ক্ষমতার অলিন্দে অশরীরী রহস্য

উপমন্যু রায়

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর আমেরিকাই একমেরু বিশ্বের অধীশ্বর। গত তিরিশ বছরে অর্থনীতি ও প্রতিরক্ষায় চীন যত উন্নতিই করুক-না কেন, বর্তমান পৃথিবীতে আমেরিকাই শেষ কথা। একথা না মেনে উপায় নেই।

সেই আমেরিকার অভ্যন্তরীণ শাসননীতি থেকে অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি থেকে কূটনীতি সব কিছু নিয়ন্ত্রিত হয় যে-বাড়ি থেকে, সেই বাড়ির নাম হোয়াইট হাউস। ক্ষমতাসীন অবস্থায় এই হাউসেই বাস করতে হয় মার্কিন প্রেসিডেন্টকে।

১৭৯০ সালে হোয়াইট হাউসের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন প্রথম প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটন। আর এই বিশাল বাড়িটি তৈরি হয় ১৭৯২ সাল থেকে ১৮০০ সালের মধ্যে। এই সুবিশাল অট্টালিকার স্থপতি ছিলেন কিন্তু আয়ারল্যাণ্ডের মানুষ জেমস হোবান। শোনা যায়, এই বিশাল ভবনটি তৈরির পিছনে রয়েছে এক করুণ ইতিহাস। ভবনটি নির্মাণে শ্রমিক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল অসংখ্য কালো চামড়ার ক্রীতদাসকে।

তথ্য বলছে, প্রথমে এই সুবিশাল অট্টালিকার নাম দেওয়া হয় প্রেসিডেন্ট প্যালেস। পরে নামকরণ হয় হোয়াইট হাউস। প্রথম প্রেসিডেন্ট হিসেবে হোয়াইট হাউসে উঠেছিলেন আমেরিকার দ্বিতীয় প্রেসিডেন্ট জন অ্যাডামস।

১৮০১ সালে এই হোয়াইট হাউসের বাসিন্দা হন টমাস জেফারসন। তাঁর সময়েই হাউসের সামনের দিকের অংশ অনেকটাই প্রসারিত হয়। তিনি এই বাড়ির সামনে দু-টি স্তম্ভসারি তৈরি করেন।

জন অ্যাডামসের পর থেকে আমেরিকার সব প্রেসিডেন্টই এই হাউসে থেকে আসছেন। ১৮১৪ সালে যুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সেনারা হোয়াইট হাউসে আগুন ধরিয়ে দেয়। ফলে বাড়িটির ভিতরের অংশ পুরোটাই পুড়ে যায়। আর অনেকটাই পুড়ে যায় বাইরের অংশও।

কিন্তু আমেরিকা বলে কথা। পুড়ে যাওয়ার পর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই হোয়াইট হাউসের পুনর্নির্মাণ শুরু হয়। ১৮১৭ সালে হোয়াইট হাউসের আংশিক অংশ ফের তৈরি হয়। সেখানে ওঠেন জেমস মনরো।

১৮২৪ সালে হোয়াইট হাউসের দক্ষিণ ভাগের স্তম্ভগুলো সব তৈরি হয়ে যায়। আর উত্তর ভাগের স্তম্ভগুলোর নির্মাণ সম্পূর্ণ হয় ১৮২৯ সালে। ১৯০৯ সালে প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম হাওয়ার্ড ট্যাফট বাড়িটির দক্ষিণ দিকের অংশ সম্প্রসারিত করেন। সেই সময়ই প্রতিষ্ঠিত হয় ওভাল অফিস।

পরবর্তীকালে বাড়িটি আরও সম্প্রসারিত করা হবে বলে জানিয়ে ওভাল অফিসটি অন্য জায়গায় সরিয়ে নেওয়া হয়। বাড়িটির তৃতীয় তলায় চিলেকোঠাটি বাসযোগ্য করে তোলা হয় ১৯২৭ সালে।

