্তী সময়েও কিছুদিন সেই সব ব্যাপার নিয়ে বিভিন্ন মহলে অনেক আলোচনা হয়েছে। এখন অবশ্য তা নিয়ে খুব-একটা কথা শোনা যায় না। অনেকে আবার হেসে উড়িয়েও দেন।

হাই কোর্টের দোতলায় অ্যাডভোকেট লাইব্রেরির পাশেই রয়েছে স্টেটমেন্ট সেকশন। শোনা যায়, এখানেই জজসাহেবের এজলাসের দিকে যে টয়লেট রয়েছে, সেদিকটা নাকি ভালো নয়।

সেদিকের লম্বা করিডোরে মাঝে মাঝে রাতের দিকে নাকি কোনো মহিলার পায়ের তোড়ার আওয়াজ পাওয়া যেত। আগে কেউ কেউ ঝলমলে ঘাঘরা-পরা সেই মহিলাকে দেখেছেনও। তবে তাঁর মাথা ছিল না।

তথ্য বলছে, ওই মহিলাটি নাকি বারবণিতা ছিলেন। তিনি এক বাবুকে ভালোবেসে ফেলেছিলেন। সেই বাবুকে বিয়ে করে সুখী হতে চেয়েছিলেন। তাই আবেদন করেছিলেন হাই কোর্টে। হাই কোর্ট থেকে তাঁকে উপস্থিত হওয়ার সমন পাঠানো হয়। কিন্তু কোনো এক অজ্ঞাত কারণে তিনি হাই কোর্টে আসেননি।

আসলে অনেকে চায়নি তিনি গণিকাবৃত্তি ছেড়ে ঘরসংসার করুন। তাদেরই ষড়যন্ত্রে তিনি খুন হয়ে যান। তাঁর শরীর পাওয়া গেলেও মাথাটি পাওয়া যায়নি। বিয়ে করে সংসার করার স্বপ্ন তাঁর অপূর্ণই থেকে যায়। মনে করা হয়, তাঁরই অতৃপ্ত আত্মা তাই হয়তো এজলাসের আশেপাশে ঘুরে বেড়ায়।

আরও একটি কাহিনি আছে এক বিদ্রোহী কবিকে নিয়ে। তিনি কবি তাপিস। রাজদ্রোহের অভিযোগে তাঁর ফাঁসি হয় কলকাতায়। শোনা যায়, ফাঁসির আগেই বিচারাধীন থাকাকালীন কবির শরীর একেবারে ভেঙে যায়। কারণ হিসেবে তাঁর শরীরে জলাভাবের কথা শোনা যায়। তাঁকে বন্দি থাকার সময় প্রতিদিন একটু একটু করে জল দেওয়ার পরিমাণ একেবারে কমিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

ভারত স্বাধীন হওয়ার পরও তাঁর অতৃপ্ত আত্মাকে ওই চত্বরে ঘোরাফেরা করতে দেখা যায়। বন্দি থাকার সময় তাঁকে জল কম দেওয়া হত বলে তাঁর আত্মাও নাকি তৃষ্ণার্ত থেকে গিয়েছে। অনেকে নাকি তাঁর আত্মাকে হাই কোর্ট চত্বরের এক কোণে একটি কুঁজো থেকে জল ঢেলে খেতেও দেখেছেন।

কলকাতা কর্পোরেশন

কলকাতা মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনের কথাও কারও অজানা নয়। ১৮৭৬ সালে তৈরি হয় এই কর্পোরেশন। একসময় এই কর্পোরেশনেরই মেয়র হয়েছিলেন স্বয়ং নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু। তখন অবশ্য ব্রিটিশ আমল। জাতীয়তাবাদী নেতা সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্যোগে ১৯২২ সালে গণতান্ত্রিক স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা হিসেবে কলকাতা পৌরসংস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ছাড়াও চিত্তরঞ্জন দাশ, যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত, এ কে ফজলুল হক, বিধানচন্দ্র রায়ও কলকাতার মেয়র হয়েছিলেন।

তবে স্বাধীনতার পর এই কর্পোরেশনের সক্রিয়তা অনেক বেড়ে যায়। গত এক-শো পঞ্চাশ থেকে এক-শো নব্বই বছরে কত ঘটনাই-না ঘটে গিয়েছে এখানকার প্রধান ভবনে। এই কর্পোরেশনের প্রধান ভবনটিতে এখনও প্রচুর মানুষ আসেন। সারাদিন জমজমাট থাকে এই কার্যালয়।

মূল ভবনে রয়েছে কলকাতা মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনের প্রধান বাড়ি। আয়তনের দিক থেকেও বাড়িটি বিশাল। সেই বাড়িটি রয়েছে ধর্মতলায়। উনিশ শতকের শেষ দিকে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে এই কর্পোরেশন বিল্ডিং বহু ঘাত-প্রতিঘাত এবং রাজনৈতিক সক্রিয়তার সাক্ষী হয়ে থেকে গিয়েছে। শুধু তাই নয়, পুরসভার লালবাড়িটি কলকাতায় ব্রিটিশদেরও বহু ঘটনার রাজসাক্ষী।

এই বিশাল বাড়িটিকে রহস্যজনক বলে অনেকে মনে করেন। কারণ হিসেবে তাঁরা এক নারীর কথা উল্লেখ করেন। গভীর রাতে সেই নারী নাকি চাপা স্বরে কার সঙ্গে কথা বলেন! এখানেই শেষ নয়। পরে ওই নারীর গলার চাপা আওয়াজ বদলে যায় কান্নায়।

কিন্তু কে ওই রহস্যময়ী নারী? কেনই-বা তিনি এত চাপাস্বরে কথা বলেন? কার সঙ্গেই-বা বলেন? শেষের দিকে ওই নারী কেন কান্নায় ভেঙে পড়েন? এমন হাজার এক প্রশ্ন অনেক মানুষের মনেই দেখা দিয়েছে বার বার। কিন্তু প্রশ্নগুলির উত্তর মেলেনি কারও কাছ থেকেই।

কর্পোরেশনে যেসব নৈশপ্রহরী কাজ করেন, গভীর রাতে তাঁরাও মূল ভবনের বিশেষ কয়েকটি জায়গায় যেতে চান না। ওই নারীর পরিচয় জানতে না পারলেও তাঁকে যে সন্ধ্যার পর থেকে শুরু করে রাত গভীর হওয়া পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে দেখতে পাওয়া যায়, তার প্রমাণ নাকি অনেকেই পেয়েছেন।

ডালহৌসি পাড়ায় স্টিফেন হাউস

কলকাতার ডালহৌসি পাড়ায় স্টিফেন হাউসের অবস্থান। ঠিকানা ৫৬ই হেমন্ত বসু সরণি, বিবাদী বাগ, কলকাতা। লালদিঘির কাছাকাছি থাকা এই পুরোনো বাড়িতে রয়েছে অনেক অফিস। সারাদিন ওই অফিসগুলি তুমুল ব্যস্ত থাকে। দেখে কেউ বুঝবেনই না যে সেগুলিতে রাতের অন্ধকারে কী হয়!

