কবন্ধ কিশোর

উপমন্যু রায়

দার্জিলিঙের ছোটো পাহাড়ি স্টেশন হল কার্শিয়াং। দার্জিলিং থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে রয়েছে পাহাড়ি স্টেশনটি। সারা বছরই এখানকার আবহাওয়া অত্যন্ত মনোরম। স্থানীয় ভাষা খারসাং। খারসাং মানে সাদা অর্কিডের ভূমি। বাস্তবিকই শান্তিতে সময়-কাটানোর ক্ষেত্রে এটি একটি শান্ত ও সুন্দর জায়গা। কিন্তু এই পাহাড়ি উপত্যকার একটি অন্ধকার দিকও আছে।

এই জায়গার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে খুনজখম এবং নানা ধরনের ভৌতিক কাহিনিও। স্থানীয় মানুষের মতে, ভিক্টোরিয়া বয়েজ হাই স্কুলটিই নাকি অশরীরীদের প্রধান আশ্রয়স্থল। ডিসেম্বর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত ঠাণ্ডার জন্য ওই স্কুল বন্ধ থাকে। তখন নাকি স্কুলে গেলে ফিসফিস শব্দ, কারও হাঁটাচলার আওয়াজ এবং হঠাৎ হঠাৎ দমকা ভূতুড়ে হাওয়া যে-কাউকে চমকে দেবে। অথচ তখন খালিচোখে কাউকে দেখা যায় না।

স্কুলের কাছেই রয়েছে ডাউ পাহাড়ি অরণ্য। বলা বাহুল্য, এই অরণ্যটি একটি রহস্যময় জায়গা। এখানে বহু মানুষ খুন হয়েছেন। সেই কারণে সাধারণ মানুষের অনেকেই বাধ্য না-হলে ওই অরণ্যের পথে যান না। স্বাভাবিক কারণেই এখনও অরণ্যটি বেশ নির্জন।

যদি আমরা ভৌতিক স্থানগুলির কথা বিশ্লেষণ করি, তাহলে বোঝা যাবে কেন এই অঞ্চলকে ভূতুড়ে জায়গা বলা হয়। এখানে বহু অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয়দের বিশ্বাস, সেই অতৃপ্ত আত্মারাই এই অরণ্যকে রহস্যময় ও ভীতিজনক করে রেখেছে। কার্শিয়াঙের ক্ষেত্রেও কথাটি সত্য।

এক্ষেত্রে সবচেয়ে ভয়ংকর কাহিনিটি একটি মুন্ডহীন কিশোরকে নিয়ে। ডাউ হিল রোড এবং ফরেস্ট অফিসের মাঝের রাস্তাটিকে বলা হয় মৃত্যু সড়ক। অন্তত সেখানকার মানুষ এই নামেই রাস্তাটির কথা বলে থাকেন। এখানে যেসব কাঠুরেরা আসেন, এ ব্যাপারে তাঁদের অনেকেই রক্ত ঠাণ্ডা করে দেওয়া নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা বিভিন্ন সময়ে বলে থাকেন।

তাঁরা নাকি এখানে বহু বার একটি মাথাহীন কিশোরবয়স্ক ছেলেকে দেখেছেন। ছেলেটি নাকি নিজের মনে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যায়। কখনো-বা সেগাছেও ওঠে একটি স্বাভাবিক ছেলের মতো। অরণ্যে যে-কেউ যান-না কেন, কিছু দেখার আগেই সকলের একটা অস্বস্তিকর অনুভূতি হতে থাকে। বার বার মনে হবে, এই অরণ্যে কেউ বুঝি আপনাকে অনুসরণ করে চলেছে।

স্থানীয়দের কয়েক জন আবার বলেছেন, তাঁরা ওই অরণ্যের ঘন ও অন্ধকার জায়গা পার হওয়ার সময় অদ্ভুত একটা রক্তবর্ণের চোখ দেখেছেন। আবার অরণ্যের মধ্যে অনেকসময় ধূসর পোশাক পরিহিতা এক মহিলাকেও দেখা যায়। তবে সেই মহিলাকে বেশি সময় দেখা যায় না। মুহূর্তের মধ্যেই ওই মহিলা অরণ্যের অন্ধকারে মিলিয়ে যায়।

আবার কখনো কখনো এই রহস্যজনক অরণ্য থেকে চিৎকার করতে করতে মহিলাটি বেরিয়ে আসে। তবে তা দেখা যায় কয়েক মুহূর্তের জন্যই। শোনা যায়, এই অরণ্যে ঘুরতে যাওয়া মহিলা ও শিশুদের অনেকেই এমন দৃশ্য দেখে অনেক বার আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। অনেকে অজ্ঞানও হয়ে গিয়েছেন।

অনেকেই বলে থাকেন, তাঁরা রাস্তা এবং অরণ্যে অনেক অশরীরী শক্তি বা আত্মাকে দেখেছেন। তখন তাঁরা এমন অদ্ভুত ও ভয়ংকর অনুভূতির মধ্যে পড়ে যান যে, তাঁদের অনেকেই নিজেদের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন এবং বেশ কিছু সময় এই ট্রমার মধ্যে থাকেন। অনেকে নাকি সেই ট্রমা কাটিয়ে উঠতে না-পেরে আত্মহননের পথও বেছে নিয়েছেন।

এবার বলি একটি রেলস্টেশনের কথা। স্টেশনটির নাম বেগুন কোদর। রাতের দিকে এই স্টেশনই নাকি একেবারে বদলে যায়। স্টেশনেরই ফাঁকা রেলওয়ে ট্র্যাক ধরে সাদাশাড়ি পরিহিতা এক রহস্যময় মহিলা হেঁটে যায়!