ওয়াশিংটন ডিসি-র ১৬০০ পেনসিলভেনিয়া অ্যাভিনিউর এই বাড়িটিও নাকি ভূতুড়ে বাড়ি। কেবল সাধারণ আমেরিকানরাই নন, এই বাড়ির বাসিন্দাদের অনেকের মত তা-ই। তা ছাড়া এই ভবনে বসবাসকারী বহু বাসিন্দার মৃত্যু হয় অপঘাতে। তাঁদের আত্মারা নাকি এই বাড়ির মায়া আজও কাটাতে পারেননি।

১৯৫০ সালে হোয়াইট হাউসের বেসমেন্ট নতুন করে তৈরি হয়। অনেকে মনে করেন, সেখানে নাকি বহু মানুষের প্রেত ঘুরে বেড়ায়। মাঝে মাঝে এখানে নাকি বিশাল আকারের বিড়াল দেখা যায়। অনেকে আবার ছোটো আকারের বিড়ালও দেখেছেন বলে দাবি করেছেন।

হোয়াইট হাউসের প্রাক্তন কর্মচারীদের অনেকেই বলেছেন, এই বিশাল বাড়িতে বহু মানুষের অশরীরী আত্মা রয়েছে। প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ও প্রাক্তন কর্মচারীদের মধ্যে যাঁরা প্রয়াত, তাঁদের অনেকের আত্মাই নাকি গভীর রাতে ঘুরে বেড়ায় এই সুবিশাল হাউসে।

হোয়াইট হাউসের জমির মালিক ছিলেন ডেভিড বার্ন। সেই ডেভিড বার্নের আত্মাকেও বহু বার এই প্রাসাদোপম অট্টালিকায় দেখা গিয়েছে। ১৯৭০ সালে প্রেসিডেন্ট হেনরি ট্রুম্যানের দেহরক্ষী নাকি বার্নের আত্মার মুখোমুখি হয়েছিলেন। সেই আত্মা এতটাই বেপরোয়া ছিল যে, সেসেই দেহরক্ষীকে ঝাঁঝালো গলায় বলেছিল, ‘আই অ্যাম ডেভিড বার্ন।’

তাঁর কথা শোনার পর ডেভিড বার্ন নামে কেউ লুকিয়ে আছেন কি না, তা জানতে হোয়াইট হাউসে নাকি গোপনে তল্লাশি চালানো হয়েছিল। পরে জানা যায় সেই জমির মালিকের নাম ছিল ডেভিড বার্ন।

১৮১৪ সালে ব্রিটিশ সেনাবাহিনী হোয়াইট হাউস পুড়িয়ে দেয়। তখন হোয়াইট হাউসের সদর দরজায় ব্রিটিশ সেনারা পাহারা দিত। শোনা যায়, এখনও কোনো কোনো রাতে ব্রিটিশ সেনাদের আত্মারা সেখানে জড়ো হয়, পাহারা দেয় হোয়াইট হাউসকে। অনেকেই নাকি সেই দৃশ্য দেখেছেন।

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কন থেকে রুজভেল্ট, হ্যারিসন, অ্যান্ড্রু জ্যাকসন, রোনাল্ড রেগন-সহ অনেক প্রেসিডেন্টের আত্মাও নাকি ঘুরে বেড়ায় এই ভবনে। প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট হ্যারিসনের আত্মা বিভিন্ন সময় চিলেকোঠার সমস্ত জিনিস তছনছ করে কী যেন খুঁজত।

হোয়াইট হাউসের অনেক বাসিন্দারই সন্দেহ, প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম হেনরি হ্যারিসনের আত্মা নাকি এই বাড়ির ওভাল অফিসের চিলেকোঠাতেই রয়েছে। ১৮৪১ সালের ২৬ মার্চ নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে হ্যারিসন মারা যান।