এই স্টিফেন হাউসেও ভূত রয়েছে বলে অনেকেই জানিয়েছেন। এ ব্যাপারে অনেকে আবার নিজেদের প্রত্যক্ষদর্শী বলেও দাবি করেছেন। বিশেষ করে নৈশপ্রহরীদের অনেকেই নাকি রাতের অন্ধকারে এই বাড়িতে অনেক রহস্যময় পুরুষকে যাতায়াত করতে দেখেছেন।

সেই সব পুরুষের বেশভূষা ও চলাফেরা নাকি অনেকটা সাহেবদের মতো। যাতায়াতের সময় তাঁদের মধ্যে একটা ব্যস্ততা ও গাম্ভীর্য দেখা যায়। তাঁরা কারও সঙ্গে কথা বলেন না। নিজের ব্যক্তিত্ব বজায় রেখে চলে যান। এই অফিস-সাহেবরা কেউই নাকি আসলে মানুষ নন! তাঁরা ছায়াশরীর মাত্র।

এক্ষেত্রে এই বাড়ির বিভিন্ন অফিসে যাঁরা রাতে অতিরিক্ত সময়ে কাজ করেন, তাঁরাও নাকি তেমন সাহেবভূতের দেখা পেয়েছেন। অনেকসময় কোনো এক সাহেবকে নাকি কেউ কেউ গভীর চিন্তায় মগ্ন থাকতেও দেখেছেন। বাণিজ্যিক সাফল্য-ব্যর্থতার নানা বিশ্লেষণ ও তথ্যই কি সেই সাহেবকে চিন্তিত করে রাখে? এর উত্তর অবশ্য পাওয়া যায়নি।

অনেকে আবার দাবি করেন, গভীর রাতে নাকি এই বাড়ির লিফট নিজে থেকে উপরে উঠে যায়, আবার নিজে থেকেই নীচে নেমে আসে। দরজাও নিজে থেকে খোলে, বন্ধ হয়। সন্দেহ নেই ব্যাপারটা নি:সন্দেহে অদ্ভুত।

আহিরিটোলার পুতুলবাড়ি

উত্তর কলকাতার অন্যতম প্রাচীন অঞ্চল হল আহিরিটোলা। শোনা যায়, আহিরিটোলার বেশ কয়েকটি বাড়িই নাকি দূষিত। সেই বাড়িগুলিতে নাকি অশরীরীদের নিত্য আনাগোনা।

ভৌতিক কারণেই বাংলা সাহিত্যেও আহিরিটোলা স্থান করে নিয়েছে। বিশেষ করে বলতে হয় পুতুলবাড়ির কথা। এই বাড়ি নিয়ে লীলা মজুমদার এবং সত্যজিৎ রায়ের লেখা ভয়ংকর ভৌতিক গল্প রয়েছে। সেই সব গল্পে কল্পনার আতিশয্য থাকলেও বাস্তবেও আহিরিটোলার পুতুলবাড়িটি নাকি একটি ভৌতিক বাড়ি। অনেকের বিশ্বাস এমনই।

তাঁদের মতে, কলকাতার সবচাইতে রহস্যময় স্থান হল আহিরিটোলার এই পুতুলবাড়ি। গভীর রাতে এই বাড়িটিতে নাকি অশরীরীদের দাপট ভয়ংকররকম বেড়ে যায়। এর পিছনে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও রয়েছে।

বাড়িটি ছিল বেশ বড়ো। বাড়িটিকে ঘিরে একটি বিশাল বাগানও ছিল। যদিও বাগানে ফুলগাছ কিছু থাকলেও বেশি থাকত আগাছাই। একসময় এই বাড়িতে এক বিত্তবান ব্যক্তির বাস ছিল।

তাঁকে দেখাশোনার জন্য সবসময় সেখানে দাসী-বঁাদিরা থাকত। শোনা যায়, সেই বিত্তশালী ব্যক্তির জন্য দাসী-বঁাদিরা শুধু ফাইফরমাশই খাটত না, প্রতিদিন বিছানায় তাঁকে যৌনসুখ দিতেও বাধ্য থাকত।

কিন্তু মালিকের এমন বদচরিত্র মেনে নিতে পারেনি অনেক দাসীই। তারা প্রতিবাদ করত। তবে সেইজন্য তাদের মূল্যও চোকাতে হত ভয়ংকর।

দাসীদের মধ্যে যারা মালিকের সঙ্গে যৌন সম্পর্কে যেতে রাজি হত না, বরং প্রতিবাদ করত, তাদের নাকি খুন করা হত। তারপর বাড়ির পিছনে আগাছা-ভরা মাটিতে সেই দাসীদের দেহ পুঁতে দেওয়া হত।

সেই নিহত দাসীদের আত্মা নাকি রাতের দিকে এই বাড়িটিকে ভয়ংকর করে তুলত। শুধু রাত নয়, কখনো কখনো ভরদুপুরেও বাড়িটি রোমহর্ষক হয়ে উঠত ওই আত্মাদের চলাফেরায়। এমনকী ওই মালিককেও তারা বাড়িতে শান্তিতে থাকতে দেয়নি।

তারপর কত বছর কেটে গিয়েছে, এখনও নাকি কোনো কোনো রাতে নারীদের গুমরে-ওঠা অসহায় কান্নার শব্দ শুনতে পাওয়া যায় এই বাড়িতে। সেই সব নারীর নাকি আজ কোনো অস্তিত্ব নেই। কারণ, তারা অশরীরী। মালিকের হাতে নিহত সেই দাসীদের অতৃপ্ত আত্মারাই নাকি কাঁদে।

রবীন্দ্র সরোবর মেট্রো স্টেশন

মেট্রো রেলে অত্যধিক হারে আত্মহত্যার ঘটনা এখন রেলমন্ত্রকের চিন্তার কারণ হয়ে উঠেছে। এত যেখানে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে, সেখানে ভৌতিক কাহিনি শোনা যাবে না তা হয় না।