মহিলাটি সম্পর্কে জানতে চাইলে সেখানকার বাসিন্দাদের মুখে একটা অবিশ্বাস ও বিস্ময় একইসঙ্গে ফুটে ওঠে। পাশাপাশি ভয়ার্ত চোখে তাকান তাঁরা। পশ্চিমবাংলার পুরুলিয়া জেলার এই স্টেশনটি ভারতীয় রেলওয়ের একটি ভূতুড়ে স্টেশন হিসেবে পরিচিত।

তথ্য বলছে, ১৯৬০-এর দশকে সাঁওতাল উপজাতির রানি লচন কুমারী সেই অঞ্চলের মানুষের উন্নতির জন্য নিজের জমির একটা বড়ো অংশ রেলওয়েকে দিয়েছিলেন। তারপরই বেগুন কোদর স্টেশনটি তৈরি হয় এবং সেটি সেখানকার মানুষের লাইফলাইন হয়ে দাঁড়ায়।

কিন্তু ১৯৬৭ সালে স্টেশনটি একটি অপ্রত্যাশিত সমস্যায় পড়ে যায়। স্থানীয়রা বিশ্বাস করেন, ওই বছরই এক রাতে স্টেশনমাস্টার রেলওয়ে ট্র্যাকে প্রথম বার সাদাশাড়ি পরিহিতা মহিলাটিকে দেখেন। দেখে খুবই ভয় পেয়ে যান। পরের দিনই তিনি মারা যান।

খবরটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। তখন থেকেই যাত্রী এবং রেল, দুই পক্ষই এই স্থানটি ত্যাগ করে। সেই সময় থেকেই স্টেশনটি ‘ভূতুড়ে স্টেশন’ হিসেবে পরিচিত হয়ে যায়। কিন্তু বিয়াল্লিশ বছর পরে ২০০৯ সালে স্টেশনটি ফের চালু হয় ভারতের তৎকালীন রেলমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্যোগে।

কিন্তু এখানকার মানুষের মন থেকে সেই ভয় কখনো পুরোপুরি মুছে যায়নি। অনেকেই বিশ্বাস করেন সেখানে অস্বাভাবিক শক্তির উপস্থিতি রয়েছে। তাই বিকেল সাড়ে পাঁচটার পর আজও স্টেশন পুরোপুরি জনশূন্য হয়ে যায়।

এবার বলি আরও একটি রহস্যজনক ঘটনার কথা। পশ্চিমবাংলার সুন্দরবন অঞ্চলের মৎস্যজীবীদের কাছে ‘আলেয়ার আলো’ বা ‘ভূতুড়ে আলো’ কথাটি অতিপরিচিত। ইংরেজিতে যাকে ‘আলেয়া ঘোস্ট লাইটস’ বলা যেতে পারে। সহজ ভাষায় এটিকে অনেকে ‘মার্শাল লাইটস’ বলেও উল্লেখ করে থাকেন।

একথা ঠিক, গ্রামেগঞ্জে বা নির্জন জায়গায় মাঝে মাঝে এমন আলো ভেসে উঠতে দেখা যায়। বলা হয়ে থাকে, সুন্দরবনের সেই আলো নাকি ফসফরাসের আলো নয়। যেখানে ওই ভূতুড়ে আলো দেখা যায়, মনে করা হয় সেই আলো আসলে কোনো মৎস্যজীবীর আত্মা।

ওই আলো যাঁরা দেখেছেন, তাঁরা শুধু ওই আলো দেখেনইনি, ওই আলোর প্রতি তীব্র আকর্ষণ বোধ করেছেন। তবে সেখানকার মৎস্যজীবীরাই বলে থাকেন, ওই আকর্ষণ অনুভব করলেও কারও উচিত নয় সেই আলোর দিকে এগিয়ে যাওয়া বা সেই আলোকে অনুসরণ করা।

কিন্তু কী এমন কারণ থাকতে পারে যে, মৎস্যজীবীরা ওই আলো অনুসরণ করতে বারণ করে থাকেন? এর জবাবও রয়েছে মৎস্যজীবীদের কাছে। তাঁরা বলেছেন, কেউ যদি সেই আলো অনুসরণ করেন বা সেই আলোর দিকে এগিয়ে যেতে থাকেন, তখনই নাকি বিপদ ঘনিয়ে আসে।

তাঁদের বিশ্বাস, তাঁরা ওই আলো দেখে বিভ্রান্তও হয়ে যান। তাই ফেরার পথ তাঁরা হারিয়ে ফেলেন। এই কাহিনি সেখানকার মৎস্যজীবীদের অধিকাংশেরই জানা।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%