আবার প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড্রু জ্যাকসনের আত্মাকে তাঁর শোবার ঘরে দেখেছেন অনেকেই। মার্কিন ফার্স্ট লেডি মেরি টড নাকি টমাস জেফারসন এবং জন টেলরের অশরীরী আত্মাকে এই হাউসেই দেখেছেন।

এবার বলা যাক একদা আমেরিকার ফার্স্ট লেডি অ্যাবেগেইল অ্যাডামসের কথা। হোয়াইট হাউসের পূর্ব দিকের একটি ঘরে সবসময় নাকি ব্যস্ত থাকতে দেখা যায় তাঁর আত্মাকে। কেউ কেউ আবার তাঁর আত্মাকে হলওয়ের হাওয়ায় ভাসতেও দেখেছেন বলে দাবি করেছেন।

যা-ই হোক, এই অ্যাবেগেইল অ্যাডামসের আত্মাকেই হোয়াইট হাউসের সবচেয়ে পুরোনো আত্মা বলে অনেকে মনে করেন। অ্যাবেগেইল ছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন অ্যাডামসের স্ত্রী। ১৮১৮ সালে তাঁর মৃত্যু হয়। ১৭৯৭ সাল থেকে ১৮০১ সাল পর্যন্ত জন এবং অ্যাবেগেইল অ্যাডামস হোয়াইট হাউসের বাসিন্দা ছিলেন।

অ্যাবেগেইল প্রতিদিন ইস্টরুমে বা পূর্ব দিকের একটি ঘরে কাপড় শুকোতে যেতেন। তিনি মারা যাওয়ার পর অনেকেই তাঁকে একইভাবে পূর্ব দিকের সেই ঘরে কাপড় শুকোতে যেতে দেখেছেন বলে দাবি করেন।

এবার বলা যাক ২০০২ সালের কথা। ওই বছর বহু অতিথি হোয়াইট হাউসে ছিলেন। তাঁরা আবার দোতলার পশ্চিম দিকের ঘরে অ্যাবেগেইলকে দেখেছেন বলে জানিয়েছেন। হোয়াইট হাউসের মাস্টার বেডরুমে অতিথিদের মধ্যে যাঁরা ছিলেন, তাঁদের একজন বলেছেন আবার একটি অদ্ভুত কথা।

তিনি নাকি এক ব্রিটিশ সেনাকে দেখেন। ওই সেনা নাকি সেই ঘরে আগুন লাগানোর চেষ্টা করছিল। তাঁর পোশাক কিন্তু এই সময়ের ছিল না। ছিল ১৮১২ সালে যে যুদ্ধ হয়েছিল, সেই সময়ের।

এ ছাড়া হোয়াইট হাউসে নাকি রয়েছে এখানকার বহু কর্মীর আত্মাও। সময় বিশেষে তাঁদেরও দেখা যায়। যেমন তাঁদের একজনকে নাকি দেখা যায় মার্কিন ফার্স্ট লেডি ডলি ম্যাডিসনের সঙ্গে। সকলেই জানেন, মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রেস কনফারেন্স হয় রোজ গার্ডেনে।

আঠারো শতকে ফার্স্ট লেডি ডলি ম্যাডিসনই নাকি এই রোজ গার্ডেন তৈরি করিয়েছিলেন। ওই ঘটনার এক-শো বছর পর মার্কিন ফার্স্ট লেডি ওই গার্ডেনটি তুলে দেন। হোয়াইট হাউসের কর্মীদের অনেকেই তারপর বহু বার বলেছেন, ওই গার্ডেনে নাকি ডলির আত্মা ঘুরে বেড়ায়। এখনও নাকি গভীর রাতে মাঝে মাঝে হোয়াইট হাউসের সেই বাগানে আগের মতোই তাঁকে গাছের পরিচর্যা করতে দেখা যায়।