রেলের ইতিহাসে মেট্রো রেল নিতান্তই নতুন। ১৯৮৪ সালের ২৪ অক্টোবর চালু হয় কলকাতার পাতাল রেল। তাই এখানকার প্রচলিত ভৌতিক চরিত্রগুলি কেউ সাহেব-মেম নন, সকলেই বাঙালি বা ভারতীয়।

এখন নাকি প্রায়ই শোনা যায় রাতের মেট্রো রেলের সুড়ঙ্গে কাদের যেন আর্তচিৎকার। সুড়ঙ্গপথে কারা যেন সারারাত ধরে চলাফেরা করে বলেও মেট্রো কর্মীদের অনেকে জানিয়েছেন। কিন্তু তাঁদের কেউ শনাক্ত করতে পারেননি। ফলে সেই দাবি মান্যতা পায়নি।

মেট্রো স্টেশনগুলির মধ্যে সবচেয়ে বেশি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে রবীন্দ্র সরোবর মেট্রো স্টেশনের লাইনে। বলা হয়ে থাকে, কলকাতার মেট্রো রেলের লাইনে ঝাঁপ দিয়ে যতগুলি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে, তার ৮০ শতাংশই নাকি ঘটেছে এই রবীন্দ্র সরোবর মেট্রো স্টেশনে।

সন্ধ্যার পর সেই অতৃপ্ত আত্মাদেরই আনাগোনা বাড়তে থাকে রবীন্দ্র সরোবর-সহ বিভিন্ন মেট্রো স্টেশনে। তবে তাদের প্রভাব বেশি থাকে রবীন্দ্র সরোবর মেট্রো স্টেশনেই। এই স্টেশনে নাকি সেই আত্মারা রীতিমতো আড্ডা বসায়। মাঝেমধ্যে অনেক রেলযাত্রীও তাদের মুখোমুখি পড়ে যান।

শোনা যায়, রবীন্দ্র সরোবর স্টেশন থেকে শেষ ট্রেনে যাঁরা উঠে থাকেন, তাঁদের অনেকেই এই অতৃপ্ত আত্মাদের দেখেছেন। তাঁদের কেউ কেউ নাকি ট্রেনের জন্য নির্জন স্টেশনে অপেক্ষা করার সময় সেখানে বিভিন্ন ছায়ামূর্তিকে ঘুরে বেড়াতেও দেখেছেন।

খিদিরপুর ডক

খিদিরপুর ডক ছিল নবাব ওয়াজেদ আলি শাহের নিজস্ব সম্পত্তি। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাঁকে মসনদচ্যুত করার পর নবাব কলকাতায় চলে আসেন। খিদিরপুর ডকেই প্রথম পা রাখেন তিনি। তার পর গা-ঢাকা দেওয়ার জন্য এই স্থানটিই বেছে নেন। সেই সময় বেশ কিছুদিন তিনি নিজের নবাবি কায়দায় জীবন কাটান এখানে।

খিদিরপুর ডক সম্পর্কে অনেক গা-ছমছমে কাহিনি শোনা যায়। এই অঞ্চলের অনেকেই বিশ্বাস করেন, নবাব ওয়াজেদ আলির আত্মা নাকি এখনও এই ডকে ঘুরে বেড়ায়। অনেকে নাকি সেই আত্মাকে দেখেছেনও। তখন নাকি তাঁকে ভয়ংকর ক্রুদ্ধ মনে হয়।

তাই মনে করা হয়, ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়ার ইচ্ছাতেই তাঁর অতৃপ্ত আত্মা এখনও গভীর রাতে খিদিরপুর ডকে ঘুরে বেড়ায়। আবার নবাবের এই ক্রোধোদীপ্ত রূপই শুধু তখন দেখা যায় না, দেখা যায় তাঁর অন্য আর এক রূপও। আসলে নবাব খুব সংগীতপ্রিয় মানুষ ছিলেন।

তাই কোনো কোনো রাতে এই ডকে নাকি উচ্চাঙ্গ সংগীতের সুরমূর্ছনা শোনা যায়। তখন নাকি সেই সংগীতের গুণমুগ্ধ শ্রোতা হিসেবে ওয়াজেদ আলি শাহকে মাথা দোলাতেও দেখা যায়। যেন নবাবের মেহফিল!

উইপ্রো অফিস

কলকাতার সল্ট লেকে যেখানে উইপ্রোর অফিস রয়েছে, সেখানে আগে মানুষের বাস ছিল না। আজ ঝাঁ-চকচকে অফিসটাকে দেখে মনে হবে না আগে সেখানে ছিল জঙ্গল আর জলাভূমি।

দুর্বৃত্তদের আশ্রয়স্থল ছিল এই জঙ্গল। এখানে তারা নেশাভাং করত। এ ছাড়াও এখানে যাবতীয় দুষ্কর্ম চলত। যেমন খুন, ধর্ষণ, অত্যাচার সবই অপরাধীরা এখানে বিনা বাধায় করে যেত। সবই চলত লোকচক্ষুর আড়ালে।

এ ছাড়াও তথ্য ঘাঁটলে এই জায়গাটির আরও একটি পরিচয় পাওয়া যায়। এখানে নাকি একটি পরিত্যক্ত কবরখানা ছিল। তবু সেই জায়গাটি সাধারণ মানুষ চিরকালই এড়িয়ে চলত। অনেকে নাকি এই জায়গায় আত্মহত্যাও করেছে। এমন নির্জন জায়গা আত্মহননের ক্ষেত্রে আদর্শই বটে। কেউ যদি আত্মহত্যা করতে চাইত, তাহলে তারা এই জায়গাটিই বেছে নিত।

সেই পরিত্যক্ত জমিতেই গড়ে উঠেছে এই বিশাল বহুতল। সেই বহুতলটিই আজ উইপ্রো বিল্ডিং। মূল অফিসটি তৈরি হয়েছে ঠিক কবরখানার উপরেই। স্বভাবতই এই উইপ্রো অফিস নিয়ে নানা রোমহর্ষক রহস্যকথা শোনা যায়।

উইপ্রো অফিসে অশরীরী অস্তিত্বের ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি তথ্য জানা যায় এখানকার নাইট গার্ডদের কাছ থেকে। তাঁদের অনেকেই নাকি এখানে ভয়াবহ অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছেন। অনেকে ভয়ে কাজও ছেড়ে দিয়েছেন।