প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট লিণ্ডন জনসনের মেয়ে লিণ্ডা নাকি নিজের চোখে ভূত দেখেছিলেন এই বাড়িতেই। অপর মার্কিন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কনের ছেলে উইলি লিঙ্কন হোয়াইট হাউসেই ১৮৬২ সালে মাত্র এগারো বছর বয়সে সম্ভবত টাইফয়েড হয়ে মারা যায়। যে ঘরে সেমারা যায়, সেই ঘরেই নাকি এক-শো বছর পরে উইলিকে দেখেছিলেন লিণ্ডা।

লিণ্ডা দেখেন, তিন-তলার ওই বেডরুম ভেদ করে উইলি অন্য ঘরে চলে যাচ্ছে। দেখে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন লিণ্ডা। শুধু লিণ্ডাই নন, এখানে অনেকেই নাকি উইলি লিঙ্কনের আত্মাকে দেখেছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট গ্রোভার ক্লিভল্যাণ্ডের স্ত্রীরও নাকি প্রায় একই অভিজ্ঞতা হয়েছিল।

আমেরিকার অন্যতম সফল প্রেসিডেন্ট হিসেবে স্বীকৃত আব্রাহাম লিঙ্কন। ১৮৬০ সালে রিপাবলিকান প্রার্থী হিসেবে তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৮৬৩ সালে তিনি আমেরিকায় দাসপ্রথার অবসান ঘটান এবং দাসদের মুক্তি দেন। পাশাপাশি দাসপ্রথাকে কেন্দ্র করে আমেরিকার গৃহযুদ্ধকে তিনি কঠোর হাতে দমন করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছিলেন।

এই ঘটনা তাঁর শত্রুর সংখ্যাও কম বৃদ্ধি করেনি! ১৮৬৫ সালের ১৫ এপ্রিল ওয়াশিংটনের ফোর্ড থিয়েটারে নাটক দেখার সময় তিনি আক্রান্ত হন। জন উইলকিস বুথ নামে এক আততায়ীর গুলিতে তিনি প্রাণ হারান। তিনিই ছিলেন প্রথম মার্কিন প্রেসিডেন্ট, যিনি আততায়ীর গুলিতে নিহত হন।

লিঙ্কনের বন্ধু এবং জীবনীকার ওয়ার্ড হিল ল্যামন লিঙ্কনের মৃত্যু সম্পর্কে অদ্ভুত একটি কাহিনি শুনিয়েছেন। যে কাহিনি চমকে দিয়েছিল আমেরিকার রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদেরও। ১৮৬৫ সালে যে গুপ্ত হামলায় লিঙ্কন প্রাণ হারান, তার আগে সেই বিষয়টি নাকি স্বয়ং লিঙ্কনই স্বপ্নে দেখেছিলেন।

তিনি নাকি স্বপ্নে দেখেন, ঘুম থেকে উঠে তিনি কাদের যেন কান্নার আওয়াজ শোনেন। ঘরের বাইরে গিয়ে তিনি দেখেন, হোয়াইট হাউসের সকলের চোখেই জল। তিনি জিজ্ঞাসা করেন, তোমরা কাঁদছ কেন? সকলে জবাব দেন, প্রেসিডেন্ট লিঙ্কন আততায়ীর গুলিতে মারা গিয়েছেন।

এই সময়ের একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করতেই হয়। ভয়ংকর রহস্য উঠে আসে অ্যানি সুরাটের ঘটনায়। ১৮৬৫ সালে লিঙ্কনকে খুনের ঘটনায় যুক্ত থাকার অপরাধে অ্যানির মায়ের ফাঁসি হয়।

অ্যানি তাঁর মায়ের জীবনভিক্ষা চাইতে হোয়াইট হাউসে গিয়েছিলেন। হোয়াইট হাউসের সদর দরজায় দাঁড়িয়ে সেই ভিক্ষা চেয়েছিলেন তিনি। সেখানে নাকি অ্যানিকে আজও দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। বিশেষ করে জুলাই মাসের ৭ তারিখে এই দৃশ্য দেখা নাকি ছিল অবধারিত। কারণ ওই দিনটিই হল অ্যানির মায়ের মৃত্যুবার্ষিকী।

আব্রাহাম লিঙ্কন এবং তাঁর স্ত্রী মেরি টড নাকি হোয়াইট হাউসের গ্রিনরুমে প্ল্যানচেট করতে পছন্দ করতেন। হোয়াইট হাউসে তাঁদের ছেলে উইলি মারা যাওয়ার পর তাঁরা দু-জনেই নাকি প্ল্যানচেট করে উইলির আত্মাকে ডেকে আনতেন। শুধু তাই নয়, উইলির সঙ্গে তাঁরা ও-ভাবে কথাও বলতেন।

লিঙ্কনের গুপ্তহত্যার পরেও মেরি টড তাঁকে নিয়েও একই চেষ্টা করেছিলেন। বেশ কিছুদিন পর তিনি বস্টনের ভাস্কর মামলারের স্টুডিয়োয় গিয়েছিলেন। ওই ভাস্কর নাকি অশরীরীদের ছায়া অস্তিত্বের ছবিও পাথরে খোদাই করতে পারতেন। মেরি মামলারকে দিয়ে তেমনই লিঙ্কনের একটি ছবি পাথরে খোদাই করেছিলেন। সেই ছবিতে দেখা যায়, মেরির কাঁধে যিনি হাত দিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, তিনি স্বয়ং লিঙ্কন।

আব্রাহাম লিঙ্কনের আত্মা হোয়াইট হাউসে আজ কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছে। উইনস্টন চার্চিল থেকে নেদারল্যাণ্ডসের রানি উইলহেলমিনিয়া, কে দেখেননি লিঙ্কনের আত্মা! সকলের মুখে মুখে ঘুরেছে লিঙ্কনের আত্মা দেখার কাহিনি।

দ্য ইয়েলো ওভাল রুমটিতে ছিল লিঙ্কনের ব্যক্তিগত লাইব্রেরি। এই ঘরটিকে তিনি অত্যন্ত পছন্দ করতেন। সেখানে বইপত্র পড়ে তাঁর বহু সময় কেটে যেত। মৃত্যুর পরেও এই ঘরটির মায়া ত্যাগ করতে পারেননি তিনি। শোনা যায়, এই ঘরের জানালার ধারে প্রায়ই লিঙ্কনের আত্মা নাকি দাঁড়িয়ে থাকে। মার্কিন ফার্স্ট লেডি গ্রেস কুলিজও ওই ঘরের জানালার সামনে লিঙ্কনের ছায়াশরীর দেখেছেন বলে জানিয়েছিলেন।

লিঙ্কনের আত্মা প্রথম দেখেন প্রেসিডেন্ট কেলভিন কুলিজের স্ত্রী গ্রেস কুলিজই। কেলভিন কুলিজ প্রেসিডেন্ট ছিলেন ১৯২৩ সাল থেকে ১৯২৯ সাল পর্যন্ত। তাই এই সময়ে কেলভিনের সঙ্গে হোয়াইট হাউসে থাকতেন তাঁর স্ত্রী গ্রেসও। প্রথমে সকলে ভেবেছিলেন, গ্রেস কুলিজ সম্ভবত ভুল দেখেছেন। কিন্তু পরবর্তীকালে বার্ড জনসনের কথা শোনার পর সকলে বুঝতে পারেন ফার্স্ট লেডি গ্রেস ভুল বলেননি বা দেখেননি।

প্রেসিডেন্ট লিণ্ডন জনসনের স্ত্রী লেডি বার্ড জনসনও প্রেসিডেন্ট লিঙ্কনের আত্মা দেখেছেন। লিণ্ডন জনসন প্রেসিডেন্ট ছিলেন ১৯৬৩ সাল থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত। এই ক-বছর হোয়াইট হাউসে থেকে বেশ কয়েক বার লিঙ্কনের ছায়াশরীর দেখেছিলেন বার্ড জনসন।