তাঁরা জানিয়েছেন, রাতে এই অফিসের বিভিন্ন রুমে আপনা থেকেই সব কাগজপত্র ওলটপালট হতে থাকে। শুধু তাই নয়, কারও কোনো সাহায্য ছাড়াই বিভিন্ন বস্তু এক স্থান থেকে অন্য স্থানে চলে যায়। কিন্তু কীভাবে তখন এসব হয় তা বলতে পারেননি রক্ষীরা।

তবে সবচেয়ে যে ভয়ংকর কাহিনিটি শোনা যায় তা হল, গভীর রাতে আচমকা অফিসের চার-তলা থেকে নাকি নারীকন্ঠে চিৎকার শোনা যায়! ওই নারীকন্ঠটি যে কার, তা কেউই বলতে পারেননি।

শুধু তাই নয়, শেষরাতের দিকে অফিসে কাদের যেন ব্যস্ততা বেড়ে যায়। তাই একটা শোরগোলও পড়ে যায়। কারা যেন কোথায় যাওয়ার জন্য তাড়াহুড়ো করতে থাকে। নৈশপ্রহরীরাও ভয়ে তাদের বিরক্ত করেননি কখনো।

ভয়ের শেষ কিন্তু এখানেই হয়নি। কোনো কোনো রক্ষী জানিয়েছেন, রাতে তাঁরা নাকি একটি অল্পবয়সি মেয়েকে দেখেছেন। তার সারা শরীর নাকি রক্তে ভেসে যায়! সেনাকি কাঁদতে কাঁদতে ছুটে কোথায় যেন চলে যায়।

সকালে জায়গাটা ভালো করে খুঁজে দেখেছেন রক্ষীরা। রক্ত দূরের কথা, সেই মেয়েটির চলে যাওয়ার কোনো চিহ্ন তাঁরা সেখানে দেখেননি। উইপ্রো অফিস সম্পর্কে এমনই সব ভয়ের কাহিনি নৈশপ্রহরীদের কাছে শোনা যায়।

রয়্যাল ক্যালকাটা টার্ফ ক্লাব

কলকাতার সবাই এক ডাকে চেনে রেসকোর্সকে। জানে রেসকোর্স ময়দানের কথাও। একসময় ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতায় মুখরিত থাকত ক্যালকাটা টার্ফ ক্লাব খ্যাত রেসকোর্সের ময়দান।

দিনের বেলা এই রেসকোর্স বেশ স্বাভাবিকই থাকে। এখন অবশ্য ঘোড়দৌড়ের তেমন ব্যস্ততা থাকে না। তাই সারাদিন জায়গাটা থাকে একটু নিরিবিলিই। তবে তেমন অস্বাভাবিক কিছু সেখানে ঘটে না। তবে সব কিছু কেমন যেন বদলে যায় দিন গড়িয়ে রাত হলে।

গভীর রাতে কোনো কোনো সময় নাকি রেসকোর্সের ময়দান ভয়ংকর ব্যস্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু প্রশ্ন হল, ওই রাতে কেন এত ব্যস্ত হয়ে পড়ে ময়দান? এর উত্তর রেসকোর্সের সঙ্গে যুক্ত অনেকেই জানেন। প্রকাশ্যে কিছু না বললেও অনেকের কথায়, ওই সময় যারা ব্যস্ত থাকে, তারা নাকি কেউই মানুষ নয়।

আর ময়দান জুড়ে নাকি শোনা যায় অসংখ্য ঘোড়ার দৌড়ের শব্দ। যেন কোনো প্রতিযোগিতায় অসংখ্য ঘোড়া দৌড়ে বেড়াচ্ছে মাঠময়। চারদিকে উত্তেজনারও আভাস পাওয়া যায়। যেন অতীতের দিনগুলিতে যেভাবে দৌড়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ত রেসকোর্স, সেই ব্যস্ততা ফিরে আসে কোনো কোনো রাতে।

মাঝে মাঝে অস্পষ্ট দেখা যায় ঘোড়া নিয়ে কারা যেন দৌড়ে যাচ্ছে রেসকোর্সে। এর মধ্যে একটি দৃশ্য কখনো কখনো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একটি সাদা ঘোড়ায় চড়ে কোনো সাহেব যেন ছুটে যান। তারপর হঠাৎই বাতাসে মিলিয়ে যান। এই ঘটনার নেপথ্যে পরিষ্কার কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। তবে একটি কাহিনি এখনও লোকমুখে শোনা যায়।

যেমন, আগে ব্রিটিশ অভিজাত পরিবারের সদস্যরা এখানে ঘোড়সওয়ার হতেন। কখনো কখনো ব্রিটিশ রাজপরিবারের সদস্যদেরও নাকি এখানে ঘোড়সওয়ার হতে দেখা যেত। এবার বলি অভিজাত ব্রিটিশ জর্জ উইলিয়ামসের কথা। তাঁর একটি সাদা ঘোড়া ছিল। ঘোড়াটি ছিল দুরন্ত।

সেটিকে যথেষ্ট ভালো ট্রেনিংও দিয়েছিলেন জর্জ। মারাত্মক জোরে দৌড়োতে পারত ওই ঘোড়া। বহু প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়নও হয়েছে। তখন ঘোড়দৌড়ে সেই সাদা ঘোড়াটি বেশ নাম করেছিল। ঘোড়াটিকে খুব ভালোবাসতেন জর্জ। ঘোড়াটির একটি নামও তিনি দিয়েছিলেন। প্রাইড।

তবে একবার ঘটল এক অঘটন। প্রাইড ভয়ংকর অসুস্থ হয়ে পড়ে। অথচ তাকে নিয়ে অ্যানুয়াল টার্ফি টুর্নামেন্টে যোগ দেওয়ার কথা ছিল জর্জের। অনেক শ্রুশ্রূষা করলেন প্রাইডের, কিন্তু কোনো লাভ হল না। শেষে অসুস্থ প্রাইডকে নিয়েই প্রতিযোগিতায় অংশ নেন জর্জ এবং হেরে যান। হারে যতটা দুঃখ জর্জ পান, তার চেয়ে বেশি উদবিগ্ন হয়ে পড়েন প্রাইডের স্বাস্থ্য নিয়ে।

এরপর আসে সেই দিন। দিনটা ছিল শনিবার। সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে জর্জ দেখেন নির্দিষ্ট জায়গায় প্রাইড নেই। জর্জ খুঁজতে বের হন তাকে। দেখেন, খোলা ট্র্যাকের উপর মরে পড়ে আছে প্রাইড। স্তম্ভিত হয়ে যান জর্জ। ভেঙে পড়লেন শোকে। সহ্য করতে পারলেন না। শেষে তিনিও মারা গেলেন।