সবচেয়ে বেশি দেখেছেন প্রেসিডেন্ট ফ্র্যাঙ্কলিন রুজভেল্ট। তিনি প্রায়ই দেখতেন লিঙ্কন যেন গম্ভীর ভঙ্গিমায় তাঁর রুমের বারান্দায় পায়চারি করছেন। আবার লাইব্রেরিতেও তাঁকে চেয়ারে বসে বই পড়তে দেখেছেন রুজভেল্ট।

আসলে রুজভেল্টের সময় ওই লাইব্রেরি আর লাইব্রেরি ছিল না। হোয়াইট হাউসে থাকার সময় লিঙ্কনের লাইব্রেরিকেই নিজের শোবার ঘর বানিয়েছিলেন রুজভেল্ট। তাই রাতে ঘুম ভেঙে গেলে তিনি হামেশাই লিঙ্কনকে চেয়ারে বসে বই পড়তে দেখতেন সেই ঘরে।

এবার বলা যাক, নেদারল্যাণ্ডসের রানি উইলহেলমিনিয়ার কথা। তিনি আমেরিকা সফরে এসে হোয়াইট হাউসে ছিলেন। সেই সময় রাতে তিনি নিজের ঘরে ঘুমোচ্ছিলেন। রাত গভীর হলে কে যেন তাঁর ঘরের দরজায় টোকা দেন। কেউ এসেছে ভেবে বিছানা থেকে উঠে উইলহেলমিনিয়া দরজা খোলেন।

খুলেই দেখেন, তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে অসম্ভব ব্যক্তিত্বশালী এক পুরুষ। তাঁর মাথায় বেশ বড়ো একটা টুপি। মুখটা দেখে তাঁর বুঝতে অসুবিধে হল না, ওই পুরুষটি আসলে আব্রাহাম লিঙ্কন।

কিন্তু সেটা কী করে সম্ভব? লিঙ্কন তো সেই ১৮৬৫ সালে মারা গিয়েছেন। তাহলে তিনি কী করে আসবেন সেখানে? ব্যাপারটা সহ্য করতে পারলেন না উইলহেলমিনিয়া। ভয়ে চিৎকার করে উঠলেন। তারপর অজ্ঞান হয়ে পড়েই গেলেন একেবারে মাটিতে!

এবার বলা যাক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলের কথা। আমেরিকা সফরে গিয়ে তাঁকেও নিয়ম অনুযায়ী থাকতে হয় হোয়াইট হাউসেই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সেটা। স্বভাবতই সারাদিন সরকারি কাজে ব্যস্ত ছিলেন। বিকেলের পর সেই ব্যস্ততার ইতি ঘটল।

নিজের ঘরে গিয়ে তিনি সোজা বাথরুমে চলে গেলেন। বেশ আয়েশ করেই সান্ধ্যস্নান সারলেন। তারপর বেরিয়ে এলেন বাথরুম থেকে। পরনে কোনো পোশাক নেই। যেহেতু ঘরে তিনি একা, সুতরাং তাতে অসুবিধেও কিছু ছিল না। সেই অবস্থাতেই চুরুট ধরালেন।

বিশ্রামের এই সময়টাকে নিজের মতো করে পেতে চুরুট নিয়ে নগ্ন অবস্থাতেই চেয়ারে গিয়ে বসলেন। চুরুটে কয়েকটা টান দেওয়ার পর তাঁর মনে হতে লাগল ঘরে তিনি যেন একা নেই, অন্য কেউ রয়েছে!