তারপর থেকে যে পূর্ণিমাগুলি শনিবার পড়ত, সেই দিনগুলির রাতে রেসকোর্স চঞ্চল হয়ে উঠত। সেখানে দেখা যেত সাদা ঘোড়ায় চেপে কে যেন ছুটে যাচ্ছে। ভালো করে লক্ষ করলে বোঝা যেত, প্রাইডের পিঠে চড়ে ছুটে চলেছেন জর্জ। যেন কোনো প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার জন্য একমনে অনুশীলন করে চলেছেন তিনি। সেই সময় পুরো রেসকোর্স ময়দান জর্জকে নিয়ে প্রদক্ষিণ করত প্রাইড।

এখনও নাকি কোনো কোনো পূর্ণিমার রাতে রেসকোর্সে প্রাইডকে নিয়ে জর্জ উইলিয়ামসকে ছুটে যেতে দেখা যায়!

জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি

জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির কথা জানেন না এমন বাঙালি পশ্চিমবাংলায় সম্ভবত নেই। শুধু বাংলা কেন, সারা ভারত এমনকী গোটা পৃথিবীর সংস্কৃতিপ্রাণ মানুষের অনেকেই ঠাকুরবাড়ির কথা জানেন। এই বাড়ির ইতিহাস ও সংস্কৃতি নিয়ে অনেকে চর্চাও করে থাকেন।

বাংলার সবচেয়ে বিখ্যাত ঠাকুর পরিবারের বাস ছিল এখানে। বর্তমানে ঠিকানা ৬বি দ্বারকানাথ ঠাকুর লেন। তবে এখন অবশ্য ওই অঞ্চলে বাড়িটিকে একটু বেমানানই লাগে।

কসমোপলিটান শহর কলকাতার ওই অঞ্চল এখন অবাঙালি অধ্যুষিত। আর অপ্রিয় সত্য হল, ব্যাবসাবাণিজ্য ছাড়া বাংলার শিক্ষা-সংস্কৃতি নিয়ে তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য উৎসব-অনুষ্ঠান আর ওই অঞ্চলে এখন দেখা যায় না। বাঙালির কাছেও বর্তমানে সব কেমন যেন সহনশীল হয়ে গিয়েছে। কেবল ২৫ বৈশাখ এলেই মনে পড়ে ঠাকুরবাড়ির কথা।

জোড়াসাঁকো অঞ্চলের আদি নাম ছিল মেছুয়াবাজার। ঠাকুর পরিবার ছাড়াও এই অঞ্চলে তখন বহু জ্ঞানী ও প্রভাবশালী বাঙালির বাস ছিল। যেমন বাংলার নবজাগরণের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক সিংহ পরিবার, যে পরিবারকে আমরা কালীপ্রসন্ন সিংহের পরিবার বলে জানি।

আবার সেখানেই ছিল কৃষ্ণদাস পালের ‘পাল পরিবার’-এর বাড়ি। দেওয়ান বেনারসি ঘোষ ও চন্দ্রমোহন চট্টোপাধ্যায়ের পারিবারিক অট্টালিকা বা বাড়িও ছিল ওই অঞ্চলেই। সেই সময় বাংলার শিক্ষা-সংস্কৃতিতে এই পরিবারগুলির অবদান অনস্বীকার্য।

যে জমির উপর বর্তমানে ঠাকুরবাড়িটি দাঁড়িয়ে রয়েছে, সেই জমিটি নীলমণি ঠাকুরের। নীলমণি ঠাকুর হলেন দ্বারকানাথ ঠাকুরের ঠাকুরদা। আর একথা তো সকলেরই জানা যে দ্বারকানাথ ছিলেন রবীন্দ্রনাথের ঠাকুরদা।

নীলমণি ঠাকুরকে জমিটি দিয়েছিলেন সেই সময়ের বিখ্যাত ধনীপতি বৈষ্ণবচরণ শেঠ। শেঠের কাছ থেকে গৃহদেবতা লক্ষ্মীজনার্দন জিউয়ের নামে দেবোত্তর সম্পত্তি হিসেবে জমিটি পান নীলমণি ঠাকুর।

তবে জমিতে বিশাল কোনো বাড়ি তৈরি করে যেতে পারেননি তিনি। আর্থিক অবস্থা কিছুটা ভালো হলে তিনি সেখানে কেবল একটি ইমারত তুলে যান। তাঁর উত্তরাধিকারীরাই ওই জমিতে ধীরে ধীরে বাড়ি তোলেন। দ্বারকানাথ আর্থিক দিক দিয়ে বিত্তবান ও প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে ব্রিটিশ আমলে খ্যাতিলাভ করেছিলেন। তাঁর সময়েই ওই বাড়ি ঠাকুরবাড়ির চেহারা পায়।

উনিশ শতকে বাঙালির সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনে এই বাড়ির সদস্যরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর বা তাঁর পুত্র রবীন্দ্রনাথের কথা তো সকলেরই জানা। এই বাড়িতেই জন্ম হয়েছিল রবীন্দ্রনাথের। ১৯৪১ সালে এই বাড়িতেই তিনি পরলোকগমন করেন।

১৯৬২ সালের ৮ মে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মশতবর্ষে ঠাকুরবাড়িতে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের উদবোধন করেছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু। শিক্ষাক্ষেত্রে এই বিশ্ববিদ্যালয়েরও বেশ প্রভাব রয়েছে।

যা-ই হোক, এবার আসা যাক মূল কথায়। একথা ঠিক, ঠাকুরবাড়িকে ‘ভূতুড়ে বাড়ি’ বলাটা হয়তো পুরোপুরি ঠিক হবে না। তবু ভৌতিক বিষয়ের সঙ্গে এই বাড়ির একটা নিবিড় যোগাযোগ ছিল। রবীন্দ্রনাথ-সহ এই বাড়ির অনেকেই পরলোকচর্চা করতেন। প্ল্যানচেটে অনেক বিদেহী আত্মার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ এবং এই বাড়ির আরও অনেক সদস্যই যোগাযোগ করতেন।

কিন্তু অশরীরী উপস্থিতি? হ্যাঁ, তেমন তথ্যও রয়েছে। যেমন শোনা যায়, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সময় এই বাড়িতে একটি পুকুর ছিল। পরবর্তীকালে সেই পুকুরটি ভরাট করা হয়। দেবেন্দ্রনাথের স্ত্রী সারদা দেবী নাকি সেই জায়গায় নানা অশরীরী উপস্থিতির প্রমাণ পেয়েছিলেন।

সেখানে কাউকে নাকি কখনো তিনি খিলখিলিয়ে হেসে উঠতে শুনতেন, কখনো-বা কারও চাপা গলায় কান্নার আওয়াজও শুনতে পেতেন, আবার কারও ক্রুদ্ধ আস্ফালনও সেখানে নাকি তিনি টের পেতেন।

যে জায়গায় পুকুর ভরাট হয়েছিল, ১৯০৫ সালে মৃত্যুর পর দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের দেহ দাহ হওয়ার পর তার কিছু ভস্ম রাখা হয়েছিল সেখানে। ঠাকুরবাড়ির বড়োছেলে ছিলেন দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর।

আর তাঁর ছেলে ছিলেন দ্বিপেন্দ্রনাথ ঠাকুর। এই দ্বিপেন্দ্রনাথের সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল হেমলতা দেবীর। হেমলতাকে খুবই স্নেহ করতেন দেবেন্দ্রনাথ। ১৯৫২ সালে সেখানেই দেবেন্দ্রনাথের ছায়াশরীর দেখেছিলেন হেমলতা দেবী।

শুধু হেমলতা দেবী নন, ১৯৬২ সালে ঠাকুরবাড়ির নৈশপ্রহরী দুর্যোধন ঢাল ও অন্যতম গাড়ির চালক মিশরির কাছ থেকে অনেক তথ্য পেয়েছিলেন রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের মিউজিয়ামের কিউরেটর সমর ভৌমিক।

ওই দু-জন নাকি দেবেন্দ্রনাথ এবং রবীন্দ্রনাথ, দু-জনেরই ছায়াশরীর অনেক বার দেখেছেন। একবার নাকি দেবেন্দ্রনাথের অশরীরী আত্মা তাঁদের সঙ্গে কথাও বলেছিল। কারও কথা জানতে চেয়েছিল। তাঁদের অনুমান, রবীন্দ্রনাথের আত্মার কথাই জানতে চেয়েছিল দেবেন্দ্রনাথের আত্মা।

এবার বলা যাক মৃণালিনী দেবীর কথা। মৃণালিনী দেবী যে রবীন্দ্রনাথের স্ত্রী ছিলেন সেকথা সকলেরই জানা। ১৯০২ সালে তিনি অকালেই প্রয়াত হন। তার ঠিক দু-বছর পর কোনো এক উপলক্ষ্যে ১৯০৪ সালে একটি পারিবারিক ছবি তোলা হয়েছিল ঠাকুর পরিবারের।

সেখানে পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথও উপস্থিত ছিলেন। ছবি তোলার পর দেখা গেল অস্বাভাবিক ব্যাপার। রবীন্দ্রনাথের ঠিক পিছনেই নাকি দেখা গিয়েছিল এক মহিলার অস্পষ্ট ছবি। ভালো করে দেখে অনেকেই বুঝেছিলেন, ওই অস্পষ্ট ছবিটি ছিল স্বয়ং মৃণালিনী দেবীর।

মৃত্যুর দু-বছর পরেও তিনি নাকি ঠাকুরবাড়ি এবং রবীন্দ্রনাথের প্রতি নিজের মায়া ত্যাগ করতে পারেননি। তাই তাঁর ছায়াশরীর নাকি সবসময় রবীন্দ্রনাথকে খেয়াল রাখত। ঘুরে বেড়াত ঠাকুরবাড়িতে। এ ছাড়া ঠাকুরবাড়িতে আত্মঘাতী হওয়া কাদম্বরী দেবীর ছায়াশরীর দেখতে পাওয়ার কথাও শোনা যায়।

নিউ মার্কেট

কলকাতার ব্যস্ত জায়গাগুলির মধ্যে অন্যতম হল লিণ্ডসে স্ট্রিটের এই নিউ মার্কেট। ১৮৭৪ সালের ১ জানুয়ারি এই নিউ মার্কেট প্রতিষ্ঠিত হয় মূলত স্যার স্টুয়ার্ট হগের উদ্যোগেই। তখন তিনি ছিলেন কলকাতা কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান। মার্কেটটির স্থপতি ছিলেন রিচার্ড রসকেল বাইন।

ব্রিটিশদের কথা ভেবেই তিনি ওই বিল্ডিংকে মার্কেটে রূপান্তরিত করার দায়িত্ব নিয়েছিলেন। এর কারণ ছিল তাঁর ভারতীয় বা নেটিভ বিদ্বেষ। একই বাজারে যাতে ভারতীয় এবং ব্রিটিশদের বাজার করতে না-হয়, তাই এই নতুন বাজারের প্রতিষ্ঠার ভাবনা আসে তাঁর মাথায়। এই বাজারে তখন কোনো ভারতীয়ের প্রবেশাধিকার ছিল না।

অনেকে বলেন, এখনও কোনো কোনো রাতে নাকি স্যার হগকে এই মার্কেটের বিল্ডিঙের করিডোরে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়। অনেক সময় সেখানে ভারতীয়দের যাতায়াত দেখে বিরক্তিও প্রকাশ করেন। যাঁরা স্যার হগকে চেনেন না, তাঁদের কেউ কেউ নাকি অচেনা বিদেশি ভেবে তাঁকে অত রাতে সেখানে থাকা ঠিক নয় বলে চলে যেতেও অনুরোধ করে থাকেন।

কিন্তু স্যার স্টুয়ার্ট হগকে যেহেতু এই মার্কেটের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা বলা যায়, তাই হগ সাহেব এখনও নিজেকে তেমনই প্রভাবশালী বলে মনে করেন। তাই যাঁরা তাঁকে সেখান থেকে চলে যেতে বলেন, তাঁদের সেই অনুরোধ তিনি নাকি প্রত্যাখ্যানও করেন। বরং নেটিভদের তিনি নাকি ওই মার্কেট ছেড়ে চলে যাওয়ার পালটা নির্দেশ দিয়ে থাকেন।

আবার কোনো কোনো দিন গভীর রাতে এই মার্কেটে নাকি তিন অ্যাংলো ইন্ডিয়ান মহিলাকে চিৎকার করতে শোনা যায়। তাঁরা ‘বঁাচাও বঁাচাও’ বলে চিৎকার করে সকলের সাহায্য চান।