ব্যাপারটা কী? ঘরের চারদিকে তাকাতে গিয়ে ফায়ারপ্লেসের দিকে তাঁর দৃষ্টি গেল। আর তখনই তাঁর চক্ষুস্থির হয়ে গেল। সেখানে কে একজন বসে রয়েছেন চেয়ারে! কে? ভালো করে দেখলেন। চিনতে সমস্যা হল না। স্বয়ং আব্রাহাম লিঙ্কন।

ওই দৃশ্য দেখে তাঁর ঘাবড়ে যাওয়ার কথা ছিল। যাচ্ছিলেনও। তবে সামলে নিলেন নিজেকে। পৃথিবীর অনেক সমস্যা সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁকে সামলাতে হয়। সুতরাং ভয় পেলে তাঁর চলবে না।

ফের ভালো করে দেখলেন লিঙ্কনকে। বড়ো বিষণ্ণ লাগল তাঁকে। যেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে বড়ো চিন্তিত তিনি। উদবিগ্ন পৃথিবীর ভবিষ্যৎ নিয়ে। তবে বেশিক্ষণ লিঙ্কনকে নিয়ে ভাবতে পারলেন না চার্চিল, কারণ তাঁর মনে পড়ে গেল নিজের শরীরে কোনো পোশাক না থাকার কথা।

তিনি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমেরিকায় এসেছেন। আর তাঁর সামনে রয়েছেন প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। সুতরাং সেখানে তাঁর নগ্ন হয়ে থাকাটা রীতিমতো অশোভনীয়। খুব লজ্জা লাগল তাঁর।

কিন্তু করবেনই বা-কী? লিঙ্কন যে তাঁর ঘরে এভাবে চলে আসবেন, তিনি তো তা জানতেন না! সুতরাং ভুলটা তাঁর নয়। ভুল যদি কারও হয়ে থাকে, তা হলে তা স্বয়ং প্রয়াত প্রেসিডেন্ট লিঙ্কনের!

তাই লজ্জা কাটিয়ে উঠতে তাঁর সময় লাগল না। বরং রসিকতা করে নিজেকে আরও স্বাভাবিক করার বুদ্ধি তাঁর মাথায় এল। তিনি সরাসরি লিঙ্কনকে বললেন, ‘শুভ সন্ধ্যা, মিস্টার প্রেসিডেন্ট।’

চার্চিলের কথার কোনো জবাব দেননি লিঙ্কন।

চার্চিল তার পরোয়াও করলেন না। নিজের সহজ ভাব বজায় রেখেই ফের বললেন, ‘আমাকে আপনি একেবারে অপ্রস্তুত অবস্থায় পেয়ে গেলেন দেখছি!’

হোয়াইট হাউসে লিঙ্কনের ছায়াশরীরের দেখা অনেকেই পেয়েছেন। তবে চার্চিলের ওই লিঙ্কন দর্শনের কোনো তুলনা নেই।

চার্চিল সাহসী ও বুদ্ধিমান ছিলেন বলে লিঙ্কনের আত্মার সঙ্গে রসিকতা করতে ছাড়েননি। তবে তাঁর সাহসেরও একটা সীমা ছিল। তাই সেই রাতে আর ওই ঘরে কাটানোর স্পর্ধা দেখাননি তিনি। তাঁর জন্য হোয়াইট হাউসেই অন্য একটি ঘরের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

আমেরিকার প্রাক্তন ফার্স্ট লেডি জ্যাকুই কেনেডি, লিডবার্ড জনসন এবং প্রাক্তন প্রেসিডেন্টের সন্তানদের মধ্যে সুসান ফোর্ড, ম্যারুইন রিগেনরা দাবি করেছেন, তাঁরাও হোয়াইট হাউসে লিঙ্কনের আত্মাকে দেখেছেন।

এই সুবিশাল বাড়ির কমপক্ষে দশটি জায়গায় নাকি অস্বাভাবিক নানা ঘটনা ঘটেছে। বিষয়টি বিশ্বাস করতেন অপর মার্কিন প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যান। তিনিও নাকি ওই ধরনের বিভিন্ন ঘটনার মুখোমুখি হয়েছেন। তবে বিষয়টি নিয়ে খুব বেশি মুখ খোলেননি।

তবে একবার বিরক্ত হয়ে বলে ফেলেছিলেন, ‘এটা একটা জঘন্য জায়গা। একে ভৌতিক বাড়ি বললে ভুল বলা হবে না। ব্যাপারটা নিয়ে অনুসন্ধান করা উচিত। সমস্ত বিষয় ক্যামেরায় বন্দি করা উচিত।’ শোনা যায়, লিঙ্কনের অশরীরী আত্মা নাকি তাঁর ঘরের দরজায় কড়া নেড়েছিল!