অথচ তাঁদের কাউকেই সরাসরি দেখতে পাওয়া যায় না। ওই বাজারে যাঁরা রাত কাটান, শোনা যায় তাঁদের কেউ কেউ সেই মহিলাদের চিৎকার শুনে বাইরে বেরিয়ে এসেছেন। অনেকে খোঁজারও চেষ্টা করেছেন তাঁদের। কিন্তু মার্কেটের কোথাও তাঁদের খুঁজে পাওয়া যায়নি। শোনা যায়, ওই তিন অ্যাংলো ইন্ডিয়ান মহিলাকে এই মার্কেটেই খুন করা হয়েছিল।

ওবেরয় গ্র্যাণ্ড

কলকাতার বিখ্যাত ও অভিজাত ফাইভ স্টার ডিলাক্স হোটেলগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ওবেরয় গ্র্যাণ্ড। এই হোটেলের গঠনকাঠামো ভিক্টোরীয় স্থাপত্যে তৈরি। হোটেলটির অভ্যন্তর ভাগের সৌন্দর্য অসামান্য।

চৌরঙ্গির হোটেল বিল্ডিংটি প্রথমে ছিল ব্রিটিশ কর্নেল গ্র্যাণ্ডের বাসস্থান। পরে সেটি একটি বোর্ডিং হাউসে পরিণত হয়। পরবর্তীকালে সেটি হয় একটি থিয়েটার হল। কিন্তু ১৯১১ সালে আগুনে পুড়ে যায় হলটি।

হলটির শেয়ারহোল্ডার যাঁরা ছিলেন, তাঁদেরই এক শেয়ারহোল্ডার স্টিফেন সাহেব তখন হলটি কিনে নেন। তিনিই হলটিকে গ্র্যাণ্ড হোটেলের রূপ দেন। এর পর ১৯৩৯ সাল থেকে ১৯৪৩ সালের মধ্যে হোটেলটি কিনে নিয়ে সংস্কার করেন মোহন সিং ওবেরয়। এই মোহন সিং ওবেরয়ই হলেন ‘দ্য ওবেরয় গ্রুপ অফ হোটেলস’-এর জনক। এই হোটেলেও নানা প্যারানর্মাল ঘটনা ঘটার কথা শোনা যায়। যদিও হোটেল কতৃপক্ষ সেই সব কখনো স্বীকার করেননি।

তবে হোটেলে যেসব অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটেছে বলে শোনা যায়, সেই সব ঘটনা নিয়ে এখনও যাঁরা সেই হোটেলে যাতায়াত করে থাকেন, তাঁদের অনেকেই আলোচনা করে থাকেন। হোটেল বিল্ডিংটির বিভিন্ন দিকে বিভিন্ন প্রান্ত রয়েছে। তেমনই একটি প্রান্তের নাম ‘চৌরঙ্গি উইং’।

তবে এই প্রান্তটি প্রাচীর তুলে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। হঠাৎ এই দিকটি বন্ধ করে দেওয়া হল কেন, সেই বিষয়ে কোনোরকম আলোকপাত করা হয়নি হোটেল কতৃপক্ষের তরফে। অনেকে মনে করেন, ভৌতিক কারণেই ওই প্রান্তটি বন্ধ করে দেওয়া হয়।

উল্লেখ্য, এই প্রান্তে বহু ঘরও সিল করে প্রাচীর তুলে দেওয়া হয়েছে। ফলে এই হোটেলে আসা অতিথি এবং কর্মীদের কাছ থেকে এই প্রান্তটি পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছে। বলা বাহুল্য, ঘটনাটি একটু অস্বাভাবিকই।

এই হোটেলের সঙ্গে বিখ্যাত পিয়ানিস্ট আফ্রিকান-আমেরিকান টেডি ওয়েদারফোর্ডের নাম জড়িয়ে রয়েছে। ১৯৪০-এর দশকে তিনি এই গ্র্যাণ্ড হোটেলের সঙ্গে মানসিকভাবেও জড়িয়ে পড়েন। ১৯৪৫ সালে কলেরায় আক্রান্ত হয়ে তিনি মারা যান। গল্পটা শুরু হয় তারপরই। তাঁকে নাকি তখন থেকে প্রায় রাতেই চৌরঙ্গি উইং-এর করিডোরে ঘুরে বেড়াতে দেখা যেত।

শুধু তাই নয়, বিভিন্ন ঘরের দরজায় নাকি তিনি টোকাও দিতেন। এমনকী সেখানে থাকা পিয়ানোটিও নাকি নিজে নিজেই বেজে উঠত। তার বোতামগুলি নিজে থেকে ওঠা-নামা করত। একবার তো ওয়েদারফোর্ডকেই বাজাতে দেখা গিয়েছে। অবশ্য এই তথ্যকে গুজব বলে উড়িয়ে দিয়েছেন হোটেল কর্তৃপক্ষ।

ওয়েদারফোর্ডের জন্ম ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ায়। ১৯২৬ সালে আমেরিকা ছেড়ে এশিয়ায় নিজের কেরিয়ার গড়তে চলে আসেন। ভারতে আসেন ১৯৩৬ সালে। তাঁর কেরিয়ার শুরু করেন বোম্বের তাজ হোটেলে। ১৯৪১ সালে আসেন কলকাতায়। এই শহরে আসার পর মাত্র চার বছর বেঁচেছিলেন তিনি। শোনা যায়, পিয়ানো বাজানোর সময় ছাড়া বাকি সময়গুলিতে তিনি উদাসীন থাকতেন। কোনো এক বিষাদ তাঁর চোখে-মুখে সবসময় বিরাজ করত।

হোটেল কর্তৃপক্ষ অস্বীকার করলেও ভেরোনিকা বালসারা বলে এক নৃত্যশিল্পীও নিজের চোখে দেখেছিলেন ওই পিয়ানিস্টের আত্মা। ভেরোনিকা ছিলেন সিবিল হাটসনের মেয়ে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি, তাঁর দুই বোন মের্লিন ও আলিসা মিলে ‘হাটসন সিস্টার্স’ হিসেবে বিভিন্ন জায়গায় নাচতেন।

কলকাতার গ্র্যাণ্ড হোটেলে তিনিও নিজের নৃত্যজীবনের বেশ কিছুটা সময় কাটিয়েছিলেন। তিনিই এক ভারতীয় সাংবাদিককে জানিয়েছিলেন তাঁর প্রত্যক্ষ ভৌতিক অভিজ্ঞতার কথা। একদিন গভীর রাতে নাচ শেষে তিনি ফিরছিলেন হোটেলে নিজের ঘরে। সেইসময় তিনি দেখেছিলেন ব্রাউন সুট পরে দাঁড়িয়ে রয়েছেন স্বয়ং ওয়েদারফোর্ড।

তিনি ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে উদাসীনভাবে বাইরের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। প্রথমে ভেরোনিকা ভেবেছিলেন, যিনি ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে রয়েছেন তিনি সম্ভবত ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট দলের কোনো খেলোয়াড় হবেন। তখন ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট দলটি উঠেছিল গ্র্যাণ্ডেই।

তাই কৌতূহলবশত কাছে গিয়ে তাঁর মুখটি ভালো করে দেখেন ভেরোনিকা। আশ্চর্য হয়ে যান সেই মুখ দেখে। অদ্ভুত এক বিষাদে ঢাকা ছিল সেই মুখ। আর, তিনি ওয়েস্ট ইন্ডিজের কোনো ক্রিকেটার নন, তিনি স্বয়ং ওয়েদারফোর্ড!

সেই রাতেই ঘটল আরও একটি অদ্ভুত ঘটনা। হোটেলের কর্মীদের অনেকেই জানান, রাতে নাকি ব্রাউন সুট পরা সেই ব্যক্তিটি তাঁদের ঘরের দরজায় টোকা দিয়েছেন। কেবল তা-ই নয়, রাতেই পিয়ানো বাজানোর আওয়াজও শোনেন তাঁরা। অনেকে বেরিয়ে আসেন ঘর থেকে। দেখেন, ওই ব্রাউন সুটপরা লোকটিই বাজাচ্ছেন পিয়ানো। সব সুরও ওয়েদারফোর্ডেরই। তখন সকলেই বুঝতে পারেন, লোকটি আসলে ওয়েদারফোর্ডের ছায়াশরীর।

শুধু ওবেরয় গ্র্যাণ্ড কেন, কলকাতার আরও অনেক হোটেল সম্পর্কেই নানা ভূতুড়ে কথা শোনা যায়। যেমন হোটেল হিন্দুস্থান সম্পর্কে এক অতিথিও তাঁর ভৌতিক অভিজ্ঞতার কথা শুনিয়েছিলেন।

রাত আড়াইটে থেকে সাড়ে তিনটের মধ্যে অনেক বার তিনি এক-তলা থেকে চার-তলায় লিফট উঠতে, তার দরজা খুলতে ও বন্ধ হতে দেখেছেন। অথচ কাউকে বের হতে বা সেখানে ঢুকতে দেখেননি। যেসময় তিনি এসব দেখেছিলেন, সেই সময় সেই লিফট মোটেও তত অত্যাধুনিক ছিল না।

বিবেকানন্দ উড়ালপুল দুর্ঘটনা

২০১৬ সালের ৩১ মার্চ উত্তর কলকাতার গণেশ টকিজ-পোস্তা অঞ্চলে নির্মীয়মান বিবেকানন্দ উড়ালপুল ভেঙে পড়ে। প্রাণ যায় ছাব্বিশ জনের। আহত শতাধিক। দুর্ঘটনার পর রাজনৈতিক তরজা শুরু হয়ে যায়। পরে অবশ্য ব্যাপারটা স্বাভাবিক নিয়মেই থিতিয়ে যায়।

কিন্তু দুর্ঘটনার কিছুদিন পর থেকেই এই উড়ালপুল সম্পর্কে নানা কথা শোনা যেতে থাকে। বলা হতে থাকে, রাতে নাকি দুর্ঘটনাস্থলের কাছাকাছি কেউ যাওয়ার সাহস পায় না। রাতে সেখানে নাকি হঠাৎ কেউ এসে স্থানীয়দের কাছে জল চান। বিশেষ করে দোকানদারদের কাছে। জল দিতে গিয়ে বিপাকে পড়েছেন অনেকেই। কারণ, তখন নাকি কাউকেই আর দেখতে পাননি তাঁরা।

এই ঘটনা এক বার ঘটেনি, ঘটেছে অনেক বার। অনেকেই নাকি এমন অদ্ভুত ঘটনার সম্মুখীন হয়েছেন। স্বভাবতই বিষয়টি অতিপ্রাকৃত কি না, তা নিয়ে জল্পনা শুরু হয়ে যায়। অনেকের স্মৃতিতেই ফিরে আসে, গরমের সময় উড়ালপুল চাপা পড়েছিলেন যাঁরা, বেঁচেছিলেন কিছুটা সময়, তাঁরা নাকি স্থানীয়দের কাছে জল চেয়েছিলেন। তাই মৃত্যুর পর তাঁদেরই আত্মা জল চেয়ে বেড়াচ্ছে কি না, তা নিয়ে কথা চলতে থাকে।

আরও একটি ঘটনার কথা শোনা যায়। রাতে এই দিক থেকে কোনো ফাঁকা ট্যাক্সি গেলে কেউ হাত দেখিয়ে থামান। উঠে বসেন ট্যাক্সিতে। গাড়িতে স্টার্ট দিয়ে ওই এলাকা ছাড়ার আগেই ট্যাক্সির পিছনে তাকিয়ে ড্রাইভারের চোখ কপালে উঠেছে। যাত্রীর আসনে নাকি কেউই নেই। প্রশ্ন হল, যিনি ট্যাক্সি থামিয়ে যাত্রী হিসেবে উঠে বসলেন, তিনি কোথায় গেলেন? তা হলে কী...!

এমন সব ঘটনার কথা যদি কোনো অঞ্চল সম্পর্কে শোনা যায়, তাহলে রাতে সাধ করে কে আর সেখানে যাবে? বিবেকানন্দ উড়ালপুলের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। রাতে বিবেকানন্দ উড়ালপুলের দুর্ঘটনাস্থলের দিকটি অধিকাংশ মানুষই এড়িয়ে চলতে শুরু করেন। গভীর রাতে দুর্ঘটনাস্থলটি প্রায় ফাঁকাই থাকে এখন। তবে এসব কথা অনেকেই বিশ্বাস করেন না। অনেকেই গুজব বলে উড়িয়ে দেন। তাঁরা বলেন, ভিত্তিহীন আষাঢ়ে গল্প নাকি এসব।

সত্যি-মিথ্যে যা-ই হোক, এমন ঘটনা যে বেশ রোমাঞ্চকর তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ব্যাপারটা হয়তো অনেকেই স্বীকার করবেন।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%