এবার বলা যাক ২০১৬ সালের নভেম্বরের কথা। একটি খবর প্রকাশ করে সকলকে চমকে দেয় ওয়াশিংটন পোস্ট। সেখানে প্রকাশিত খবরে জানানো হয়, হোয়াইট হাউসের একজন বাগান পরিচর্যাকারী দাবি করেছেন, ১৬ নভেম্বর গভীর রাতে তিনি নাকি সেখানে লিঙ্কনের দেখা পেয়েছেন। হোয়াইট হাউসের নিয়মের কড়াকড়ির জন্য তাঁর নাম প্রকাশ করেনি ওয়াশিংটন পোস্ট।

ওই পরিচর্যাকারী জানিয়েছেন, রাত দুটোর সময় ঘুম না-আসায় তিনি নাকি নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন। আর তখনই তিনি অতিথি ভবনের সামনের বাগানে লম্বা আলখাল্লা পরা এক ব্যক্তিকে পায়চারি করতে দেখেছেন। সেই ব্যক্তিকে চিনতে না-পেরে তিনি তাঁর পরিচয় জানতে তৎপর হন। কারণ হোয়াইট হাউসে অপরিচিত কারও ঘোরাফেরা সম্পূর্ণ বেআইনি।

তখন তিনি এক নিরাপত্তাকর্মীকে ডেকে আনেন সেখানে। তখনও সেই ব্যক্তি সেখান থেকে যাননি। তাঁদের দু-জনকে আসতে দেখে মুখ ফিরিয়ে দেখেন সেই আলখাল্লা পরা ব্যক্তি। তখন দু-জনেই চিনতে পারেন সেই ব্যক্তিকে। তিনি আর কেউ নন, স্বয়ং আব্রাহাম লিঙ্কন! হ্যাঁ, এত বছর পরেও! তাঁদের দেখে মুচকি হেসে ধোঁয়ার মতো হাওয়ায় মিলিয়ে যান লিঙ্কন।

বিষয়টির কথা জানতেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাও। তিনি হোয়াইট হাউসের বাসিন্দা হওয়ার পর তাঁর পরিবারেও এই কাহিনিগুলি প্রভাব ফেলেছিল। তাঁর মেয়েরা রীতিমতো ভয় পেত ওই সব কথা মনে করে। তবে বারাক ওবামার স্ত্রী মিশেল ওবামা জানিয়েছেন, ওই বাড়িতে থাকার সময় কোনো অশরীরী বা অতিপ্রাকৃত শক্তির কোনো প্রমাণ তিনি পাননি।

ওবামা তো বিষয়টি নিয়ে রসিকতা করতে গিয়ে আপত্তিকর কথা বলে ফেলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, একদিন ফায়ারপ্লেসের সামনে ন্যান্সি রেগনের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়েছিল। তিনি ওবামাকে বেশ কিছুক্ষণ সঙ্গ দিয়েছিলেন! তাঁর এই রসিকতা নিয়ে সমালোচনা শুরু হলে তিনি অবশ্য ক্ষমা চেয়ে নেন।

হোয়াইট হাউসের রোজ রুম, লিঙ্কনের রিডিং রুম বা লাইব্রেরি, বেডরুম এবং দোতলার পশ্চিম দিকের ঘরগুলিতে নানা সময়ে নানা ব্যক্তিত্বের অশরীরী উপস্থিতির প্রমাণ পেয়েছেন অনেকেই।

তবে একটা কথা সকলেই স্বীকার করে নিয়েছেন, হোয়াইট হাউসে কিছু থাকলেও থাকতে পারে। আর যে শক্তিই থাকুক-না কেন, সেই শক্তি কারও কোনো ক্ষতি কখনো করেনি।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%